ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জাপান ১৩ 

    Rumjhum Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৭ মে ২০২২ | ১৬৭ বার পঠিত
  • চাইনিজে চান, কোরিয়ানে সিওন, ভিয়েতনামিসে থিয়েন তাই হল গিয়ে জাপানিতে জেন। বৌদ্ধ ধর্মের অনেক শাখার মধ্যে ‘জেন’ বুদ্ধিজম’ এশিয়ায় বহু;প্রচলিত বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম শাখা। ভারি সহজ ও সাধারণ এই জেন বুদ্ধিজম। নেই আচার অনুষ্ঠানের বাড়াবাড়ি। ধ্যানের মাধ্যমে নিজের আত্মিক উন্নতি সাধনই এই ধারার মূলমন্ত্র। সুন্দরের প্রকাশকে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করা আর অন্তরের সৌন্দর্যকে সুন্দর করে প্রকাশ করা জেন বুদ্ধিজমের মূল ভাবনা। জাপানের কলাবিদ্যা, বাগান করা, ফুল সাজানো, চা-পান উৎসব, সব কিছুর মধ্যে দিয়ে এই যে সুন্দরের পূজা এ জাতি করে চলেছে তার অন্তঃ স্থলে আছে জেন দর্শন। নিজো-জো ক্যাসেল থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম এমনি দুই জেন বৌদ্ধ মন্দির দেখতেঃ কিংকাকুজি ( গোল্ডেন প্যাভেলিয়ন) আর গিনকাকুজি ( সিল্ভার প্যাভেলিয়ন)। বাস ধরে প্রায় ঘন্টা খানেক পরে পৌঁছোলাম কিংকাকুজি মন্দির। বাস স্টপ থেকে বেশ খানিকটা হেঁটে মন্দিরের গেটে পৌঁছোলাম। সামনে বিরাট একটা কালো গেট। পাশে টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা হল। গেটের ওপারে কি আছে তা বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই। গেট পেরোতেই যেন এক রূপকথার দেশে পৌঁছোলাম। এমন অপূর্ব সুন্দর জায়গা আমি সত্যিই খুব কম দেখেছি। এক খন্ড জলাশয়, চারপাশে সবুজের সমারোহ, যত্রতত্র ফুটে থাকা চেরি ফুলের শোভা।দূরে ছোট ছোট টিলার সারি। আর ঘন সবুজের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সোনালী এক মন্দির। এ যেন কোনো শান্তি-নীড়ে পৌঁছে গেছি। এমন একটা জায়গা বানপ্রস্থের উপযুক্ত জায়গা বটে। আসিকাগা ইয়োসিমিতশু, মুরোমাচি যুগের তিন নম্বর শোগুনেরও নিশ্চয় সেই কথাই মনে হয়েছিল। তাই তিনই ১৩৯৭ সালে সায়নজি পরিবারের থেকে এই জায়গা কিনে নিজের জন্য বানালেন রিটায়ারমেন্ট ভিলা, নাম দিলেন কিতায়ামা ডেন। কালে কালে এই গোল্ডেন প্যাভেলিয়ন হয়ে দাঁড়ালো অফিসিয়াল গেষ্ট হাউস। মুরোমাচি যুগে চৈনিক প্রভাব জাপানে তুঙ্গে। সে সময় এই ভিলায় উঁচু দরের মানুষজনের আনাগোনা বাড়ল। ইয়োসিমিতশুর মৃত্যুর পর তার ইচ্ছায় এই গেষ্ট হাউস হল জেন মন্দির। রোঁকুয়োজি মন্দির নামে পরিচিত হল ইয়োসিমিতশুর শেষ জীবনের বারাণসী। এমন সুন্দর জায়গা ছেড়ে স্বর্গে যাওয়ারও ইচ্ছা ছিল না তার। তাই তো রোঁকুয়ো ডেন নাম দিয়েছিলেন সাধের এই মন্দিরের। ‘রোঁকুয়ো ডেন’ অর্থাৎ কিনা মৃত্যুর পরের আশ্রয়। তিন তলা মন্দিরের ওপরের দু’তলা চকচকে সোনালি পাতে তৈরি। চূড়ায় মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে সোনালী এক মোরগ। মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীতে আছে তিন ধরণের স্টাইলের সংমিশ্রণ। হেইয়ান যুগে সম্রাটের প্রাসাদ নির্মাণ হতো যে শিন্ডেন স্টাইলে একতলা তৈরি হয়েছে সেই শৈলীতে। দোতলা তৈরি হয়েছে সামুরাইদের বাসস্থানের মতো শৈলীতে। আর একদম ওপরের তলা তৈরি হয়েছে চাইনিজ স্থাপত্যের অনুকরণে। কিংকাকুজি মন্দিরের স্থাপত্য থেকে মুরোমাচি যুগের স্থাপত্যের ধারণা পাওয়া যায়। জাপানের নিজস্ব স্থাপত্য শৈলীর বিশেষত্ব হল মাটি থেকে কিছুটা ওপরে কাঠের তৈরি ঘর, আর মাথায় ঢালু চাল। দেওয়ালের বদলে কাপড়ের স্লাইডিং দরজার ব্যবহার জাপানের নিজস্ব ঘরানা। ক্রমে ক্রমে বিদেশি স্থাপত্যের সংমিশ্রণ ঘটতে থাকে। যেমন চৈনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া লাগে বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে। আর মেজি শক্তির উত্থানের পর ব্যপকভাবে পশ্চিম দেশের প্রভাব পড়তে থাকে জাপানের আর্কিটেকচারের ওপর।  মন্দির চত্বরের এক পাশে আছে পুরোণো এক টি হাউস আর আছে একটা চালু মন্দির যেখানে মানুষজন গিয়ে পুজো অর্চনা করতে পারে। কারণ কিংকাকুজি আসল মন্দির প্রকৃতির কোলে সাজানো এক ইতিহাসমাত্র, সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। 
    কিংকাকুজি মন্দির দেখে আবার একটা বাসে চড়া গেল। মিনিট পঁয়তাল্লিশ লাগল গিংকাকুজি মন্দিরে পৌঁছাতে। মুরোমাচি যুগের অষ্টম শোগুন ইয়োশিমাস, হিগাসিয়ামা ডেন নামের এই রিটায়ারমেন্ট ভিলা বানিয়েছিলেন ১৪৮২ সালে। পরবর্তীকালে গিংকাকুজি নামে পরিচিত হলেও প্রথম দিকে এই ভিলা হিগাশিয়ামা সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে এবং এইখানেই জাপানে আধুনিক জীবনশৈলীর সূত্রপাত হয়। জেন বুদ্ধিজমের নান্দনিক বোধের সঙ্গে ওয়াবি-সাবির ধারণা (সরল সাধারণের মধ্যে সৌন্দর্য সন্ধান) মিলিয়ে নতুন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন শোগুন ইয়োশিমাস। তাই হিগাসিয়ামা কালচার বলে জাপানে পরিচিত। জাপানের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে আছে যে চা-পানের রীতি, ফুল সাজানোর কলা, নোহ্ নামের নাটক এবং কালি দিকে সূক্ষ্ম পেন্টিং এসবই আসলে হিগাসিয়ামা কালচারের অঙ্গ। বিশ্বের কাছে যা আজও জাপানী সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে আছে। ওখানে পৌঁছে প্রথমে চোখে পড়ল পথের দু”ধারে পাথর, বাঁশ আর ঘন সবুজ গাছ দিয়ে তৈরি বেড়া। বেশ মনোরম একটা শুরুয়াৎ বলা যায়। সেই পথ বেয়ে এগোতে মন্দির গেটে পৌছোনো গেল। ভিতরে সেই মনোমুগ্ধকর এক নৈসর্গিক চিত্রপট যেন যত্ন করে কেউ এঁকে রেখেছে আমাদের জন্য। ছোট জলাশয়, ছোট পথ বেয়ে ওপরে চড়লে একটুকরো টিলা, সবুজের ঘেরাটোপ সব মিলিয়ে জায়গাটা ভীষণ সুন্দর। টিলার ওপর থেকে কিয়োতো শহরের ব্যপ্তি নজরে পড়ে। টিলার গায়ে ঘন সবুজ মসের আস্তরণ, বেঁটে বেঁটে জাপানী পাইন গাছের অঙ্গসৌষ্ঠব এ সবের মধ্যে হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ছোঁয়া লেগে আছে। কত শীত, কত না বসন্ত কত গ্রীষ্ম ঋতু চক্রাকারে ঘুরে চলেছে, কত পালাবদল হয়ে গেছে তবু অনন্ত কাল থেমে থাকেনি। ওপর থেকে নজরে পড়ল দুতলা কাঠের মন্দির, কানোন ডেন। একতলা তৈরি জাপানি স্থাপত্যে আর দু তলা হয়েছে চৈনিক আদলে। সামনে সাদা এক স্তূপের মতো করা। দেখতে দেখতে জানতে জানতে  মিশে যাই ইতিহাসে, অতীত বর্তমান সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল সময় আর স্থিতির বন্ধন থেকে  মুক্ত হয়ে যেন কোন সমান্তরাল ইউনিভার্সে দিন কাটাচ্ছি। আজ আমাদের টোকিও ফিরে যাওয়া। ‘ফিল্জপার্স পাথ’ দিয়ে হাঁটা আমাদের হয় নি। কিয়োতো বেড়াতে এসে মানুষজন পায়ে হেঁটে বা সাইকেল চেপে এক মন্দির থেকে আর এক মন্দির ঘুরে বেড়ান। সংক্ষিপ্ত জাপান ট্যুরে আমরা সে বিলাসিতা করতে পারলাম না। তবু যা দেখলাম, আর যা জনলাম তাও কিছু কম নয়। নিজের দেশ ছাড়া বৃহত্তর এশিয়া সম্বন্ধে আমার ধারণা খুব কম ছিল। এখানে এসে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আমরা সন্ধ্যাবেলার হিকারিতে ফিরছি। মঙ্গলবার বেরিয়েছি বাড়ি থেকে। আজ শুক্রবার, হত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সবাই। বাড়ি ফিরে দু’দিন কোথাও যেতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। নিশিকাশাই স্টেশনে যখন পৌছলাম তখন রাত ন’টা। বাইরে বেরিয়ে মনটা ভীষণ ভাল হয়ে গেল দুটো কারণে, এক জেবরাজ এসেছে স্টেশনে নিতে আর দুই বাতাসে ভেসে আসা স্যাক্সোফোনের মধুর আওয়াজে। দেখি স্টেশনে ঢোকার মুখে একটি জাপানি কিশোর ছেলে আপন মনে বাজিয়ে চলেছে স্যাক্সোফোন। দূর দেশি সেই কিশোর ছেলের আপন ভোলা সঙ্গীতে মন কেমন করে উঠল। কেন যে এমন হয় জানা নেই, তবু কখনও কখনও এমন হয়। বুঝি এমন অনেকেরই হয়, শুধু কবি সে অনুভূতি গানে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। আর আমাদের মতো সাধারণের বুকে সে অনুভূতি শুধু বেবাক কান্না হয়ে জমা হয়ে থাকে। মন কেমন করে কে জানে কে জানে কিসের লাগি মন কেমন করে…।    
     
    কিনকাকুজি মন্দির 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন