• টইপত্তর  ভ্রমণ   যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে

  • উঠলো বাই

    সে
    ভ্রমণ | যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে | ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ | ২৮৬০ বার পঠিত
  • তখনও গোটা ইয়োরোপে দেশের সংখ্যা এখনকার চেয়ে ডজনখানেক কম, এশিয়ার দেশের সংখ্যাও বেশ কম। ইউরোস্টার রেলপথ তৈরিই হয়ে ওঠেনি, তবে সেটা তৈরি হলে খরচ যেমনই হোক না কেন মানবসভ্যতার ইতিহাসে যে একটা মাইলফলক সৃষ্টি হবে এরকম আলোচনা টুকটাক হয়। ইয়োরোপ তখনও দ্বিধাবিভক্ত এবং দ্বিধাগ্রস্ত।
    সোভিয়েত দেশে তখন স্ট্রাকচারাল পরিবর্তনের কথা পাবলিককে বুঝিয়ে দিয়ে তলে তলে সিস্টেমিক পরিবর্তনের সওদা হচ্ছে, কেও কিচ্ছুটি জানে না। এইরকম একটা টাইমে বয়ফ্রেন্ডের হাতে রেগুলার নিগৃহীত হতে হতে, মধ্য এশিয়ার একটা মরূদ্যান শহরে  আমার মনের মধ্যে হঠাৎ ঘটে গেল সিস্টেমিক পরিবর্তন।
    হাতে তখন আমার মোট দুটো অপশন, হয় পড়ে পড়ে মার খাও, নয়ত পালাও। আমি সেকেন্ডটা চুজ করলাম। গত শতাব্দীর আশির দশকে ভারতীয় মেয়েরা ভীতু হতে শুরু করেছিল (কারন অনেক থাকতে পারে, কিন্তু এটা অবজারভেশন) এবং নো ওয়ান্ডার আমিও সেই দলেই ছিলাম। কথায় কথায় ভয় পাওয়াটা একটা নেশার মতো আচ্ছন্ন করে রাখে। নিজেকে দুর্বল ভাবতে ভাবতে মানসিক ভাবে পরনির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে, যেটা প্রথমদিকে আরামদায়ক এবং খানিকটা রোম্যান্টিক হলেও,  কেমন যেন দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার মতো আচ্ছন্ন করে রাখে। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে এক ঝটকায় বের হতে হয়, অ্যাটলিস্ট আমাকে বের হতে হয়েছিল এক ঝটকাতেই। সেই প্রসেসটাতে কয়েক ঘন্টার ভেতর ডিসিশন নিয়ে ফেলি যে, বেড়াতে যাবো। একা। এর আগের ছুটিগুলোতে দেশে যেতাম, সেসবে কর্তব্য দায়িত্ববোধ সামাজিকতা সেন্টিমেন্ট এইসব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে মড়িয়ে একাকার হয় থাকত। এবার সেসব বাহুল্য বাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম একা, সম্পূর্ণ অজানার দিকে। গন্তব্য লন্ডন।
    প্রশ্ন উঠতে পারে, লন্ডন কেন? হোয়াই? বেড়ানোর জায়গা কি আর নেই?
    তা ঠিক নয়,  আশে পাশে অনেক জায়গা ছিল, কিন্তু অনেকটা দূরে যাওয়ার মধ্যে কেমন একটা নিজেকেই পরীক্ষা নেবার ব্যাপার থাকে, যেখানে থাকে শক্ত পরীক্ষায় পাশ করার আনন্দ, ফলে নিজেকেই বেশি নম্বর দেবার প্রবণতা, সম্ভবত নিজের ওপর বিশ্বাস আর ভরসা তৈরি করার জন্যই। 
    আশেপাশে আমাদের হস্টেলে অনেককেই দেখতাম লন্ডন ফেরৎ হয়ে খুব গর্ববোধ করতে, তাই কঠিন টার্গেটটাই সেট করলাম নিজের জন্য।
    প্রথমে হেঁটে, তারপর ট্রলিবাসে, তারপর এরোপ্লেনে চেপে মস্কো পৌঁছে বিশাল সব লাইন টাইনে দাঁড়িয়ে গোটাপাঁচেক দেশের ভিসা নেবার লম্বা প্রসেস অতিক্রম করতেই প্রায় দুসপ্তাহ লেগে গেছল। (এ প্রসঙ্গে আগে লিখেছি "তেহরানের স্বপ্ন" শিরোণামে) । দুটো রাত এবং তিনদিনের জার্নি, কিছুটা জলপথে, অধিকাংশটাই রেলপথে। শুরু হলো যাত্রা দুপুরবেলা। মস্কোর একটা রেলস্টেশন থেকে (বেলোরুস্কি ভাকজাল)।
    দীর্ঘ রেলযাত্রার খুঁটিনাটি এই লেখার প্রতিপাদ্য নয়, প্রাথমিক ঝটকায় ভয়টয় কাটিয়ে দুটো রাত ট্রেনে কাটিয়ে তৃতীয় দিন দুপুরে যখন ফেরিঘাটে ( হুক ভান হলান্ড)  ট্রেন থামল তখন আবার ভয় ভয় অনুভূতিটা ফিরে এলো। বেশ কয়েকঘন্টা পরে ফেরি যখন ভিড়বে ইংল্যান্ডের বন্দরে, তখন যাবোটা কোথায়?
    আমার তো কোনও ঠিকানা নেই।
     
    এটা ভ্রমণকাহিনী নয়। ভ্রমণ করতে গিয়ে বাঙালিদের থেকে সাহায্য পাবার ঘটনা।
    হারউইচে ফেরি থেকে নেমে লাইনে দাঁড়িয়ে ইমিগ্রেশনের ফর্ম ভর্তি করতে গিয়ে মুশকিলে পড়লাম, ঠিকানা লিখতে হবে। লম্বা  লাইন পাশাপাশি দুটো। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খশখশ করে ফর্ম ফিলাপ করছে। পেন নেই আমার। পাশের লাইনের একজন ছেলের কাছে পেন চাইলাম, ফর্ম ভর্তি করতে গিয়ে তাকে বললাম
    —আমার তো ঠিকানা এখানে কিছু নেই, কী লিখব এখানে?
    সে স্থিরভাবে বলল, তাহলে তুমি যেতে চাচ্ছো কোথায়?
    — লন্ডন।
    — লন্ডনে যেখানে গিয়ে উঠবে সেখানকার ঠিকানা লিখে দাও।
    — সেসব তো এখনও ঠিক নেই...
    ছেলেটা বিরক্ত হয়ে বলল, তাহলে আমি জানি না।
    লাইন সামনের দিকে এগোচ্ছে। ঝপ করে তার ফর্মে সে যা ঠিকানা লিখেছে সেটা দেখে নিয়ে যতটা মনে রাখতে পেরেছি নিজের ফর্মেও সেটা তাড়াতাড়ি লিখে নিয়ে তাকে কলমটা ফেরত দিলাম।
    ইমিগ্রেশন কিছুই সেভাবে খুঁটিয়ে দেখেনি। ফেরিঘাট থেকে ফের ট্রেন, সেখান থেকে লন্ডনের লিভারপুল স্ট্রিট পৌঁছতে পৌঁছতে রাত আটটা সাড়ে আটটা। আমার পিঠব্যাগটা অসম্ভব ভারি, তাতে রয়েছে খাবার, জলের গোটা পাঁচ ছয় বোতল এবং দুসেট সালোয়ার কামিজ। এই অবধিই আমার টিকিট কাটা ছিল। এখন বাসস্থান খুঁজতে হবে। গ্রীষ্মকাল, তাই শীতবস্ত্রের দরকার নেই, কিন্তু সূর্য অস্তমিত। 
    সিনিয়রদের কাছে শুনতাম তাদের লন্ডনে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কিছুই নেই, তবু তারা বেড়াতে যেত, যদিও তারা সকলেই পুরুষ। মেয়ে সিনিয়র কেউ ছিল না তাই মেয়েদের অভিজ্ঞতা আমার অজানা।
     
    মস্কোয় যে হোটেলে থেকেছিলাম ভিসা নেবার সময়টায়, সেখানে রোজই নানানজনের সঙ্গে আলাপ হতো। একজন বাংলাদেশি ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সিনিয়র। আগেও দুবার লন্ডন গেছে। এবার যাবে কম্পিউটার কিনতে। পারসোনাল কম্পিউটার বলে একটা জিনিস বেরিয়েছে যেটা নাকি এমনি ছোটখাট কম্পিউটারের চেয়ে দামে বেশি এবং দেখতে শুনতেও খুব ভাল। মাইক্রোসফট বলে একটা কোম্পানীর অপারেটিং  সিস্টেমে ওটা চলে। লন্ডন কি সিংগাপুর থেকে কিনে এনে সোভিয়েত বাজারে বেচতে পারলে বিরাট লাভ। সবাই কিনতে পারে না, প্রচুর দাম, বেশ ওজনও আছে। 
    আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কম্পিউটার কিনতে কত পাউন্ড লাগে? তাতে সে যে সংখ্যাটা বলেছিল তেমন টাকা আমাকে বেচে ফেললেও পাওয়া যাবে না। তার নিজেরও অত পুঁজি নেই॥ যাদের অনেক পুঁজি আছে তারা এরকম ছেলেদের কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এবং যাতায়াত-খাবারদাবারের খরচ  টরচ দিয়ে কম্পিউটার আনানোর কাজ করে। মাথাপিছু একটা কম্পিউটার আনলে কাস্টমসে ট্যাক্স দিতে হয় না। যারা অন্যের পুঁজি নিয়ে কম্পিউটার আনতে যায় তাদের নাম "পাইলট"। এই সিনিয়র ভাইটিও একজন পাইলট।
    আমার মাথায় প্রশ্ন খেলে গেছল, তাই সরাসরি সেই ছেলেটিকে বলেছিলাম— আমিও পাইলট হতে চাই।
    — আপনি?
    ভুরু কুঁচকে আমার দিকে একটু তাকিয়েই সে আর হাসি চাপতে পারে নি।
    — হাসছেন কেন? 
    — আপনি কী করে পাইলট হবেন?
    — আপনার চেনা কেউ থাকলে তাকে একটু বলুন না, এই ট্রিরে আমিও তার জন্য কম্পিউটার এনে দেব। 
    সে আবারও হাসতে থাকে।
    — কী যে কন আপনি!
    — কেন? এতে হাসির কী আছে? টাকা নিয়ে তো  আর আমি পালাবো না, আমাকে তো ফিরে আসতে হবেই এখানে লেখাপড়া শেষ করতে!
    — মাইয়া মানুষ পাইলট। নাঃ। কেউ রাজি হবে না।
     

     

  • আরও পড়ুন
    আতান্তর  - সে
    আরও পড়ুন
    D 14/10 - Arka Goswami
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:a0e0:dccc:e2ca:8880 | ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ১৪:৫৬735431
  •  
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:a0e0:dccc:e2ca:8880 | ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ২০:১৯735432
  • ইদের দিন দুপুর পেরিয়ে বিকেল হবে হবে, তখন ছেলেমেয়েরা সবাই বাড়ি এসে গেছে, আমাদের সেই পাঁচজনের গ্রুপ এবং মনোয়ারার বড়ো ছেলে ও ভাশুরের ছেলে, মোট সাতজনে পৌঁছে গেলাম রিজেন্ট পার্ক।
     
    (বাকিটা পরে লিখছি)
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:a0e0:dccc:e2ca:8880 | ২৪ জানুয়ারি ২০২২ ০৫:৩৪735433
  • রিজেন্ট পার্ক একটা মোটামুটি মাঝারি সাইজের পার্ক। তুলনা করা যেহেতু আমার তখন স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে, তাই সোভিয়েত দেশের পার্কগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এটা খুবই ছোট্ট একটা পার্ক, আবার যে শহর আমার জন্মস্থান সেখানে ট্র্যাংগুলার পার্ক ও আছে, সে তুলনায় ইহা সুবিশাল। পার্কের একেবারে ধার ঘেঁষে সেই মস্ক অর্থাৎ মসজিদ। ছোট্ট মর্জিনা পরেছে কমলা রঙের একটা ছিটের ফ্রক, ছেলেরা সব নতুন নতুন শার্ট প্যান্ট, নতুন শার্টগুলো একটু খড়মড়িয়ে রয়েছে। আকন্দবাবু আজ কোট পরেন নি। মরিয়মের সাজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে সে টিনেজার, শ্যাম্পু করা বাদামি চুল পুরো খোলা, স্কিনটাইট জিন্স এবং হালকা গোলাপি স্লিভলেস ব্লাউজে তাকে পরীর মতো দেখাচ্ছে। মস্কের দিক থেকে এদের কয়েকজন চেনা লোককে আসতে দেখা গেল, কুশল বিনিময় করে করে তারা চলেও যাচ্ছে। রিজেন্ট পার্কে প্রচুর লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। 
    এখানে সম্ভবত আমরা বেশিক্ষণ থাকব না, কারন একটু আগেই প্ল্যান করা হচ্ছিল যে সবাই মিলে চিড়িয়াখানা যাওয়া হবে। লন্ডন জু।
    এখন মোটামুটি যেটা হচ্ছে সেটা সামাজিকতা রক্ষা টাইপের ব্যাপার। এরা কেও ধার্মিক নয়। তবে মনোয়ারা প্রত্যেক দিনই নামাজ পড়েন তা কয়েকবার নজর করেছি। 
    আজ সকালেই মনোয়ারা আমার ঘরে এসে বিছানার ওপর বসে তাঁর অদ্ভূত বিশ্বাসের কথা বলছিলেন। আজ সকাল থেকেই বেশ গরম, ইয়োরোপে অধিকাংশ বাড়িতেই পাখা থাকে না, এয়ারকন্ডিশনারের তো প্রশ্নই নেই। কথায় কথায় মনোয়ারা বললেন যে মক্কায় তাঁর স্বামীর কত কষ্ট হচ্ছে এখন গরমে।
    আমি উত্তরে বলেছিলাম যে সৌদিতে তো গ্রীষ্মে খুবই গরম, এই ইদে হজ করার তীর্থযাত্রীদের খুবই কষ্ট হবে।
    উনি ওঁর নিজের মতামত জানালেন — মক্কায় আছে আল্লাহর ঘর। সেই ঘরে থাকে চন্দ্র ও সূর্য। সূর্য সেই ঘর থেকে বের হলেই দিন হয়। চাঁদের ক্ষেত্রেও ঐভাবেই নানারকম সাইজ পূর্ণিমা, না বের হলে অমাবস্যা। সূর্যের অত তাপ ওখানে, তাই মক্কা অত গরম। তাই হজ করা এত কষ্টের।
    এঁকে কিছু বোঝানো বৃথা। যার যার বিশ্বাস তার কার কাছে। আমি কথা বাড়ানোর পথে যাই ই নি।
    আমার যেটা মনে হচ্ছিল সেটা হচ্ছে অনেক অনেক কথা জমে আছে মনোয়ারার ভেতরে। তার কিছু বাস্তব, কিছু কল্পনা, কিছু গর্ব, কিছু দুঃখ, হতাশা, আনন্দ, অসহায়তা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, অবহেলা, সব মিলে মিশে উপচে পড়ছে, অথচ সেসব ব্যক্ত করবার মাধ্যম নেই, শোনানোর পাত্র নেই। হয়ত সেজন্য সম্পূর্ণ অচেনা একজনকে তিনি বলে চলেন তাঁর কল্পনা ও বাস্তব মেশানো কথা। কত কিছু বললেন — লন্ডনের সিলেটি কমিউনিটির কথা, এঁরা নোয়াখালির লোক, প্রায় বিশ বছর আগে এদেশে আসার গল্প, এই দামী অ্যাপার্টমেন্ট কেনার পেছনে স্বামীর দীর্ঘ সঞ্চয়ের অবদান এবং কর্মক্ষেত্রের সাফল্য, তা সত্ত্বেও প্রচুর পাউন্ড কিস্তির জন্য গুনতে হচ্ছে এই অ্যাপার্টমেন্টের জন্য, সেই সঙ্গে তুলনা — আমরা অল্ডগেট ইস্টের বাংগালীদের মতো না, ওরা কাপড় কেচে বাইরে টানিয়ে রাখে, ন্যাস্টি, আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট বড়োলোকদের অ্যাপার্টমেন্ট, দেখেছেন তো এখানে কাপড় কাচার মেশিন বাথরুমের পাশের ঐ ছোটঘরটাতে, আমরা রান্নাঘরে ওয়াশিং মেশিন রাখি না।
     
    পার্কে সবাই সাজুগুজু করে এসেছে। সবাই মুসলমান তবে নানান দেশের, মরিয়ম খুব কায়দা করে হাঁটছে, তার চেনা বন্ধু বান্ধব সম্ভবত ক্লাসমেটদের সঙ্গেও কথা বলল। হঠাৎ একটু সাইডে পার্কের উঁচু রেলিং এর দিক থেকে কে বা কারা যেন শিস দিল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম চারজন ইয়াং ছেলে রেলিংএর ওপর ব্যালেন্স করে বসে পা নাচাচ্ছে। মরিয়ম সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে। একজন ছেলে আবার শিস দিলো, চেঁচিয়ে কী যেন বলল, লোকজনের কথাবার্তার নয়েজ এবং ঐ ছেলেটির ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট এসব মিলিয়ে কিছুই বুঝলাম না। 
    মরিয়ম বেশ দ্রুত পদক্ষেপে চলে গেল সেই ছেলেদের দিকে।
    বোঝো কাণ্ড! আমার মধ্যেকার রক্ষণশীলতাবোধ ফের জেগে উঠেছে। যতই নিজেকে আধুনিক মনে করি না কেন, শৈশবের পরিবেশ, শিক্ষা, সব মশলার মতো মিশে রয়েছে ম্যারিনেড হয়ে শিরায় শিরায় ধমনীতে ধমনীতে। 
    চারটে বখাটে ছেলে ডাকল আর মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে সে দিকে চলে গেল? বিরক্ত লাগল আমার। আকন্দবাবুকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। মর্জিনা তার দাদাদের সঙ্গে ঘুরছে, নজরুলকে অবশ্য কাছেই দেখলাম, সে রাস্তা থেকে একটা সস্তার রিস্টওয়াচ কিনেছে, সেই রিস্টওয়াচ নিয়েই খুটখাট করছে। 
    পনের বিশ মিটার মত দূরত্ব পা চালিয়ে হেঁটে মরিয়ম ঐ পাঁচিলের নীচে দাঁড়িয়ে কী সব যেন বলল, অমনি ধুপ ধাপ করে  দুজন ছেলে নেমে পড়ল নীচে। চারটে ছেলের পরনেই ট্র্যাক সুট, যে ছেলেটি মরিয়মের একদম কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল তার পরনে বেগুনী রঙের আডিডাস ট্র্যাকসুট। আমি নিজের অজান্তেই এগিয়ে যাচ্ছি ওদিকে। খুব হাসাহাসি চলছে ওখানে। ছেলেটার মাথার চুল রুক্ষ্ম, চোখ দুটো ঘোলাটে, তারা চারজনে সিগারেট খাচ্ছিল একটু আগে। ব্যাপারটা ভাল করে বুঝবার জন্য আমি আরও কয়েক পা এগোলাম। 
    মরিয়ম এবার পাশ ফিরে আমাকে দেখতে পেল, কিন্তু তোয়াক্কা করল না, তার চোখ অন্য কারোকে খুঁজছে। 
    হ্যাঁ, পেয়ে গেছে। নজরুলকে দেখতে পেয়ে মরিয়ম, নজরুলও মরিয়মকে দেখা মাত্র তীরবেগে ছুট্টে চলে এল তার কাছে। তবে মরিয়ম নয়, সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঐ বেগুনী ট্র্যাকসুট পরা ছেলেটির ওপর। তারপর বলল — ইড মোবারক ভাইয়া!
    পাওয়া গেছে। মনিরুলকে পাওয়া গেছে।
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:ddfa:2afd:9c5a:40e5 | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ ২৩:৫৩735460
  • মনিরুল কিন্তু তখন বাড়ি ফিরতে রাজি হলো না। তাকে লন্ডন জু তে বেড়াতে নিয়ে যাবার প্রলোভনও দেখানো হয়েছিল, এরা কেউই আগে লন্ডন জু দেখে নি, কোনও জু ই দেখেনি, তবু মনিরুল নাচার। আজ না ইদ? আজ না পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদযাপন করতে হয়? তবু সে বন্ধুদের ছেড়ে যেতে রাজি নয়। সম্ভবত এখানে একটা প্রেস্টিজ ইশু জড়িয়ে আছে। বছর পনেরো ষোলোর মনিরুলের টিনএজার মন ঐ ঘড়ছাড়া বখাটে বল্ধুদের কাছেই থাকতে চায়। সে নিমরাজি হয়ে বলল, সন্ধেবেলা বাড়ি যাবে। 
    তাকে তেমন জোরাজুরি করল না কেউ। এমনিতেই সে বেশ এমব্যারাসড ফীল করছিল বন্ধুদের সামনে। পূর্বপ্ল্যানমাফিক আমরা চললাম চিড়িয়াখানা দেখতে। জন্তু জানোয়ারের সংখ্যা আলিপুর চিড়িয়াখানার তুলনায় হয়ত কম, কিন্তু এই চিড়িয়াখানায় পশুপাখিদের অনেক বেশি যত্ন করা হয় তা স্পষ্ট, তাদের জায়গাও দেওয়া হয়েছে বেশি, খুব মনোরম জায়গা। বেশিক্ষণ লাগল না পুরোটা ঘুরে দেখতে। 
    যতক্ষণ ঘুরেছি ততক্ষণ মনোয়ারার ভাশুরপো আমার ওপর বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছিল। বেড়ানোর পর সে আমাদের সকলকে আইসক্রিম কিনে খাওয়ালো। আমাকে ইমপ্রেস করবার জন্য সে নিজের সম্বন্ধে অনেক কিছু বলছিল। হয়ত মনে করেছিল আমি লন্ডনে থাকতে এসেছি। সবাই মিলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে। 
    বাড়িতে যাকে বলে আনন্দধারা বহিছে ভূবনে। আমরা ঢোকার মিনিট পাঁচেক আগেই মনিরুল বাড়িতে এসেছে। মনোয়ারা সেমাই বানাচ্ছেন রান্নাঘরে, মনিরুল ভিডিও চালিয়ে দিয়েছে — মাইকেল জ্যাকসনের নাচের। মাইকেল খরগোশ সেজে পালিয়ে যাচ্ছে, আর যেটা করছে পিছলে পিছলে হাঁটার মতো করে নাচা, ওর নাম মুন ওয়াকিং।
    নজরুল ভিডিও রিওয়াইন্ড করে করে ঐ মুনওয়কিংটা বারবার চালাচ্ছে এবং নিজেও সেটা করে চলেছে। জমে উঠেছে ইদের সন্ধ্যা।
    রান্নাঘরে গিয়ে মনোয়ারাকে সাহায্য করা আমার নৈতিক কর্তব্য। উনি ভয় পাচ্ছেন — ছেলে এসেছে বটে, কিন্তু যদি আবার চলে যায়? ওকে আটকে রাখা যায় কেমন করে? ওর আব্বা ফিরবে তিন চার দিনের মধ্যেই, তার আগেও ফরে আসতে পারে, ফিরে এসে মনিরুলের এসব কাহিনি শুনলে তো মহা গ্যাঞ্জাম হবে। সে সব সামাল দেওয়া কি সহজ হবে? দোষ তো পড়বে মনোয়ারা আর মনিরুলের ওপর।
    লিভিংরুমে কেউ ভিডিও দেখছে, কেউ কেউ সিরিয়াস আড্ডায় মশগুল, সারা বাড়ি ম ম করছে এলাচ দারুচিনি দেওয়া সেমাইয়ের গন্ধে। মাইকেল জ্যাকসন শেষ হবার পর চলছে গোভিন্দার একটা সিনেমা। 
    কোনও এক নায়িকার সঙ্গে তুমুল নাচছে গোভিন্দা। মনিরুল, নজরুল ও মেয়ে দুজন অপার বিষ্ময়ে দেখছে সেই নাচ। মনিরুল নাচ খুব ভালোবাসে সেটা বুঝে গেছি।
    ওদের কাছে গিয়ে মুরুব্বির মত ঘোষণা করলাম — হি ইজ গোভিন্দা, মাই কাজিনস ফ্রেন্ড।
    — রিয়েলি?!
    নাচ থেকে চোখ ঘুরিয়ে তিনজন আমাকে মনোযোগ দিল।
    — ইয়েস। 
    গুল মারলে বেশি কথা বলতে নেই।
    — ইজ হি বাংগালি?
    সেরেছে! এই সরল প্রশ্ন আমাকে ফাঁদে ফেলে দিয়েছে। 
    — নো।
    এবার ওরা হামলে পড়ল গোভিন্দা সম্পর্কে জানতে। আমার কাজিন কোথায় থাকে, তার কাছে গোভিন্দার ঠিকানা পাওয়া যাবে কি না, মিঠুন চক্রবর্তীকে চিনি কিনা, মিঠুন বাংগালি সেটা ওরা জানে। মোট কথা হিন্দি সিনেমা ওরা দেখে তেমন ভাষা টাশা না বুঝলেও নাচের জন্য দেখে।
    মনিরুলকে আটকে রাখার জন্য এত সব আজগুবি গল্প বলে যাচ্ছিলাম ঐসব তারকাদের বিষয়ে, যে আকন্দবাবুও কাছাকাছি এসে বসলেন। উনি নিশ্চয় বুঝেছিলেন যে গুল মারছি, ওঁক কৌতুকভরা দৃষ্টিই তা বলে দিচ্ছিল। 
    অবশ্য নাচের আলোচনার পর আলোচনা ঘুরে গেল অন্য দিকে, মনিরুল উৎসাহিত হয়ে বলতে শুরু করে দিল তার বাংলাদেশে বেড়াতে যাবার গল্প, নোয়াখালির সেই গ্রাম যেখানে তার নানাবাড়ি ছিল এককালে। সেখানকার অভিজ্ঞতা, কীরকম মজার লোকজন সেই দেশে, উহ কী বোকা তারা, অল্প টাকার লোভ দেখালেই তারা কত কী করে দেয়, আরও কত কী! 
    তারপর সেই সূত্র ধরে আরও গল্প, আরও মনগড়া ফিলিমস্টারদের গল্প করি, এই করতে করতে রাত এত বেশি হয়ে যায় যে মনিরুল ওখানেই রাতের খাবার খায়। 
    মনোয়ারা বলেন — এত রাতে আর গোসল করতে হবে না, শুয়ে পড়।
    ক্লান্ত মনিরুল বাধ্য ছেলের মতো ঘুমোতে চলে যায় নিজের ঘরে।
    মনোয়ারার মুখ থেকে আশঙ্কার মেঘ কেটে গিয়ে স্মিত হাসি। আল্লাহর রহমতে ছেলে ফিরে এসেছে। 
    আমি মনে মনে ভাবি আরব্য রজনীর মতো নাই বা হোক, আজকের রাতটা তো আটকে দিতে পারলাম ছেলেটাকে। মন্দ কী?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
    • কি, কেন, ইত্যাদি
    • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
    • আমাদের কথা
    • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
    • বুলবুলভাজা
    • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
    • হরিদাস পালেরা
    • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
    • টইপত্তর
    • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
    • ভাটিয়া৯
    • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
    গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন