• খেরোর খাতা

  • শিব ঠাকুরের দেশে

    Swati Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ অক্টোবর ২০২১ | ১১৩ বার পঠিত
  • বারাণসী, ভারতের ধর্মীয় রাজধানী। ভিন্ন ভিন্ন নামে এই স্হান পরিচিত। কখনো কাশী, কখনো বেনারস কখনো বারানসী। ছোটোবেলা থেকে বিভিন্ন রকম পৌরাণিক কাহিনী, ঐতিহাসিক রচনা, সিনেমার গল্প শুনে শুনে উত্তর ভারতের এই প্রবীন, ইতিহাস সমৃদ্ধ শহর সম্পর্কে এক দেবভক্তি মিশ্রিত ঔৎসুক্য ছিল‌ই। তবে পঞ্চ‌ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল ২০১৮ সালে। ২০১৮র ১৬ই অক্টোবর যখন বাংলার বারোয়ারি, সাবেকি ঘরানা দেবী দুর্গার মহাষষ্ঠীর পূজোর আয়োজনে ব্যস্ত, আমরা পরিবারের সকলে র‌ওনা দিয়েছিলাম কাশী বিশ্বনাথ দর্শনের উদ্দেশ্যে।

    বেনারস মানেই মহাকুম্ভ, গলির গলি তস্য গলি, গঙ্গার ঘাট, জয় বাবা ফেলুনাথ, বেনারস ঘরানার স‌ঙ্গীত, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আরও, আরও অনেক কিছুই।

    পৌরাণিক মতে এই শহর নির্মিত স্বয়ং মহেশ্বরের হাতে। তবে ঐতিহাসিক মার্ক টোয়েনের উক্তি সবচেয়ে সুন্দর ও সহজ ব্যাখ্যা করেছে, তিনি বলেছেন "বারানসী ইতিহাসের চেয়েও পুরোনো,
    ঐতিহ্যর চেয়েও পুরোনো। সবকিছুকে একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তার চেয়েও দ্বিগুণ পুরোনো"।

    সেই সবকিছুকে  উপলব্ধি করতে আমরা রাত আটটায় উপস্হিত হয়েছিলাম মোগলসরাই স্টেশনে। বর্তমানে পন্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন।

    বারানসীর অতিপরিচিত ভীষণ ব্যস্ত গোধূলিয়া চকের কাছে শিওয়ালাতে ছিল আমাদের হোটেল। গাড়ি ঠিক করে সবাইকে নিয়ে হোটেলে পৌঁছোতে বেশ রাত হল। ফলে রাতের খাওয়াটা যখন একটু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তখন উদ্ধার করল আ‌ঙ্কলস্ কিচেন নামে ছোট্ট একটি হোটেল। বারাণসী শহর আমাদের আপ্যায়ন করল আলুচোখা, ডাল আর ডিমের কারি দিয়ে। সে স্বাদ এখনো আমাদের স্বাদগ্ৰন্থিগুলিকে ভাবিয়ে তোলে। রাতে একটা তোফা ঘুম হল। ঘুম ভাঙ্গলো আজানের সুরে। সেদিন সপ্তমী। মহাসপ্তমীর শারদীয়া ভোরে বারানসীর আকাশেও মিশে ছিল শিউলির ঘ্রান। মনে দুর্গাপূজার হিন্দোল।পূজোর নতুন জামা-কাপড় আর গয়নার বাক্স উপুর করে সেজেগুজে সকাল সকাল হোটেল ছাড়লাম। কাশী বিশ্বনাথ দর্শন না করে কি আর বেনারস ঘোরার অনুমতি মেলে তাই প্রথমেই গেলাম বিশ্বনাথের চরণে। দ্বাদশ জোতির্লিঙ্গের একটি কাশী বিশ্বনাথ। বহুবার ধ্ধংস হয়েও স্বমহিমায় বিরাজমান। শেষ বার আক্রমন করে ঔরঙ্গজেব।প্রতিষ্ঠা করে জ্ঞানবাপী মসজিদ, যা গেলেই দেখতে পাওয়া যায় মন্দিরের পাশেই। বর্তমান মন্দির নির্মান করেন ইন্দোরের রানি আহিল্যা বাই। আস্তিকতা নাস্তিকতার বিচারে না গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মন্দিরে প্রবেশের সময় নিজেকে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাছে সমর্পিত মনে হয়েছিল। শুদ্ধ অন্তর‌আত্মা আর আত্মবিশ্বাস, এতেই যেন ঈশ্বরের অধিষ্ঠান। নিজেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনে হয় নি বরং আমিও, জগতে যে শক্তি প্রবাহ চলেছে তার‌ই অংশ তাই অনুভব করেছিলাম। বেনারসে কাশী বিশ্বনাথ দর্শন সৃষ্টিকর্তার সাথেই সাক্ষাৎ।

    মন্দির থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ পরিকল্পনাহীন হয়ে ঘুরলাম। আবোলতাবোল না ঘুরলে কি আর সেই জায়গা মনের কাছে আসে? টুরিষ্ট স্পট তো শুধু ছবি তোলার জন্যে। তবে দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত মানুষের ভীড়ে পুজোর সাজপোশাক পরে আমরা খাপছাড়া হয়েই ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম দশাশ্বমেধ ঘাটে। সারি সারি দিয়ে ছাতা মাথায় বসা ব্রাম্ভনদের দেখে চোখের সামনে হরিহর আর অপুর রিল চলতে শুরু করল। সেই ঘাট! এই সেই ঘাট! কত বছর পিছিয়ে গেলাম। গল্প আমার চোখের সামনে এমন সত্যি হবে ভাবিনি। এই ঘাট বাঙালির সংস্কৃতির সাথে, আবেগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

    সেখানে বেশ কিছুক্ষন কাটিয়ে, গেলাম পাশেই মানমন্দির ঘাটে। মহারাজ মানসিংহ এই ঘাটে একটি মানমন্দির নির্মান করেন। পরে জয়পুরের রাজা জয়সিংহ এই মানমন্দিরকে পর্যবেক্ষণ স্হানে রুপান্তরিত করেন। এখানে একটি বিষুবীয় সূর্যঘড়ি আছে যেটা চলমান। কিন্তু একযাত্রায় রথ দেখা কলা বেচা হলনা। সংস্কার কাজে সেটি বন্ধ থাকায় বিফল মনোরথে হোটেলেই ফিরতে হল। ফেরার পথে অবশ্য বেনারসের সুবিখ্যাত কাঁচের চুড়ি আমাদের হাতে শোভা পাচ্ছিল। যে হোটেলে আমরা উঠেছিলাম তার অবস্থানটি ছিল ভারী সুন্দর। চারপাশে সুন্দর সুন্দর শাড়ীর ছোটো ছোটো দোকান। স্হানীয় মানুষ সেগুলিকে ফ্যাক্টরি বলে। সেটি একটি পাড়া, ফলে সাধারণ মানুষের গৃহস্থালির কিছুটা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে ছিল। সামনেই অঢ়হঢ় ডাল আর আটার তৈরি কচুরি ভাজা চলছে। দোকান পাট, লোকসমাগম, এক্কেবারে জমজমাট। আঙ্কল'স কিচেনে দুপুরের খাওয়া সেরে বেনারসী পান মুখে পুরে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম পুনরায় বেনারস এর খোঁজে। একটি জায়গার রাস্তা, বাড়ি, মানুষ, দোকানপাট, আকাশ, বাতাস, সবকিছুই জায়গাটির অস্তিত্বর সাক্ষ্য বহন করে। তাই যখন নৌকাযোগে বারানসীর ঘাট পরিদর্শনে বেরোলাম তখন ইতিহাসকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলছিল আমার কল্পনার পালতোলা ময়ূরপঙ্খী। কম বেশী প্রায় ৮৪টি ঘাট। আস্যি ঘাট থেকে শুরু করে হরিশ্চন্দ্র ঘাটে শেষ। ঘাটগুলো মূলত নির্মিত হয় মারাঠা রাজত্ব কালে। মণিকর্নিকা ঘাট, আহিল্যা ঘাট, নিশাদ ঘাট আরও কত। সব ঘাটের সাথেই পুরাতন ভারতবর্ষের ইতিহাস বিজড়িত। মণিকর্ণিকা ঘাটে পার্বতীর কুন্ডল নাকি হারিয়ে গিয়েছিল, গাইড ভদ্রলোক তার সাথে জুড়ে দিলেন আরও একটি রোমাঞ্চকর পুরাণের কথা। তিনি বললেন পার্বতী নাকি এই স্হানে নিজের কানের দুলটি লুকিয়ে রেখে মহাদেব কে তা খুঁজে দিতে বলেন। এখন ভোলানাথের পত্নীনিষ্ঠার কথা তো দেবালোক খ্যাত। আজ‌ও নাকি মহেশ্বর সেই দুল খুঁজে চলেছেন এমনকি মোক্ষপ্রাপ্ত যে সমস্ত দেহ সৎকারের জন্য এই ঘাটে আসে তাদের প্রত্যেকের কানে কানেই মহাদেব দুলটি তারা দেখেছে নাকি তাই জিজ্ঞাসা করেন। তাই জন্যই সৎকারের আগে দেহগুলিকে গঙ্গার শীতল জলে ডোবানো হয়, কিন্তু কেউই আজ অবধি সেই দুলের হদিস পায়নি। আর এই ছলনায় পার্বতীও মহাদেবকে এই স্হান ত্যাগ করতে দেন নি। বারানসীর গঙ্গাবক্ষে ভ্রমনকালে এমন একটি কাহিনী শুনলে তার সত্যতা যাচাইয়ের মত নির্মোহ মন কারোরই বোধ হয় নেই।

    সামনেই হরিশ্চন্দ্র ঘাট আর মণিকর্নিকা ঘাট। দিবারাত্রি চিতার আগুন উর্ধ্বে ধাবমান সেখানে, নিভতে সে চায়না। মা গঙ্গার শীতল স্পর্শ তাকে শান্ত করতে পারেনা। কুন্ডলীকৃত কালো ধোঁয়া বারাণসীর আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পরছে। পূণ্যলাভের এই ব্যবস্হা হয়তো আকাঙ্খিত কিন্তু ধর্মীয় নগরীর সত্যি কারের পবিত্রতা এতে রক্ষা পাচ্ছে না। দূষনের ভয়াবহ অভিশাপে শাপগ্ৰস্ত হচ্ছে সে প্রতিনিয়ত। বারাণসীর ঘাটৈ মা গঙ্গার উদ্দেশ্যে আরতি এক দৃষ্টিনন্দন বিষয় শুনেছিলাম। সত্যিকারে যখন সার দেওয়া নৌকার মধ্যে একটিতে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য নির্মীলিত চোখে অবলোকন করলাম তখন মনে যে ভক্তিস্রোত বাহিত হল তার ধারা গঙ্গার গতিপথের মত‌ই অপ্রতিরোধ্য। একদিনের ভ্রমনেই কাশী আমার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেললো। ভীষন ভালো লাগা আর প্রশান্তি নিয়ে হোটেলে ফিরলাম। আঙ্কলের খাবার খেয়ে রাতে বসলাম পরের দিনের পরিকল্পনা করতে। কিন্তু বিধি বাম। সব পরিকল্পনায় ইলেকট্রলের জল পরল। পরিবারের অনেকেই ফুড পয়জনিং এ আক্রান্ত। বেশ অসুস্থ। শয্যাশায়ী অবস্থা। আমরা তো ভয়‌ই পেয়ে গেলাম। সাথে যে ওষুধ ছিল সেগুলো শুরু করলাম পুরো দমে। হোটেলের মালিক যে ভদ্রলোক, এক স্হানীয় ডাক্তারবাবুর খোঁজ দিলেন। ধীরে ধীরে সকলে সামলে উঠলো।তবে পথ্য জোগাড়ে ধীরেনবাবু অর্থাৎ হোটেলটি যাঁর তিনি সহায়তা না করলে বারানসী দর্শন অসমাপ্ত রেখেই ফিরতে হত। সুস্থ হয়েই প্রথমে আঙ্কলের মায়া ত্যাগ করলাম।

    বেনারসে প্রায় ছ'হাজারের ওপর মন্দির। এবং প্রত্যেকের পৃথক পৃথক মহিমা। তার কিছু অন্তত জানতে গেলে আর হোটেলে বসে থাকা চলেনা। বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন আবার মহাষ্টমী। তাই আমাদের‌ও যাত্রা শুরু হল দুর্গামন্দির দর্শনের মাধ্যমে। তার পর গেলাম সঙ্কটমোচন মন্দিরে। দূরদুরান্ত থেকে মানুষ এসেছেন ভগবান দর্শনে। কত আস্হা, বিশ্বাস, পূর্ণ সমর্পন নিয়ে তাঁরা এসেছেন। ভগবান যে ভক্তের‌ই।

    ধর্মের পাশাপাশি শিক্ষাতেও এই শহর পৃথিবীর অন্যতম। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় একটি। পন্ডিত মদনমোহন মালব্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গড়ে ওঠার ইতিহাসের সাথে। গেলাম আমরা সেখানে। তবে বন্ধ থাকায় দেখতে পাইনি। বাইরে থেকেই কিছুটা দেখে ফিরে আসতে হল। তবে যে অটোঅলা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন তার মুখে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার নির্ভুল এবং সাবলীল বিবরণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনের অভাব অনেকখানি লঘু করে দিল। সেখান থেকে গাড়ি ছুটল সারনাথের দিকে। সারনাথ, ১৭৫৮ থেকে ১৯১৫ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে চলা খনন কার্যের ফলে এই স্হানে বৌদ্ধ ধর্মের উজ্জ্বল ইতিহাস প্রকাশ পায়। গৌতম বুদ্ধ এই স্হানেই প্রথম বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দান করেন যা ধর্মচক্র নামে সুপরিচিত। বৌদ্ধ ধর্মের ভাস্কর্য, স্তূপ, মনেস্ট্রির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার হয়। চারিদিকে সাজানো সেই সমস্ত শিলাখন্ড। অথচ সামনে গিয়ে স্পর্শ করলেই অহল্যার মত প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। চোখ বন্ধ করে নিমগ্ন চিত্তে ধর্মচক্রের বেদীটিতে আসীন হলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে গৌতম বুদ্ধের প্রশান্ত স্হিতধী মুখাবয়ব। স্হানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম তার থেকেও অনির্বচনীয় ঐ স্হানের বুদ্ধত্ব। বিস্তৃত ক্ষেত্র। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন জাপান থেকে আগত একদল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ।অত টুরিষ্টের মাঝে তাদের নিমগ্ন চিত্তে ধ্যান ও মন্ত্রপাঠ আমাদের সারনাথ দর্শনের সার্থকতাকে দ্বিগুণ করেছিল। অপূর্ব প্রশান্তি। সারনাথের ইতিহাস সম্পর্কে জানার কোনো অভাব কারোর হবে না। কিন্তু সেই স্হানে বটের তলায় বসে ধ্যানমগ্ন না হলে তার আকাশে বাতাসে অণুরনিত বৌদ্ধিকতা লাভ হবে না এবং তাতে দর্শন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। পাশেই মিউজিয়াম। দীর্ঘকাল যাবৎ চলা খননকার্য থেকে উদ্ধারকৃত ভাস্কর্য এখানে সংরক্ষিত। সেই সময় শিল্প, সংস্কৃতি কোন গগনচুম্বী পর্যায় গেছিল এখানে গেলে বোঝা যায়। তবে অশোকচক্র দেখে বাড়ির ছোটোদের সাথে সাথে আমিও লাফিয়ে উঠেছিলাম। ওমা ইতিহাস ব‌ই এর সেই ছবিটা অবিকল এখানে। বেড়ানোর পরিপূর্ণতা নিয়ে ফিরেছিলাম। ইতিহাসের কি মহিমা! ও যত পুরোনোই হোক, তুমি তাতেই আকর্ষিত হবে। ফেরার পথে আরেক মজার জিনিস। গঙ্গার উপরে ব্রীজ। তাই দিয়েই গাড়িঘোড়া ছুটছে। কিন্তু সেটা বিষয় নয়। বিষয় পাশে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা একটি ব্রীজ। পিপে ভাসানো জলে। সেগুলো একটার সাথে একটা বাঁধা। তার ওপর দিয়েই নাকি গাড়ি চলত উঠবোস করতে করতে। ট্রাফিক পুলিশ কখনো কানটাও ধরতে বলত নাকি তা অবশ্য জানি না। আবার এক ব্রীজ দেখলাম দোতলা। উপর দিয়ে গাড়ি। নীচ দিয়ে ট্রেন। বালিব্রীজের ট্রেনলাইনটা কান ধরে নামিয়ে দিলে যেমন হবে তেমন। যাবার দিন উপস্হিত। রাতে ট্রেন। কিন্তু ভ্রমন যে অসম্পূর্ণ।রাজদর্শন হয়নি যে। রাজাকে না জানিয়ে সভা যে ত্যাগ করা চলে না। ভুবনবিখ্যাত কাশীরাজ। রামনগর ফোর্ট এ বর্তমান কাশীনরেশ মহারাজ অনন্ত নারায়ন সিং সপরিবারে বাস করেন। প্রতিদিন বিকেলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে উনি রাজসাজে নগরপরিদর্শনে বের হন। এমন চাক্ষুস রাজা দেখার রোমাঞ্চকর অনুভূতি থেকে বাদ পড়তে চায় কোন আহাম্মক? কাশীনরেশের ফোর্ট ঘুরে দেখলাম। আহা গঙ্গার পাড়ে ওই সুবিস্তৃত স্হানে ঘোরার সময় নিজেকে রানী মনে করতে আমি একটুকুও ভুল করি নি। সেখানে সংরক্ষিত আছে তুলসীদাসের সহস্ত রচিত রামচরিত মানস। কিন্তু দেখার সুযোগ হয় নি। আপাতত সেটি অন্যত্র স্হানান্তরিত করা হয়েছিল। আছে একটি অত্যন্ত উন্নত সূর্য ঘড়ি। মহারাজের ব্যবহৃত আসবাবপত্র। এসব ঘুরে ঘুরে দেখছি এমন সময়ে টং টং করে ঘন্টা বাজল কাশীনরেশ বেরোচ্ছেন রামলীলা ময়দানে দশেরা উদ্বোধনে। সেদিন দশমী। হুড়মুড় করে নেমে এলাম জায়গা দখল করতে। কচিরা সামনের সারিতে। বহু স্হানীয় মানুষও এসেছেন দর্শন করতে। এরমধ্যেই একভদ্রমহিলা শুরু করলেন রাজবাড়ির অন্দরমহলের খবরাখবর সম-আলোচনা  করতে। এমন রাজদর্শনের মহিমা  মাঠে মারা যাবার উপক্রম হল। তাই বাধ্য হয়ে ধরতে হল "মেজাজটাই তো আসল রাজা আমি রাজা ন‌ই।"

    অপেক্ষা হল অনেকক্ষন। তা হোক রাজা বলে কথা। তা আবার কাশী নরেশ। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ছত্রধারী কুন্দশুভ্র রাজবেশ, গজমোতির হার পরিহিত  স্বর্ণরথে (কল্পনার) চড়ে রাজা এলেন। আমরা জয়ধ্ধনি তুললাম জয় কাশী নরেশের জয়। উফ্ কি যে রোমাঞ্চ! সত্যি রূপকথার গল্প‌ই এখনো আমার সবচেয়ে প্রিয়। রাজমস্তক শোভিত ছত্রের করুণ অবস্থা আমার নজরেই পরে নি। সম্পূর্ণ হল। মনেপ্রাণে বেনারস রসস্বাদন সম্পূর্ণ হল।

    ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নাড়াচাড়া করব না। রাতের শান্ত সমাহিত গঙ্গার ঘাটের নরম আলোয় চায়ের ভাঁড় হাতে বসে থেকেছি। রাজরাজাদের নামাঙ্কীত অনিন্দ্য সুন্দর পরিত্যক্ত, নিঃসঙ্গ প্রাসাদের নিস্তব্ধ, নিস্পন্দ ঘরগুলিতে সারঙ্গীর সুরের সাথে জনচিহ্নের চিত্র এঁকেছি। ইতিহাসের যখ হয়ে বসে থাকা ঐ সিঁড়ির ধাপ আমার পায়ের স্পর্শে জীবন্ত হয়ে উঠেছে অনুভব করেছি রোমকূপের শিহরনে। বিশ্বচরাচরে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে তার কাছে সামান্য সংসারে আবদ্ধ জীব কত নগন্য, তার অন্তরাত্মার প্রশান্তি র পথ যে অবরুদ্ধ তাই মনে হয় এই আধ্যাত্মিক তীর্থক্ষেত্রে এলে। ট্রেন ধরেছিলাম রাতে, কিন্তু ফেরার কথা আর লিখব না। কারণ, বারানসীতে যে যায় সে তার সমস্তটা আর ফিরিয়ে আনতে পারে না। বিশ্বনাথের পাদপদ্মে নিবেদিত থাকে তার অস্তিত্বের একাংশ।

     

  • বিভাগ : অন্যান্য | ১১ অক্টোবর ২০২১ | ১১৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন