• বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ

  • ...গেয়ে ধান কাটে চাষা...

    অনিমেষ চট্টোপাধ্যায়
    আলোচনা | সমাজ | ০৮ অক্টোবর ২০২১ | ৮০৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • পর্ব ১
    (১) এ প্রবন্ধ কোনো ভাষাবিদের ভাষাতত্ত্বের ওপর লেখা নয়। এ প্রবন্ধ সামাজিক সমস্যা ও দ্বন্দ্বের অনুসন্ধান। বাঙলা ভাষার দুনিয়ায় জাতপাতের ভেদ, ধর্মে ধর্মে বিভেদ - সাম্প্রদায়িকতার বীজ অথবা ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ কেমন করে ইতিহাসের গর্ভে অঙ্কুরিত হয়েছিল - এ প্রবন্ধ তার অন্বেষণ। (২) এই প্রবন্ধের দু’টি ভাগ। প্রথমে, আমাদের দেশ কবে থেকে বাঙলা-দেশ বলে পরিচিত হল, আমাদের ভাষা কবে থেকে বাঙলা বা সাবেকি বাঙ্গালা বলে পরিচিত হল এবং কারা কবে থেকে বাঙালি বলে পরিচিত হতে লাগল। পরের ভাগ বাঙলা গদ্যের জন্মকথা ও তার বড় হওয়া। দু’টি ভাগের লক্ষ্য - আমাদের ভাষা-ইতিহাস চর্চার বিবর্তন।


    (১)

    বঙ্গদেশ, বাঙালি আর বাঙলা ভাষার জন্মপত্রিকা

    যে কোনো বাঙলা সাহিত্য বা ভাষার ইতিহাসের স্কুলপাঠ্য সিলেবাস বা বইতে চর্যাপদকেই আরম্ভ বা প্রথম নিদর্শন বলা হয়েছে। এই পুঁথিটির একটি কপি বা অনুলিপি হরপ্রাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপাল থেকে এনে ১৯১৬ সালে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়: হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৯৬ এবং ১৮৯৮ সালে দু’বার নেপাল গিয়ে এটি জোগাড় করতে পেরেছিলেন। কিছু বছর পরে প্রবোধচন্দ্র বাগচী আরো ডিটেলে পঞ্চাশটি দোহা প্রকাশ করেন। এই তালপাতার পুঁথিটির প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ নেই। ভাষার বাক্য গঠনের স্টাইলটা সংস্কৃত নিয়ম মেনে চলেনি। এই কথাগুলো মোটামুটি আমাদের জানা কারণ বাঙলা স্কুলে এসব আমাদের পড়তে হয়েছে।

    এইবারে সমস্যার কথা। যেটা আমাদের স্কুলপাঠ্য বইতে লেখা নেই, সেটা হল, এই পুঁথি শুধু বাঙলার নয়, ওড়িয়া, অহমীয়া, ভোজপুরি এইরকম বেশ কয়েকটি ভাষারও পূর্বপুরুষ। ওই সব ভাষার সাহিত্যের ইতিহাস বইতেও একই কথা লেখা আছে। তাই প্রশ্ন আসে, এটা আদি নিদর্শন বটে, কিন্তু এ ভাষা তখনো কি বাঙলা হয়নি? কতকটা ইটালিয়ান, ফরাসি বা পর্তুগিজ ভাষার সঙ্গে আদি ল্যাটিনের যা সম্পর্ক, সেরকম? আসলে চর্যাপদের ভাষাকে আজকের ভাষাবিদদের কথায় ‘অর্ধমাগধি অবহঠট’ ভাষা বলা হবে। অর্ধমাগধি নিয়ে পরে আলোচনা করব।

    দেশের কথা

    বঙ্গ বলে একটি জনপদের নাম বহুদিন ধরে আছে। ঐতেরেয় ব্রাহ্মণে এর উল্লেখ আছে। ‘তানীমানি বয়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চেরপদাঃ’ বলে একটি পদে বঙ্গের উল্লেখ আছে। ‘মগধের সঙ্গে যুক্ত, তাদের ভাষা পাখির মতো’ - এইরকম ইঙ্গিত। ঐতেরেয় ব্রাহ্মণ যদি হাজার তিনেক বছর আগের রচনা হয়, তাহলে অবশ্যই অনুমেয়, তখন এই ম্লেচ্ছ দেশের ভাষা ব্রাহ্মণ রচয়িতারা বুঝতে পারতেন না। বৌধায়নের ধর্মসূত্রে বঙ্গ জনপদটি কলিঙ্গের প্রতিবেশি বলে উল্লেখ আছে এবং যেহেতু ওই দেশ ম্লেচ্ছ এবং বৈদিক ভাষায় কথা বলে না, তাই ওই দেশে গেলে প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান দেওয়া আছে। বঙ্গবাসীদের ‘সঙ্কীর্ণ যোনয়ঃ’ বলা হয়েছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও বঙ্গ শব্দটি দেশ অর্থে পাওয়া যায়। কালিদাসের রঘুবংশে বঙ্গের উল্লেখ আছে। তবে সেই সময়ের সবচেয়ে সুখকর মন্তব্যটি বাৎসায়ন তাঁর কামশাস্ত্রে করেছেন — ‘বঙ্গরমণীরা  প্রেমভাবাপূর্ণ ও কোমলাঙ্গী’।

    বঙ্গ শব্দটি নিয়ে ভাষাবিদরা আরো মূলে যেতে চেয়েছেন। বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি কোথা থেকে? কেউ বলেছেন কোল মুণ্ডারী ভাষার (ভারতের অন্যতম প্রাচীন ভাষা) ঈশ্বর বা ভগবান ‘বোঙ্গা’ থেকে শব্দটা এসেছে। অথবা তিব্বতি বনস্‌ শব্দ থেকে এসেছে। আবার কেউ বলেছেন, বঙ্গ বা বং নামে এক দ্রাবিড় ট্রাইব এই অঞ্চলে থাকত। এই অঞ্চল খুব ছোট ছোট জনপদ বা আলাদা ট্রাইবে বিভক্ত ছিল। জনপদগুলির নাম চন্দ্রদ্বীপ, পুন্ড্র, গৌড়, সমতট, বরেন্দ্রী, সুহ্ম, বজ্রভূমি, বঙ্গ ইত্যাদি। প্রায় চোদ্দটি এরকম আলাদা বসতি বা কৌমের সন্ধান পাওয়া গেছে। বঙ্গ দক্ষিণ অঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বোঝাত। এই ছিল আজকের ভারতের পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চল।

    এই চর্যাপদের কবি বা গীতিকাররা নিজেদের কোথাকার লোক ভাবতেন? তাঁরা কি নিজেদের বঙ্গবাসী ভাবতেন?

    চর্যাপদের কবিরা যতদূর মনে হয় দক্ষিণ ও রাঢ় অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। বঙ্গ অঞ্চলের মানুষদের নিচু চোখে দেখতেন। বঙ্গে নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া দস্তুর ছিল না। চর্যাকবি শহরপাদ লিখেছেন, ‘বঙ্গে জায়া নিলোসি পারে ভাগল তোহার বিণানা’ – বঙ্গে জায়া নিয়ে গেছ, তোমার বিজ্ঞানও (knowledge) ওপারে ভাগল। নিম্নবর্ণের নারীকে বিবাহ করলে পুরুষের আর পুরুষত্ব থাকত না। ভুসুকপাদের অতি পরিচিত পঙ্‌ক্তি – ‘আজি ভুসুক বঙ্গালী ভিওলী / নিঅ ঘরনী চণ্ডালী লেলী’ (ভুসুক আজ বাঙালি হয়ে গেলি / তোর স্ত্রী চণ্ডাল নিলি)। ‘চণ্ডালীর সঙ্গে সম্বন্ধ হয়ে ভুসুক মেয়েলি (বঙ্গালী) হয়ে গেল’ — এ’রকম এর অর্থ। বঙ্গ অঞ্চলের মানুষদের বাঙ্গালী বলা শুরু হয়েছে ১৩/১৪ শতাব্দী নাগাদ। ভুসুকপাদকেও অনেকে ১৩ শতাব্দীর কবি মনে করেন। যদিও সাধারণভাবে চর্যাপদ ৮/৯ শতাব্দী থেকে ১১ শতাব্দীর লেখা বলে ভাষাবিদরা ধারণা করেন। বঙ্গ জনপদের মানুষরা আল প্রত্যয় যোগ হয়ে বঙ্গাল, পরে বাঙ্গাল হয়েছিলেন। স্ত্রী বাচক ঈ প্রত্যয় যোগ হয়ে বঙ্গালী। পরে বাঙ্গালী। বঙ্গালের রমণী বঙ্গালী। এই স্ত্রী প্রত্যয় পরে জাতিগত অর্থে ব্যবহার হতে শুরু হয়। যেমন গুজরাতি বা মারাঠি, সেইভাবে বাঙ্গালী।

    কিন্তু আজকের গোটা বাঙলাদেশকে বঙ্গ বলা শুরু হয়েছে অনেক পরে। ১৩ শতাব্দীর শেষের দিকে বখতিয়ার খিলজি লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে যে দেশকে জয় করেছিলেন তার নাম ছিল গৌড়, বঙ্গ নয়। বখতিয়ার খিলজি রাজ্য জয় করে নতুন মুদ্রা চালু করেছিলেন। তার একপিঠে দিল্লির সম্রাটের নাম, অপর দিকে দেবনাগরীতে ‘গৌড় বিজয়’ লেখা থাকত। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ দক্ষিণবঙ্গে সোনারগাঁও জয় করার পর (১৩৫২) ‘শাহ এ বাঙ্গালিয়ান’ উপাধি নেন। ঠিক ঠিক ভাবে ১৬ শতাব্দীতে মুঘলরা জয় করার পর গোটা অঞ্চলটার নাম হয় ‘সুবাহ বাঙ্গালা’। অনেকপরে ১৮ শতাব্দীতে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে আমরা পাই – জাহাঙ্গির জিজ্ঞাসা করছে -
    ‘কহ মানসিংহ রায়           গিয়াছিলে বাঙ্গালায়
    কেমনে দেখিলা সেই দেশ।’

    ইংরেজরা প্রথম থেকে মোঘলদের অনুসরণ করে এই অঞ্চলকে Bongal / bengalee নামাঙ্কিত করে।

    সেইজন্যেই বলা হয় আজকের বাঙলা ভূখণ্ড তার নাম পেয়েছে ১৫ থেকে ১৬ শতাব্দীর সময়। সুলতান - মোঘল শাসনকালে। তার আগে নয়। 

    কিন্তু ভাষাকে কোন সময় থেকে বাঙ্গালা বলা শুরু হয়েছিল? সে কথা জানতে হলে আমাদের কিছুটা ফিরে যেতে হবে সেন-রাজাদের আমলে।

    দীর্ঘ সময় বাঙ্গাল বা বাঙ্গালীদের এই ভাষাকে শুধু ‘ভাষা’ বলে চিহ্নিত করা হত। সেন রাজাদের আমলে সংস্কৃতের খুব রমরমা শুরু হয়। কনৌজ থেকে বেদ-বেদান্ত-বেদাঙ্গ জানা কুলীন ব্রাহ্মণ আনা হয়েছিল, বাঙলায় বৈদিক সংস্কৃতি ও ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে (প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে, বাঙালিদের কখনই বৈদিক সংস্কৃতির মধ্যে পুরোপুরি ঢোকানো যায়নি)। এই সংস্কৃত ভাষায় নির্ভর উচ্চবর্ণের পণ্ডিত কাব্যকাররা “ভাষা”কে নিচু চোখে উপহাসের সঙ্গে দেখতে শুরু করলেন, এবং এই ভাষায় কথা বলত যে নিচুতলার মানুষ, তাদের উপহাসের পাত্র করে তুলেছিলেন। বিশেষ করে বাঙ্গালদের। এই উচ্চবর্ণের পণ্ডিতরা বৌদ্ধ পাল-রাজাদের পরে সেন-রাজাদের সময় থেকে রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজে প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। বাঙলা ভাষা কোণঠাসা হয়েও অজ পাড়াগাঁয়ের চাষি-মাঝিদের মধ্যে বেঁচে ছিল।

    উপহাসের এই মনোভাব সাহিত্যেও দেখা যেত। মুকুন্দরামের লেখায়, যখন শ্রীমন্ত সদাগর সিংহল পৌঁছল, তখন বাঙ্গালদের দুরবস্থা নিয়ে উপহাস পাওয়া যায়।

    “কান্দেরে বাঙ্গাল সব বাফোই বাফোই।
    কুক্ষণে আসিয়া প্রাণ বিদেশে হারাই।।
    পলায় বাঙ্গাল ভাই ফেলাইয়া সোলা।
    হেঁট মাথা করি তোলে কাঁখতলির মলা।।
    আর বাঙ্গাল বলে মোর কি হলো রে বাপ।
    পান্ত খাবার হোলা গেল একি মনস্তাপ।।”

    কিন্তু এই বাঙ্গাল অরিজিনালি কারা ছিল? বাঙ্গাল বলতে মূলত পূর্ববঙ্গের ওই দক্ষিণ অঞ্চলে, সমাজের একদম প্রান্তে বসবাসকারী, অল্প পরিমাণ বৌদ্ধ ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকেই বোঝা হত। কবিয়াল গোপীচন্দ্রের গানে পাওয়া যায়, ‘ভাটি হইতে আইলো বঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি’। এ সমস্তই ১৩/১৪ শতাব্দীর কথা। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় শব্দকোষে ‘বাঙ্গাল’ শব্দের অর্থ দিয়েছেন — (১) পূর্ববঙ্গের অধিবাসী (২) পুর্ববঙ্গীয় মুসলমান। আর বাঙ্গালী শব্দের অর্থ (১) বঙ্গ যাহার স্বদেশ, বঙ্গ ভাষাভাষী (২) পৌরুষহীন বঙ্গবাসী।

    পরিবর্তন আসে তুর্কি-আফগান শাসনের সময় থেকে। সুলতানরা এই ভাষাকে বিশেষ নজরে দেখে উৎসাহ দিতে শুরু করেন। হয়তো পরাজিত সেন রাজাদের সামাজিক স্তম্ভ, সংস্কৃত ভাষা-সর্বস্ব ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের অগ্রাহ্য বা কোণঠাসা করার জন্যেই এই নিম্ন বর্ণের মানুষের ভাষাকে পক্ষপাত দেখাতে শুরু করেন। কারণ, তাঁরা নিজেরা তো তুর্কি, আরব, ফার্সি ভাষাভাষী ছিলেন। তাঁদের কাছে প্রথম স্তরে সেন্টিমেন্টের দিক থেকে সংস্কৃত ও বাঙলা দুটোই সমান হওয়ার কথা।

    প্রথমে মহাভারত-রামায়ণ অনুবাদের মধ্যে দিয়ে ‘বাঙলা’(দেশী ভাষা)সাহিত্যের প্লাবন আসে। আমি সে ইতিহাসে যাচ্ছি না। ইতিহাসের এই অধ্যায় সবার জানা। অবশ্য এই প্লাবনের পেছনে একটা টেকনোলজিকাল উন্নতিও কাজ করেছিল। তুর্কিরা আরব থেকে কাগজ তৈরির কলাকৌশল ভারতে নিয়ে এসেছিল। বাঙলাতেও এই তুলট কাগজের উৎপাদন ১৩ শতকের শেষ থেকে নিয়মিত শুরু হয়েছিল। উচ্চবর্ণের পণ্ডিতরা তালপাতাই ব্যবহার করতেন। বোধহয় তুলট কাগজ ম্লেচ্ছবস্তু হিসেবে দেখা হত। নতুন লেখকরা, বিশেষ করে মুসলমান লেখকরা এই কাগজ ব্যবহার শুরু করেন।

    কিন্তু কয়েক শ’ বছর ধরে সমাজের উচ্চ বারান্দায় বসে থাকা এই পণ্ডিতরা সহজে জমি ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। একের পর এক মহাভারত, রামায়ণ, পুরাণ অনূদিত হচ্ছে এবং সাধারণ নিম্ন শ্রেণীর অকুলীন ব্রাহ্মণ বা অব্রাহ্মণরা শাসকের উৎসাহ-আনুকূল্য পাচ্ছে, এসব দেখে প্রতিঘাত করলেন। বিধান দিয়েছিলেন,

    “অষ্টাদশ পূরাণাণি রামস্য চরিতাণিচ ভাষায়াং মানবং শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ”
     - অষ্টাদশ ধর্মগ্রন্থ, পুরাণ, রামায়ণ যে ‘ভাষায়’ (বাঙ্গালায়) শুনিবে সে ঘোর নরকে যাইবে’।

    কিন্তু ততদিনে ‘বাঙলা’ভাষা ডালপালা পাতা মেলে বৃক্ষে পরিণত হতে চলেছে। তাকে আর অভিশাপ দিয়ে থামানো যায়নি। এসবই তুর্কি-সুলতান-মোগল আমলের ফসল

  • এই ‘দেশি’ বা ‘লৌকিক’ ভাষা কে বাঙ্গালা ভাষা হিসেবে নামাঙ্কিত করার নমুনা যা পাওয়া গেছে, তাতে মনে হয় ভারতচন্দ্রের সময়ের কিছু আগে থেকে, মানে ১৭/১৮ শতাব্দী থেকে এই ভাষাকে বাঙ্গালা বলা শুরু হয়েছে। প্রথমে একে বাঙ্গালী ভাষা বলে লেখা হত (যেমন গুজরাতিদের ভাষা গুজরাতি) পরে বাঙ্গালা ভাষা শব্দটা পপুলার হয়েছে।

    অবশ্য আমরা এও জানি – সমাজের, সংস্কৃতির পরিবর্তন সবাই মেনে নেয় না। যেমন বহুদিন উচ্চবর্ণের শিক্ষিত মানুষরা বাঙলা ভাষাকে গৌড়ীয় ভাষা নামে জানতেন, কারণ গৌড় ছিল সেন-রাজাদের রাজধানী, বৈদিক সংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল অতীত। অপর কথায়, গৌড়ের চশমা দিয়ে দেখাই তাঁদের মানসিক গঠন ছিল। ফলত, রাজা রামমোহন যখন বাঙলা ব্যাকরণ লিখেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ (১৮২৬)। আরো পরে, ১৮৪০ সালে, রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ হিন্দু কলেজের পাঠশালার সিলেবাস নিয়ে আলোচনার সময়ে বলেছিলেন, “এতদ্দেশীয় ভাষার অল্পতা বিষয়ে কোন আপত্তি সম্ভবে না, কারণ সংস্কৃত ভাষা হইতে গৌড়ীয় ভাষা উৎপন্ন হয়, ... পাঠাশালাস্থ ছাত্রদিগকে গৌড়ীয় ভাষা দ্বারা বিদ্যোপার্জন করান যাইবেক”। আরো পরে মাইকেল তাঁর মেঘনাদ বধ কাব্যতে লিখেছিলেন, “রচিব এ মধুচক্র গৌড়জন যাহে - আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি”।

    এখন পর্যন্ত প্রথম বাঙ্গালা শব্দটি ভাষার প্রেক্ষিতে পাওয়া যায় পর্তুগিজদের লেখা থেকে। আন্তোনিও দ্য রোজারিও-র ব্রাহ্মণ ক্যাথলিক সংবাদ (১৭৩৫)। তারপর মনোএল দ্য আসসুনসাঁও-র কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ (১৭৩৪)। এই দুটো লেখা লিসবন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। রোমান হরফে লেখা বাঙলা। ভারতচন্দ্র তখন জীবিত।

    এরপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার ন্যাথানিয়েল হ্যালহেড সাহেবের দ্য গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ (১৭৭৮)। বোঝাই যায়, বইটা ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। শুধু উদাহরণগুলো ছিল বাঙলায়।

    বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম রচয়িতা, ভাষাবিদ দীনেশচন্দ্র সেন সরাসরি এবং বেশ খোলাখুলি লিখেছেন –  

    “বাঙ্গলা ভাষা মুসলমান প্রভাবের পূর্বে অতীব অনাদর ও উপেক্ষায় বঙ্গীয় চাষার গানে কথঞ্চিত  আত্মপ্রকাশ করিতেছিল৷ পণ্ডিতেরা নস্যাধার হইতে নস্য গ্রহণ করিয়া শিখা দোলাইয়া সংস্কৃত শ্লোকের আবৃত্তি করিতেছিলেন এবং “তৈলাধার পাত্র” কিম্বা “পাত্রাধার তৈল” এই লইয়া ঘোর বিচারে প্রবৃত্ত ছিলেন৷ তাঁহারা হর্ষচরিত্ত হইতে ‘হারং দেহি মে হরিণি’ প্রভৃতি অনুপ্রাসের দৃষ্টান্ত আবিষ্কার করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেছিলেন এবং কাদম্বরী, দশকুমারচরিত প্রভৃতি পদ্য-রসাত্মক গদ্যের অপূর্ব সমাসবদ্ধ পদের গৌরবে আত্মহারা হইতেছিলেন৷ সেখানে বঙ্গভাষার স্থান কোথায়?

    ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গভাষাকে পণ্ডিত-মণ্ডলী ‘দূর দূৱ’ করিয়া তাড়াইয়া দিতেন, হাড়ি-ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন, বঙ্গভাষা তেমনই সুধী সমাজের অপাংক্তেয় ছিল - তেমনি ঘৃণা, অনাদর ও উপেক্ষার পাত্র ছিল৷ কিন্তু হীরা কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভিতর মুক্তা লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুবুরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা তেমনই কোন শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল।

    মুসলমান বিজয় বাঙ্গলা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল৷ গৌড়দেশ মুসলমানগণের অধিকৃত হইয়া গেল৷ তাঁহারা ইরান-তুরান যে দেশ হইতেই আসুন না কেন, বঙ্গদেশ বিজয় করিয়া বাঙ্গালী সাজিলেন। আজ হিন্দুর নিকট বাঙ্গলাদেশ যেমন মাতৃভৃমি, সেদিন হইতে মুসলমানের নিকট বাঙ্গলাদেশ তেমনই মাতৃভুমি হইল৷ তাঁহারা এদেশে আসিয়া দস্তুরমত এদেশবাসী হইয়া পড়িলেন৷ হিন্দুর নিকট বাঙ্গলা ভাষা যেমন আপনার, মুসলমানদের নিকট উহা তদপেক্ষা বেশি আপনার হইয়া পড়িল৷ তাই বঙ্গ-সাহিত্যকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না।

    প্রতিকূল ব্রাহ্মণ সমাজ কি হিন্দু রাজত্ব থাকিলে বাঙ্গলা ভাষাকে রাজসভার সদর দরজায় ঢুকিতে দিতেন? কখনই না। সুতরাং এ কথা মুক্তকঠে বলা যাইতে পারে যে, মুসলমান সম্রাটেরা বাঙ্গলা ভাষাকে রাজ দরবারে স্থান দিয়া ইহাকে ভদ্র সাহিত্যের উপযোগী করিয়া নূতনভাবে সৃষ্টি করিয়াছিলেন।”

    - উদ্ধৃতিটি দীর্ঘ হল। কিন্তু খুব জরুরী, কেননা আমাদের বাঙলা ভাষা-সাহিত্যের জীবনে এই হচ্ছে সুলতানি-মোগল যুগের ভূমিকা। এ এক অনালোচিত অধ্যায়। আমাদের দেশের সাহিত্যের ইতিহাসের পথিকৃৎ দীনেশচন্দ্র সেনের বক্তব্য উল্লেখযোগ্য।  



    তথ্যসূত্র-
    ১) সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়The Origin and Development of Bengali Language
    বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা
    বাঙ্গলা ভাষা প্রসঙ্গ

    ২) দীনেশচন্দ্র সেন বঙ্গভাষা ও সাহিত্য
    বঙ্গভাষার ওপর মুসলমানের প্রভাব
    History of Bengali language and literature

    ৩) সুকুমার সেন ভাষার ইতিবৃত্ত
    ইসলামিক বাঙলা সাহিত্য
    ৪) আনিসুজ্জমান আঠারো শতকের বাঙলা চিঠি
    পুরনো বাঙলা গদ্য

    ৫) মহঃ শহীদুল্লাহ বাঙ্গালাভাষার ইতিবৃত্ত

    ৬) গোলাম মুরশেদ আঠারো শতকের গদ্য
    ঔপনিবেশিক আমলের বাংলা গদ্য
    হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি

    ৭) অতুল সুর বাঙলা ও বাঙালী

    ৮) মহম্মদ আমীর হোসেনবাঙালির ভাষা, অনুষ্টুপ শারদীয় ১৯৯৯
    বাঙ্গালী-পরিচয় ও পরিচিতির বিবর্তন, অনুষ্টুপ শারদীয় ১৯৯৮

    ৯) কবিকঙ্কণ চন্ডী মুকুন্দরাম

    ১০) হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ।

    ১১) Parna Sengupta Pedagogy for Religion

    ১২) সুজিত ঘোষ আ মরি বাঙলা ভাষা
    পর্ব ১
  • বিভাগ : আলোচনা | ০৮ অক্টোবর ২০২১ | ৮০৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 117.194.75.138 | ০৯ অক্টোবর ২০২১ ০৮:২৫499329
  • ভালো হচ্ছে। আরও এগোক। তবে লেখক তথ্যসূত্র দিলে ভালো হয়। 
  • Subhro Kumar Mukhopadhyay | ০৯ অক্টোবর ২০২১ ০৯:৪৪499333
  • অর্থনীতি আর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাঙলা ভাষা নিয়ে এমন আলোচনা এখন বিরল। লেখকের গভীর মনন‌ ‌ও উপস্থাপন শৈলী নিশ্চয়ই অভিনন্দন যোগ্য। এ লেখার কাছে আমাদের নানা সময় নানা তথ্যের জন্য ফিরে ফিরে আসতে হবে। 
  • বাসুদেব গুপ্ত। | 2606:54c0:36c0::ca:ce | ০৯ অক্টোবর ২০২১ ১০:৪৬499336
  • এমন হীরকখন্ড আরো নিয়ে আসুন আপনাদের খনি থেকে। 
  • রমিত | 202.8.114.65 | ০৯ অক্টোবর ২০২১ ১৫:০৯499339
  • দারুন লাগল। নতুন এক পারস্পেক্টিভ থেকে বাংলা ভাষাকে দেখলাম।
  • সন্দীপন সিনহা | 2402:3a80:1960:dcb0:178:5634:1232:5476 | ০৯ অক্টোবর ২০২১ ১৫:২৯499340
  • আবহঠট এর ইতিহাস আরো চলুক। এবার আসুন বাংলাভাষার বিবর্তন এর প্রসঙ্গে। অপেক্ষায় রইলাম। 
  • অরিজিৎ চৌধুরী | 2402:3a80:6c2:a859:7502:7e8f:9ae5:1946 | ১০ অক্টোবর ২০২১ ১৬:৫৮499408
  • খুব ভাল লেখা। পাকিস্তান হবার পর বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত কাফেরের ভাষা হিসেবে চিন্হিত করে কোণঠাসা করার চেষ্টার ফলশ্রুতি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন। অবাক করা এ প্রবন্ধ তথ্য দিয়ে উল্টো কথা বলছে। আবার প্রমাণ হ'ল প্রায়ই তথ্য বদ্ধামূল ধারণাকে উল্টেপাল্টে ভুজিয়া বানিয়ে ছাড়ে। তাই উগ্র হতে গেলে তথ্য বর্জন করা অতি প্রয়োজন।
    ইন্দোনেশিয়ার প্রধান ভাষাকে বাহাসা (ভাষা) ইন্দোনেশিয়া বলে। তা কেন হয়তো এ লেখা গড়ালে আন্দাজ পাওয়া যাবে।
  • অম্লান রায় | 157.40.167.56 | ১১ অক্টোবর ২০২১ ০৮:৫৭499419
  • এই লেখায় যে দাবি করা হচ্ছে তুর্কি শাসকরা বাংলা ভাষার উন্নতি করেছিলেন, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয় নি। তুর্কি নবাবের দরবারে কি বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হত? তাঁরা কি বাংলায় ফরমান জারি করতেন। যদি তাই হয়, তবে সেই ধরণের বাংলায় লেখা নবাবী ফরমান দেখানো উচিত। তা নইলে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। যদি এই তুর্কি শাসকরা বাংলা সাহিত্যের উন্নতির চেষ্টা করে থাকেন, তবে তাঁদের উৎসাহে কোন কোন সাহিত্য রচনা করা হয়েছিল, তা বলা উচিত।
    নীহাররঞ্জন রায়ের 'বাঙালির ইতিহাস, আদি পর্ব ' থেকে দেখছি লক্ষণ সেন পরাজিত হবার পর, তাঁর সভাকবি তুর্কি শাসকের স্তুতি রচনা করেছিলেন। তবে সেই রচনা আমার কাছে বাংলা মনে হচ্ছে না, খুবই সংস্কৃত ঘেঁষা। নীহাররঞ্জন রায় বলছেন মাগধি অপভ্রংশ এর এদেশীয় রূপ থেকেই সাধারণ বাঙালির  মুখের ভাষা এসেছিলো। তুর্কি বিজয়ের আগে থেকেই রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে তখনকার বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা শুরু হয়েছিল। সেই সময় সাধারণ মানুষকে নিয়ে সাহিত্য রচনা হত না। সবই হিন্দু ধর্মীয় লেখা হত। তুর্কিরা তাতে কেন উৎসাহ দেবে? আরো প্রমাণ ছাড়া মানা যায় না।
    আধুনিক যুগে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম শাসকরা  পূর্ব বঙ্গে উর্দু চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। তার প্রতিবাদেই বাংলাদেশ হয়। তুর্কি শাসকরা  সংস্কৃতের বিরোধী হতেই পারে। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য তাঁরা কি করেছিলেন, তার কোনো প্রমাণ লেখাটিতে নেই।
  • অনিমেষ চট্টোপাধ্যায় | 2409:4060:41e:a7a1:97e:928b:c0ca:ef8f | ১২ অক্টোবর ২০২১ ১১:৩৪499462
  • অম্লানবাবু 
    লেখাটা ধারাবাহিক। শেষ হোক  তারপর আমার ধারনা  লেখবার  চেষ্টা করব। আমার এই লেখা, বাজারে সহজে পাওয়া যায় এমন সব বইপত্তরের ওপর নির্ভরশীল।  তাতে আমার মনে হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ছাড়া আর কোন বাঙলা সাহিত্য তুর্কিবিজয়ের আগের যুগের পাওয়া যায় না। আপনি যদি এই সময়ের আর কিছু উদাহরন দেন,তাহলে ভালো হবে। 
    আর ফরমান দিয়ে কি উৎসাহদান বোঝা যায়?  তুর্কি-আফগান শাসকরা নিজেদের মাতৃভাষার পরিবর্তে ফারসি ভাষায় ফরমান জারি করতেন কারন তখন ফারসি ভাষা ছিল অফিসিয়াল ভাষা। যেমন আজকাল ইংরেজিতে সব সরকারি ফরমান এমনকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ফরমান গুলোও ওই ইংরেজিতে বেরোয়।  আজও কেউ নিজের মাতৃভাষায় ফরমান জারি করে না। প্রশ্নটা হচ্ছে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে কিনা। 
                     আর একটা বাস্তবের পরিবর্তন। কেন সেনরাজাদের আমলের উদাহরন  পাচ্ছি না। কেন তুর্কি-আফগান আমলে পাচ্ছি? 
    মনসা বা চন্ডী তখনো পুরাণে স্থান পাননি।  যে দেবদেবী স্মৃতি বা শ্রুতি কোথাও ছিলেন না  তাকে হিন্দু দেবদেবী বলাটা আমার কাছে অনৈতিহাসিক। গত একশ-দেড়শ বছরের হিন্দু দেবদেবীর যে ধারনা তার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
  • অম্লান রায় | 2409:4060:394:57d9:3019:61f3:a033:da21 | ১৩ অক্টোবর ২০২১ ০৮:৫১499496
  • স্থানীয় ভাষায় সরকারী কাজ ও আদেশানেমা প্রকাশিত হলে নিশ্চিত ভাবে বোঝা যায় যে সরকার স্থানীয় ভাষাকে উৎসাহ দিচ্ছে। অন্তত পক্ষে যদি নবাবের ফরমান দুটি ভাষাতেই (ফার্সি ও বাংলা ) প্রকাশ করা হত, তাহলেও প্রমাণিত হয় যে তুর্কিরা বাংলা ভাষাকেও গুরুত্ব দিত। এই ধরণের দ্বিভাষী ফরমান পাওয়া গেলেও আপনার ব্যক্তব্যের জোরালো সমর্থন পাওয়া যাবে।
    আপনি সঠিক কথাই বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গের কোনো সরকার কখনো বাংলা ভাষার প্রতি পক্ষপাত দেখিয়ে প্রশাসনিক কাজ বাংলায় করে নি। ভারত সরকার হিন্দিকে উৎসাহ দেবার জন্য প্রশাসনিক কাজ হিন্দিতে করে। গুজরাট, কর্ণাটক, তামিলনাড়ুর সরকার প্রশাসনিক কাজ নিজেদের ভাষায় করার চেষ্টা করে। স্বাধীন বাংলাদেশ বাংলা ভাষায় প্রশাসনিক কাজ করে। তবে পশ্চিমবঙ্গের কোনো সরকারকে এই ধরণের বদনাম কেউ দিতে পারবে না।
    নবজাগরণ এর সময় থেকে আজ অবধি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি হয়েছে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও ছোটো ছোটো সাহিত্যিক গোষ্টির উদ্যোগে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আধুনিক লিখিত বাংলা ভাষার জনক। কিন্তু এই কাজ তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে, কোনো সরকারী উৎসাহ ছাড়াই, করেছিলেন। ইংরাজ আমলে রবীন্দ্রনাথ, জগদীশ বোস প্রমুখেরা জন্মগ্রহণ করেছিলেন ও কাজ করেছিলেন। তার থেকে কি বলা যায় ইংরাজ শাসকরা বাংলা ভাষা ও এদেশীয়েদের বিজ্ঞান চৰ্চায় উৎসাহ দিতেন? হয়ত বলবেন পাশ্চাত্য শিক্ষার পরোক্ষ প্রভাব আছে। তা হলেও বোলবো  সরকারী উৎসাহ ছিল না। যা হয়েছে তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে।
    তুর্কিরা ইংরেজদের মত এদেশে কোনো উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা এনেছিল কি না জানি না। কাজেই তুর্কি পরবর্তী যুগের বাংলা সাহিত্যের উন্নতি কতটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে, আর কতটা সরকারী উৎসাহে, তা আরো প্রমাণ ছাড়া বলা যায় না।
    ব্যক্তিগত চেষ্টা ও সাহিত্য গোষ্ঠীর উদ্যোগে যে ভাষার উন্নতি হয়, তার প্রমাণ তো আমরা নিজেরাই। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাংলা ভাষাকে উৎসাহ দেন, এমন অপবাদ তো কোনো ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদ দেবেন না।
    আপনার লেখাটি পড়তে আমার খুব ভালো লাগছে। সম্পূর্ণ লেখাটি পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
     
  • সৌম্যজিৎ | 117.208.206.178 | ২৪ অক্টোবর ২০২১ ০৮:১৬500141
  • অনবদ্য হচ্ছে দাদা। এরম একখানা লেখারই যেন অপেক্ষায় ছিলাম। সমৃদ্ধ হচ্ছি।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন