• খেরোর খাতা

  • সত্যজিতের ছবির নারীরা যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল ও ভেজে নি

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৯ মে ২০২১ | ৭৬৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • সত্যজিতের ছবির নারীরা যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল ও ভেজে নি - অনুরাধা কুন্ডা।

    জীবনের প্রথম ছবি যেটি দেখেছি সে হল গুপি গাইন বাঘা বাইন। তারপর তাঁর ছবি দেখতে দেখতেই বড় হয়ে ওঠা। পাশাপাশি যখন অন্যান্য দেশি, বিদেশি পরিচালকদের কাজ দেখতে শুরু করলাম, তখনও তাঁর স্থানচ্যুতি ঘটেনি। ক্রমে প্রত্যাশা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই ক্রিটিক্যাল চোখ তৈরি হয়েছে। তাও সত্যজিত রায়ের অবদান বেশ কিছুটা। ছবি দেখতে দেখতে শেখা। মানে দেখতে শেখা। ভাবতে শেখা। কিছু কথা উঠেই আসে। তাঁকে প্রগাঢ় সম্মান জানিয়েই উঠে আসে।

    সত্যজিতের ছবিতে হারিয়ে যাওয়া নারী

    তাঁর ছোট মেয়েরাও নারী। খুব বেশি ছোটত্ব তো তাদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না, কারণ ছোট থাকার, ছেলেমানুষ থাকার, ছেলেমানুষি করার প্রশ্রয়টুকু চিরকাল পুরুষশিশুদের জন্যেই রয়েছে।

    যেমন দুর্গা। পথের পাঁচালি অপুর গল্প। সে কেন্দ্রবিন্দু। তাকে ঘিরে রয়েছে বাঙালীর দুই অতি প্রিয় নারী চরিত্র। মা ও দিদি। তারা নারীর সেই আদর্শ যাকে পুরুষ আইডিয়ালাইজ করেছে বইতে। ছবিতে।

    পোস্টমাস্টার ছবিতে রতন তেমনি এক নারী। তার খুকিত্ব কে গল্পকার বা চলচ্চিত্রকার, কেউই তেমন প্রশ্রয় দেন নি। হয়তো তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই প্রশ্রয় কন্যাসন্তানের বরাদ্দ ছিল না বলেই ছবিতে তার বাস্তব প্রকাশ।রতনের বয়সকে ছাপিয়ে যায় তার নারীসত্ত্বা। যে নারীসত্ত্বা একান্ত ভাবে পিতৃতন্ত্রের নির্মাণ। দারিদ্র্য, বঞ্চনা, উপেক্ষা এইসবকিছুকে অতিক্রম করে যায় এই নারীত্বের স্টিরিওটাইপ।

    রতন কে? তার বাপ মা?
    মা তো নেই।
    কবে?
    মনে নেই। যখন ছোট ছিলাম।

    পোস্ট মাস্টার হাসে। কারণ রতন আট নয় হবে। তার নিজের কাছেই নিজের শৈশব অতিক্রান্ত। বাবাও নেই। যখন যে পোস্ট মাস্টার আসে, সে তার অনুগত।
    রতন।
    রত্না না রতনা?

    পূর্ববর্তী পোস্ট মাস্টার অনায়াসে তার মাথাতে চাপিয়ে দেন পুঁটলির বোঝা।

    প্রথমদিকে রতনকে আমরা দেখি যে তিনটি দৃশ্যে, তা অতি অবশ্যই শ্রমমূলক।

    প্রথম দৃশ্যে রতন মোট বইছে।

    দ্বিতীয় দৃশ্যে রতন ঘর ঝাড় দিচ্ছে।এবং পোস্ট মাস্টার পরিস্কার বলছেন যে তিনি স্নানে গেলে যেন সে ঘর ঝাড় দেয়। স্বাভাবিক নিয়মে ধুলো যেন তাঁকে স্পর্শ না করে।

    তৃতীয় দৃশ্যে সে জুতো পলিশ করছে।

    এই তিনটি কাজের মধ্যে দিয়েই রতন অতি শিশুবয়সে শ্রমজীবী নারীর ভূমিকা পালন করে।

    রতন বিশুপাগলাকে দেখে ভয় পায় না। উল্টে ধমক দেয়। অর্থাৎ সে অতি শিশুবেলা থেকেই এই পাগলকে দেখে, তাকে ধমক দিয়ে অভ্যস্ত। এখানেই তার মেচিওরিটি। যে মেচিওরিটি পোস্ট মাস্টারের পাগল দেখে ভয় পাওয়ার দৃশ্যে আরো বেশি পরিস্ফুট।

    রতন একা একটি ঘুমায়। আলো নিভিয়ে। সে ভয় পায় না। এও অভ্যেস। ভাগ্যিস এই গল্প সেই যুগের যখন পেডো ফাইলের কনসেপ্ট ছিল না। এই ছবি যে সময়ের তখনো তেমনভাবে সামনে আসেনি শিশুধর্ষকরা। নয়তো, একটি নির্জন জায়গা, ছোট বাড়ি, অচেনা পোস্ট মাস্টার ও পিতৃমাতৃহীন বালিকা। আমাদের কিন্ত রতনের জন্য ভয় হয়। খুব ভয়।

    কিন্ত এই প্রসঙ্গ আলাদা। চুলের মুঠি ধরে ছুঁড়ে মারার মত স্নেহময় পোস্ট মাস্টারের পরিবর্তে রতন কপালগুণে এক সহৃদয় মাস্টারবাবু পেয়ে যাচ্ছে। কিন্ত তাতে তার শৈশব ফিরে আসছে না।তার ভূমিকা স্নেহময়ী মা, কল্যাণী ভগিণীর। এবং শেষে অবশ্যই উপেক্ষিতা।

    মেয়েসন্তানের কোনো শৈশব থাকত না। সত্যজিতের ছবিতে তার ব্যতিক্রম নেই। যে ব্যতিক্রমী কিশোরীটি ছেলেদের সঙ্গে দৌড়ে বেড়াত, যার চোখ বিদ্রোহ, ওষ্ঠে গভীর অভিমান, সেও ছবির শেষে অনুগত, বিরহিণী বধূতে পরিণত হয়। এতে আপত্তিকর কিছু নেই। কিন্ত এও সত্য যে এই মেয়েরা একটি স্টিরিওটাইপের মধ্যে আবধ্য এবং তাদের চরিত্রের যদি কোনো ইভোলিউশন থাকে, তবে সেটাও ঐ স্টিরিওটাইপের মধ্যেই আনাগোনা করে। যেটা ভীষণভাবে রাবীন্দ্রিক। পিতৃতান্ত্রিক। এবং কিছুটা অবদমনের রাজনীতি তাতে কাজ করে বৈকি। রতন একজন শিশুশ্রমিক। যতই তার সঙ্গে পোস্ট মাস্টারের একটি আবেগের সম্পর্ক তৈরি হোক না কেন, ভরকেন্দ্র হচ্ছে রতনের শ্রম এবং সেবা। তার মেয়েবেলা ঐ গন্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ। যখন নন্দর বোনের সঙ্গে কাল্পনিক প্রতিযোগিতায় যখন রতন গান গেয়ে ওঠে, পরিচালক চন্দন বন্দোপাধ্যায়ের কচি মুখটি ক্লোজ আপে ধরেন, নাকে নাকফুল, চুল আঁটো করে বাঁধা, গায়ে আঁচল ফেলা রতন নিজের অজান্তেই নারী হয়ে যায়।

    নন্দ চিঠিতে ছাপ মারেন। রতন কাপড় কাচে পুকুরঘাটে। শাড়ির আঁচল গায়ে জড়ানোতে, ভিজে কাপড় নিংড়ানোতে রতন একেবারেই ছোট মেয়েটি নয়। বেশ পরিপূর্ণ নারীর মত তার হাবভাব। সে নিজেও জানে না শৈশব কাকে বলে। এই বাস্তব। আরো পরিপূর্ণ নারী হয়ে ওঠার ইচ্ছেতে নন্দর বোনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গান গায় রতন। লেখা পড়া শিখতে চায়। নন্দ গ্রামের মানুষের গান শোনেন। রতন রুটি ভাজে। রতন শুকনো কাঠ কুড়িয়ে আনে যখন নতুন পোস্টমাস্টার আসেন।

    যতবার পোস্টমাস্টার দেখি, রতন, মেয়েবেলা ও নারীত্ব সম্পর্কিত যাবতীয় পুরুষতান্ত্রিক বিধান মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। একটি মহৎ চলচ্চিত্র এইভাবে দর্শককে ভাবায়। ভাবাতেই থাকে।

    মৃন্ময়ী নারীত্বের একটি ছাঁচে পড়ে যায়, যার প্রারম্ভ সুক্তোতে কী কী ফোড়ন দিতে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে শুরু হয়। গেছো মেয়ে লক্ষ্মী বউ হল। এই বিষয়ে বিশেষ কিছু বলার থাকে না।কিন্ত মণিমালিকা?

    সে কী ভয়ানক এক পিতৃতান্ত্রিক পিন্জরে আবদ্ধ নয়? টিয়াপাখির মুখে লঙ্কার মত, মণিমালিকার হাতে দেওয়া হয় গহনা। এবং মণিমালিকার সন্তানহীনতাকে তার গহনালিপ্সার সঙ্গে যুক্ত করে দেবার এক ভয়ঙ্কর পিতৃতান্ত্রিক চক্রান্ত তৈরি হয়। কাহিনীর শুরুতেই সেই প্রবচন: স্ত্রীলোক ঝাল লঙ্কা এবং কড়া স্বামী পছন্দ করে। শিং ধার করিবার জন্য বাছুর কলাগাছ খোঁজে না। এই কড়া স্বামীর ধারণার বিপ্রতীপে আছে ফণিভূষণ। সে কড়া স্বামী নয় বলেই মণি খামখেয়ালি হয়ে ওঠে এইরকম একটা ধারণা হতেই পারে।

    সন্তানের সঙ্গে নারীত্বকে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলার কুঅভ্যাস পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার একটি বিশাল অবদান। তাহলে নারীকে আবদ্ধ করা যায়।দায়ী করা যায়। দোষী করা যায়। এ এক যুগান্তকারী ষড়যন্ত্র। মণির সন্তান নেই। কেন? ফণীর সন্তানহীনতা গুরুত্ব পায় না। কারণ সে পুরুষ। পিতৃত্বর মহিমা অন্যত্র। তার আছে কাজের জগৎ। কাজেই সন্তান না থাকার সমস্ত গ্লানি বহন করতে হয় মণিকে কারন আমরা জানি না মণি অথবা ফণীর সন্তানহীনতা সম্পর্কিত কোনো ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছিল কিনা। সম্ভবত হয় নি কারণ সেকালে কেন, একালেও সন্তানহীনতা সমাজের চোখে একটি "মেয়েলি সমস্যা", শারীরিক ও মানসিক, উভয়ভাবেই। পুরুষ এখানে দায়ভারমুক্ত। মণির শূন্যতা কেবলমাত্র সন্তানহীনতা জনিত বললে, মণিকেও সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। নারীত্বকেও না।

    এরপরেই সন্তানহীনতার সঙ্গে গহনাপ্রীতিকে যোগ করে দেওয়ার প্রয়াস। সন্তানবতী নারী গহনার লোভ করেন না বুঝি! গহনার ব্যবসা কিন্ত করেন পুরুষ। লাভের অংক পুরুষের খাতায়।

    মণিমালিকার চোখে দপদপ করে লোভ। স্বামীর ব্যবসাতে ভরাডুবির কথা শুনে সে ফুঁসে ওঠে। আমি গয়না দেব না।

    চোখে তীব্র আধিভৌতিক দৃষ্টি। ঐ বাড়ি, গা ছমছমে পরিবেশ, নির্জনতা, একাকীত্ব সবমিলিয়ে মণিমালিকা কল্যাণী নারীমূর্তির ঠিক বিপরীতে অবস্থান করে। সন্তানহীনতা দিয়ে নারীত্ব নিরূপণ করা এক সামাজিক ব্যাধি। মণিমালিকাকে তার সঙ্গে না জড়ানোই ভালো। অথচ সমালোচকরা এইটিই করে থাকেন অক্লেশে।

    ঠিক যেমনটি হয় চারুলতার ক্ষেত্রে।

    চারু যে অমলের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে তার কারণ কী সন্তানহীনতা? পাতার পর পাতা লেখা হয়ে গেছে এই নিয়ে।

    চারু দূরবীন দিয়ে বাগান থেকে একটি শিশু কোলে জননীকে দেখে। আর দর্শক তার শূন্যতা আঁচ করে নেন। যেহেতু তার সন্তান নেই, সেই জন্য তার হাতে অফুরন্ত সময়, ক্লান্তি, এবং সর্বোপরি অমলের প্রতি আকর্ষণ। এত সহজ সমীকরণে বোধহয় চলচ্চিত্রকারের প্রতি সুবিচার হয় না। আর চারু সন্তানধারনের বয়সোত্তীর্ণও হয় নি।

    চারুলতাতে চারুর সন্তান নেই, তাই অমলের প্রতি সে দুর্বল হয়, অথবা, ঘরে বাইরেতে বিমলার সন্তান নেই, তাই সে সন্দীপের প্রতি আকৃষ্ট হয়, এইসব নিরেট ধারনাকে তছনছ করে দাঁড়িয়ে আছে সত্যজিতের কান্চনজংঘা। বা পিকু। যেখানে বিবাহিতা ও সন্তানের জননীরা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত থাকেন।

    চারুলতার নিঃসঙ্গতা আরো অধিকতর গভীর। মননশীল। আবেগপ্রবণ। ভূপতি যে অন্তর্লীন রোমান্টিসিজমকে কখনো স্পর্শ করা দূরে থাক, বুঝতেও পারে নি। চারু সেই রোমান্টিক বাঙালি নারী যার সহজাত সাহিত্যবোধ, অন্তঃপুরের অবরোধ, এই খিড়কি থেকে ঐ খিড়কির সীমিত চলাচল, তার মনকে চঞ্চল করে তোলে অথচ তার কোনো বহির্প্রকাশের জানালা নেই। অন্তঃপুরের অবরোধ যে কী ভয়ানক মানসিক যাতনার কারণ হতে পারে তার উদাহরণ চারু। আর অন্তঃপুরের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে যে চোখ ধাঁধিয়ে যেতে পারে তার উদাহরণ বিমলা। বিমলার কথাতে পরে আসি। এখন চারুলতা।

    চারুলতা তো কপালকুন্ডলা নয়। তাঁর সংসারে মন আছে। সে মন দিয়ে স্বামীর জন্য রেশমের পাদুকা বানায়। রবীন্দ্রনাথের চারু এবং সত্যজিতের চারুলতার মধ্যে কিছু ফারাক আছে। সেটা শুধু ছোটগল্প এবং চলচ্চিত্রের পার্থক্য নয়। ভিশুয়ালাইজেশনের পার্থক্য। নষ্টনীড়ের চারু আরো কিছুটা কমবয়সী।

    চারুলতার মাধবী মুখোপাধ্যায় পরিপূর্ণ নারী। বিশেষ করে ইন্টেলেকচুয়াল রোম্যান্টিসিজমের প্রতীক চারুলতার অপ্রতিম মুখাবয়ব। যাকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গল থেকে বারবার ধরেছেন সত্যজিৎ।
    সেই ছবিগুলি চারুর সন্তানহীনতা জনিত অপূর্ণতার কথা বলে না, এক পরিপূর্ণ নারীসত্ত্বার ইমেজ আমরা দেখি, যে পরিপূরক চায়। হাতে দূরবীন নিয়ে এক জানালা থেকে অন্য জানালা চলে যাওয়ার বহুমাত্রিকতা বহুআলোচিত হলেও, তাকে একটি নূতন আঙ্গিকে দেখা যায়।

    চারু উন্মুখ। চারু উৎসুক। বহির্জগত তাকে আকর্ষণ করে। অথচ সে বন্দি।এই নির্দয় বন্দীত্ব চারুর মধ্যে ক্ষয় সৃষ্টি করে। এই ক্ষয় সন্তানসুখ দিয়ে হয়তো সেইসময় মেয়েরা ভুলিয়ে রাখতেন।কিন্ত অন্তর্লীন বিষাদের কাব্যকাহিনী ভূপতির মতো পিতৃপ্রতিম পতির বোঝার ক্ষমতা নেই। তাই ঝড়ের সঙ্গেই ঝড়ের মত হরে মুরারে মধুকৈটভারে বলতে বলতে চারুর জীবনে এসে পড়ে অমল। চারু অমল মন্দার ত্রিকোণটি বলতেই হবে খুব দুর্বল। যদি মন্দা মন্দা না হয়ে বিমলা হতেন বা বিনোদিনী তবে ব্যাপার গুরুতর হত।

    ছবিতে চারুর পাশে মন্দা চোখে পড়ার মত স্থূল। তাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হয় না। কিন্ত চিরকাল চারুর মধ্যে যে সমালোচকরা অবদমিত মাতৃত্ব খুঁজে এসেছেন, তার প্রতিবাদ হওয়া জরুরি। চারুলতার ঠোঁটের ভাঁজে, ওষ্ঠে, চিবুকে, চোখে যে প্রবল আভিজাত্য, বুদ্ধিমত্তা, মনন ও অভিমানের প্রকাশ, তা কেবল মাতৃত্বের অভাব বলে লেবেল সেঁটে দেওয়া অন্যায়। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের প্রোফাইল, দূরবীন হাতে তাঁর ক্লোজ আপ, তাঁর হেঁটে যাওয়া, অমলের মুখে "দাদার কী সৌভাগ্য" শুনে ছন্দ মিলিয়ে গেয়ে ওঠা, "তোমারো হবে", মুখের চাপা হাসি, দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণ ঔপন্যাসিক সমস্ত কিছুই এক অসাধারণ দ্যোতনা তৈরি করে। যাকে কোনো সীমিত তান্ত্রিকতার ফর্মূলা গন্ডীবদ্ধ করে রাখতে পারে না।

    দেবী সম্ভবত সত্যজিতের সবচেয়ে প্রতিবাদী ছবিগুলির অন্যতম।

    যেভাবে মৃত্তিকার মাতৃমুখ টাইটল কার্ডের সঙ্গে সঙ্গে সেজে ওঠে আভূষণে, তাতেই স্পষ্ট যে পিতৃতন্ত্র ও ধর্ম মৃন্ময়ীকে নির্মাণ করে। অলংকারে সাজায়। ক্যামেরা ধীরে ধীরে দূরে যায়। প্রতিমার মুখ থেকে পুরো আটচালা। সেখান থেকে ক্যামেরা যায় ছবি বিশ্বাসের মুখে। পাশে বড় ছেলে। দুজনের চোখেই পিতৃতান্ত্রিক দম্ভ যাকে ভক্তির আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছে। এরপরেই ছাগবলি।সেখান থেকে আকাশে আতসবাজি এবং খোকার নিষ্পাপ মুখ। হাসি। তারপর সৌমিত্রর মুখ। ক্যামেরা নেমে আসে শর্মিলা ঠাকুরের ঈষৎ অবনত পানপাতার মত মুখের ওপর। তিনি ধীরে ধীরে ঘাড় তুলে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসেন। চোখ। ঘাড় ফেরানো এবং হাসি।

    সমস্ত ভঙ্গিতে সমর্পণ। যে সমর্পণের বিশ্বাসে তিনি পরবর্তী দৃশ্যে বলেন, "তুমি যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যাবো।" এই হল নারীত্বের সমাজ অনুমোদিত আরেকটি স্টিরিওটাইপ। ভক্তি যাকে নির্মাণ করে এবং আমরা তাঁকে দেখতে পাই ঠাকুরঘরে। নিপুণভাবে পালনীয় কাজ করে যাচ্ছেন যার প্রধান উপাদান হল, বুঝে হোক বা না বুঝে, ভক্তি।

    ফিল্ম দর্শক মাত্রেই জানেন, শর্মিলা ঠাকুরের উপস্থিতির মূল বৈশিষ্ট্য হল মাধুর্য। যে মাধুর্য পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার প্রিয় বিষয়, পিতৃতন্ত্র তাকে ঐ মাটির মূর্তিকে সাজানোর মতোই আরো বেশি সাজিয়ে তোলে। কারণ সে বাধ্য। কারণ সে অনুগত। কোমল। পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতা একে বলে সুলক্ষণা। এই নারী মূলত একটি কাদার তাল। যাকে পিতৃতন্ত্র নিজের মনের মত করে গড়ে নেয়। সেই আদর্শ কল্যাণী বধূর মডেল।

    সত্যজিতের নিজের কথাতেই, মেয়েরা তাঁর ছবিতে বিবেকের কাজ করে।

    বেশ কিছু ছবিতেই এই উক্তির যথার্থতা প্রমাণিত। আবার এই বিবেক হতে গিয়ে মেয়েরা যে কখন রোল মডেল হয়ে যায়, এবং গতানুগতিক, সেটিও আলোচ্য বিষয়।

    বিবেক। এটা এক আশ্চর্য বস্তু। আয়ন গ্রন্থে জাস্টিস সম্পর্কিত আলোচনা করতে গিয়ে প্লেটো বলেছিলেন, কনসিকোয়েন্সের ভয় না থাকলে বিবেক বস্তুটা থাকতো না।

    যদি এটা সত্যি মেনে নিতে হয়, তবে মেয়েদের বিবেক মানে বিবেচনা। কনসিকোয়েন্সের চিন্তা। এর পরে কী হবে? এটা করলে কী দাঁড়াবে শেষে?

    রতন শিশু। সে কনসিকোয়েন্স বোঝে নি। পোস্টমাস্টার যে চিরকালের নয়, সে বুঝতে পারে নি। চন্দনার মুখ চোখের অভিব্যক্তিতে তার প্রকাশ। ঐখানে সে পূর্ণ নারী নয়। অর্ধ নারী। পথের পাঁচালীতে দুর্গা। সেও ছোটো এক নারী। যে ছোটো আরশিতে মুখ দেখে কাজল পরে। সে এক মাতৃপ্রতিম দিদি।

    মণিমালিকা কনসিকোয়েন্স বোঝে নি। সন্তানহীনতা নয়। অপরিণামদর্শিতাতে তার অপরিপূর্ণতা।

    আর দয়াময়ী? সে বলল, আমি যাবো না এইভাবে। গেলে যদি তোমার অমঙ্গল হয়?

    উমাশংকর স্তম্ভিত। ব্যথিত।

    তবে কী দয়াময়ী ভুল কনসিকোয়েন্সের বিচারে? অবশ্যই ভুল। পিতৃতান্ত্রিক মোড়কে আদ্যন্ত সজ্জিত মেয়েটি ভেবে ফেলে। বলে ফেলে - আমি যদি দেবী হই? যদি দেবী হই? ও যে চোখ মেলে চাইল গো!

    পিতৃতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা দেবী ছবিতে সবচেয়ে বেশি প্রকট। যা দয়াময়ী নামে সহজ, স্বাভাবিক মেয়েটিকে স্কিৎজোফ্রেনিক পেশেন্ট করে তোলে। দয়া দেবীতে হারিয়ে যায়।

    দয়াময়ী তার প্রবল প্রতাপশালী শ্বশুরের পায়ে তেলমালিশ করে। ছবি বিশ্বাসের বসে থাকার ভঙ্গি এবং প্রশ্ন, আমার ছেলেটা তোমাকে চিঠি লেখে? রোজ লেখে? মনে হয় উমা ও দয়ার দাম্পত্যে অনুপ্রবেশ করে। এইসময়ের দর্শকের মনে পড়বেই অধুনা ওয়েবসিরিজ মির্জাপুরে কুলভূষণ খারবান্দার পায়ে রসিকা দুগ্গলের তেলমালিশ। সেখানেও শ্বশুর পুত্রবধু। মির্জাপুর একধরনের নির্যাতন পোর্ট্রে করে। দেবী আরেকরকম। দুটোই বিকৃত।

    মেয়েরা যে হারিয়ে যায়, সামাজিক এবং মানসিক চাপে, সত্যজিতের ছবিতে তা বারবার ফিরে আসে। সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক সবসময় নয়।তবে বাস্তবানুসারী।

    দুর্গা মেয়েসন্তান। সম্ভবত তাই সে বিনে চিকিৎসায় প্রায় প্রায় জ্বরে ভোগে। সে পাঠশালা যায় না। সামান্য আকাঙ্খাও পূর্ণ হয় না তার, তাই সে চুরি করে। মার খায়। আর ভাইটিকে আগলে রাখে। দিদির রোল মডেল।

    এই ছবির তিন নারী। ইন্দির ঠাকরুণ। সর্বজয়া। দুর্গা। দুর্গা আর ইন্দির ঠাকরুণের মধ্যে একটা কেমিস্ট্রি আছে যেটা ইন্দির সর্বজয়ার মধ্যে নেই। দুর্গা সর্বজয়ার মধ্যে নেই। যেটুকু আছে তা বড়বেশি ক্ষীণ। স্রোতস্বিণী নয়। দুর্গা আর ইন্দির ঠাকরুণের হাসিমুখের ক্লোজ আপ এক অন্য ভুবনের খোঁজ দেয়। সেটা উইলিয়াম ব্লেকের সংগস অব ইনোসেন্সের মত নির্মল। কিন্ত ভঙ্গুর। বাস্তব তাকে ভেঙে গুঁড়ো করে দেয়। তাই ইন্দির বাঁচেন না। দুর্গাও বাঁচে না। সর্বজয়া সংঘর্ষ করতে করতে হারিয়ে যায়।

    যেমন হারিয়ে যায় অপর্ণা। অপুর সংসারে। বড় কোমল। বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার জোর এই মেয়েদের নেই।

    রতন বা দুর্গা, মণি বা চারু , অথবা দয়াময়ী সেই পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের শিকার, যেখানে তারা হারিয়ে যেতেই আসে।

    এই হারিয়ে যাওয়া পরিপূর্ণ নারীদের প্রসঙ্গে আরো কয়েকজনের কথা বলবো। যার জন্য তাঁর ছবির কোনো ক্রমতালিকা ব্যবহার করছি না। যদিও সময়ের প্রেক্ষাপট খুব গুরুত্বপূর্ণ, তবু কিছু চিরকালীন বা আপাতচিরকালীন বৈশিষ্ট্য তো থেকেই যায়।

    এই হারিয়ে যাওয়া নারীদের তালিকাতে আমি রাখবো গণশত্রু ছবিতে ডাক্তারের স্ত্রীকে, যে ভূমিকাতে অভিনয় করেছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা। এবং মমতাশংকর অভিনীত ডাক্তারের কন্যাকেও।

    রুমাকে আমরা সবসময়ই দেখি বৈঠকখানাতে। গৃহসেবককে তিনি রান্না শিখিয়ে পড়িয়ে দেন।বাকী সময় আমরা তাঁকে সুসজ্জিতা দেখি ড্রয়িং রুমে। অতিথি দোরগোড়াতে দাঁড়ানোমাত্র বলে ওঠেন, আপনি চা খাবেন তো?

    হতে পারে অতিথি আপ্যায়ন করতে করতে ক্লান্ত গৃহবধূ চা খাওয়ানোর দায়িত্বটুকু তাড়াতাড়ি সেরে অব্যাহতি চান? হতেও পারে। কিন্ত অতিথি আসামাত্র চায়ের অফার একটি আলোচনাযোগ্য বিষয় বটে।

    দ্বিতীয়ত, ডাক্তার যখন মিউনিসিপ্যালিটির সঙ্গে নৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের তুঙ্গে, তখন তিনি একবার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার মন্দিরে যেতে ইচ্ছে করে না?

    গৃহিণী বলেন, আমার নিজের ইচ্ছে বলে আলাদা করে আর কিছু নেই।

    এই নারীটি সম্পর্কে আকন্ঠ নিমজ্জিত এমন এক স্টিরিওটাইপ, কলিংবেলের শব্দে যাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ঐ বুঝি উনি এসেছেন! কী হাস্যোজ্জ্বল মুখ।

    এখানেই সত্যজিতের স্টিরিওটাইপ নারী স্রোতে হারিয়ে যান। দেবীর দয়াময়ীর এক্সটেনশন বা আধুনিকভার্সান ডাক্তারগৃহিণী, যাঁর কোনো নিজস্ব আইডেনটিটি নেই। কান্চনজংঘার রায়বাহাদুরের স্ত্রী। অবদমনে ক্লিষ্ট। তবু তাঁর বিষাদময় চোখে আমরা দেখেই ফেলি প্রতিরোধের ছায়া। এই করুণাময়ীতে কোথাও আমরা স্বকীয়তায় উজ্জ্বল নারীকে খুঁজে পাই না। ছিল সেই উজ্জ্বলতা। ডাক্তার গুপ্তর মেয়েটির মধ্যে। গণশত্রু।

    যে তার বাবার লেখা অনুবাদ করে। যে অসৎ সম্পাদকের ইঙ্গিত অবহেলায় ধুলিস্যাৎ করতে পারে।

    অথচ সেই ঋজু মেয়েটি সম্পর্কে তাঁর বাবা, মা বলে ওঠেন, ও এখন একটা স্কুলে চাকরি করছে। বিয়ে হলে ছেড়ে দেবে। মা বলেন, মে মাস থেকে চাকরিটা ওর আর না করলেও চলবে। কারণ রমেন ব্যাঙ্কে চাকরি করে ও ভালো মাইনে পায়। মেয়েটির নিজস্বতা এখানেই সমূলে ধ্বংস।

    গণশত্রুর অনেক অনেক আগের নির্মাণ মহানগর। আরতি কিন্ত হারিয়ে যায় নি।

    যে মেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজেছিল।

    দুর্গা সত্যজিতের নিয়ম ভাঙা মেয়ে।বিভুতিভূষনের প্রকৃতিকন্যা।ঝড় মাথায় করে সে আমবাগানে আম কুড়াতে যায়।তুমুল বৃষ্টিতে ভেজে। কাশবনের মধ্যে দিয়ে সে দৌড়ায় রেলগাড়ি দেখতে।সে সুদূরের পিয়াসী।সে অন্যান্য গ্রামবালিকাদের মতো সুশীলা নয়।দুর্গা ডানপিটে। খানিকটা যেন মৃন্ময়ীকে তার মধ্যে পাওয়া যায়। বিবাহ নয়।মৃত্যু তাকে গ্রাস করে।

    বৃষ্টি ভেজা মেয়েরা বাঁচে না।

    কিন্ত মহানগর?

    আরতির চোখে মুখে মাধবীলতার বুদ্ধি।উদ্বেগ।প্রেম। স্বামীর বন্ধুর স্ত্রী ইস্কুলে পড়ান।শুনে আরতি ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়।ঐ ঘাড় ফেরানোটুকুতেই তার ইচ্ছের প্রকাশ
    - তুমি চাও না আমি চাকরি করি? আরতি বলে।
    - না। চাই না।
    কারণ হিসেবে ভোম্বল জানায় সে কনসার্ভেটিভ।
    আরতি আবার জিজ্ঞেস করে, তুমি সত্যি চাও না আমি চাকরি করি?
    এবার ভোম্বল অন্য টেকনিক নেয়। গেয়ে ওঠে, ম্যায়নে চাকর রাখো জি। আরতি পরাস্ত। বউকে ভুলিয়ে রাখার কায়দা স্বামীটি জানেন।
    ভোম্বল বলে, তুমি যদি একটু কম অ্যাট্রাকটিভ হতে তাহলে চাকরি করতে দিতে আপত্তি করতাম না। তোমার মত মেয়েরা চাকরি করলে পুরুষের কাজের আউটপুট কমে যায়।
    এও আরেকরকম ডমিনেশন। ছল করে, স্তুতি করে ভুলিয়ে রাখা।
    আরতি, যেহেতু গৃহবধূ, সে তর্ক করে না। সে কাজ করতে চায়।
    কিন্ত তার স্বামী তাকে বলেছেন, আ উওম্যানস প্লেস ইজ অ্যাট হার হোম। শি শুড নট ওয়ান্ডার অ্যরাউন্ড ।ভিক্টোরিয়ান ইংরিজি প্রবাদবাক্য। স্বামীর অধিকার ও আরতির সমর্পণ।

    যদিও বাস্তব চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ভোম্বল স্ত্রীর জন্য চাকরির বিজ্ঞাপন খুঁজতে বসে, তবু তার মনের গভীরে বসে থাকা পিতৃতন্ত্র রাজত্ব চালাতে ভোলে না।

    এই ছবিতেও তিনটি নারী। আরতি, তার শাশুড়ি, যিনি পিতৃতান্ত্রিক ছাঁচে নিজেকে পিষে ফেলেছেন এবং আরতির কিশোরী ননদটি যাকে তার শিক্ষিত দাদা বলেন, আর পড়াশোনা করে কী হবে, সেই তো বউদির মতো হাঁড়ি ঠেলতে হবে। ডোমেস্টিক সায়েন্স! ব্যঙ্গ করেন দাদাটি। কিন্ত কিশোরী চায় বউদি ফিল্ম স্টার হোক। অনেক টাকা রোজগার করুক। এও বউদির মধ্যেই তার স্বপ্নপূরণ। সে জানে যে ফিল্ম স্টার হলে অনেক টাকা রোজগার করা যায়। আর হিন্দি ফিল্ম করলে আরো অনেক টাকা। অর্থাৎ এই ফ্রকের ওপর চাদর জড়ানো কিশোরীটির মনে মনে কোথাও অর্থ উপার্জনের তাগিদ আছে। সংসার সেটাকে চেপে দিতে তৎপর।

    শিক্ষিত বাঙালি পুরুষ। ষাঠের দশক। স্ত্রীর মানসিকতা। যখন রেঁস্তরাতে চা খেতে গিয়ে বন্ধুর স্বামীকে আরতি বলে, সে শখের চাকরি করছে। স্বামী ছ' মাস কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বড্ড ব্যস্ত, সময় পান না সামাজিকতার, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় আরতির মধ্যে পিতৃতন্ত্র ঢুকে আছে অনেকটা। আবার খানিকটা সে বেরিয়েও এসেছে। মহানগর এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণের ছবি। ভোম্বলের ব্যাঙ্ক ফেইল, আরতির বসকে অনুরোধ করে পঞ্চাশ টাকা মাইনে বাড়ানোর নীটফল, ভোম্বলের প্রতিক্রিয়ায়। অনিল ও মাধবী দুজনে দুদিকে পিঠোপিঠি বসে। মাধবীর মুখে অন্ধকার। অনিলের সংলাপ, স্বামীর সর্বনাশ। স্ত্রীর পৌষমাস। মাধবীর মুখে অন্ধকার ঘনীভূত।

    এর মধ্যেও দেখতে ভালো লাগে সোচ্চারে নয়। নিরুচ্চারে ঘটে যাওয়া এক প্যারালাল মেটাস্টোরি।

    এখনকার পরিভাষাতে যাকে বলে সিস্টারহুড। আরতির শাশুড়ি মাছের মুড়োটি ভাতের হাঁড়ির ঢাকনায় নামিয়ে নিয়ে এসে দেন অফিসযাত্রী পুত্রবধুর পাতে। এই শাশুড়ির চোখে জল এসেছিল আরতির চাকরির খবর পেয়ে। কিশোরী ননদটি, বাণী যখন বলে সে আর পড়বে না, অর্থাভাবের কারণে, আরতি বলে, তোকে শাড়িটা দেওয়াই ভুল হয়েছে। এই অনবদ্য ভগিণীভাব এইসময়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে চলেছে। আরতি ও তার স্বামী পাশাপাশি বসে ভাত খাচ্ছে মেঝেতে। মা পরিবেশন করছে। বাণী বলে ওঠে, তোমাদের দুজনকে খুব সুন্দর লাগছে। সেই বিয়ের পর যেমন খেয়েছে!

    অর্থাৎ এই সংসারে এতদিনে স্বামী স্ত্রী দুজনে পাশাপাশি বসে খায় নি আর এতদিন। সখ্য তৈরি হয় নি। মাস্টারহুড সৃষ্টি হয়েছে। সেটা ভাঙছে আরতির কাজে যোগ দেবার দিনে।

    সেইসময়ে পিতৃতন্ত্র মেয়েদের মধ্যে বৈপরীত্যর মডেল ও বিভাজন তৈরি করে সিস্টারহুডকে জায়গা দিত না। লিংগ রাজনীতির এও এক কৌশল। কিন্ত যা হবার তা হবেই। পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো মহানগর ছবিতে একটু একটু করে ভাঙতে থাকে। আরতির বস তাকে গাড়িতে লিফ্ট দেবার সময় যে কথোপকথন হয়, স্মরণ করি?

    আমার স্ত্রী এই বাইরের কাউকে লিফ্ট দেওয়া ঠিক পছন্দ করেন না। মেয়েদের একটু বাতিক থাকে তো। মানে যদি ইনফেকশন হয়ে যায়? মাসে তিন তিনটে ডেটল লাগে।

    এই কোভিড কালে উপরোক্ত সংলাপ বড় জরুরি। কিন্ত ধনী মানুষের স্ত্রীর পিটপিটানির স্নবারি আরতিকে হেসেই সহ্য করে নিতে হয় কারণ তার বাড়ি ফিরতে হবে।

    মনে রাখি, এটা সেই সময়ের ছবি যখন মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও ধনী, সকল সম্প্রদায়ের মেয়েরাই ছাপা শাড়ি বা ভয়েল পরতেন। কোনো পুরুষ গাড়ি করে কোনো মেয়েকে বাড়ি পৌঁছে দিলে সেটার কদর্থই করা হত। এখনো অনেক জায়গাতেই এই অভ্যাস রয়ে গেছে। সময় একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কখনো সে পাল্টায়। কখনো পাল্টায় না।

    এই সময়ে দাঁড়িয়ে মহানগরকে দেখতে হবে সময় বিচার করে।

    আরতি কী খানিকটা বিবেক? বটেই তো। তবে সে ঘরে বিদ্রোহিণী নয়। সত্যজিতের নারীরা কেউই বিদ্রোহিনী নন। আরতি সুশীলা। অনুগত। সে তো চাকরিতে ইস্তফা দিতেই গেছিল। নেহাত সেইদিনই তার বরের ব্যাঙ্কে তালা পড়ে। কাজ চলে যায়।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে মেয়েরা গৃহকোণ থেকে বেরিয়ে আসতো না। এইরকম একটি প্রবাদ কথিত আছে। এত পুরুষ যুদ্ধে গেলেন, ফিরলেন না অনেকে, কেউ ফিরলেন পঙ্গু হয়ে বা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে, যে মেয়েদের কাজের জগতে আসতেই হল। অর্থাৎ শুরুটা হয়েছিল বাধ্য হয়ে। শুধুমাত্র পুরুষের একক উপার্জনে যখন সংসার চলছে না অথবা পুরুষের কাজ থাকছে না, তখন নারী কর্মসংস্থান খুঁজছে। আরতি এইসময়টিকে রিপ্রেজেন্ট করছে।

    আরেকটি ভগিণীবৃত্ত কাজ করে এই ছবিতে। সে হল আরতির সহকর্মিণীরা। এবং এই সিস্টারহুডের প্রেক্ষাপটে উঠে আসে আরতির প্রতিবাদী চরিত্র। এডিথ সিমনস।

    মহানগরীর এডিথ একটি প্রতিবাদী মেয়ে।

    সে তার ন্যায্য দাবী চাইতে পারে। সে স্পষ্ট কথা বলতে পারে এবং তার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ব্যাকগ্রাউন্ড পরিচালক তুলে ধরেন সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে।

    স্বভাবতই এই চটপটে মেয়েটিকে কতৃপক্ষ পছন্দ করে না। তাদের পছন্দ আরতি। কারণ সে নরম। তাকে এক্সপ্লয়েট করা খুব সহজ। এডিথকে এক্সপ্লয়েট করা যায় না। তাকে বেতন হিসেবে পুরোনো পচা টাকা দিয়ে হিউমিলিয়েট করা যায়। এই সূক্ষ্ম দিকগুলো আরেক সত্যজিতের মাস্টার টেকনিক। চিরকালীন। অনবদ্য।

    তবে মহানগরের মাস্টার স্ট্রোক আরো আছে। যেখানে নারী প্রতিবাদী।

    হিমাংশু মুখার্জি যখন বাঙালি অবাঙালির বিভাজন তুলে স্পষ্ট বক্তা এডিথকে বরখাস্ত করেন, আরতি প্রতিবাদ করে। এডিথ কমিশন চেয়েছিল কারণ সে জানে যে অন্য কোম্পানির মালিক দশ পার্সেন্ট কমিশন দেন। তর্ক করে সে পাঁচ পার্সেন্ট কমিশন আদায় করে সেলস গার্লদের জন্য, যাদের শ্রমের বিনিময়ে হিমাংশু এসি কেবিনে বসেন। একাধিক গাড়ি মেইনটেইন করেন। এডিথ তার ন্যায্য দাবী চাইতে জানে। তাই এডিথ বিপজ্জনক। এডিথের চাকরি যায়। কিন্ত এডিথের সঙ্গে আরতির সম্পর্ক সিস্টারহুডের একটি নতুন দিক। আরতি বাংলা বলে। এডিথ ইংরিজি। তবু তারা বন্ধু। আরতির নতুন টাকার নোট। এডিথের পুরোনো। মালিকমহলের স্পষ্ট একপেশেমি। নারীদুটি সেই পিতৃতান্ত্রিক একপেশেমি ভেঙে নোট বিনিময় করে। প্রতিদানে এডিথ আরতিকে লিপস্টিক দেয়। আরতি ইতস্তত করে। সে জানে না ব্যবহার। তারপর লিপস্টিক লাগানো তার কাছে অপরাধ। এডিথ তাকে ঠিক সেই চিহ্নগুলো দেখায়, যেগুলো দেখিয়ে আরতি বুঝিয়েছিল সে বিবাহিতা। সিঁদুর সিঁথিতে। কপালে। ঠোঁটে লাল তবে কী দোষ করল?

    অথচ ভোম্বলের অসুবিধে হয়। স্ত্রীর রঙ মাখা বা কমিশন পাওয়া, এসব তার হজম হয় না। মেঘ গাঢ়তর।

    এই ছোট ছোট নির্মাণ অনেক বড় পরিবর্তন ইঙ্গিত করে।

    এডিথের জন্য আরতি যখন হিমাংশুর সঙ্গে তর্ক করে, ইস্তফাপত্র দেয় তখন সে বিদ্রোহিণী। তার স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি বলিষ্ঠ সে। অনেক ঋজু। আরতি সত্যজিতের বৃষ্টিতে ভেজা নারী। সে হারিয়ে যায় না কোনো অর্থেই।

    অরণ্যের দিনরাত্রি। শ্রীমতী জয়া ত্রিপাঠী। অপর্ণা। শর্মিলা অপুর সংসার থেকে শুরু করে সত্যজিতের ছবির হাত ধরেই ক্রমশ বড় হয়ে ওঠেন। এখানে আবারো দুটি বিপরীত ধর্মী নারী চরিত্র দেখি আমরা।

    বৌদি অপেক্ষাকৃত তরল। প্রগলভ। অপর্ণা মিতবাক। রিসার্ভড। অনেকবেশি বুদ্ধিমতী। সংবেদনশীল।

    ছবির শুরু থেকে বনবাংলোর চৌকিদারটি বলে চলে, তার স্ত্রী অসুস্থ। অথচ এই চারজন তুমুল যুবক তাদের খাওয়া, ব্রেকফাস্টে ডিম, নেশা ইত্যাদি নিয়ে মগ্ন। কেউ একবারও চৌকিদারের স্ত্রী কেমন আছেন জিজ্ঞেস করে না, ইচ্ছে করলে তারা ওষুধ পথ্যের ব্যবস্থা করতেই পারতো। সেটিও গুড়ে বালি। এই আত্মসর্বস্ব আধা ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালি পুরুষদের হারিয়ে যাওয়া নৈতিকতা অপর্ণা। যে মেয়েটি চৌকিদারের ঘরে উঁকি দেয়। কষ্ট পায়। এই নারীদুটিই আবার যুবকচতুষ্টয়কে আনরিজার্ভড বাংলো থেকে নিয়মমতো বিতাড়িত হওয়া থেকে রক্ষা করে। বলে ওঁরা আমাদের অনেকদিনের পুরোনো বন্ধু। নারী এখানে পুরুষের নৈতিক ও ব্যবহারিক জীবনের রক্ষাকর্তা।

    এই ছবিতেও একজন নারী, অপর্ণা অনেকটাই নীতিপুলিশের কাজ করে। যদিও জয়া ত্রিপাঠী যেভাবে খুব সহজে, অতি অল্প পরিচিত যুবকদের সঙ্গে প্রগলভ হয়ে যান, সেটা বিস্ময় উদ্রেককারী।

    জয়ার স্বামী বিদেশে আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর একটি পুত্রসন্তান আছে। তিনি যুবক চারটির সঙ্গে খুব সহজ হতে পারেন, একটি অভিজাত পরিবারের পুত্রবধু হবার সুযোগে। সমাজ তাঁকে সেই ছাড়পত্র দেয়।

    মেমোরি গেম খেলার সময় জয়া শতরন্চিতে যেভাবে শুয়ে পড়েন, সেটাই তাঁর চরিত্রকে অনেকটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। এমনকী বালিশ নেবার অলস ভঙ্গি। অপর্ণা যেখানে ভীষণ সোফিস্টিকেটেড, ফর্মাল, বালিশ নিয়ে কথার ফাঁকে ছোট্ট একটি থ্যাঙ্ক্যু দিয়ে তাঁর দূরত্ব বুঝিয়ে দিলেন, জয়া ততটাই ইনফর্মাল, যে ইনফর্মালিটি তাঁকে সিডাকশনের দিকে নিয়ে যায়। শতরন্চিতে শয়নভঙ্গি দিয়ে তার সূত্রপাত।

    জয়া যেভাবে একটি সদ্য পরিচিত যুবককে বাংলোতে নিয়ে এসে সিডিউস করেন, সেটি আমার কাছে অন্তত খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়। একদিনের পরিচয়ে জয়া এতটা উন্মুখ হবেন, এ বোধে সম্পৃক্ত হয় না।

    অথবা, হয়তো তিনি এতটাই যৌন কাতর যে সময়, স্থান কোনো ফ্যাক্টর নয় তাঁর কাছে। এমনকী বাংলো তখন একেবারে ফাঁকা নয়। পরিচারক আছে। জয়া তবু উন্মুখ। এবং হতাশ। অন্যদিকে অপর্ণা ততটাই সংযত।

    অসীম যখন তার হাত ধরে ফেলে, বলে, কলকাতায় কোথায় গেলে তোমার দেখা পাব? অপর্ণা বলে, হাতটা ছাড়ুন।

    অসীম কথায় কথায় "তুমি" তে নেমে এসেছে, অপর্ণা কিন্ত "আপনি" মেইনটেইন করে চলেছে, যদিও মেমোরি গেমে সে ইচ্ছাকৃতভাবে হেরেছে অসীমের কাছে। প্রথম থেকেই অপর্ণা একধরনের শহুরে, একেবারে টিপিক্যাল আর্বান সোফিস্টিকেশন তুলে ধরছে। তার কথা, পোশাক, তাকানো, মেডিটেশন রুম। অসীম যখন বলে, আপনাকে ঠিক বুঝতে পারলাম না, অপর্ণা উত্তর দেয়, সেটার কী খুব প্রয়োজন আছে?

    দর্শক হিসেবে আমার প্রশ্ন, একদিনের পরিচয়ে, এত বোঝাবুঝির আছেটা কী?

    অপর্ণার পরিশীলনের বিপ্রতীপে দুলির গ্রাম্যতাও কৃত্রিম। সাঁওতাল মেয়ে হলেই সে খুব সহজলভ্য, মহুয়ার নেশা, করবে এবং ডাকলেই পয়সার লোভে দেহদান করবে, এই কনসেপ্ট কী অতি সরলীকরণ নয়?

    আদ্যন্ত সত্যজিতের ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায়। এবং দুলিকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকে।

    সাঁওতাল রমণীর রিপ্রেজেন্টেটিভ কী দুলি?

    তাকে সম্ভোগ করা মেইনস্ট্রিম বাঙালি যুবকের বিনোদন? এবার একটি অন্য বিষয়ে তাহলে ঢুকতে হয়, যা নিয়ে একটি সম্পূর্ণ আলাদা নিবন্ধ লেখার পরিকল্পনা আছে।

    এই যে চরিত্রগুলি ছবিতে মেইনস্ট্রিমকে রিপ্রেজেন্ট করছেন তাঁদের নাম দেখুন।

    শ্রীযুক্ত ত্রিপাঠি। জয়া ত্রিপাঠি। অপর্ণা ত্রিপাঠি। অসীম চ্যাটার্জি। সঞ্জয় মুখার্জি। সকলেই ব্রাহ্মণ।

    শেখর সেন। বৈদ্য।

    হরি দাস। অব্রাহ্মণ। চার বন্ধুর মধ্যে সেই সবচেয়ে অপরিশীলিত বা সেইভাবে তাকে রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছে। সেই দুলির প্রতি আকৃষ্ট হয় ও শারীরিক সম্পর্ক করে। সঞ্জয় সিডিউসড হয়েও নিজেকে সংযত করে। অসীম প্রেমে পড়ে। কিন্ত হরি খেলোয়াড়। তাকে মোটা দাগের মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। কেন?

    এ কী জাতের বায়াসনেস নয়?

    পথের পাঁচালির হরিহর রায় ব্রাহ্মণ। ইন্দির ঠাকরুণ ব্রাহ্মণ কন্যা।

    দেবী। উচ্চ বংশজাত পরিবার।

    তিনকন্যা। অমূল্য পৈতেধারী।

    মহানগর। মজুমদার পরিবার।

    সীমাবদ্ধ। শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি। সুদর্শনা ভট্টাচার্য।

    নায়ক। অরিন্দম মুখার্জি। মিস সেনগুপ্ত।

    অশনি সংকেত। ব্রাহ্মণ পরিবার। চক্রবর্তী।

    তবে কী ধরে নেওয়া যায় যে তাঁর ছবিতে কেবল উঁচু জাতের অথবা প্রিভিলেজড জাতের নারীরাই সমাজের রোল মডেল? তাঁরাই সংযম, প্রেম, নীতিবোধকে রিপ্রেজেন্ট করেন।

    আপাতত এই বিষয়ের গভীরে ঢুকছি না। স্বতন্ত্র আলোচনা করবো।

    নীতিবোধ, মরাল পোলিশিং এর কাজটা তথাকথিত উঁচু জাতের মেয়েরাই করেন সত্যজিতের ছবিতে। (সদগতি ছবিটির কথা এখানে আনছি না। কারন তার কনটেক্সট সম্পূর্ণ আলাদা।)
    নায়ক ছবিতে মিস সেনগুপ্ত বা সীমাবদ্ধতে টুটুল, এঁরা সবাই মোটামুটি একটিই চরিত্রের এক্সটেনশন। এঁরা শিক্ষিত। উচ্চ বংশজাত। পরিমার্জিত। সংবেদনশীল। রুচিশীলা। নীতিপুলিশ।

    বস্তুত অরণ্যের দিনরাত্রির অপর্ণা, নায়কের মিস সেনগুপ্ত এবং সীমাবদ্ধর সুদর্শনার মধ্যে আমি কোনো ফারাক খুঁজে পাই না। তিনজন একটিই চরিত্র। একইরকম পরিমার্জিত ব্যবহার, সৌন্দর্য, এলিগ্যান্স, ঈষৎ আধো কথা, এবং উচ্চবর্গীয় শালীনতা, নৈতিকতার প্রকাশ। বাচনভঙ্গিতেও কোনো পার্থক্য নেই।

    সীমাবদ্ধতে যখন বড়দিদি ছোট বোনকে বলেন, তোকে দেখে আমি চিনতেই পারিনি, সুদর্শনা অবিকল অপর্ণার ভঙ্গিতে বলে, আগেও চিনতে পারতে কী?

    এই অপর্ণা, মিস সেনগুপ্ত বা সুদর্শনা আরেকটা স্টিরিওটাইপ। একটা শহুরে সৌন্দর্যের মাপকাঠি। শহুরে পরিশীলন এবং বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি যা কখনোই পিতৃতান্ত্রিক প্রথার বিরোধিতা করে না, বরং সাবমিশন আছে। সমর্পণ করে। একটু বুদ্ধিদীপ্তভাবে। এই মেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজতে পারত। সেই সম্ভাবনা ছিল। সুদর্শনা তার এক প্রেমিকের কথা বলেও বটে। কিন্ত ছবিতে কোথাও সে ততটা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে না যতটা সে হতে পারতো। কারণ গল্পটা সুদর্শনার নয়। গল্পটা শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জির। ঠিক যেমন আগন্তুক উৎপল দত্তর বা মনমোহন মিত্রর গল্প। গণশত্রু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বা অশোক গুপ্ত গল্প। নারী চরিত্রগুলি পুরুষের মানস প্রতিমা মাত্র।

    আমরা বাধ্য হই গুপিগাইন বাঘাবাইন বাদ দিতে। সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ বাদ দিতে। কারণ সেখানে নারীচরিত্র নেই বললেই চলে। হীরকরাজার দেশে, গুপি বাঘা ফিরে এলো ও বাদ রাখতে হচ্ছে একই কারণে।

    তবে গুপিগাইনের দুটি কথা বলতে হয়। দুটি বাক্যেরই রসবোধ প্রবাদপ্রতিম।

    এক। রাজকন্যা কী কম পড়িয়াছে? বলছেন সন্তোষ দত্ত।
    রাজকন্যা রসগোল্লা তুল্য। কম পড়লে আরেকটি আসলেই হয়। বস্তুমাত্র। মানুষ তো নয়।

    দুই। দাসী অত ফর্সা হয়? বলছেন রবি ঘোষ।
    কালো। সাঁওতাল মেয়ে দুলি হয়।

    প্রথমটি রসবোধের খাতিরে এবং দু মেনে নিলেও, দ্বিতীয় বাক্যটি, বারান্দায় দেখা দেওয়া মুখাবয়বের প্রেক্ষিতে মেনে নিতে পারি না এখন। কারণ সেটা একটা বিশ্রী সমীকরণ প্রকাশ করে।

    রাজকন্যা। অভিজাত। ফর্সা।
    দাসী। অনভিজাত। কালো।

    আগন্তুক ছবিতে মমতাশংকর আসেন। গৃহবধূ। সম্পূর্ণ গৃহবধু। এবং পিতৃতান্ত্রিক ছাঁচে ঢালা নারী। গণশত্রুর ডাক্তারের পত্নীর মতো। তিনিও সেই নীতি পুলিশ যিনি পুরুষের সন্দেহকে কাউন্টার করেন। মামাকে বিশ্বাস করেন মামা বলেই। আদর্শ গৃহিণী, যিনি বাড়িতে বিস্কুট তৈরি করা থেকে তানপুরা বাজিয়ে গান গেয়ে দিতে পারেন বিনা রেওয়াজেই। এখানেও বোসে মিত্রে বিবাহ সম্পর্ক। সুধীর বোসের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়ে অনিলা মিত্র অনিলা বোস হয়েছেন। ইন্টারকাস্ট বিবাহের ঝুঁকি নেই গল্পে। অনিলার শ্বশুরের তৈরি একটি প্রাসাদোপম বাড়ি আছে। বাড়ির সামনে বাগান। একজন ডমিনেটিং স্বামী আছেন যিনি পরপর অনিলাকে নির্দেশ দিয়ে যান, আগে জিজ্ঞেস করো, উইলের এক্জিকিউশনার উনি (শীতলবাবু) কী না। যদি হন, সে টাকা এখন কার কাছে আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অনিলা স্বামীর আদেশ মেনে ফোন করে যায়। প্রসঙ্গত শীতল বাবু মুখুয্যে। সাঁওতালদের সঙ্গে নাচে পা মেলানোর আগেও অনিলা সুধীর বোসের মুখের দিকে তাকায় এবং তাঁর প্রীত সন্মতি পেয়েই নাচতে শুরু করে। পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেম একেই প্রকৃত দাম্পত্যসুখ বলে থাকে।

    প্রতিদ্বন্দী কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশেষ রাজনৈতিক দোলাচলের সময়ে সিদ্ধার্থ চৌধুরীর গল্প। সিদ্ধার্থর মা'কে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। তিনি বা সর্বজয়া বাঙালি মায়ের রোল মডেল। কিন্তু সিদ্ধার্থর বোন টুনু চাকরি করে। অফিসের পরে বসের সঙ্গে বেড়াতে যায়। নাচ শেখে এবং তার স্বপ্ন সে মডেলিং করবে। স্বল্পবেশে মডেলিং করা সত্তরের দশকের পশ্চিমবঙ্গে ভীষণ নিন্দনীয় ছিল। কিন্ত এই মেয়েটি সাহসী। সিদ্ধার্থ মেনে নিতে পারে না। দাদা হিসেবে সে টুনুর তরফে সিদ্ধান্ত নেয় যে টুনু চাকরি করবে না। সে ধকল নিতে পারছে না। রোগা হয়ে যাচ্ছে। টুনুর বস বলেন তিনি সেটা দেখতে পাচ্ছেন না। দু' জন পুরুষ। একজন বাড়িতে। একজন অফিসে টুনুর ভাগ্য বা জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বসকে দেখে সিদ্ধার্থর প্রথম রিঅ্যাকশন, মনে মনে গুলি করে দেওয়া সেই অভিভাবকত্বের ছড়ি।

    সিদ্ধার্থর বন্ধু যে নার্স মেয়েটির কাছে তাকে নিয়ে যায়, যে মেয়েটির আরেকটি পেশা দেহব্যবসা সেই চরিত্রে অভিনয় করেছেন শেফালী। এই চরিত্রের নাম, পদবী জানা যায় না।

    টুনু ও শেফালী তাঁদের কথা, বডি ল্যাঙ্গোয়েজে "অন্য" নারী, যারা অনুগত, মাধুর্যময়ী নয়। তারা বোল্ড। দেহ সচেতনে। প্রয়োজনে দেহকে ব্যবহার করে। অতএব সিদ্ধার্থ তাদের নিয়ে খুশি নয়।সে পালায় এই মেয়েদের কাছ থেকে। তার দেখা হয় কেয়ার সঙ্গে। কেয়া মুখার্জি। জয়শ্রী রায়ের পরিবর্তে এখানে শর্মিলা থাকলেও অসুবিধে ছিল না। জয়শ্রী আরেকটু আরেকটু কম চেনা মুখ। আরেকটু সহজসুন্দর। সরল। কিন্ত প্যাটার্ন এক।সেই চেনা ছকের মেয়ে। সেই ছিপছিপে শরীরে ছাপা শাড়ি। ছোট হাতের ব্লাউজ। কলার বোন স্পষ্ট। হাতে ঘড়ি। কন্ঠস্বর মৃদু। নরম।

    ইটারনাল ফেমিনিন বলে পুংতন্ত্র যাকে প্রশংসার ছলে বন্দি করে।

    প্রসঙ্গত কেয়ার পদবী মুখার্জি।

    এবং শেষ ইন্টারভিউতে অপেক্ষমান সিদ্ধার্থর আগে যে কটি নাম ডাকা হয়, তা হল, চঞ্চল মুখার্জি। বিপুল চ্যাটার্জি। মিহির চক্রবর্তী। সৌমিত্র ব্যানার্জি।

    চাকরির বিজ্ঞাপনে কী লেখা ছিল, ব্রাহ্মণসন্তান ছাড়া আবেদন নিষ্প্রয়োজন?

    এই সমস্ত নারীই বৃষ্টিতে ভিজতে পারতেন। কিন্ত ভেজেন নি।

    সবশেষে বলব কান্চনজংঘার কথা।

    আবারও একটি অভিজাত পরিবারের দার্জিলিঙ সফরের কাহিনী।

    রায়বাহাদুরের নাম ইন্দ্রনাথ চৌধুরী। চৌধুরী পদবী দিয়ে আমরা জাত বুঝতে অক্ষম। তবে রায়বাহাদুরের খেতাব তাঁর কৌলীন্য ইঙ্গিত করে। তবে এইরকম একজন রক্ষণশীল মানুষ যখন ব্যানার্জির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন, তখন এটা স্পষ্ট যে জাত বিচার করেই করেছেন।

    তাছাড়া তাঁর শ্যালক জগদীশ চট্টোপাধ্যায়। এতদ্বারা প্রমাণিত যে পরিবারটি ব্রাহ্মণ। অতএব ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেম বেশ জাঁকিয়ে র‌য়েছে প্রথম থেকে।
    রেজিস্টান্স বলে যদি কিছু থাকে, তবে সেটি সবচেয়ে সবল ভাবে প্রতিষ্ঠিত উনিশশো একষট্টির এই সাদা কালো ছবিটিতে।

    রায়বাহাদুর এতটাই পিতৃতান্ত্রিক, যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেন, আই অ্যাম অপটিমিস্টিক। আই ডোন্ট লাইক গ্লুম। হাসছো না কেন? হাসো?
    এবং করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় জোর করে হাসি ফুটিয়ে তুললে, রায়বাহাদুর খুশি।

    প্রথম থেকে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে এক অদ্ভুত বিষন্নতা। দুশ্চিন্তা। এবং রায়বাহাদুরের ক্রমাগত ইনকোয়ারির পরে তিনি বলেন, তার (মণির) তো একটা মন আছে! অনি আর মণি এক নয় গো!

    একটা প্রতিরোধ আছে এই ছবিতে। কোনো নারীবাদের প্রসঙ্গ নয়। সেটা নেই। কিন্ত নির্লজ্জ, অবদমননমূলক পিতৃতান্ত্রিক প্রথার বিরোধিতা আছে। নীরবে। এবং মৃদুভাবে। সজোরে।

    রায়বাহাদুরের জেরা যখন শিবশংকর রায়কে ঘায়েল করছে, প্রোটোকল ভেঙে মণীষা অশোকের সঙ্গে আলাপ করে। প্রতিরোধ। যদিও মণীষা ইংলিশ ও প্রেসিডেন্সি, অশোক ইতিহাস ও বাংলা, মণীষার অগ্রসর হয়ে অশোককে ডেকে নেওয়ার প্রতিরোধকে স্বীকার করতেই হয়।

    মণীষাকে ব্যানার্জির সঙ্গে হাঁটার প্রশ্রয় দিয়ে রায়বাহাদুর স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান অন্যদিকে।

    ব্যানার্জি মণীষাকে নাম ধরে ডাকেন। মণীষা কিন্ত মি. ব্যানার্জির বলার ফর্মালিটি থেকে সরে না। প্রতিরোধ।

    ব্যানার্জি যখন তাঁর কর্মস্থলের বাসভবনের নির্জনতার কথা বলেন, মণীষা জিজ্ঞেস করে, আপনার একা থাকতে ভালো লাগে না? এও একধরণের প্রতিরোধ।

    অরণ্যের দিনরাত্রির অপর্ণা একা থাকতে ভালোবাসে। তার মেডিটেশন রুমে।

    এরপর ব্যানার্জি যখন ব্যানার্জি যখন বিলেতে মেয়েদের সঙ্গে তার খোলামেলা মেলামেশার কথা বলে, মণীষার মুখের চেহারা পাল্টে যায়। ইতিপূর্বে সে অশোকের সঙ্গে কথা অসমাপ্ত রেখেই চলে এসেছিল ব্যানার্জিকে দেখে। এবার তার দৃষ্টি বলে দেয় যে সে প্রতিশোধ নিচ্ছে। ব্যানার্জিকে ফেলে সে এগিয়ে যায় অশোকের দিকে। আবার।

    প্রথমবার মণীষা তার বাবাকে প্রতিরোধ করেছিল। এবার ব্যানার্জিকে।

    পিতৃতন্ত্র কী শুধু মেয়েদের ডমিনেট করে? নাহ্। দুর্বল মাত্রকেই ডমিনেট করে। কাজেই যে জগদীশ রায়বাহাদুর যখন জিজ্ঞেস করেন, ছেলেটি কেমন? তার উত্তরে বইয়ে মুখ গুঁজে বলেছিলেন, বেশ। বেশ ভালো পাখি (এবং এই উচ্চারণের বিদ্রূপ, পাখি ও ফাঁদের সম্পর্ক দর্শকের নজর এড়াতে পারে না) সেই জগদীশ ওদের তিনজনকে দূর থেকে দেখে বলেন, টু ইজ কম্পানি, থ্রি ইজ ক্রাউড এবং কায়দা করে অশোককে সরিয়ে নেন।

    ব্যানার্জির ক্রমাগত প্রশ্নকে বা বিবাহ প্রস্তাবকে মণি খুব সংযতভাবে রেজিস্ট করে, আমরা শুধু হাঁটতে পারি না? কোনো কথা না বলে?

    রায়বাহাদুরের স্ত্রীর মলিন মুখচ্ছবি। গান, এ পরবাসে রবে কে, এবং সর্বোপরি তাঁর দাদাকে বলা, মণিকে গিয়ে বলো তার মন যা চায় সে যেন তাই করে। এসমস্তই পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেমকে খন্ডন করে। ভীষণ মৃদুস্বরে। কিন্ত সজোরে।

    ঠিক যেমন পিতৃতান্ত্রিক প্রথার চাপে অণিমাকে বিবাহ করা পুরুষটি ক্ষোভ এবং দুঃখে মণিকে বলেছিলেন, মণি, এদিকে শোন। প্রেমে না পড়লে বিয়ে করিস না।

    মণি বৃষ্টিতে ভিজেছিল কিনা আমরা জানি না। কিন্ত সে মিস্ট ভালোবাসে।

    সে কুয়াশাতে ভিজেছিল।

    গণশত্রুর ডাক্তারকন্যা কিন্ত আরো বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। এই প্রথম তাঁর ছবিতে ইন্টারকাস্ট বিবাহ। গুপ্ত ও হালদার।

    এইপ্রথম একটি মেয়ে, চাকরি করতে কেমন লাগছে, তার উত্তরে বলে ওঠে, ভালো লাগছে। তবে মাসের প্রথমে মাইনেটা পেতে আরো ভালো লাগে।

    আরতির যোগ্য উত্তরসূরী। এই ইভোলিউশন ব্যতীত ফিল্মের উত্তরণ হয় না।

    মহানগর এবং কান্চনজংঘার মেয়েরা। তারা বড় কাছের। অণিমা। যে পুরোনো প্রেমিকের চিঠি লুকিয়ে রাখে, আবার মেয়েকে বলে, বাপিকে টা টা করেছো? মণীষা, যে ব্যানার্জিকে বলে, আপনি এত গয়না দিয়েছেন যে নিজেই ভুলে গেছেন। রায়বাহাদুরের গৃহিণী তাঁর মলিন বিষাদে গেয়ে ওঠেন, এ পরবাসে রবে কে হায়।

    আইরনি এইখানে যে ইন্দ্রনাথ চৌধুরি তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, দ্যাখো তো, তুমি মনের জোরে মেঘ কাটিয়ে দিতে পারো কী না!

    আশ্চর্য! তাই হল। ঐ বিষাদাচ্ছাদিতা নারী বলে উঠলেন, দাদা, তাড়াতাড়ি যাও, নইলে বড় দেরি হয়ে যাবে। মেঘ কাটালেন তিনিই। মেয়েকে সঙ্গী নির্বাচনের অগাধ স্বাধীনতা দিয়ে। তাঁর নিরুচ্চারিত মগ্ন বিষাদময়তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় তাঁর নিজের জীবনের বেদনাটুকু। প্রেমহীন দাম্পত্যসুখ। অথবা সমাজ যাকে প্রেম বলে তার পীড়ন। ব্যানার্জির ভাষায়, নিরাপত্তা থেকেও একধরনের প্রেম জন্মায়।

    মেয়েরা বড় দেরি করে ফেলে। সিদ্ধান্ত নিতে। কঠিন হতে। আজকের ছবিতে যে স্বাধীন নারীদের আমরা দেখি, তার বীজ বপন করে গেছেন সত্যজিত। একটি নির্মাণের আগে অনেক ভাঙার গল্প বলে গেছেন। গণশত্রুর যে ঋজু অথচ কোমল মেয়েটি খুব স্পষ্টভাবে কাগজের সম্পাদক হরিদাস বাগচীর প্রেমপ্রস্তাব বা মুগ্ধতা খারিজ করে, তার বাবার লেখা আর ছাপা হয় না, তার সূত্রপাত হয়তো আরতি। বা মণীষা। কিংবা এডিথ সিমনস।

    মনে রাখতে হবে, এই সমস্ত ছবি যে সময়ে নির্মাণ হয়েছিল তখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, টুইটার ছিল না। পার্লারে যেত না মধ্যবিত্ত মেয়েরা। তখন শপিং মলের অস্তিত্ব ছিল না যেমন ছিল না ল্যাপটপ, আইপড। পর্দা দেওয়া হত স্ট্রিংগের। একটু এদিক ওদিক হলে ঝুলে থাকতো। তখন ধনী, মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে মেয়েরা বাড়িতে শাড়ি পরতেন। মায়েরা শাড়ি পরতেন সাধারন করে। বাবা ধুতি। মেয়েদের মাথায় উঁচু খোঁপা ছিল ফ্যাশনেবল হবার শেষ কথা। মেঝেতে বসে খাওয়ানোর রীতি তখনো যায় নি। ধনীগৃহেও এসির আয়োজন ছিল না। সীমাবদ্ধতে শ্যামলেন্দু গর্বভরে শ্যালিকাকে তার কোম্পানির ফ্যান দেখায়। তার স্ত্রী দোলনচাঁপা দেখায় বাথরুমে জল গরম করার মেশিন। তখন ঘরে ঘরে গিজার থাকতো না।

    কয়েকটি ছবির কথা বাদ গেল। কাপুরুষ ও মহাপুরুষ। জনঅরণ্য। তাতে কিছু যায় আসে না।

    যা বলতে চাওয়ার তা হল, এই ছবিগুলির নারী চরিত্রের হাত ধরেই আজকের ছবির যথার্থ স্বাধীনতা নারীরা উঠে এসেছেন। একজন মহৎ চলচ্চিত্রকারের অবদান সেই বীজবপনে।
  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৯ মে ২০২১ | ৭৬৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বাতী রায় | 117.194.37.66 | ১১ মে ২০২১ ১৬:৫২105865
  • অনবদ্য বিশ্লেষণ। ডিটেইল্ড। 


    পড়তে গিয়ে  অনেক এলোমেলো ভাবনা মাথায় আসছে।  সেসব গুছিয়ে বলা কঠিন। 


    সব মিলিয়ে সত্যজিতের  আরতিকে মাথায় রেখেও বলি যে আমি সত্যজিতের ছবিতে মেয়েদের নিয়ে মাথা ঘামানোর যত চেষ্টা দেখি,  না ঘামানোর চেষ্টা দেখি বেশি। এত বেশি গন্ডী-বাঁধা  ব্যাপার স্যাপার কেমন দম আটকান লাগে !


    শুধু দেবী দেখে চমকে উঠি।  আমার মনে সত্যজিতের ব্যক্তি মানুষের যে ছবি আছে,দেবী সেটা ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। প্রায়  প্রতিটা ডায়ালগ  বুঝিয়ে দেয় যে উনি চাপটা খুব ভাল ভাবেই বুঝতেন। আর তখনই অজস্র প্রশ্ন জাগে তাহলে কেন ...   খুব কৌতূহল হয় একদিন প্রতিদিনের থিমে যদি সত্যজিত  ছবি করতেন, কীকরতেন কীভাবে করতেন!      

  • Prativa Sarker | ১১ মে ২০২১ ২৩:০১105874
  • অনেক গভীরে খনন চালিয়েছ। কাজটা খুব কঠিন, কারণ সত্যজিত কখনোই উচ্চকিত ভাবে বলেন না কিছু, বলেন ব্যঞ্জনাময় অথচ মৃদু স্বরে। সেই অনুচ্চ ন্যারেটিভের সব লেয়ার ছুঁয়ে গেছ লেখাটায়, খুব কঠিন কাজ সমাধা করেছ।

  • সম্বিৎ | ১২ মে ২০২১ ১১:৫২105885
  • এই নিয়ে লেখাটায় তিনবার এলাম। খুব পড়ার ইচ্ছে, কিন্তু কোন প্যারাগ্রাফ বিভাজন চোখে পড়ছে না, একটানা টানা একটা লেখা দেখে থমকে যাচ্ছি।

  • Anindita Roy Saha | ১২ মে ২০২১ ১৭:৩০105892
  • সমৃদ্ধ আলোচনা , গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ। সাগ্রহে পড়লাম। 


    একটা ছোট মন্তব্য করছি। 


    ডাক্তার অশোক গুপ্তের কন্যাটি প্রসঙ্গে মনেহয় একটু বেশি আশাবাদী হয়ে পড়া গেছে। মেয়েটি তেজস্বী বটেই। তবে এখনো অবিবাহিত এবং সে অর্থে সংসারী হয়ে ওঠে নি। মেয়েদের প্রকৃত ছবি ধরা পড়ে যখন তারা স্ত্রী এবং মা। সেখানেই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা , সমঝোতা এবং বশ্যতা স্বীকার। ভেবে নিতে ভাল লাগে যে মেয়েটি ব্যক্তিত্বময়ী ,বুদ্ধিমতী ও স্বকীয় থাকবে। তবে সেটা এখনই ধরে নেয়াটা বোধ হয় একটু বেশি আশাবাদী হয়ে যেতে পারে। 

  • সুপ্তি | 2605:6400:10:449:d588:761:3910:8268 | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২২:০৩498111
  • সত্যজিতের সিনেমায় নারীর ভূমিকা নিয়ে এত ভাল লেখা আগে কখনও পড়ি নি। সিনেমাগুলো দেখে এভাবে ভাবি নি। খুব ভাল লাগল। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন