• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • অর্ধেক আকাশ

    Sangrami Lahiri লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৪০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • অর্ধেক আকাশ~~পর্ব ১
    --------------------------
    আজ এই অগাস্ট মাসের ছাব্বিশ তারিখে, বুধবারে কাজের দিনে আমার ইমেলে হঠাৎ সকাল থেকে শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে গেল| কত ওয়েবইনার আমার সুমধুর বাণী শোনবার প্রতীক্ষায় আছে, কত অর্থনীতিবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, লাইফস্টাইল-বিশারদ আমার সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করতে চান, তার আর ইয়ত্তা নেই|
    প্রথমে ব্যাপারটা বুঝিনি| সক্কাল সক্কাল সবাই এতো খেপে উঠলো কেন? কী করেছি আমি?
    কিছুক্ষণ পর আমার কর্পোরেট প্রভুও অন্তর্জালে আমায় ট্যাগ করলেন| তাঁরা নাকি ধন্য হয়েছেন নাচবার জন্য আমায় সমান মাপের একটি উঠোন দিতে পেরে| আজ নাকি ওম্যান'স ইকুয়ালিটি ডে!
    আরো বোকা ব'নে গিয়ে পুত্রের শরণাপন্ন হলাম| সে তখন সবে এক কাপ কফি নিয়ে বসেছে| তার মতে আমি এদেশে বুদ্বুদে বাস করি – living in a bubble. চারদিকের হালহকিকতের কোনো খবরই রাখি না|
    কথাটা মিথ্যে নয়| সে এদেশে স্কুল-কলেজে গেছে, পপুলার কালচার নিয়ে অনেক বেশি ওয়াকিবহাল|
    ইমেল দেখে সে মন্তব্য করলো, "এতো বছর ধরে তুমি ছেলেদের সঙ্গে সমানে সমানে কাজ করেছো, এতদিনে তোমার প্রভুর খেয়াল হয়েছে যে তুমি সমান|"
    আমি অথৈ জলে|
    সে দয়াপরবশ হয়ে আমায় উদ্ধার করলো, "এদেশের কনস্টিটিউশনের সেই ঐতিহাসিক নাইন্টিন্থ অ্যামেন্ডমেন্ট হয়েছিল আজকের দিনে, মানে এই ছাব্বিশে অগাস্ট, উনিশশো কুড়ি সালে| আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে আমেরিকান মেয়েরা ভোটের অধিকার পেল| তারই সেন্টেনারি আজ, তাই জেন্ডার ইকুয়ালিটি নিয়ে এতো হৈচৈ|"
    আমি হাঁ, "একশো বছর পরে আমাকে আলাদা করে appreciate করছে? হঠাৎ এত আদিখ্যেতা? তাহলে একশো বছরে কিছুই এগোয় নি বল?”
    পুত্র হাসলো, "আচ্ছা মা, কলকাতায় যে এতবছর পড়াশোনা করেছো, চাকরি করেছো, তোমার জীবনের আদ্ধেকেরও বেশি কেটেছে তৃতীয় বিশ্বে| কোনোদিন কি তোমার মনে হয়েছে যে তুমি মেয়ে?“
    অবাক হই, "না তো? মনে করতেও চাই নি| স্কুলে, কলেজে, চাকরিতে ঢুকে কে ছেলে আর কে মেয়ে? কাজ খারাপ হলে একই রকম ধাতানি খেয়েছি| মেয়ে বলে কেউ কোনোদিন রেয়াত করে নি|"
    "ঐখানেই তো মজা| তোমরা যা বোঝোনি, এদেশের মেয়েরা তা হাড়ে হাড়ে টের পায়|"
    "তা বটে| শুনেছি এদেশে একই কাজের জন্যে ছেলে আর মেয়েদের আলাদা আলাদা মাইনে| এসব তো আমরা ভাবতেও পারিনে|" আমার সুচিন্তিত মতামত|
    পুত্র বললো, "চাকরি পর্যন্ত অতো দূরেও যেতে হবে না, তার আগেই স্কুল কলেজে দেখেছো কি 'ওম্যান ইন স্টেম' ক্যাম্পেইন? আমি এদেশে যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করি, প্রথম প্রথম খুব আশ্চর্য লাগতো| মেয়েদের সায়েন্স, অঙ্ক আর টেকনোলজি পড়াবার জন্যে এতো চেষ্টা? আমি তো বরাবর দেখেছি বাড়িতে সবাই সায়েন্সের লোক| তুমি রেডিওফিজিক্স পড়েছো, কাকিমা ডাক্তার| কোনোদিনই তো মনে হয়নি তোমরা খুব স্পেশাল? বাবা-কাকাও যেমন, তোমরাও তেমনি|"
    সায় দিলাম, "সে তো একশোবার| তোর দিম্মা-ই তো সারাজীবন সংসার করে স্কুলে পড়িয়ে এল| এ সব আমাদের কাছ খুব স্বাভাবিক|"
    পুত্র বললো, "তাই তোমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, এদেশের মতো প্রথম বিশ্বের মেয়েদের শুধু সমান অধিকার পেতেই কতখানি লড়তে হয়েছে |"
    বলেই বললো, "আমাদের পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্রফেসর ক্যাথির কথা তোমার মনে আছে মা?"
    খুবই মনে ছিল| পুত্রই বলেছিলো ক্যাথির কথা| সে এক কাহিনী|
    ক্যাথি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন| সেখানে পাঠ্যক্রম অনেকটাই উদারপন্থী| ক্যাথির অনেকদিনের সাধ আমেরিকার এই লিবারেল আর্টস কলেজে তাঁর ডিপার্টমেন্টে একটি গ্লোবাল ফেমিনিজম ক্লাস চালু করেন| কিন্তু যতবার তিনি প্রস্তাবটি পাড়েন, ততবারই নাকচ হয়ে যায়| পুরুষ সহকর্মী তো বটেই, মহিলা অধ্যাপকদেরও তাতে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় – “পলিটিক্যাল সায়েন্সে ফেমিনিজম এর ক্লাস মানে সময় নষ্ট|”
    ক্যাথি দমবার পাত্রী নন, লড়ে গেলেন, “ইউরোপের প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় ফেমিনিস্ট স্টাডির ওপর ডিগ্রি দেয় | আর আমরা সামান্য একটা ক্লাস চালু করতে পারবো না?”
    এবার উত্তর এলো, “তুমি যদি মেয়েদের অধিকার-টধিকার নিয়ে মাথা ঘামাতে চাও, তাহলে সরি, এ দেশটা তার জায়গা নয়| আমরা তেমন মেয়েদেরই পছন্দ করি যারা ভালো স্যান্ডউইচ বানাতে পারে|”
    এ পর্যন্ত শুনে আমি বাকরহিত হয়েছিলাম মনে আছে| তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বে জন্মেও এমন উক্তি আমি কোনোকালে শুনিনি|
    ক্যাথি অবশ্য হাল ছাড়েন নি, গ্লোবাল ফেমিনিজম ক্লাস সিলেবাসে ঢুকিয়েই ছেড়েছিলেন|
    ওই গ্লোবাল ফেমিনিজম ক্লাসে যে গুটি পাঁচেক পড়ুয়া এসেছিলো, তার মধ্যে পুরুষজাতির একমাত্র প্রতিনিধি ছিল - আমার পুত্র|
    ভোটাধিকারের একশো বছর পরেও ফেমিনিজম পড়াতে গেলে যে সব মন্তব্য শুনতে হয়, ক্যাথি তাঁর ক্লাসের পাঁচটি পড়ুয়ার সঙ্গে তা বড় দুঃখেই ভাগ করে নিয়েছিলেন|
    ক্যাথির ভক্ত ছিল পুত্র| ক্যাথিও তাকে একটু বিশেষ চোখে দেখতেন| হাজার হলেও ক্লাসে জেন্ডার ডাইভার্সিটি এনেছে সে!
    সেসব কথা মনে করে আমার সুচিন্তিত মতামত, "তৃতীয় বিশ্ব তাহলে মেয়েদের সমানাধিকারে এগিয়ে আছে বল?"
    পুত্র জোরগলায় বললো, "নিশ্চয়ই| ভেবে দ্যাখো না, শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারটুকু পেতেই কত লড়াই! সেই একশো বছর আগে যখন পৃথিবীতে স্প্যানিশ ফ্লুর মহামারী, তখন আমেরিকায় গুটিকয়েক মেয়ে - ওম্যান সাফরেজিস্ট - তারা ভোটের অধিকার চেয়ে লড়ে গিয়েছিল| ঠিক যেন আজকেরই ছবি, একশো বছরের ফ্ল্যাশব্যাকে|"
    বললাম, "অথচ দ্যাখ, ভারতে কিন্তু মেয়েদের ভোটাধিকার এসেছে স্বাধীনতারও আগে| উনিশশো উনিশ থেকে ঊনত্রিশের মধ্যেই পুরো কলোনিয়াল ভারতের মেয়েরা ভোট দিতে পারে, নির্বাচনে লড়তে পারে, সরকারে বা দলে উচ্চপদে থাকতে পারে| ইংরেজিতে যার নাম 'অফিস হোল্ড করা'| এসব পৃথিবীর বহু দেশেই তখন কল্পনাও করা যেত না|"
    "তুমিই তো বলেছিলে মা, স্বাধীনতার কুড়ি বছরের মধ্যেই ভারতে মহিলা প্রধানমন্ত্রী তাঁর কিচেন ক্যাবিনেট নিয়ে তৈরী ছিলেন| মোটামুটি একই সময়ে আরও দু'জন মহিলা বিশ্বের আরো দু'টি দেশের কর্ণধার| ইসরায়েলে গোল্ডা মেয়ার, শ্রীলংকায় সিরিমাভো বন্দরনায়েক খবরের কাগজে হেডলাইন| ভালো মন্দ বিচারে যাচ্ছি না, কিন্তু কত আগেই তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বে মেয়েরা সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত|"
    পুত্রের মনে আছে|
    "এ ছবি তো এখানে চোখে পড়লো না এখনো, কখনো সত্যি এমনটা হবে কী না তাই বা কে জানে| বাদ দে সে কথা| ভেবে দেখেছিস কি, একশো বছর আগে একটা প্যানডেমিকে এদেশের মেয়েদের ভোটাধিকার মিললো, আর একশো বছর পর আরেক প্যানডেমিকে আজকের দিনে আমি পেলাম woman appreciation!"
    পরিবেশটা একটু হালকা করতে চাইলাম| বড্ডো গুরুগম্ভীর হয়ে গেছে|
    পুত্র কিন্তু কান দিলো না, "জানো মা, সামান্য একটা ফেমিনিজমের ক্লাস চালু করতে চেয়ে ক্যাথির এই যে দীর্ঘদিনের লড়াই - তা আমাদের মনে খুব দাগ কেটেছিল| আমি বরাবর ভেবে আশ্চর্য হয়েছি, কোথা থেকে ক্যাথি পেয়েছেন এতো ধৈর্য, এতো সহনশীলতা? শেষে একদিন উত্তরটা পেলাম| ক্যাথির রক্তেই যে উত্তরাধিকার|"
    আমি উৎসুক, "কীরকম?"
    "সে এক লম্বা গল্প, পরের দিন বলবো| তুমি এবার কাজে ফেরত যাও| মিটিঙে না ঢুকলে তোমায় মেয়ে বলে কেউ ছেড়ে কথা বলবে বলে তো মনে হয় না| সে যতই আজ ওম্যান'স ইকুয়ালিটি ডে হোক না কেন|"
    বলেছে ঠিকই| গল্পটা বরং তোলা থাক পরের দিনের জন্যে|
    ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
    অর্ধেক আকাশ~~পর্ব ২
    --------------------------
    ক্যাথিকে মনে আছে নিশ্চয়ই? ক্যাথি মার্টিন, ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট| বৃহত্তর নিউইয়র্ক অঞ্চলের এক লিবারাল আর্টস কলেজে গ্লোবাল ফেমিনিজম ক্লাস চালু করতে লড়ে গিয়েছিল| বেশিদিন নয়, এই বছর কয়েক আগের কথা| সে ক্লাসে ছিল পাঁচটি পড়ুয়া| আর পুরুষজাতির হয়ে একমাত্র প্রতিনিধি ছিল আমারই পুত্র|
    সে ছিল ক্যাথির বিশেষ স্নেহধন্য| ক্যাথির সঙ্গে মিলে অর্গানাইজ করেছিল “In Your Shoes”| প্রতীকী ইভেন্ট| মেয়েদের জুতো পরে ছেলেরা হেঁটেছিল| জনান্তিকে বলে রাখি, পুত্রের পায়ের মাপে আমায় একটি লাল টুকটুকে স্টিলেটো কিনতে হয়েছিল সে সময়|
    মরিসটাউনের এক ক্যাফেতে গিয়ে তারা প্রায়ই লাঞ্চ খেত| আর অবশ্যই তার সঙ্গে দেশবিদেশের গল্প| সে গল্পের ভাগ আমিও একটু-আধটু পেয়েছি| তার থেকেই একটা - ক্যাথির জবানীতেই বলি|
    সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা কাজের শেষে ডক্টর সারা ব্রাউন সবে একটু বসেছে| ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল ছিটিয়ে ক্লান্ত শরীর কিছুটা স্নিগ্ধ হয়েছে| রাত হয়েছে| ডিনার শেষ| মাপা বরাদ্দ দুপিস রুটি, দু'টুকরো চিকেন, কফি| তিনটে টেবিল পেতে সার্ভাররা দাঁড়িয়ে আছে| লাইন দিয়ে একে একে চিকেন, রুটি আর কফি নিয়ে একসঙ্গে সার দিয়ে বসে খাওয়া| রাতটুকুই শুধু বিশ্রাম|
    এইসময় রাতের অন্ধকার খানখান করে বেজে উঠলো সাইরেন| ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে ওঠে সারা| দৌড়োয় হাসপাতালের দিকে| এক ঝাঁক মেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে পৌঁছে যায় যেখানে সার সার বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছে যুদ্ধে জখম হওয়া সৈন্যরা| আর বোমায় জখম সাধারণ মানুষ|
    ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা| মুহুর্তে সব আলো নিভিয়ে দেয়| নিশ্ছিদ্র অন্ধকার| বোমারু বিমান দেখতে পাবে না অন্ধকারে ডুবে থাকা আহত মানুষের আশ্রয়টিকে| রাতের অন্ধকার কেঁপে ওঠে মুহুর্মুহু বোমার শব্দে| আতঙ্কে বোবা সবাই|
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মরণপণ করে লড়ছে আটাত্তর জন আমেরিকান মেয়ে| ওরা সবাই ডাক্তার আর নার্স| আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফ্রান্সে এসে যোগ দিয়েছে যুদ্ধে| ওদের লড়াই মৃত্যুর সঙ্গে| যমের মুখ থেকে প্রাণ ছিনিয়ে আনার চেষ্টা|
    দক্ষিণ পশ্চিম ফ্রান্সের ছোট্ট একটি শহর লাব্যুয়ের (Labouheyre)| বোর্দো থেকে ট্রেনে ঘন্টা দেড়েক| সারা এই পথেই এসে পৌঁছেছে|
    নিউইয়র্কের কর্নেল মেডিক্যাল কলেজে পড়তো সারা| কলেজেই আলাপ রবার্ট মার্টিনের সঙ্গে| ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক পরিবারের ছেলে| সে আলাপ প্রলাপে পৌঁছতে দেরি হয় নি| সারা-র পরিবারও খুশি| দুজনে পাস করে বেরোলেই বিয়েটা হয়ে যাবে|
    কলেজের সিনিয়র ক্যারোলিনের সঙ্গে সারার খুব বন্ধুত্ব| ক্যারোলিন ফিনলে| অগাধ জ্ঞান, প্রচুর পড়াশুনো| সারা মুগ্ধ|
    ক্যারোলিন স্পষ্টবক্তা| প্রতিটি ব্যাপারেই তার সুচিন্তিত মতামত আছে| আর জোরগলায় সে মতামত ব্যক্ত করতেও তার দ্বিধা নেই| প্রতিবাদী বলে কলেজে তার খ্যাতি ও কুখ্যাতি - দুইই আছে|
    ক্যারোলিনের ঠিক উল্টো সারা| নরম-সরম, বাধ্য মেয়ে| নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারলেই যেন বাঁচে| প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কারোর চোখে চোখ রেখে কথা বলতেই তার প্রবল কুণ্ঠা, সংকোচ|
    এহেন নির্বিরোধী সারার সঙ্গে বিদ্রোহী ক্যারোলিনের মনের মিল দেখে অনেকেই অবাক!
    কয়েকমাস আগেই দেশের আঠাশতম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘটে গিয়েছে| উড্রো উইলসন দ্বিতীয়বারের জন্যে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন| ক্যারোলিন আর সারাদের অবশ্য ভোট দেওয়ার অধিকার নেই| মেয়ে যে! এদেশে মেয়েরা ভোট দিতে পারে না| প্রশাসনিক কোনো পদে মেয়েদের জায়গা নেই|
    ক্যারোলিন আর তার দুই বন্ধু মরিয়া হয়ে একটা চেষ্টা চালিয়েছিল| ভোট দেবার জন্যে হাজির হয়েছিল কাছের এলিমেন্টারি স্কুলে| সেখানে তখন প্রাইমারি ইলেকশনের ভোটিং চলছে| শ্বেতাঙ্গ পুরুষরাই শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারী|
    ক্যারোলিন আর তার বন্ধুরা সটান দাঁড়িয়ে পড়েছিল লাইনে| গলাধাক্কা জুটতে অবশ্য দেরি হয় নি|
    ক্যারোলিন সহজে ছাড়বার পাত্রী নয়| বোঝাতে গিয়েছিল যে সেও একটা মানুষ, আমেরিকান নাগরিক| দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার নিশ্চয়ই ভোট দেবার অধিকার আছে| দুদিন হাজতবাস হয়েছিল|
    সেই থেকে ক্যারোলিনের ধনুর্ভঙ্গ পণ, এদেশে মেয়েদের ভোট দেওয়ার অধিকার সে লড়াই করে ছিনিয়ে নেবে| বড় একটা অ্যাক্টিভিস্ট দলের সঙ্গে যুক্ত| নানা প্রতিবাদ মিছিলে হাঁটে, মিটিঙে যায়|
    কয়েকবার চেষ্টা করেছে সারাকে নিয়ে যাওয়ার| সারা লুকিয়ে থেকেছে| ক্যারোলিনের ওপর তার পূর্ণ সমর্থন| কিন্তু জনসমক্ষে যেতে প্রবল অনীহা|
    ইদানিং ক্যারোলিনএর সঙ্গে কেরির পরিচয় হয়েছে| কেরি চ্যাপম্যান ক্যাট| মেয়েদের অধিকারের জন্যে লড়ছে| ওম্যান সাফরেজ অ্যাসোসিয়েশনএর নেত্রী| কেরি আর ক্যারোলিন মিলে চেষ্টা চালাচ্ছে ডাক্তার আর নার্স মেয়েদের নিয়ে একটা ওভারসিজ হাসপাতাল খোলার|
    মেয়েদের ভোট দেওয়ার দাবী জানালে মাঝেমধ্যেই শুনতে হয় – “মেয়েরা কি দেশের জন্যে যুদ্ধে যায়? দেশের সেবা করে? তাহলে কেন মেয়েদের ভোটিং রাইট থাকবে?”
    তাই ক্যারোলিনের এখন পাখির চোখ যুদ্ধে যাওয়া - মিলিটারি সার্ভিস| ফ্রন্টলাইনে সে লড়তে চায়| এদেশে মানে আমেরিকায় সেটা সম্ভব নয়| মিলিটারিতে মেয়েদের জায়গা নেই| কিন্তু ইউরোপে আছে| বিশেষত, সেখানে এখন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে| ডাক্তার আর নার্সের দরকার সেখানে এখন অনেক বেশি|
    উনিশশো সতেরো সালের শেষের দিকে ডাক্তারী পাস করে সারা ঘোষণা করলো সে ফ্রান্সে যাচ্ছে| বিশ্বযুদ্ধে ডাক্তারী পরিষেবা দিতে|
    নরমসরম সারার এমন ঘোষণায় ব্রাউন পরিবারে আকাশ ভেঙে পড়লো| সারার বাবা ধর্মপ্রাণ যাজক| মা সংসারে নিবেদিতপ্রাণ গৃহবধূ| মেয়ের এমন সৃষ্টিছাড়া পরিকল্পনায় মর্মান্তিক শোক পেলেন দুজনেই|
    শুধু রবার্ট বলেছিল, সে অপেক্ষায় থাকবে|
    তারপর তো এই লাব্যুয়ের শহর| উনিশশো আঠারো সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আটাত্তর জন মেয়ে ডাক্তার আর নার্সের প্রথম দলটি এসে হাজির হলো সেখানে| কেরি চ্যাপম্যান ক্যাট, ক্যাটরিনা টিফ্যানি-রা ফান্ডরেইজিং করে তুললেন দু'লক্ষ ডলার| এখনকার হিসেবে যা তিন মিলিয়ন ডলারেরও বেশি| তৈরী হলো হাসপাতাল|
    ইউরোপে তখন মহামারী| স্প্যানিশ ফ্লুতে দলে দলে মানুষ মরছে| ঠিক যেন এখনকার মহামারীর ছবি| তার মধ্যে বিশ্বযুদ্ধের দামামা| মেয়েরা কিন্তু অকুতোভয়|
    “বলেছিলে না তোমরা, মেয়েরা যুদ্ধে গিয়ে দেশের সেবা করে না? এবার দ্যাখো আমরা যুদ্ধে যেতে পারি কী না| কেন ভোটের অধিকার দেবে না আমাদের?”
    দলে দলে এসেছিল তারা| যখন তখন বোমারু বিমান, এয়ার রেইড| তার মাঝে প্রাণ হাতে করে একদল আমেরিকান সাহসিকা নিজেরাই গড়েছিল তাদের একান্ত নিজস্ব হাসপাতাল| পৃথিবীতে আর কোথাও কি এমন উদাহরণ আছে? যেখানে গোটা হাসপাতালটাই তৈরী হয়েছে একদল ডাক্তার আর নার্স মেয়ের পরিশ্রমে? মনে হয় না|
    জুন মাসের মধ্যেই আমেরিকান মেয়েরা পঞ্চাশটা ব্যারাক তৈরী করে ফেলল| সাহায্য করল জার্মান যুদ্ধবন্দীরা|
    জুলাই মাসের মধ্যে শুধু লাব্যুয়ের শহরেই পাঁচশোটি বেড| দশহাজার আহত মানুষের চিকিৎসা আর শুশ্রূষা হতে থাকল|
    ওম্যান'স ওভারসীজ হাসপাতাল ফ্রান্সের উত্তরে আরো তিনটি শহরে একই রকম চিকিৎসাকেন্দ্র গড়েছিল| প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে পনের হাজার মানুষ চিকিৎসা পেতেন|
    সারা নিউইয়র্কে বাবাকে চিঠি লিখল - 'জানো বাবা, এখানকার সৈন্যদের কাছে আমরা খুব পয়া, lucky charm. আমাদের মতো ডাক্তার আর নার্স মেয়েদের ওরা কী চোখে যে দেখে! বিশ্বাস করে, আমরা একবার ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই ওরা ভালো হয়ে যাবে| আদর করে আবার নাম দিয়েছে - "মিলিয়ন ডলার"| আমি ওদের কাছে গিয়ে বুকে ক্রস এঁকে দিই, মনে মনে প্রার্থনা করি যেন ভালো করে তুলতে পারি সবাইকে|'
    সে চিঠি পড়ে নিউইয়র্কে বাবার চোখে জল|
    আহতদের চিকিৎসা চলছে পুরোদমে| এমন সময় জার্মানি থেকে সদ্য ছাড়া পেয়ে কয়েকজন ইংরেজ সৈন্য ভর্তি হল লাব্যুয়ের হাসপাতালে| তারা জ্বরে আক্রান্ত| ভয়াবহ স্প্যানিশ ফ্লু| | চিকিৎসাও নেই| ফ্লু ভ্যাকসিন তখনো বেরোয় নি| হাসপাতালের একদিকে আইসোলেট করে দেওয়া হল তাদের, সেবা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা চললো| কিন্তু সবরকম সাবধানতা সত্ত্বেও সংক্রমণ আটকানো গেল না| উইনিফ্রেড আর ইভা পড়লো জ্বরে| বাঁচানো গেল না| মহামারীর বলি দুই সাহসিকা| সংক্রমণের ভয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হল কোন অজানা জায়গায়|
    লাব্যুয়ের শহরের যুদ্ধকালীন চিকিৎসাকেন্দ্রের সবাই সেদিন চোখের জলে ভেসে বিদায় দিয়েছিল উইনিফ্রেড আর ইভাকে|
    যুদ্ধ শেষ হলেও সারা ব্রাউনদের কাজ শেষ হয়নি| রক্তাক্ত, আহতদের চিকিৎসা, সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলছিল তারা| যুদ্ধোত্তর ফ্রান্স, ইংল্যান্ড অন্তত একশজন আমেরিকান মেয়েকে সম্মান দিয়েছিল| সারাও ছিল তাদের মধ্যে| আমেরিকা তখনো চুপচাপ| যে সব মেয়েরা ভালো স্যান্ডউইচ বানাচ্ছে, তাদের নিয়ে কোনো অসুবিধে নেই| যত গন্ডগোল ওই সাফরেজিস্টগুলোকে নিয়ে! মেয়েদের অধিকার চায় - হুঁহ!
    আমেরিকান ওম্যান সাফরেজিস্টদের লড়াইটা ছড়িয়ে গিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ ছাড়িয়ে আরো অনেক অনেক গভীরে| মেয়েদের সমান অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকার, দেশের শাসনব্যবস্থায় অংশ নেওয়া - দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হয়েছে প্রত্যেকটির জন্যে|
    সারা ফিরলো দুবছর বাদে| উনিশশো কুড়ি সালে| ততদিনে কনস্টিটিউশনের নাইন্টিন্থ অ্যামেন্ডমেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে আমেরিকান মেয়েদের ভোট দেওয়ার অধিকার দিয়ে দিয়েছে| এক পা এগোনো গেল| এখনো অনেক পথ বাকি| কিন্তু এটুকুই বা কম কিসে?
    রবার্ট মার্টিন কথা রেখেছিল, অপেক্ষা করেছিল সারার জন্যে| নিঃশর্ত, প্রত্যাশাহীন অপেক্ষা|
    ফেরার পর দুজনে ঘর বেঁধেছিল, সুখের ঘর|
    অনেকক্ষণ একটানা বলে ক্যাথি থেমেছিল|
    পুত্র সেই সুযোগে জিজ্ঞেস করে, "ডক্টর সারা মার্টিন কি..."
    ক্যাথি মার্টিন কথা শেষ করতে দেয় নি, "হ্যাঁ, আমারই প্রপিতামহী|"
    দুজনেরই চোখ তখন চিকচিক করছে - ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়|
    ** Techtouchtalk এ প্রকাশিত
    *** সব চরিত্র সত্য, ইতিহাস থেকে নেওয়া| শুধু সারা ব্রাউনের নামটা বদলে দিয়েছি|
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৪০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আরও পড়ুন
কাঠাম - Rumela Saha
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Nirmalya Nag | 45.64.238.245 | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৩:৪৮97050
  • ভাল লাগল।  

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত