• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • তিব্বতে তথাগত (শেষ পর্ব)

    সৈকত ভট্টাচার্য
    বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৭ জুন ২০২০ | ৩০৮ বার পঠিত
  • (বলেছিলাম আর পোস্ট করব না। কিন্তু পাঠকের দাবিতে শার্লককে অবধি ফিরতে হয়েছিল। আমি তো চুনোপুঁটি। তাই প্রকাশকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পোস্ট করলাম। বই হলে জানাব সকলকে। সেখানে আরও কিছু সংযোজনের ইচ্ছা আছে।)

    । অন্ধকারের উৎস হতে।

    হাসপাতালের সামনের বড় রাস্তাটা পার হয়ে ছশো মিটারের মত হাঁটলেই দেখা মিলবে সমুদ্রের। গুগল ম্যাপ তাই বলল। ঘড়িতে এখন ভোর পাঁচটা। লকডাউনের বাজারে দিনের বেলাই রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেশ কম। এই অঞ্চলে অধিকাংশই আইটি বা সফটওয়ারের কোম্পানি। অফিস যাত্রীদের গাড়িতেই রাস্তা সকাল সন্ধ্যা ভরপুর থাকে। যেহেতু এখন সব বিলকুল বন্ধ, গাড়ির সংখ্যা সারাদিনে হাতে গোনা। কয়েকটা ভারি লড়ি শুধু গুমগুম করে শব্দ তুলে মাঝে মধ্যে চলে যায় আরো দক্ষিণে। এখন রাস্তা একেবারে সুনসান। শুধু সারি সারি হলুদ স্ট্রীট-লাইটের আলোতে একটা অদ্ভুত মায়াজগত তৈরী হয়ে আছে আমাদের সামনে।
    সন্ধ্যেবেলায় গল্পের মাঝে মঞ্জুশ্রীর ফোনে খবরটা আসা মাত্রই আমরা তড়িঘড়ি চলে এসেছিলাম হাসপাতালে। ওদের এন জি ওর সুরেশ নামে বছর বারোর একটি ছেলে ছাদ থেকে পড়ে গেছে। সবার চোখ এড়িয়ে ছাদে গিয়ে নাকি খেলছিল। ন্যাড়া ছাদ। পা ফসকে পড়ে গেছে। খুব বেশী উঁচু নয় যদিও। মাথা ফেটে গেছে। ওখানকার যে দুজন ভদ্রমহিলা ওদের দেখাশোনা করে তারা কী করবে বুঝতে না পেরে মঞ্জুশ্রীকে ফোন করেছে। মঞ্জুশ্রী ওদের শিগগির হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে আমাদের নিয়ে দৌড়েছে। সারা রাত হাসপাতালে বসে শুধু প্রার্থনা করেছি এই ছোট্ট ফুলের মত শিশুর যেন কিছু না হয়। ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের এক বিশাল শ্বেত পাথরের মূর্তির সামনে ছিল আমাদের বসার জায়গাটি। আর তার পাশের করিডোর দিয়ে গিয়ে অপারেশন থিয়েটার। একেই হাসপাতালের একটা বড় অংশ কোভিড পেশেন্টদের জন্য বরাদ্দ। আমরা যথাসম্ভব নিজেদের ঢেকে রেখেছি মাস্ক আর গ্লাভসের আড়ালে। রাতজাগার ক্লান্তি মাখা চোখের সামনে দিয়ে বারবার নার্স ডক্টরদের ছোটাছুটি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম এই কঠিন সময়ের মধ্যেও এই মানুষগুলির অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা।
    ছেলেটি সুস্থ আছে, বিপন্মুক্ত - এই খবর যখন পাওয়া গেল ঘড়িতে সাড়ে চারটে বেজে গেছে। জয়দা বলল, চল চা খাই।
    হাসপাতালের ক্যাফেতে বসে চা খেতে খেতেই ঠিক করা হল, সুরেশ যখন এখন ভাল আছে, ডাক্তারও আমাদের নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন - বাড়ি না ফিরে সমুদ্রের ধারে গিয়ে একটু সূর্যোদয় দেখে গেলে হয়না? কতদিন সমুদ্রের ধারে হাঁটিনা - কতদিন ভোর দেখিনা।

    পায়ের তলায় যখন বালির স্পর্শ পেলাম তখন আকাশের তারাগুলো একটা একটা করে বিদায় নিতে শুরু করেছে। এখানে বেলাভূমি বরাবর সিমেন্টের বাঁধানো বসার জায়গা করা থাকে। আমরা একটা বেঞ্চে ফুঁ দিয়ে বালি সরিয়ে বসে পড়লাম। সমুদ্রের হাওয়ায় মন ভাল হয়ে যায় খুব। মনের সকল গ্লানি ঘুচে গিয়ে বেশ একটা দার্শনিক ভাব জেগে ওঠে।
    পা দুটো মুড়ে গুছিয়ে বসে বললাম, জীবন কি অনিশ্চিত, তাই না? এই বাচ্চাটা খেলছিল সন্ধ্যেবেলায় - এখন মৃত্যুর সাথে যুঝছে।
    শুভও একটু উদাস হয়ে বলল, ওই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন না…
    তারপর কী বলেছেন সেটা বোধহয় মনে না পড়ায় চুপ করে গেল। এমন মোক্ষম ‘লেগ পুলিং’ এর সুযোগকে হেলায় ছেড়ে দিয়ে মঞ্জুশ্রী বা জয়দা যখন কিছু বলল না - আমি বুঝলাম এই সজল হাওয়ার স্পর্শে সবার আজ মন উদাসী। আমিও শুভকে আর না খুঁচিয়ে একটা লম্বা হাই তুললাম।
    জয়দা এবার যেন মহাকাশ থেকে নেমে এসে বলল, শান্তরক্ষিত নাকি পড়ে গিয়ে মারা গেছিলেন। অত্ত বড় পণ্ডিত - ভাব!
    অ্যাঁ। শুনেই আমার মুখ থেকে এই শব্দটাই বের হল।
    মঞ্জুশ্রী বলল, এত কাণ্ড করে বোন ধর্মের কাছে হার না মেনে বৌদ্ধ ধর্মকে জনমানসের মধ্যে প্রচারিত করে শেষে কিনা পড়ে গিয়ে মৃত্যু হল এই মহান পণ্ডিতের?
    অবশ্য খুনও হতে পারে! জয়দা ছোট্ট করে জবাব দিল।
    খুন! কে করবে খুন? কেনই বা করবে? পদ্মসম্ভব তো সবাইকেই বৌদ্ধধর্মের আওতায় এনে ফেলেছিলেন।
    নট ‘সবাইকে’। দেশের একটা বড় অংশ তখনও বোন ধর্ম পালন করে। শুধু তাই নয়, রাজসভার এক বড় অংশ ছিল চৈনিক বৌদ্ধধর্মের পক্ষে। ভারতীয় মহাযান আর চৈনিক মহাযানে ছিল তত্ত্বগত বিরোধ। চৈনিক বৌদ্ধধর্মের পন্থীরা মোটেই শান্তরক্ষিতের ধর্মপ্রচারকে ভাল চোখে দেখে নি। ফলে, বুঝতেই পারছিস যে শত্রুর সংখ্যা কম ছিল না!
    মানে, একেবারে ঘরে বাইরে শত্রু তো! - আমি বলি।
    মঞ্জুশ্রী সাধারণত যুক্তি সংগত প্রশ্ন করে থাকে। এবারও জয়দার কথা শুনে বলল, চৈনিক মহাযান কী করে আলাদা হল?
    বোধি লাভের উপায় সম্পর্কে রাস্তা খুঁজতে গিয়ে। দুই দল দুই পথে ভাগ হয়ে গিয়ে বোধির খোঁজে বের হয়েছিল। দুজনেই নিজের নিজের মত করে তার সন্ধানও পেল। কিন্তু যখন তারা দাবী করে বসল ‘আমিই সঠিক। ইহাই বোধি লাভের এক এবং অদ্বিতীয় উপায়’ তখন থেকে শুরু হল - তুই বেড়াল না মুই বেড়াল।
    কেন? এমন রাস্তাভাগের কারণ কী? - মঞ্জুশ্রী আবার জিজ্ঞেস করল।
    সঠিক ভাবে বলতে গেলে হয়ত দুই দেশের ইতিহাস এর পিছনে দায়ী। আমি দুদেশের সম্পর্কের ইতিহাস বলছিনা। আমি বলছি এই দুটি দেশ যে সম্পূর্ন পৃথক কিন্তু দুটি প্রাচীন উন্নত সভ্যতাকে ধারণ করেছিল - সেই সভ্যতার সমাজ ও দর্শনগত পার্থক্যই হয়ত, বৃহত্তর ভাবে দেখলে, এই বিবাদের পিছনে একটি ভূমিকা পালন করেছে।
    কিচ্ছু বুঝলাম না। - আমি সারেন্ডার করে বললাম।
    আচ্ছা। আমি এতদিন ধরে এতকিছু যে জ্ঞান বিতরণ করেছি - কেমন মনে আছে দেখি। বৌদ্ধধর্মের আগে এদেশের মানুষ কী ধর্ম পালন করত?
    হিন্দু? আমি উত্তর দিই।
    হ্যাঁ, সনাতন ধর্ম। উপজাতিরা হয়ত কিছু অন্যান্য ধর্ম পালন করত - কিন্তু মূলতঃ সনাতন হিন্দু বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবই সর্বাপেক্ষা বেশী ছিল। আর এই ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে আর সহ্য করতে না পেরে বুদ্ধদেব এক নতুন ধর্ম প্রবর্তন করলেন যেখানে দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ - অর্থাৎ একটা সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেন। কোন দেবদেবী নেই, মন্ত্র-ফন্ত্রের ঝামেলা নেই - শুধু কিছু সহজ নিয়ম মেনে সাধারণ জীবন যাপন। তাই তো? কিন্তু কালে কালে সে ধর্মের মধ্যে মন্ত্র-তন্ত্র, দেবদেবী পূজা পাঠ সব ঢুকে পড়ল। কেন?
    নইলে সাধারণ মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছিল না। ধর্ম পালন মানে একটা বড়সড় আয়োজন, উপাচারের অভাবটা সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য হচ্ছিল না। তাই দর্শন-টর্শনকে তাকে তুলে রেখে দেবতাজ্ঞানে বুদ্ধ এবং সমস্ত বোধিসত্ত্বদের পূজা পাঠ শুরু হল। - মঞ্জুশ্রী জবাব দিল।
    কারেক্ট। অর্থাৎ দুটি বিপরীতমুখী ধর্মকে আপোষ করে মাঝামাঝি আসতে হল শুধুমাত্র লোক টানার জন্য। নইলে ব্রাহ্মধর্মের মত একটি সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে গন্ডীবদ্ধ হয়ে থেকেই তাকে শেষ হয়ে যেতে হত। ঠিক সেভাবেই চীনদেশে যখন বৌদ্ধধর্মের প্রথম পদার্পণ হল - খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দী বা হয়ত তার একটু আগে - সেসময় চীনে জোরদার ছিল দুটি মতবাদ। একটি অতি প্রাচীন, তখনই প্রায় হাজার বছরের পুরনো টাওবাদ, আর একটি কনফুসিয়াসবাদ - কনফুসিয়াসের প্রবর্তিত। এই দুই মতবাদের কিছু সাধারণ জায়গা ছিল। সাধারণ মানুষ কীভাবে আরও ভালো করে জীবনযাপন করবে - সেটাই ছিল এই দুই মতবাদের লক্ষ্য। আর এরা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কথা বিশ্বাস করত। ঠিক যেমন হিন্দু ধর্মে মৃত্যুর পর স্বর্গে যাওয়ার ধারণা আছে। ওদের চোখে মৃত্যু মানে জীবনের শেষ নয় - বরং, একটি জীবন থেকে অন্য একটি জীবনে স্থানান্তরিত হওয়া। এবার বৌদ্ধ ধর্ম যখন চীনদেশে পৌঁছল তখন তাতে আছে নির্বান, বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি - এই সমস্ত দার্শনিক তত্ত্ব। চীনদেশের মানুষ সেসবকে টাওবাদের একটি প্রকার হিসাবেই গ্রহণ করল। তাদের চোখে গৌতম বুদ্ধ হলেন একজন বিদেশি ঋষি যিনি নির্বাণ লাভ নয় - টাওবাদ অনুযায়ী মৃত্যু পরবর্তী জীবনের পথে পা রেখেছেন। এভাবে বৌদ্ধধর্মের অন্যান্য ক্রিয়াকলাপকেও নিজেদের টাও অথবা কনফুসিয়াসের মত অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত করে নিলো। ফলে মহাযানী বৌদ্ধধর্ম নিজের আসল চেহারা থেকে সরে গিয়ে একটি দ্বিতীয় রূপ নিলো চীনদেশে গিয়ে।
    ঠিক যেমন তিব্বতে গিয়ে আরো অন্য একটা রূপ নিয়েছিল?
    হ্যাঁ। চীনদেশে গিয়ে যে নবরূপের জন্ম হল তাকে বলা হল ‘চ্যান বৌদ্ধধর্ম’। এই ‘চ্যান’ থেকেই পরবর্তীকালে ‘জেন বৌদ্ধধর্ম’ রূপ পায় এবং জাপান ভিয়েতনাম, কোরিয়া - এইসমস্ত অঞ্চলে প্রসারিত হয়। সে যাই হোক, মোদ্দা কথা হল চীনদেশে গিয়ে মহাযানী বৌদ্ধধর্ম যে রূপ ধারণ করল তা অনুযায়ী বোধি লাভ এক আকস্মিক প্রক্রিয়া। এর জন্য জীবনকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্য দিয়ে যাপন করার প্রয়োজন নেই। যদি বোধি লাভ হওয়ার হয় তা গৃহী বা সন্ন্যাসী যে কারোরই হতে পারে। অন্যদিকে ভারতীয় মহাযানী মার্গ বোধি লাভের জন্য ভিক্ষু জীবন যাপনের কথা বলে। তিব্বতে পদ্মসম্ভবের কৃপায় বোন ধর্মালম্বীরা যখন ব্যাকফুটে, বৌদ্ধধর্ম প্রসারিত হতে শুরু করেছে, সাম’য়ে বিহারের প্রতিষ্ঠা হয়েছে - তখন বৌদ্ধধর্মালম্বীদের নিজেদের মধ্যেই বিবাদের সূচনা হল। শান্তরক্ষিতের ধর্ম শিক্ষার বিরুদ্ধমত গড়ে উঠল চ্যান বৌদ্ধদের অবলম্বন করে।
    মানে সেই সময় থেকেই চীনেরা আমাদের সাথে কাঠি করে যাচ্ছে! - আমি ভেবেছিলাম শুভ বুঝি সমুদ্রের ঠাণ্ডা হাওয়ায় গুটিসুটি মেরে ঘুম দিয়ে নিচ্ছে। মন্তব্য শুনে বুঝলাম যে না, জেগেই আছে।
    ইতিহাস তো তাই বলছে! - অন্ধকারে জয়দার মুখে মুচকি হাসিটা অনুমান করে নিলাম। জয়দা আবার বলল, কিন্তু এই চৈনিক কাঠির জেরে জীবন গেল দুই বৌদ্ধ পণ্ডিতের।
    দুই? আর কে?
    আচার্য শান্তরক্ষিতের মৃত্যুকে যদিও বেনেফিট অফ ডাউট দেওয়া যায়। কিন্তু তার শিষ্য কমলশীল খুন হন।
    আবার খুন! এত রক্ত কেন! - মঞ্জুশ্রী শিউরে উঠে বলল।
    ইগো! ধর্মীয় ইগো। কমলশীল কেন খুন হলেন সেটা জানার জন্য সাম’য়েতে বিহার প্রতিষ্ঠার পরের কয়েক বছরের কাহিনী জানা প্রয়োজন। সম্রাট ঠিস্রোং দেচেন বিহার তৈরী হলে আচার্য শান্তরক্ষিতকে এসে বললেন, একটি বিহার পরিচালনার জন্য যে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন তা এদেশে এই মুহুর্তে একমাত্র আপনারই আছে। সুতরাং এই দায়িত্বভার আপনার সুযোগ্য হাতেই অর্পন করতে চাই। শান্তরক্ষিত সম্রাটের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। শুরু হয় দীক্ষাদান এবং শিক্ষাদান। তার সাথে আর একটি খুব প্রয়োজনীয় কাজ করেন। বিভিন্ন বৌদ্ধপুঁথির অনুবাদ কাজ। সেটা অবিশ্যি নিজে একা করেননি। তিব্বত, চীন, খোটান, ভারত - নানা দেশ থেকে বেশ কয়েকজন বৌদ্ধ পণ্ডিতকে আমন্ত্রণ করে সাম’য়েতে আনান। সেখানে সকলে মিলে সুবিশাল অনুবাদ কার্য শুরু করেন। বৌদ্ধসাহিত্য তিব্বতীভাষায় অনুদিত হয়েছিল বলেই আজ ভারতবর্ষের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারগুলি ধ্বংস হওয়ার সাথে সমস্ত বৌদ্ধসাহিত্য দর্শণ চিরতরে হারিয়ে যায়নি। কিছুটা অংশ বেঁচে ছিল তিব্বতের বিভিন্ন মঠে। শান্তরক্ষিতের কোনও বইএরই মূল সংস্কৃত সংস্করণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিব্বতে অনুবাদ পাওয়া গেছে। সেখান থেকে পরে ইংরিজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। তাই সাম’য়েতে বৌদ্ধধর্মের প্রচার কদ্দুর হয়েছিল জানি না - তবে তার চেয়েও এই অনুবাদের কাজটি আমার কাছে অন্ততঃ বেশী প্রাধান্য পায়। বই হল সময়ের দলিল। যাই হোক, সাম’য়েতে এই সমস্ত কর্মকাণ্ড যখন চলছে একদিন আচার্য এসে সম্রাটকে বললেন, হে রাজন্‌, সবই তো ঠিকঠাক হচ্ছে এখনও অবধি - কিন্তু আমি যে একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারছিনা।
    সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, কেন আচার্য? সমস্যা কীসের?
    সমস্যা অতি গভীরে। আপনাদের প্রাচীন বোনপন্থীরা হয়ত কিছুটা হলেও পিছনে সরে গেছে। কিন্তু আপনার রাজসভার এক বড় অংশ চৈনিক বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট। আমার দর্শন আর চীনদেশের বৌদ্ধ দর্শনের পথ ভিন্ন। ফলে এখানে ভারতীয় মহাযানের প্রচারের কারণে তাদের মনে একটি উষ্মার জন্ম হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এই মুহুর্তে আমার উপস্থিতিতে সেই ক্ষোভের আগুন হয়ত বাইরে থেকে বোঝা যাবেনা - কিন্তু আমার অবর্তমানে তার প্রবল আকার ধারণের সম্ভাবনা আছে। কীভাবে সামলাবেন তখন?
    সম্রাট বললেন, দেখুন হে আচার্য বোধিসত্ত্ব, আমি একটা কাজই করতে পারি - তা হল শাসন। আপনার অনুমতি নিয়ে আমি আজই দেশ জুড়ে আইন প্রণয়ন করছি - আচার্য বোধিসত্ত্বের মার্গই আমাদের মার্গ। অন্য মতবাদকে আমি স্বীকার করিনা। কিন্তু জোর করে, শক্তি দিয়ে হয়ত মানুষের ক্ষোভকে দমিয়ে রাখা যায়। মানুষের মনের ভিতর দ্বন্দ্ব দূরীভূত হয়না - তুষানলের মত তা ধিকিধিকি করে জ্বলতেই থাকে।
    সম্রাটের কথা শুনে শান্তরক্ষিত বললেন, আপনি আপনার রাজধর্ম পালন করবেন - তাতে আমার সহমত আছে। কিন্তু আপনার পরবর্তী সময়ে ওই তুষের আগুন যে দাবানলের চেহারা নেবেনা তার তো কোন নিশ্চয়তা নেই! আর আমাদের যৌথভাবে এই এত বছরের যে শ্রম ব্যয় করে গড়ে তোলা মহাবিহার, ভগবান তথাগতর শরণ - তার স্থায়িত্ব তো কয়েক দশকের জন্য হতে পারেনা! চিরকালের জন্য বন্দোবস্ত করে যাওয়ার দায়ও আমাদের উপরেই বর্তায়। সুতরাং আমাদের এ বিষয়ে ভাবনার প্রয়োজন।
    আপনার কী উপদেশ, আচার্য?
    জানিনা মহারাজ। যদি দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে উপস্থিত হয় - তার মীমাংসা হয়ত করতে পারি। কিন্তু সে বিতর্কের উত্থান যদি আমার অবর্তমানে হয়, সে মীমাংসা করার মত যোগ্য ব্যক্তি কে আছেন জানিনা। আপনার এ দেশে ভিক্ষু জ্ঞানেন্দ্র আছেন। যদিও তিনি সংসার রাজকার্যের ব্যাপারে সেরকম উৎসাহী নন - সব ত্যাগ করে তাপসের পথই তিনি বেছে নিয়েছেন। তবে ভারতবর্ষে আমার শিষ্য আচার্য কমলশীলকে আপনি আহ্বান করতে পারেন। তিনি এ ব্যাপারে আপনার সহায়ক হবেন নিশ্চয়ই।
    আচার্য, আমি কামনা করি আপনি চিরজীবী হয়ে আপনার নিজের হাতে আমাদের সুরক্ষিত রাখুন।
    শান্তরক্ষিত মৃদু হেসে বললেন, এই জীবন, এই আমি - সকলই অনিত্য, মহারাজ। নইলে যে আত্মার পরিশুদ্ধি হয়না।
    এর কিছুদিনের মধ্যেই আপাতভাবে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় শান্তরক্ষিতের মৃত্যু হয়।
    জয়দা একটানা বলে একটু থামল। মঞ্জুশ্রী বলল, তাহলে সাম’য়ে মোনাস্ট্রির কী হল?
    শান্তরক্ষিতের তিব্বতি শিষ্য বা পেলিয়াং হলেন নতুন অধ্যক্ষ। তিনি তার আচার্যের পথ অনুসরণ করেই অনুবাদ কাজ এবং ধর্মের প্রচার চালু রাখলেন। অন্যদিকে বা সালনাং সন্ন্যাস গ্রহণ করে সম্রাটের মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে লাসা ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু সমস্যা হল অন্যত্র। এই সমস্ত ধর্ম সংস্থাপন করার পাশাপাশি সম্রাট ঠিস্রোং দেচেনের যুদ্ধবিগ্রহ এবং রাজ্যবিস্তারে যে খামতি ছিল না - সে গল্প তো তোদের আগেই বলেছি। চীনের ট্যাং রাজাদের অধিকারে থাকা ডুনহুয়াং অঞ্চল এই সময় তিব্বতের দখলে চলে যায়।
    যেখানে সেই গুহার মধ্যে গ্রন্থাগার? - মনে পড়ল জয়দার আগের গল্প।
    ঠিক বলেছিস। সেই অঞ্চলে হেশাং মহেয়ান নামে এক চৈনিক বৌদ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি শান্তরক্ষিতের মতাদর্শের বিরোধী ছিলেন। প্রচার করতেন, ওইসব ধর্মপথে কাজ করে বা পুণ্যচর্চা করে বুদ্ধত্ব লাভ করা যায় না - কিচ্ছুটি না করেও একদিন আকস্মিক বুদ্ধত্ব লাভ করতে পার। এই সহজ পথটা তিব্বতিদের কাছে বেশ আকর্ষনীয় লাগল। ফলে বহু মানুষ হেশাং-এর দলে গিয়ে ভিড়তে লাগল। এই চীনা মহাযানীদের বলা হল তোনমুনপা। তোনমুনপাদের সাথে শান্তরক্ষিতের অনুগামীদের বিবাদ বেধে গেল। সম্রাট ঠিস্রোং দেচেন আইন করে শান্তরক্ষিতের প্রদর্শিত পথকেই অনুসরণ করার নির্দেশ দিলেন। তাতে মুশকিল হল তোনমুনপারা ধারাল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালাতে লাগল শান্তরক্ষিত-পন্থীদের। রাজা দেখলেন এরকম ভাবে তো চলেনা। গৃহযুদ্ধ বাধব বাধব করছে! তখন তিনি দূত পাঠালেন ভিক্ষু জ্ঞানেন্দ্রর কাছে। তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু জ্ঞানেন্দ্র তাদের সকলকে ফিরিয়ে দিলেন। রাজকার্যে তার আর ইচ্ছা নেই। তিনি এখন বোধি অর্জনের পথের পথিক। ক্ষুদ্র পার্থিব দ্বন্দ্ব, পঙ্কিলতা তাকে আর স্পর্শ করেনা। সব দৌত্য বিফলে গেল। রাজা পড়লেন মহা সমস্যায়। এই দুঃসময়ে কী করা যাবে? ভাবলেন শেষ চেষ্টা করা যাক। রাজার গৃহসচিব খাম্পাকে ধরে বললেন, তুমিই না’হয় কর না ভাই চেষ্টা। এই নাও আমার আদেশনামা আর শোন, ধরে যদি আনতে পার তাহলে যা উপহার পাবে তাতে তোমায় আর চাকরি করতে হবে না। আর যদি তাকে না নিয়ে আসতে পার তাহলেও তোমায় আর চাকরি করতে হবে না - কারন তোমার ধরের উপর ওই মুণ্ডুটাই আর থাকবেনা! খাম্পা পড়ল মহা বিপদে। মুণ্ডু গেলে খাবটা কি, মুণ্ডু ছাড়া বাঁচব না কি! - এইসব ভাবতে ভাবতে সাধের মুণ্ডুতে হাত বোলাতে বোলাতে রাজার আদেশপত্র হাতে ঘোড়া নিয়ে চললেন দক্ষিণে খারচু অঞ্চলে। সেখানেই আছেন বা সালনাং অথবা জ্ঞানেন্দ্র। যথাসময়ে জ্ঞানেন্দ্রর দেখা পেল খাম্পা। দেখেই একেবারে পায়ে ডাইভ দিয়ে পড়ে কেঁদে কেটে বলল, স্যার, আপনি আমার সাথে ফিরলে ভাল - দেশের মঙ্গল। কিন্তু না ফিরলে যে আমার ঘোর অমঙ্গল - তাতে সন্দেহ নেই। এবার আপনিই বলুন। জ্ঞানেন্দ্রর মায়া হল লোকটির প্রতি। বললেন, ঠিক আছে। এমনিতে আমার ফেরার কোন ইচ্ছা নেই। কিন্তু তোমার কথা ভেবেই ফিরব। ঘোড়া আন। জ্ঞানেন্দ্র ফিরে এসে সোজা রাজার সাথে দেখা করলেন। রাজা বললেন, এই তো অবস্থা - একটা উপায় বের করুন। আপনিই ভরসা। জ্ঞানেন্দ্র বললেন, দেখুন মহারাজ। এদের সাথে আমি একা তো পেরে উঠব না। আপনি বরং আচার্য বোধিসত্ত্বের উপদেশ মেনে কমলশীলকে আহ্বান করুন। আমি, পেলিয়াং এবং তিনি - সবাই মিলে হেশাংকে জব্দ করতে পারি।
    একটা লোককে জব্দ করার জন্য তিনজন এমন বাঘা বাঘা পণ্ডিত দরকার! এত বড় পণ্ডিত ছিল নাকি হেশাং? - মঞ্জুশ্রী জিজ্ঞেস করে।
    বড় পণ্ডিতের চেয়েও বড় কথা - তার লোকবল, জনসমর্থন। এমন অবস্থা হয়ে গেছিল যে প্রায় সব লোকই হেশাং-এর মতকে মানতে শুরু করেছিল। এই বিশাল জনসমর্থনকে পরাস্ত করা তো মুখের কথা নয়! অতএব দূত গেল কমলশীলের কাছে। তিনি রাজার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে দ্রুতগামী দূত এসে জানাল যে কমলশীল আসছেন। সম্রাট যারপরনাই খুশি হয়ে সাম’য়ে বিহারে বিতর্ক মঞ্চ প্রস্তুত করার আদেশ দিলেন। কমলশীল উপস্থিত হলে সেই বিতর্কমঞ্চে এক সিংহাসনে তাকে বসান হল। সাথে রইলেন জ্ঞানেন্দ্র, পেলিয়াং, বৈরচন এবং জ্ঞানেন্দ্রর স্ত্রী বা রত্না।
    জ্ঞানেন্দ্র তো তপস্যা করছিলেন। বিয়ে করলেন কবে? - শুভর প্রশ্ন।
    জয়দা চোখ পাকিয়ে বলল, পূর্বাশ্রম বলে তো কিছু ছিল নাকি! সে যাই হোক, এদের বিপরীতে রইল হেশাং আর তার দলবল। সম্রাট কমলশীল এবং হেশাং দুজনকেই ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেন, হে আমার প্রজাবৃন্দ, আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে যখন এই সমগ্র তিব্বত অপশক্তির প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়েছিল, আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভারতবর্ষ থেকে আচার্য বোধিসত্ত্বকে এখানে আমন্ত্রণ জানাই। আমার উদ্দেশ্য ছিল সদ্ধর্মের প্রচার এবং আপনাদের সকলকে ভগবান তথাগতর আশ্রয়ে আনয়ন। বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘ - এই ত্রিরত্নের স্থাপনা করার জন্যই এই সাম’য়ে বিহারের প্রতিষ্ঠা। আমি সেই কর্মে সফল। কিন্তু আজ আচার্য বোধিসত্ত্বর অনুপস্থিতিতে চৈনিক পণ্ডিত হেশাং মোহেয়ান তার মতাদর্শ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন, সেই মার্গ আচার্য বোধসত্ত্বের প্রদর্শিত পথের চেয়ে ভিন্ন। আমি আইন প্রবর্তণ করে আচার্য বোধিসত্ত্বের দেখান পথকেই সমগ্র তিব্বতি জাতির ধর্মপথ হিসাবে নির্দিষ্ট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার ফলে পণ্ডিত হেশাং-এর অনুগতরা প্রাণভয় দেখিয়েছেন আচার্যের মতালম্বীদের। আমি এই অরাজকতার বিরুদ্ধে। সমগ্র দেশে শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পণ্ডিত কমলশীল, যিনি আচার্য বোধিসত্ত্বের সুযোগ্য শিষ্য, তাকে আহ্বান জানিয়েছিলাম। আজ এই মঞ্চে আপনাদের আলোচনার মাধ্যমে নির্ণয় হোক তিব্বতের মানুষের ধর্মমার্গ - এটাই আমার ইচ্ছা।
    মানে, সিরিয়াসলি? মানুষ কোন ধর্ম দর্শনে বিশ্বাসী হবে - তার জন্য এত ঘটা করে এমন মহা বিতর্কসভা নাকি? - আমি বললাম।
    ‘ধর্ম’ কথাটার অর্থ জানিস? জয়দা জিজ্ঞেস করল।
    ধর্ম মানে রিলিজিয়ন। মানে, হিন্দু, ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ… - আর কী? - আমি ভেবে পেলাম না এই প্রশ্নের অর্থ কী!
    বুৎপত্তিগত ভাবে দেখলে ‘ধু’ ধাতুর সাথে ‘মন’ প্রত্যয় যোগ করে ‘ধর্ম’ শব্দের জন্ম হয় - যার অর্থ ধারণ করা। আমাদের এই মানব জীবন তো শুধু প্রবৃত্তি-তাড়িত নয়, তার সাথে সমাজ বা গোষ্ঠীর প্রভাব যুক্ত হয়। তাই মানুষের প্রয়োজন পরে কিছু নিয়ম মেনে এই জীবনকে অতিবাহিত করার। কে কী করবে - সেটা নিয়ে নানামুণির নানামত। তারফলেই সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ধর্মমতের। বুদ্ধদেবও এক নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখেই রাজসুখ ছেড়ে পথে নেমেছিলেন। আবার তার অনেক অনেক বছর পরে জর্জ হেগেল, কার্ল মার্ক্সও নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। এইসবই ধর্ম। এই সবকিছুই ধারণ করে মানুষ জীবনযাপন করে। যদিও বারবারই মানুষের কাছে ধর্মের সংজ্ঞার চেয়ে তা পালন বা তাকে রক্ষা করার প্রবণতাই বেশী হয়। বর্তমান পৃথিবীতে তার জ্বলন্ত প্রমাণ চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। আর আমি তিব্বতের যে সময়ের কথা বলছি তারা তো পূর্ন শিক্ষা পায়নি, তারা আধুনিকতার স্পর্শ, জ্ঞানের আলোর চরণধ্বনি সবে মাত্র শুনেছে। সুতরাং যাকে ধারণ করে সমগ্র তিব্বতের জনজাতির চরিত্র নির্ধারিত হবে - তার সঠিক পথ নির্ণয় তো প্রয়োজনীয় হবেই রে! অতএব, সম্রাট ঠিস্রোং দেচেনের আদেশ মাফিক বিতর্ক শুরু হল। প্রায় দিনদুয়েক ধরে এই বিতর্ক চলে। শেষ অবধি কমলশীলের কাছে হেশাং পরাজয় স্বীকার করে নেয়। তিব্বতের জনতার উপস্থিতিতে শান্তরক্ষিতের প্রদর্শিত পথ প্রতিষ্ঠা পায়। মোহেয়ানের অনুচরেরা অনেকে আত্মহত্যা করে। রাজা হেশাংকে তিব্বত থেকে চলে যেতে আদেশ দেন। হেশাং দেশ ছেড়ে চলেও যান। কিন্তু প্রতিশোধের স্পৃহা তার বুকের মধ্যে। লোক লাগিয়ে আক্রমণ চালায় কমলশীলের উপর। ধারাল অস্ত্র দিয়ে পণ্ডিত কমলশীলকে নৃশংসভাবে হত্যা করে তারা।
    উফ! এমনভাবে খুনোখুনি করতে পারে যারা, তারা নাকি আবার বৌদ্ধ! - মঞ্জুশ্রী মন্তব্য করল।
    আসলে কী জানিস তো, মঞ্জুশ্রী, আমার মনে হয় - অযথা রক্তপাত কোন ধর্মের নীতিই হতে পারেনা। যারা ধর্মের নামে রক্তপাত করে তারা আদতে কেউ সেই ধর্মকে মেনে চলেনা - সেই ধর্মও তাদের ধারণ করেনা। কমলশীল নিজের জীবন দিয়ে তিব্বতের বুকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠা করে গেছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের। পরবর্তীতে অনেক বন্ধুর পথের মধ্যে দিয়ে চলার পরেও সে ধর্ম আজ অবধি মানব ধর্ম হয়ে থেকে গেছে তিব্বতের মানুষের কাছে। সে ধর্মের আরও সূক্ষ্ম বিভাজন হয়েছে, অনেক মতামত তৈরী হয়েছে, কিন্তু কমলশীলের নির্ণয়কে অভ্রান্ত প্রমাণ করেছে বারে বারে। তিব্বতের রাজপরিবারে রক্তও ঝরেছে অনেক। যাক, এই ব্রাহ্মমুহুর্তে এইসব রক্তসিঞ্চনের কথা মনে করে আর মন কলুষিত করিস না। ওই দেখ আকাশ কেমন লাল হয়ে উঠছে।
    জয়দার গল্প শুনতে শুনতে এতক্ষণ খেয়াল করিনি কেউ। কখন যেন রাতের আঁধার তরল হয়ে গেছে। আমরা নিজেদেরকে বেশ স্পষ্ট দেখতেও পাচ্ছি। আকাশের তারারা সব ছুটি নিয়েছে। শুধু পশ্চিম আকাশে একও ফালি চাঁদ এখনও বিদায় নেয়নি। হয়ত অপেক্ষা করছে সূর্যের। দায়িত্ব হস্তান্তর করেই তার ছুটি। ধীরে ধীরে কমলা হতে থাকা পূর্ব দিগন্তের দিকে চেয়ে জয়দা বলল, মঞ্জুশ্রী, ওই গানটা জানিস? - অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো?
    মঞ্জুশ্রী ঢক করে মাথা নেড়ে গেয়ে উঠল -
    অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো
           সেই তো তোমার আলো।
    সকল দ্বন্দ্ব-বিরোধ-মাঝে জাগ্রত যে ভালো,
           সেই তো তোমার ভালো।
    পথের ধুলায় বক্ষ পেতে রয়েছে যেই গেহ
           সেই তো তোমার গেহ।
    সমর-ঘাতে অমর করে রুদ্র নিঠুর স্নেহ
           সেই তো তোমার স্নেহ।
    সব ফুরালে বাকি রহে অদৃশ্য যেই দান
           সেই তো তোমার দান।
    মৃত্যু আপন পাত্রে ভরি বহিছে যেই প্রাণ
           সেই তো তোমার প্রাণ।
    বিশ্বজনের পায়ের তলে ধূলিময় যে ভূমি
           সেই তো স্বর্গভূমি।
    সবায় নিয়ে সবার মাঝে লুকিয়ে আছ তুমি
           সেই তো আমার তুমি।

    । সমাপ্ত ।
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৭ জুন ২০২০ | ৩০৮ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • শেষ পর্ব | 98.114.105.164 | ২৭ জুন ২০২০ ১৮:৫৬94658
  • ধন্যবাদ
    বই বেরোলে পাঠের ইচ্ছা রইল। সন্ধান পাবো আশা করি।
  • বিপ্লব রহমান | 103.231.160.128 | ২৮ জুন ২০২০ ০৯:০২94672
  • বৌদ্ধ ধর্ম নানা আকার-প্রকারে বিকশিত হলো ঠিকই, গৌতম বুদ্ধের বিশুদ্ধ বাণী বা দর্শন বোধহয় নয়। 

    বইটির এক কপি বুকিং দিয়ে রাখলাম।

    ব্রোভো, সৈকত দা           

  • :|: | 174.255.132.144 | ২৯ জুন ২০২০ ০৪:১৭94702
  • কী ভালো! ক্কী ভালো!

    অনেক ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য।
    আন্তরিক নমস্কার জানবেন।
  • Atoz | 151.141.85.8 | ২৯ জুন ২০২০ ০৪:৪১94703
  • খুব ভালো লাগল।
    "ধৃ" ধাতু হবে না? ওই যে ধারণ করা, ওখানটায়, মনে হয় টাইপো হয়েছে।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত