• বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়।
    বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে।
  • আয়লা টুর এবং

    সুমন্ত এবং অরিজিৎ
    বিভাগ : বুলবুলভাজা | ১৪ জুন ২০০৯ | ১৩১ বার পঠিত
  • কোথাও গেলে, ফিরে এসে সেটা নিয়ে লিখতে হয়। এটাই নিয়ম। তার ওপর, সেই জায়গাটা যদি হয় "আয়লা'-য় ভেসে যাওয়া সুন্দরবন, তবে তো লেখাটা একটা মাস্ট ডু লিস্টের মধ্যে পড়ে যায়। তাই লিখছি। তথ্য খুব কমই জানি, তাই মূলত: যা দেখেছি সেটাই লিখবো। কোনো থিয়োরী থাকবে না। নিছকই একটা "আয়লা ট্যুর' ভাবতে পারেন। "ট্যুর'-টা শুনতে বা বলতে খুব খারাপ লাগলো, আমাদের সাধ্যমত "ত্রাণ' দিতেই গিয়েছিলাম তো, কিন্তু বিশ্বাস করুন, শেষপর্যন্ত যা দেখলাম, তাতে ঐ "ত্রাণ' নিয়ে যাওয়াটা নিজের কাছে দেওয়ার জন্য একটা অজুহাত ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না।

    বেরিয়েছিলাম গত শুক্রবার, মানে ৫ই জুন। আয়লা আসার দিন দশেক পরে। সকাল সাতটা পঁয়তাল্লিশের হাসনাবাদ লোকাল। শিয়ালদা থেকে। সব মিলিয়ে আমরা জনা বিশেক। সঙ্গে জামাকাপড়, ওষুধপত্র, চাল। পৌনে দশটা নাগাদ হাসনাবাদ। ওখান থেকে জ্যারিকেন ভর্তি খাবার জল তোলা হলো। ২০ লিটারের মোট দুশোটা জ্যারিকেন। মানে চার হাজার লিটার। দুটো বোট। একটায় আমরা জনা দশেক যাবো সন্দেশখালি, অন্যটায় বাকিরা। ওরা গেলো ভান্ডারখালি বলে একটা জায়গায়, কোন ব্লক মনে নেই। ওরা মেডিক্যাল ক্যাম্প করবে, তাই মূলত: ওষুধপত্র নিলো সাথে। আর জল। দু'হাজার লিটার। বাকিটা আমাদের সাথে। বোট চলতে শুরু করলো ইছামতি থেকে ডাঁসা নদীর দিকে। দুপাশে একই দৃশ্য। ভাঙ্গা বাঁধ, ভাঙ্গা বাড়ি, জলে ডোবা বাড়ি। কতক্ষণ পর খেয়াল নেই, বৃষ্টি নামলো। আবহাওয়া দপ্তর বলেছিলো, ফিয়েনা আসতে পারে। তখন আমরা মাঝনদীতে। প্রবল ঢেউ। জোর বাতাস বইছে, সাথে বৃষ্টি। মাথা ঢাকার কিছু নেই, ত্রিপল দিয়ে ঢাকা আছে সঙ্গে আনা জিনিষগুলো। এইসব হতে হতে-ই পৌঁছলাম ছোটো সেহারায়। আগেই লিখেছি, সন্দেশখালি ব্লক। তখন বোধহয় বাজে দুটো। ভাঁটা শুরু হয়ে গেছে। বাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে যে জল ঢুকেছিলো জোয়ারে, সেটা বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই বোট ভেতরে ঢোকাতে হলে অপেক্ষা করতে হবে পরের জোয়ারের জন্য, রাত নটা-সাড়ে নটা অবধি। এদিকে, আমরা যে বোটে এসেছি, সেটা তো ফিরে যাবে। তাই স্থানীয় একজনের নোকোতে কিছু জিনিষ নামিয়ে নেওয়া হলো। ঠিক হলো, রাত্রে সে নৌকো নিয়ে ভেতরে ঢুকে যাবে। চালের বস্তা, আর ব্লিচিং পাউডার নিয়ে আমরা গেলাম রায়পুর। সেও ডাঁশা নদীর ধারেই। নদীর একটা দিক দিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ছে কোথাও নতুন করে ছাওয়া বাড়ি, কোথাও একটা খাঁচামতো করে তার ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে নেওয়া। আসলে গোটা দ্বীপের মধ্যে বাঁধটাই সবচেয়ে উঁচু জায়গা, সবচেয়ে নিরাপদ। তাই যেখানে যতটুকু বাঁধ জেগে আছে, সেটাই সাময়িক আশ্রয়। সেখানেই বসত, গোয়াল, খেলার জায়গা, এমনকি, পার্টি অফিসও। পাশ দিয়ে বোট পেরিয়ে গেলেই সমস্বরে ডাক, যদি খাবার পাওয়া যায় কিছু। কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙেছে ওপরের দিকটা, মানে তলাটুকু আছে, আর কোথাও পুরোটাই ধুয়ে গিয়ে খালের চেহারা নিয়েছে। মাটির বাঁধ, কিছু কিছু জায়গায় তার ওপর একটা প্রস্থ ইঁট ফেলা, মানে যেখানে যেখানে "উন্নয়ন' হয়েছে আর কি। নদী তো সেটা বোঝে নি, ভাসিয়ে দিয়েছে সবটাই। যাই হোক, রায়পুরে নদীর ধারে কাদা প্রায় এক হাঁটু। কেউ কেউ নামলো, স্থানীয়দের হাত ধরে। কিন্তু ঐ কাদার মধ্যে চল্লিশ কেজির পাঁচটা বস্তা তো আমাদের কেউই নিয়ে যেতে পারবে না, তাই, ওখানকার মানুষেরা নিজেরাই নামিয়ে নিয়ে গেলেন। আমরা বোটে করেই ফিরে এলাম সেহারায়। ঢুকলাম দ্বীপটার ভেতরে। সামনের দুয়েকটা বাড়ি আস্ত আছে। সেহারা বাজারটাও। তার পাশেই স্কুলবাড়ি, আপাতত ত্রাণশিবির। শদুয়েক লোক আছেন ওটায়। দুপুরে খাওয়া ওখানেই। মুড়ি, আর চা। তারপর হাঁটা। কতখানি? বুঝতে পারিনি। দুদিকে বাড়ির কঙ্কাল দেখতে দেখতে, মোটামুটি ভাবে অক্ষত একটা রাস্তা দিয়ে এলাম নিত্যবেড়িয়া। তখন বিকেল হয়ে গেছে। চারদিকে প্রচুর "ফোটোজেনিক' দৃশ্য। কোনো বাড়িটা পুরো মুখ থুবড়ে পড়েছে, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে বাঁধানো তুলসীমঞ্চ, কোনো ধানের গোলা ভেসে রাস্তায় এসে পড়েছে, কিন্তু অক্ষত আছে তার তালাটা। রাস্তাটার ওপরে প্রায় ফুটচারেক উঁচু মাচা করে নতুন করে ঘর বেঁধেছেন অনেকেই। এই রাস্তাটা আসলে শহরে যাওয়ার রাØতা। বাকি রাস্তাগুলো? জিগ্যেস করলে উত্তর আসছে, ঐ যে গাছটা জেগে আছে, ওটার গায়ে ছিলো কুমোর পাড়ার শেষ বাড়িটা। তার পাশ দিয়ে ছিলো রাস্তা। পাড়াটা নেই। চাষের জমি নেই। রাস্তা নেই। শুধু জল। কোমর ওবধি, বা হাঁটু। হাত ধরাধরি করে হাঁটা। পায়ের তলায় এবড়োখেবরো ইঁটের টুকরো। সেটাই রাস্তা। কোথাও আবার সেটুকুও ধুয়ে গেছে। উপড়ে যাওয়া ইউক্যালিপটাস দিয়ে চলছে সাঁকো বানানোর কাজ। সরকারি উদ্যোগ না, বেঁচে থাকার উদ্যোগ। আমরা শহর থেকে গেছি, ত্রাণ নিয়ে, কাজেই আমাদের হাত ধরে, বা আক্ষরিক অর্থেই কাঁধে করে পার করে দেওয়াটা ওঁদের "দায়িত্ব'।

    সন্ধ্যের মুখে ফিরে এলাম আমাদের রাত্রিকালীন আশ্রয়ে। একজন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকের বাড়ি। পাশেই স্কুল, তথা "ত্রাণশিবির"। ভাঁটার সময় স্কুলের মাঠে জল হাঁটুর একটু নীচ পর্যন্ত। আর ঝড়ের দিন ছিলো একগলা। স্কুলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওঁরা। রাতভর। সকালে বৃষ্টি কমতে ছাদে আশ্রয় নেন। সেদিন থেকে ওখানেই। কোনো এক ক্যাথলিক মিশন থেকে দুপুরে খিচুড়ি পাঠায় কোনো কোনো দিন। আমরা যেদিন গেলাম, সেদিন পাঠায় নি। খাবার জলের জন্য টিউবওয়েল, জোয়ারে ডুবে যায়। সেই জলই হ্যালোজেন ট্যাবলেট দিয়ে খাওয়া। কাছেই এক ভদ্রলোকের বাড়ির গোয়ালে চাল চাপা পড়ে মারা গেছিলো চারটে গরু। দুটোর দেহ বের করা গেছে, বাকি দুটোর দেহ দশদিন ধরে আছে ওখানেই, জলের মধ্যে। জোয়ারের জল ঢুকলে সেই জল ছড়িয়েও যাচ্ছে চারদিকে। এভাবেই আছেন ওঁরা। কথা বলতে বলতেই রাত হলো, জল বাড়ছে। জোয়ারের জল কি ঘরের ভেতর ঢুকবে? ভয়ে ভয়ে আছি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে খেতে গেলাম স্কুলবাড়ির ছাদে, এককোমর জল পেরিয়ে। তখনই দেখলাম, আমাদের রাখা জিনিষপত্র নিয়ে নৌকো আসছে। নৌকো চলে এলো স্কুলবাড়ির কাছে। জিনিষ উঠলো স্কুলের ছাদে। পরেরদিন সবাইকে দেওয়ার জন্য জিনিষ গোছগাছ করে ফিরে আসতে আসতে শুনলাম একই ভাবে নাকি নৌকো নিয়ে এসেছিলো ডাকাতরাও। ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো কাছ থেকে শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়ে গেছে। ফিরে এসে দেখলাম জোয়ারের জল এসেছে বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত। রাতে আর জল উঠবে না। সাময়িক ভাবে নিশ্‌চিন্ত।

    পরদিন সকাল থেকেই দেওয়া হলো জামাকাপড় আর যা যা ছিলো। ওখানে কিছুক্ষণ থেকে যাবার কথা রায়পুরে। ওখান থেকে দু'জন এসেছেন নিয়ে যেতে। ওনারা বললেন যাবার মূল রাস্তাটা ভেঙে গেছে, একটু ঘোরাপথে যেতে হবে, সেটা ঠিকই আছে। মালপত্র উঠলো ভ্যানে। কিছুদূর পরপরই ভ্যান আটকে যাচ্ছে কাদায়, নেমে ঠেলতে হচ্ছে। এইভাবে একটু এগিয়ে ভ্যান দাঁড়িয়ে গেলো, আর যাবে না। এতক্ষণ জল ছিলো গোড়ালির একটু ওপর অবধি, এরপর সেটা হাঁটু ছাপিয়ে। এটা নাকি ভালো রাস্তা। ওতেই ওনারা সাইকেলে মাল চাপিয়ে এগোতে লাগলেন, আমরা আনাড়ির মতন কষ্টেসৃষ্টে এগোচ্ছি। রাØতায় পথ আটকালেন কয়েকজন। অভিযোগ, ত্রাণ যা আসছে সব যায় প্রধানের ঘরে, পায় না কেউ। রাম্‌কৃষ্ণ মিশনের খিচুড়ি এসেছিলো দিন কয়েক আগে, আবার সেদিন আসার কথা। এই অভিযোগ অনেক জায়গাতেই শুনতে হলো, যে ত্রাণ যেটুকু আসছে, তা মূলত:পাচ্ছে নদীর ধারের মানুষেরাই। ভেতরে পৌঁছচ্ছে না কিছু। ত্রাণ নেওয়া কে ঘিরে বচসাও হয়েছে কোথাও কোথাও। আসলে নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই মানুষ চাইছেন জমিয়ে রাখতে, যদি আগামীদিন কিছু না আসে। এটাতে ক্ষোভ জমছে যাঁরা পাচ্ছেন না তাঁদের। যাই হোক, যাঁরা পথ আটকেছিলেন, তাঁরা কিছুক্ষণ পর ছেড়েও দিলেন। কোথাও একহাঁটু, কোথাও এককোমর জল পেরিয়ে রায়পুর। ওখানে জিনিষপত্র বিলি করতে করতেই শুনছিলাম যে আগের দিন আমরা যে চালের বস্তা পৌঁছে নদীর ধারে, সেটা ওনারা এনেছেন যখন, তখন জন নাকের ওপরে। মাথার ওপর তোলা বস্তা ধরা দু'হাতে, মাঝে মাঝে উঁচু হয়ে নি:শ্বাস নেওয়া, আবার পথ চলা। এভাবেই মিনিট দশেক হেঁটে চাল নিয়ে এসেছেন ওঁরা। গেলাম একজনের বাড়ির ভেতরে। উঠোনে জল পেটের সমান। দাওয়াটা উঁচু। সেখানে আমরা বসতে না বসতেই চা এলো, সাথে বিস্কুট। "অতিথি ভগবান'। আমাদের মধ্যে যারা ঐ জল পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার সাহস দেখাতে পারেনি, তাদের জন্য চা গেলো বাইরেও। এখানে এই নিয়ে দ্বিতীয়দিন ত্রাণ এলো। অনেকেই আছেন, যাঁদের পরনের কাপড়টুকু বাদ দিয়ে আর কিচ্ছুটি নেই। এমনিতেই এই জায়গাগুলোয় উন্নয়নের দেবতার দেখা মেলেনা, তার ওপর এই বন্যা, রাতারাতি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন ওঁরা। সারাবছরের খাওয়ার ধান-চাল ভেসে গেছে, পচে গেছে। জমি নোনা হয়ে গেছে।
    এর পর কিভাবে বাঁচবেন ওঁরা?
    প্রশ্ন তো উঠে আসে আরো।
    এরপর কী করা হবে ? এরকম কেনো হল ?
    এসব প্রশ্নগুলো যতটা সহজ, উত্তর গুলো ততটা ঠিক ততটা স্পষ্ট নয়।
    তবে আমরা কিছু দেখলাম, কিছু শুনলাম, আর সেই মতন কিছু বুঝলাম।
    অভিজ্ঞরা যদিও বলে গেছেন "অভিজ্ঞতা নোপানুপি করে খুব বেশী এগোনো যায় না।' এগোনো না ই যাক, বসে বসে সেগুলো শোনাতে আর কি আছে !
    বাঁধ মেরামতির তেমন কোনো উদ্যোগ ই কোথাও আমাদের চোখে পড়®লোনা। অন্তত:, আমরা যেখানে যেখানে গেলাম, সেখানে।
    সবাই বলছিলেন যে ভরা কোটালের জল নেমে গেলে তবে হয়তো মেরামতিতে নামা হবে। আমরা যখন ফেরৎ আসছি, তখন সবে দুপুরের ভরা কোটাল শুরু হয়েছে, সেই জল মোটামুটি আরো দিনতিনেক থাকবে বলেই ওঁরা বলছিলেন।
    কিন্তু তা যে কতটা হবে, কীভাবে হবে তা নিয়েও জিজ্ঞাসাচিহ্ন ঝুলিয়ে দিলো নাপিতখালি, হোগলডুরির গ্রামবাসীদের অভিজ্ঞতা।

    নাপিতখালি। ভাটার আমরা যেখানে একটি সুদৃশ্য জলপ্রপাত দেখে এলাম, বাঁধ ছিলো সেইখানেই। শুনলাম। এও শুনলাম যে,বাঁধ সারাইয়ের কাজ আগেও হয়নি, এখনো বোধহয় করা যাবে না, কারণ পঞ্চায়েতের টাকা নেই।

    সোনাখালির কাছেই হোগলডুরি। এখানে বাঁধ মেরামতের প্রয়োজন ছিলো আয়লার আগে থেকেই। বাঁধের ধস সারানোর কাজ শুরু হয়েছিলো বিপর্যয়ের দিন পনেরো আগে। গ্রামের মানুষ নদীর সাথে যুদ্ধ করেই বাঁচেন, কিন্তু বরাত পাওয়া ঠিকাদার তাঁদের যথেষ্ট দক্ষ মনে করেন নি, তাই বাইরের শ্রমিকরা এসেছিলেন বাঁধ সারাতে, স্বাভাবিকভাবেই সরকারী রেটের থেকে কম মজুরীতে। তাও না হয় হচ্ছিলো, কিন্তু আয়লার পর থেকে আর কারুরই দেখা মেলে না। অনেকেই মনে করছেন বাঁধ পুরো ভেঙ্গে গেলে ঐ ঠিকাদার আবার নতুন করে প্রোজেক্ট পাবেন, তখন কাজ শুরু হবে, তার আগে নয়। গ্রামের মানুষ নিজেরাই চাইছেন হাতে হাত মিলিয়ে মেরামতির কাজ করতে, কিন্তু প্রয়োজনীয় কোদাল-বেলচা-ঝুড়ি অমিল। পঞ্চায়েতের কোনো উদ্যোগ নেই গ্রামবাসীদের প্রস্তাবিত "কাজের বিনিময়ে খাদ্য' প্রকল্পে। বেঁচে থাকার জন্যই লড়ছেন গ্রামবাসীরা।

    যাইহোক, এবার ফেরা। সেই একই রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে দেখলাম, যাঁরা আমাদের পথ আটকেছিলেন, তাঁরা কোথা থেকে চাল-গম দিয়ে বানানো খিচুড়ী জোগাড় করে এনেছেন, আমাদের না খাইয়ে ছাড়বেন না। পথে কোথায় খাবার পাবো তার ঠিক নেই, তাই ওখানে খেতেই হবে আমাদের, এই হলো ওঁদের যুক্তি। বোঝালাম, যে আমরা ফিরে যাচ্ছি এরপর, যেখানে যাবো, সেখানে লাইফ মানে স্ট্রাগল না, স্টাইল, কিন্তু কে শোনে। যাই হোক, কিছুটা আসার পর ভ্যানে করে এলাম কালীনগর, স্থানীয় শহর। (হাসনাবাদের পর এখানেই মোবাইলে সিগন্যাল পেলাম প্রথম।) সেখান থেকে নদী পেরিয়ে ন্যাজাট। তারপর ম্যাটাডোর চেপে ভ্যাবলা, ফের হাসনাবাদ লোকাল, শিয়ালদা', নিজের কমফোর্ট জোনে ফেরা।

    পুনশ্চ: ১), আমাদের সাথে অন্য যারা গেছলো মেডিক্যাল ক্যাম্পে, তারা শোনালো এক অদ্ভূত গল্প। গল্প হলেও সত্যি। সত্যি কিছু মানুষ কি করে কখনো পিঠ দিয়ে জল আটকে, কখনো বা টিনের চাদর দিয়ে ঢেউ ভেঙ্গে বাঁচিয়েছেন গ্রামকে।


    পুনশ্চ: ২), রায়পুরে কয়েকজনের কাছে শুনলাম ওখানে কি করে বাঁধের ভাঙ্গন ঠেকানো হয়, তার পদ্ধতি। ভাঙ্গন শুরু হতে দেখা গেলে একদল বস্তায় মাটি ভরেন, একদল ডুবসাঁতার দিয়ে সেই বস্তা নিয়ে ভরে দেন ভেঙ্গে যাওয়া জায়গাটায়। বাঁধের উল্টোদিকে তখন আরেকদল মানুষ হাতে হাত ধরে বুক দিয়ে ঠেকিয়ে রাখেন জলকে। এইবার সেসব করেও কিছু হয় নি।

    পুনশ্চ: ৩), ফিরে এসে একজন সিপিয়েম সমর্থককে বলছিলাম কি কি দেখলাম। যেই না বলেছি এই অবস্থার জন্য আয়লাকেই সব দোষ দেওয়াটা ঠিক হবে না, বাঁধ ইত্যাদি ঠিকমতো থাকলে এত সমস্যা হতো না, ব্যাস,চোথা কমন পড়ে গেছে! বাঁধ উঁচু করতে হবে, তার জন্য জমি চাই, বিরোধীরা নৈরাজ্য শুরু করেছে, জমি নিতে দেবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। সম্ভবত: উনি লেখাটা পড়বেন, তাই একটা প্রশ্ন করে রাখি। বিরোধীরা কবে থেকে এই জমি নেওয়ার বিরোধিতা করছেন? বাঁধগুলো কতদিনের পুরোনো?

    পুনশ্চ ৪), এসে শুনলাম, বাঁধ সারাইয়ের জন্য রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১৫ লক্ষ "অত্যাধুনিক বস্তা'র বরাত পেয়েছে। এই 'অত্যাধুনিক বালি' ঠিক কি জিনিষ বোঝা এখনো বোঝা না গেলেও এটুকু বোঝাই যায়, কারো সর্বনাশ হলে কারো পৌষমাস হয় বটে।

    এবং পুনশ্চ ৫):বাঁধ সারাইয়ের কাজ নাহয় হোলো, কিন্তু এতেই কি মিটবে সমস্যা? সুন্দরবনের এক-দেড়শো বছরের পুরোনো নদীবাঁধগুলোর। নদী বিশেষজ্ঞরা কিন্তু অন্য কথা বলছেন। সুন্দরবনের বহু দ্বীপে বাঁধ পড়েছে পলি জমার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই, তাই নদী তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়েছে। পলি জমে অগভীর হচ্ছে খাত, ভাঙছে পাড়। এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে, তা বুঝে উঠতে উঠতেই নদী ফের ফুঁসে উঠতে পারে, আবার ভেসে যেতে পারে গোটা সুন্দরবন। তাই কিছু করার আগেও অনেককিছু ভাবার আছে বাকি।

    জুন ১৪, ২০০৯
  • বিভাগ : বুলবুলভাজা | ১৪ জুন ২০০৯ | ১৩১ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • আয়লা | 14.139.221.129 | ২০ মে ২০২০ ২২:৪৩93511
  • রইল।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত