• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • এক মুঠো বেল ফুল

    Kallol Lahiri লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১১ মে ২০১৯ | ১৭৪ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • বিজয় কাকুদের বাড়িতে প্রকান্ড একটা জামরুল গাছ ছিল। তার গুঁড়িটা এতো মোটা ছিল যে সেখানে ভর দিয়ে ওঠা দুঃসাধ্য। পাড়ার কেউ কেউ ছিল যারা অনায়াসেই সেই দুঃসাহসের কাজটা করে ফেলতে পারতো। গরমের ছুটি পড়লে আমাদের খেলার জায়গাটা ছিল ওই জামরুল গাছের তলায়। চক্কোত্তিদের পুকুরের পাশে। রাঙার আম গাছের ছায়ায়। কাজেই আমের বোল আসা থেকে শুরু করে জামরুলের প্রথম ফুল, ছোট ছোট সবজেটে কচুরিপানার নীচে তেলাপিয়াদের ঝাঁক এই দেখে গরমের ছুটি দিব্বি কেটে যেত। ভরা কোটাল আর মরা কোটাল উপেক্ষা করে গঙ্গায় ঝাঁপানো চলতে থাকতো নিয়ম মতো। যতক্ষণ না চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির লোকেরা এসে গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে চিল চিৎকার ছেড়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। শুধু বাড়ি ফেরাটা আর তখন বাড়ি ফেরা থাকছে না। লু লাগা দুপুরে ভাতের প্রথম পাতে থাকছে কলমি শাক। মণির হাতে তৈরী ঝাঁঝালো কাসুন্দি। আর শেষ পাতে টক ডাল। ঘামাচিতে নাইসেল পাওডার। আর ঠিক দুপুরে কারেন্ট অফ। পাশের কামাক্ষা কার্তিক স্মৃতি পাঠাগারে তখন ম্যানড্রেক, অরণ্যদেব, বাহাদুর, হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে। আরও একটু বড় হলে ফেলুদা, তোপসে। গোঁফের রেখায় ডেবোনিয়ার। বিকেলে রাসবাড়িতে রাধারমণের মন্দিরের বৈকালি খাওয়ার জন্য হা-পিত্তেশ করে বসে থাকা। তরমুজ, মুগডাল ভিজে, শসা, মিছরির ডেলা। শিবের মাথায় টিপ টিপ করে ধারা জল। সন্ধ্যে বেলায় অনিচ্ছার ছুটির পড়া। মনে মনে দুই শালিককে বলা আজ যেন আবার কারেন্ট অফ হয় বাবা। তাহলে চার ডবল পেন্নাম ঠুকবো তোমার পায়ে। হঠাৎ পাওয়া তাল শাস। কিম্বা কলাপাতার ডোঙায় ফলসা। ছন্দা সেনের খবরে ভারী বৃষ্টিপাতের স্বপ্ন নিয়ে ঘুমোতে যাওয়া। অনেক ভোরে পাপ্পুদের বাড়ির সামনে মনোরঞ্জনের কয়লা গোলায় কেরোসিনের লাইন দিতে গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া দুটো পাকা বেল। হঠাৎ ছুটিটা নিমেষে শেষ হয়ে যাওয়া। কে সি নাগের অঙ্কের পিতা পুত্রের ততক্ষণে চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার। এই যে ধারাপাতের রোজ নামচা হঠাৎই মনে পড়ে যাওয়া তার একটা সূত্রপাত অবশ্যই আছে। সে কবেকার লু লাগা দুপুরের প্রত্নখনন নিশ্চই এখন আর মেলে না। না মেলানোটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেটা হঠাৎই মিলে যায় সেটা হল বাজার। নানা জায়গা থেকে আসা মানুষ গুলো। তাদের আশে পাশের গাছ গুলো। তাদের মুখের হাসি গুলো। বাজারের গন্ধ গুলো। মনে করায়, ফিরিয়ে দেয় স্মৃতি। সেই বাজার আমাকে ফিসফিস করে চেনায় শীতের ফসল। গরমের ফসল। বর্ষার ফসল। মনে করায় আমার শৈশবকে। আমার বেড়ে ওঠাকে। আমার চারপাশে ঘুমিয়ে থাকা, জেগে না ওঠা গল্প গুলোকে। আজ যেমন হঠাৎই তপন কাকুর কাছে পাঁচশো গ্রাম কুড়ি টাকায় পাওয়া কোষ্ঠ জাম্বুল গুলোকে দেখে থমকে গিয়েছিলাম। এই জাম্বুল তো চুরী করতাম আমরা। ঢিল মেরে পাড়া হতো। গাছে উঠতে পারলে অপেক্ষায় থাকতো কাঠ পিঁপড়ে গুলো। একবার কামড়ালে ঢিবির মতো ফুলে উঠতো হাত-পা। সেই জাম্বুল এই ভরা বাজারে এলো কোত্থেকে? দোকানী জানালো গেরস্থ বিক্রি করেছে ছেলে পিলের জ্বালায়। আমরা কি কম জ্বালাতন করেছি বিজয় কাকুর বাড়ির লোকদের? কি জানি আছে কিনা গাছটা এখনও? বাজারের গলিতে বসে মালতী মাসি। তার কাছে পাওয়া গেল মাটিতে পড়ে ফেটে যাওয়া পাকা বেল দুটোকে। শেষ বাজারে যার বাজার দর জোড়া কুড়ি টাকা। মিষ্টি কিনা না জেনেই রহমত চাচা বাজারে নিয়ে এসেছে ষাট টাকা কিলো হিমসাগরকে। ফোঁপড়া ওঠা দুটো ভাঙা নারকোল আর কচুর শাক নিয়ে বসে আছে আর এক মাসি। তারকেশ্বর থেকে আমদানি হওয়া তরমুজ গুলোর এলাকায় চাহিদা অনেক। অনেক দিন ধরে বাজারে ভোলা ষাঁড়টাকে দেখা যাচ্ছে না। ভোটের বাজারে সেও হয়তো ব্যস্ত। না এবারেও বাজারে ফলসা খুঁজে পাইনি। যদিও সময় এখনও ঢের আছে তার। ‘বাজার সফর সমগ্র’ নামের এক মহাকাব্যিক উপাখ্যানে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় দাবী করেছিলেন কোন এক বাজার দেখা মানে কোন এক সভ্যতার অন্দরে উঁকি দেওয়া। সেই বাজার যদি উত্তরপাড়া হয়...বাঁশদ্রোনী হয়...দমদম কিম্বা নাগের বাজার হয়...বালীর স্টেশন এবং বালীর বাজার হয়...আড়বেলিয়ার যদি বেনে পাড়ার বাজার হয়...শিবহাটির সেই কবেকার বুড়ো গাছের তলার বাজার হয়...আরও যেগুলো আমার দেখা হয়নি...যেগুলো দেখা হবে...কিম্বা না হওয়া থেকে যাবে...সেগুলোর গল্প গুলো লু হাওয়ার সকালে বইতে থাকে। ফলসার জন্য আবার যে আমাকে অনেকবার বাজারে আসতে হবে মনে করিয়ে দেয় বর্ধমান থেকে শাক বিক্রি করতে আসা এক দিদা। তার কাছে আজ আমার উপরি পাওনা এক মুঠো বেল ফুল।
  • বিভাগ : ব্লগ | ১১ মে ২০১৯ | ১৭৪ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | 670112.220.234512.90 (*) | ১২ মে ২০১৯ ০৯:৪৭48208
  • সুন্দর যথারীতি।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন