এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  অন্যান্য

  • কারাগার, বধ্যভূমি ও একঝাঁক স্মৃতি বুলেট

    kallol
    অন্যান্য | ২৬ অক্টোবর ২০০৬ | ২০২৭০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kallol | ২৮ নভেম্বর ২০০৬ ১৮:০৫695876
  • ডি আর কেডি ...... তোমাদের পোষ্ট দুটো চোখ এড়িয়ে গেছিলো।

    ডি - থ্যাংকু।

    কেডিদা - না, আপনার বি ই-র বন্ধুর সাথে পরিচয় ছিলো না।
  • kallol | ২৯ নভেম্বর ২০০৬ ১৪:১৮695877
  • আমাদের এই তর্কে কলেজের বন্ধুদের একজনই মাত্র যোগ দিতো, তবে খুব মাঝে মধ্যে। জয়ীক যখন বলতো তখন খুব যুক্তিনিষ্ঠ ভাবে বলার চেষ্টা করতো। আমরা যেমন। কখনো কখনো, খুব আবেগের জায়গা থেকেও তর্ক করতাম। ও সেটা করতো না। কোথাও জয়ীকের সাথে চেতনের তরঙ্গে মিলছিলো। এরকমই একদিন, বাবলুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফেরার পথে, জয়ীক হঠাৎই কথাটা পাড়লো - তাত্ত্বিক তর্ক চলুক, কাজও কিছু হোক। কিছু মানুষ মিলে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে কিছু করতে চাইছে। একদিন কথা বললাম আমরা। আমার মত ছিলো, এই সরকার (তখন সিদ্ধার্থ জমানা) কি আমাদের এতো ক্ষুদ্র শক্তির চ্যাঁচামেচিকে কোনো পাত্তা দেবে? যদি আমাদের সেই শক্তি না থাকে, তবে এসব করে লাভ কি? জয়ীক একটা যুক্তিতেই আমায় উড়িয়ে দিলো। বলল - তুইও তো একদিন জেলে ছিলি। আজ তুই মুক্ত। তোর নৈতিক দায়িত্ব থাকে যারা আজও জেলে তাদের জন্য রাস্তায় নামা। আর কোনো কথাই থাকে না এরপর। পরদিনই কলেজ কেটে রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের পেছনে কালিদাস সিংহ লেনে এপিডিআর অফিসে।

    আমার তিন বছরের আইআইটি খড়্‌গপুর বাস আমায় অনেক কিছু দিয়েছিলো যার উত্তরাধিকার আমি আজও বাহিরঙ্গে এবং অন্তরঙ্গে বহন করি। ওখানেই আমি ফ্লাওয়ার চিল্ড্রেন আন্দোলন সম্পর্কে শুনি, এবং শ্রদ্ধাশীল হই। বামপন্থীরা (গোলাপী, লাল, গাঢ় লাল নির্বিশেষে) তখন (এখনও) একে মার্কিন অপসংষ্কৃতি, হিপি কালচার বলেই চিনতো। এটা যে আদৌ কোনো প্রতিবাদের ধরন হতে পারে তা সাধারন ভাবে বামপন্থীদের ধারনার বাইরে ছিলো।

    আমি কিন্তু অনুপ্রানিত হয়েছিলাম চুল-দাড়ি না কাটতে। জিনস তখন ভারতে পাওয়া যেতো না। আইআইটি ক্যাম্পাসে থাকার সুবাদে সেটাও জোগাড় হয়েছিলো, তাও কেয়াবাত, সেকেন্ড হ্যান্ড। দুবছর টানা আমিই পড়েছি, আমি যখন তাকে পাই, তখনই সে দুবছরের পুরোনো।

    ফলে সেই প্রায় পুরোপুরি "ফেডেড" হয়ে যাওয়া জিনস আর মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবী শ্রীঅঙ্গে ধারন করে যখন এপিডিআর অফিসে আবির্ভূত হলাম, তখন কি একটা গুরুগম্ভীর বিষয়ে মত বিনিময় চলছিলো, জয়শ্রীদি (জয়শ্রী রানা) খুব হাত-টাত নেড়ে তার মত বলছিলো, ঐ হাত তোলা অবস্থাতেই বলে উঠলো "যা ব্বাবা" ........... অলোচনা সেদিনের মত গুলি মারা গেলো।
  • kallol | ০১ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৭:১৫695878
  • আমার চালচিত্তির যেমনই ঠেকুক না কেন সকলে কিন্তু হৈ হৈ করে স্বাগত জানালো। পরে জয়ীকের কাছে শুনেছি, ও এই "কাল্‌চারাল শক"টা আন্দাজ করেছিলো। তাই আগেভাগেই আমার হুলিয়া ও আগমনী গেয়ে রেখেছিলো। চা বিড়ি এবং রাজাবাজারের বিখ্যাত পরোটা-ভুনা সহযোগে আমি এক ঝাঁক নতুন বন্ধু পেলাম। শিবাজী, গৌতম, উদয়ন, মিত্রা, জয়তী, সঞ্জয়দা, সুভাষদা, দিলীপদা, ভারতীদি এবং জয়শ্রীদি। এরা কেউ কেউ তখনো আন্ডারগ্রাউন্ডে, ফলে, ছদ্মনামে।

    পরের সপ্তাহেই বড় মিছিল, আমরা বলতাম "সেন্ট্রাল র‌্যালী"। তখন, নক্সাল রাজনীতিতে বিশ্বাসী দুটো চারটে পত্রিকা বেরুচ্ছে। অনীক, পূর্বতরঙ্গ, প্রস্তুতি পর্ব, অনুষ্টুপ আরও দু একটা। তাতে "সেন্ট্রাল র‌্যালী"র বিজ্ঞপ্তি বের হতো। সাধারনত: ওয়েলিংটন স্কোয়ার থেকে এসপ্ল্যানেড ইস্ট (না, সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে সিধু-কানু ডহর নয়) যাওয়া হতো। শ'দুয়েক মানুষ সামিল হতেন সেই মিছিলে। কলকাতা ও তার আশেপাশে গণআন্দোলনে বিশ্বাসী নক্সালদের সংখ্যা তখন ঐরকমই হবে।

    দারুন উৎসাহ কিন্তু কি হয় কি হয় ভাব নিয়ে হাজির হলাম ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ঠিক বেলা দুটোয়। জমায়েত থেকে স্লোগান উঠছিলো - সমস্ত রাজবন্দীদের মুক্তি চাই ..... সমস্ত রাজনৈতিক হত্যার তদন্ত চাই .... মিসা পিডিএ সহ সমস্ত কালা কানুন তুলে নাও ................ মিছিল শুরু হতেই কোথা থেকে সামনে দুটো আর পেছনে দুটো পুলিশ ভ্যান এসে গেলো। পুলিশ ভ্যান আসতেই মিছিল পাল্টাতে শুরু করলো। এতক্ষন স্লোগানে জড়িয়েছিলো এক প্রত্যয়ী বেদনা। হেরে যাওয়া মানুষ যখন নতুন করে জীবন শুরু করে, তখন নতুন ভাবে শুরু করার প্রত্যয়ের সাথে বিগত পরাজয়ের বেদনা যেমন মিশে থাকে, ঠিক তেমন। পুলিশ ভ্যান দেখেই চোয়ালগুলো শক্ত হয়ে এলো, দৃঢ়তর হলো মুষ্টিবদ্ধ হাত, চোখে চোখে হারিয়ে যাওয়া কমরেডদের মুখ, শানিত বিদ্যুত ঝলকের মতো ঝলসে উঠলো। দু'শ বুকের ঘৃণার জ্বালা অগ্নিগিরি হয়ে উঠে এলো গলায়। লাভাস্রোত আছড়ে পড়লো ধর্মতলা স্ট্রিটে - কাশীপুর বরানগরের গণহত্যার জবাব চাই ......, নক্সালবাড়ির কৃষক নেতা কানু-জঙ্গলের মুক্তি চাই, ছাত্র-যুব'র চোখের মনি অসীম-সন্তোষের মুক্তি চাই ......., ডেবরার কৃষক নেতা গুনধর মুর্মুর মুক্তি চাই ......, পুলিশ লকআপে শহীদ চারু মজুমদারের হত্যার জবাব চাই ......, তখন, ঠিক তখন, হঠাৎই কে যেন কলজে ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠতো - শহীদের রক্তঋণ রক্তের দামে শোধ করো ...... প্রতিবাদে প্রতিরোধে প্রতিশোধে কমরেড/গড়ে তোলো গড়ে তোলো গড়ে তোলো ব্যারিকেড ..............। কলকাতা বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখতো, ধুসর মৃত্যু উপত্যকা পার হয়ে ফিরে আসা দু'শ আগুন পাখীর নয়া উড়ান।
  • I | ০১ ডিসেম্বর ২০০৬ ২১:৫১695879
  • কল্লোলদা, এই লেখাটাকে বড় করে মেমোয়ার হিসেবে ছেপে বার করুন। ধীরেসুস্থে।
  • kallol | ০৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৩:৫৯695880
  • এপিডিআর-এর সেই শুরুর সময়। নতুন লড়াই, পুরোনো এবং নতুন বন্ধুরা মিলে শিখছি। পাঠ নিচ্ছি গণআন্দোলনের ভাষার, যে ভাষা আমদের বয়সীদের কাছে একদমই অচেনা। আমাদের রাজনীতি শুরুই হয়েছে গোপন সংগঠন, গেরিলা অ্যাকশন দিয়ে। বড়রা যাঁরা ছাত্র রাজনীতি/ট্রেড ইউনিয়ান/মহিলা সংগঠন করে এসেছেন, তাঁরা হাতে ধরে শেখাতেন গণআন্দোলনের পথ হাঁটা, মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে, পথসভায়, কর্মীসভায়, আড্ডা মারতে মারতে ......... সঞ্জয়দা, সুভাষদা, তারকদা ছাড়াও, অমিয়াদি (সুশীতল রায়চৌধুরীর জীবনসাথী, অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির সময় থেকে মহিলা সেলের সংগঠক), ঝর্ণাদি (ঝর্ণা ভৌমিক - ইনিও অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির সময় থেকেই বিভিন্ন ফ্রন্টে কাজ করেছেন), দাদু (বেহালার সুশীলবাবু-পোড়খাওয়া প্রবীন। অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির আমল থেকে পার্টি সদস্য। পরে ছেড়ে দেন,১৯৬৩-৬৪ নাগাদ, পার্টির ভেতরে আমলাতান্ত্রিকতার বিরোধীতায়), এরকম আরও অনেকে।

    একদিনের কথা মনে আছে। বৌবাজারের মোড়ে সেদিন পথসভা। আমি আর জয়ীক একটু আগে পৌঁছেছি। যথারীতি, পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। আসলে রাষ্ট্র তখনও আমাদের মাপতে পারেনি। বোঝা যাচ্ছে এগুলো নক্সাল, কিন্তু বোম-টোম মারে না। খতম-টতম বলে না। গোপন নয় যা করার প্রকাশ্যেই করে। বক্তৃতায় / প্রচারপত্রে নক্সাল এমনকি সিপিএম বন্দীদেরও মুক্তি চাইছে। লিখছে, এদের রাজনীতির সঙ্গে একমত নয়, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গা থেকে দাবী করছে, এদের মুক্তির। তখন অবধি রাষ্টের চেনা ছকের বাইরে বলেই সাবধানতা। বলা তো যায় না!

    সে যাকগে। প্রচুর উর্দিধারী পুলিশের সাথে সাদা পোষাকের টিকটিকিরও কমতি নেই। তখন অত চিনতে পারতাম না। এক সিড়িঙ্গে মার্কা, কেরানী গোছের ভদ্রলোক হঠাৎ আমায় জিজ্ঞাসা করলেন- ভাই, এখানে কি হবে? তারকদা শিখিয়ে দিয়েছিলেন, যে যা জিজ্ঞাসা করবে ঠিকঠাক বলবে। গোপন করার কিচ্ছুটি নেই। ওনার লব্জে - এখন সব "ওপেন" নো "গোপেন"। তাই তাকে বললাম - মিটিং হবে।

    - কিসের মিটিং?

    - এপিডিআরের

    - এটা কোন পার্টি?

    - কোনো পার্টি নয়। এটা গণসংগঠন।

    - না না, গণসংগঠন তো বুঝলাম, কিন্তু কোন পার্টির গণসংগঠন?

    - কোনো পার্টির নয়।

    - তা কি করে হয়!

    এর মধ্যে সঞ্জয়দার নজরে পড়েছে ব্যাপারটা। কাছে এসে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলো - কি ব্যাপার ?

    - না না এই জিজ্ঞাসা করছিলাম কি হবে।

    - আপনি পুলিশের লোক ?

    - হ্যাঁ, এসবি-র।

    - শুনুন, আপনার কাজ এখানে দাঁড়িয়ে থাকা, কে কে বক্তৃতা করছে তাদের নাম এবং বক্তব্য টুকে নেওয়া। আপনার বড় সাহেবকে গিয়ে তা রিপোর্ট করা। আপনাকে আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় এই কারনেই পোষা হয়।

    তরপর আমাকে দেখিয়ে বলল - ও কেন আপনার কাজ করে দেবে? যান, নিজের কাজ করুন।

    ওমা, লোকটা কেমন কাঁচুমাচু হয়ে চলেও জেলো।

    সঞ্জয়দা আমার দিকে ফিরে লোকটাকে শুনিয়েই বলল - একদম পাত্তা দিবি না, সোজা ফুটিয়ে দিবি।

    শিখছিলাম ............
  • suhasini | ০৫ ডিসেম্বর ২০০৬ ১০:২৪695881
  • তারপর?
  • kallol | ০৫ ডিসেম্বর ২০০৬ ১২:৩৩695882
  • এর বেশ কিছু দিন পরের ঘটনা। ১৯৭৪। ২০শে জুলাই কার্জন পার্কে প্রবীর দত্ত শহীদ হবার পর, খুব খরপ সময় শুরু হোলো। যাও বা একটু আধটু মিছিল-মিটিং করা যাচ্ছিলো, তাও বন্ধ। আমরা এপিডিআর-এ প্রস্তাব রাখলাম, একটা বড় করে মিছিল করার। তাতে যদি এই অচলাবস্থা ভাঙ্গে। ঠিক হলো এসপ্ল্যানেড ট্রাম গুমটি থেকে মিছিল শুরু হবে, শেষ হবে শ্যামবাজারে।

    সেদিন সারা এসপ্ল্যানেড জুড়ে প্রচুর পুলিশ। এমনিতে এপিডিআর-এর মিটিং-মিছিলে পুলিশ থাকতো, কিন্তু সেদিন আয়োজন বেশ অন্যরকম। বড়রা ঠিক করলেন, মিছিল বাতিল। শুধুশুধু সংঘাতে যাওয়া হঠকারীতা হবে। আমার কাছে এপিডিআর-এর বড় ফেস্টুনটা ছিলো। তরকদা দেখেই বললেন ওটা ঝোলায় ঢুকিয়ে আস্তে আস্তে কেটে যেতে। আমি চলে যাচ্ছিলাম, তারকদা পেছন থেকে ডাকলেন। উল্টোদিক থেকে খাশনবিশ (স্পেশাল ব্র্যাঞ্চে-অ্যান্টি নকসালাইট সেক্‌শনের কুখ্যাত ওসি) তার দলবল নিয়ে আসছে। তারকদা, অমিয়াদি, ঝর্ণাদি, কপিলদা(নদী বিশেষজ্ঞ), তিলোত্তমাদি(কপিলদার সহধর্মীনি ও সিপিআই-এর মহিলা ফ্রন্টের নেত্রী) আমাকে আড়াল করে খাশনবিশের দিকে এগুতে থাকলেন। কাছাকাছি আসতেই তারকদা বেশ চেঁচিয়ে ডাকাডাকি শুরু করলেন - আরে, মিস্টার খাশনবিশ যে! এখানে কি ব্যাপার ? নকসাল-টকসাল ধরতে এলেন নাকি।

    ঐ অপিস ছুটির সময় এসপ্ল্যানেডে গিজগিজ করছে মানুষ। তারা "নকসাল ধরতে আসার" কথা শুনে সবাই এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তারকদা সোজা হেঁটে খাশনবিশের সামনে গিয়ে টপ করে একটা হ্যান্ডশেক করে, অমিয়াদি, ঝর্ণাদি, কপিলদা, তিলোত্তমাদিদের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে লাগলো বেশ উচ্চকন্ঠে - এই হলেন মিস্টার খাশনবিশ, নাম তো শুনেইছেন। আরে এনার লোকইতো অসীম, সন্তোষ, কানুবাবু এদের ধরেছেন। চারুবাবুই যা ওনার হাত ফস্কে ডিডি-র হাতে ধরা পড়লেন। আশেপাশের লোকজন

    তখন কৌতুহলী হতে শুরু করছে। তারকদা চেটেই যাচ্ছেন। এই যে নকসালেরা যে সব জেলে, তার প্রধান কৃতিত্ব তো এনারই ..............। খাশনবিশের প্রায় ল্যাজে গোবরে অবস্থা।

    এইভাবে সর্বসমক্ষে পরিচিতি ফাঁস হয়ে যাওয়া কোন গোয়েন্দার ক্ষেত্রেই ভীষণ অস্বস্তির। তার ওপর তারকদা পরিচয় পর্ব শেষ করে, চা খাবেন চলুন বলে হাত ধরে টানাটানি। কোনোমতে পালিয়েছিলো খাশনবিশ আর তার দলবল।

    শিখছিলাম ........ কিভাবে ডেঁটে অথবা মস্করা করে ভয়ের সাথে মোকাবিলা করা যায়।
  • kallol | ০৬ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৪:২১695883
  • এপিডিআরের পাশাপাশি আরও একটা সংগঠন নি:শব্দে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটা কাজে করে যাচ্ছিলো। লিগ্যাল এড কমিটি। হাইকোর্ট পাড়ায় একটা চেম্বারে, সন্ধ্যা বেলা থেকে নিয়মিত বসত, রমাদি (অসীম চ্যাটার্জির সহধর্মীনি), জয়শ্রীদি, শংকরদা(শংকর ভট্টাচার্য্য) আর তনুদি(টালিগঞ্জ চন্ডীতলার পীযূষদার সহধর্মীনি)।

    এরা প্রত্যেকটা জেল ঘুরে ঘুরে রাজনৈতিক বন্দীদের তালিকা তৈরী করেছিলেন। কার মামলার কি অবস্থা, উকিল ঠিক করা, মামলার তদবির করা, প্রয়োজন পড়লে, জামিনের পয়সা, উকিলের দক্ষিণা জোগাড় করা, সবই করতো। অবশ্য বহু উকিলই পয়সা নিতেন না। অরুনপ্রকাশ চ্যাটার্জি, আবদুল হালিম (আজকের স্পিকার), স্নেহাংশু আচার্য্য, বিকাশ ভট্টাচার্য্য(আজকের মেয়র, তখন স্নেহাংশুবাবুর জুনিয়ার), অসিত গাঙ্গুলী এরকম আরও অনেকে।

    এদিকে সিপিআইএম-এল তখন ক্রমাগত ভাঙ্গছে। চীন পার্টি লিন পিয়াওকে খারিজ করছে। ১৯৭৩-এর দশম পার্টি কংগ্রেসে বলা হলো, ১৯৬৯-এর নবম পার্টি কংগেসের সময় লিন পিয়াও ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা পার্টিকে কুক্ষিগত করে ফেলেছিলো। তারা নানা রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়। নবম পার্টি কংগ্রেস বলেছিলো "এটা মাও-এর যুগ"। এর আগে পর্যন্ত ছিলো "লেনিনের যুগ - সাম্রাজ্যবাদের যুগ"। এখন "মাও-এর যুগ - সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতন ও সমাজতন্ত্রের বিজয়ের যুগ"। এই তাঙ্কিÄক জায়গা থেকেই নক্সাল আন্দোলনের পরিধি থেকে গণসংগঠন (ছাত্র-যুব, কৃষক, এমনকি শ্রমিক সংগঠন - ট্রেড ইউনিয়ানও)- সংশোধনবাদী/অর্থনীতিবাদী কাজ বলে, হঠিয়ে দেওয়া হলো। সংগঠন বলতে শুধুমাত্র গণফৌজ/গেরিলা বাহিনী। বলা হয়েছিলো - "কাগুজে বাঘ সাম্রাজ্যবাদ এখন ঝরা পাতার মতো কাঁপছে", "এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা নতুন সমাজ প্রসবের গর্ভযন্ত্রনায় কেঁপে উঠছে", "দেশগুলি চায় স্বাধীনতা, জাতিগুলি চায় মুক্তি, জনগন চান বিপ্লব"। তাই আর কালক্ষেপ নয় - সশস্ত্র লড়াইই একমাত্র পথ। দশম পার্টি কংগ্রেসে স্বীকার করা হলো ঐ লাইন ভুল ছিলো - মাও নয় এখনও লেনিন যুগই।

    আন্তর্জাতিকতার যান্ত্রিক বোধ ও প্রয়োগ বারে বারে নানান দেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে কিভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে - আর একবার তা প্রমাণ হলো।

    ওদিকে চারুবাবুর লাইনে বিশ্বাসী সিপিআইএম-এল আবার ভাঙ্গলো - লিনের পক্ষে আর বিপক্ষে। আমরা বলতাম - প্রো চারু প্রো লিন (মহাদেব মুখার্জি, আজিজুল হক) আর প্রো চারু অ্যান্টি লিন (জহর, বিনোদ মিশ্র)।
  • kallol | ০৮ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৭:০১695884
  • এরই মধ্যে আমরা গুটিকয়েক, এপিডিআর-এর বাইরে কিছু করা যায় কি না, ভাবনা চিন্তা করছিলাম। শিবাজী, গৌতম, উদয়ন, মিত্রা, জয়তী, জয়ীক, কল্লোল - আমরা সাতজন বসলাম, ইডেনে। তখনকার রীতি অনুযায়ী, আলোচনা শুরু হলো, রাষ্ট্রের শ্রেণীচরিত্র দিয়ে। এখন ভাবলে মজা লাগে কত অনায়াসে কত ভারী ভারী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা হতো। আমরা একমত হলাম - এটা আধা সামন্ততান্ত্রিক-আধা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। প্রধান দ্বন্দ্ব সামন্তবাদ। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলেও, এই রাষ্ট্রের একটা আপেক্ষিক রাজনৈতিক স্বাধীনতা আছে। সেই স্বাধীনতাটা প্রভূ চয়নের স্বাধীনতা। আমেরিকান তাঁবে (মার্কিন চাপে টাকার অবমূল্যায়ন) থেকে - সোভিয়েৎ-এর দালাল হওয়া(ব্যাঙ্ক জাতীয়করন, রাষ্ট্রীয় পূঁজির বাড়-বাড়ন্ত) ইত্যাদি ইত্যাদি ......।

    ঠিক হলো শ্রমিক সংগঠন করতে হবে। সেই মতো উল্টোডাঙ্গা স্টেশনের গায়ে খাল পাড়ের বস্তিতে, আইস্ক্রিমের চামচ বানানোর শ্রমিকদের সঙ্গে জুটে গেলাম। কিন্তু তখন ইউনিয়ান করব বললেই হতো না। তাহালে পুলিশের নজর পড়বে। তাই শুরু হলো ফ্রি কোচিং সেন্টার। বস্তির বাচ্চাদের সাথে সাথে বড়দেরও পড়ানো। বাচ্চাদের পড়ানো হচ্ছে অ আ, অঙ্ক এইসব। বড়দের অক্ষরজ্ঞান শেখানো হচ্ছে - মে দিবসের গল্প, ছোটোদের রাজনীতি এইসব দিয়ে। এতকিছু সঙ্কেÄও পুলিশের নজর পড়েছিলো। আমরা বস্তিবাসীদের মতো জামাকাপড় পড়লে কি হবে? চেহারা ? লুকাবো কিসে? এই ভদ্রলোকের মতো হাবভাব, কথাবার্তা, লুকাবো কিসে?

    একদিন মিত্রা সন্ধ্যায় পড়াতে গিয়ে ধরা পড়লো। সকালে খবর পেলাম গৌতমের কাছে। মিত্রার বাড়ি থেকে গৌতমকে খবর পাঠানো হয়েছিলো। গৌতম ভোর ভোর আমায় খবর দিলো।

    সেদিনই দুপুরে ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে বসলাম। কি করা যায়। ঠিক হলো গৌতম যেহেতু মিত্রার পড়ার ছেলে, তাই ও মিত্রার বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখবে। যাতে মেশোমশায় মাসীমা একা না হয়ে যান। উদয়ন আর আমি এপিডিআর আর লিগ্যাল এড কমিটির সাথে যোগাযোগ করে, মিত্রার কেসটা যাতে ঠিকমতো লড়া যায় সেটা দেখবো। জয়তী আর শিবাজী, বস্তির লোকেদের সাথে যোগাযোগ রাখবে। যাতে তাঁরা না মনে করেন যে বিপদের দিনে আমরা তাঁদের ফেলে পালিয়ে গেছি। জয়ীক, যখন যার দরকার হবে তাকে সাহায্য করবে।

    জয়তী, কেন জানিনা কি মনে করে, চলে গেলো বস্তিতে - এবং সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার।

    আমরা বাধ্য হলাম বাড়ি ছাড়তে।
  • J | ০৮ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৭:০৪695509
  • এটা কতো সালে কল্লোলদা?
  • kallol | ১০ ডিসেম্বর ২০০৬ ১২:১৪695510
  • য - এটা ১৯৭৩-এর শেষ বা ১৯৭৪-এর প্রথম।
  • kallol | ১২ ডিসেম্বর ২০০৬ ১১:৪৫695511
  • কিন্তু মুস্কিল হলো কোথয় যাই? পুরোনো যতো যোগাযোগ কোনটাই পাঁচ বছর আগেকার অবস্থানে নেই। যারা তখনো ঠিকঠাক অছে তাদের ওখানে সন্দেহ না জাগিয়ে থাকা বেশ ঝামেলার। পাড়ায় নতুন মানুষ এলেই নব-যুব কংগ্রেসীদের জবাবদিহি করতে হবে ..... কে-কি-কেন-কবে-কোথায়। সন্দেহ হলেই পুলিশে খবর। যাদের কছে নিরপত্তা নিয়ে কোন কথা হবে না, তাদের আর বন্ধু বলতে মন চায় না। এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে জয়ীক নিয়ে গেলো রাঘবদার কছে। জয়তী, যে পরে ধরা পড়ল, সে জয়ীকের দিদি, ফলে জয়ীকের বাড়িতে থাকা নিয়ে কোন ঝামেলা ছিলো না। পুলিশ ওকে সন্দেহ করে নি। রাঘবদা (রাঘব চট্টোপাধ্যায়), ৬৭তে মৌলানা আজাদ-এর ছাত্রনেতা। কিন্তু সিপিআইএম-এল এ যোগ দেননি। নানান প্রশ্নে ফারাক ছিলো। ওরা মনে করতেন। ভারত একটি অনুন্নত ধনতান্ত্রিক দেশ। ফলে, জনগণতান্ত্রিক বিল্পব নয়, এটা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর। সেই সময় (১৯৬৭-৬৯) এই একই চিন্তা নিয়ে আর.এস.পিও ভাগ হয়ে হয়েছিলো- আর.এস.পি এম-এল। এরাও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলতো, কিন্তু ৪র্থ আন্তর্জাতিকের সমর্থক ছিলো (ট্রট্‌সকিপন্থী)। রাঘবদারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বললেও ৪র্থ আন্তর্জাতিকের সমর্থক ছিলো না। কলকাতায় এরাই প্রথম আলবানীয়ার এনভার হোজার কথা বলে, লেখা ছাপায়(এটা নিয়ে আজও রাঘবদা বেশ শ্লাঘায়িত)।

    তখন (১৯৭৪-এ) ওসব অতীত। রাঘবদা তখন সম্ভবত সেন্টার ফর সোস্যাল স্টাডিজ-এ ঢুকেছে। রাঘবদার বাড়িতে গিয়ে দেখি রেওয়াজ চলছে। সেতারটা রাঘবদার প্রেম। রেওয়াজ হলো। আমাদেরও লুচি বেগুনভাজা হলো। রাঘবদা বলল এক্ষুনি তো কোন জায়গা ভাবা যাচ্ছে না। আজকের মতো একটা বন্দোবস্তো হবে। আমাকে একটা কার্ড দিয়ে বলল - এটা বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের গেটপাশ। আজ রাতভর ক্লাসিকাল গানের আসর। ওখানে রাতে থেকে যাবি। কেউ সন্দেহ করবে না।

    সারাদিন এদিক সেদিক কাটিয়ে, রাত নটা নাগাদ নিজাম থেকে পেটভরে ভূনা আর পরোটা মেরে, গেলাম ময়দানে (তখন রবীন্দ্রসদনের উল্টোদিকে হতো) বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে। এর আগে শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে কোন ধারনা ছিলো না। ছোটোবেলায় বাবার মুখে শচীনকর্তার রাগপ্রধান শোনা, সেই যা। আবার মার্ক্সবাদী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ওসব "প্রতিক্রীয়াশীল সামন্ত সংস্কৃতি" বলে বুঝতে শিখেছি। তা সে যাকগে, আমি তো ঘুমোতে এসেছি।

    মন্ডপে ঢুকে পেছনদিকে যেখানে খড় বিছানো ছিলো, সেখানে আলোয়ান মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। চোখ লাগতে লাগতে শুনতে পেলাম, পাব্লিক বেশ খচে টচে বলছে "ঘুমোবেই যদি তো বাড়িতেই ঘুমোতে পারতো, এখানে ঘুমোনোর কি হলো কে জানে"। যথেষ্ঠ যুক্তিসংগত। কিন্তু আমার তখন যুক্তি শোনার কোনো পরিকল্পনা নেই। অতএব ঘুম।
  • kallol | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৫:১৫695512
  • কতক্ষন ঘুমিয়েছিলাম মনে নেই (কারই বা মনে থাকে!)। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো কেমন একটা গোলমালে। উঠে বসে দেখি মঞ্চে এক চশমা পড়া ভদ্রমহিলা বসে প্রচন্ডবেগে বেহালা বাজাচ্ছেন। সে এক ভয়ানক কান্ডো। বেহালার মত যন্ত্র থেকে ওরকম প্রচন্ড দ্রুত লয়ের আওয়াজ বার হতে পারে, আমার এসম্পর্কে কোনো দূরতম ধারনাও ছিলো না। তারপর দেখি সে বেটি লাফ-ঝাঁপ ছেড়ে কেমন মিঠে করে একটা গৎ বারবার বাজাতে লাগলো, ভাবলাম যাক শেষ হলো বুঝি, ওব্বাব্বা, কোথায় কি, হঠাৎ দেখি তবলিয়া ভদ্রলোক প্রবল বেগে মাথাটাথা ঝাঁকিয়ে ধ্‌র্‌র্‌র্‌র্‌র্‌র্‌র করে তবলায় কি একটা করে যাচ্ছে। এই তো চাললো। এ ছাড়ে তো ও ধরে, বেশ কিছুক্ষন শোনার পর মজা পেতে শুরু করেছি। কেমন একটা লড়াই লড়াই ভাব (তখন যে কোন ধরনের লড়াইতেই খুব উৎসাহ)। আশেপাশের লোকজন দেখি বাহ্যজ্ঞান শুন্য হয়ে কেমন একটা তূরীয় ভাবে আছে আর কখনো একে কখনো ওকে সাবাসী দিচ্ছে। সাবাসীর ধরনও নানা রকম। কেউ বলছে ক্যাবাৎ, কেউ করছে হায় হায় ইত্যাদি ............। তারপর তো দুজনেই একসাথে ক্রমাগত দ্রুত আরও দ্রুত বাজাতে বাজাতে ধ্‌র্‌র্‌র্‌র-চ্যাঁচ্যাঁচ্যাঁ ধ্‌র্‌র্‌র্‌র-চ্যাঁচ্যাঁচ্যাঁ ধ্‌র্‌র্‌র্‌র-চ্যাঁচ্যাঁচ্যাঁ করে তিনবার বাজিয়ে শেষ করলো। ও: কি হাততালি। আমিও দিলুম। দুজনে উঠে দাঁড়ালেন, হাততালি দুগুণ হয়ে গেলো। সেবব থামলে পরে শোনা গেলো বেহালার নাম শিশিরকনা ধরচৌধুরী আর তবলার নাম ওস্তাদ কেরামতুল্লা।
  • d | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৫:২২695513
  • কল্লোলদা এইটা ব্যপক দিল তো .... :)))))))))))))))))))
  • Arjit | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৫:২৫695514
  • মাইরি। কপালে থাকলে লোকে শিশিরকণা ধরচৌধুরী আর কেরামাতুল্লা শুনতে পায় - কোথায় সেইডা নিয়ে জাবর কাটবে, তা না...
  • S | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৫:৩৪695515
  • ওফ্‌ফ্‌ কল্লোলদা, যা-তা!
  • Parolin | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৬:৫৫695516
  • অদ্ভুত ভলো।
    এরেই কয় কপালের নাম গোপাল।
  • ® | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৭:১৯695517
  • আহা।কেরামতুল্লা আর শিশিরকণার যুগলবন্দী।কেয়া বাত। হাজার খুঁজেও ক্যাসেট পাই না এখন।
  • kallol | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৭:৪৮695518
  • এইসব কান্ডে ঘুমটুম তো মাথায় উঠলো। ভাবছি কি করবো, আবার ঘুমানো যায় কি না। রাত তখন দেড়টা কি দুটো। এর মধ্যে দেখি এক ফর্সা টাকমাথা বয়স্ক মানুষ, আর সাথে আর এক বয়স্ক লোক মঞ্চে উঠে পড়েছে। লোকজন সাংঘাতিক রকম হাততালি দিচ্ছে, চোখেমুখে কেমন আপ্লুতভাব। নাম বললে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় আর সম্ভবত: কানাই দত্ত। ভীষ্মদেবের নাম শুনেছি বাবার বন্ধুদের আড্ডায়। বাবা প্রায়ই বলতেন, কে যেন (দিলীপকুমার বোধ হয়), পন্ডিচেরী নিয়ে গিয়ে ভীষ্মদেবের বারোটা বাজাইসে। ওনারে দিয়া বাসন মাজাইত! শোয়া আর হলো না। ভীষ্মদেব বসেছেন। হার্মোনিয়ামটা আদ্ধেক কোলে তুলে। কে একজন এসে চা দিয়ে গেলো কাপ প্লেটে করে। উনি হার্মোনিয়ামে একটা পোঁ ধরে আছেন আর কানাইবাবু তবলায় চাঁটি মারছেন, হাতুড়ি ঠুকছেন, আবার চাঁটি মারছেন। এইসব যখন চলছে, তখন আশেপাশের লোকজন নানা কথা বলাবলি করছে-বুড়ো কি গাইবে, খেয়াল নাকি রাগপ্রধান। এক বয়স্ক মানুষ বলছিলেন মার্কাস স্কোয়ারে ভীষ্মদেব শোনার অভিজ্ঞতা, প্রায় পনেরো বছর আগে। উনি যে ভাষায় কথা বলছিলেন, সে ভাষা আমার তখনো অজানা। ছুট তান, মুড়কির কাজ, বিলম্বিত, পকড় ........। কিন্তু কেন জানি শুনতে ভালো লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো কোন কথক ঠাকুর যেন এক অজানা ভাষায় কথকতা করছেন। হঠাৎ হার্মোনিয়ামের আওয়াজে ঝাড় বয়ে গেলো। সব্বাই চুপ।
    একটা তীক্ষ্ণ আর ঝকঝকে গলা হাহাকার করে উঠলো - যদি মনে পড়ে সেদিনের কথা - একবার, দুবার, তিনবারের বার - সেদিনের কথায় একটা বুক খালি করা মোচড় দিয়ে গান যেন ডুকরে কেঁদে বললে - আমারে ভুলিও প্রিয়। সারা জম্মের মতো লোকটার, বড়ো করে বললে শাস্ত্রীয় সংগীতের কেনা গোলাম হয়ে গেলাম।
  • kd | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৯:২৯695520
  • বা:, দারুন transition তো - gun থেকে গান! বা:।
  • tan | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ ২২:৩৫695521
  • এইমাত্র পড়লাম গান থেকে গান!
    দারুণ!
    বসন্ত রায় কেও টু বি অ্যাসাসিন খাঁসাহেব বলেছিলো,বয়েৎ আছে, "তলোয়ারে শত্রুনিপাত হয় আর গানে শত্রু বন্ধু হয়ে যায়।""
  • kallol | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ০৯:২৮695522
  • ভোর হয়ে গেলো বিসমিল্লা সায়েবের সানাইয়ে। ওখান থেকে সিধে হাওড়া স্টেশন হয়ে খড়্‌গপুর। বন্ধুর বাড়িতে দিন সাতেক কাটিয়ে ফিরে এলাম। লিগ্যাল এড-এ খবর পেলাম মিত্রা আর জয়তী দুজনেই প্রেসিডেন্সী জেলে। বাড়িতেও পুলিশ আসে নি। আবার বাড়ি।
  • kallol | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ১১:১৫695523
  • এর মাসখানেক পরে জয়তী জামিনে ছাড়া পেল। জয়ীকের থেকে শুনলাম খুব ভয় পেয়ে আছে। মিত্রা আর ওকে একসাথে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লর্ড সিন্‌হা রোডে এসবি অফিসে নিয়েছিলো। সেখানে তারাপদ(কুখ্যাত এসবি অফিসার) ওদের সামনে সদ্য ধরা পড়া একটা ছেলেকে বীভৎস মারতে থাকে। জয়তী সহ্য করতে না পেরে, অজ্ঞান হয়ে যায়।

    জয়তীকে আর পাওয়া গেলো না। জয়ীকও কেমন আলগা হতে থাকলো। আমি, শিবাজী, গৌতম আর উদয়ন ছুটছি লিগ্যাল এড আর এপিডিআর-এ মিত্রার জামিনের জন্য। আমরা বারবার বসছি কি করে উল্টোডাঙ্গার কাজটা চালু রাখা যায়। কোন উপায় মাথায় আসছে না। এর মধ্যে একদিন হঠাৎই ঐ বস্তির একজনের সাথে দেখা হয়ে গেলো শিয়ালদায়। সে রিক্সা চালাতো। তার কাছে শুনলাম, পুলিশ বস্তির কাউকে ধরে নি। বস্তির লোকেরা বুদ্ধি করে শুধু জয়তী আর মিত্রার কথাই বলেছে - ওরা পড়াতে আসতো। এক-দুবার দুজন ছেলে এসেছিলো(ওদের "লাভার" বলে চালিয়েছে)। তাদের নাম মনে নেই। তারা আর আসেও নি। বস্তিতে পুলিশ ঘুরছে সারাদিন। আমরা যেন একদম ওদিকে না যাই।

    এরও মাস দুয়েক পর মিত্রা ছাড়া পেল। মিত্রার সাথে বসা হলো, দমদমে এক বন্ধুর মামার বাগানবাড়িতে। ওমা! কথা বলবো কি, সেখানে দেখি গৌতম আর মিত্রা দিব্যি হাতধরাধরি করে পুকুরঘাটে বসে বকম বকম করতে লাগলো। তারপর খেয়ে দেয়ে উঠে প্রায় ঘোষনা করার মত বলল - আমরা ভালোবাসি। ও: সে এক কান্ডো। তার মধ্যে শিবাজি কি সব লেনিন-ক্রুপ্সকায়া, মার্ক্স-জেনী মার্ক্স ফোটানোর তালে ছিলো। আমি আর উদয়ন সোজা বলে দিলাম - কোনো কথা হবে না। আজ শুধু আড্ডা, গান আর খাওয়া। গৌতম আর মিত্রা খাওয়ালো। কাছের এক পাঞ্জাবী দোকানের রুটি তড়কা। মিত্রা গান গাইলো, মেঘনাদের - দিন যায় রাত যায়/চাঁদ যায় মেঘ যায়/মন মোর ছুটে যায়/দূরে ঐ পাহাড়ী গাঁয়। উদয়ন কবিতা বলল, দ্রোনের - ভালোবেসে চাঁদ হয়ো নাকো/পারো যদি সূর্য হয়ে এসো, সুভাস মুখুজ্জের - মিছিলে দেখেছি সেই মুখ, আরো অনেক। শেষ করলো আল মাহামুদ দিয়ে - তোমায় নিয়ে আপনমনে খেলা/কখনো তো খেলিনি ভালোবাসা/লক্ষ্যহারা রাজার মত শেষে/ধরেছিলেম জীবনপণ পাশা/রক্ত দিতে চেয়েছিলেম বলে/মোহিনী তোর এমনই ছল যে/সোনার থালে চাইলি টুকটুকে/টুকরো করা আমার কলজে .....

    এরপর ওরা সারারাত ঘুরে বেড়ালো বাগানে আর পুকুরঘাটে। শিবাজি ঘুমিয়ে পড়লে, আমি আর উদয়ন, বারান্দায় বসে কথা বলছিলাম ওদের নিয়ে। আসলে আমরা আমাদের নিয়েই কথা বলতে চাইছিলাম। উদয়ন শেষে আমার হাত ধরে বলেই ফেলল - মিত্রার জন্য সব কিছু করতে পারি, কিন্তু সেটা ওকে বলতে পারিনি কোনদিন। উদয়নের চোখ কুয়াশায় ঢেকে ছিলো, আর আমার চোখে ছিলো বালুচরী শুণ্যতা। আমিও যে মিত্রার জন্য তাইই পারতাম, সেটা উদয়নকেও বলতে পারিনি। উদায়নের হাত আমার হাতে ছিলো।
  • S | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ১১:৩৩695524
  • গুরু, পদরজ দাও এট্টু। উরেবাবা, এ তো কালবেলার থেকেও বড় মাপের লেখা। অসা, অসা, একঘর।

    চলুক।
  • saa | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ১২:০২695525
  • অপূর্ব! কল্লোলদা! কান পেতে আছি-- তারপর?
  • kallol | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ১৪:০১695526
  • আমার এরকমটাই হয়ে এসেছে। আমার খড়্‌গপুরের সে। স্কুলে সবে ভর্তি হয়েছি, একেবারে ১১ ক্লাশে। ফলে লোকজন বেশ কৌতুহলী। কি করে জানাজানি হয়ে গেলো। মালটা জেল ফেরৎ। তাতে আমার ক্লাশের জনগণের বেশ গব্বো গব্বো ভাব। কিন্তু অন্য ক্লাশের লোকজন একটু "ছেড়-ছাড়" এর মুডে। রোজই স্কুলে গিয়ে শুনি, আমাকে নাকি গতকাল অমুক মেয়ের সাথে দেখা গেছে। অবধারিত ভাবে সেই নারীটির একটি প্রেমিক থাকবেই। সেই প্রেমিক প্রবর আমার ওপর হম্বিতম্বি। আমাকে যেটা করতে হতো, সেই মেয়েটাকে খুঁজে বার করা (আমি নতুন, ফলে কাউকেই চিনি না)। খুঁজে পেয়ে, তাকে কেলোটা বলা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কিছুই জনতো না। তবে সব ক্ষেত্রেই তারা অসম্ভব সাহায্য করতো। তারা তাদের প্রেমিককে কেসটা বুঝিয়ে বলতো, আর আমার দুটো করে বন্ধু বাড়তো।

    এই রকম একদিন একজনকে খুঁজছি, পাচ্ছি না। আমাকে ওরকম খোঁজাখুঁজি করতে দেখে আর্টসের শর্মিলা ধরলো। কি হয়েছে রে? কাকে খুঁজছিস? আমি সব বলতে, সে বেশ রেগে গিয়ে বললো, তুই কেনো গাধার মতো এটা করছিস। তারপর সে যেটা করল, সেটা সাংঘাতিক। খুঁজে বার করলো কারা আসলে এই চক্করটা চালায়। পরদিন তাদের ধরে আমার ক্লাশে নিয়ে এলো টিফিনের সময়। ক্লাশশুদ্ধু জনগণের সামনে - তোদের লজ্জা করে না, একটা নতুন ছেলে পেয়ে ............। তারপর থেকে ওগুলো বন্ধ। সেদিন আমি আর শর্মিলা একসাথে বাড়ি ফিরছি পাশাপাশি সাইকেলে। স্কুল থেকে বেড়িয়েই বলল - তুই না একটা আস্তো গাধা ......। তারপর যতদিন স্কুল চলেছে, ততদিনই ওর সাথে ফিরেছি। যেদিন খড়্‌গপুর ছেড়ে কলকাতা চলে আসবো, সেদিনও ও-ই স্টেশনে এসেছিলো। ওর চোখে দুপুরের চিলের ডাকের বিষন্নতা দেখেছি। আমার চোখ কাঁসাই-এর চরের মত ধূ-ধূ। আমি বলতে পারিনি - আমি জন্মের মতো তোর গাধা হতে চাই। ও-ও কি আমায় বলতে পারেনি? কি জানি।
  • RATssss | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ২০:৩৪695527
  • পুরো একটা লেভেল। কতা হবে না। জোঁকের মতন আটকে আছি। তারপরে?
  • vikram | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ২০:৩৮695528
  • এই লোকটাকে সামনে পেলে চাঁদা করে ক্যালাবো। একটা গোটা দুর্ধর্ষ উপন্যাস শর্টে সেরে কাটিয়ে দিচ্ছে - ক্রিমিনাল অফেন্স।
    এই টা বই হয়ে বেরোবে না - হতে পারে!

    বিক্রম
  • r | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ২১:০৪695529
  • কারাগার আর বধ্যভূমি কমে আসছে। বেশ সুখপাঠ্য হয়ে উঠছে। তবে "চিলের ডাকের বিষণ্নতার" পরে "আমি জন্মের মতো তোর গাধা হতে চাই" কি রকম যেন শোনাচ্ছে!
  • vikram | ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ ২১:২০695531
  • অতি ভালো শোনাচ্ছে।

    বিক্রম
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই প্রতিক্রিয়া দিন