এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আমি চড়াই বলছি ...

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ মার্চ ২০২৫ | ৬১৮ বার পঠিত
  • গুড মর্নিং, সুপ্রভাত বন্ধুরা। আমি চড়াই বলছি। হ্যাঁ গো হ্যাঁ, সেই ছোট্ট চড়াই। এমন অবাক চোখে তাকিয়ে আছো কেন তোমরা। কপালে চোখ তুলে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে থাকা তোমাদের মুখগুলো দেখে না সত্যি সত্যিই আমার বেশ মজা হচ্ছে। আজকের তারিখটা কি মনে আছে? না সব ভুলে গেছো ? আজ মার্চ মাসের ২০ তারিখ – আন্তর্জাতিক চড়াই দিবস। আমার মতো এমন ছয় ছোট্ট চেহারার এক পাখিকে নিয়ে একটা দুনিয়াজোড়া আলোচনা, আলোড়ন… সত্যি বলছি আমি বিশ্বাস‌ই করতে পারছি না। কী করে বিশ্বাস করবো বলো, আমি কি সত্যিই তোমাদের কাছে এতটা আদরের, এতটা ভালোবাসার ?
     
    জানো বন্ধুরা, একটা সময় তোমাদের ছায়া ঘেরা গ্রাম থেকে শুরু করে হৈচৈ মুখরিত শহরে, সর্বত্রই আমাদের, মানে চড়াইদের অবাধ বিচরণ ছিল। ছোট্ট ডানায় ভর করে আমরা অনেকেই সকাল সন্ধ্যা গ্রাম আর শহরের মধ্যে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতাম। ঠিক তোমাদের মতো। কিচিরমিচির শব্দ তুলে কত খুনসুটির সম্পর্ক ছিল তোমাদের সঙ্গে। তোমাদের পক্ষ থেকে আসা আদর আপ্যায়নের পরোয়াই করতাম না আমরা। আমার কথা বুঝি বিশ্বাস হচ্ছে না? যাও গিয়ে শুধোও বাড়ির বড়োদের - বুড়ো দাদু আর বুড়ি ঠাম্মি কিংবা দিম্মাদের। খলখল করে ফোকলা দাঁতের বেড়া ডিঙিয়ে কত্তো কথা বেরিয়ে আসবে! স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে ছড়া কাটবেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজন –
     
                      মিষ্টি চড়াই, দুষ্টু চড়াই 
                      মিছেই করিস বড়াই?
                      মোদের ঘরে আয়না এবার 
                      তোর সনে নেই লড়াই।
     
    কত সহজেই আপন করে নিতাম আমরা পরস্পরকে। একটা দিন দেখা না হলে সারাটা দিন মনটা মেঘলা হয়ে থাকতো। তারপর হঠাৎ করেই নেমে এলো বাঁধন আলগা হয়ে যাবার দিনগুলো। আমরা ক্রমশই হারিয়ে যেতে থাকলাম, বিশেষ করে ব্যস্ত শহরগুলো থেকে। আমজনতার অবশ্য আমাদের এভাবে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে মোটেই মাথা ব্যথার বালাই ছিলো না। তাঁরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত ছিল। কিন্তু কিছু মানুষ ভাগ্যিস আমাদের এই কমে যাওয়ার ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলো। আমাদের হারিয়ে যাওয়ার ফলে বাড়ছিল পোকামাকড়ের উপদ্রব। বাড়ির চারপাশে নেমে এলো অদ্ভুত এক স্তব্ধতা। আমরা গলা খুলে দোয়েল অথবা পাপিয়া দিদিদের মতো সুরেলা কন্ঠে গান গাইতে না পারলেও, অনর্গল কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত করে রাখতাম তোমাদের ঘর,দোর আঙিনা। 
     
    ধীরে ধীরে সব বদলে গেল। তোমাদের শহরগুলো আরও বেশি বেশি করে শহর হতে শুরু করলো। গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী মানুষের চাপ সামলাতে পুরনো সবকিছু ভেঙেচুরে সাবড়ে দেওয়ার এক প্রবল প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল তোমাদের মধ্যে। সাবেকি একতলা দুতলা বাড়িগুলোর জায়গায় মাথা তুলতে লাগলো আকাশ ছোঁয়া সব বাড়ি। সেসব বাড়ির এমন কেতা যে আমাদের ঘোসলা বানানোর মতো ঘুলঘুলিই আর র‌ইলো না। এককালে বাবুই ভাইয়ের সঙ্গে গলায় ঝড় তুলে কতনা অট্টালিকায় থাকার গর্ব করে ঝগড়া করেছি। আর আজ? কোনো ঠাঁই মোর নাহিরে!  
     
    তোমরা আমাদের ঘর কেড়েছো, বন বাদাড় লোপাট করে আমাদের খাদ্যের জোগানে ঘাটতি তৈরি করেছো, আমাদের সুখী সহাবস্থানের নিয়মকানুন সব ভেঙে দিয়েছো। এতেও তোমরা সন্তুষ্ট হ‌ওনি, আমাদের দেশ ছাড়া করেছো। আচ্ছা, সত্যি করে বলতো, আমরা কি শুধুই একটা পাখি হিসেবে তোমাদের সাথে, তোমাদের পাশে ছিলাম? এর থেকে বেশি কিছু নয়? তোমাদের প্রতিদিনের হাসি কান্না,সুখ দুঃখের সঙ্গে কি আমাদের কোনো সংযোগ ছিলনা? আমরা তোমাদের জড়িয়েই বাঁচতে চেয়েছিলাম। তোমরাই সম্পর্কের সেই ঐতিহ্য আর পরম্পরাকে ভেঙেছো, অস্বীকার করেছো মানুষ আর চড়াইয়ের পারস্পরিক সহাবস্থানের আদর্শকে।
     
    ভাবছো, আজ ফিরে এলাম কোথা থেকে? তোমরা বুঝি ভেবেছিলে আমাদের হাল‌ও বুঝি ডোডো খুড়োর মতো হবে? সত্যি বলতে কি আমিও তেমনটাই ভেবেছিলাম। শহর ছেড়ে দূরে, অনেক দূরে সরে গিয়ে ছিলাম আমরা সবাই। সেখানকার অবস্থা এখনো সবটা এমন নয়। তবে সেখানেও স্বস্তি নেই। ফসলের ফলন বাড়াতে যথেচ্ছভাবে খেত খামারে ব্যবহার করা হচ্ছে রাসায়নিক সার, আর কীটনাশক। তোমরা তোমাদের মরণফাঁদ নিজেরাই পাতছো, আর সাথে করে আমাদের‌ও লোপাট করে দেবার খেলায় মেতে উঠেছো। বলিহারি বুদ্ধি তোমাদের!
     
    আজ অনেক দিন পর তোমাদের ডাকে, তোমাদের সকলের কাছে এসে খুউব ভালো লাগছে।আজ গোটা দুনিয়ার ৫০ টির বেশি দেশে আমাদের ঘিরে বিশেষ উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে। সেই ২০১০ সাল থেকেই এমনটা হয়ে আসছে কিছু হার না মানা মানুষের চেষ্টায়। তোমরা জানো কি ২০১২ সাল থেকে আমরা এই চড়াইরা দিল্লি রাজধানী এলাকার রাজ্য পাখি। এখানে এসে শুনছি তোমাদের শহরগুলো থেকে বায়স দাদারা ও বেমালুম উবে গেছে। হাঁ হয়ে গেছি এমন কথা শুনে। অমন বুদ্ধিমান, পরিবেশ রক্ষার জন্য জানপ্রাণ লড়ে যাওয়া পাখিদের‌ও আজ ঠাঁই নেই তোমাদের শহরে। বলি কি কংক্রিটের জঙ্গল না বাড়িয়ে, সবুজ গাছে দেশ ভরো। তাহলেই হারিয়ে যাওয়া সব কিছু ফিরে পাবে তোমরা।এই ছোট্ট বন্ধুর কথা মনে রেখো। আজ চলি। ঐ শোন,কারা যেন শ্লোগান দিতে দিতে এদিকেই এগিয়ে আসছে, ছড়া কাটছে কি সুন্দর। একটু শান্ত হয়ে শুনি–
     
                 ওরে চড়াই, ছোট্ট চড়াই 
                  আয়না আবার ফিরে।
                 কিচিরমিচির বুলির সুরে,
                   দে না রে মন ভরে।
        ওরে চড়াই, মিষ্টি চড়াই, আয়না আবার ফিরে।
     
    বাহ্, খুব সুন্দর, খুব আন্তরিক আহ্বান। আজ চলি। ভালো থেকো তোমরা সকলেই।
     
     
    ** চড়াই দিবস পালন করুন। চড়াইদের ফিরিয়ে আনতে আপনিও সামিল হোন।
     

    ***** এই লিংকে ক্লিক করুন। অন্য মেজাজ পাবেন।
     https://www.4numberplatform.com/?p=34452
     
    # ছড়িয়ে পড়ুক সচেতনতার জন্য। 

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বহ্নি ভট্টাচার্য | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ২০ মার্চ ২০২৫ ০৮:১৬541790
  • আধুনিকতার দোহাই দিয়ে একে একে সবই হারাতে বসেছি আমরা...খুবই প্রাসঙ্গিক লেখা...
  • সৌমেন রায় | 2409:*:*:*:*:*:*:* | ২০ মার্চ ২০২৫ ০৯:৪৯541792
  • আগের থেকে অবস্থা একটু ভালো। ওরা এখন ভাঙ্গা ভেন্টিলেটর দিব্যি বাসা করা শিখে গেছে। ফিরে আসুক, সবাই মিলে মিশে থাকি।
  • PRABIRJIT SARKAR | ২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:৩০541795
  • আমার আগের ফ্ল্যাটে গিজারের খাঁজে বাসা করেছিল। ফ্ল্যাট যারা কিনেছিল তাদের বললাম ঘরে চড়াই বাসা বানালে ভাঙতে নেই। মা লক্ষ্মী কুপিত হন। তাই সব রঙ করলেও ওদের বাসা অক্ষত রেখেছি। আশা করি ওরা ওই বাসা ভাঙেনি।
  • শর্মিষ্ঠা লাহিড়ী। | 49.*.*.* | ২০ মার্চ ২০২৫ ২১:৪২541804
  • ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে চা রপাশে ঘুরে বেড়ানো পাখিটা আজ সত্যিই অনেক হারিয়ে গেছে। বাড়ির ঘুলঘুলি তে বাসা বাঁধতো, কখনো বাসা থেকে ডিম পড়ে ভেঙে থাকতো, আবার কখনো সদ্য জাত ছানা টা উড়তে শিখে মাটিতে পড়ে থাকতো, আবার তাকে স্বস্থানে তুলে দিতাম। সারাদিন ওদের কিচিরমিচির কানে অভ্যস্ত হয়ে থাকতো। আজ সত্যিই তারা সব উধাও। নতুন ক্রমবর্ধমান নগরায়নের দাপটে ওরা আর ঘরে বাঁধা র জায়গা পায়না।তাই উদাস মনে আমিও বলি, 'আয় ফিরে আয়।'
  • DrSourav M | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ২১ মার্চ ২০২৫ ১২:৪৫541820
  • Couldn't appreciate their disappearance that much but now when they are coming back and increasing in numbers it really is feeling good :)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন