বড় পুকুরটার পাশে একটা আড়াই কামরার বাড়ি, শৌচাগার এবং ছোট একটা রান্নাঘর সমেত। গায়ে কোন রঙ চঙ নেই। শুধু সিমেন্টের প্লাস্টার হয়ে পড়ে আছে প্রায় বছর দশেক। অনেকদিনের নি:সঙ্গ অবহেলায় চারপাশে ঘাস এবং আগাছার আলিঙ্গনে সমর্পণ করে আছে। অনাদি কারক ও ঘরখানা তুলছিল। গোবিন্দ কারকের দাদা অনাদি কারক। দুজনেই চাষ আবাদ করা লোক। সে যাই হোক, অনাদি ঘর তুলতে তুলতেই মারা গেল দু বছর আগে শীতকালে বুকে কফ জমে। হাঁফানির রোগ ছিল। খুব বাড়াবাড়ি হতে বাসন্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাঁচাতে পারেনি তারা। তাই ওই আধা তৈরি পাকা ... ...
অরুনাংশুবাবু মুখে রুমাল বেঁধে কষে নাক মুখের ফাঁকফোঁকর ঢেকেঢুকে পোস্টাফিসের ক্যাশ কাউন্টারে লাইন দিলেন এমআইএস-এর সুদ তোলার জন্য। লোকজন বিশেষ নেই। এই জনা পাঁচেক উলোঝুলো বুড়ো পাসবুক আর উইথড্রয়াল স্লিপ বাগিয়ে খাড়িয়ে আছে। লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্বের নির্ঘন্ট চালু আছে। কে বলে লোকে নিয়ম মানছে না ! প্রায় এক একটা ঠেলাগাড়ির সমান দূরত্বে এক একজন দাঁড়িয়ে। পাওয়া গেল ষোলশ টাকা। পরের মাস থেকে এরও কম পাওনা হবে। কি করে সংসার খরচ চলবে অরুনাংশুবাবু এখন ভাবতে চান না। শুধু ওষুধের খরচই মাসে সাত আটশো টাকা। সরকার নাকি কোভিড-১৯ এর মোকাবিলার জন্য খরচ কমাচ্ছে। বাজেট ঘাটতি টেনে নামাতে হবে। পেনশনারদের ঘরে বসিয়ে তোফা আরামে খাওয়ানোর তবিল কোত্থেকে ম্যানেজ ... ...
( ৩ ) নন্দনের কাছে পৌঁছে দেখল নানা রঙের গুলাল ফাগ পিচকিরি রঙের মহা হুল্লোড় চলছে। প্রায় পনের ষোল জন বাইশ চব্বিশ বছরের ছেলেমেয়ে হোলির রঙ উৎসবে মাতোয়ারা। দুনিয়া ভুলে মজে আছে রঙের উৎসবে। নানা রঙের আবীর উড়ছে হাওয়ায় চারপাশ রঙীন করে। রামশঙ্কর অভ্যাসবশত: ঝোলার মধ্যে আর একবার হাত দিল। একি ! হাতে পার্সের ছোঁয়াটা পেল না তো ....। রামশঙ্কর একটু ঘাবড়ে যায়। এমন তো হবার কথা নয়। রামশঙ্কর নন্দনের চত্বরে ঢুকে দাঁড়াল। ঝোলার ভেতর হাত ঢুকিয়ে হাতড়াতে ... ...
( ২ ) রামশঙ্করের মনটা আজ একদম ভাল নেই। বাদামী রঙের ভোলাভালা ভুলোটাকে কে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে। সকালবেলায় দেখল সজনেগাছের তলায় মরে পড়ে আছে। যন্ত্রণাকাতর মুখটা অসহায়ভাবে হাঁ করা। গ্যাঁজলা শুকিয়ে আছে চোয়ালের দুপাশে। পা চারটে টানটান হয়ে আছে। প্রাণটা বেরোবার আগে পর্যন্ত কত কষ্ট পেয়েছে ভেবে তার চোখে জল এসে গেল। সে রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে ভুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ..... খুব ন্যাওটা ছিল ..... কামারুল মোল্লার নামে কসম খেয়ে বলল — ভুলো তোকে ... ...
( ১ ) মসলন্দপুর থেকে ট্রেনে উঠল রামশঙ্কর। দুপুর দেড়টা বাজে। ডাউন ট্রেনে এই সময়ে ভিড় ভাট্টা বিশেষ থাকে না। রামশঙ্কর জানলার ধারেই জায়গা পেয়ে গেল। ট্রেন ছাড়ার পর একটা বিড়ি ধরাল। তার পাশের জায়গাটাও খালি আছে।কেউ এসে বসার আগেই বিড়িটা টেনে ফেলে দিতে হবে। ট্রেনে এখন বিড়ি ফোঁকা বারণ। ধরলে কেস খেতে হবে নিশ্চিত। কামরায় অবশ্য ধরার কেউ নেই। অনেক প্যাসেঞ্জারও অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে কামরায় বসে ধোঁয়া ছাড়লে। জানলা দিয়ে বাইরে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল রামশঙ্কর। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। রামশঙ্কর শেষ টান মেরে বিড়িটা ফেলে দিল। জানলা দিয়ে বাইরে ... ...
আলোকবরণ চৌধুরী বিল্ডিং-এর পনেরতলার ছাদে উঠে চারিদিক দেখতে লাগলেন। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। যেন সবুজ রঙের আলোয়ানে জড়ানো তলাটা। সবুজের ফাঁকে ফাঁকে নানারঙা নুড়ি পাথরের মতো উঁকি মারছে ঘরবাড়ি। আলোকবরণের বয়স এখন ছেচল্লিশ। রবসন কেমিক্যালস-এর সিইও। তিনদিন আগে জুরিখ থেকে ফিরেছে। এখানে ঝাড়খণ্ডের এই প্রোজেক্টটা সুপারভাইজ করতে আসতে হল। এসে এই পনেরতলা চারতারা হোটেলে উঠেছেন। স্যুট বুট ছাড়া হয় নি। ছাদের আলসে ধরে দাঁড়িয়ে দূরের নীলাভ ... ...
আগুনের বলের মতো উলের গোলা গড়িয়ে যাচ্ছে রিখির কোল বেয়ে। হাউসকোটে ঢাকা দুরন্ত মনোরম শরীর। মসৃন ছিমছাম পায়ের পাতা। পেডিকিওর করা পায়ের নখ। সাজানো অশোক ফুলের মতো। রিখির গায়ে কেমন যেন মেঘ কিংবা কুয়াশার গন্ধ। কার্পেটের ওপর রিখির পায়ের কাছে বসে আছে শমিত আর অনুপ। রিখি যদিও সোয়েটার বুনে চলেছে একমনে, তবু এটা কিন্তু শীতকাল নয়। ভরা গ্রীষ্ম। বৈশাখ মাস। ঘরের ভিতরে এয়ারকন্ডিশানার আর বাইরে ঝুরু ঝুরু ফুরু ফুরু বাতাস। শমিত এবং অনুপ এরা কেউই কিন্তু রিখির সৌন্দর্যরসে আকৃষ্ট হয়ে এখানে আসেনি। কিংবা প্রেম নিবেদনের উদ্দেশ্যে তার পদতলে বসে নেই। তারা দুজনেই অত্যন্ত বাস্তব একটি চাহিদা নিয়ে রিখির কৃপাপ্রার্থী ... ...
অমলেন্দুবাবু অনেকদিন বাদে চারতলার ছাদে উঠলেন। চারতলার ছাদে চিলেকোঠার ঘর। ঠাকুর্দার করা একান্নবর্তী পরিবারের এতবড় বাড়ি। বাড়িতে লোক অনেক। কিন্তু বাড়ি দেখভাল করার মতো মানুষের নিতান্তই অভাব। সকলেরই গা বাঁচিয়ে চলা স্বভাব। অমলেন্দুবাবুর বয়স প্রায় আশি হল। মুখ ঘুরিয়ে থাকতে পারেন না। গায়ে জ্বালা ধরে। বাড়ির দেখভাল যা করার তিনিই করেন। আজ প্রায় দু বছর পরে তিনি চিলেকোঠা ঘরের তালা খুললেন। দেখা দরকার ভেতরে কি অবস্থা হয়ে ... ...
জয়তী ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে বলল, ‘ ওঠ ওঠ .... বেলা নটা বাজে ... আর কত ঘুমোবে। ওঠ তাড়াতাড়ি। আজ রোববার। ঘরের ঝুল ঝাড়ব। পড়ে পড়ে ঘুমোলে জীবন চলবে ? ‘ অর্ণব কথা না বাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে বাইরে বেসিনের দিকে যায়। সেখানে তখন তার সাত বছরের ছেলে চিন্টু দাঁত ব্রাশ করছে। আজ রবিবার বলে দেরিতে দাঁত ব্রাশ। বাবাকে দেখে মাজনের ফেনা ভরা মুখে বলল, ‘ বাবা বাবা ...... আমাদের স্কুলে না সায়েন্স একজিবিশান হবে নেক্সট স্যাটারডে অ্যান্ড সানডে। সবাইকে হান্ড্রেড রুপিজ করে দিতে ... ...
একটা আয়না দেয়ালের পেরেকে টানানো ছিল। চৌকো ছোটখাটো তিন বিঘতের আয়না। শুধু মুখটুকু দেখা যায়। একটু পিছিয়ে দাঁড়ালে বুকেরও আধখানা দেখা সম্ভব। ওটার সামনে দাঁড়িয়েই দীপিকা চুল আঁচড়ায়, কপালে বিন্দি লাগায়, সিঁথিতে সিঁদুর ঢালে। মাঝে মাঝে চোখে কাজলও টানে।বাদল কসবার একটা বারের বাউন্সার। পয়সাওয়ালা ঘরের উড়নচন্ডী বেপরোয়া ছেলেমেয়েরা যেখানে বেহিসেবী টাকা ছড়ায় উন্মত্ত অবস্থায়।বাদল মাস গেলে হাজার পাঁচেক টাকা পায়। তাছাড়া ওই ফূর্তি করতে আসা পয়সায় টইটুম্বুর লোকগুলোর কাছ থেকে বখশিস বাবদ কিছু আমদানী হয়। আদতে এটাই তার আসল রোজগার। এতেই তার সংসার ... ...