বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--5


           বিষয় : নলসংক্রান্তি
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :Titir
          IP Address : 237812.69.01900.45 (*)          Date:25 Oct 2019 -- 10:49 PM




Name:  Titir          

IP Address : 237812.69.01900.27 (*)          Date:25 Oct 2019 -- 10:54 PM

নলসংক্রান্তি

কথায় আছে বাঙ্গালীর বারমাসে তের পার্বণ। বাংলার গ্রামে ঘরে সাড়ম্বরে পালিত হয় সে সব উৎসব। তেমনি এক পার্বণ, পার্বণটি হল নলসংক্রান্তি। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের সংক্রান্তিতে হয়।কেমন যেন মনেহয় সেই সময়ের লোকজন মাসের শেষ দিনটিতে এইসব উৎসব বা পার্বণ উদযাপন করার উপযুক্ত মনে করত। তা এই নলসংক্রান্তি ছিল ধান গাছের সাধভক্ষন উৎসব। সাধভক্ষন তাও আবার ধান গাছের ! শহুরে মানুষজনের কাছে আশ্চর্য্যজনক হলেও গ্রাম মফঃসলে খুব ঘটা করেই হত।

সংক্রান্তির দিন খুব ভোরবেলা নল গাছ (নল গাছ অনেকটা আখ বা বড় বড় কাশ গাছের মত দেখতে) কাটার ধুম পড়ে যেত। আগে আগে না গেলে ভালো নল গাছ পাওয়া যাবে না। তাই সকালবেলা বাড়ির পুরুষেরা যেত গাছ কাটতে। ছোট পিসিদের বাগানের একদিকে প্রচুর নল গাছ। শুধু এই উৎসবের জন্যই ঐ নল গাছ রেখে দেওয়া হত। মানে কেটে নেওয়ার পরে যে গাছগুলো থাকত তাদের থেকে আবার চারা বেরিয়ে নতুন গাছ গজাত। তার ফলে ওখানে আর অন্য কিছুর চাষ হত না। সবাই নিজের নিজের যত জমি, পুকুর,গোয়ালঘর আছে সেই অনুসারে নল গাছ কেটে নিয়ে যেত। সারাদিন সেই গাছ পুকুরের জলে গা ডুবিয়ে প্রতীক্ষা করত সন্ধ্যের জন্য। সন্ধ্যেবেলা সাজুগুজু হবে যে তার!

সন্ধ্যেবেলা বসত নল বাঁধার কাজ। সারাদিন ধরে এদিক সেদিক থেকে কেঁউ, কাঁচা হলুদ,কাঁচা তেঁতুল, নিম পাতা, তিতা পাট, ক্ষুদে আরন্দি, পঞ্চশস্য, চালকুঁমড়োর ডাঁটা, শশার গাছ,চালতা ও ওল জোগাড় হত সাধের উপকরণ হিসাবে। যে যেটা জোগাড় করতে পারবে সে সেগুলো নিয়ে আসবে ।এই জিনিসগুলো খুব একটা দুষ্প্রাপ্য ছিল না।কারুর না কারুর বাড়িতে থেকে মিলে যেত। নল বাঁধা হত কোন একজনের বাড়িতে বসে। আর সেটা সবসময় ছোট পিসির বাড়িতেই হত। একটু অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু এটা বলে রাখা মনে করি। আমার ছোট পিসি আর আমাদের বাড়ি পাশাপাশি। পিসিরা আগে থেকেই ওখানে থাকত, বাবা জ্যেঠুরা পরে ওখানে এসে বসতি শুরু করে ।

সে যাই হোক, নল বাঁধতে যেত ছেলেরা। কেন জানি না পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল মহিলা বর্জিত।সেই বয়সে এই সব প্রশ্ন মাথাচাড়া দিত না। আর মাথায় এত বুদ্ধিশুদ্ধিও ছিল না। এই বুড়ো বয়সে স্বদেশে বা বিদেশে দেখি সাধভক্ষন মানে মেয়েলি ব্যাপার। কিন্তু কি করে সেই গ্রামের মানুষজন এই একটা উৎসবকে পুরুষের কুক্ষিগত করেছিল জানা নেই আমার! অনুষ্ঠান শুরু হত শাঁখের আওয়াজে। সেই যে সারাদিনের সংগৃহিত সাধের দ্রব্যগুলি থেকে কেঁউ,ওল,চালতা, কাঁচা তেতুল, তিতা পাট,পঞ্চ শস্য,ক্ষুদে আরন্দি, নিমপাতা, কাঁচা হলুদ, কুমড়ো আর শশার গাছ নিয়ে সবাই মিলে ঢেঁকিতে কূটত। ওল, চালতা , কাঁচা তেঁতুল পরের দিন গৃহস্থের বাড়িতে দুপুরের রান্নার প্রধান উপকরণ। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ভাল করে কোটার পর শুরু হত বাঁধার কাজ। বাঁধন শুরুর আগে মহালক্ষ্মীর নাম স্মরণ করে প্রনাম জানাত তাঁর উদ্দেশ্যে। আর নলগাছের গোড়ার দিকের পাতাগুলো সাফসুতরো করে উপরের পাতাগুলো রেখে দিত। সবকিছু কুটানো জিনিশ দিয়ে এক একটি নল গাছের পাতায় ছোট্ট পুঁটলির মত করে বেঁধে দিত ওই পাতার ই বাঁধন দিয়ে । বাঁধতে বাঁধতে ছড়া বলত সুর করে।

"এতে আছে কেঁউ, ধান হবে আড়াই বেঁউ"।
"এতে আছে সুকতা ধান হবে গজমুক্তা"
"এতে আছে ওল,মহাদেবের বোল"
"এতে আছে কুমড়ো খাড়া (ডাঁটা), ধান হবে বিঘা আড়া"

আরো কত কি ছিল। কালের নিয়মে ভুলে গেছি তাদের। বেঁচে আছে স্মৃতিটুকু।

আশায় মরে চাষা,তাই প্রতি বছর এই আশা পোষন করে যেত মনে মনে। সবাই সবাই কে বাঁধতে সাহায্য করত। কারুর হয়ত অনেকবেশী জমি ,তার লাগত
অনেকগুলি নল গাছ বাঁধা। একা হাতে কুলিয়ে উঠতে পারত না, অন্যেরা হাত লাগাত শেষ করার জন্য।

এদিকে মেয়েদের কাজ ছিল পিঠে তৈরীর। সকালবেলা বড়ো বড়ো টোঁকায় (চাল ধোয়ার জন্য বাঁশের বা টিনের তৈরি ধুচনি ) চাল ভিজাতে দিত পুকুরে।এক সের দু সের চাল নয়। সে হবে আট দশ সের চাল। কত লোক খাবে সেই পিঠে। সেই অনুসারে চাল ভেজানো। ঘন্টাখানিক পরে সেই ভেজা চাল তুলে আনা হত পুকুর থেকে। জল ঝরার জন্য একটু কাৎ করে রেখে দিত। সেই চাল ফুলে ফেঁপে যখন তৈরি ,চলে যেত ঢেঁকিশালে। মেয়েরা গল্প করতে করতে সব চাল কুটে ফেলত। দুজন মিলে পাড় দিত ঢেঁকিতে আর একজন গড়ে (যে গর্তে হাত ঢুকিয়ে নাড়িয়ে দিত চালের গুঁড়ো)। এই হাত দিয়ে নাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা বড় সাংঘাতিক ছিল। সময় মতো হাত সারাতে না পারলে ঢেঁকির মাথায় যে লোহার পাত লাগলো থাকত তার আঘাত এসে লাগত হাতে। তাই অভিজ্ঞ কেউ ছাড়া সেখানে বসত না। এখানেও একে অপরের কাজে হাত লাগাত। চালের গুঁড়ো চালুনি দিয়ে ছেঁকে বড় বড় গামলা ভর্তি করে বাড়ি এসে যেত।একটু মোটা দানার গুঁড়োগুলো যাকে বলত 'মুলখি" সেও লাগত পোড়াপিঠে বানানোর জন্য।

সন্ধ্যের আগেই এই ঢেঁকিশাল পরিষ্কার করে দিতে হত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অর্থাৎ সাধের জিনিশগুলি কোটার জন্য। ছেলেরা যখন নল বাঁধায় ব্যস্ত, মেয়েরা সেই সময় ব্যস্ত রান্নাঘরে পিঠে তৈরিতে। ছেলেরাবাড়ি ফিরে এসে পিঠে খাবে। তৈরি হত ভাপা পুলি, ক্ষীর পুলি, দুধপুলি,ভাজা পিঠে বা সরা পিঠে আর সরু চাকলি। কচি কচি হাতগুলি সাহায্য করত মা বড়মাদের।আমাদের লোভ ছিল ওই পুরের উপর। গুড় আর নারকেলের পাক দিয়ে তৈরী পুরের গন্ধে ম ম করত চারিদিক।লোভের চোটে ঘুরপাক খেতাম চারপাশে।কখন একটু চাখার জন্য দেয়? আর ওই পিঠে তৈরির নাম করে পুলির পেটে গাদা গাদা পুর ভরে লক্ষ্মীর ভাঁড়, হাঁস আর ও হাবি জাবি কত কিছু বানাত ছোটরা । মা বড়মারা বকুনি দিত সব পুর শেষ করে ফেলার জন্য।
ছোটরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষ করত কখন তাদের হস্তশিল্পগুলি বেরিয়ে আসবে অক্ষত অবস্থায়। কারুর হাঁসের পেট বা লক্ষ্মীর ভাঁড় ফেটে গেলে অন্যরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত তার শিল্পকর্ম নিয়ে।সেই সব হাসাহাসি নিয়ে কেউ কিছু মনে করত না। সে ছিল নির্ভেজাল আনন্দের দিন একান্নবর্তী পরিবারে ।

নল বেঁধে বাড়ি ঢোকার আগে ছেলেরা জানান দিত বাড়ি ফিরে এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা ফুঁ দিত শাঁখে। নল গাছ বাড়ির ভিতর ঢুকত না । রয়ে যেত বাইরের বাড়ির চালে। শুরু হত পিঠে পুলি খাওার পালা। সবাই বসে খেত সাদা ধপধপে সরুচাকলি গুড় দিয়ে, সেই সঙ্গে নরম ফুলো ফুলো সরা পিঠে আর পুলি।গরম পুলিপিঠে আমাদের কারুর ভালো লাগত না। ভালো লাগত বাসি পিঠে। মা বড়মারা তার জালি ঘেরা মিটসেল্ফে তুলে রাখত পিঠে পরের দিনে খাওয়ার জন্য।

এ রাতে আবার ডাউক্যা বলে এক ভুত বের হত। সে নাকি কু বলে ডাক দেয়, আর যে তার ডাকে সাড়া দেবে তার আর রেহাই নেই। মৃত্যু অবধারিত। নাহ, আমাদের পোড়াকপালে তার ডাক শোনার মত সৌভাগ্য হয় নি। সে তার মত ভয় ঢুকিয়ে আমাদের জব্দ করে রাখত। পরদিন সকালবেলা মুখ হাত ধুয়ে পিঠে খাওয়ার জন্য
তৈরি সবাই , কিন্তু পিঠে খাওার আগে এক প্রস্থ পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষা হল "আলাই খাওয়ার "। আলাই তৈরি হত সেই উপকরণগুলি দিয়ে যা নল গাছের পাতায়
পুঁটলি বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। পুঁটলি বাঁধার পর যা বাকি থাকত সেগুলি প্রতি বাড়িতে চলে যেত আলাই খাওয়ার জন্য। সকালবেলা সেগুলিকে ভালোকরে বেটে ছোট
ছোট বড়ির মতো করে খেতে দিত। কিন্তু তেতোর চোটে কে খায়? যে না খাবে সে পিঠে খেতে পাবে না। সে এক কুরুক্ষেত্র বেঁধে যেত ছোটদের আলাই না খাওয়া নিয়ে। কেউ কেউ
জীভের তলায় লুকিয়ে রেখে দেখাত খেয়ে নিয়েছি, তাই মাঝে মাঝে পরখ করার দরকার পড়ত। সবশেষে দুধে জমা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা পিঠে খেয়ে বিশ্বশান্তি।মা আবার বাসি সরা পিঠে কে ঘন দুধের জাল দিয়ে ফুটিয়ে দিত। এই পিঠে খেতে আসত কত লোক। ধোপা, নাপিত, মজুরজন, যারা সারা বছর কাজ করেছে বাড়িতে। আর যেত লোকের বাড়িবাড়ি। আমাদের দায়িত্ব ছিল লোকের বাড়ি দিয়ে আসার। লোকের বাড়ি থেকেও আসত। এ ছিল এক লোকাচার। সবাই মিলে মিলেমিশে থাকার।

এদিকে নলগাছ নিয়ে বাড়ির কেউ বা মজুর সব জমিতে, একটা একটা করে গাছ পুঁতে দিয়ে আসত। জমিতে পোঁতার সময় বলত
"নল পড়ল ভুঁয়ে, যা শনি উত্তর মুয়ে"।
"আশ্বিন গেল, কার্তিক এলো,
সর্বধানের গর্ভ হল
ধান ফুলো, ধান ফুলো"।
পুকুর আর গোয়ালের ও একটা করে গাছ বরাদ্দ ছিল। হয়তো চাষীবাড়ীর লোকেরা গোয়ালভর গোরু আর পুকুরভরা মাছের ও স্বপ্ন দেখত।
দুপুরবেলা ভাতের সঙ্গে সাত শাকের ভাজা, ওলের ঘণ্ট, চালতার চাটনী হবেই হবে। ছোটরা শাকের ভাজা আর ওলের ঘণ্ট নিয়ে বিস্তর চেঁচামেচি করত।
মা বড়মারা বলত একটু খেয়ে দ্যাখ, গলা কুট কুট করলে চালতার চাট্নীতো আছে।

ধান হত কম বেশী, সরু মোটা, সোনালি। কি বা তাদের নাম- রুপশাল,ঝিঙ্গেশাল,কবিরাজশাল,রঘুশাল, জংলীজটা, তালমাঁড়,কাঁকুরে,কনকচুর, গন্ধমালতী। শেষ দুটি ধানের চাল মিহি মিহি, ছোট ছোট। চাষ হত পায়েস খাওয়ার জন্য। তালমাড়ের মুড়ি হত হালকা পলকা ফুলো ফুলো। একটু আমতেল দিয়ে মেখে খেলে অমৃত। অন্যগুলি থেকে ভাতের চাল বা মুড়ির চাল হত এক বা দো (দুই) সিদ্ধ করে।

প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় বর্ষা আর সময় মতো আসে না। এক দু মাস গড়িয়ে যায় তার আসতে। কচি ধানের গর্ভ সঞ্চারের লক্ষণ না দেখেই তাকে সাধ
খাওাতে হয় চাষীকে। কি করবে অসহায় চাষী? যে মাস তিথি দেখে তার পুর্বপুরুষেরা এই লোকাচার শুরু করেছিল তা সে কতদিন বজায় রাখতে পারবে তা সে জানে না। হয়ত কালের অতলে হারিয়ে যাবে এই লোকাচার। হারিয়ে যাবে ছোটবেলার কিছু সোনালি দিন।



প্রথম প্রকাশ ফেসবুক মজলিশ বসন্ত সংখ্যা মার্চ 2019 ।



Name:  dc          

IP Address : 237812.68.674512.109 (*)          Date:26 Oct 2019 -- 07:53 AM

মানুষের ইতিহাসে কতো লোকাচার বানানো হলো, কতো লোকাচার লোকে ভুলে গেল। সুমেরীয় সভ্যতায় কতো লোকাচার ছিলো, ইনকাদেরও কিছু কম ছিল না। সেসব এখন সবাই ভুলে গেছে। আবার এখন যেসব লোকাচার তৈরি হয়েছে সেগুলো একশো দুশো বছর পর ভুলে গিয়ে অন্য লোকাচার তৈরি হবে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া।


Name:  Atoz          

IP Address : 237812.69.4545.151 (*)          Date:29 Oct 2019 -- 12:10 AM

নলসংক্রান্তির লেখাটা খুব ভালো লাগল। এটাই কি আশ্বিনের শেষদিন আর কার্তিকের প্রথম দিন জুড়ে হয়? (পুবদেশীদের কেউ কেউ এই অনুষ্ঠান করেন একটু অন্যরকমভাবে, সন্ধ্যাবেলা প্রদীপের সারি জ্বালান বাড়ির সীমানা ঘিরে (দীপাবলির মতন ছাদে না কিন্তু, পাঁচিলে ), আর কচুরশাক রান্না, কচুরশাকের বদলে এররকম ডালও রান্না করা যায়, তিনচাররকম ডাল আর অনেক সব্জি দিয়ে। পরদিন সেই খাবার খেতে হয় মন্ত্র পড়ে নিয়ে।মন্ত্রটা হল "আশ্বিনে রান্ধে কার্তিকে খায়/ যেই বর মাগে, সেই বরই পায়। এই অনুষ্ঠানের আসল তাৎপর্য্য এতদিনে জানলাম। ধানগাছের মঞ্জরী ধরা উপলক্ষে! অপূর্ব। হবেই তো, ধান তো আমাদের লাইফলাইন, অন্ন বিনা প্রাণ টেঁকে না যে। )


Name:  i          

IP Address : 236712.158.891212.81 (*)          Date:29 Oct 2019 -- 12:44 PM

তিতির,
ভালো লাগল।
পাল পার্বণের একটা সিরিজ করুন। অনুরোধ।


Name:   শঙ্খ           

IP Address : 237812.69.453412.8 (*)          Date:29 Oct 2019 -- 10:38 PM

অপূর্ব হয়েছে বিবরণ। কুর্নিশ!

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--5