বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--5


           বিষয় : ময়নামতীর দুঃখ্সুখ এবং..........
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :Sarbani
          IP Address : 236712.158.8990012.177 (*)          Date:30 Aug 2019 -- 12:42 PM




Name:  Sarbani          

IP Address : 236712.158.8990012.147 (*)          Date:30 Aug 2019 -- 12:47 PM

ময়নামতীর দুঃখসুখ.......

শালিখের নাম ময়নামতী, পুকুরের নাম ভোম্বলদাস। সেদিন মাঝদুপুরে, আমড়া গাছের ছায়াটা যখন ভোম্বলের বুকের ওপর আড়াআড়ি পড়েছে, ময়নামতী পাড়ে বসে ডুকরে উঠল।ভোম্বলদাস সবে দেবদারু ডালের কানখুসকি কানে ফুরফুর দিয়ে চোখটা বুজতে যাবে, ঠিক তখনই টুপটুপ ঝরল ময়নার চোখের জল।

সেই ভোর থেকে শুরু হয়ে সারা বেলা পাড়ার বউ ঝি দের ঘাট সারা, কচিদের জলে হুড়োহুড়ি, বড়দের সাঁতার চান চলে, ব্যস্ত ভোম্বলের নিশ্বাস ফেলার জো থাকেনা দুপুর অবধি। সব মিটলে সে তখন একটু তন্দ্রার জোগাড় করে, আর আজ সেই ক্ষণে একী বিপত্তি!



বুকে জল পড়া ভোম্বলদাসের একেবারে না পসন্দ, সে চোখের জল হোক বা বৃষ্টির জল। এমনেতেই সে একটু মোটার দিকে, দুপাড়ে ধরেনা এমন শরীর, লম্বিতেও তেমনি, মাঝবরাবর ডুবে তল মেলাভার।

তার গভীরে দু চারটে বড় রুই কালবোশ, যারা পুরনো বাসিন্দা, তারা ঘাই মারা ছেড়ে অন্য কেউ সাহস করে যায়না, তালেবর সাঁতারুরাও নয়।



তা চেহারা অমন ভারভারিক্কি হলেও ভোম্বল বড় ভালো মনের পুকুর। মাছেরা তার গায়ে শান্তিতে হেলে দুলে খেলে বেড়ায়, পাখিরা উড়ে উড়ে ক্লান্ত হলে দুদন্ড পাড়ে বা ডালে বসে, জল খায়, সুখ দুখের কথা কয় তার সাথে। গাছ যা আছে তাদের ফল পাতা ফুল শুয়ে থাকে ভোম্বলদাসের দরাজ বুকে, নিশ্চিন্তে!

ভোম্বল সবাইকে ভালোবাসে, কথা কয় সবার সাথে, পরামর্শ দেয় সাহায্য করে, শুধু ওই জল পড়লে বড় বিচলিত হয়ে ওঠে, যেমন আজ হল।



জল পড়া মানে ভারী শরীর ফুলে ফেঁপে উঠে নড়াচড়া, দু পাড় ছাপিয়ে ওঠা, তাতে বাস যাদের সেইসব বাসিন্দাদের নাকালের একশেষ, সে নিজেও অত দৌড়ঝাঁপ পছন্দ করেনা।



“চুপ কর চুপ কর, কাঁদো মত, কাঁদো মত।।।।শেষমেশ একটা বানভাসি করে বদনাম করবে নাকি আমার। আমি এ পাড়ার সাত পুরুষের পুকুর, কত মান্যি আমার, পুন্যিপুকুর করে মেয়েরা আমার ঘাটে, কী বলবে সব, আমার কারণে ঘর দোর ভাসলে!”



ময়নামতী থতমত খেয়ে চোখের জল গপ করে গিলে ফ্যালে। বয়স তার কম, বুদ্ধি খানিক কাঁচা এখনো, তবে অবুঝও নয়। ভোম্বলদাসের বারন বোঝে কারন ভালো না বুঝলেও আর তাই জল আটকে শুকনো চোখে ফোঁপাতে থাকে।

“জ্বালালি দেখছি মেয়ে তুই। হল কী তোর? গলায় ফুটল কাঁটা, নাকি বেড়াল শম্ভুচরণ করল তোকে তাড়া?”



ময়নামতী তার সরু ঘাড় নাড়ায় সজোরে,

“না, শম্ভুদাদা ভালো বেড়াল, কাঁটাকুটো ভাত দুধ খায়, আমাদের দিকে চায় না। কিন্ত আমার বড় দুঃখু হচ্ছে আজকাল। সবকিছু কেমন বদলে যাচ্ছে, ভালোর আর যুগ নেই!”



ভোম্বলদাস এতক্ষণ মনে মনে ময়নামতীর কান্নায় একটু উদ্বিগ্ন মত হয়ে পড়েছিল, তাই মাঝ জলে বুদবুদ , ধারের জল চলকে ছল ছল শব্দ উঠে টুঠে একসা। ময়নামতীর কথা শোনার পরে, আবার সব ঠান্ডা হল। সাতপুরুষের সাত ঘাটের পুকুর মনে মনে হাসে। নাঃ বড্ড কাঁচা এরা, কিছুই দেখেনি সংসারের, কত জল বয়ে গেছে তার মাঝে, কত না উথালপাতাল, তবে গিয়ে আজ এত শান্ত নির্লিপ্ত হতে পারে সে!

কিন্ত এখন এই শালিখ ঠাকরুনকে সেসব বলে লাভ নেই।



চোখদুটো আধবুজে মাদার গাছের ডাল দিয়ে পিঠ চুলকাতে চুলকাতে বেজার গলায় ভোম্বলদাস বলে,



“হ্যাঁ, সে তো হরদম সব বদলাচ্ছে। এতকাল ধরে কত বদল যে দেখলুম পাড়ে পাড়ে। তা এই ধর দুধারে আমার সারি সারি কত তাল গাছ ছিল, পুন্নিমের সন্ধ্যেয় ঝিরঝির বাতাস বইলে তাদের কত গল্প কত গান। তালের মরশুমে ছোট বড় কাঁচা পাকা তাল সারাদিন রাত ধুপধাপ আমার কোলে কত খেলে বেড়াতো।।।।।সে সব দিন ছিল বটে, গন্ধে ম ম করত চারধার। আমাকে লোকে তখন নামই দিল তালদীঘি। সে নাম আজ কারো আর মনে নেই।”

ময়নামতী নিজের দুঃখ ভুলে হাঁ করে ভোম্বলের গল্প শুনছিল, শেষ হতে ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দেয় পুকুরকে,
“আহাগো, তোমার বড় প্রাণে লাগে নাগো? পুরনো সঙ্গী তালের সার, তার কিছুই তো বাকী নেই দেখি আর!

ভোম্বলদাস পোড় খাওয়া পুরনো পুকুর, জল ফেলা তার নাপসন্দ, সে সহানুভূতিতে না ভেসে, হাল্কা চালে বলে,

“নাঃ, সময়ের এই নিয়ম। তাল গিয়ে জাম মাদার আমড়া এসব এসেছে, এরাও মন্দ কী, মানে গণে আমায়, ডাল পাতার ছায়া দেয়, কোলে ওদের ফলেরা খেলে। তবে তালের একটা অন্যরকম ব্যাপার ছিল, সে মানতেই হবে। যত একানড়ে ভুতেদের বাস ছিল তালের টঙে, নানান কান্ডকারখানা, সরগরম থাকত জায়গাটা। তালগাছ গিয়ে ভুতগুলোও সব কোন চুলোয় যে পালালো!”

বলতে না বলতেই দু চারটে পাতা উড়িয়ে একটা ঝোড়ো মতন হাওয়ায় ভেসে সাদা এক বিঘত লম্বা বেলুন একটা ভুত হাজির।

“গাসে না গাসে না, অহন আমরা ঘাসে থাহি”

ময়নামতী সাদা বেলুনের আওয়াজ শুনে চেহারা ঠাহর করতে সরু গলা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে চোখ গোল গোল করে তাকাতেই থাকে।

“ভুত এমন হয় বুঝি, ও ভোম্বলদাস দাদা”
ভোম্বলদাস আবার বেজার, বেলা পড়ে আসছে, ঘুমের তার আজ দফারফা। প্রথমে ময়নামতী, এখন আবার এই ভুত নরেশচন্দ্র সাঁপুই!

“হ্যাঁ বীর ভূত সব তোমরা, তালগাছ ছেড়ে এখন ঘাস ধরেছো, রাজপ্রাসাদ গিয়ে ছিটেবেড়ার দাওয়া! আর যত নজর আমার মাছের দিকে, মেছোভূতের দল! এই তোমরা আর ওই মাছরাঙা কৃষ্ণকিশোরের জন্যে নিন্দেয় আমার কান পাতা দায়। মাছগুলো সাবড়ে যাও তোমরা আর লোকে বলে ভোম্বলদাসের জল ভালো নয়, মাছ বাড়ে না মরে যায়। কৃষ্ণকিশোরকে তো আমি আজকাল বাঁশের লগিতে বসতে দেখলেই জলে এমন ঢেউ তুলি যে বাছাধন মাছ খাওয়া ভুলে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচে না। কিন্ত এই ভূত গুলোকে আমিও ঠিক ধরতে পারিনা, এমন লুকিয়ে চুরিয়ে কাজ সারে এরা!”

নরেশচন্দ্র লজ্জায় অধোবদন, তারাই বা কী করে, বাসস্থান গেছে, ভোম্বলদাসের মাছই তাদের একমাত্র ভরসা, তাই ঘাসে থাকতে হলেও এ পুকুরের পাড় তারা ছাড়ার কথা ভাবতে পারেনা।

ময়নামতী এবার উসখুস করে, বিকেল হলে ভোম্বলদাসের আর তার কথা শোনার সময় হবে না, ঘাটে ঘাটে গা ধোওয়া বাসন মাজা শুরু হয়ে যাবে, ভোম্বল এ ঘাট ও ঘাট জল দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

“ও দাদা, আমি যে এখানে একদম একা। এদিকে আর কেউ নেই। আমার এতদিন কোনো অসুবিধে ছিলনা, তোমার পাড়ে পাড়ে ঘুরে আমড়া মাদার ডুমুর জামরুল খেয়ে দিব্যি উড়ে বেড়াতাম। যবে থেকে বড় হইছি, রঙটা ছাই থেকে খয়েরী হয়েছে আর গলার কাছে হলুদ, সবাই দেখলেই হুস হুস করে তাড়ায়, চোখ বুজিয়ে ফেলে, আমার এমন শ্যামলা মাজা রঙ, এমন নরুন চেরা ঠোঁট, কাজলা চোখ কেউ ঘুরেও দেখেনা।”

নরেশচন্দ্র এতক্ষণ ময়নামতীকে খেয়াল করেনি, ভোম্বলদাসের বকুনিতে লজ্জা পেতেই ব্যস্ত ছিল, এখন ময়নার পুরো কথা শুনে সে এহে এহে করতে করতে ঘুরে যায় অন্য দিকে।

মুখ চোখ না বোঝা গেলেও ঘোরাটা দিব্যি বুঝতে পারে ময়নামতী, তার গলা রোঁয়া সব অভিমানে ফুলে ওঠে,
“দেখছ ভোম্বল দাদা, শেষে ভুতেও আমার দিকে তাকাবেনা বলে মুখ না কী ওদের তাই ঘুরিয়ে নিচ্ছে! নাঃ আমাকে তোমার তলায় নিয়ে নাও, ডুব দিই। কারোকে আর মুখ দেখাতে হবে না।”

নরেশচন্দ্র কোনোদিকে একটা তাকিয়ে একটা ঘাসফড়িং চিবোতে চিবোতে বলল,
“তার চেয়ে একটা সঙ্গী যোগাড় করে দুটিতে থাকলেই তো হয়। সবাই আদর করে ডেকে নেবে, দুর দুর না করে নমস্কার করবে, কত সম্মান হবে!”

ভোম্বলদাস চুপ করে দুজনের কথা শোনে। ময়নামতী এবার অভিমান ভুলে রাগে বেগুনী।
“কেন, সাথে সঙ্গী না থাকলে আমার দিকে তাকানো যাবেনা। এ আবার কেমন কথা! কী এমন দোষ করেছি আমরা শালিখেরা, যে আমাদের জন্যে এমন সৃষ্টিছাড়া নিয়ম ! যতদিন না কেউ জোড়া আসে আমাকে ততদিন লোকের তাড়া খেতে হবে। এই তো তোমরা আমাকে দেখছ এতক্ষণ ধরে, কী খেতিটা হয়েছে শুনি?”

ভোম্বলদাস পুকুর, ঘুম না হওয়ায় রাগে চুর। ঢেউ তুলে ঝাঁঝিয়ে ওঠে,

“ খেতি হয় নি মানে? এই যে দুপুরের বিশ্রামটা বরবাদ হল তোদের জন্যে, সে খেতি নয়।”

নরেশচন্দ্র সাঁপুই, বেলুনের শেষটা ল্যাজের মত সরু করে হাওয়ায় ভাসিয়ে উড়ন্ত আর একটা ঘাসফড়িং খপ করে ধরে মুখে পুরে বলে,

“আমিও তো পুকুরদার কাছে মাছ চুরির জন্য গাল খেলাম, ময়নামতীর মুখ দেখেছি বলেই না!”

ময়নামতী শালিখের মুখটি করুণ হয়ে এল, তা দেখে আমড়াগাছও ছলছল, ফোঁটা ফোঁটা টুপটাপ জল ঝরে, ওদিকে পড়ন্ত রোদে মেঘের ছায়ার মত, আকাশও বুঝি নরম হয় ময়নার কথা শুনে।

ভোম্বলদাস পুকুরের বুক করে দুরুদুরু। এইভাবে সবাই যদি জল বর্ষায়, তার তো মহা বিপদ, যে করেই হোক ময়নামতী শালিখের মুখে হাসি ফোটাতে হবে তাকে!

“ ও আমার শালিখ রানী ময়নামতী বোন। রাগিস কেন তুই, এই সামান্য ব্যাপারে রাগতে হয় নাকি, ছিঃ, তুমি না বড় হয়েছ, মাজা রঙ, নরুনচেরা ঠোঁট, কাজলা চোখ তোমার। পৃথিবীতে এরকম কত নিয়ম আছে আবার নিয়ম ভাঙার উপায়ও সমান আছে, আর তোর এই সামান্য সমস্যার সমাধান নেই!”

ময়নামতী কোনো উত্তর করে না তবে শুনতে থাকে ভোম্বলদাস পুকুরের কথা। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তে শুরু হয়েছে, আকাশও শুনছে পুকুরের কথা, দরকার বুঝে জল পড়ার গতি বাড়াবে!

সামান্য হাঁপাতে থাকে ভোম্বলদাস পুকুর, জল পড়ে ফুলতে শুরু করেছে মাঝ বরাবর সে।

তবু দম নিয়ে সে নরেশচন্দ্র সাঁপুই কে বলে

“ময়নার দিকে তাকা, তারপর ঠিক তার নীচেই আমার জলের দিকে তাকাবি।”

সাঁপুই সম্ভবত ঘোরেনা, কারন হাওয়া দেয়না। তাই দেখে পুকুর বলে,

“এই আমার হাতে একটা কালবোশ, দেখলে পাবি, না দেখলে আমার পাড়ের ঘাস সব উপড়িয়ে তোদের বাস ঘোচাবো।”



এবার হাওয়া দেয়, ঝড়ে দু একটা পাতা ওড়ে, ময়না কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে আরো একটু এগিয়ে যায় ভোম্বলদাস পুকুরের দিকে।

পুকুর জলের গলায় নরেশচন্দ্র সাঁপুইকে আবার জিজ্ঞেস করে,

“কীরে কী দেখিস?”

সাদা বেলুন নড়েচড়ে এগোয় ময়নামতী শালিখের দিকে, পৌঁছে যায় ভোম্বলদাস পুকুরের একদম পাড়ে।

“এ যে দেহি দুইখান ময়না, ডাঙায় এক ও জলে আরেক।”

“তবে ? জোড়া হল কিনা, দেখলি কিনা জোড়া ময়নামতী, নমস্কার কর নমস্কার কর!”
ময়নামতী খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। সাদা বেলুনের নজর তখন জল থেকে ডাঙায় ওঠা কালবোশের দিকে, লেজ বাড়িয়ে সাপটে তুলে নেয় কালবোশ আর রুই, তালগাছ ও অধুনা ঘাসের বাসিন্দা নরেশ সাঁপুই!

আকাশ হেসে রোদ উঠে পড়ে আবার, আমড়া গাছ খুশীতে টুপটাপ পাতা ঝরায় ভোম্বলদাসের জলে।

ঘাটে ঘাটে আনাগোনা শুরু, বিকেলের কাজ শুরুর আগে ভোম্বলদাস পুকুর ঢেউ তুলে এগিয়ে যেতে যেতে, ময়নামতী শালিখকে বলে,

“ময়নামতী বোন, আমি থাকব যতক্ষণ, তোর পাশে সুখে দুখে। এক থেকে তুই হলি যে দুই, তোর ছায়া আমার বুকে।”
*****************************


Name:  Sarbani          

IP Address : 236712.158.1234.155 (*)          Date:07 Sep 2019 -- 09:06 PM

যখন মানুষ নিয়ে আর লিখতে ইচ্ছে করেনা.............:)


Name:  Sarbani          

IP Address : 236712.158.1234.155 (*)          Date:07 Sep 2019 -- 09:08 PM

মোলোই বুঝি শম্ভুচরণ ......

মকর সংক্রান্তির দিন। ভোম্বলদাস পুকুরের আজ শুকোবার পজ্জন্ত সময় নেই। সেই কাকভোর থেকে ঘাটে ঘাটে গ্যাঞ্জাম, এই একদল চান সেরে যায় তো আর এক দল আসে চাল ফল ধুতে। বৌ ঝিয়েরা বাসী কাজ সারে তাড়াতাড়ি।।।।সব ঘাটে জল যোগাতে পুকুর হাঁসফাস করে ভারি।
বয়স তো তার কম হল না, সাত পুরুষ ধরে এ পাড়ার জল জুগিয়ে যাচ্ছে, কোনোদিন এতটুকু এদিক ওদিক হয়নি। ভরা গ্রীষ্মেও ভোম্বলদাস পুকুর এতটুকু শুকিয়েছে এমন অপবাদ শত্তুরেও দিতে পারবেনা।
শত্তুর অবিশ্যি নেই কেউ তার। এ অঞ্চলে সবাই তাকে মানেগণে বিস্তর। তার পাড় ঘাট সাফ রাখে সকলে, নিয়ম করে জলের কচুরীপানা তোলে, কাকচক্ষু জল, করে টলটল, আহা। তবে ভোম্বলদাস পুকুর, রাগলে কসাইয়ের কুকুর। মুখ তার হলে ভার, বান ভাসি তোলপাড়।
বেড়ালের নাম শম্ভুচরণ শান্তিপ্রিয় অতি, ইঁদুর ধরায় বা ঝগড়া করায়, নেইকো তার মতি। ওপাড়ার কেলে হুলো কর্কটক্রান্তি, নিত্য এসে এপাড়ায় বাধায় অশান্তি। এ অবস্থায় অবশ্য নির্বিবাদী শম্ভুচরণ বেড়াল চাইলেও চুপ করে বসে থাকতে পারেনা, দুই মুরুব্বি ভোম্বলদাস পুকুর, আর কৃপাশংকর কুকুর, পাঠায় তাকে লড়াইয়ের ময়দানে, কাকুতি তার কেউ না শোনে।

তখন আর কী করে! মাঠের সীমানার এদিকে সজনে গাছতলায় দাঁড়িয়ে সজনেপাতা বা ফুল গায়ে মেখে কিছুক্ষণ “মিউ মিউ ঘরররর ঘররররর যাও যাও” করে বেচারা শম্ভুচরণ বেড়াল, তাতে যদিও কর্কটক্রান্তির দলবলের বিশেষ কোনো হয়না হেলদোল। বরং তারা খি খি খ্যা খ্যা হাসে আর মাঝে মাঝে এক আধ জন উঁচু আলটায় পা ঠেকিয়ে, এই এলাম, এসে পড়লাম, করে ভয় দেখায়।
তবু শেষ অবধি কেউ সীমানা পেরোতে পারে না, তা শুধু কুকুর কৃপাশংকরের দাঁত খিঁচুনি আর ভৌ ভৌ চিৎকারে, বেপাড়ার হুলোর দল ফিরে যায় যে যার ঘরে।
যদিও শম্ভুচরণ ভাবে বেপাড়ার যত বজ্জাত সব হুলো, বুঝি তার ধমকি আর শাসানিতেই ভয়ে পালালো!


আজ ভোরে সবে সুয্যি ঠাকুর পুব মাঠের তালসারির ওপরটিতে দেখা দিয়ে পিঁড়ি পেতে বসব বসব করছে, বেড়াল শম্ভুচরণ দখিন পাড়ের ছাই গাদায় আছাড়ি পিছাড়ি খেতে লাগল, সংগে ভয়ানক সুরে আর্তনাদ, মিয়াও , খ্র্যাচ, খিঁউ!
ভোম্বলদাস পুকুর ব্যস্ত বড়ই আজ, সাত ঘাটে তার সাত রকম কাজ।শম্ভুচরণের কাতরানো সে প্রথমটা দেখেও তাই দেখেনা। পুকুর না এলে কী হবে, শম্ভুচরনের চিৎকারে ছাইগাদার পাশে এক এক করে এসে জড় হয়েছে পাড়ের অন্য বাসিন্দারা।
ডাঙার দিকে প্যাঁকপ্যাঁক করে এগিয়ে আসে বিন্ধ্যেশ্বরী হাঁস তার গুটি চারের পরিবার সাথে। আমড়া গাছে পুঁটি ঝুঁটি দুই ফিঙে, ডুমুর গাছের ল্যাজঝোলার সঙ্গে এতক্ষণ পোকার ভাগ নিয়ে চিল ঝগড়া করছিল, তারা জমায়েত দেখে ঝগড়া মুলতুবী রেখে ঘন হয়ে আসে।
কৃপাশংকর পাড়ার কুকুর ভুলো, বন্ধু যে তার শম্ভুচরণ হুলো।গোয়ালধারের রোদে এতক্ষণ গেরস্তর দেওয়া বাসী রুটি দিয়ে প্রাতঃরাশ সারছিল, বন্ধুর খবর শুনে খাওয়া ফেলে হাজির। ওদিকে এই সবে নতুন ধান উঠেছে, তাই মাঠে চরম ব্যস্ততা, তা সত্বেও মেঠো ইঁদুর কাত্যায়ন এসে পড়েছে, তারও শম্ভুচরণ দাদার সাথে হেভি ভাব।
কাত্যায়ন ইঁদুরকে দেখে কৃপাশংকর কুকুরের মুখ বেঁকে যায়, শম্ভুচরণের সাথে কাত্যায়নের দোস্তি তার হজম নেহি হোতা।
কলিকাল হায়, বেড়াল শম্ভুচরণ, ধরেনা ইঁদুর, খায়না মাছ, এ বড় অসৈরন।
বয়রা গাছের ডালে বাসা ক্ষ্যান্তমনি টিয়ের। সকাল সকাল উড়তে বেরোবার আগে ঘরদোর গুছিয়ে নিচ্ছিল। হইচই শুনে সে এসে ছাইগাদার পাশে পুকুর পাড়ের পেয়ারা গাছে বসল।
সবাই প্রতিবেশী তারা, একে অন্যের খেয়াল না রাখলে চলবে কেন!
চলে সকলের গুলজার গুলতানি, কেউ জানেনা শম্ভুচরণের কী কারণে হয়রানি!
বলি সংক্রান্তির রান্নাঘরের দিছল নাকি হানা, ধরা পড়ে খেয়েছে বুঝি গেরস্তর ঠোনা? কী হল ও শম্ভুচরণ, কী কষ্ট তোমার? বলি শুধু চেঁচিয়ে ভোম্বলদাস পুকুরের পাড় মাথায় করো কেন?
সমবেত চেঁচামেচিতে কাতরানো থামিয়ে, আরো নিস্তেজ হয়ে নীচুস্বরে ইঁ ইঁ করতে থাকে শম্ভুচরণ বেড়াল।

মন্দিরে মকর সংক্রান্তির পুজো শুরু হয়ে গেছে, সারা পাড়ার লোক সেখানে। ভোম্বলদাস পুকুরঘাটের ভিড়ভাট্টা দিনের মত শেষ। হাঁফ ছেড়ে সে আসে হন্তদন্ত, শুনতে এদিকের সকল বৃত্তান্ত । ডালিম গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ উঁকি দেয়, জলে তার উষ্ণতার আভাস, গভীর থেকে সেই ওমের টানে উঠে আসা মাছেদের বীজগুড়ি ছাড়া আপাত শান্ত জল। ভিড়টা ভোম্বলদাসকে দেখে নড়েচড়ে। ভোম্বলদাস পুকুর, সবার গুরুঠাকুর। সে পুরো ব্যাপারটা শুনে শম্ভুচরণের সামনে এসে হাঁক দিল,
বলি হল টা কী শম্ভুচরণ, মাখছ কেন ছাই, এদিকে যে বুকে আমার কাতলা মারে ঘাই।মাছ ছেড়ে সকাল থেকে গোল জুড়েছ একি, অলুক্ষুনে কাজকারবার বন্ধ কর দিকি।
পুকুরের গলা শুনে ডুকরে ওঠে শম্ভুচরণ বেড়াল
ও পুকুরদাদা গো, আমাকে তুমি বাঁচাও। আমার গা ম্যাজম্যাজ করে, চোখ টনটন করে, পেটে আমার বেজায় ব্যথা, যাচ্ছি আমি মরে!

সেই কথা শুনে লাগল ভারী গোল। দু চারটে ছোকরা চড়ুই ভিড় দেখে এ ডাল ও ডাল ছুঁয়ে কিচকিচ করে খবর দেওয়া নেওয়া করছিল, ক্ষ্যান্তমণি টিয়ে, মুখঝামটা দিয়ে, দিল তাদের উড়িয়ে। ফিঙে বোনেদের দুজনের এই ঝগড়া এই ভাব, এমনধারা চলে সবসময়, তারা শম্ভুচরণ বেড়ালের কী হয়েছে তাই নিয়ে সমানে ঝগড়া করছে ও একমত হচ্ছে। সবাই একসাথে নিজেদের মতামত জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে দেখে ভোম্বলদাস পুকুর মহা বিরক্ত হয়ে এক পেল্লাই ধমক হাঁকল।
চুপ করে থাক দিকি চেঁচাসনে মেলা, কামকাজ নেই বুঝি কারো সক্কালবেলা।যাও যাও তোমরা সব নিজের কাজে, ডাকা হোক বরং পঞ্চানন পেঁচা কবিরাজে।
ধমক খেয়ে এবার ভিড় টা সরে খানিক দূরে গেল, শম্ভুচরণ বেড়ালও চুপ মেরে আবার নেতিয়ে যেই কে সেই, দু চোখ আদ্ধেক বোজা তার, কোনো সাড় নেই।



Name:  Sarbani          

IP Address : 236712.158.1234.155 (*)          Date:07 Sep 2019 -- 09:13 PM

**********
ইতিমধ্যে পাশের পাড়ার কেলে হুলো কর্কটক্রাল্তিও কীকরে জানি খবর পেয়ে এসে পড়েছে। শম্ভুচরণের সাথে তার আদায় কাঁচকলায়, এমনে সে ঢোকে না এ পাড়ায়।
এখন অবস্থাগতিকে পাড়া ছাড়িয়ে সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে ভালোবেড়ালের গলায় বলে,
-এ কী সর্বনাশ হল, শম্ভুচরণ দাদার এ অবস্থা কে করল, এ তো চোখে দেখা যায় না।
অন্যরা চুপ থাকলেও মুখরা ক্ষ্যান্তমনি টিয়ে, নাকে নোলক দিয়ে, ওঠে খরখরিয়ে,
-তোমার তাতে কী কাম শুনি, বজ্জাত হুলো,তোমার শাপেই বুঝি আমার শম্ভুদাদা মোলো।সবসময় ফন্দি আঁটো, পাড়া দখল করার,কে জানে কী তুক করেছে শম্ভুচরণ মারার।
সেই শুনে সবার রাগ হল খুব, সবাই মিলে কর্কটক্রান্তি হুলোর ওপর মহা চোটপাট করতে থাকে। ভোম্বলদাসের মত ঠান্ডা পুকুরও উত্তেজিত হয়ে জল টল উছলিয়ে একাকার। ফিঙে চড়ুইরা কর্কটক্রান্তি হুলোকে ঠোকরায়, কাত্যায়ন ইঁদুর তার পা কুট কুট করে কামড়ে দেয়, শেষে কৃপাশংকর কুকুর দাঁত খিঁচিয়ে গরগর করে তাকে পাড়ার সীমানা অবধি তাড়িয়ে আসে।
সমবেত আক্রমনে কর্কটক্রান্তি হুলো বেকায়দা, পালাতে পালাতে চিঁ চিঁ করে,
-বেড়াল ছাড়া বেড়ালের কষ্ট বোঝে কে, তার তরেই তো এসছিনু বিন বুলায়ে।
পেঁচো ভুতে ধরেছে একে লক্ষণ পরিস্কার, বেশী দেরী হলে হবে মহা অনাচার, সময় থাকতে নাও ব্যবস্থা, নইলে সিরিয়াস হবে অবস্তা!

হুলোর মুখে ভুতের নাম শুনে সবাই দমে গিয়ে শান্ত এবার, ভূতের কান্ডখারখানা কেউ জানেনা কী ব্যাপার। মাছেরা অনেকে ঘাটের কাছে এসে চুপচাপ সব শুনছিল, শম্ভুচরণ বেড়াল মাছ খায় ঠিক কথা কিন্তু অকারণে মাছ মারেনা, তার চাহিদাও কম, ভোম্বলদাস পুকুর যতটুকু দ্যায় তাতেই তার হয়ে যায়। মাছেদের ভয় অনেক বেশী পাড়ের মেছো ভুতে, তাই ভুতের নাম শুনে তারা তড়িঘড়ি একসঙ্গে গভীরে পালাতে গিয়ে জলে তোলপাড় তুলল আর ভোম্বলদাস পুকুরের জল ফুলে ঢেউ তুলে একশা কান্ড। জলে ঢেউ তোলা ভোম্বলদাসের একেবারে নাপসন্দ । জল ফুলে উঠলে তার হাঁসফাস লাগে। চেহারাটি তার হৃষ্টপুষ্ট, হতে দেখে জল নষ্ট, সে রেগে গিয়ে বলে ওঠে,
ভুত ধরেছে কিনা তা সঠিক যাবে বোঝা, তবে থাক কবরেজ, ডেকে আনো কেউ গিয়ে নিত্যানন্দ বক ওঝা। প্রমাণ হলে এখান থেকে তুলব ভূতের বাস, উপড়ে ফেলে পাড়ের যত ঘাস।

একটা হাওয়া বয় পূবে, জামরুল গাছের ডাল কেঁপে উঠে, আর এক বিঘৎ সাদা আবছা লম্বা কাঠি বেলুনের মত আকারের একখান ভুত ভেসে আসে, পিছন পিছন একটু দুরত্বে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আরো কয়েকটা আবছায়া।কাঁইমাই করে বলে,
-একি কথা পুকুরদাদা, এ কেমন বিচার? আমাদের কথাটাও শোনেন কিনা একবার।
ভুতেদের সর্দার, নিরাপদ জোয়ারদার, খবর শুনে দৌড়ে এসেছে ছেড়ে কাজকারবার। ভোম্বলদাস পুকুর, বেকায়দায় পড়লেও বুদ্ধি ধরে প্রচুর। ধমকে ওঠে নিরাপদ জোয়ারদারকে। ভুত দেখে বাকীরা একটু দূরে সরে গেছে, বিশ্বাস নেই কী করতে কী হয়, ভুতেদের সবাই করে ভয়। শুধু ভোম্বলদাস পুকুরের কোনো ভয়ডর নেই, সে এক ধমক দিয়ে বলে,
-বিচার তো এখনো হয়নি, বিচার হবে ওঝা নিত্যানন্দ বক এলে। তুমি আর তোমার সাঙ্গোপাঙ্গ মিলে দিনরাত পুকুরের মাছ চুরি কর, লোকে বদনাম আমাকে করে, যে ভোম্বলদাস পুকুর মাছেদের বাড়তে দেয়না, জল তার আর সেই আগের মত নেই। কই সে নিয়ে তো আমি কিছু বলিনি। দ্যাখো দিকি আমাদের বেড়াল এই শম্ভুচরণ, অবস্থা তার যে এখনতখন। কী ব্যারাম যাচ্ছেনা যে বোঝা, তাই সবার মতে হচ্ছে ডাকা নিত্যানন্দ ওঝা। দোষ যদি কিছু নাই হয়, তবে তোমার কিসের ভয়?
-ও পুকুরদাদা, বলি এত ভুত চাদ্দিকে।তুমি তো জানো আমাকে, সেই কোন আমল থেকে আমি তোমার পাড়ের ভুত, তালগাছ থেকে আজ ঘাসে নেমে এসছি তবু তোমায় ছাড়িনি।যদি কোনো ভুত কিছু করেই থাকে, পেঁচো ভুত বা মেছো ভুত,আমি শাস্তি দেব তাকে। কিন্তু তুমি সক্কলকে পাড় থেকে তাড়াবে, এ কেমন বিচার।
নিরাপদ জোয়ারদার, নয়কো সে ভুত ভয়ংকর। তাই কৃপাশংকর কুকুর আর ক্ষ্যান্তমনি টিয়ে, দেখেশুনে সাহস পেয়ে, গুটিগুটি এল এগিয়ে।ওদিকে শম্ভুচরণ পড়েছে আরো এলিয়ে।

ক্ষ্যান্তমনি ঝাঁঝিয়ে ওঠে,
-ওহে বাছা ভুত, দেখেশুনে তুমিই নাহয় বল কী হয়েছে শম্ভুচরণ দাদার, শরীরে তার নেইকো ক্যানে জুত?
নিরাপদ জোয়ারদার, হতে পারে ভুতেদের সর্দার, কিন্তু তার তেজ নেইকো মোটে, বয়স হলে এমনটা হয় বটে।সে সবাইকে ভয় পায় আজকাল, ক্ষ্যান্তমণিকেও পেল, কৃপাশংকরের দাঁত দেখে তো তার প্যালপিটিশন হতে থাকে। কোনোরকমে নিজেকে সামলে বুকে জোর এনে বলে,
-পুকুরদাদা আমাকে একটু সময় দাও। ভুতেদের সভা চলছে পাড়ার শেষে বনের মধ্যে আশশেওড়া গাছে। আমি সেখান থেকেই আসছি। একটু খোঁজ নিয়ে দেখি কেউ কিছু জানে কিনা, তারপর নাহয় দিও ওঝাকে ডাক, ঘাস সাফের ব্যাপারটাও আপাতত মুলতুবী থাক ।
ভোম্বলদাস তাকিয়ে দেখে বেড়াল শম্ভুচরণ, কাহিল এখনো তবে, আছে জ্ঞান টনটন। ভূতের কথায় রাজী হয়ে সে সবাইকে কাজে যেতে বলে। সে নিজেও ঘাটে ঘাটে কাজ সারতে গেল, কৃপাশংকর কুকুরকে পাহারায় রেখে। অন্যরাও এদিক ওদিক কাজে যায়, খানাপিনা ছানাপোনা, কাজ কী আর একখানা! যদিও দৃষ্টি সবার রইল ছাইগাদায়, মন খারাপ এক সমুদ্র, আহা কী যে হল শম্ভুচরণ বেড়াল দাদার।

খানিকটা সময় কেটে গেছে, শেষ হয়েছে মন্দিরে মকরের পুজো। বাড়ি বাড়ি দুপুরের খাবারের তোড়জোড়, চাল ধুতে ডাল ধুতে বউ ঝিরা ঘাটে, ওদিকে ধান তোলা শুরু দক্ষিণের মাঠে। ভোম্বলদাসের এ সময়টা, এই দিনটা বড় প্রিয়, ঝিউড়িরা কোমর জলে দাঁড়িয়ে মকর পাতায়, দেখে চোখ জুড়োয়।নবান্নের আনন্দে মাতে সারা পাড়া, সাত পুরুষের পুকুরের শিরায় শিরায় শান্তি আর আনন্দ বয়ে যায়, আহা ভালো থাকুক আমার পাড়া, আমি থাকি জলে ভরা।
আজ অবিশ্যি এসবে পুরোপুরি মন দিতে পারেনা, শম্ভুচরণ বেড়াল অনেককালের সাথী, চিন্তায় চিন্তায় আনমনে কাজ সারে। কিছুক্ষণ পরে, নিরাপদ জোয়ারদার ভুতকে দেখা যায় মাথা নীচু করে ফিরতে। আসলে মাথা তো কিছু নেই, তবু নীচু হওয়াটা বেশ বোঝা গেল। বেলুনটা আর ততটা লম্বা নেই, কুঁকড়েমুকরে আয়তনে যেন আদ্ধেক হয়ে গেছে।
সবার ডাকাডাকিতে ভোম্বলদাস হাজির হয়ে বেজার, চাদ্দিকে কাজ তার হাজার, কিন্তু আজ এদিকেও বাঁচামরার সওয়াল, বেকায়দায় পড়েছে বন্ধু শম্ভুচরণ বেড়াল।
-পুকুরদাদা, এবারটির মত মাফ করে দাও, গলতি হয়েছে ভারী।ছোকরা ভুত এক নয়া, কোথা থেকে কিছুদিনের জন্য হাজির হুয়া। মহা পাজী বলে, কালকেই সবাই তারে মেরে তাড়ালে।
আজ শুনি শম্ভুচরণ বেড়ালভাই, তার ভাগের মাছ খেয়েছিল তাই, সে বোধহয় শোধ নিয়েছে যাবার বেলায়, ভুত কমিটির মতামত এমনটাই।
-সর্বনাশ তাহলে কী উপায়?
এরপর যা হল তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলনা। কেউ এনিয়ে কিছু বলা বা পাকা মাথার আলোচনার অবকাশ ছাড়াই দেখা গেল ছাইগাদায় ঝোড়ো হাওয়া উঠিয়ে, সবাইকে ছাই মাখিয়ে একাকার করে, বেলুনটা চট করে সিঁদিয়ে গেল বেড়াল শম্ভুচরণের ভেতর, আর তাতে যেন শম্ভুচরণ আরও গেল নেতিয়ে, চোখ আধবোজা থেকে ফুল বুজিয়ে।
হায় হায় করে ওঠে যেখানে যতজন,
মোলোই বুঝি বেড়াল শম্ভুচরণ।
ভোম্বলদাস মহা পরেশান, ঘনঘন নিশ্বাস নিতে থাকে, পুকুর ফুলে তাতে বানভাসি প্রায় হয় হয়। ফিঙে চড়ুইরা মহা ক্যাঁচরম্যাচর লাগিয়ে দিয়েছে, ক্ষ্যান্তমণি টিয়ে, কান্না জুড়ে দিয়ে, সেই জল পড়ছে পুকুরে গিয়ে, তাতে আরো বিভ্রাট। আকাশ বাতাস থমথম করে, টাপুর টুপুর বৃষ্টি ঝরে, ভিজে ওঠে মাঠঘাট!
পাড়ের বাসিন্দারা সব মারমুখী, নেহাত বেলুন পিছলিয়ে যায় খালি, নইলে এতক্ষণ টের পেত পাজী ভুতগুলি। গোলমাল দেখে ভুতেরা ভয়ে নিরাপদ দূরত্বে উঠেছে আশশেওড়া গাছে গিয়ে । কৃপাশংকর কুকুর, আকাশের দিকে মুখ করে কান্না শুরু করে দেয়, সেই আওয়াজ শুনে, এদিক সেদিক থেকে পাড়ের বাকী বাসিন্দারা ছুটে আসে, উত্তেজনায় বেপাড়ার কর্কটক্রান্তি হুলোও আবার ঢুকে পড়ে সীমানা পেরিয়ে, কেউ তাকে খেয়ালও করে না।
মিনিট কয়েক এইভাবে চলার পর আবার হাওয়া উঠল, ছাইগাদাতে উড়ল ছাই আরেকবার।অবাক চোখে সবাই দেখে, চোখ খুলেছে শম্ভুচরণ বেড়াল, আর তার কান থেকে হাত ঝেড়ে বেরিয়ে আসছে সাদা আবছা বেলুনমত, নিরাপদ জোয়ারদার, ভুতেদের সর্দার।

ভোম্বলদাস পুকুর, কৃপাশংকর কুকুর, এছাড়া আরো যত আশপাশের জন, খুশী তাদের মানেনা বাঁধন। সবার হইচইয়ের মাঝে নিরাপদ জোয়ারদার মিনমিনে নাকি সুরে কয় বারবার,
-বদমাশ ভুতের বজ্জাতির তরে, বিগড়ে গেছিল কলকব্জা বেড়ালের অন্দরে। এমনটা কখনো দেখিনি আগে, অনেককষ্টে রিপেয়ার করে এনেছি তাহাকে বাগে।
ভোম্বলদাস মহাখুশী। ফুরফুরে মিঠে রোদ উঠেছে, দিনটা এখনো শেষ হয়নি, নবান্নর পায়েসের গন্ধে ম ম করছে পাড়া। ওহে, শম্ভুচরণ অনেক হল এবার উঠে দাঁড়া।ভুতেদের সে বলে,
-যদি শম্ভুচরণ সারে, এবারকার মত তোদের করে দিনু মাফ, আবার যদি বেচাল দেখি পাড়ের ঘাস চিরতরে করব সাফ।

শম্ভুচরণ উঠে বসতে সবাই খুশীতে করে হই চই। ক্ষ্যান্তমনি খরখরিয়ে বলল,
-কাজ নেই বাবা মাছ খেয়ে আর, থাকো শুধু দুধেভাতে, নইলে বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে বজ্জাত ভূতের হাতে।
সব বৃত্তান্ত শুনে শম্ভুচরণ বেড়ালও বলে,
-নাক মুলি কান মুলি মাছ খাবনা মোটে, দুইবেলা দুধভাত খেয়ে যাবে আমার কেটে।
মাছেরা এই শুনে মহা খুশী হয়ে পুকুরে তোলপাড় তুলতে ভোম্বলদাস জল ভাসিয়ে সবাইকে তাড়া লাগালো, জল নোংরা করছে সব, কাজে যাও কাজে যাও। এদিকে কর্কটক্রান্তি হুলো মুখভার করে,
-হ্যাঁ ভাই, আমাকে তো তোমরা কেউ পছন্দ করোনা ভাই, সমস্যাটা আমি না বাতলালে তো ভুতেদের কথা কারো মনেই আসেনি, তবু কি কেউ একটু সুখ্যাত করছে আমার, সবসময় খালি দুর দূর। বেড়াল হয়ে শম্ভুচরণ বেড়ালের দুঃখ আমিই তো সব্ব আগে বুঝেছি, যাই ভাই,আসি ভাই, গেলাম ভাই, ভালো থেকো ভাই।

সে কী অভিমান, জলে ভরে নাক কান, তবে বলছে বটে কিন্তু যাচ্ছে না।সবাই তখন হুলোকে খুব খাতির করতে লাগল, বটেই তো বটেই তো, ছিল বলে এই কর্কটক্রান্তি, ফিরে এল ফির এপাড়ে শান্তি।
শম্ভুচরণ আর কর্কটক্রান্তি দুই পাড়ার হুলো্‌.........সেই থেকে দুজনের দোস্তি হয়ে গেল ।

(শেষ)


Name:  Ela          

IP Address : 236712.158.782323.11 (*)          Date:08 Sep 2019 -- 07:03 AM

বাঃ

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--5