বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--3


           বিষয় : অ্যামেরিকায় নাট্যচর্চার সালতামামি
          বিভাগ : নাটক
          শুরু করেছেন : ন্যাড়া
          IP Address : 237812.68.234512.22 (*)          Date:03 Aug 2019 -- 01:10 AM




Name:   ন্যাড়া           

IP Address : 237812.68.234512.22 (*)          Date:03 Aug 2019 -- 01:11 AM

দীইইইইইর্ঘ প্রবন্ধ, খনু-স্টাইলে। গেল-বছর অগ্রবীজ পত্রিকা ছ্যাপেছিল।


Name:   ন্যাড়া           

IP Address : 237812.68.343412.137 (*)          Date:03 Aug 2019 -- 01:12 AM

এই লেখাটার একটা প্রেক্ষিত না দিলে লেখাটা খাপছাড়া লাগতে পারে। একে লেখা না বলে বরং স্বগতোক্তি বলা যাক। অ্যামেরিকায় দীর্ঘদিন নাট্যচর্চা করে ক্ষান্ত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি, প্রবাসে নাট্যচর্চার সুখ ও অসুখ। এ তার খতিয়ান না হলেও, সেই চিন্তাসম্পৃক্ত বটে। নিজের অনুভবকে ঠিকমতন প্রকাশ করতে চুঁইয়ে আসা সিনিসিজমকে চেপে রাখতে চাইনি। পাঠক যদি কোথাও সিনিসিজম দেখতে পান, চোখ সরিয়ে নেবেন না। এও নাট্যচর্চার অন্যতম বাই-প্রোডাক্ট, অম্বল ও আলসার-সহ। এই সিনিসিজম সত্বেও বলব, এখন অন্ততঃ অ্যামেরিকার বাংলা নাটকে অনেক নিজস্বর উঠে আসছে, যা কুড়ি বছর আগেও অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু প্রবন্ধের শেষ লাইন লেখার আগে একটা মুখবন্ধ করা যাক।


ডাক্তারি, ফোটোগ্রাফি আর নাটক - এ তিনটেয় বাঙালি জন্ম-ইস্তক এক্সপার্ট। বিশেষতঃ নাটক। প্রবাসী বাঙালীর নাট্যচর্চা এ ব্যাপারে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এ শুধু আজ নয়। আবহমানকাল ধরে, মানে যবে থেকে বাঙালি প্রবাসী হতে ও নাটক লিখতে শিখেছে, তবে থেকে। যে আসনে এককালে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বসতেন, সেখানে আজ কয়েক দশক ধরে মনোজ মিত্রর আসন। চন্দ্রগুপ্ত থেকে কেনারাম-বেচারাম। ব্যতিক্রম কি আর নেই? ষাটের দশকে ব্যাঙ্গালোরের বাঙালিরা শুনেছি বঙ্গে-বর্গী-টর্গী স্কিপ করে একেবারে রক্তকরবীতে ল্যান্ড করেছিলেন। সত্তর দশকে তাদের উত্তরসূরীরা ইংরিজি অনুবাদে মারীচ সংবাদ মঞ্চস্থ করবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী!


বাঙালির প্রবাস বলতে আগে ছিল পশ্চিম, অর্থাৎ নবদ্বীপ। এখন হয়েছে অ্যামেরিকা। সুপ্রীতি ঘোষের গানমাফিক "যেথায় গেলে হারায় সবাই ফেরার ঠিকানা গো"। প্রবাসে বাঙালির নাট্যচর্চা বলতে অ্যামেরিকায় বাঙালির নাট্যচর্চার কথাই বলব। বিপুলা পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি। অ্যামেরিকা মানে সমগ্র অ্যামেরিকাও কী আর! নিজের উঠনসমুদ্র অব্দিই তার দৌড়। তথাপি বিলেত, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, অ্যাফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য কি এশিয়ার অন্যদেশের গল্প ভাল করে না জানলেও, আশা করছি ঊনিশ-বিশের বেশি তারতম্য হবে না। অ্যামেরিকায় আমার নাট্যকর্ম মূলতঃ এনাদ (একটি নাটকের দল') নামক দলের সূত্রে। কাজেই কথাপ্রসঙ্গে, উদাহরণ হিসেবে, মাঝে মাঝে এই দলের কথা আসবে।


আমি নব্বইয়ের দশকে অ্যামেরিকায় দেখা নাট্যকর্ম দিয়ে শুরু করি। তুলনামূলকভাবে বাঙালি-অধ্যুষিত নিউ জার্সি কিম্বা ক্যালিফোর্নিয়ায় সেই মনোজ মিত্রর নাটকেরই রমরমা দেখেছি। কিম্বা কলকাতা তথা মফস্বলের একাংক-প্রতিযোগিতা সার্কিটের 'চাপা-পড়া-মানুষ' থেকে 'একটি অবাস্তব গল্প'। সে নাটক হত মূলতঃ দুর্গাপুজোয়। সপ্তাহান্তে স্থানীয় স্কুলের জিমন্যাসিয়ামে বা অডিটোরিয়ামে হয় দুর্গাপুজো। সেই অডিটোরিয়ামেই সন্ধ্যেয় নাটক। প্রবাসের পুজো সম্পূর্ণ করতে একটি প্রতিমা, ক'টি কোষাকুষির সঙ্গে একটি বাংলা নাটক প্রয়োজন। এ কোন সিরিয়াস নাট্যচর্চা নয়। সিরিয়াস নাট্যচর্চার পরিস্থিতিও নয়। কুশীলবদের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া প্রাপ্তবয়স্করা ব্যস্ত গজল্লায়, খোকা-খুকুরা ছোটাছুটিতে। অডিটরিয়ামের ভেতরেই। এই যখন অবস্থা, তখন সিরিয়াস নাট্যকর্মের সঙ্গে যদি গোদের ওপর বিষফোড়ার মতন জোটে মগজ-খাটানর নাটক, তবে নাট্যকর্মটির দর্শকটানার ক্ষমতায় ওখানেই ইতি। কারণ দর্শকদের চাহিদা, যদি দেখতেই হয়, 'দমফাটা হাসির' নাটকের। অথচ এই নিউ জার্সির পাশেই নিউ ইয়র্ক শহরে 'এপিক থিয়েটার' সে সময় থেকেই সিরিয়াস নাট্যচর্চা করতে শুরু করেছে বেশ ক'বছর। নামটি, যারা বোঝার বুঝবেন, ব্রেখট সাহেবের থেকে ধার করা। যদিও, যদ্দুর স্মরণ, এপিকের কর্মকান্ড ব্রেখটেই আবদ্ধ ছিলনা।


কি দেশে, কি বিদেশে - অন্যান্য আরও কিছু অবশ্যম্ভাবী চাহিদার সঙ্গে নাট্যচর্চা করতে গেলে যা লাগে তার মধ্যে একটি নাটক ও হল-ভরানো রসিক দর্শক অবশ্যই। আর এই দুটোই বিদেশে বিরল।


বাংলাভাষায় নাটকের অভাব এ কথা বললে ঘোড়ায় হাসবে ঠিকই, কিন্তু ভেবে দেখলে এর মধ্যে সত্য আছে। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, গিরিশ ঘোষদের পরের যুগে হাতে গোনা জনা-চারেক নাট্যকার ছাড়া বাংলায় নিয়মিত ও ন্যূনমান-ধরে-রাখা নাটক আর কেউ দিয়ে যাননি। নব্বইয়ের দশকে এলেন আরও জনা দুয়েক। এ বাইরে বাংলা রঙ্গমঞ্চের চাহিদা মিটিয়েছে বিদেশী নাটকের অনুবাদ ও বঙ্গীকরণ। পেশাদার রঙ্গমঞ্চে সেই সঙ্গে ছিল গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ। ওপার বাংলার ছবিটা একটু ভাল হয়ত। কিন্তু খুব কিছু নয়।


আমরা কথায় বলি "নাটক-নভেল", কিন্তু বাঙালির কালেক্টিভ সাইকিতে নাটককে নভেল পেছনে ফেলে এসেছে বহুদিন। কোন সাহিত্যপত্রিকা (কটাই বা আর আছে!) বা সাহিত্যযশোলোভী সাময়িক পত্রিকায় নিয়মিতভাবে নাটক প্রকাশিত হয়? নিয়মিত প্রকাশের কথা ছেড়েই দিন, অনিয়মিতভাবেও হয়না। এমনকি পুজোসংখ্যা বা বিশেষ সংখ্যায়ও নাটকের স্থান আজ অনেকদিন হল আর নেই। বাংলাভাষাভিত্তিক শহুরে সংস্কৃতির খোদ পীঠস্থানেসমূহেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে বাপে-খেদানো মায়ে-তাড়ানো দুখিনী প্রবাসের অবস্থাটা কী হবে কল্পনা করুন!


প্রায় একই মন্তব্য প্রযোজ্য নাট্যামোদি দর্শককুলের অস্তিত্ব সম্বন্ধে। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরার শহর-গঞ্জের যাবতীয় আমোদ ঠাঁই নিয়েছে সিনেমা হলে বহুদিন। কলকাতায় সুস্থ, অসুস্থ সব নাটকের ঠাঁই শ্যামবাজার বা অ্যাকাডেমি চত্বরের অভয়ারণ্যে। নব্বইয়ের দশকে এদিক-সেদিক কিছু নাটকের হল হয়ে ডেমক্রাটাইজেশনের পরাকাষ্ঠা হল। আশির দশকে বাগবাজার অঞ্চলের গিরিশ মঞ্চ দিয়ে সেই ডেমক্র্যাটাইজেশনের শুরু। আবার ওই একই সময়ে পুরনো পেশাদার রঙ্গমঞ্চগুলো ক্রমশঃ বন্ধ হবার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছিল। কাজেই নাটক দেখব বললেই, নাটক দেখা যেত না। অল্পবিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হত। টিকিটের দামের দিক দিয়েও, নাটক সিনেমার মতন গেরস্তপোষা ছিলনা। স্মৃতি যদি বিশ্বাশঘাতকতা না করে, তবে আশির শেষে যখন সিনেমাইয় ভদ্রগোছের জায়গার টিকিটের দাম ছিল আড়াই টাকা, নাটকে তদ্রূপ জায়গার টিকিটের দাম সাত টাকা। ফলে ছাত্রাবস্থায় নাটকপন্থী হবার পথ না ছিল সুগম, না সুলভ। এই আবহাওয়ায় বড় হয়ে যারা পরের জীবনে অ্যামেরিকায় আসছেন, তাঁদের মধ্যে কতজনের যে নাট্য-আমোদি হওয়া সম্ভব সেটা বোধহয় সমাজতত্বের বিষয়।আশির দশকে কলকাতা শহরে বয়োপ্রাপ্ত হবার সুবাদে জানি, সিরিয়াস নাটক দেখা কলকাতা শহরের মেনস্ট্রিম সময়-কাটান বা আনন্দলাভের মাধ্যম ছিলনা। তখনও না, এখনও না। নব্বইয়ে বড়-হওয়াদের আগমন শুরু হয়েছে কিছু বছর। প্রবাসে বাংলা নাটকের হাল তাতে ফেরে কিনা সে ব্যাপারে আমরা জনগণ দমবন্ধ করে অপেক্ষা করছি.!


এ প্রসঙ্গে বলা ভাল যে যে কোন পারফর্মিং আর্ট - সে গান শোনাই হোক, বায়াস্কোপ দেখাই হোক কি নাটক দেখা - তার জন্যে একধরণের দীক্ষা, একধরণের ট্রেনিং দরকার। যে কোনদিন নাটক দেখেনি, তাকেও বহুরূপীর 'অয়দিপাউসে" বসিয়ে দিলে তৃপ্তি মিত্রর ইওকাস্তের সামনে বেভুল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা টাকায় ষোল আনা। কোলেরিজ-কথিত ও নাটক-সম্বন্ধে বহুল-ব্যবহৃত লব্জটি মেনে ডিসবিলিভের ইচ্ছাকৃত সাসপেনশনের ট্রেনিংটি আমজনতার করায়ত্ত নয়, যা নাটক দেখার পক্ষে অবশ্যসূত্র। সুতরাং, অ্যামেরিকার বাঙালিদের মধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠের সিরিয়াস নাটক দেখার অভ্যেস গড়ে ওঠেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অ্যামেরিকায় আমাদের সিরিয়াস নাট্যপ্রয়াসের আলোচনা করতে হবে।


প্রথমেই একেবারে লজিস্টিক সমস্যাগুলো দেখা যাক। নাটকের প্রোগ্রাম বা লিফলেটে যাকে 'ব্যবস্থাপনা' বলে দাগিয়ে দেবার বন্দোবস্ত আছে। যেহেতু পুজোমন্ডপ নাটক দেখা বা দেখানোর পক্ষে একেবারেই যোগ্য নয়, প্রথমেই ভাবতে হয় কি করে নাটকের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি করা যেতে পারে। অনেক ভেবেচিন্তে দেখা যায়, শুধু নাট্যসন্ধ্যার আয়োজন করে হল ভাড়া নিয়ে নিজেরা টিকিট বেচে নাটক করা এর প্রায় একমাত্র উপায়। প্রথমে ভাবা যাক হলের কথা। পেশাদার যে নাট্যমঞ্চ আছে, সে সব মঞ্চ ভাড়া নেবার কথা ভাবতে গেলেও রেস্তর যে জোর থাকা দরকার, সে কোন প্রান্তিক নাট্যদলের থাকে না। তার ওপর সে দল যদি ইংরিজি ছেড়ে বাংলা ভাষায় নাটক করে, তাহলে তো কথাই নেই! কারণ টিকিটের দাম বিশ-পঁচিশের টাকার বেশি হলেই সেই টিকিটের দাবীদার হয়ে পড়বেন বলিউডি ধামাকা। "চল্লিশ টাকাই যদি এক সন্ধ্যের জন্যে দেব, তাহলে বাংলা নাটক ছেড়ে বলিউডি জমজমাটে ফুর্তি ডবল।" সুতরাং টিকিটের দাম রাখতে হবে এমন যাতে দর্শক ধামাকামুখী না হয়ে পড়েন। কাজেই নজর পড়ে স্কুল বা স্থানীয় কলেজের অডেটোরিয়ামের ওপর। এদেশের হাইস্কুলে অডেটোরিয়াম থাকে। বিশেষতঃ কিছু স্কুলের অডেটোরিয়াম তো বেশ ভাল - প্রমাণ-সাইজের প্রসেনিয়াম স্টেজ, এয়ার কন্ডিশনিং আছে, অ্যাকাউস্টিকস (অর্থাৎ সাউন্ড) মন্দ নয়, ন্যুনতম মানের আলোর সরঞ্জামও মজুত। লোক ধরে দুশো-আড়াইশো। ভাড়াও যা তা কুড়িয়ে-বাড়িয়ে পনেরো-বিশ টাকার টিকিট করেও দিয়ে দেওয়া সম্ভব।


এরপরে আবিষ্কার করা গেল যে কোন কোন শহরের নিজেস্ব যে অডেটোরিয়াম আছে, যা সাজসরঞ্জাম ও ব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে স্কুল কলেজের হলের থেকে অন্ততঃ দু-তিন গুণ ভাল, সে হল সরকারের এবং সুলভে পাওয়া সম্ভব। তদুপরি সে হল কোন নন-প্রফিট সংস্থার নামে ভাড়া করলে সুলভতর দক্ষিণায় পাওয়া সম্ভব। কাজেই নাট্যদল যদি নিজেদের নন-প্রফিট বলে ঘোষণা করে আর নইলে অন্য কোন নন-প্রফিটের হাত ধরে তবে হল ভাড়ায় আরও পয়সা বাঁচান যাবে। নিজেদের নন-প্রফিট ঘোষণা করায় অনেক হ্যাপা। বিস্তর নিয়মিত নথি-টথির ব্যাপার। সেই নথির চক্করে খুব কম দলই পড়তে চায়। কাজেই টিকিট বিক্কিরির একাংশ নন-প্রফিটকে দান করার অঙ্গীকারে আমরা সেই নন-প্রফিটের নামে হল ভাড়া নিতে পারতাম। এর ফলে টিকিট বিক্কিরিতেও সুবিধে হত 'অমুকের চ্যারিটিতে' - এই ঘোষণায়। নন-প্রফিটও কাগজে নিজেদের নাম ধার দিয়ে, এবং সামান্য শ্রমদান করে নিজেদের ফান্ডে কিছু আমদানী করতে পারে।


হল পাওয়া গেল এবং হলে লোক ধরে আড়াইশো। কিন্তু সে লোক আসবে কোথা থেকে? বড় শহরাঞ্চলে - যাকে মেট্রোপলিটান এলাকা বলা হয় - আড়াইশো দর্শক জোটানো শক্ত নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু নাটকের টিকিট-বিক্কিরির চক্করে যে মজেছে, সেই জানে। পরিচিত দল যদি নাটক করে, তাহলে শতখানেক দর্শকের আসা মোটামুটি নিশ্চিত। যাদের ক্যাপটিভ অডিয়েন্স বলতে পারি। কিছু মুষ্টিমেয় দর্শক আছে, ইন্ডাস্ট্রির ভাষায় যাদের ফ্লায়িং অডিয়েন্স বলে। অর্থাৎ আগে থেকে পরিকলনা ছাড়াই যারা নাটকের দিন এসে টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেনেন। এরকম বাঙালি দর্শক প্রায় নেই বললেই চলে। বাকি দর্শকদের কাছে নাটককে পৌঁছতে হবে। এমনিতেই প্রবাসী বাঙালির বারো মাসে তেরশো নেমনতন্ন। উইকেন্ডে। কাজেই শুধু বলিউডি ধামাকা নয়, বাংলা নাটককে অন্নপ্রাশন ও সাধভক্ষণের সঙ্গেও নিরন্তর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয় প্রবাসে। এর ওপর বাঙালি দর্শক হাসির নাটক চায়। আমাদের দলের প্রথম নাটক ছিল বাদল সরকারের 'পাগলা ঘোড়া'। সে নাটকে কুশিলবদের যত উৎসাহ, তার শতাংশের একাংশও যদি দর্শকের মধ্যে নাটকের আগে সঞ্চারিত করা যেত, তবে টিকিট বিক্কিরির কিছু সুরাহা হত। বাবা-বাছা করে টিকিট বিক্কিরি করতে গেলে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে, "হাসির নাটক তো?"


এ ব্যাপারে শুধু দর্শককে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই। আশি-নব্বইয়ের দশকে নাটক দেখা তেমন জনপ্রিয় ব্যাপার ছিলনা। আশির দশকেও যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছেলেকে অ্যাকাডেমিতে নাটক দেখতে যাবার সুবাদে 'আঁতেল' উপাধি পেতে হয়েছে। কাজেই তারাই যখন অ্যামেরিকা আসবে, তখন দারুণ নাট্যবোদ্ধা হয়ে যাবে এমন আশা করাটা নাহক বোকামি। কিন্তু তার পরেও তাদের কোনরকমে নাটকের হলে এনে যদি দেখান হয় 'কেনারাম-বেচারাম' আর 'সাজানো বাগান', তাহলে সেই দর্শকদের নাটকমুখী করার শেষ চেষ্টাটিও আঁতুড়েই বিনষ্ট করা হল। নাটকগুলোর মান সম্বন্ধে এখানে কোন কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু এ নাটকের জীবন, সমস্যা ও সমাধান, যদি কিছু থেকে থাকে, প্রবাসী জীবনের থেকে তা এতই দূরে যে, দর্শকদের তাতে কতখানি মগজের চাহিদা মিটতে পারে সেটা ভেবে দেখার। ইউনিভার্সাল ট্রুথের ঢপ দিয়ে কত আর নাটক দেখান যায়!


আমরা নিজেরা দেখেছি বাদল সরকারের নাটকের থেকে নিজেদের লেখা নাটকে সময়বিশেষে বেশি সাড়া পাওয়া গেছে। এর কারণ অবশ্যই এই নয় যে শিল্পগতভাবে বাদল সরকারের নাটকের চেয়ে আমাদের স্বলিখিত নাটক উচ্চাঙ্গের। কিন্তু কোথাও নিজেদের জীবনের গল্প গিয়ে দর্শকদের তন্ত্রীতে এমন সুর তুলেছে, যেটা বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের কাহিনীতে তারা পাননি। এবং এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই কারণেই নিউ জার্সির দল ইসিটিএ-তেও নাট্যকার সুদীপ্ত ভৌমিককে নিজের নাটক নিজেকে লিখতে হয়। অন্যান্য দলও ক্রমশঃ উপলব্ধি করেছে, নিজেদের গল্প বলতে গল্প নিজেদেরই লিখতে হবে। শৈল্পিক উৎকর্ষের ব্যাপারে খুঁতখুঁতুমিকে গোল্লায় দিয়ে বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা আর সমসাময়িকতাকেই যে এই দলগুলো প্রাধান্য দিচ্ছেন, এ খুবই আশার কথা। উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার এই যে, তুলনামূলকভাবে গত পাঁচ-সাত বছরে মৌলিক নাটকের উপস্থাপনা অনেক বেড়ে গেছে।


কাজেই প্রবাসীদের জন্যে নাটক প্রবাসীদেরই লিখতে হবে এবং লেখা হচ্ছেও। কিন্তু সেখানেও অন্য একটা মুশকিল আছে। প্রবাসে, অন্ততঃ অ্যামেরিকায়, বাঙালি সমাজ অনেকাংশেই একমাত্রিক। নিউ ইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, শিকাগোর মতন কিছু হাতে গোণা বড় শহর ছেড়ে দিলে সর্বত্রই প্রায় এক ধাঁচের বাঙালি। মূলতঃ শহুরে, শিক্ষিত, স্বচ্ছল এবং পেশাদার মধ্যবিত্ত বাঙালি। তাদের নিয়ে পাঁচটা নাটক হয়, দশটা নাটক হয়। সিজিনের পর সিজিন তাদের নিয়ে নাটক খাড়া করা অতি দুরূহ।


এতদসত্বেও প্রবাসের বাঙালির জীবন অন্য, আশা অন্য, সমস্যা অন্য। রোটি-কাপড়া-আউর-মকানের বাইরে গেলেই বাঙালি সমসত্ব ভেঙে যায়। যেমন ধরা যাক, সামরিক অভিযান। ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি আজ অনেকবছর। অ্যামেরিকা সারাক্ষণই বিশ্বের কোথাও-না-কোথাও যুদ্ধবাজী করছে। অ্যামেরিকার ভূখন্ডে বোমা পড়ছে না ঠিকই, কিন্তু অ্যামেরিকার নাগরিকেরাই সেই যুদ্ধে লড়ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছে। সেই নাগরিকের মধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের ভারতীয় ও বাঙালিও আছে। কিংবা বর্ণবিদ্বেষ। জাতপাতের সমস্যা যতই থাক তার থেকে বর্ণবিদ্বেষের প্রকৃতি ভিন্ন। হোক না তা প্রচ্ছন্ন বর্ণবিদ্বেষ। প্রবাসী বাঙালি কী তার স্বাদ পান না? এ সংখ্যালঘুর সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গের, বাংলাদেশের এবং কলকাতা-ঢাকার বাঙালি সংখ্যাতত্বের বিচারে যাই হোক, মনেপ্রাণে সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রবাসের বাঙালি শুধু সংখ্যালঘুই নয়, তার লঘুত্ব নজর করতে টেলিস্কোপ, মাইক্রোস্কোপ দুইই চাই। আর কে না জানে, সংখ্যালঘুর জীবনযাপন সংখ্যাগুরুর থেকে অনেক আলাদা। আর স্রেফ প্রবাসে থাকার কারণেই এমন অনেক আনন্দ, দুঃখ ও চিন্তার উদ্রেক হয় যে অপ্রবাসীজন সেসবের ঠাহর পায়না।


এসব একেবারেই তাত্বিক কচকচি বলে ভাববেন না। একেবারে হাতে-গরম উদাহরণ-সহ প্রমাণ দিতে পারি। আমাদের নাটকের দলের তৃতীয় নাটক ছিল "ছেঁড়া কোলাজ"। আমাদের দলের এক সদস্যার লেখা। প্রবাস জীবনের গল্প। এর পরে এনাদ আরও অনেক নাটক করেছে। নাটকের দল হিসেবে পরিণত হয়েছে ক্রমশঃ। দলের সদস্যরাও বাড়িয়েছে তাদের নাট্যবোধ ও কলা। কাজে শৈল্পিক দিক দিয়ে "ছেঁড়া কোলাজ" নিঃসন্দেহে প্রথমদিকের কাজ হিসেবে তুলনামূলকভাবে কাঁচা। অথছ আজ প্রায় ষোল-সতেরো বছর পরেও অচেনা-আধচেনা লোকে এনাদের প্রসঙ্গ উঠলে সেই নাটকের কথা বলে। এই একই নাটক ব্যাঙ্গালোরের 'এনাদ' অভিনয় করেছিল এই দশকের গোড়ায়। সেখানেও তো মধ্যবিত্ত, শহুরে ও লেখাপড়া-জানা প্রবাসী বাঙালি। বহিরঙ্গের বিচারে অ্যামেরিকার প্রবাসীর সঙ্গে খুব তফাত থাকার কথা নয় - একই র' মেটিরিয়ালে তৈরি। অথচ সে নাটক ব্যাঙ্গালোরের প্রবাসী দর্শকদের চিত্তে কোনরকম চুলবুলি জাগাতে সক্ষম হলনা। এর থেকে দুটি সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব - এক, প্রবাস হলেও সব প্রবাস এক নয়। আর দুই, শৈল্পিক খামতি নিয়েও শিল্প যদি দর্শকের হৃদয় ছুঁতে পারে, তাহলে প্রান্তিক দলের পক্ষে দর্শকমনে চিরস্থায়ী না হোক, দীর্ঘমেয়াদী কায়েমি সত্ব দখল করা সম্ভব।


এখানে কতগুলো নিরীক্ষণের অবতারণা করা যাক। এক, প্রবাসী বাঙালি অতীতে বাঁচে। কাজেই যে নাটক বাঙালিকে তার বেড়ে ওঠার সময়কার স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়, সে নাটকই সে করতে চায়। দুই, সব বাঙালিই জীবনের একটা সময় অব্দি দেশে-ফিরব-না-বিদেশে-থাকব এই দোলাচলে ভুগতে থাকে। যদ্যপি এই দোলাচলের ঊর্ধে সে কোনদিন ওঠেও, "একদিন ফিরে যাব চলে" নামক একটি অসম্ভব দুরাশাকে সে দীর্ঘদিন মনে মনে লালন করে চলে। ফলতঃ নাটকের পটভূমিকা প্রায়শই ভারতবর্ষ বা বাংলাদেশ। অথচ প্রবাসী বাঙালির দৈনন্দিকতা সেখানে নেই। যে আশা, যে ভাবনা, যে আশংকা প্রবাসীকে চালায় - কলকাতা-ঢাকার নাটকে সে ধরা পড়বেই বা কী করে?


এতদসত্বেও মনে রাখতে হবে যে নাটকের প্রাসঙ্গিকতা থাকলেও পর্যাপ্ত দর্শক জোটানো বাংলা নাটকের পক্ষে এক দূরূহ কাজ। বিশেষতঃ যদি হিন্দির সঙ্গে তুলনা করি। এ শুধু বাংলার একার কাহিনী নয়। অহিন্দি অন্যান্য ভারতীয় ভাষার হাল একই। আমি প্রত্যক্ষভাবে মারাঠি নাটকের কথা জানি।


আন্যদিকে, এই সিলিকন ভ্যালিতে ১৯৯৫ সাল থেকে নিয়মিত নাটকের অভিনয় করে চলেছে "নাটক" নামের একটি নাট্যদল। তারা মূলতঃ হিন্দিতে নাটক করা শুরু করেছিল। হিন্দিতে নাটক করার সুবিধে অনেক। প্রথম, এবং আমার মতে সবথেকে বড়, সুবিধে হল দর্শকসংখ্যা। ভারতীয় মাত্রেই কিছু-না-কিছু হিন্দি বোঝে। জয় বাবা বলিউডেশ্বর ধ্বনী তুলে সত্তরের দশক থেকে মা-মাসির হেঁসেলে হিন্দি সিনেমার প্রবেশ ও তৎসময়কালে থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের বদান্যতায় রেডিওতে ক্রিকেট কমেন্ট্রি ও টিভিতে হিন্দি ছবি-সংবাদ ও গানে চরাচর আকুল হয়ে ওঠায়, দরিদ্র ভারতবাসী, ধনী ভারতবাসী থেকে প্রবাসী ভারতবাসী - সকলেই অল্পবিস্তর হিন্দিপটু হয়ে পড়েছে। কাজেই দুখীনি বাংলাকে যখন তিনশোটি টিকিট বিক্কিরি করতে ল্যাজেগোবরে হতে হয়, হিন্দি নাটক সগৌরবে পর পর হাউসফুল শো করে চলে।


নাট্যকর্মী হিসেবে নিজেদের - এবং নাট্যদল দলগতভাবে - উন্নতি করার প্রধান উপায় একই নাটকের একাধিক শো করা। তার অন্যতম উপায় আমন্ত্রিত অভিনয়, ইন্ডাস্ট্রির ভাষায় যাদের কল-শো বলে। কলকাতাতেও শোনা যেত নাট্যদলগুলোর অর্থনৈতিক জোরের জায়গাও এই আমন্ত্রিত অভিনয়। সেখানে নাট্যদলগুলো যায় মফস্বলে, শহরের অন্য জলসায় - কখনও মুম্বাই, দিল্লি, ব্যাঙ্গালোরে। কিন্তু অ্যামেরিকায় সে গুড়ে বালি। কখনও অন্য শহর থেকে আমন্ত্রণ এলেও সে ব্যাতিক্রমী ব্যাপার। তাছাড়া সে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলে যাতায়াতের খরচাপাতি দলের সদস্য-সদস্যাদের নিজের পকেট থেকেই ব্যয় করতে হয় প্রায়শই। ঘরের কাছাকাছি কল শো পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।


নিজেদের দলের জন্যে হল ভাড়া করে, টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করে নাটক মঞ্চস্থ করার হ্যাপা ছেড়ে নাট্যদলগুলো এখন অন্য স্ট্র্যাটেজির আশ্রয় নিয়েছে। সেই স্ট্র্যাটেজির নাম 'নাট্যমেলা'। দিন-তিনেক ধরে ঠাসা নাটক। একদিনের নাট্যমেলাও হয়। স্থানীয় দলের সঙ্গে প্রায়শই থাকে বাইরের শহরের দল। সিলিকন ভ্যালির নাট্যমেলায় আসে সিয়াটলের দল। সিয়াটলের নাট্যমেলায় যায় সিলিকন ভ্যালির দল। এই নাট্যমেলার আয়োজনে নাট্যদলকে হল ভাড়া থেকে টিকিট বিক্কিরির - অর্থাৎ সে 'ব্যবস্থাপনা'র - ঝক্কি ঘাড়ে নিতে হয় না। তারা নাটক করে খালাস। এক যদি না, নাট্যদলই নাট্যমেলার আয়োজন করে। তবে সময়াভাবে কোন দলই পূর্ণাঙ্গ নাটকের সুযোগ পায়না। একাংকই প্রধান। মেরেকেটে দুই-অংকের নাটক, ঘন্টাখানেক থেকে সোয়া একঘন্টা মেয়াদের। প্রশ্ন উঠতে পারে শুধু স্বল্প-দৈর্ঘ্যের নাটক করে নাটকের চর্চা কতটা এগোতে পারছে। সে প্রসঙ্গে এই যুক্তি থাক যে কোন নাটক না করার থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্য অনেক ভাল। সত্যি বলতে কি, সব দলের পূর্ণদৈর্ঘ্য করার মতন দম ও দখল তৈরি হয়েছে কিনা সেটা ভাববার।


দর্শকদের কাছে নাট্যমেলা খুবই হিট। এই বাই-ওয়ান-গেট-ওয়ান সেলের দেশে এক টিকিটে নানাস্বাদের একাধিক নাটক দেখার সুযোগ করে দেওয়া নাট্যমেলার জনপ্রিয়তার মধ্যে হয়ত অবাক হওয়ার কিছু নেই। জনপ্রিয় তো হবারই ছিল, ভাবটা এমন। দর্শকদের মধ্যে এই ভাবনাও কাজ করে, চারটে নাটকের মধ্যে অন্ততঃ একটা নাটক ভাল আর দুটো চলনসই হলেই পয়সা ও সময় উশুল। তা সে অনেক সময় হয়েও যায়। আয়োজকরাও সে কথা মাথায় রেখেই অন্ততঃ একটা প্রমাণীতভাবে দর্শকধন্য নাটক রাখার চেষ্টা করেন। তবে সময়াভাবে নাটকগুলো টেকনিকালি যে খুব চিত্তাকর্ষক করা সম্ভব, তা নয়। এসব নাটকে খুব ভাল আলোর কাজ বা মঞ্চের কাজ দেখার ও দেখানোর সুযোগ থাকে না বললেই চলে। দুটি নাটকের মাঝে আধঘন্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে মঞ্চ সাজানো ও আলোর পরিবর্তন সেরে ফেলতে গেলে ন্যুনতম চাহিদা মিটিয়ে বিশেষ কিছু করা যায়না। কাজেই নাটককে নির্ভর করতে হয় নাটকের কাহিনী, অভিনয় ও সব মিলিয়ে মাউন্টিঙের মুন্সিয়ানার ওপর।


প্রবাসী দলগুলোর অভিনেতাদের মধ্যে চার ধরণের লোক পাওয়া যায়। একদম ওপরে থাকেন যাঁরা কোন-না-কোন সময়ে দেশে সিরিয়াস থিয়েটার করেছেন। এনারা সেটের ফ্ল্যাট বয়ে, মই ধরে, রাত জেগে কাগজ কেটে ইঁট-বের করা দেয়াল বানিয়ে দলের খিদমত খেটে গ্রুপ থিয়েটারে সমগ্র থিয়েটারের অ-আ-ক-খ শিখেছেন। সংখ্যায় তাঁরা শতেকে গুটিক। এর পরে আছে নাট্যোৎসাহী মানুষ। দেশে থাকতে নিয়মিত নাটক দেখতেন। পাড়ায়-টাড়ায় উৎসাহ নিয়ে নাটক করেছেন নিয়মিত। অনেক নাটক পড়েছেন। জানা আছে নাটকের থিওরি-টিওরিও কিছু। নাটকের যে-কোন কাজেই হাত লাগাতে এনাদের খুব উৎসাহ। এনারাই দলের চালিকাশক্তি, প্রাইমমুভার। তৃতীয় দল ছুপা রুস্তম। এনাদের নাটকে অভিজ্ঞতা ও উৎসাহ অল্প। কিন্তু নিমরাজী হয়ে নাটকে অভিনয় করতে নেবে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন অভিনয়ে। এনাদের চরিত্রায়ণ এতটাই ভাল যে অভিনয়ে টেকনিকের অভাব এনার সেই দিয়ে শুধু পুষিয়েই দেন না, দলের সম্পদ হয়ে ওঠেন। তবে অভিনয়ের বাইরে অন্যান্য কাজে এনাদের উৎসাহ নেই। এর বাইরে আছেন আপামর জনগণ, যাঁদের জীবনের শখ স্টেজে ভাল পোষাক পরে নায়ক বা নায়িকা হবেন। অন্য চরিত্রে এনাদের উৎসাহ নেই। অন্য কোন কাজেও নেই। নাট্যকর্ম এনাদের কাছে মূলতঃ হুজুগ। পেশা, সংসার, বন্ধুবৃত্ত সেরে শেষপাতের চাটনি।


এখন এই প্রথম দল, যাঁদের নাটকে ট্রেনিং আছে, তাঁরাই একাধারে অর্গানাইজার, পরিচালক ও ট্রেনার। সর্বত্র এই ভদ্রজনকে খুঁজে পাওয়া শক্ত। এবং তিনি যে কখন কোথায় দেখা দেবেন, বলা শক্ত। বড় শহরে বাঙালির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, তাই সেখানে এনাদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি হলেও, হঠাৎ কোন ছোট শহরের দল নাটক করে এমন তাক লাগিয়ে দেন যে বোঝা যায় ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা কোনভাবে ওই শহরে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ দলেই এরকম ব্যাক্তি নেই বলে তাদের নাটক মূলতঃ "এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বলো" স্টাইলের ওপরে আর উঠতে পারেনা। অবশ্যই সব দল সম্বন্ধে এ কথা খাটে না। এমন দলও আছে যাঁরা কলকাতা থেকে পেশাদার অভিনেতা এনে ওয়ার্কশপ করে দলের ছেলেমেয়েদের অভিনয়ে এগিয়ে দেবার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় কলেজে বা অভিনয়ের স্কুলে গিয়ে রীতিমত অভিনয় শিক্ষার পাঠ নেন। তবে সেও হাতে-গোণা লোক। তার ফলে শুধু যে নাটকের অভিনয়ের মান উচ্চ হয়না তা নয়, অভিনেতাদের মধ্যেও মানের তারতম্য চোখে পড়ার মতন। আর এ সবই কোন ভাল নাট্যপ্রযোজনার বিরাট বড় অন্তরায়।


আর একটা অদ্ভুত জিনিস দেখা যায়। নাট্য-অভিনয় বা পরিচালনার মান যেমনই হোক না কেন, দ্রুত পোষাক, সেট ও প্রপস বদল; ঠিক সময়ে আলো জ্বলা-নেভা ও মিউজিক বেজে ওঠা - এসব ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে ত্রুটি কমই দেখা যায়। এর কারণ নিম্নরূপ বলেই সাব্যস্ত করেছি - প্রবাসে এই নাটুকে বাঙালিরা সকলেই প্রায় পেশাগতভাবে ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, ম্যানেজার গোছের লোক। এসব পেশায় যাকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বলে তাতে এনারা যে দড় তাইই নন, বিশিষ্টও বটে। (তাত্বিক কচকচিতে আপত্তি না থাকলে এনাদের 'সেলফ-সিলেক্টেড' বলে অভিহিত করা যাক।) এই গোষ্ঠির লোকেদের কাছে নাট্য-প্রযোজনাকে একটি প্রজেক্ট হিসেবে ধরে তার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সম্পাদনা করা বলা যেতে পারে বাঁয়-হাতকা-খেল। নেহাত যারা সম্পাদনা করবেন তারা নাট্যদলের বেতনভোগী নন বলে ভুলত্রুটি কিছু ঘটে যায়।


সবমিলিয়ে অ্যামেরিকার নাট্যকর্মের চরিত্র দেশের নাট্যকর্মের চরিত্রর থেকে আলাদা। এতদূর পড়ে যদি কারও মনে হয় যে অ্যামেরিকায় বাঙালিদের নাটক একান্তই হেলাফেলার অ্যামেচারিশ, তাহলে বলব, আপনি স্যার সর্বৈব ভুল বুঝেছেন। ভালমন্দ মিশিয়ে থাকলেও, অ্যামেরিকার বহু নাট্যদলের কাজে শুধু পরিশ্রম ও মনোযোগের ছাপ তাইই নয়, মান ও মননের দিক থেকেও তারা অনেকক্ষেত্রে দেশের যে কোন ভাল নাটকের সঙ্গে টক্কর নিতে পারে। সিলিকন ভ্যালি, লস এঞ্জেলেস, সিয়াটল, হিউস্টন, বস্টন, ওহায়ো, ওয়াশিংটন, নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক - এসব জায়গার দলগুলো বছরের পর বছর উচ্চমানের প্রযোজনা করে চলেছে। এখন আর তাদের নাটকের জন্যে দেশ-মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়না। দক্ষতার সঙ্গে মিশেছে আত্মবিশ্বাস। জুটেছে দর্শকদের ভরসা। শুধু তাই নয় সুদীপ্ত ভৌমিকের অ্যামেরিকায় লেখা মৌলিক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে কলকাতায়। করছে কলকাতার দল। নাটকের অভিনয় ও পরিচালনার মানও উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। বাড়ছে দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ।


কাজেই বুক ফুলিয়ে কল্লোল করে আমরা বলতেই পারি, "প্রবাসে নাটক চলছে, চলবে।"


Name:  rivu          

IP Address : 237812.68.8934.45 (*)          Date:03 Aug 2019 -- 01:48 AM

এন আরবার মিশিগানে গত বছর জুলাই মাস নাগাদ একটি নাট্যমেলায় গিয়েছিলাম। বেশ ভালো কিছু নাটক এসেছিল।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--3