বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--5


           বিষয় : গল্পঃ বিস্মৃত সাতচল্লিশ
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :প্রতিমা সেনগুপ্ত
          IP Address : 7845.15.8967.165 (*)          Date:24 Aug 2018 -- 09:58 PM




Name:  প্রতিমা সেনগুপ্ত          

IP Address : 7845.15.0123.205 (*)          Date:24 Aug 2018 -- 10:02 PM

যতদূর চোখ যায়, বিস্তৃত সবুজ মাঠ। একটি – দুটি – তিনটি পরপর। হয়তো আরও আছে। আমি ছুটছি, খানিক হাঁটছি, আবারও ছুটছি। কোথায় গিয়ে শেষ হবে এই অনন্ত চলা তা জানা নেই। সাতচল্লিশে আমাকে পিছন থেকে তাড়া করেছে আমার মাতৃভূমি, মায়ের ভিটে–মাটি। আমি ভাস্করজ্যোতি গুপ্ত, নারায়ণগঞ্জে নিজের বাসা থেকে যাত্রা আরম্ভ করেছি। মাঠ–ঘাট, খাল–বিল, উঁচু–নিচু জমি পেরিয়ে, ধান জমি, কলার বাগান, পানের বরজ পেরিয়ে ছুটছি প্রাণপণ। দেশের মানচিত্রে ইংরেজের মরণ হূল ফোঁটার আগে আমি জন্মেছিলাম – ঢাকার নারায়ণগঞ্জে, আমার পিতৃগৃহে। আজ ১৯৪৭ বলে দিল এখানে তোমার কোন জায়গা হবে না। পালাও, যত তাড়াতাড়ি পার গোয়ালন্দঘাট হয়ে পেরিয়ে যাও আন্তর্জাতিক সীমারেখা। পিছন ফিরে দৌড়াতে আরম্ভ কর, আর কোন দিনও এখানে ফিরে এসো না।
কোন মতে একটা চামড়ার সুটকেস হাতের তলায় চেপে দৌড়ে পেরিয়ে চলেছি অতি পরিচিত আটচালা ঘর, পড়শির গোয়াল, বাঁশঝাড়, মেঠো রাস্তা। সারা শরীর যখন ঘেমে স্নান, মাথার চুল দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় চুইয়ে নামছে ঘামের স্রোত, আমি গিয়ে পৌঁছলাম স্টেশনে।
স্টেশনে তখন তিল ধারণের জায়গা ছিলনা। তবুও মানুষকে শরীরের ধাক্কায় সরিয়ে সরিয়ে এগিয়ে গিয়ে উঠে পড়লাম ট্রেনের একটা কামরায়। কিন্তু একি? ট্রেনের হাতল ধরে কামরায় উঠতে যাব, হাতল রক্তে মাখা। ট্রেনের কামরার দেওয়াল চুইয়ে নামছে রক্ত, কোথাও রক্ত জমাট বেঁধে তাল। ট্রেনের মেঝে ভেসে গেছে রক্তে। কিন্তু কোথাও কোন জায়গা নেই। মানুষ, শিশু, বাক্স–প্যাঁটরায় ভর্তি। বাঙ্কে জায়গা না পেয়ে, মানুষ ট্রেনের রক্তমাখা মেঝেতেই বসে পড়েছে।
সবাই ভীষণ চুপ। কাউর মুখে টুঁ–শব্দটি নেই।
মাটিতে বসে থাকা মানুষ পেরিয়ে ঢুকে গেলাম বাঙ্কের কাছে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম – উদাস।
ট্রেন কখন ছাড়বে, কে জানে?
আমার দু’ই বোনকে আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে কলকাতার টালিগঞ্জে, মামা বাড়িতে। নারায়ণগঞ্জের বাসায় বড় মেয়েদের রাখা নিরাপদ নয়, তাই পিতৃদেব মেয়েদের মামা বাড়ি রেখে এসেছেন।
গতকাল রাত্রে কারা যেন বাসার সদর দরজা ভাঙার চেষ্টা করছিল, আর কেবলই থেকে থেকে ‘আল্লাহু আকবার ....’ বলছিল। আমার পিতৃদেব পেশায় চিকিৎসক। বাড়ির সদর দরজা সংলগ্ন ঘরটি আমার পিতৃদেবের ডিস্পেনসরি। ইদানীং দেশের অবস্থা খারাপ হওযায়, প্রত্যেক রাতে সদর দরজার ভেতর দিকে, দরজা বরাবর চাপিয়ে দেওয়া হয় পিতৃদেবের মেডিক্যালের বইপত্রে বোঝাই আলমারি। স্পেসিমেন ওষুধে বোঝাই ডিস্পেনসরির টেবিল।
সকালে ভোর ফুটতে না ফুটতেই মা বিছানা থেকে হিঁচড়ে টেনে তুললেন আমায়। কাঁপা গলায় বললেন, ‘আর নয়। তুমি আজই মামার বাসায় চলে যাও।’
অবাক হয়ে বলি, ‘তোমরা’?
মা উত্তেজিত হয়ে বলেন,‘আমাদের যা হবে দেখা যাবে। তুমি আজই রওনা হয়ে যাও।’
আমি ফুঁসে উঠি, ‘আমি যাবনা। নিজের বাসা ছেড়ে কোথাও যাবনা।’
মা অশ্রু সংবরণ করে বলেন, ‘নিজের বাসা কি আর আমাদের আছে। আজ না হয় কাল, সবাইকেই বাসা ছাড়তে হবে। তবু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাদের যাবার মতো কোন বাসা আছে। কত মানুষ ওপারে গেল, কেবল রেলস্টেশনের ছাউনি আর রিফিউজি ক্যাম্পের ভরসায়।’
কিন্তু মামার বাসায় কি পৌঁছাতে পারবো?
হঠাৎ বাষ্পশকট ঝাঁকি দিল। একবার, দু’বার, তিনবার। ট্রেনের মেঝেতে বসা নিশ্চুপ মানুষগুলি নড়েচড়ে বসে। বাইরের প্ল্যাটফর্ম থেকে খালি গায়ে, ধুতি পরা একজন লোক ছুটে ঢুকল ট্রেনের কামরায়। জোর চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আপনেরা সবাই সতর্ক থাকেন। এই একটাই ট্রেন এখন এপার–ওপার করতেছে। আগের ট্রেনে এক গাড়ি লোক ওপারে রওনা হয়েছিল। একজনও দর্শনা পেরিয়ে, ওপারে পৌঁছাতে পারে নাই। সবাই গাড়িতেই নিকেশ হয়েছে। দর্শনা না পেরোনো পর্যন্ত জীবনের কোন নিশ্চয়তা নাই।’
মুহূর্তের মধ্যে ট্রেনের কামরার ভেতরের মানুষগুলির মধ্যে গুঞ্জন উঠলো। সকলের মুখেই ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্কের ছাপ। আমার বুকের ভীতর কেউ দুরমুশ পিটছে। মনে পড়ে গেল, বাসা থেকে বেরোনোর সময় পিতৃদেব বলেছিলেন, ‘দর্শনা পর্যন্ত সাবধানে থেকো’। এইযে সবাই বলছে, দেশটা নাকি ভাগ হয়ে গেছে। এপারে যেখানে আমাদের বাসা ওটা নাকি পূর্ব–পাকিস্তান। তাই আমাদের চলে যেতে হবে ওপারে। দর্শনা বর্ডার। এপারে পূর্ব–পাকিস্তান, ওপারে ভারত অধিরাজ্য।
আবারও ঝাঁকি দিয়ে ওঠে ট্রেনটা। ট্রেনের মুখের দিক থেকে ভেসে আসে গার্ডের বাঁশির শব্দ। অনেক মানুষ প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফালাফি করে উঠেপড়ে ট্রেনের ছাদে। ছাদে তখন দুপ–দাপ আওয়াজ চলছে। আবারও ট্রেনের পিছন দিক থেকে বেজে ওঠে গার্ডের বাঁশি। যারা প্ল্যাটফর্মে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের অনেকেই লাফিয়ে ট্রেনের দরজায় উঠে পড়ে। কিছু মানুষ হুড়মুড় করে ঢুকে আসে কামড়ার ভিতর। মাটিতে বসে থাকা মানুষ–জন তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। ট্রেনের কামরায় তখন মানুষে মানুষে ঠেসাঠেসি আর চিৎকার চ্যাঁচামেচি। কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই। আবারও ঝাঁকি দিয়ে, কাঠের ট্রেন চলতে আরম্ভ করল – চাকায় চাকায়, গড্ গড্ শব্দ তুলে – ধীর লয়ে।
যাত্রীদের অনেকের মুখ উপুড় হয়ে পড়ল ট্রেনের জানালায়। স্টেশনে তখন হুটোপুটি আর দৌড়াদৌড়ি চলছে। কেউ উঠতে পারল, কেউ পারলো না। আবার কেউ পরিবারকে বিদায় জানালো অশ্রুজলে।
ট্রেন স্টেশন ছেড়ে বেরোনোর পরই ঠাণ্ডা হয়ে এলো যাত্রীদের কণ্ঠস্বর। অনেকক্ষণ ধরে বুকের ভিতর জমে ছিল একটা ভীষণ গুরুভার। হঠাৎ সেটা গলার কাছে এসে যেন টুঁটি টিপে ধরল। মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরল না। কেবল গলাটা বুজে গিয়ে, চোখ দিয়ে অবিশ্রান্ত ধারাপাত শুরু হল। আমি পারছিলাম না। চিৎকার করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু মানুষের ভিড়ের চাপে, ঘামের গন্ধে, আমার মুখ নিঃসৃত সেই অস্ফুট শব্দ – ডুবে গেল।
এই যে অজানা এক নিরুদ্দেশে চলেছি এতো মানুষ, আমাদের পরিচয় কি? আমরা তো শুধুই উদ্বাস্তু। কাকে বলবো – আমরা উদ্বাস্তু নই। কতগুলো রাজনীতি করা লোক, ইংরেজ বাহাদুরের সঙ্গে নিচু গলায় সমঝোতা করে আমাদেরকে উদ্বাস্তু বানিয়ে দিল। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একজন স্নাতক। আমার পিতৃদেব নারায়ণগঞ্জের একজন অতি পরিচিত, নামী চিকিৎসক। আমার পৈতৃক বাসা, বাসা সংলগ্ন জমিতে বাগান, এ সমস্ত কিছু ছেড়ে, কেন আমাকে মাতুলালয়ে গিয়ে তাঁদের উচ্ছিষ্টে প্রতিপালিত হতে হবে? কেন আমাকে চলে যেতে হবে? কেন আমি আর কোন দিনও নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসতে পারবো না? এখনও, এই মুহূর্তে যদি ছুটে যাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে, আমার সহপাঠী সবুজ, করিম ওরা আমার জন্য ঠিক অপেক্ষা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান ডঃ পঞ্চানন মাহেশ্বরী, বারংবার আমাকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। পূর্ণ সম্মতি থাকা সত্ত্বেও; পরম শ্রদ্ধেয় স্যার – উদ্ভিদবিজ্ঞানের একজন দিকপাল মানুষের সঙ্গে দেখা না করেই, আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আমি চিৎকার করে বলবো, না আমি উদ্বাস্তু নই। এভাবে কিছুতেই আমি আমার ভিটে–মাটি ছেড়ে পালিয়ে যাবো না।
আমি ফুঁপিয়ে উঠি। সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। একটা নরম হাত আমার মাথায় এসে ঠেকে। আমার পাশে বাঙ্কে বসে থাকা এক বৃদ্ধা হঠাৎ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। ক্রমশ তাঁর হাত আমার বুকের কাছে নেমে আসে। আমার দু’চোখের জলোচ্ছ্বাস তার হাত ভিজিয়ে দেয়।
আমি অসহায়, তাঁর দিকে ফিরে বলি, ‘আমি যাব না ঠাকুমা’।
বৃদ্ধা আমার মাথাটা তাঁর কাছে টেনে নেন। তাঁর দু’চোখ দিয়েও জলস্রোত বইতে থাকে।
কতক্ষণ এভাবে কেটে ছিল – ঘণ্টা, মিনিটের হিসাব জানিনা। কতটা পথ পেরলাম, সময় কত গড়াল জানা নেই। হয়তো অনেক সময় চলে গেছে, বেলা বুঝি পড়ে এলো। হঠাৎ ট্রেনের বগিতে গুঞ্জন শুরু হল। এতক্ষণ সবাই মৃত্যুর অপেক্ষায় মুহূর্ত গুনছিল। এই বুঝি আগের ট্রেনের যাত্রীদের মতো, সবাইকে মেরে–কেটে, সহায়–সম্বল যতটুকু আছে সব কেড়ে নেওয়া হয়। এখন তাদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চালন দেখা দিল। সবাই বলাবলি করছিল, ‘ট্রেন দর্শনা ঢুকছে’। অর্থাৎ, আমরা বিপদ মুক্ত। সত্যিই কি তাই?
ছোট্ট একটা স্টেশন, সেখানে মেলা মানুষের ভিড়। ট্রেনে ওঠার লোকই বেশী। কেউ নামেনি। অবশেষে ট্রেন দর্শনা ছেড়ে এগিয়ে চলল – সামনের দিকে। ভারত।
দর্শনায় ঢোকার আগে এবং ছেড়ে বেরোনোর পরে চারপাশের কোন পরিবর্তন হল না। একই সবুজ মাঠ–ঘাট, দূরে দূরে বাড়ি–ঘর, এপারেও বাংলা, ওপারেও তাই। শুধু এক ট্রেন মানুষ যারা আগের মুহূর্তে ছিল – একটি অবিভক্ত দেশের অধিবাসী, একটা স্টেশনের তফাতে তাঁরা পরিণত হল – বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের উদ্বাস্তুতে।


Name:  Ishan          

IP Address : 2390012.189.892312.15 (*)          Date:24 Aug 2018 -- 10:05 PM

গল্প? পড়ে তো মনে হচ্ছে অভিজ্ঞতা। একটু কনফার্ম করবেন?


Name:  প্রতিমা সেনগুপ্ত          

IP Address : 7845.15.3478.173 (*)          Date:26 Aug 2018 -- 10:13 PM

স্মৃতিচারণ


Name:   স্বাতী রায়           

IP Address : 781212.194.7878.50 (*)          Date:28 Aug 2018 -- 01:02 AM

এটা আরও চলবে তো? পড়ছি ...


Name:  দ          

IP Address : 453412.159.896712.72 (*)          Date:28 Aug 2018 -- 09:50 AM

হ্যাঁ আমিও পড়ছি।

একটা কথা। এইভাবে সম্পূর্ণ মৃতদের নিয়ে ট্রেন রক্ত চ্যাটচ্যাটে -- এই পূর্ব সীমান্তে সেরকম খুব একটা পাই নি। পশ্চিমে নিয়মিত হত দুই পার থেকেই গেছে এসেছে।
তা এটার আরেকটু স্পেসিফিক ডিটেইলস পাওয়া যায়? মোটামুটি তারিখ না হলেও মাস ইত্যাদি।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--5