আপনার মতামত         



সীমান্ত, শরণার্থী আর কবিতা(প্রথম পর্ব)

অদ্রীশ বিশ্বাস



      

পর পর দু বছর দেশে ফেরা না হলে যা হয়। সবাই মিলে জানতে চায়, কী হল, কেন দেশে গেলে না। আমার চেনা নাসিম ওমরের পেশা কার্পেট ব্যবসা। আগে ছিল টাকা ধার দেওয়া কাবুলিওয়ালা। সে পেশার বারো বাজলো নানা ব্যাংক হাউস-কার-ট্রাভেল-এডুকেশন মায় পারসোনাল লোন দেওয়া শুরু করার পর থেকে। ব্যাঙ্কই ক্রাইসিসে তো নাসিম কীভাবে বাঁচাবে তার আদি ব্যবসা! বলে, ভালই হয়েছে, গালিমন্দ করে টাকা আদায় আর ভাল লাগে না। শুরু নতুন ব্যবসা। দেশ আফগানিস্তানে যে গঞ্জে ও থাকে তার নাম কুশখা, সেখানেই তৈরী হয় রাশি রাশি কার্পেট। সে দেশের একমাত্র ট্রাইবাল মেড কার্পেট। কাজখস্তান থেকে বহু বছর আগে একদল কাজাখ এসেছিল ধর্মপ্রচারে। সীমান্ত পেরিয়ে আসার সময় যত দৈত্যদানো পড়েছিল, তাদের নাকি তারা মন্ত্র পড়ে ঠেকিয়েছিল; তারপর উড়ন্ত কার্পেটে চড়ে কুশখার আশেপাশে শান্তিতে কিছুবছর ধর্মপ্রচার করে চলে যায়। সেই ক বছর কাজখরা ধ্রুপদী শৈলিতে কার্পেট না বানিয়ে ঐ দৈত্য ঠেকানো মন্ত্র ওয়ালা যে কার্পেট বানানো শিখিয়ে গিয়েছিল, সেটাই হয়েছিল গোটা আফগানিস্তানের একমাত্র নন-ক্লাসিক্যাল নন-আর্বান ফোক কার্পেট। মূলত মাজারেই ব্যবহার হত। যেবার নাসিমের ঠাকুর্দার বাবা মরুভূমি থেকে আসা ঝড়ের প্রকোপে দম আটকে মারা গেলেন সেবার গোটা কমিউনিটির টিকে থাকার প্রয়োজনেই তৈরী হল কার্পেট বিক্রির নতুন পেশা। গাঁ - গঞ্জের মানুষজন ছড়িয়ে পড়লো দেশে বিদেশে ও ই কার্পেট বিক্রিতে। নাসিম সেই পেশা প্রথমে গ্রহণ করেনি, ছিল কাবুলিওয়ালা, সংকট তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো তিন পুরুষের পারিবারিক ব্যবসায়। একেই বলে আল্লা কি খেল, হ্যাঁ নাসিমের সেটাই মত।

কুশখা থেকে কাবুল আসতে হয় বাসে, দীর্ঘ পথ। কাবুল থেকে সীমান্তে পৌঁছে বিশ্রাম। তারপরে গোটা একটা দেশ পার হওয়া - পাকিস্তান। পাকিস্তানে তেমন অসুবিধে হয়না চলাফেরার। যতটা হত আফগানিস্তানে। তালিবান শাসনের সমস্যা পাকিস্তানে নেই। আফগানের কাছে পাকিস্তান গণতন্ত্র। বরং সমস্যা হয় ভারতে ঢুকলে। হিন্দু প্রধান ভারতে আদব কায়দাটাই বদলে ফেলতে হয়।আপনা সংস্কৃতির কালো পোশাক, পাগড়ি, শৌখিন দাঁড়ি গোফ চলবে না। প্লেন অ্যান্ড সিম্পল চুড়িদার পাঞ্জাবী আর নাগরাই। লম্বা চওড়া বাত বন্ধ। পেঁয়াজ রসুন কম।অস্ত্র টাও লুকিয়ে ফেলতে হয় কোনো চেনা বন্ধুর ডেরায়। এখানে ঘুরতে বেড়াতে যতটা হিন্দু দেখায় , মানে হিন্দু ঘেঁষা মুসলমান,ততটাই মঙ্গল। যদিও এসব ধর্মীয় বাড়াবাড়ি নাসিমের ভাল লাগে না। ও পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ে না। ওর মতে ও খাঁটি মুসলমান নয়;ব্যবসায়ীর অত পাঁচওয়াক্ত মানলে চলে! বৌবাজারে আগে থাকতো এখন পার্ক সার্কাস। কার্পেট বিক্রির সূত্রেই আলাপ। সেই নাসিম কেন দু বছর ধরে দেশে যায় নি? ওমা এভাবে তো ভেবে দেখা হয় নি, ওর দেশে যেতে পাসপোর্ট লাগে! নিয়মিত ব্যবসা করতে আসা নাসিম পাসপোর্ট হীন অথচ ওকে কোনোদিনই পাসপোর্টধারী হয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে মনে হয় নি। যুদ্ধ বাধার পরে দেশটা কিছুদিন সংকটে ছিল এখন সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। নাসিমের গঞ্জেও বহু বাড়িঘর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেছে, মারা গেছে। তবু ক্ষয় ক্ষতি অন্য অনেক জায়গার তুলনায় কম। আমেরিকান সৈন্যরা এদিকটায় ঘাঁটি গাড়েনি। ছিল আফগান গেরিলা বাহিনী আর তালিবানরা। জনসমর্থনের অভাবে তালিবানরা পালিয়েছে। এসব ই নাসিমের কাছ থেকে শোনা। তাই এ বছর নাসিম বাড়ি যাবে ভেবেছিল, সেটাও হল না। কিন্তু পাসপোর্ট হারালো কী করে? উরিব্বাপ , সে আরেক কাহিনী। ওর এক দোস্ত, আসলে তার পাসপোর্ট হারায়। নাসিমের পাসপোর্ট নিয়ে দেশে যাওয়ার পথে সে পাকিস্তানে মারা যায়। অতএব সরকারী নথিপত্রে মারা যায় নাসিম, যে বর্তমানে পাসপোর্ট হীন । এখন নাসিম কেউ না, কিছু না, মৃত। বে আইনি ভাবে বেঁচে থাকা। সেই নাসিম এবার নতুন বছরে ফিরবেই ঠিক করেছে। কিন্তু কীভাবে? সে কি লোকাল কোর্টে নাম এফিডেভিট করিয়ে নতুন পাসপোর্টের জন্য অ্যাপ্লাই করেছে অথবা সব ঘটনা জানিয়ে কনসিডার করার জন্যে দিল্লির দূতাবাসে চিঠি পাঠিয়েছে? হাল্কা শীতের রোদে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলাম প্রশ্নটা।আর নাসিম মৃদু হেসে আর একটু রোদ গায়ে মেখে নিয়ে জানালো,"এইসায়ি চলা যায়গা।' সে জানে না কী ভাবে যাবে। সীমান্ত আছে,সীমান্তে পাহারা আছে,বি এস এফ, র‌্যাফ,পাসপোর্ট-ভিসা,বর্ডার কন্ডিশন,সেই বহু বর্ডার কন্ডিশনের মধ্যেও কীভাবে যেন একটা "এইসায়ি চলা যায়গা' আছে, যার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, পদ্ধতি নেই, সমাধান নেই। সাইকেল চালিয়ে চলে যাওয়ার আগে বুঝতে পারলাম, এই সীমান্ত ও সীমান্ত হীনতার মাঝাখানে দাঁড়িয়ে থাকা নাসিম রা এই ভাবেই সীমান্তর গড়ে ওঠা ও ভেঙ্গে ফেলা কে সমার্থক করে দেয়। মনে পড়ছে কাইফি আজমীর কবিতা --
সীমান্তের হাজার পাহারার মাঝখানে একদিক থেকে অন্যদিকে যাচ্ছে ক্ষুধা।

ক্ষুধা মানে নাসিমরা। সাদ্দাত হোসেন মান্টোকে নাসিম চেনে না। যাঁরা মন্টোর "তোবাটেক সিং' পড়েছেন তাঁরা জানবেন, সীমান্ত নিয়ে তিনি এমন গল্প লিখেছেন যা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। সেই হিন্দুস্তান পাকিস্তান দু ভাগ হওয়ার সময় ঠিক হল যে দু দেশের পাগলা গারদে যত হিন্দু মুসলমান পাগল আছে, মানুষ ভাগাভাগির সঙ্গে তাদেরও ভাগাভাগি হবে। কিন্তু ঢের আগে থেকে পাকিস্তানি বন্দী পাগল তোবাটেক সিং কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, হিন্দুস্তান দেশটা কোথায়? সেই গল্পের লেখক মান্টো পাঞ্জাবে একটা গ্রামের কথা লিখেছেন,বিসনির, যার ওপর দিয়ে গেছে দুদেশের সীমানা আর সীমানার বানানোর অনেক আগে থেকেই সেখানে একটা পানীয় জলের কুয়ো ছিল, যেটা এখন পাকিস্তানে। বি এস এফ আসে কিন্তু কুঁয়ো একটাই। অতএব দিনের বেলা সেখান থেকে জল তোলে আর রাতের বেলা ভারতীয়রা। আমাদের এক বৃষ্টি বিশেষজ্ঞ বন্ধু বুধেন্দ্র, যার কুঁয়ো বানিয়ে দেওয়ার আইনি সামর্থ নেই, সে গিয়েও দেখে এসেছে কীভাবে সীমান্ত পারাপার করছে সে কুঁয়োর জল আর টেলিফোনে আমি তাকে দেখতে বলেছি ইরাণের বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মহসিন মখমল বাফের সদ্যনির্মিত ডকুমেন্টারি,"আফগানিস্তান', যেটা সম্পূর্ণই গোপনে আফগানিস্তানে ঢুকে বারো ঘন্টা শ্যুট করে বানানো একটি দু ঘন্টার তথ্যচিত্র। সেখানেও নাকি গোপনে চিত্রায়িত হয়েছিল ক্যাম্প বানানো আমেরিকান সৈন্যদের জন্য জাহাজে করে আনা আমেরিকান পানীয়জল মাঝরাতে পাইপ লাগিয়ে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাসীরা আর আশীর্বাদ করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ঘাঁটি গেড়ে থাকার জন্য। ত্রাতা আমেরিকানরা এমন আহ্লাদে আটখানা এমন সহযোগিতা দেখে, প্রেস কন্‌ফারেন্স হচ্ছে, যৌথ ছবি ছাপা হচ্ছে ইংরাজি সংবাদপত্রের অথচ তলায় তলায় যে বানানো সীমান্ত ভেঙ্গে যাচ্ছে, ভেঙ্গে দিচ্ছে জল-রুটি-আচ্ছাদন, তার হদিশ মিলছে না। না মখমল বাফ ও চান নি সেই হদিশ মিলুক, তাই তথ্যচিত্র নিয়ে কথা বললেও সাক্ষাৎকারে একথা বললেও ওই দৃশ্য অশেষ পর্যন্ত রাখেন নি ছবিতে। জল চলাচল অব্যাহত থাকুক।শুধু জল কেন, মহসিন মখমল বাফ? তিনি তো বিখ্যাত, সঙ্গে বিখ্যাত টেকনিশিয়ান দের টিম, সবাইমিলে বে আইনি ভাবে ঢুকে পড় ল দেশটায় আর সব পাহারা নস্যাৎ করে দেড় মাস ধরে শ্যুটিং করে ফিরে এল ইরাণে। এমন ও সম্ভব হয়! বাফ লিখছেন, "ধরা পড়লে যাবজ্জীবন হতই, ফাঁসি অসম্ভব নয়; তবু যেতে হল, না গিয়ে উপায় ছিল না, মানুষ যেখানে আছে, সে কীভাবে আছে আর কেন ওভাবে আছে, তা জানার কৌতূহল আরেকদল মানুষের কোনোদিন শেষ হবে না। মানুষ যাবেই মানুষের কাছে, যতই সীমান্ত রচিত হোক'।

একথা আজ সবাই জানেন যে চিলির সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালক মিগুয়েল লিতিনের অভিজ্ঞতাও একই রকম ঘটেছিল। সালভাদর আলেন্দে হত্যায় চিলিতে যে মিলিটারি ক্যু নামে তখন তিনি প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালান। সেই মিলিটারি শাসনের ছবি তুলতে একটা জনপ্রিয় হলিউডি শ্যুটিং এর অনুমতি আদায় করে লিতিন চিলি তে ঢোকেন পুরো ইউনিট নিয়ে। তিনি ছদ্মবেশী উরুগুয়ের ব্যবসায়ী। ভ্রু প্লাক করে ব্যবসায়ীর বাচনভঙ্গী তে প্রযোজক সেজে যান। মিথ্যা শ্যুটিংএর কাট আর অ্যাকশান বলার মাঝখানে যে সময় ছবি বানানোর ছবি তুলেছেন তিনি হ্যান্ড ক্যামেরায়, সেটাই আসল তথ্যচিত্রের শ্যুটিং, সাধারণ মানুষের দেশ ও সরকার সম্পর্কে মতামত আর পারমিশান বহির্ভুত এদিক-ওদিক চলে যাওয়া, সঙ্গে চিলির বিপ্লবী দলের একটি মেয়ে ব্যবসায়ী বউয়ের ছদ্মবেশে, আসলে পথপ্রদর্শনকারী। বেশ কিছুদিন শ্যুটিঙের পরে সন্দেহ হল সরকারের। অ্যারেস্ট করার নির্দেশ এল কিন্তু ততক্ষণে লিতিন ক্যামেরা আর ফিল্ম নিয়ে বিমানে চড়ে বসেছেন। পাশে বসা যাত্রী কে চেনা চেনা লাগছে? আরে ইনি ই তো তাঁর প্রিয় লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। পরিচয় দিতে মার্কেজ তো ভুত দেখার মত অবাক হয়ে বললেন, "আপনি তো মিলিটারি ক্যু তে মারা গিয়েছেন, এমন ই তো আমরা জানি।' তারপর দীর্ঘ আঠারো ঘন্টা প্লেন জার্নিতে গোটা ঘটনার বিবরণ দিলেন লিতিন আর টেপ রেকর্ডারবদ্ধ সেই ঘটনাটা স্রেফ লিখে দিলেন মার্কেজ। রচিত হল "ক্ল্যান্ডেনসটাইন ইন চিলি'। ঘরে ফিরে লিতিন যে তথ্য চিত্র বানালেন তার শুরু তে পাবলো নেরুদার কবিতা-

এই দেশ আমার, আমি ছাড়িয়ে যাচ্ছি আমার দেশ কে, কোথায় যাচ্ছি জানিনা, কীভাবে যেতে হয় তাও জানিনা, শুধু জানি আমার দেশ ভাল নেই বলে আমি ভাল নেই। লাতিনের উপকথারা ভাল নেই বলে, আকাশ বাতাস ভাল নেই, বৃক্ষের প্রান্তর, মদ-রুটিদের গান ভাল নেই, কারণ আমি ভাল নেই।


      

আমাদের বন্ধু শুভ্র ম্যাক্‌স্‌মুলার ভবনের ক্যাফেটেরিয়ায় "এই যে সুমন' বলে যে তরুন কবির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল, সে ছিল বরিশালের সেই কলেজের ছাত্র যেখানে জীবনানন্দ পড়িয়েছেন। মাত্র কয়েক বছর আগে সে ভারতে এসেছে বর্তমানে দক্ষিন চব্বিশ পরগণার একটা আধা শহরে বসবাস করছে সপরিবারে। আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। ভেতরে ভেতরে এই আশ্‌চর্য্য স্বেচ্ছা-শরণার্থী দশার সঙ্গে চমকিত হয়ে থাকলেও আমাদের ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়তে হল জীবনানন্দ দাশ আর সুমনের কবিতা বিষয়ক কথোপকথনে। সেখানে আর উঠে আসেনি এই স্বশরণার্থী দশার কারণ ও পরিস্থিতি নিয়ে কোনো কথাবার্তা। হ্যাঁ, একথা স্থির মনে আছে যে, কান যতটা খাড়া ছিল অকবিতার দিকে, ঠিক ততটাই লক্ষ্য করছিল ওর গলায় সচেতন ভাবে প্রতিস্থাপন করা কলকাতার কথাভঙ্গিকে। না ধরা পড়েনি যে সুমন কয়েক বছর আগে কলকাতায় এসেছে, যেমন ধরা পড়ে যাচ্ছিল জলপাইগুড়ি থেকে এস টি ডি করা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাওয়া ছাত্র সিদ্ধার্থর বান্ধবীর কথোপকথনে, যারাও একই রকম ভাবে শরণার্থী হয়ে গড়িয়ায় বসবাস করছে। প্রকৃত অর্থে এদের আমরা চিনিনা, জানিনা কেন তারা শরণার্থী। শুধু জানি, দেশভাগের পরম ধর্ম-ভাষা-বর্ণ নিয়ে স্থায়ী সমাধানের জন্য যে সীমান্ত তৈরী হয়, তারপরও সেই সীমান্ত পেরিয়ে মানুষ যাতায়াত করে, শরণার্থী হয়,সংঘবদ্ধ ভাবে বা বিচ্ছিন্ন ভাবে।গরীব দেশের শরণার্থী ঢোকে সমৃদ্ধ দেশে,সমৃদ্ধ দেশ শরণার্থী বানায় প্রতিবেশী ছোট ছোট দেশগুলোয় অথবা দুটো সমৃদ্ধ দেশের মধ্যেও নানা ভাবাবেগ কাজ করে, যা বিচ্ছিন্ন ভাবে শরণার্থী বানায়, শরণার্থীর পরিস্থিতি তৈরি করে। আর কী আশচর্য্য , ইউনেস্কোর "দ্য ওয়ারলড রিফিউজি: রিপোর্ট ২০০০' বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষ করে কলোনির অবসানের সঙ্গে যে ছোট দেশ গুলোর স্বাধীনতা অর্জন হয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্বাধিক শরণার্থী সমস্যা। এই শরণার্থী অনুপ্রবেশ কে তারা দুভাগে ভাগ করেছেন - দ্রুতগতিতে ঢোকা শরণার্থীর কাল ও ধীর গতিতে ঢোকা শরণার্থীর কাল। আশ্‌চ্‌র্য্যের তথ্য হল, ছয়ের দশকের পর এই শরণার্থী সমস্যা সারা পৃথিবী জুড়েই গুরুত্ত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর আশির দশক ছিল শরণার্থী-বিশৃঙ্খলার কাল, যেমনটা পৃথিবীর ইতিহাসে আর দেখাই যায় নি। অলোকরঞ্জন একে বলেছেন, শরণার্থীর ঋতু। ইউনেস্কো বলেছে সেই সীমান্ত অতিক্রম করার মহদেশীয় হিসাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ -

দশক এশিয়া ইউরোপ আফ্রিকা লাতিন-আমেরিকা
৭০ ৯.১% ১০% ১০.২% ৮.৩%
৮০ ১২.৩% ১৪.২% ৮.৪% ৬.১%
৯০ ১১% ১৩% ১০% ৫.২%


শতাংশের হিসাব গুলি মহাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে।

গত তিরিশ বছরে শরণার্থীএর হিসাব যোগ করলে যে সংখ্যাটা বার হয়ে আসে তা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মধ্যে অশিক্ষিত পানীয়জলহীন,অপুষ্টিতে ভোগা মানুষজনের হিসাবের সমতুল্য। বিশেষত, এর সামগ্রিক সংখ্যাটা পৃথিবীর অনেক ছোটোখাটো দেশের চেয়ে বেশি। আফ্রিকার কবি জিন্ডালা মেবু, নিজেই একজন শরণার্থী; জাতিগত দাঙ্গায় পীড়িত, দেশান্তরী; দু জার্মানী মেলার পরে যে শরণার্থী সম্মেলন হচ্ছে দু বছর ধরে, তাতে কবিতা পড়তে এসে বলেছেন, সারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সঙ্কটের একটা শরণার্থী সমস্যা বা সীমান্ত সমস্যা। তাঁর কবিতায় রয়েছে সেই সীমান্ত সমস্যায় অনি:শেষ দুর্গতির কথা, নÙটালজিয়া -

সারা পৃথিবীর সমস্ত শরণার্থী শিবিরের তাঁবু নীল কেন?
সারা পৃথিবীর সমস্ত সীমান্তের রং হলুদ
এই নীল আর হলুদের বুনে যাওয়া সোয়েটার নিয়ে
আমার বাড়িতে মা বসে আছেন।
আমি যত দূরেই যাই, সেই সোয়েটারের উল
ছেড়ে যাচ্ছেন তিনি আর আমি শরণার্থী শিবির থেকে
শিবিরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, হাতে পাসপোর্ট -
কিন্তু মায়ের কাছে যেতে পারছি না।


ইউনেস্কো পোস্টার বানিয়েছিল এই কবিতা দিয়ে, সঙ্গে একটা নীল রঙের শরনার্থী শিবিরের ছবি। সীমান্তের রং কি হলুদ? দলাই লামা, স্বাধীনতা উত্তর ভারতের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ শরণার্থী, সম্ভবত: গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী শরণার্থী তিনি, লিখেছেন, "একের পর এক হলুদ রাস্তা পার হয়ে আসছি, পাথরে কোনো সবুজ নেই, জল নেই, ভালবাসা নেই; শুধু রুক্ষ হলুদ রাস্তা। এভাবেই এল সীমান্ত। আমি তিব্বত পেরিয়ে যাচ্ছি ভারতের সীমানায়। সেই একই হলুদ পথ। কোনো পরিবর্তন নেই। তাহলে কেন এত বিপর্যয়? আমার সঙ্গে পথ হেঁটেছে যে দশ হাজার তিব্বতি, যারা আমার সঙ্গে শরণার্থী হয়ে ভারতে ঢুকেছে, আমি বিশ্বাস করি তাদের সকলের আগে, ঐ হলুদ পথের সামনে হেঁটে চলেছেন গৌতম বুদ্ধ। আমাদের জয় হবেই।'

এই যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে যত শরণার্থী সমস্যা, তার অন্তর্গত কোনো একটামাত্র সুত্র নেই, যেমন থাকতো আগে স্বাধীনতা বা ঐ জাতীয় কিছু। এখন তা বহুধাবিভক্ত, জটিল,গোষ্ঠী ও এককের স্বাধীন আকাঙ্খা পুরণের লক্ষ্যে অগ্রগামী। কী বলা যাবে একে - উত্তর আধুনিক ঝোঁক? হয়তো। সদা উৎপন্ন, পীড়িত মানুষের জাগ্রত বিবেকের পরিচয়। বলেছেন কোফি আন্নান। এই "বিবেক' খায় না মাথায় দেয়? কে জানে! রাজনৈতিক মার্কা দান বা বিদ্যায়তনিক অভিধা, এই দুই সম্পর্কেই ইউরোপ-আমেরিকার উৎসাহ সীমান্ত বা শরণার্থী গড়ে তোলার উৎস - উৎসাহের সঙ্গেই সমতুল্য। এই টেবিল - টক, সেমিনার, রিপোর্ট আর ক্ষমতাকেন্দ্রের সেবাপ্রকল্পের অন্ত:সারশূন্যতা - সব সমান। কিংবা উল্টো দিকে - ক্ষোভ, বিক্ষোভ, মিছিল, ধর্না,গুলি,মৃত্যু, হাহাকার। জিন্ডালা মেবু বলেছেন, এই যে ক্রস বর্ডার টেরোরিজম, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এইসব আনসলভড শরণার্থী সমস্যা। কারণ, আজ যে গুলি খাচ্ছে, কাল সে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ নিয়ে অস্ত্র হাতে ধরবে। তাকে অস্ত্র যোগাবে এই ক্ষমতার রাজনীতির ঐ বিকেন্দ্রীভূত সহশক্তি রা। এমন অনেক দেশ আছে যাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা সীমান্ত। সীমান্ত নির্মাণ ও লোপের যে টানাপোড়েন দ্বন্দ্ব; তার ই রাজনীতি আজ সীমান্ত পুনর্নির্মান তত্ত্বর জন্ম দিয়েছে। জানা গেছে, সীমান্ত মনস্তত্ত্ব - একজন মানুষ নাকি এই ডায়াস্পোরায় তিন পুরুষ ধরে একই দেশে আর থাকতে চাইবে না। সে মানসিক কারণেই সীমান্ত লঙ্ঘন করবে, তৈরি হবে সেই সীমান্ত লঙ্ঘনের সংকট আর সেখান থেকেই সীমান্ত অস্বীকার করার বা নস্যাৎ করে "বিশ্বগ্রাম' - এর দিকে যাওয়ার দিকে ঝোঁক। অর্থাৎ দুপিঠ ওয়ালা একই মুদ্রা। একই সঙ্গে দুটো প্রবণতা, সীমান্ত-রচনা ও সীমান্ত-মোচন। এই অংশের সূচনায় যাঁর কথা দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই জীবনানন্দ দাশ আশ্‌চর্য্য ভাবে ধরতে পেরেছিলেন সেই দুটো দিক। তিনি তো সীমান্ত-সংকটে পড়া মানুষ নন, কিন্তু দেশান্তরী, তাই তাঁর কবিতার উচ্চারণ যতটা নস্টালজিক, মহাভৌগোলিক, ইতিহাস সচেতন; ততটা সীমান্ত সমস্যা কেন্দ্রিক নয়। তিনি লিখেছেন -

একটি হাওয়ার সাথে সমূহের কথা হল অবশেষে,
অবশেষে হাওয়াদের গান ছুঁয়ে দিল নদীর আ ঘ্রাণ,
চরে ওড়া চিল, আকাশের সীমানা ব্যাপিয়া রহিয়াছে
গাঢ়তর ওড়াউড়ি, পালযুগ, বাংলাদেশের জলছাপ,
আর তারা চিনিয়াছে মহাসময়ের পৃথিবীকে,
সীমান্তহীন হাওয়াদের গানের সেই দেশ আজও বসি আছে।



কিশোরী মা আমার দাদু-দিদার সঙ্গে দেশভাগের পর পাবনার বাড়ি ছাড়ার সময় বাড়ির উঠোনে দাঁড়ানো সাধের হিম সাগর গাছের আমের আঁটি নিয়ে এসেছিল। দেশান্তরী হওয়ার সময় কে যে কী আনে, কে বলতে পারে! দিদা এনেছিল একসের বোয়ালমাছ কাটার বঁটি - পথের অস্ত্র , পুরোনো সংসারের স্মৃতি - হয়তো এ ভাবনাও ছিল নোতুন জায়গায় নিজের ছেড়ে আসা সাম্রাজ্যের লীলা বোঝাতে ওই একটা লৌহ পাত ই যথেষ্ট হবে। কিন্তু মা তখনো দোলনা চড়তো বলে, ওই আমগাছ লাগিয়ে তাতে দোলনা ঝোলানোর সুদূর পরিকল্পনায় গোপনে আশচর্য্য রকম মিষ্টি হিমসাগরের আঁটি কোচড়ে করে শিয়ালদহ স্টেশনে। কলোনি তৈরি হল। বিয়ের পর সেই কলোনির বাড়ির উঠানে ঐ আমআঁটি পুঁতে নিত্য জল দিয়ে সত্যি সত্যি একদিন আম্রবৃক্ষ তৈরি হল। তার ডালে বাঁধা আমাদের জন্য বারোমাসের দোলনার স্মৃতি যে আসলে তাঁর কাছে পূর্ববঙ্গ, তা তখন বুঝিনি। এখনো কি বুঝি? শুধু দেখতে পাই ঝড়ে-জলে-রোদে-মেঘে সেই দোলনা সবসময় দুলে চলেছে আর গরমকালে তাতে ঝরে পড়ছে পাকা হলুদ মিষ্টি হিমসাগর। সীমান্ত পেরিয়ে আসা সেই গাছের গয়ে শেষ মেশ বাংলাদেশ যুদ্ধে পাকিস্তানি বিমান থেকে শেল পড়লো। দাউদাউ করে জ্বলে গেল গাছটা। আবার নিভেও গেল। কিন্তু সেই মিষ্টি হিমসাগর আর ফলল না। কচি আমের নীচটা ক্রমশ নীল থেকে নীলতর হয়ে যেত। তারপর পাড়ার মুখের উপর গোটা গরমকালটা সেই দেশভাগ ও যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে হাজার হাজার নীল-বিষ আম ফলাতো গাছটা। নিয়ম করে প্রতি বছর। লোকে জানতো, ডেভিড ডাভিডার নয়, আমাদের বাড়ি ই অসলে হাউস অফ ব্লু ম্যাঙ্গোজ। আশচর্য্য ঘটনা, লোকটা নামটা বেমালুম মেরে দিল। আর তারপর থেকে মা ক্রমশ চন্দ্রাহত হতে শুরু করল। সেই কলেজের দিন গুলোয় এমন একটা কবিতা লিখেছিলাম যার প্রথম দুই পংক্তি ছিল, "আমের নীল থেকে মায়ের মাথায় চাঁদ ঢুকে গেছে / আমি চাঁদ তাড়াতে পাবনায় যাব, আমের আঁটি নিয়ে আসব।' পুরনো আমগাছটা আজও আছে, মা মারা গেছে কিন্তু আমের আঁটি নিয়ে আসা হয় নি। বাস চালু হয়েছে - সৌহর্দ্য-শ্যামলী। রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে কেনিয়া, টোল উঠছে দু বেলা। বেনাপোল-পেট্রাপোল হয়ে ছায়াঘেরা পথ, পাচার হচ্ছে নারী-শিশু-গরুবাছুর আর হিন্দি সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট। পাচার হচ্ছে কবিতা -

শুনতে পাচ্ছি ওগো মেয়ে তোমার দুটি চোখের ভাষা
বলছে আমায় কোথায় ছিলে, কোথায় তোমার এখন বাসা
যাচ্ছো কোথায়, সীমান্তের এই সড়ক ধরে চিনছ কিনা
বলব বলে এসেই দেখি ভ্যানিশ তুমি, ছিন্নবীণা।


এ কবিতার রচয়িতা কোনো বাংলাভাষার কবি নন, জার্মান কবি হাইনে। দেশান্তরী কবি হাইনে গোপনে ফিরছেন নিজের দেশে আর ফিরতি পথে সব চেনা চিহ্নকে এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন একজন শরণার্থীর মত একটু ও স্বস্তির আশায়। পকেটে একটা জাহাজ মার্কা কম্পাস, বাবার দেওয়া স্মৃতি। আমের আঁটি থেকে কম্পাস - এই 'মাস' ও 'ক্লাস' -এর ঐক্যে কোথাও যেন সীমান্ত লঙ্ঘনের একই যন্ত্রণা আছে, একই নস্টালজিয়া। দানবের মত দুপা ফাঁক করে দাঁড়াচ্ছে। ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে একজীবন।
গ্রিসের চিত্রপরিচালক থিও এঞ্জেলোপুলস-এর ছবি 'ইটারনিটি অ্যান্ড আ ডে' - র গোটাটাই যেন ছায়ায় নির্মিত। ঠান্ডা আলো, কুয়াশা, শীতকাল। মধ্যবয়সী নায়ক পথ থেকে একটা বালক কে উদ্ধার করে, যে থাকে সীমান্ত পেরিয়ে আলাবেনিয়ায়। দরিদ্র, অসুস্থ এইসব শিশুরা কাজের আশায় সীমান্ত পার হয়, গাড়ি মোছে আবার পাকে চক্রে বিক্রিও হয়ে যায়। সে বালকটাকে ফেরত দিতে যায় সে নিজেই পাহাড়ের উপর কুয়াশায় ঢাকা সশস্ত্র সীমানার কাছে। হাড় হিম করা ঠান্ডা ও সীমান্ত চিত্রকল্পের স্থানুবৎ উপস্থিতির মধ্যে জেগে থাকে শুধু লোহার জলে ঝুলন্ত পাহারাদারের দল। হাতে স্টেনগান। কার্গিল, দ্রাস থেকে কাটাও,নাথুলাপাস একাকার হয়ে যায়। রিচার্ড বাখ লিখেছেন, ' বিমানটা যখন ওপরে ওঠে তখন আর দেশের সীমানা দেখা যায় না, মনে হয় সমস্যাটা তত প্রকট নয়; অবশেষে একসময় বিমানটাকে যখন নীচে নামতে হয় তখন বোঝা যায় সমস্যাটা যথেষ্ট প্রকট, এক দেশ থেকে উড়িয়ে আরেক দেশে নামালে চলবে না, যত্রতত্রও নয়। আসলে বিমান ওড়ানোর থেকে বিমান নামানো অনেক কঠিন।'


      

এই অতিআবেগি রচনার যে হোমওয়ার্ক করা ছিল, তা নষ্ট হতে শুরু করে নাসিমের ঘটনা থেকেই - সীমান্ত বিষয়ক উদাসীনতার ঐ ধরণের একটা কাহিনী কে সবার আগে বলে দেওয়ার মাধ্যমে। কীভাবে আধুনিকতা-উত্তর এই সময়ে সীমান্ত সমস্যা ক্ষমতাকেন্দ্রকে নির্ভর ও নস্যাত করে এগিয়ে চলেছে, সৃষ্টির অবলম্বন বা পথরোধকারী হয়ে উঠছে, তার শিল্প-সমাজ ও তথ্যমিশ্রিত প্রাথমিক একটা পাঠরূপ গড়ে তোলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। অথচ প্রথাগত যুক্তিবিন্যাস কে না মেনে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যে কাহিনিটি অবশিষ্ট আছে তা মূলত: ভূমিকা বা বর্ডার অ্যান্ড ইকোলজি - ইকোলজিকাল বর্ডারের উদাহরণ। কিংবা ইকো-মিথোলজিকাল। যে ভাবেই ভাবা হোক না কেন, তা প্রথমাংশ ছাড়া আর অন্যকিছু নয়।

পূজাবকাশে এইবার ভ্রমণের থিম ছিল বুদ্ধের জন্ম ও কর্মস্থলগুলো। বুদ্ধ যেখানে গিয়েছিলেন, শুধু সেই সব জায়গাগুলোই। বুদ্ধগয়া, রাজগির, সারনাথ, বারাণসী,ঘুরে টুরিস্টহ £ন সেই সব দুর্গম শ্রাবস্তি,কুশিনগর হয়ে যখন লুম্বিনীর পথে তখন সেটা ভারত ছাড়িয়ে নেপালে। গোরক্ষ পুর থেকে জিপে করে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সীমান্ত-শহর সিনৌলিতে। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে চার কিলোমিটার দূরে ভৈরয়াঁয় আমাদের রাত্রি বাস করতে হবে। পরদিন বাসে করে বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী। পথে আসতে গিয়ে তেল ও জীপের সমস্যায় এতই দুর্ভোগ হল যে জিপ সিনৌলি পৌঁছোলো রাত দশটায়। শুনশান, অন্ধকার। বর্ডার পেরোনোর মত কোনো গাড়ি নেই। মালপত্র সহ আমি-মৌ। নেপালে না পোঁছাতে পারলে পথেই রাত কাটাতে হবে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে প্রচন্ড। কোনোক্রমে একটা রিক্সাকে রাজি কারন গেল তিনগুণ ভাড়ায়। এপথে পাসপোর্ট লাগে না। তাই আমাদের সঙ্গে কোনো পরিচয়পত্রও নেই। চেকপোস্টের গেট পেরিয়ে সেই অন্ধকার খাখা পিচরাস্তা ধরে পরিত্রাহী এক ভয়ে আমাদের রিক্সাওয়ালা ছুটছে। চার কিলোমিটার পথ। ওভাবে ছুটছে কেন? রাত এগারোটার পর নাকি পৃথিবীর সমস্ত আন্তর্জাতিক সীমান্তের এদিক-ওদিক দুই-দুই চার কিলোমিটারে কার্ফু লেগে যায়। তখন ধরলে জেল কিংবা বন্দুকের গুলিতে মারাও যেতে হতে পারে। আর নেপালের সময় ভারতের সময়ের চেয়ে প্রায় আধঘন্টা এগিয়ে। অর্থাৎ আমাদের ঘড়িতে যখন নিশচিন্তের সাড়ে দশটা, তখন নেপালে কার্ফু লেগে গেছে। অতএব ছুট। সীমান্ত অতিক্রমের এই ছোটার ভেতর দিয়ে জানতে পারলাম এমন আন্তর্জাতিক নিয়ম। জীবন-মৃত্যুর মধ্যে দাঁড়ানো আমার জীবনের প্রথম সীমান্ত অতিক্রম, বিদেশযাত্রা। পৌঁছে দিল সে রিক্সা। পরদিন সকালবেলা লুম্বিনী। বুদ্ধ ও এসেছিলেন নেপাল থেকে ভারতে। তখন এমন সীমান্ত ছিল না। আজকের বিচারে সীমান্ত-অতিক্রমী মানুষ, দলাই লামার ভাষায়, আগে আগে হেঁটে চলেছেন তিনি, গৌতম বুদ্ধ।

লুম্বিনীর দোকানপাটের নাম মূলত: সিদ্ধার্থের নামে। গৌতম বুদ্ধ বোধগয়ার পর, লুম্বিনী তো আগের ইতিহাস। বাস থেকে নেমে সেই মায়দেবীর পথ চলে গেছে গাছের ফাঁক দিয়ে, ত্য বার্থ প্লেস অফ বুড্ডা স্যার, লুক লুক, বিফোর ডেলিভারি মায়াদেবী বাথ হিয়ার, স্যার, দ্য হোলি পন্ড। তাকিয়ে দেখি, নীলজলের ধারে অভিমানিনীর মত দাঁড়িয়ে আছে নীল পিপুলবৃক্ষ। এমন ই একটা গাছের নীচে বুদ্ধ জন্মেছিলেন। নীল কেন? কোন যুদ্ধের শেল পড়েছিল এই গাছের গায়ে? কী ভাবে এই মাইথোলজিক্যাল বর্ডার ক্রস করল ইকোলজিক্যাল বর্ডার কে? হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। যেন আমার বাড়ির আমগাছ। আর মাথায় পাগড়িবাঁধা টুরিস্ট গাইড জানাচ্ছে, সে প্রত্যেকদিন এই কাজ করতে আসে ভারত থেকে। নাম সত্যানন্দ প্রসাদ। ফিরতে রাত হয় না তোমার, তখন কী কর?
আবার সেই উদাসীন হাসি, আবার সেই উদ্বেগজব্দ উত্তর, "এইসায়ি চলা যাতা হ্যায়।' হয়তো হুবহু এমন নয়, আবার এমন ও। এই একটা উত্তরের নীচে শুয়ে আছে পৃথিবীর তাবৎ সীমান্ত।

(চলবে)