আপনার মতামত         



দিন আনি দিন খাই (দ্বিতীয় পর্ব)...

সুমেরু মুখোপাধ্যায়


-- ১ --

আসলে তো একটাই দিন। আমার মনে হয় কোথাও যেন সব আমানত আছে, আমি একটু একটু করে নিই, রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়ার মতন। আমার টাকা পয়সা তো নাই। কোনদিন ছিলও না। সেগুলো সব রাত, আছে হয়ত, কিন্তু চিনতে পারিনা, খুঁজে পাই না। দেহের বয়স বাড়ে, আমার দিনের হিসেব রাখতে রাখতে ছিঁড়ে পড়ে ক্যালেন্ডারের পাতাগুলি। বাড়িতে বাড়িতে ক্যালেন্ডার পাল্টায়। আমার কখনও জীবন একপাতা, কখনও বারো পাতা, ঘন্টা টাইমের হিসাব থাকে সব শব্দের অন্ধকারে, কারখানা, টাইম-কল, পারে এসে লাগা ভটভটি। আমরা সবাই হিসাব করি। হাতে সব রঙিনতাস, ফুলকপি, বাঁধা কপি, সবাই বাজারের মাছওয়ালা। যেমন স্বপনের ছিল সাট্টার নেশা,সিলিপ- সিলিপ আর সিলিপ,বটতলায় বসে সে আর কাউন্সিলার মদন দিনরাত হিসেব করত, খোকা বোঁ- বোঁ ক'রে সাইকেলে দিয়ে যেত হিসেবের কাগজ। আর এই সুপার লোট্টো আছে না,নম্বর নম্বর, সাবেব-বিবি-গোলাম, আসলে সবই আছে হিসাব মত। আমি চাইনিজ জাপানিজ ইংরাজী কোনোটাই পড়তে পারি না। লোকের কত শখ থাকে, চশমার, খপরের কাগজ, পাইখানায় বিড়ি ফোকা। বাক্স থাকে, আমার ছিল পুটুলি। আমি যতগুলো সংসার করেছি ততগুলো বিষ পুটুলি আমার রগের কাছে দলা পাকিয়ে থাকে। আমি যদি সত্যিই নদী হয়ে থাকি, তাহলে আবর্জনা ভেসে বেড়াবেই। আমি যে গোটা দিনটার কথা ভাবি তাতে অল্প অল্প রাত থাকে। নদীতে পচা ফুল, পানা, মরা কুকুর ভেসে ভেসে যায়, আসলে আমি সব দেখতে পাই। যেটুকু দেখার সেটুকু দিন হয়, বাকীটুকু রাত। ঐ তো পরিতোষের কথামত চোখ বোজা আর-খোলা। ছোটবেলায় হোমের কিচেনে চিনি থাকত বোয়াম ভর্তি বা নকুল দানা, আমরা চুরি করে খেতাম। কিন্তু নকুল দানা তো পাটালি নয়, টুকরো টুকরো। দানা দানা চিনি। অমনি অনেক গুলো টুকরো নিয়ে আমার দিন কাটে না, স্মৃতিগুলো কিছুতেই পিছু হটে না, সব হারামির বাচ্চা।

আমাদের সবকিছু টুকরো টুকরো কেন? গোটা আম টুকরো টুকরো করে খাই,রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে। আমার স্মৃতি আমার ছেলেবেলা সব টুকরো করে দিয়েছি। এই যে আমি নদীর মতো, নদীরও কোন ছাড়ন নেই। দেশভাগের মত তার টুকরো টুকরো নাম। আসলে পৃথিবীতে একটা পাহাড়, একটা নদী তো আর সম্ভব নয়, পৃথিবী মানে গ্রহ সেটাও একটা নয়। তিনি দিলেন দুটো মানুষ। আদম আর ঈভ। নইলে আমরা কোথায় থাকতাম। তিনি দিলেন দিন আর রাত, সেও আবার টুকরো টুকরো। এক কলের জল টুকরো টুকরো করে নানা পাত্রে ধরে রাখা। আমিও সেইমতো সবকিছু ভরে রাখি পুটলিতে পুটলিতে। টুকরোগুলো জুড়তে পারি না বলে একটা হতাশা গিলে নেয় আমাকে। এই গিলে ফেলল আমায় তারপরে আবার বেরিয়ে পড়লাম। এ তো সেই সমুদ্র ছেঁচার গল্প। এই যে আমাদের সব চাঁদ-তারা গিলে গিলে নেয় রাহু-কেতু রা । অমৃতের স্বাদ আমি কোনদিনই পেলাম না। কিশোরকুমারকে পেয়েছিলাম আবার পাইও নি। যেই গানটায় সমুদ্রমন্থনের কথা ছিল সেই টি-সিরিজের ঝাড়া ক্যাসেটটা আর বাজাতেই পারলাম না, টেপ পেলাম না যখন পেলাম তার চাকা জ্যাম। ভুড়ভুড়ি খতম। জানি গানটা আছে শুনতে পারছি না। আমি মা হতে পারলাম না। লোকে নিস্ফলা গাছ পছন্দ করে না তায় আবার মানুষ, খেতে চায়, শুতে চায়, সোহাগ চায়! সংসারের ঘটি-বাটি সব বদলে বদলে যেতে লাগলো। রোজকার দেখা তালগাছ ঘুমথেকে উঠতেই ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে গেল। কখনও নদীর এপারে কখনও নদীর ওপারে আমি জেগে থাকার চেষ্টা করি, নদী দূরে সরে যেতে লাগলো। মাঝে মাঝে রাত খুঁজে পেতাম, কিছু ভালোবাসার রাত, তবে একটানা নয়। হাত ঘুরিয়ে পায়ের ওপাশ থেকে আঙ্গুলে করে আলতা মিলিয়ে নেওয়া নয়। অমন টানে নদী আঁকা যায়, আমর জীবন নয়। আমার দিনগুলো সব আলাদা আলাদা টুকরো টুকরো। মেলানো যায় না।

আগে গান গাইতাম, আগে কত কি যে করতাম। ছুঁচ উলের টুকরো সব তো পুটলিতে, সব আমার গলার ভেতর দলা পাকিয়ে আছে, বিঁধে থাকা বোঝ? গেলা যায় না। যত সংসারই হোক মানুষ তো সেই একাই থাকে আর মেয়েরা ঘর বুনে যায়। দিনের সাথে দিন বুনে যায়, উলের গোলা পাক মেরে মেরে ছোট হয়, বয়সের পর শরীর আর নেয় না। স্বামীর জন্যে আসন সেলাই করি, হ্যারিকেনের সলতে বারবার বাড়িয়ে নিই , সকাল হলে সমান করে কাটি। মাফলার বানিয়েছিলাম অনেকগুলো, হাতমোজা একবার। কাঁথার উপর ঘর-বাড়ি বুনেছি। শুষনি শাক, কলমি শাক যেমনটা ঐ চালচিত্রে থাকে। দেবী তো বসুন্ধরা, তার শরীরে শুষনি শাক কলমি শাক, হাঁস , পাখি, ময়ূর। বিসর্জনের সময় আমি টুকরো টাকরা ছিনিয়ে নিয়ে আসতাম, নদী অবধি যেতাম না বোমের আওয়াজে। ফ্রকের তলায় শরীর হাচড়ে থেকে যেত অলংকার আর চুড় চুড় চাঁদমালা, চালচিত্রের টুকরো জমা হত পুটলির মধ্যে। দাঁতভাঙা চিরুনী, রোয়া ওঠা দাঁতের বুরুশ, সব কিছু নিয়ে পুটলি বড় হত যেমন পেটে বাচ্চা এলে হয়। অমি আনন্দে গান গাইতাম । আগে পাড়াঘরের গান পরে ট্রান্‌জিষ্টারে শুনে শুনে গান তুলতাম যেন বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ি। মুর্শিদাবাদে থাকতে দল বেঁধে যেতাম বিয়ের আসরগুলোয় গান গাইতে। তিন-চার দিনের জন্যে পেট পুরে খাওয়া। গাইতে গাইতে কত কথা শিখতাম। নদীর ধারে বসে গুনগুন করতাম। নদীতে পচা ফুল, পানা আর অদৃশ্য সব ডানাওয়ালা মাছ ভেসে ভেসে যেত। লুকিয়ে লুকিয়ে সেগুলো লিখে রাখতাম। সব হারিয়ে গেছে। যখনই একা থাকি তখনই লিখি আর আমার একা থাকা হারিয়ে যায়। ভালোবাসা দু-টুকরো, এক হাতে তালিই বাজে না । আমিও এক কিশোর কুমার থেকে অন্য কিশোর কুমারে ঘুরে বেড়াই। সংসার বদল হয় এক দিন থেকে অন্য দিনে, এ শহর থেকে অন্য শহরে চলে যাই।

ইস সে পহলে কি ইয়াদ তু আয়ে
মেরে আঁখো মে ফির লহু আয়ে
তুঝসে রিশতা ম্যায় তোড় যাউঙ্গা
মুঝকো গম হ্যায় তেরে জুদাই কা
রন্‌ঝ হ্যায় আপনি বেওয়াফাই কা
আপনি ওয়াদে সে ফির গয়া হু ম্যায়
ইসসে পেহলে কি তু মুঝকো ছোড়ে
মুঝকো ঠোকরায় মেরা দিল তোড়ে
আপনা দিল খুদ ম্যায় তোড় যাউঙ্গা
ম্যায় তেরা শহর ছোড় যাউঙ্গা।


-- ২ --

হলুদবরণ দুটি কন্যা নারী জলকে সেজেছে,
কি হায়রে নারী জলকে সেজেছে।
সিঁথার মানান সিন্দুর দিব নারী আমার মহলে আয়,
কি হায়রে নারী আমার মহলে আয়।

আমার ডাক আসে, আমি ডাক টের পাই। ডাক এলে আগের সবকিছু চুরি হয়ে যায়। আগের দিনগুলি, আগের পুটুলি, আগের সংসার। দূর কোন টাওয়ারে দপদপ করে লাল আলো, নিষেধের সংকেত তবু আমার ছুটে যাওয়া চাই। দিনের অন্য টুকরোগুলো না পেলে বুঝি আমার দিন শেষ হবে না। বয়ে যাওয়া জীবনের টুং টাং সেই ডাক কানের মধ্যে ফিসফিসাতে ফিসফিসাতে একসময় থেমে যায়। গাছতলায় বকুল ফুল হয়ে পড়ে থাকে যখনই সকাল হয়। এসমস্ত ঢ্যামনামি আমি টের পাই। আমাকে ঘর থেকে বের করার ডাক। পুরুষেরা ফুসলায়। দেহ চাই, মাংস চাই। আমি দেখতে চাই পড়ে থাকা ফুলগুলোকে, আমি দেখতে চাই না সেই পড়ে থাকা ফুলগুলোকে যখন আমি ডুবে থাকি ভালোবাসার রাত্রিতে। তবু সকাল হয় আর ফুলগুলো পড়ে থাকে। আমি ফুল ফোটাতে পারি না তাই অবাক হতেই হয়। কোথা থেকে এল এই ফুলগুলো? ফুল ফুল ছেলে-মেয়েরা রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে, স্কুলে অফিসে ছড়িয়ে পড়ে, সে তো অন্য জীবন। টুকরো টুকরো দিন, টুকরো টুকরো জীবন, টুকরো টুকরো আমার দেখা, টুকরো টুকরো আমার কথা। যখন যা কাগজ পেয়েছি, টুকরো কাগজ, বিলবইয়ের পাতা, সিনেমার টিকিট, বইয়ের প্রুফের সাদা অংশ, এভাবেই আমি স্মৃতি লিখে রাখি নয়তো ও হারামি সব মুছে যাবে। স্মৃতি মুছে যাওয়া খুব খারাপ । নদী যখন এগিয়ে এগিয়ে যায় তার আগের অংশ কি মুছে যায়? হরিদ্বার থেকে গঙ্গা এলাহাবাদে চলে এল তার মানে কি হরিদ্বারের গঙ্গা মুছে গেল? অসম্ভব। আমার দিন আমি মুছে যেতে দেব না। ঘর বদলাই, শাড়ি বদলাই, শহর বদলাই, সংসার বদলাই, দিন আমার শেষ হয় না।

চাঁচের বেড়ার দরজাগুলো ক্রমশ এপাশে একটা কাঠি আর ওপাশে একটা কাঠি দিয়ে চাপা থাকে কান্নার মত। কাঠিগুলি যদি তুলে নিতে যাই ঐ দেখা যায় আমার ঘর। আমি ঘরে ঢুকি রোজ রোজ কিন্তু তা আমার ঘর বলে চিনব কি করে? পুরনো বিছানার চাদরে বানানো পুটলি আর টিনের বাক্সখানাই কি আমার ঘর-বাড়ি উঠান? যেদিন আমি পুটলির মধ্যে ঢুকি সেদিন কেবল দীর্ঘশ্বাস দিয়ে সাজানও থাকে রাত্রি। সারসার আমগাছ আর আম পড়ার সাথে সাথে আমাদের দৌড়। বাজ পাখির মত ছোঁ মেরে সাথে সাথে আবার দৌড়। আমগাছের ডালগুলো ক্রমশ শহরের রাস্তাঘাট হয়ে পড়ে। ঝরা পাতা থেকে শহরের খানা-খন্দ, ম্যানহোল, ম্যানহোলে শিশুর কান্না শোনা যায়। এমনই কোন এক আমগাছের কোটরে আমার জন্ম। ঝুড়ির ভিতর আম সাজানো হয় যেন অনেকগুলো আমি। বাজারে নিয়ে যাওয়া হবে, সব বেচে দেওয়া হবে, কে কোনটা খাবে তার কোন হিসেব নেই। মা-বাপের কিসসাটা শুনেছি বড় হয়ে। হোমে টুস্টুসে হয়ে উঠলাম। আমিও একসময় শহরে চলে আসি। গানেরা শহরে এলে ফিতে বা রেকর্ডে গাঁথা হয়ে যায়। নদীও একদিন নাচতে নাচতে শহরে চলে আসে। তাই বাঁধা পড়লাম সিমেন্টের ঘাটে। সে ছিল আমার গঙ্গা। আমরা দুইজনে বসতি করি শহরে। নতুন সংসার।

একের পর এক নতুন সংসার আমাকে নদী করে তোলে। আসলে খুব ছোটবেলায়ই টের পাই আমি নদী হয়ে যাচ্ছি। আমি জানতাম মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণের অধিক। আমি জানতাম আমার হোমে মেয়েদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায়, আমাকে প্রথমবার বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুখেন শিস দিত রাত্রে জানালার কাছে এসে। সাবুদি বল্লেন, আমাদের হোমে একসাথে একশো জনের বিয়ে দেবে, এটা রেকর্ড, মন্ত্রীরা সব আসবে, স্টিব ওয়াক বলে একটা বড় খেলোয়াড়কে আস্টেলিয়া থেকে আনার চেস্টা হচ্ছে। ওকে আনতে পারলে আমাদের হোম তিনতলা হয়ে যাবে, কারুর কোন কষ্ট থাকবে না। আমি রোজ স্টিব ওয়াকের স্বপ্ন দেখতাম। দুজনে কবাডি খেলতাম, কি ছেলেমানুষই না ছিলাম তখন! হঠাৎ করে আমি আর খুকিটি থাকলাম না, ক্রমশ বুঝলাম আমি গঙ্গা নদী হয়ে যাচ্ছি। তখনও গঙ্গা নদী চিনিনি আমি। আমরা বলতাম ভাগিরথী। পূবপাড়ে লালবাগ পশ্‌চিমপাড়ে আমাদের গ্রাম এলাহিগ্‌। কতবছর যাইনি সেখানে। হয়তো সেই লাল মোরামের রাস্তাটাও আর নেই। আমার হোমে যাওয়ার রাস্তাটাই যদি আর না থাকে তো হোমে যাব কি করে? কাটা ঘুড়ি কখনো মালিকের কাছে ফেরত আসে না।

আমি প্রতিটা সম্পর্ক ভাঙ্গার আগে টের পাই। কিশোরকুমার আমায় বলে চলে আয়, চলে আয়। কিশোরকুমার চারবার বিয়ে করেছে। কি সব স্যাড়ি²ফাহাইস। আমি যখন পরিতোষের সংগে ঘর করি, তখন ও রোজ কিছু না কিছু পুরুফ নিয়ে আসত রাতে দেখার জন্যে। আমি সেগুলো রাতে জেগে জেগে পড়তাম, ও মাল খেয়ে নাক গাঁতিয়ে ঘুমাত, পেরথমে একটু চিল্লাতাম, একটু কাঁদতাম, তার পর শালা পড়াশুনো শুরু করে দিলাম । তার মধ্যে কিশোরকুমারের কথা আমার মনে গেঁথে গেছে, কত কি ছিল বইটায়। মাগীগুলোর নাম ভুলে গেছি, একটা ক্যানসার শুদ্ধু বিয়ে করেছিল। কিশোরকুমার গ্রেট মাল। বেলেঘাটায় থাকতেই আমি অবশ্য কিশোরকুমারকে ভালোবেসে ফেলি।
এক ম্যায় আউর এক তু
দোনো মিলে ইস তরাহ
আউর যো তন মন মে হো রাহা হ্যায়
ইয়ে তো হোনা হি থা

আমি আমার শরীর চিনতে শিখলাম, এর আগে আমি যেন কাউকে ভালোবাসিনি, ভালোবাসা পাই নি।

কিউ নেহি মিলতে হ্যায় ইয়ার ইয়ার সে
দে মুঝে প্যায়ার কা জবাব প্যায়ার সে
ধড়কনে হুয়ি জওয়াঁ, ওয়াক্ত ভি হ্যায় মেহেরবাঁ
ফির ইয়ে ক্যায়সি দুরীয়া বোল বোল বোল
আমি বুঝতে পারি প্রতিটা নারীজন্ম গনগনে আগুণের জন্ম দেয়, কিশোরকুমারে গানে বারুদ থাকে, কেবল ঠুকে সেটা জ্বালিয়ে দেওয়া । মমতা ব্যানার্জীকে দেখলে আমি সে আগুণের আঁচ পাই ও নির্ঘাত কিশোরকুমার ভালোবাসে, না বেসে উপায় নেই, সোচোগে তব মেরে বারে মে তানহাইয়ো মে, ঘের যাওগে আউর ভি মেরে পরছাইও মে। এখন তুমি একলা, এখন তুমি তাকে ভালোবাসো। আসলে সব মেয়েই একলা, সব মেয়েই আগুণ। হারামির বাচ্চারা সেই জন্যে ওকে সহ্য করতে পারে না। মেরে সব মাজাকি ঘুচিয়ে দিতে হয়। আমিও পুরুষ পোড়াতে ভালোবাসি। কিশোর কুমার পুড়তে ভালোবাসে । তার গান শুনলেই আমি টের পাই। আমি নদী হয়ে থাকি বলে ঠান্ডা, না হলে তোদের সব কটার খাল খিঁচে নিতাম। আমি কখনই বেশী আশা করি না। উল্টে চুপচাপ একা শুয়ে থাকি কিশোরকুমারের সাথে।

আমরা এলাম নদীয়ায়। রনপল্লীতে ছিল ওর ওর্জিনাল বাড়ি। একটাই কামরা। বাড়ির পেছনেই রাইসমিল। বেলা বাড়লেই তুষের গুড়োয় সব ঢেকে যেত। সকালবেলায় ও মিলে চলে যেত। সারাদিন ঘরে একা একা। কাটা চট এনে দিত ও রাইসমিল থেকে। পুরনো সোয়েটারের উল খুলে আমি আসন বুনতাম। অনেকগুলো হয়ে গেল একবছরের মধ্যে। সেই সময়টায় আমি খুব মা হতে চাইতাম। ঘর বড় শূণ্য লাগত। আমি চটের ফাঁকে ঘর বুনতাম লাল নীল হলুদ ফুল দিয়ে। ঘর তবু খালি খালি লাগে। কয়েকটা বড় বড় বিস্কুটের ঢোঙ তাতে চাল ডাল আটা। তোলা উনুন, ঘুটের বস্তা, কয়লা ভাঙা হাতুড়ি সবাই যেন অপেক্ষা করে একটা সন্তানের। সব মিলিয়ে অপেক্ষারই ছাবি। প্রত্যেক মেয়েরই অপেক্ষা সন্তানের, স্বামীর ঘরে ফেরার। নিজের ঘর নিয়ে স্বপ্ন দেখা। ঘরের সামনে যে বাগানটা দেখতাম তা অর খুঁজে পেলাম না। সুতো বেয়ে উঠতে পারলো না লাউডগা। মেয়েরা মায়ের জাত আমি ছোটবেলা থেকে এটা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। তাই আমি স্বপ্নে বাগান করতাম, ঘরতাম, আসন বুনতাম আমার চার দেওয়ালে। কিন্তু তার আগে তারা যে মেয়ে এবং একটা মাও যে মেয়েই থেকে যায় সারাজীবন এটা আমায় একজন ছাড়া কেউ বলেনি। একটা দিন কতকিছু কথা বলে। কথায় কথায় দিন কেটে যায়। আমার কাছে মেয়েলী স্বপ্নেরা ভিড় করে। হিন্দি সিনেমায় যেভাবে দেখা যায়, বাচ্চা হওয়ার আগে ঘরভর্তি হয়ে যায় বাচ্চার খেলনায়। আমি কেমন একটা হালকা হালকা দেখতাম আমার ঘরজোড়া আসন পাতা, ঘর ভরে গেছে ঘটিতে বাটিতে দোলনায়। ঘরময় ছড়ানো হরেক নকশার আসন। জানালা অব্দি বেয়ে উঠেছে লাউডগা।

ঘর যেমন থাকে পড়ে তেমনি পড়ে থাকে কিছুই বদলায় না। ধুলো জমে, আমি সাফ করি। ধুলোরা এক একটা দিন একটা স্মৃতি নিয়ে আসে। মানুষ ঘর পাল্টায় আমি মানুষ পাল্টাই। সেকথা থাক। আমি সোয়েটার বুনে চলেছি আমি আসন বুনে চলেছি। যে মানুষ আসে তার মাপের, তার পছন্দের। কিন্তু আমার নাড়ুগোপাল কোথায়? কি সব ডাক্তারি পরীক্ষার পর জানা গেল আমার পক্ষে মা হওয়া সম্ভব নয়। সেই সময়্‌টা আমার কাছে অনন্ত রাড়ির মত। রাত ফুরালেও যেন রাত আসে। ধুলো কেবল জমতে থাকে। কেরোসিনের বোতল, কয়লা ভাঙা হাতুড়ি, আসন সেলাইয়ের ছুঁচ আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে। সারাদিন কোন কাজের উৎসাহ পাই না। আধখোলা সোয়েটার জটপাকানো উলের গোলা ছিটিয়ে থাকে ঘরময়। বিড়াল এসে দুধ খেয়ে যায়। সে এসে ঝামেল অকরে সন্ধ্যেবেলায়। কেবল ঝগড়ার অন্ধকার। আমি সেই আমগাছটার কোটরের মধ্যে ঢুকে যেতে থাকি। অন্ধকার। ঘর থেকে আমার একদম বেরোতে ইচ্ছে করতো না। কখনও জলের শব্দ পেতাম, শুনতাম ছোট ছোট পায়ে জল ভাঙার শব্দ সে গাছের কোটরে। ইচ্ছে হত আমার নদীটার কাছে ফিরে যেতে কিন্তু চাকদায় নদী ছিল না। কেবল মনে পড়ত আমাদের ছোটবেলার নদীতে ঝাপটা ঝাপটি, গামছায় মাছ ধরা, নৌকার দড়ি খুলে দেওয়া আর চর ধরে দে দৌড় দে দৌড়।


-- ৩ --


গাছের হইলে পরে আসে কিছু ভোগে,
অন্যের তাহাতে কিছু কাজ নাহি লাগে।
দিবারাত্র অনুগত মোরে না পালায়,
হাতে পায়ে নাহি বল তবু সঙ্গে যায়।
লুকাইলে অন্ধকারে খুঁজিতে কে পারে
আলোর আভাস পেলে লুকাইতে নারে।
কখন রাক্ষস হয় কখন হয় বামন,
কোথা দেখেছ বল মায়াবী এমন।
( সূচী শিল্প/ জিয়াউর রহমান - বিন্দুবাসিনী আশ্রয়শালা, মুর্শিদাবাদ, ১৯৬৮-১৯৮১)

ঘুম যেমন ভেঙে ভেঙে যায় মাঝে মাঝে বিছানায় চুপচাপ বসে থাকি একা, রাত বড় ভেঙে ভেঙে যায়। রাতকে একটা নদী বলে মনে হয় তখন আমার। আর আমি একটা গোটা রাত। সেই নদীতে কত নৌকা ভেসে যায়, যোয়ান, বুড়ো, মাঝি, মল্লা অথচ ভোর হয় না সহসা। একা বিছানায় চাদরের ঢেউ সামলাতে সামলাতে শরীরে জল ঢুকে ফুলে যেতে থাকে হাত পা। ভিজে যায় শাড়ি জামা। একরত্তি মোমবাতি জ্বলে সারারাত যতক্ষণ তার ধৈর্য। আমি চুপচাপ দেখি তার সারা গা বেয়ে কান্না গড়িয়ে পড়ছে পাথরের মত। নদী হারিয়ে যায়, নদীতে মাছের হারিয়ে যায়। জাল টানো জাল সব ধরা খাওয়া। কোথাকার কচুরিপানা, কোথাকার জল এসে পড়ে আমার জীবনে।
(কামিনী বØড়ালয়ের রসিদের পিছনে লেখা/ টিটাগড়/ ৩-৮-১৯৮৮)

আজ আমি ইন্দিরা গান্ধী। প্রচুর ধুলো উড়ছে চারপাশে আমি হেলিকপ্টারে করে পাঁক মেরে এলাম সবার মাথায়, অমি আজকে মুর্গীএর মাংস খাব, বিরিয়ানি হবে প্যাকেট করে। চারপাশে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে প্রচুর লোক, বেড়ার ওপাশ থেকে চীৎকার করছে আমি হেলিকপ্টারের মত হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, এত ধুলো কেন চারদিকে? বাঁশ দিয়ে ঘেরা হয়েছে লালপুরের মাঠখানা। অমি নামলাম হেলিকপ্টার থেকে। সবাই আমাকে তোয়াজ করছে, হাত নাড়ছে, আমি বহুদূর দূরান্ত দেখতে পাচ্ছি। শুধু লোকেদের মাথা, গাছভর্তি সব ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া ফুল।
(জাতীয় কংগ্রেসের ব্যাচের পিছনে লেখা/ চাকদা/ ২১-৪-১৯৮১)

নদীও কখনও লোকে লোকে ভরে যায়। সেই ছটের সময় মাথায় করে কলার কাঁদি নিয়ে ঘুরে ঘুরে ডুব দেয় জলে। মহালয়ার দিন হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে গলাজলে। আমরা কাঁচা আম কুড়োতাম গঙ্গাপুজোর সময়। নদী থেকে ঝাপ দিয়ে তুলে আনা আম আবার পাড়ে এনে জড়ো করে বেচো। দশ আনা প্রতি ভাগা। হারিয়ে যাওয়া কথা এমনি করে জড়ো করে বেচতে গেলে এলেম লাগে। পরিতোষ কাড়ি কাড়ি প্রুফ নিয়ে আসে ঘরে। কাজ হয়ে যাওয়া প্রুফ দিয়ে আমি উনুন ধরাই, চা বানাই। কবিতা খুব ভালো, আমি প্রুফ পড়ি মাঝে মাঝে আর ওতে অনেকটা সাদা জায়গা। আমিও লিখতে পারি যা খুশি তাই।
(শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বসুমতী সংস্করণের প্রুফের ১০৯ পাতার সাদা অংশে লেখা/চিংড়িঘাটা/১৯-১১-১৯৯৫)

মাছেরা সব নদীতে লুকিয়ে থাকে। জল গড়িয়ে চলে হরিদ্বার হলদিয়া সব। সবকিছু গড়িয়ে গড়িয়ে যায় আমার দিন, আমার রাত। আমি জলের শব্দ পাই, ঘুম ভেঙে যায়। মুখে দাঁতন ঢুকিয়ে জল আনতে দৌড়াই। কলে লম্বা লাইন, আজকাল সবকিছুতেই বড় লাইন পড়ে। পরিতোষ বলে শৃঙ্খলা থাকাটাই নাকি আমরা চাই। সে চায় না। আমি পায়ে নূপুর পরি না। আমি কামিনী রায়ের লেখা পড়েছি।
( জোনাকী হলের টিকিটের পিছনে লেখা/চিংড়িঘাটা/ ৬-৯-১৯৯৩)

ডিয়ার স্বপন,
আমি এলাম। আর পারলাম না। এখন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। দেরী করলে সকাল হয়ে যাবে। সকালে পাখিরা খুব চীৎকার করে। আমার এই মানসিক অবস্থায় আমি কোন আওয়াজ সহ্য করতে পারবো না। এই যে টিনের চালে অনবরত বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে, আমি চাইছি তার আওয়াজ কান্নার শব্দ দিয়ে ঢেকে রাখতে। আমি কাঁদবো কেন? আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু তোমার রাজনীতি, গুন্ডামী আমার সহ্য হয় না। তোমার বন্ধু-বান্ধবদেরও ভালো লাগে না। রাতবিরেতে মটোর বাইক নিয়ে কোথায় কোথায় বেরিয়ে যাও, আমি একদিন তোমার জামায় লিপিস্টিকের দাগও পেয়েছি। গত তিনমাস তুমি বাড়ি ফেরো না। ঠিকঠাক বললে তিনমাস বারো দিন। এটা যদি তোমার দুষ্টুমি হয়ে থাকে তাহলে আমার আত্মহত্যা ছাড়া কোন পথ নেই। আমি সবকিছু বুঝে উঠতে পারি না। আমার শরীর শক্ত হয়ে আসে।
দিল্লাগী নে দি হাওয়া, থোড়াসা ধোয়া উঠা আউর আগ জ্বল গয়ি
তেরি মেরি দোস্তি প্যায়ার মে বদল গয়ি, তেরি মেরি দোস্তি।।
পহলে পহলে কম মিলে, ফির হাম খুব মিলে
এক মুলাকাত মে, হাসকে বাত বাত মে
জানে তুনে ক্যায়া কাহা, জানে ম্যায়নে ক্যায়া সুনা
তুনে কিয়া মজাক, মেরি জান নিকাল গয়ি
তেরি মেরি দোস্তি প্যার মে বদল গয়ি
তেরি মেরি দোস্তি প্যায়ার মে বদল গয়ি।।
( স্বপন কুমার হাজরা'র রেশনকার্ডের উপর লেখা/কসবা/ ১২-৬-১৯৮৭)

বিয়ে নিয়ে আমার কিছু কথা নেই। সবটাই বিয়ে। জন্মানো মানে বিয়ে। এই যে এত ফুল ফুটছে, সব বিয়ে হচ্ছে, এত আওয়াজ। সব বিয়ের আওয়াজ। কেউ একা নেই। জল ভাঙলেও নাকি অনেক কিছু পড়ে থাকে। সব বিষ শালা।
(কোয়ালিটি আইস্ক্রিমের সাদা প্যাকেটের ওপর লেখা/চিংড়িঘাটা/১-১-২০০৫)

আজ মুড়িঘন্ট রান্না করেছিলাম। মালটা বাড়িই ফিরলো না। সব শালা একাই খেয়ে নিয়েছি। ফোট। সারারাত বসে বসে খেলাম। আমি কাঁদলাম। শাড়িটা খুলে নিচে ফেলে দিলাম। বাইরে বৃষ্টি পড়ল। আমর দেহটা ভিজলো না।
( বিনয় মজুমদারের অঘ্রানের অনুভূতিমালার প্রুফে লেখা, পৃষ্ঠা-৫৪/চিংড়িঘাটা/ ২৮-৭-২০০১)

হরিপদকে নিয়ে আমি খুব হ্যাপি। হরিপদ গুচ্ছ ঢ্যামনা কিন্তু আমাকে খুব ভালোবাসে। আমার কাছে ডলার রেখে যায়। এখন বেলেঘাটায় আছি। আমাকে দু'দিন বেড়াতে নিয়ে গেছিল, গঙ্গার ধারে। আমি রেডিও সেন্টার দেখলাম। ও আমাকে একটা রেডিও কিনে দেবে। হরিপদ যে দোকানটায় আছে সেখানেও আমায় নিয়ে গেল। আমাকে সবাই বৌদি বৌদি করল। কোল্ড ড্রিংকস দিল। আমি দু'বোতল খেয়েছি।
(ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলীর টেবিল ক্যালেন্ডারের পেছনে লেখা/বেলেঘাটা/১৪-৮-১৯৮৪)

আমি নদী। আমি বয়ে বয়ে যাই। পুরুষেরা অমায় নোঙর দিয়ে থেতো করে, শুধু।
(দোকানের লম্বা ফর্দের নিচে লেখা/ টিটাগড়/১৩-৫-১৯৯২)

স্বপন,
তুই খুব ভালো। আমার জন্যে পাকা কামরাঙা এনেছে। আমি কামরাঙা খুব ভালোবাসি। আমি স্বপনকেও খুব ভালোবাসি। আমি তোমায় কিশোরকুমার বানিয়ে দেব। রবীন্দাকে ছেড়ে দাও। তুমি কেন গান নিয়ে থাক না? আমরা বম্বে চলে যেতে পারি। তোমার জন্যে সব জায়গায় চলে যেতে পারি।
(পাদুকা সদনের ক্যাশমেমোর পিছনে লেখা/ বেলেঘাটা/১২-৩-১৯৮৬)

মদ আরেকটা মেয়েছেলে।
(জোনাকী সিনেমাহলের টিকিটে লেখা/ চিংড়িঘাটা/১৫-৯-১৯৯৪)

কাল দক্ষিনেশ্বর যাবে। হরির ফ্যাক্টরির ছুটির দিনগুলো আমাদের দারুন কাটে। আমি দইয়ের ভাড়ে চারটে গাঁদা গাছ করেছি। কি রকম ঢাল ভাঙ্‌লেই গাছ। মানুষের কেন এমন হয় না? কাল কুব করে চাইব, মা আমাকেও গাঁদা গাছ করে দাও। গাঁদা আর গঁদাল পাতায় কত তফাত অতচ নামে কত কাছাকাছি।
(টু হুম ইট মে কনসার্ণ, কাউন্সিলারের দেওয়া রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেটের পিছনে লেখা/বেলেঘাটা/১২-১২-১৯৮৩)


পুরুষের ভালোবাসা
-----------------
সুবোধ বউকে খুব ভালোবাসতো। সকালে উঠে দাড়ি কামাতো। বউ চা করে এনে দিত। বউটার নাম কমলা। বাপ-মা ছিল না। সুবোধ বাজার থেকে চুনো মাছ নিয়ে আসতো। বউ খুব চেঁচাত, তুমি ছোটমাছ এনেছ।
( মীরা মুখোপাধ্যায়ের বিশ্বকর্মার সন্ধানের প্রুফের ৫১ পাতার সাদা অংশে লেখা/চিংড়িঘাটা/২৪-৫-১৯৯৭)

সুখ সব গিয়াছে চলি
ভোরবেলা কাকের কাকলি
সাত তাড়াতাড়ি জল তুলি
রাতের বিবাদ সব ভুলি।
( মীরা মুখোপাধ্যায়ের বিশ্বকর্মার সন্ধানের প্রুফের ৮৬ পাতার সাদা অংশে লেখা/চিংড়িঘাটা/২৪-৫-১৯৯৭)

আমায় বেগুনী শাড়িতে দারুন লাগে। গীতা স্বপ্না দুজনেই বললো। হরি পুজোয় দিয়েছে। আমি এবার কলকাতার পুজো দেখব। ব্লাউজ আমি ঠিক আদায় করে নেব।
( গীতা বস্ত্রালয়ের ক্যাশমেমোর ভেতর লেখা/বেলেঘাটা/১২-৬-১৯৮৩)

শাড়ি খুলে দিলে নদীর মতন। শাড়িটাও আমি। আমিটাও আমি।
(ছবিঘরের টিকিটের উপর লেখা/চিংড়িঘাটা/১৫-৮-১৯৯২)

রোজ রাতে তোমার বাড়ি ফেরা উচিত। আমি ঠিক থাকলে রেডিও শুনি। কিশোর কুমারের গান হলে তো কথাই নেই। আমি একা একা নাচ করি। তুমি কিশোর কুমার হয়ে যাও।
(দোকানের লম্বা ফর্দের নীচের দিকে লেখা/টিটাগড়/৭-৪-১৯৯০)

ডিয়ার স্বপন,
আমাকে এখান থেকে
(টিটাগড়-শিয়ালদা ট্রেনের টিকিটের পেছনে লেখা/টিটাগড়/২-২-১৯৮৭)

ইন্দিরা গান্ধী যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করে তোমার কি চাই? আমি বলব আমায় হরিদ্বার আর পুরী নিয়ে চল। জিলিপি খেতে চাইবো আর কুচো চিংড়ি। অমায় মমতা ব্যানার্জী করে দাও।
(আই ক্যাম্পের লিফলেটের পেছনে লেখা/চাকদা/৩-৬-১৯৮২)

আটদিন হয়ে গেল আমরা এই পার্টি অফিসটায় আছি। মনে হয় যেন বহুবছর ধরে এখানে আছি।
ইশক মেরা বন্দেগী হ্যায়
ইশক মেরা জিন্দেগী হ্যায়
আশিকো কা আরশ ডেরা
আশিকো কা সাঁতো জাঁহা
ইউ তো জাঁহা মে হ্যায় সবই নাম কি হ্যায় রিশতে
যো ইশক মে ডুব যায়ে য়হি হ্যায় ফরিশতে
ইশক মে হ্যায় উও খুমারি
বহ না যায়ে উমর সারি
দিন ব দিন ইয়ে হোগি জওয়াঁ
ইশক মেরি জিন্দেগী হ্যায়
ইশক মেরি বন্দেগী।।
আমাকে তুই ঘরে নিয়ে যাস না কেন? আগে যখন বেলেঘাটায় থাকতাম তখন দু'বার মজা করতে এসেছিল। তখন ইচ্ছে করত রোজ যাই। ঘর খালি পাওয়া শক্ত। এখন তো আমি তোর বিয়ে করা বৌ। দ্যাখ, সকালে উঠে আমি ঠিক চলে যাব। আমার সাথে একদম হারামিগিরি করবি না। আমি একা থাকতে পারবো না। ঐ তো, এই গলিটা থেকে বেরিয়ে পেরাইমারী ইস্কুলটা ছাড়িয়ে কল থেকে ঘুরে ডানদিকে নাড়ুদের বাড়ির পাশের গলি। আমি ঠিক চিনে নেব।
(মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি, কসবা শাখার অনুদান পত্রের উপর লেখা/কালিকানগর/৩-১১-১৯৮৬)

আজ বারোদিন হল।
তেরা সাথ হ্যায় কিতনা প্যায়ারা
কম লাগতা হ্যায় জীবন সারা
তেরে মিলন কি লগন সে
হামে আনা পড়েগা
দুনিয়ামে দো'বারা
ম্যায়নে তন মন তুঝপর ওয়ারা
প্যায়াস বুঝে না করকে নাজারা
যিতনি তুঝমে হ্যায় আদা
উতনি হি হ্যায় ওয়াফা
যিতনা জাঁহা মে প্যায়ার হ্যায়
তুঝসে মুঝে মিলা
বাড়তি যায়ে ইয়ে বেতাবি
যিতনা করু নাজারা
হামে আনা পড়েগা
দুনিয়ামে দো'বারা
(মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি, কসবা শাখার অনুদান পত্রের পিছনে লেখা/কালিকানগর/৭-১১-১৯৮৬)

ডার্লিং,
আমার খুব ভয় করে। তুমি রাত্রে আমায় একা ফেলে বেরিয়ে যাও। আমায় তোর সাথে নাইট ডিউটিতে নিয়ে যাস না কেন? জানালা বন্ধ করে একা থাকি। ঘরে একটা ঘুলঘুলি নেই। আমার ভীষন ভীষন ভীষন ভীষন ভীষন ভয় করে। সারারাত টিভি টা চালিয়ে রেখে দিই। আমি জেগে থাকি। জানালায় মাঝে মাঝে টোকা শুনতে পাই। জানালার ওপাশে হিসির আওয়াজ। আমার গা গুলিয়ে ওঠে। ভাড়ে আটকা তড়কা রুটি এমনি শালা শক্ত হয়ে যায়। আমার বডিও টাইট হয়ে যায়। তুই আমায় একদম ভালোবাসিস না। তুই কবে ঘরে নিয়ে যাবি? আমার ভীষন ভয় করে। ওখানে তোর আরেকটা বৌ লুকিয়ে রাখিসনি তো?
(মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি, কসবা শাখার অনুদান পত্রের পিছনে লেখা/কালিকানগর/১৪-১১-১৯৮৬)


আমরা নতুন বাসা বেঁধেছি তিনমাস। এর মধ্যে চাউর হয়ে পড়েছে সুলেমান আমার স্বামী নয়। অথচ আমরা একবার কালিঘাটে একবার মসজিদে গিয়ে বে করেছি। পীরবাবার দিব্যি। মা কালির দিব্যি। সুলেমান আমার নিজের স্বামী। পাকা বরের মতই আমায় চুড়ি কিনে দেয়, পিঠে সাবান ঘসে দেয়, রাত্রে মাল খেয়ে এসে খিস্তি-খাস্তা করে। আমার বাপ বাপান্ত করার কি আছে ? নিজে চোখে কম দেখিস স্বীকার কর। আমি যে রাত্রি বেলা সুস্মিতা সেন হয়ে যাই সেটা আমাদের আগের কলোনীর সবাই জানত, নতুন করে কিছু প্রমাণ করার নেই। সুলেমানের এর মধ্যেই স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়েছে, ওর ধারণা আমি ঠকিয়েছি। তাই আমার সঙ্গে এখন তিনদিন কথা বন্ধ। আগে যখন দুপুরবেলা আমরা জোনাকী হলের সামনে মীট করতাম তখন প্রত্যেকবারই আমার দেরী হত, বরটাকে ঠেলে-ঠুলে কাজে পাঠিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে পৌছাতাম। আইস্ক্রীমের ঠেলাগাড়িতে হেলান দিয়ে কেষ্ট ঠাকুর হয়ে ওয়েট করত আমার পিরীতের সুলেমান। সানি দেউলের সিনেমা ছাড়া আমার কম বেশি দেরী হতই। আমাকে কোনদিনও সুস্মিতার সিনেমা দেখায়নি। বিবি নম্বর ওয়ান, ম্যায় হুঁ না, ম্যায়নে প্যার কিউ কিয়া, দস্তক, সময় এরকম কত এলো আর গেলো। মালটা কিছুতেই ভেজেনা। বলত, তুই তো হলের মধ্যেই থাকিস তোকে আর নিয়ে যেতে হবে কেন? আমি ঘরে একা একা বসে থাকি, রাত্রে জানালার নিচে এসে শীষ দিত। গরমকালে যখন মাঠে ম্যারাপ বেঁধে যাত্রাপালা বসে তখন কেষ্টঠাকুর আইস্ক্রীমের গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে গিয়ে হাজির হয় আমার সঙ্গে ঠিক চোখাচোখি। এইভাবে হতে হতে আমি সুলেমানকে ভালবেসে ফেললাল্ম। সুলেমানের তখন কত আদর। ভোররাত্রে ফেরার পথে আইস্ক্রীমের ডালার উপর আমাকে বসিয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসে। আমি বিক্রি না হওয়া লাল সবুজ ম্যাঙ্গো দুধ আইস্ক্রীম চুষতে চুষতে ফিরে আসি।
কুছ তো লোগ কহেঙ্গে
লোগো কা কাম হ্যায় কেহনা
ছোড়ো বেকার কি বাত মে কহি বীত না
না যায়ে রেয়না
কুছ তো লোগ কহেঙ্গে
কুছ রীত জগৎ কি অ্যায়সী হ্যায়
হর এক সুবহ কি শাম হুয়ি
তু কৌন হ্যায়, তেরা নাম হ্যায় কেয়া
সীতা ভি ইহা পর বদনাম হুয়ি
ফির কিউ সংসার কি বাতো সে
ভিগ গয়ে তেরা নয়না

আর মিনসের তিনমাসেই প্রেম উধাও? একপীস সরালে খিটির মিটির, পয়সার হিসাব তোলে। তোরই তো বিয়ে করা বৌ নাকি? ঝাটা মারি অমন পিরীতের । ( প্রতিমা ড্রাই ক্লিনার্সের খয়েরি প্যাকেটের উপর লেখা/সুভাষ গ্রাম/৬-৩-২০০৫)

তিনদিন আমার সাথে সুলেমনের কোন কথা নেই। আমিও কম হারামি নই। জল অব্দি ভরিনি। আমিও র‌্যালা দেখাতে জানি। জল না থাকলে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে মাল বসাতে পারবে না। খাপে খাপে মাল না ভরতে পারলে আইস্ক্রীমও খালাস। যা: ভাগ। তুই ভেবেছিস কি? বিয়ে করা বৌ মানে রুটির টুকরো নাড়াবি আর আমি ন্যাজ নাড়তে নাড়তে হাজির হব? এই মালগুলোকে সব শিক্ষা দেওয়া দরকার। সমাজ শিক্ষা। আমার আগের হাসব্যান্ড বলত সমাজসেবা করলে পেরাইজ টেরাইজ পাওয়া যায়। মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের সেই সময় ভীষণ মালকড়ির ঝামেলা চলছিল। আমি জোনাকী হলে টিকিট ব্ল্যাক করা শুরু করে দিই। সুলেমানই বলেছিল এতে প্রফিট যেমন আছে তেমনি সমাজসেবা ও করা হয়। লোকে আজকাল ভীষণ ব্যস্ত। বড় বড় শহরে শুনেছি ফ্লাইওভার হচ্ছে। মাটির তলা দিয়ে চোঁ করে রেল চলে। যারা সব সমাজের মাথা তাদের হাতে টেইম খুব কম থাকে। আমি তাদের হেল্প করি। তারা ছুটতে ছুটতে এসে পনের টাকার টিকিট পঞ্চাশ টাকায় কিনে হলে ঢোকে। আসলে আমি দেশের উন্নতিতে হেল্প করি। এই যদি টিকিট না পেয়ে ফিরে যেত আবার একদিন অপিস কাটতে হত ঝুল্লা দিয়ে মাগ ভাগিয়ে আনতে হত। সমাজসেবা করতে আমার ভাল লাগে। শুনেছি মাদার টেরেজাও নাকি আমার মত সমাজসেবা কত্তেন। কাজেই আমি জল ভরিনি মানে আমি জল বাঁচাচ্ছি। বিশ্বে শুনেছি জলের পরিমান কমে আসছে সব শালা মরুভূমি হয়ে যাবে। আর এই মিনসেটা জলের মধ্যে কি সব বিষ গুলে আইস্ক্রীম বানায় সে তো আমি নিজের চোখে দেখেছি। সকালে যাবি স্কুলে একপাল বাচ্চা তোর ঐ মাল চুষবে। জিভ শালা লাল নীল হলদে বেগুনী হয়ে যাবে। সুলেমান জলের মধ্যে রং মেশায় আর খ্যাক খ্যাক করে হাসে। প্রথম যখন এই বাসায় এসে উঠলাম তখন আমিও রং গুলতাম। সুলেমান ওর চুল্লুর গন্ধওয়ালা মুখটা আমার মুখের সঙ্গে ঠেসে ধরত। সোহাগ হত। আমরা ঐ রং দিয়ে হোলি খেলতাম। দুপুরবেলা জোনাকীর সামনে গিয়ে গছাবি ঐ বাবু বিবিদের। ওদের শরীর খারাপ করলে দুনিয়াটাই মায়ের ভোগে চলে যাবে। আমি তিনদিন ধরে সামাজসেবা করছি। এখানে এসে তো কাজকম্মো সব গেলো।
( বর্তমান কাগজের প্রথম পাতার সাদা অংশে লেখা/ সুভাষ গ্রাম/৭-৩-২০০৫)

আজ হেব্বি ফাইট হয়েছে। তা বলে সুলেমান যা শুরু করেছিল আমার বাপ চৌদ্দ পুরুষ তুল্বে? মজাকি নাকি? দেব শালার নালী হড়কে। কোন মায়ের পেটে জন্মেছি সেটাও তো দেখতে হবে। মা টা শালা গেলে দিয়েছিল বাপটাকে। জেলের মধ্যে জন্মালুম। বড় হতে হতে দেখলুম আমি একটা হোমে। হোমের সুপারকাকু একদিন মাগনা নিতে এসেছিল শালা দিয়েছিলাম গরম সাঁড়াশী তালুতে বসিয়ে। যা না। এখনও হোমে গেলে দেখতে পাবি বাঁ হাতের তালুতে কুড়কোটা। তোকে তো পিস পিস করে বস্তায় ভরে দেব রে। তুই যদি ভেবে থাকিস হাসব্যান্ড বলে যা খুশি তাই করবি আমার সাথে তাইলে ভুল করেছিস। প্রথম প্রথম সুলেমান যখন সোহাগ করে ক্যালাতো মাইরি বলছি আমার খারাপ লাগতো না।

রাত্রে জানালার বাইরে শীষ দিত আমি জামবাটি বাজিয়ে ওকে ঘরে ডাকতাম। সানি দেউল আর আমিশা প্যাটেলে ষ্টাইলে দুজনে সোহাগ করতাম। আমার মনে হত ঐ আমার প্রকৃত হাসব্যান্ড। আমায় গাইড করত, আদর করত, বকত। আমরা দুজনে বিছানার তলায় ঢুকে প্রেম করতাম। সুলেমান প্রেম করতে করতে একটা কথাই বারবার বলত, নো রিস্ক নো গেইন। সারা রাত্তির ও আমায় অ্যাডভাইস দিত কোনদিন কোন শোয়ে কটা টিকিট তুলতে হবে। এখন দিনে একটাও কথা হয়না। নদী তুই কেবল জলে ভরা অন্য সবাই মদে ভরা । ঘেন্না। আচ্ছা একটা নদী কত দিন বাঁচে ? কিশোরকুমার আমায় তোমার কাছে নিয়ে যাও।
(সোনারপুর ফ্রেন্ডস অ্যাসোসিয়েশনের দূর্গাপুজোর চাঁদার ছেড়া বিলের উপর লেখা/ সুভাষ গ্রাম/২-৩-২০০৬)

নদী এখন ফুরিয়ে এসেছে, খালি পাথরে পাথরে ধাক্কা।
(চিত্তরন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আউটডোর টিকিটের ফাঁকা অংশে লেখা/ পার্কসার্কাস/১২-৪-২০০৬)

(চলবে)