আপনার মতামত         



হরিণেরা
-

সুমনা সান্যাল





হয়ত তখন তুমি ভেবেছো
এই পথে একদিন কে যেতো
ঝোলা ব্যাগ কাঁধে ফেলে নিঝঝুম

আঙুলেরা দিনে দিনে শীর্ণ
তবুও সে রোগাটে মুখের তাপ
তোমাকেও ডাক দিতো সে ছাদে

এই সেই চোখ আর পল্লব
এই চাপা ঠোঁট আর লালতিল
এসবি আমার হবে একদিন

এইভেবে সে শীতের বিকেলে
হাতছানি দিয়ে তাকে ডেকেছো
ডেকেছো খাদের মুখে কী আশায়

সে গভীর গিরিখাদে কেই বা
শ্বাস নিতে পারে আর মৃত্যুর
ছায়া চমকালো দেখে সে মৃগও

পালায় সে বনপথে শঙ্কায়
সে ভেবেছে এইবার বুঝি ঝড়
তছনছ করে দেবে হয়তো

তারঘর; আর সব স্বজনও
তাকেই দুষবে যে কী ভীষণ
অপরাধ ঘটে গ্যালো শহরে

ভেবেছে সে তাকাবে না ওদিকে
প্রাণপণে ফিরাবে সে ছোখ তার
ফাঁদ পেতে বসে আছে বাঘিনী



তবুও হটাৎ এক রাড়ে
যখন বাইরে আর কেউ নেই
এমনকি রাত-প্রহরীও তার

বাজায়নি ঘন শীতে বাঁশিটি
সে রাতে গলির সে ল্যাম্পপোস্ট
কী দেখেছে বলি সেই কাহিনী

মৃগটি বেরিয়ে এসে রাস্তায়
দাঁড়ালো বোতাম খোলা সোয়েটার
যেন সে শীতার্ত না আর তার

ঘন চুল ঢেকেছিলো কুয়াশায়
সে তখন তাকিয়েছে দোতলায়
বন্ধ কাচের গায়ে মৃদু জল

শিশিরের? অথবা অশ্রুনদী বয়ে যায়?
ভিতরে সে বন্ধ ঘরের তাপ
তাপ নাকি সে বাঘিনী কুঁকড়ে

শুয়েছিলো মুখ ঢেকে বালিশে?
তখন সাতাশি সাল দেওয়ালে
বাংলায় লেখা ছিল মাঘশেষ

শেষমাঘে সেই খোলা রাস্তায়
মৃগটি অপেক্ষায় একলা
অচমকা খুলে গেল দরজাও

বলো দেখি কে দাঁড়ালো রেলিঙে?
পনেরো বছরের সেই বাঘিনী
এর বেশি জানতো না কিছু আর

সে শুধু খুলেছে তার ঝিনুকের
দ্বিতীয় বোতাম আর বিনুনী
সে জানতো কেউ আর জেগে নেই

পাশে তার বোনটিও ঘুমিয়ে
পড়েছে পাশের ঘরে মা বাবাও
লেপ কম্বলে মোড়া স্বপ্নে

কাকিমাও ডুবে আছে নির্ঘাত
সে বাড়িতে তারাও যে অতিথি
স্কুল ছুটি ও শহরে সে নতুন...

আধোচেনা সে শহরে তার খুব
কান্নাও পেতো আর হায় গো
একদিন হটাৎ সে স্নানশেষ

যেমনি গিয়েছে চুল শুকোতে
রেলিঙের ঐপারে কে গো যায়?
কী চেনা সে চোখদুটি রোগাহাত

এÉ¡তো রোগা কেউ হয় ভাবলেই
ঢেউ আছড়িয়ে পড়ে বালিতে
বাঘিনীও চুরমার অতলে

নৌকা ডুবির পর কূল নেই
বাঁচাতে কেই বা পারে আর
এভাবেই কেটে গেল একমাস

মাঝে মাঝে দেখা হয় সন্ধ্যায়
এইটুকু তখন সে জেনেছে
পিকনিক গার্ডেনে ব্লক কিউ

কোণের সে ফ্ল্যাট নাম্বার পাঁচ
টিউশানি শুধু তার সম্বল
বছর পঁচিশ তার এ ভাবেই

কেটে গেছে এখন সে চাকরীর
আশায় দিয়েছে ছাই এসবি
বলেছে সে বাঘিনীর ছোট বোন

যে এখন পাশটিতে ঘুমিয়ে
রয়েছে জেনেই এই কাহিনী
মাঘ শেষ সিঁড়িঘরে শুরু হয়...



এমন কিছুই নেই গল্পে
যা তোমরা মনে মনে ভাবছো
সে তো ভীত হরিণের শিশুটি

যেন তার এই সবে শৈশব
ফুরিয়েছে আর সে লাজুক চোখ
নামিয়েছে যেন বা পঁচিশ নয়

ষোলো কি সতেরো তার শরীরে
অথচ সে বাঘিনীর কী সাহস
সে ছুঁয়েছে রোগাহাত লালতিল

মৃগটি জানলো তার ডাকনাম
ঘরেতে ভ্র্রমর এলো গুণগুণ
মধুমাস নয় তবু ভ্রমর

নাও মধু ঠোঁট রাখো এখানে
এতোদিন কেন চোখ তোলোনি
বলে সে দু'হাতে তার ঘনচুল

নামিয়ে এনেছে তার ও খাদে
যদিও তখন সেই বন্য
বাঘিনী পায়নি কোনো লোনাস্বাদ

রক্তের নাকি তার দিগ্‌ভুল
হয়েছিল প্রথম সে ছোঁয়াতে
বন্য সে থরোথরো কাঁপছে

হরিণটি ততোধিক ভীতপ্রাণ
তবু সে নিয়েছে তার নির্যাস
আর সেই শাঁখ তার নখরে

এই সব ঘটেছিলো গলিতে
আর ও গলির সেই ল্যাম্পপোস্ট
দেখেছিল আগুনের লালআঁচ

কীভাবে পুড়িয়ে দিলো পর্দা
দেখেছিল কাহিনীর শেষভাগ
দেখে সেও মনে মনে হেসেছে

ভেবেছো আমি তো আর একা নই
এ দৃশ্যে ওরাও তো এঘরে
ঐ তো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়

ঐ তো বোনটি আর কাকিমা
এলো খোঁপা পাশে যে স্লিপীংস্যুট
ওরাই তো তবে কাল এলো না?

ঐ তবে বাগিনীর বা মা
ছুটি শেষে নিতে এসে মেয়েকে
যা দেখলো তার কাছে সিনেমাও

কিছু নয়! ও মেয়ে তো লাইনেই
এসে গ্যাছে ঠিকঠাক ষোলোতে
ষোল নাকি পনেরো তা জানিনা

এইভেবে গলির সে ল্যাম্পপোস্ট
ঢলেছে হাসিতে আর তখনি
নেমেছে অন্ধকার শহরে

চালাও পানসি আজ ও আঁধার
চালাও জলসা আজ রাতভোর
গলিতে এই মজাও লা-জবাব

ঐ তো আর্তনাদ! ঠিক তো
ঐ তো সে মেয়েটির ছেঁড়া চুল
ঐ কার মুখ যেন ভেসে যায়

ঠোঁটের কোনটি থেকে ওই কার
লাল দাগ বয়ে এসে ভিজলো
ভিজে গেলো কার নীল সোয়েটার

হোক আরো মজা হোক এ রাতে
ঘটনাবিহীন এই গলিতে
কাঁহাতক ভালো লাগে রোজ রোজ

এইভাবে একা একা দাঁড়াতে
হাসিতে গড়িয়ে পড়ে ল্যাম্পপোস্ট
দেখে নিল গল্পের শেষভাগ...



না গো এটা শেষ নয় গল্পের
তোমরা কি শুনবে না এরপর
কি হোল বন্য সেই বাঘিনীর

তারপর কেটে গেল একযুগ
বারোটি বছর আর আরো তিন
যোগ দাও; কত আসে অঙ্কে?

এরপর কত শীত এসেছে
কত মাঘ পউষের ঘন ঝড়
সে পেতেছে হিম সে শরীর তার!

আর সে বাঘিনী নয় সেইসব
শীত ও বসন্তের ছবিতে
সে শুধু নিছক এক "মেয়েটি'

অথবা "মহিলা' মৃত তিরিশের
আর কোনো মাঘশেষে সন্ধ্যায়
জাগেনি সে মৃতপ্রাণ নদীটি

তবু তার কাহিনীতে এসেছে
এরপরো এক রাজপুত্তুর
অবশ্য যদি কোন গল্পের

অংশে ঢুকতে পারে একজন
যে আদৌ বেঁচে নেই ছিলোনা
তার কাছে এই সব ঘনঘোর

ঘটনা কি দাবী রাখে তখনো
সিঁথিতে সে নিয়েছে রঙীনদাগ
এরপর ফুল ফুল বিছানায়

ছিঁড়ে গ্যাছে খোলাছাদে একা সে
দাঁড়িয়েছে রাতভোর সে গৃহের
সেই রজনীর কোনো স্মৃতিবিষ

আর নেই এরপর পেছনের
সিঁড়ি দিয়ে নেমেছে সে সরুপথ
যদিও তখন কোনো ল্যাম্পপোস্ট

ছিলো না সেখানে কেউ হাসেনি
দেখে আরো মজাদার গল্প
এরপর চামড়ার কালোব্যাগ

কালো চটি সাদা তাঁত শাড়িতে
সে এখন ক্লাসঘরে "পূরবী'
সে এখন সাহিত্য-ইতিহাস

এছাড়া কিছুই নেই আজ তার
আর কোনো জানালা বা কোনো ছাদ
অথবা ঝড়ের কোনো সঙ্কেত

তবুও হটাৎ এক দুপুরে
যখন সে পেরোচ্ছে সিগন্যাল
কে দাঁড়িয়ে ঐখানে ও কে গো-

বাতাস উড়িয়ে দিল যার চুল
ঐ সাদা পা¡বী! ঈশ্বর...
ঐ তো সে রোগা হাত আঙ্গুলও

সেই ঝোলা ব্যাগ কাঁধে এখনো
ফিরে এলো হরিণের শিশুটি?
ফিরে এলো পনের বছর পর!

না না সে তো আর নেই শহরে
তারা চলে গ্যাছে সেই বছরই
চিঠিতে জানিয়েছিলো বোনটি!

এখনো কী ঝড় ওঠে ভাবলেই
পুড়ে যায় সবকিছু ছারখার
ও নয় ও নয় তবু নিরূপায়

সে এসে দাঁড়ালো তার সামনে
মেয়েটি দাঁড়ালো আর সময়ও
থেমে গেলো সাতাশির মাঘশেষ...



বলতো কে ছিলো সেই দ্বিতীয়
মৃগটি সে রাস্তার ওপারে?
তিনি সেই কবি তার নির্জন

অক্ষরে ভরে যেত তার ঘর
এমনকি সেইসব রাড়ে
সে যখন ছিঁড়ে গেছে বারবার

তখনো সে জড়িয়েছে উন্মাদ
শব্দসমূহ তাঁর সিন্ধু
তার শেষ কথাটির ভারও

খুলে দিলো তাঁর কাছে সে প্রথম
খুলে দিলো সে রাতের সিঁড়িঘর
খুলে দিলো সেই শেষ চিৎকার

কবি জানালেন তাকে শব্দের
ভিতরে লুকোন আছে ঝিনুকের
বোতামটি আর সেই নীলরঙ

সে তখন জানলো লেখার ঘোর
কি ভাবে জাগিয়ে রাখে সারারাত
দাঁতে-নখে ছেঁড়া সেই চাপাশ্বাস

যা কখনো স্পষ্ট বলার নয়
বুকের ভিতরে যতো রক্ত
ঢেউ তোলে অসহ্য সেসবি

লেখার খাতায় এসে জড়ো হয়
কলম বা খাতা ছাড়া আর কেউ
পারবে না এই ভার বইতে

সে রাতে যে এসেছিলো সিঁড়িঘর
সে রাতে যা দেখেছিলো ল্যাম্পপোস্ট
আজ সেই গল্পের শেষভাগ

মেয়েটি লিখছে এই রাত্রে
আমাকে মুক্তি দাও ব্লক কিউ
আমাকে মুক্তি দাও ফ্ল্যাট পাঁচ

পনের বছর এই শরীরে
জড়িয়ে রেখেছি সেই ছেঁড়া চুল
সেই সাদা বোতাম আর সোয়েটার

ঠোঁটের সে কোণ থেকে রক্ত
আমাকে জড়িয়ে আছে এখনো
এবার আমিও চাই এ লেখায়

ওইসব লিখে রাখি প্রগাঢ়
বৃষ্টিবিন্দু এসে করতল
খুলে দিলো কী অচেনা গুহামুখ!

এরপর

আমার ভূমিকা খুব অল্পই
আমি তার কাছের সখীটি নই
আমি শুধু দেখি এই রাত্রে

পুরোন দিনের সেই গল্পের
গুহামুখ খুলে সেই মেয়েটি
না না ও মেয়েটি নয় আজ আর

আবার বেরিয়ে এলো বাঘিনী
ওই তো সে গিরিখাদ জাগছে
ওই তো সে নদীটিও বহমান

লেখার কাগজে তারা জাগছে
আর কিছু নেই তার সামনে
দেহের সে ঘনতম উত্তাপ

সব ঢেলে দিয়ে ওই কাগজে
এÉ¡তোদিন পরে আজ জাগছে

জাগছে গুহার সেই বাঘিনী..