আপনার মতামত         


এই লেখাটি একটি ধারাবিবরণী। সত্তর দশকের উথালপাথালের মধ্যে দিয়ে দাঁড় টেনে আসা এক জ্যান্ত মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত ফিরে দেখা। এও এক ইতিহাস, এক ব্যক্তিগত ইতিহাস। অবজেক্টিভতার কোনো দাবী নেই এখানে, কারণ কোনো অবজেক্টিভ ইতিহাস এ পৃথিবী দেখেনি এখনও।


          আমার সত্তর (পর্ব এক)

          দীপ্তেন


লিখতে গিয়ে দেখলাম, আরে,নাম ধাম গুলো প্রায় সবকটাই ভুলে গেছি - আর বাকী যে কটা মনে এখনো থেকে গ্যাছে -সেগুলো পাল্টে দিয়েছি। আর সন,তরিখ .... এরাও তেমন ঠিক ঠাক নয়।তবে ঘটনা গুলো সত্যি,আমারই চোখের সামনে,নাকের সামনে ঘটেছিলো।


কমরেড আজ লাল দিন আনবে না ?

আমার সত্তর শুরু হয়েছিলো সেই আটষট্টি সাল থেকেই। তখন আমি ক্লাস টেনে - বদ্ধোমানে। ওখানে সি পি এমের খুব বাড় বাড়ন্ত। তো সেবার সি পিএমের প্লেনাম হলো। সবার কি উৎসাহ। টাউন হলে দরজা বন্ধ করে আলোচনা হলো - অন্ধ্র গ্রুপের বিপ্লবী লাইন বাদ গ্যালো। বাসবপুন্নাইয়া, রামমুর্তি, প্রমোদ, জ্যোতি,নাম্বুদ্রিপাদ - এরা তখন স্টার। ইশ্‌কুলের ছেলেরা তাদের অটোগ্রাফ নিচ্ছে। আমাদের কি উদ্দীপনা! রাত বারোটা পর্যন্ত্য যাত্রা দেখে বাড়ী ফিরলাম। তখন ই প্রথম প্রকাশ্যে চীনা বই বিক্রী হোলো । তো আমি ও কি একটা বই কিনে এনেছিলাম।

সেটা দেখে মা আর বাবা দুজনে ই শংকিত।"কেন , লেনিন স্ট্যালিন পড় না। এইসব মাও ফাও কেন? বাবার প্রশ্ন ।

কিন্তু তখন থেকেই সি পি এমের মধ্যে গুড়গুড় শুরু হয়ে গেছে। নাগী রেড্ডীদের অন্ধ্র লাইন আর চারু মজুমদারের উত্তরবংগ লাইন। এরা ক্রমশ: জোরদার হয়ে উঠছে - বিশেষত: ছাত্র মহলে।

আমার দাদা আমার থেকে পাঁচ বছরের বড়। কলকাতা শহরে সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে বি এ পাশ করে বিশ্বভারতীতে এম এ করছে। গড় গড় করে ইংরেজী বলে - এ আমার নিজের কানে শোনা। আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। দাদা সব জানে। আমাকে চুপি চুপি বলে গেলো - এই শীতে ই বিপ্লব আসছে।

" ডিসেম্বরে ? '

" ইয়েস,ডিসেম্বরে ফসল কাটার সময় ' দাদা বলে গেলো।


ঢিপ করে তাল পড়ে না কি তাল ঢিপ করে পড়ে ?

কিন্তু ডিসেম্বরে বিপ্লব এলো না। বিপ্লবী লাইন কিন্তু বেরিয়ে এলো মুল পার্টি থেকে। বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ শুরু হয়ে গেছে।

অসংখ্য উপদল। জোরদার বিতর্ক চলছে। মূল দ্বন্দটা কি ? দেশের আর্থ সামাজিক চরিত্র কি রকম ? মুৎসুদ্দী পুঁজিবাদ নাকি জাতীয় বুর্জোয়া। নয়াজনগনতান্ত্রিক লড়াই না কি কৃষি বিপ্লব।

১৯৬৯ এ আমি কলকাতায়।

কলেজ স্ট্রীটে তুমুল লড়াই। সি পি এম আর নকশাল। সংশোধোনবাদী আর হঠকারী। পুজো হলেই মন্ডপে মন্ডপে বামপন্থী দলের স্টল বসতো। এছাড়া রাস্তার মোড়ে ও বসতো বই'র দোকান।পার্টি ও অনেক ছিলো। সৌমেন ঠাকুরের আর সি পি আই, জ্যোতি ভট্টাচার্য্যের ওয়ার্কার্স পার্টি, বলশেভিক পার্টি। খুব জোরদার আর এস পি। এমন কি রাম চ্যাটার্জীর মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক। উপদলীয় সংঘর্ষ প্রচুর। বেলেঘাটা শিয়ালদায় ফরওয়ার্ড ব্লক আর সি পিএমের লড়াই তো রোজকার ঘটনা। ছাত্রমহলে কংগ্রেস প্রায় নেই ই। প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি,সংযুক্ত সোস্যালিস্ট পার্টি - এরা তখন কমুনিজম বিরোধী সোস্যালিজমের নীতি নিয়ে খুব তপ্ত আলোচনা করছে। তাদের ও নানান বই বার হতো।

আর ছিলো কথায় কথায় মারামারি। কলেজ দখলের লড়াই। কারখানা দখলের লড়াই। সি পি এম ই ছিলো মূল লক্ষ্য।

বালীগঞ্জ সাইন্স কলেজে ইউনিয়ন তখন বি সি ই এস এফ'র হাতে। সুভাষ মুখুজ্জে তার তাত্ত্বিক নেতা। কিছুতেই সি পিআই এম এল ঐ ইউনিয়ন দখল করতে পারে না। সুভাষের লাইন ছিলো ভারতবর্ষের মূল দ্বন্দ হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। তাই লড়াই করতে হবে ব্রিটেন আমেরিকার সাথে। দরকার হলে সেই যুদ্ধের সাথী হবে টাটা বিড়লারাও।

" টাটা,বিড়লা? ' আমরা অবাক হই।

" ইয়েস, সে লড়াই ভারতের সত্যি স্বাধীনতার লড়াই। সবাইকেই একসাথে লড়তে হবে। বিপ্লবের বর্শা ফলক তাই সাম্রাজ্যবাদের দিকে তুলে রাখো কমরেড ।'

কিন্তু ঐ ছোটো খাটো দল গুলো বেশী টেঁকে নি। স্রেফ মার ধোর করেই দূর করে দেওয়া হয়েছিলো বেশীর ভাগ দলকে।

সুবীর এসে বল্লো "আজ রাতে বাড়ী থাকিস না '।

" কেন? '

" আজ আমরা হাজরা হস্টেল রেইড করবো। শালা- সুভাষের ইয়ে করে দেবো। '

মাঝ রাতে বোমার আওয়াজ কানে এসেছিলো। সকালে সুবীরের বাড়ী গিয়ে দেখি বসে আছে মুখ কালো করে।

" চন্দনদা দিয়ে গেছে - দ্যাখ ঐ রক্তমাখা শার্ট। এটা কোথায় ফেলি ? '

লাল ভেজা শার্ট একটা ব্যাগে নিয়ে আমরা দুজনে -অবশেষে চেতলার কাছে একটা নিরিবিলি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হলো।

" হাতের ছাপ নেই তো ? ' শংকিত সুবীর।

আমি ও চিন্তিত। কার শার্ট,কার রক্ত কোনোদিন জানতেও পারলাম না।

তো ১৯৬৯ বাইশে এপ্রিল পার্টি হলো আর পয়লা মে তে শহীদ মিনারের নীচে কানু স্যান্নাল ঘোষনা কল্লেন পার্টির নাম। সেদিন ময়দানে কুরুক্ষেত্র। বেনুদার হত ধরে দৌড়াচ্ছি - কিন্তু কোথায় যাবো ? কে সি দাসের দোকানের দিক থেকে পুলিশ ক্রমাগত কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটাচ্ছে -এসপ্লানেডের দিক থেকে বড় বড় লাঠি নিয়ে পুলিশ নির্বিচারে মেরে যাচ্ছে। রেড রোডের দিকে সি পিএম। চোখের সামনে চার পাঁচ জন মিলে ছুরি মারলো একজনকে। বেনুদা আশ্বস্ত কল্লো " ও আমাদের নয় '। হঠাৎ হো হো করে উল্লাস ধ্বনি - হাওড়ার মিছিল এসে গেছে - হাওড়ার মিছিল এসে গেছে। ব্যাস। পলকে ব্যালেন্স ওফ পাওয়ার আমাদের দিকে। সারা সন্ধ্যা ঐ হৈ হৈ করে আমরা বাড়ী ফিরলাম। একই সাথে দলে দলে বাড়ী ফিরছিলো সাঁঝ বেলা - ওরা আর আমরা। একই পাড়ায়। আর রাগ নেই। সেদিনের মতন যুদ্ধ শেষ।

আসলে "যুদ্ধ' তখনো শুরু হয় নি। তখন পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটাই বেশ খেলা খেলা ছিলো। লাঠি বোমা ছুরি। রক্তপাত। মারা ও যেতো। কিন্তু জীবন মরণ লড়াই শুরু হয় নি। পুলিশ ও ভয়ানক মারতো কিন্তু ঐ পর্যন্তই - এনকাউন্টারে ঠান্ডা মাথায় খুন তখনো শুরু হয় নি। আরো এক বছর বাকী ও সব হতে।

কমিউনিস্ট তখনো খুব ভদ্রলোকের পার্টি। ধবধবে ধুতি আর পাঞ্জাবী। বিড়ি চলতো না। নেতারা খেতেন চারমিনার - দু একজন চুরুট।

একজন-দুজন শহরের আঙিনা ছেড়ে বেরিয়েছিলো। টেঁকে নি। রুপেন গেছিলো সাঁওতাল পরগনার প্রত্যন্ত গাঁয়ে। কয়েকমাস পরই ফিরে এলো- কংকালসার চেহারা ,গ্যাস্ট্রিক আলসারে লিভারের চোদ্দোটা বেজে গেছে।

" সকালে কিচ্ছু খেতাম না। সারা দিন মাটি কোপানোর পর ভর দুপুরে একথালা লাল চালের ভাত। ব্যাস। আর নুন। কখনো একটা পেঁয়াজ। এই ই ' চিঁ চিঁ করে বল্লো "আর রাত্রে আকন্ঠ মদ'।

নেতারা - জ্যোতি বাবু থেকে শিবদাস ঘোষ - তখনো ময়দানী বক্তৃতায় শ্রমিক ভাই কৃষক ভাই করে কথা বলেন। প্রমোদ দাশগুপ্ত চটে কাঁই "বলি সি আর পি এতো গুলি চালায়,কই নকশালদের তো মরতে দেখি না। বলি,সি আর পির গুলিতে কি নীরোধ লাগানো থাকে? ' পরে তার তৃষ্ণা মিটেছিলো কি না জানি না।

প্রেসীডেন্সী কলেজের কিছু ছেলে তখন ম্যাপ হাতে নিয়ে বসে। বাঙলা বিহার উড়িষ্যার সীমান্ত অঞ্চল চাই। একটু বন জংগল হলে ভালো হয়। ওরা বেছে নিলো ডেবরা গোপীবল্লভপুর।

আর শহরের আর শহরতলীতে তুমুল লড়াই। যেন সিভিল ওয়ার। রোজ ই মারা যাচ্ছে কিছু ছেলে - আমাদের, ওদের। যত দিন যাচ্ছে তত নিষ্ঠুর হচ্ছে মানুষের মন। পার্টি ইউনিটে শুধু আলোচনা লাল আর সাদার দাম কত। কাল ছিলো ত্রিশ টাকা কে জি আর আজ দাম বেড়ে হয়েছে পঁচান্ন। লাল আর সাদা পাউডার দিয়ে ভালো করে ঠেসে ,নারকেল দড়ি দিয়ে বেঁধে তবে ই না পেটো। বাঘা যতীনের পাঁচুর খুব নাম। অমন ভালো মাল - ও আওয়াজ শুনেই বোঝা যায়, এ পাঁচুর নিজের হাতের তৈরী। আর সাইন্স কলেজে পিকরিক অ্যাসিড দিয়ে মনা যা বানালো না গুরু- পুরো পাড়া কেঁপে গেছিলো।


দুটো খন্ড চিত্র :

যাদবপুর থেকে গাংগুলিবাগান ,রামগড় থেকে গড়িয়া ওদের এলাকা আর লায়েলকার মাঠ থেকে রানীকুঠি পর্যন্ত আমাদের। সীমান্ত অঞ্চল ছিলো রিজেন্ট এস্টেট। অমন দুপুর বেলা ইঁটের কেয়ারীর পিছনে একজন ,হাতে তার একটা রামদা ,ইতি উতি তাকাচ্ছে। সে টের পায় নি,গুঁড়ি মেরে পাইপগান হাতে আরেক জন প্রায় বুকে হেঁটে পৌঁছে গেছে তার ই পিছনে। রিজেন্ট এস্টেটের জানলায় জানলায় ত্রাসে বিস্ফারিত চোখ। ভয়ে কেউ চেঁচিয়ে সাবধান করতে পারছে না। আর এক ফুট - ব্যাস, কিন্তু কি হলো, ঠিক পাইপগানের গুলি চলবার আগের মুহুর্তেই পিছন ফিরলো শিকার আর ভোঁ দৌড়। শিকারী ছেলেটার আফশোষ আর শেষই হয় না। ইনিয়ে বিনিয়ে ওর বন্ধুদের একই কথা বল্লো বার বার "আর কয় ফুট,বুঝলি প্যালা। আর কয় সেকেন্ড সময় পাইলেই .... ও:, এক্কারে হাতের থিক্ক্যা ফস্কাইয়া গ্যালো রে,আ হা হা হা '। তার বিলাপ অনেকক্ষণ ধরে চলেছিলো।

আরেক চিত্র : সেটা আমার কানে শোনা। বাগবাজারে আমাদের হাতে ধরা পড়লো বাপী। শোনা যায় আমাদের অন্তত: ছয়জন কমরেডের গলা কেটেছে বাপী। তার আর রক্ষা নেই । বাপী ও বুঝেছিলো। কিন্তু ভয় পায় নি। বল্লো " মারবি তো ? তো আগে একটু রসগোল্লা খাওয়া '। তো আমরাও দিলাম তাকে রসগোল্লা কিনে। খুব তৃপ্তি করে খেলো গোটা চারেক রসগোল্লা। " এবার সিগারেট দে ' তার আবদার। চারমিনার দিলে রেগে যায়। "বাঞ্চোত, জিন্দেগীর শেষ সিগারেট খাবো -একটা ক্যাপস্টান তো দে '। তাই খেলো। তারপর হেসে বল্লো " শোন,মারবি একেবারে গলার নলি তে। এই খানটায়। বুঝলি তো ? ' ধারালো ছুরিতে সেই কাজ করেছিলো কমরেডেরা। ছয় জনের মৃত্যুর বদলা নিলো। কিন্তু সেই হৃদয়হীন আততায়ীর সাহস ও তাদের মুগ্ধ করেছিলো। আবেগে আপ্লুত ঘাতকদের একজনের কাছে শুনেছিলাম এই কাহিনী।

এ ভাবেই ৬৯ শেষ হবার মুখে। সেন্ট জেভিয়ার্সে স্লোগান টোগান দিয়েছি বলে বিতাড়িত হয়ে ভর্তি হলাম আরেকটা কলেজে।

বাতাসে বারুদের গন্ধ। অগ্নিগর্ভ দিন? না কি বড় বেশী ধোঁয়া।

টুক টাক খবর শুনছি অমুক আর তমুক গ্রামে গেছে। গ্রাম ফেরৎ কোনো কমরেডের সামনে আমরা বসে - চক চক করছে চোখ। কখনো মনে পড়ে বছর দশেক আগে আমার জেনিভা নিবাসী কাকাকে ঘিরে আমরা কয়েকজন - বিলেতের গপ্পো শুনছি চোখ বড় বড় করে। গ্রামের কথা শুনে আমরা অবাক। সত্যি এরকম হয় ? এতো কুসংস্কার। পৃথিবীর কোনো খবর না জেনে বেঁচে থাকে এতো মানুষেরা।

শহরের এলাকা দখলের লড়াই চলছে, ভীত দিদিমা অসহায় রাস্তার মোড়ে সাথে দুই ছোটো নাতি নাতনী। রাস্তা পার হবেন কি করে ? দুই দিকে দুই পক্ষ। অহরহ বোমা ফাটছে। ধোঁয়ার ভরে আছে রাস্তা। সব দোকান বন্ধ। ছোটো কমরেডকে শাসিয়ে ওঠে পাড়ার বড় কমরেড। দেখছিস না দিদমা রাস্তা পার হচ্ছেন ? মুহুর্তে যুদ্ধ বন্ধ। দুই পক্ষেই। দিদিমা রাস্তা ক্রস করে নিরাপদ দুরত্বে গেলে, তবে ই ঝোলার থেকে পেটো বের হয়। দিদিমা যে ভানুদার মা - দু পক্ষের ই পাড়াতুতো দিদিমা।

অধ্যাপক এলেন আমাদের ইউনিটে। একটি ছেলের হাতে সুকান্তর কবিতার বই দেখে বল্লেন ঐ বই ছিঁড়ে ফেলো নি এখনো ? "কেন?' প্রশ্ন করলে উনি বই খুলে দেখান - সিগারেট নামে কবিতায় সুকান্ত লিখেছেন "একদিন হয়তো '। " হয়তো লিখেছেন, বুঝলে ? শ্রেনীচরিত্র ধরা পড়ে গেছে ' -সত্যি তো। অধ্যাপক সে¾ট্রাল কমিটির সদস্য। আমরা ছিঁড়ে ফেল্লাম সুকান্তর বই। ছিন্নপত্রের সাথে ঝরে গেলো আমাদের শ্রেনীচরিত্র - আমরা শুদ্ধ হলাম।

প্রেসিডেন্সী কলেজে এক অধ্যাপককে ধাক্কা মারা হলো। (মনে আছে নেতাজীর কথা - হুঁ হুঁ বাবা)। স্কুল কলেজে ভাঙচুর শুরু হয়ে গেছে। অদ্ভুত সব পোস্টার পড়ছে রাস্তায় রাস্তায়। এবার ডাক্তারদের খতম শুরু- এরপর শিক্ষকদের পালা। এই সব পোস্টারের মালিকানা কার ? পুলিশ থেকেই ? কিন্তু দেশব্রতীতে (তখনো প্রকাশ্য ছাপা হচ্ছে কলকাতা থেকে) এই সব নিয়ে কিছু লেখা থাকতো না। আমরা খুব ধন্দে থাকতাম। আমার সোনামামা তো ডাক্তার। আচ্ছা দাঁতের ডাক্তাররাও কি শ্রেনী শত্রু ?

প্রায় পিকনিকের মতন দক্ষিন বঙ্গের গ্রামে ঘুরে এলাম - বিপ্লবের বাণী প্রচার করতে। গ্রামের চাষীরা শুনেছে নকশালদের কথা। ওরা উদগ্রীব হয়ে আছে। শহরের বাবুরা এসে লড়াই শিখাবেন। গোল হয়ে আমাদের ঘিরে ধরে। প্রশ্ন করে। টিউকল একটা -সেটাও খারাপ হয়ে যায়। কেউ সারায় না। ডাক্তার নেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ওষুধ নেই। রাস্তার হাল টা একবার দ্যাখেন কর্তা।

স্কুলে কলেজে পাড়ায় শুধু আমরা। শুধু আমরা। আর সবাই পিছু হটছে।

আমাদের ইউনিটে ট্রাম কোম্পানীর কর্মী রাম আসলে আমরা উৎসাহে ফেটে পড়ি। প্রথম একজন শ্রমিক এসেছে। শ্রমিক ভাই। সর্বহারা ভাই। কলেজে পড়াশুনা লাটে উঠেছে। দিনবদলের মাদল বাজছে চারিদিকে।

ফেলে রেখে আমাকে বন্ধনে -ছেলে গেছে বনে।


আমার ছেলের হাতে বিষের নাড়ুর মত বোমা।ক্ষমা? কাকে ক্ষমা ?

তো শুরু হলো সত্তর দশক। জ্বলছে কলকাতা ও শহরতলী। অন্যপ্রদেশেও বিপ্লবের বিজয় রথ চলছে।

খবরের কাগজ খুলে দেখি কলেজ স্ট্রীটে চারজন যুবক পোস্টার মারছিলো - আচমকা পুলিশের গাড়ী গেলে তারা বোমা ছোড়ে। এসি ও দুজন কনেস্টবল জখম হয়। আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়লে ঘটনাস্থলেই চারজন ...। কিন্তু কানে কানে খবর ছোটে। অমন হয় নি। কাজল কে তুলেছিলো পুলিশ আগের দিন - পরের দিন গভীর রাতে কলেজ স্ট্রীটের পাশের গলিতে এনে চারজনকেই খুব ঠান্ডা মাথায় - মাথার পিছনে গুলি করে মারা হয়। সত্যি ? না: কক্ষনো না।

কিন্তু আরো খবর আসতে থাকে। একটা দুটো। দশ কুড়ি। সেই একই গল্প। ততদিনে আমরা জেনে গেছি।

চিনে গেছি নখ আর দাঁত।

বারাসতের রাস্তায় মালার মতন সাত জন ছেলের মৃত দেহ সাজিয়ে রাখলো পুলিশ।আর বছরের মাঝামাঝি কালো গাড়ীতে চেপে মাঝ রাতে আমি চল্লাম হাজত বাসে।

হাজতেও সিপিএম আর নকশালরা আলাদা থাকে - যদিও সি পিএম প্রায় নেই বল্লেই চলে। ওখানে আলাপ হয় অদ্ভুত সব লোকেদের সাথে। দক্ষিন বংগের দুই গরীব চাষী- হয়তো বছর তিরিশ বয়স। দুজনে ধর্ষন করেছে তাদের বৌদিকে। প্রশ্ন করলে বলে "হয়ে গেলো বাবু"। মোটা চালের দুর্গন্ধ ভাত খেতে পারছি না দেখে তাদের চোখ চক চক করে। " দিয়া দ্যান বাবু,আমাদের দ্যান '। দুই ভাইপরম তৃপ্তিতে খায়। পকেটমার নেপালীকে দেখে রাগে ফেটে পড়েন ওসি। " নেপালী।তোকে না বলেছিলাম আমার এলাকায় ঢুকবি না। আর তুই আমার পাড়ায় এসে পকেট মাল্লি? অ্যাঁ? ' খুব অপরাধী মুখে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নেপালী। " মেরে ঠ্যাঙ ভেঙে দে ' ওসি নির্দেশ দিলে নেপালী হাঁ হাঁ করে ওঠে। "পা নয় স্যার,পা নয়। পায়ে জখম আছে'। এবার অপ্রতিভ হন ওসি। " পান্ডে। ওর হাতে মারিস - পায়ে নয়। '

আরো চরিত্র মনে আসে।

মিনি চারু। ওকে আমরা ঐ নামেই ডাকতাম। তত্ত্বের চোটে অন্ধকার। সবাই কে থামিয়ে গলা ফাটিয়ে তার কি তক্কো। আমাকে প্রশ্ন করে "চে গোভেরার পোস্টার রেখেছিস - চে কি কমিউনিস্ট ? ' আমি আমতা আমতা করলে সে বুঝিয়ে দ্যায় চে কমিউনিস্ট নয়। আবার প্রশ্ন "আর হো চি মিন? ' আমরা সমস্বরে বলি "না সে ও নয়।' -- " আর কিম ইল সুং ?' আমরা তখন জেনে গেছি "না না,কিম ইল সুং ও কমিউনিস্ট নয় '। মিনি চারু সাবধন করে দ্যায় "কিন্তু এনভার হোজা কমিউনিস্ট'। আমরা সায় দি। আমাদের গেরেফতার হবার কথা শুনেই মিনি চারু পাড়া ছেড়ে সোজা গৌহাটীতে চলে গেলো ওর মামার বাড়ী। আর কেউ ওর খবর পায় নি।

রাগী মানু সব সময় চোখ পাকিয়ে ই থাকতো। তার বড় রাগ। কে একজন চারু মজুমদারের রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করলে চোখ লাল করে মানু পাল্টা প্রশ করে "প্রশ্নকর্তার বেঁচে থাকাটা কি খুবই দরকার ? ' পুলিশের হাতে ধরা পড়তেই লুটোপুটি খেয়ে সে কি কান্নাকাটি " আর মারবেন না স্যার '। পুলিশ তো অবাক। " আরে,আমরা তো মারতে শুরু ই করি নি '।

সুশীল কম কথা বলতো - রক্তাক্ত অচৈতন্য তার দেহ দেখে আমরা ঘাবড়ে গেছিলাম। বাঁচবে তো ? কিন্তু তার মুখ থেকে কথা বলতে পারে নি কলকাতার পুলিশ। অনেকদিন জেলে থাকবার পর সুশীলের সাথে আবার দেখা হয়েছিলো ময়দানে। সে আরেক গপ্পো।

মাস তিন চারেকের মধ্যেই আমাদের মাজা ভেঙে গেলো। প্রায় লাখ খানেক ছেলে জেলের ভিতরে - আরো বহু ঘর ছাড়া। পার্টি ব্যান হয়ে গেছে। কোনো সংগঠন নেই।সব ছত্রভঙ্গ। সব থেকে ভয়ের কথা ছাত্র পরিষদ উঠে আসছে - হু হু করে। যেন বাঁধ ভাঙা বন্যার জল। রাতের অন্ধকারে যেমন আসে - গ্রামের বাড়ী ঘর ডুবিয়ে।

কলেজে ঢুকতে গেলে দেখি কারা শ্লোগান দিচ্ছে সি পির হয়ে। আরে! এতো পুরো বেকার হস্টেল। আসলাম,নুরুদ্দীন,হাসান... সবাই। সবাই। এরা তো আমাদের দলের? তবে? শ্লোগান দিতে গিয়ে রোশন ছুটে আসে - " কি করছিস ?পালা। ' আগের দিন রাতে তালতলার পুলিশ আর লোকাল এম এল এ এসে মিটিং ডেকে বলেছে - " হয় যোগদান করো নয় মরো। তো কোনটা চাও ? তাই আমরা সকলেই ..... '

বেরোতেই সাদা পোষাকের পুলিশ । আবার।

আমরা প্রস্তুত ছিলাম না কিন্তু প্রশাসন ছিলো। কিছু কনেস্টবল ছিলো দাবা খেলার পন। তাদের মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে চুর করে দেওয়া হলো এক প্রজন্মের প্রতিবাদের ভাষা। লাশের পর লাশ। রাস্তায় জেলখানায়।

প্রকাশ কর্মকার আঁকলেন প্রতিবাদের ছবি,মঙ্গলাচরন লিখলেন কবিতা। কোথাও কোনো প্রতিবাদ নেই। সবাই গন্ডার।

রাতারাতি বদলে যাচ্ছে রং। কয়েক মাসের মধ্যে ই আমরা বেঁচে রইলাম অন্যদের দয়ায়। পরাজিত। মৃতদেহের স্তুপ বেড়ে ই চলছে।

অপু সারেন্ডার করলো। তার আগের দিন আমার বাড়ীতে এসে বল্লো "আর পারছি না'। অনেক চেনা মুখ অনন্ত প্রবাসে। গন্ডারের সংখ্যা আরো বাড়ছে।

কার দোষ ? পার্টির মধ্যে চলছে আঙুল দেখানোর পালা। ঐ নীতি টা ভুল ছিলো। সন্দেহ আর অবিশ্বাস। কে কখন রং পাল্টাচ্ছে কে জানে ? পুরোনো বন্ধুদের দেখলে ভয় লাগে। কারা কারা পুলিশের চর ? পুলিশের হাতে ধরা পড়লে দেখি তারা সব ই জানে - কে কখন কোথায় কথা বলেছিলো, কোন পাঁচিলের নীচে লুকিয়ে রাখা আছে অস্ত্র।কার বাড়ীতে নিশুতি রাতে আশ্রয় নিয়েছিলো বীরভুমের পুলক।

সত্তরের শেষ থেকেই পার্টির মধ্যে দুই লাইনের সংঘাত। অনেক সময়ে ই রক্তাক্ত। সুশীলের সাথে দেখা অনেক দিন পর। কবে ছাড়া পেলি?

সুশীলের আমার হাতের বান্ডিলের দিকে তাকায়। ওগুলো কি ? "ওয়াং মিং চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করুন ' - আমি ইস্তাহার এগিয়ে দি। সুশীলের মুখ ঘৃনায় উপছে পড়ে - তাহলে তুই ও ওদের পাল্লায় পড়লি ? দুজনে দুজনকে দেখি। এতো রাগ ছিলো আমাদের ? সাইকেল চালিয়ে সুশীল চলে গেলো।

আরেক দিন। কলেজ ঢুকতে যাচ্ছি হঠাৎ চিৎকার। আর আওয়াজ। সমীর ছুটে বেরোলো।পালা। আমরা দুজনে ই ছুটছি।ধরমতালা স্ট্রীট। ভর দুপুর। লোকারণ্য। ট্রাম চলেচে মুখটি তুলে। বাসের হর্ন। দুটি ছেলে ছুটছে। পিছনে চারজন। ধর শালাকে।

দৌড়।

রাস্তায় অগুন্তি মানুষ। কাজ পাগলার দল। কেউ চোখে দেখে না কানে শোনে না। মানুষের ভীড়। হকার। এঁকে বেঁকে দৌড়াও। ন্যাট জিও তে দেখায় না কি এমন ডকু ?

ততদিনে কলকাতায় প্রতিবাদের চিতার আগুনও নিভে গেছে। আকাশে এশিয়ার মুক্তি সূর্য্য। কলকাতা কাপাচ্ছে ফাটা কেষ্ট। পার্টি ভেঙে সত্য নারান সিং বেড়িয়ে এসেছেন। আর এক বচ্ছর পর অসীম,কান্বু এরাও জয়েন করবেন।

অভীক আমাকে বল্লো চীনের সে¾ট্রাল কমিটি আজ এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে আর সেখানে ভুল পদক্ষেপ সম্ভব নয়। মাও আর তার পর লিন পিয়াও।(তখনো তিনি বিয়াও হন নি)।এদের হাতেই বিশ্ব বিপ্লবের যাদু দন্ড। কিন্তু লিন বিয়াও ও টিকলেন না। চার চক্রী দুর হলো। তাহলে ঠিক কে ?

সত্তরের দশকের কথা ছিলো না মুক্তির দশক হবার? কিন্তু এতো শুধু ত্রাসের দশক। অপমান আর পরাজয়ের। আর কি ভয় কি ভয় ।

শুধু খারাপ খবর শুনি। বহরম পুর জেলে ,আলিপুর জেলে - ওয়ার্ডাররা স্রেফ পিটিয়ে মেরে ফেললো - সেই ওয়ার্ডারদের ইউনিয়ন আর এস পির দেবু ভটচাযের। "এইসব সোনার টুকরো পথভোলা ছেলেরা' - এমন কথা বলে বহু বক্তৃতা দেন সব নেতাই। প্রেসীডেন্সীর হীরের টুকরো ছেলেরা- সবাই আহা উহু করেন।

কিন্তু সে শুধু গন্ডারের অশ্রুপাত। আমাদের সবার চামড়াই মোটা হয়ে যাচ্ছে।

ধ্রুবদার সাথে দেখা। ছুটে যাই। কেমন আছো ধ্রুবদা? এর তার খবর? কে কোথায় আছ ? "সবাই ছাত্র পরিষদ হয়ে যাচ্ছে ধ্রুবদা "। শুনে মুখ ম্লান হয়ে যায় ধ্রুবদার। "তুই শুনিস নি?' ধ্রুবদা অস্ফুটে বলে "আমি ও। এখন কলেজের বড় ছাত্র পরিষদ নেতা। ' দুজনে ই চুপ করে যাই।

(চলবে)