আপনার মতামত         


          বিষণ্নতার উপাখ্যান

          বেদবতী দত্ত


১।

ভয় করে আজকাল, বড়ো ভয় করে। রাত হলে, যখন সুয্যিমামা টুপ করে ডুবে যায় দূরের ঐ গাছগুলোর ওপারে, আর গাছগুলো কালো-কালো ছায়া-ছায়া হয়ে যায়, মনে হয় ঐ ছায়ামূর্তিরা এবার আমার ঘরে ঢুকে পড়বে, ভয় দেখাবে। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে। যখন আলো ক্রমশ কমে আসত, কমে আসত, কিন্তু শেষ হতনা বিকেলের খেলা, মনে হত এখনও একটু আলো থেকে গেছে আকাশের গায়ে, সেই তখনকার কথা। তারপর ঝুপ করে হঠাৎই নেমে আসত অন্ধকার, বইয়ে পড়া ভ্যাম্পায়ারের মতো সোজা নেমে আসত আমাদের লুকোচুরি খেলার ঝোপঝাড়ে। ভয় করত তখন, অন্ধকারের ভয়, রাতের রাস্তায় একলা বাড়ি ফেরার ভয়, একলা হয়ে যাবার ভয়। একদৌড়ে রাস্তায় এসে দেখতাম সব আলো জ্বলে গেছে, আরো জোরে উড়ে যেতাম বাড়ির দিকে। দৌড়, দৌড় দৌড়, ভয় থেকে পালানোর দৌড়, একলা পড়ে না যাবার জন্যে দৌড়। বাড়ি ফিরে দেখতাম অন্ধকার নেই আর, ঘরে ঘরে আলো। মা চোখ পাকিয়ে বলত, "এতো দেরি কেন?' আমি জড়িয়ে ধরতাম। যতই বকুক, এখানে আলো আছে, উষ্ণতা আছে, আলিঙ্গন আছে, একলা হয়ে যাবার কোনো ভয় নেই আর।


২।

ছোটোবেলার আরো কথা মনে পড়ে। গান গাইতাম, শুনতাম। এদিক সেদিক গান শুনতে যেতাম প্রায়ই। একদম ছোটোবেলায় বাবা-মার সঙ্গে। পরে কোনো প্রিয়জনকে নিয়ে। সবাই শিল্পীকে দেখত, আমি দেখতাম হারমোনিয়াম। গান শেষ করে উঠে যাচ্ছেন শিল্পী, তাঁকে ঘিরে রেখেছে ভক্তরা, দেখতাম, মঞ্চে একলা পড়ে আছে হারমোনিয়াম। আমার মন কেমন করত। যদি কেউ ভুলে যায়? যদি একলাই পড়ে থাকে ঐ নি:সঙ্গ হারমোনিয়াম? ওকে কিকরে সবাই ভুলে যেতে পারল?
এখন থাকি দশতলায়। জানলা দিয়ে দেখা যায় ট্রামডিপো। কোনো ট্রাম নেই শুধু সিটিসির বাস থাকে এখন। যখন অনেক রাত হয়ে যায়, অনেক রাত, রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়, শেষ বাস চলে যায় ধর্মতলার দিকে, তখন মাঝে মাঝে বাইরে তাকাই। হ্যালোজেন আলোয় ফুটপাথ দেখা যায় পরিষ্কার। দেখা যায় গাছ, জলবিন্দু চকচক করে ঘাসের গায়ে। কয়েকজন মানুষ দেখি জটলা করে। কিছু পরে তারাও চলে যায়, তখন ট্রামডিপোর দিকে তাকাতে ভয় করে। একলা কয়েকটা সিটিসির বাস পড়ে আছে নি:ঝুম আলোয়, ওদের সবাই ভুলে গেল? ওদেরকি ভয় করে? মানুষ সারাদিন ধরে ব্যবহার করে ফেলে রেখে গেল ওদের, ওরা কি অভিমানী?
কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখি, ফুলে ছেয়ে আছে। পাখিরা রাতের ঠিকানায় ঘুমিয়ে, শুধু কয়েকটা বাস, একলা, আমার ভেবে কান্না পায়।
ভোরে ঘুম ভাঙে কোনোকোনো দিন। জানলার পর্দা সরিয়ে দিই। একফালি রোদ ঝুপ করে এসে বলে, এতক্ষণ কোথায় ছিলে? সত্যিই তো, জানলা বন্ধ ছিল। বাইরের রোদ, বৃষ্টি ঐ কৃষ্ণচূড়া গাছ, এরা তো একলা ছিল সারারাত। এদেরকি তাই মনখারাপ?


৩।


চিনেমাটির পুরোনো প্যাঁচা ছিল একটা, পড়ে গেল হাতে লেগে। নাকটা খসে গেছে, বেরিয়ে গেছে ছালচামড়া। ওকে কুৎসিৎ বললেই চলে এখন, কিন্তু ফেলতে পারিনা। কোথায় ফেলব? ডাস্টবিনে? পড়ে থাকবে পুরোনো ঝুলঝাড়ু, দুধের কৌটো, ছেঁড়া ন্যাপকিন আর পুরোনো পাপোশের পাশে? একা একা? কিছু ফেলতে পারিনা। ড্রয়ারে পুরোনো পেনের স্তূপ জমে ওঠে, কারো ঢাকা নেই, কারো নেই নিব, কারো শুধু ঢাকনাই পড়ে আছে। পার্সে পড়ে আছে সেলোটেপ দেওয়া ছেঁড়া টাকা, চলেনি কোথাও। গাছ শুকিয়ে ঝরে গেছে গত গ্রীষ্মে, বারান্দায় টব পড়ে আছে। ময়না পুষেছিলাম সেই কবে, তার স্মৃতিটুকু নিয়ে খাঁচা আজও ড্রয়িং রুমে।
কিছু ফেলতে পারিনা। ভয় হয়, যদি কেউ একলা হয়ে যায়?
নিজের কথাই ভাবি। একদিন শরীরের আগুন নিভে যাবে, সমস্ত দিনের শেষে টুপ করে বুড়িগঙ্গার তীরে ডুবে যাবে সুয্যিমামা। নদীর ধারে পোড়ো গাছের মতো যদি আমিও কখনও একলা হয়ে যাই?


৪।

মেঘ দেখি, গাছ দেখি, দেখি কচিপাতা। নিয়নের আলো দেখি রাস্তায়। দুপুরের রোদ দেখি, বৃষ্টির সন্ধ্যা। জানলা দিয়ে হাত বাড়াই, দু হাতে মেখে নিই বৃষ্টিজল। রাস্তায় হাঁটলে ছাতা বন্ধ করে দিই, ভিজে যাই ভিজে যাই। একা ভিজি, দুজনেও ভালোবাসি, শাওয়ারের নিচে। তিল দেখি, চেনা হাসি দেখি, দৃষ্টি দেখি। মত্ততা দেখি, ভালোবাসাবাসি দেখি, দুহাতে মেখে নিই জলের মতো। ভরে যাই, ভরে যাই আকুলতায়। পথঘাটও ভেসে যায় জলে, হাঁটুজল ভেঙে চলে সরকারি বাস। বারান্দায় টব পড়ে থাকে, শ্রাবণদিনের শেষে দেখি ভরে গেছে ধারাবর্ষণে।
পরদিন যেকে সেই।


৫।

সঙ্গী বদলে যায় বারবার। আড়ালে আবডালে চোখ টেপে চেনা লোকজন। আমি জানলা দিয়ে মেঘ দেখি। কোনো কোনো স্তূপ মেঘকে দেখলে মনে হয় রাজপ্রাসাদ, কোনো মেঘ যেন ছোট্ট কাঠবিড়ালী, আপন মনে খেলে বেড়ায় বসন্তনিকেতনে। হঠাৎ তার পিছনে দেখি ক্ষিপ্রগতির বেড়াল, ঝাঁপ দিয়ে পড়তে চায় যেন। পরক্ষণেই পাল্টে যায় চেহারা, কাঠবিড়ালী ময়ূর হয়ে যায়, পেখম মেলে নেচে নেয় এক দুবার। আর বেড়াল হয়ে যায় সিংহশিশু, চলনে আসে মন্দগতি, স্থিরতা। কোনো মেঘ দেখি ছাইছাই, কেউ সাদা, কেউ ঘন কালো, চোখে মায়াঅঞ্জন। কেউ বৃষ্টি দেয়, কেউ শুধু ভেসে যায়। ভেসে যাই, ভেসে যাই আমিও বারবার।
আমি ঘরে বসে ছাদ দেখি। এই দশতলায় কড়িকাঠ নেই, শুধু দুএকটা চিড়, প্লাস্টার অফ প্যারিসের সামান্য অমসৃণতা। দু একটা ছোটোছোটো ভাঁজ, আলোছায়ার খেলা। আমি মাঠ দেখি দেয়ালের গায়ে, ছোটোবেলার লুকোচুরি খেলা, ইশকুল বাড়ি। কুলের আচারের কথা মনে পড়ে, ফুচকা, পাপড়িচাট। প্রেম-প্রেম খেলা, বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা চিঠি। প্রেমপত্র পড়ে হাসাহাসি মনে আসে, রোমাঞ্চ, ভয়, সব মনে পড়ে যায়, ভেসে যাই, ভেসে যাই বারবার।
সেই কিউট কিশোরের কথা মনে পড়ে। কি মিষ্টি ছিল ঠোঁটের গড়ন, দৃষ্টিসুখ। তীব্র চাহনি ছিল, কার যেন? কি নাম ছেলেটার? ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা শেষে যার চিঠি ছিঁড়েছিলাম অবলীলায়? প্রেমপত্রও ছিঁড়েছি, ছিছি। সেদিন বিকেলেই গান গেয়েছি শ্যামার রিহার্সালে। কি নিষ্ঠুর খেলাধূলা ছিল, তখন। পাপ হয়েছিল নিশ্‌চয়।
পাপ হয়েছিল?


৬।

দেবী হতে চেয়েছি রাত্রিদিন। দুহাতে পায়রা উড়িয়েছি, প্রেম নিয়েছি অকাতরে। চুল কেটেছি ছোটো করে, তীক্ষ্ম করেছি ভ্রূভঙ্গী। আয়নার সামনে কেটেছে দিবসরজনী, শরীরে দিয়েছি শান। ফ্যাশান প্যারেডের মতো হেঁটে গেছি সহস্র দৃষ্টির সামনে দিয়ে। অপাপবিদ্ধতা নয়, শুধু ভান ছিল। ফিরে তাকাইনি কখনও। আজ দূর, বহুদূর হেঁটে এসে দেখি কেউ অনুসরণ করেনি, দেহরক্ষী নেই কোনো। অসহায় লাগে, একা লাগে, ভয় করে।


৭।

চিনেমাটির প্যাঁচাকে দেখি তাকের উপর। নাক নেই, ভেঙে গেছে। পার্সের ছেঁড়া টাকা দেখি, কোনোমতে প্লাস্টিকে ভর করে টিকে আছে। সন্ধ্যাবেলায় দশতলা থেকে দেখা যায়, বহুনিচে পড়ে আছে ডাস্টবিন। ঝুপ করে লোডশেডিং হয়ে যায়। ভয় করে। এখান থেকে দিগন্তের কোনো গাছ আর দেখা যায়না, শুধু কালো-কালো বাড়ি দেখি, আর রাস্তায় ছায়ামূর্তির ভিড়। তার ফিসফিস করে কথা বলে, হেঁটে চলে বেড়ায়। বইয়ে পড়া ভ্যাম্পায়ারের মতো, মনে হয় সোজা চলে আসবে জানলা দিয়ে। অন্ধকারে ভয় করে, একলা হয়ে যাবার ভয়। একদৌড়ে চলে যেতে চাই রাস্তায়। তারপর উড়ে যেতে চাই সেখানে, যেখানে আলো আছে, উষ্ণতা আছে, আলিঙ্গন আছে, একলা হয়ে যাবার কোনো ভয় নেই আর।

আমি বাড়ি যেতে চাই, আবার। আমার বাড়ি।