আপনার মতামত         


      শ্রমিক এবং কমিউনিস্ট ইস্তাহারের রাজনীতি: একটি পাঠের খসড়া

      সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


শ্রমিক কে?

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর আঠেরোশো আঠারো সালের ইংরেজি সংস্করণে "বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত' শীর্ষক প্রথম পরিচ্ছেদের টীকায় এঙ্গেল্‌স লেখেন "বুর্জোয়া বলতে আধুনিক পুঁজিপতি শ্রেণীকে বোঝায়, যারা সামাজিক উৎপাদনের উপকরণগুলির মালিক এবং মজুরি শ্রমের নিয়োগকর্তা। প্রলেতারিয়েত হল আজকালকার মজুরি-শ্রমিকেরা, উৎপাদনের উপকরণ নিজেদের হাতে না থাকায় যারা বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচতে বাধ্য হয়।'
ঐ বইয়েরই "প্রলেতারিয়েতরা ও কমিউনিস্টরা' শীর্ষক দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে মার্কস ও এঙ্গেল্‌স লেখেন "এবার মজুরি শ্রমের কথা ধরা যাক। মজুরি শ্রমের গড়পড়তা দাম হল নিম্নতম মজুরি, অর্থাৎ মেহনতকারীরূপে মেহনতীর অস্তিত্বটুকু মাত্র বজায় রখার জন্য যা একান্ত আবশ্যক, গ্রাসাচ্ছাদনের সেইটুকু উপকরণ। সুতরাং মজুরি-শ্রমিক শ্রম করে যেটুকু ভাগ পায় তাতে কেবল কোনোক্রমে এই অস্তিত্বটুকু চালিয়ে যাওয়া ও তার পুনরুৎপাদন করা চলে। '

অর্থাৎ "প্রকৃত শ্রমিক' চিনে নিতে গেলে,মার্কস ও এঙ্গেল্‌সের মতে, দুটি জিনিস মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন:
  ১) উৎপাদনের উপকরণ নিজেদের হাতে না থাকায় সে/তারা বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচতে বাধ্য হচ্ছে কিনা, এবং
  ২) মজুরি হিসাবে সে/তারা যেটুকু পাচ্ছে তার পরিমান এইটুকু কিনা যাতে কেবল কোনোক্রমে এই অস্তিত্বটুকু চালিয়ে যাওয়া ও তার পুনরুৎপাদন করা চলে।

এইদুটি চিন্‌হের দ্বিতীয়টি দিয়ে আঁকা এক নিরূপায় সর্বহারা কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুখকেই শ্রমিকের প্রকৃত মুখ বলে আমাদের দেখায় কমিউনিস্ট ইস্তাহার। এই সেই নিরন্ন মুখ,যে পুঁজিবাদী দুনিয়ায় কোনোক্রমে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। এই মুখকে আমরা দেখেছি নভেম্বর বিপ্লবে সিনেমার পর্দায়, দেখেছি শ্রীরামপুরের টালির চালের চটকল বস্তির ঘরে, দেখেছি শহরের পথে মহামিছিলে। এই সেই মানুষ, শ্রমশক্তি ছাড়া যার আর কিছুই নেই। যার শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার আর কিছুই নেই, কিন্তু জয় করবার জন্য আছে সারা দুনিয়া।

মার্কসবাদী মূল ধারার আলোচনায় চিরকালই শ্রমিকের মুখ এক নিরন্ন মানুষের মুখ। বাংলা ভাষায় তাই প্রলেতারিয়েতের অনুবাদ হয় "সর্বহারা'। শ্রমিকের এই নিরন্নতা মার্কসবাদী বিশ্ববীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। লক্ষ্যণীয়, যে কমিউনিস্ট ইস্তাহারে শ্রমিক পায় শুধু গ্রাসাচ্ছাদনের ন্যূনতম উপকরণটুকুই। এই কোনোমতে বেঁচে থাকা শ্রমিক, এই নিরন্ন শ্রমিক, মার্কসবাদী প্রকল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মজদুররা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে। তাদের জাতি আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, ধর্ম আলাদা, বেঁচে থাকার প্রকরণ আলাদা। কিন্তু একটি জিনিস এক। দুনিয়ার সকল মজদুর একই রকম দরিদ্র, একই রকম নিরন্ন, বেঁচে থাকার উপকরণগুলি থেকে একই রকম ভাবে বঞ্চিত। তারা সকলেই পায় ন্যূনতম মজুরিটুকু। এই অর্থনৈতিক বঞ্চনাই তৈরী করে সেই সাধারণ সাম্য, যা ভাষা ধর্ম জাতি নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মজদুরকে একই সূত্রে বেঁধে ফেলে। এই সেই মঞ্চ, যেখানে দুনিয়ার সকল মজদুরের সঙ্গে একক, বিচ্ছিন্ন শ্রমিক একই জমিতে এসে দাঁড়ায় ,একই সাথে সংগ্রাম করে সাধারণ লক্ষ্যের জন্য, এবং অবশেষে ছিনিয়ে আনে জয়। "দুনিয়ার মজদুর এক হও ' এই যে মিলিত ধ্বনি শোনা যায় ইস্তাহারের শেষ বাক্যে, এই ঐক্যের জন্য প্রয়োজন এক সাধারণ ভিত্তি, এক সাম্য। নিরন্নতা, মার্কসবাদী বীক্ষায় সেই সাধারণ সাম্য যোগান দেয়।

এই সাম্য, এই সাধারণ ভিত্তি, এই ঐক্যকেই আমরা খুঁটিয়ে দেখব এই আলোচনায়, খুঁটিয়ে দেখব শ্রমিকের মুখকে। মাথার পিছনের আলোকিত চাকতি সরিয়ে নিয়ে জোরালো আলোর নিচে ফেলে দেখব তার মুখের প্রতিটি ভাঁজ। জেরা করব "প্রকৃত শ্রমিকে'র সন্দেহাতীত চিন্‌হসমূহকে। ইন্টারোগেশানের এই পদ্ধতি হবে চাতুরি, কুটিলতায় ভরা, আক্রমণের পদ্ধতি হবে গেরিলা। লক্ষণের গন্ডী পেরিয়ে যাব বারবার, প্রয়োজনে ফাঁদব বিকল্প এক উপাখ্যান, দেখব দেবরহীন জনকদুহীতার দুর্বলতা ঠিক কোথায়।


প্রকৃত শ্রমিক, একটি থট এক্সপেরিমেন্ট

একটি উপাখ্যান

রাম একজন নিচুতলার ভারতীয় সফ্‌টওয়ার কর্মী, ইন্ডাস্ট্রির ভাষায় যাকে বলে কোডার। কর্মসূত্রে সে আছে আমেরিকা যুক্তরাষ্টে। থাকে একটি এক কামরার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টে অন্য একজন রুমমেটের সঙ্গে শেয়ার করে, তার একখানি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি আছে। মাস গেলে সে দু হাজার ডলার মাইনে পায়। ব্যাচেলার ছেলে, বাড়িভাড়ার পুরোটাও দিতে হয়না, তাই দিব্যি চলে যায়,হাতে প্রতিমাসেই হাজার খানেক ডলার বাঁচে। টাকাপয়সা বাঁচলেও এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তার জীবনযাত্রার মান বেশ নিচু। সামাজিক বিচারে সে একজন দক্ষ শ্রমিক ভিন্ন আর কিছু নয়, যাকে কষ্ট করে অন্য একজন শ্রমিকের সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করতে হয়। অর্থনৈতিক বিচারেও তার মাইনে এ দেশের অদক্ষ শ্রমিক, যেমন দোকানের বা রেস্তোরার কর্মচারিদের থেকে কিছুটা বেশি হলেও , সাধারণ দক্ষ শ্রমিকদের তুলনায় বেশ কমই। শ্রমিক শ্রেণীর গড় বেতনের ঊর্ধ্ব ও নিম্ন সীমার মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায় তার অবস্থান। রাজনৈতিক মতবাদের দিক থেকে সে বেশ উদারনৈতিক। আমেরিকার ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে স্থানীয় একটি সভায় সে যোগ দিয়েছিল। ভারতীয় সংবাদপত্রে, সে দেখেছে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকান শ্রমিক শ্রেণীর এক বিরাট প্রতিবাদ হিসাবে সেই সভার খবর বেরিয়েছে।
বছর তিনেক আমেরিকায় থাকার পর, রাম চলে আসে ভারতবর্ষে। তার কোম্পানি তাকে পাঠিয়েছিল আমেরিকায়, তারাই ফেরত নিয়ে আসে। এতোদিনে সে বেশ কিছু ডলার কামিয়েছে, তাই দিয়ে সে কিনে ফেলে একটি ফ্ল্যাট। আরও কিছুদিন পরে সে কেনে একখানি গাড়ি। তার ফ্ল্যাটবাড়িটি উদ্বোধন করেন এক মন্ত্রী, যার খবর বেরোয় সংবাদপত্রে। কয়েকদিন পরে তা নিয়ে নিবন্ধও লেখেন জনৈক সুপরিচিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবি। সেই নিবন্ধে, সে পড়ে, লেখা হয়, যে, সরকার শুধু মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধিদের বাসস্থান সমস্যা নিয়েই চিন্তিত আজকাল, লক্ষ লক্ষ নিরন্ন সর্বহারার বাসস্থান নিয়ে সরকারের আর কোনো মাথাব্যথা নেই।
রাম ভাবে, সে কি ধনিক শ্রণীর প্রতিনিধি? আমেরিকায় যখন সে শ্রমিক শ্রেণীর একজন হয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল, তার থেকে সে কি আজ পাল্টে গেছে? আজও সে একজন কোডার। তখন যে মাইনে পেত তার পাঁচ ভাগের এক ভাগও সে এখন পায়না। তখনকার গাড়ি আজকের গাড়ির চেয়ে অনেক ভালো ছিল। সেই সময়ের অ্যাপার্টমেন্ট ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, আজকের ফ্ল্যাট তা নয়, অবশ্য এটা তার নিজের ফ্ল্যাট। কিন্তু শুধু একটা ফ্ল্যাট কিনেই কি কেউ শ্রমিক শ্রেণী থেকে ধনিক শ্রেণীতে উত্তরিত হতে পারে? নাকি শ্রমিকশ্রেণীর বহুকথিত আন্তর্জাতিক ঐক্য শুধু এক কল্পকাহিনী মাত্র? দুজন শ্রমিক যখন দূর দেশে থাকে তখন তারা একে অপরের শ্রেণীভাই, কিন্তু কাছাকাছি এলেই কিভাবে ঘুচে যায় সেই বন্ধুত্ব?

এই উপাখ্যানটি অন্য ভাবেও বলা যেতে পারত। দুবাইতে টাকা কামাতে যায় যে ভারতীয় ছেলেরা, বা সোনারূপার কাজে মুম্বই বা গুজরাট যায় যে বাঙালিরা, এমনকি, হয়ত বিহারের গ্রাম থেকে কলকাতায় কাজ করতে আসে যারা তাদের যে কাউকে নিয়েই রচিত হতে পারত এই উপাখ্যান। এদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই গল্পটি একই। এবং প্রত্যেকটি গল্পের সঙ্গেই একই প্রশ্ন উঠে আসে। দুনিয়ার সকল শ্রমিক যদি ভাই ভাই হয়, তাদের মধ্যে যদি ঐক্যের বা সাম্যের এক বাস্তব ভিত্তি থেকে থাকে,তাহলে এক দেশের শ্রমিক তার জীবনযাত্রার নির্দিষ্ট মানটি নিয়ে অন্য দেশে এলেও শ্রমিকই থেকে যাবে। কিন্তু তার বদলে কোন যাদুমন্ত্রবলে এক দেশের শ্রমিক অন্য দেশে পরিণত হয় পুঁজিপতি না হলেও, এক ধনী মধ্যসত্ত্বভোগীতে? যে ন্যূনতম মজুরির কথা বলেছে ইস্তাহার, জীবনযাত্রার সকল উপকরণ থেকে বঞ্চিত হয়ে কোনো ক্রমে গ্রাসাচ্ছাদন করার যে সাধারণ ভিত্তি, যে ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে ইস্তাহার ঘোষণা করেছে "দুনিয়ার মজদুর এক হও', শ্রমিকে শ্রমিকে সাম্যের সেই ভিত্তিটি কি তাহলে সার্বজনীন নয়? এই সাম্য কি তাহলে কোনো চরম সাম্য নয়, যা সকল দেশের সকল ভাষার সকল ধর্মের শ্রমিককে একে অপরের ভাই করে তুলবে?

অত:পর এই প্রশ্নটি আমরা করব মার্কসবাদী বিশ্ববীক্ষার কাছে।

নিম্নতম মজুরি

"নিম্নতম মজুরি' বলতে ঠিক কি বুঝি? "কোনোক্রমে এই অস্তিত্বটুকু চালিয়ে যাওয়া ও তার পুনরুৎপাদন করা' র জন্য ঠিক কতোটুকু মজুরি প্রয়োজন? এটি কি একটি ধ্রুবক রাশি, যাকে কোনো এক এককে মাপা যায়? টাকার মূল্যে একে মাপা যাবেনা, কারণ যেকোনো মুদ্রারই ক্রয়ক্ষমতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল। কিন্তু তা যদি নাও হত, অর্থাৎ তিরিশ বছর আগে চালের যা দাম ছিল আজও যদি তাইই থাকত, তাহলেই কি টাকা দিয়ে এই নিম্নতম মজুরিকে মাপা যেত? টাকা বাদ দিয়ে যদি নিছক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতেই দেখি, তাহলেই কি "কোনোক্রমে এই অস্তিত্বটুকু চালিয়ে যাওয়া ও তার পুনরুৎপাদন করা'র জন্য একজন মানুষের ন্যূনতম ঠিক কতটা খাদ্য বস্ত্র এবং ঠিক কতটা আরামদায়ক বাসস্থান লাগে তার একটা গড় মান নির্ধারণ করা সম্ভব, যে মান দেশ ও কালের ঊর্ধ্বে উঠে এক অচঞ্চল ধ্রুবক রাশি হয়ে থাকবে?

"মজুরি শ্রম ও পুঁজি 'র "পুঁজি ও মজুরি শ্রমের সম্পর্ক' শীর্ষক পরিচ্ছেদে মার্কস লিখছেন "উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক জীবনধারণের সমস্ত উদাহরণের দাম ২/৩ ভাগ কমে গেছে, যখন দৈনিক মজুরি কমেছে ১/৩ শতাংশ -- ধরা যাক ৩ শিলিং থেকে কমে হয়েছে ২ শিলিং। যদিও এখন একজন শ্রমিক দুই শিলিং এ যে পরিমান পণ্য কিনতে পারে তা তার আগেকার তিন শিলিং এ কেনা পণ্যের চেয়ে পরিমানে বেশি, আসলে পুঁজিপতির মুনাফার অনুপাতে তার মজুরি কমেছে। পুঁজিপতির মুনাফা ... এক শিলিং বেড়েছে, যার অর্থ হল শ্রমিককে এখন যে ক্ষুদ্রতর পরিমানের বিনিময় মূল্য দেওয়া হয়, তার বিনিময়ে, শ্রমিককে আগের চেয়ে বেশি পরিমানে বিনিময় মূল্য উৎপাদন করতে হবে। শ্রমের চেয়ে পুঁজির আনুপাতিক ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রম ও পুঁজির মধ্যে সামাজিক সম্পদের বন্টন আরও অসম হয়েছে। পুঁজিপতি একই পরিমান পুঁজি দিয়ে আরও অধিক শ্রম করায়ত্ত্ব করতে পারছে। শ্রমিক শ্রণীর উপর পুঁজিপতি শ্রেণীর আধিপত্য বৃদ্ধি পেয়েছে, শ্রমিকের সামাজিক অবস্থান আরও নিচে নেমেছে, তাকে পুঁজিপতির অবস্থানের চেয়ে আরও এক ধাপ নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে'।

ঐ পরিচ্ছেদেই তিনি আরও লেখেন "মজুরি নির্ধারিত হয় সর্বোপরি পুঁজিপতির লাভ, মুনাফার পরিপ্রেক্ষিতে। অন্যভাষায়, মজুরি একটি আনুপাতিক, আপেক্ষিক পরিমান'।

ঐ বইয়েরই "মজুরি কার দ্বারা নির্ধারিত হয়' পরিচ্ছেদে মার্কস লেখেন "যে সাধারণ নিয়মগুলি সাধারণ পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করে, সেই একই নিয়মগুলি স্বাভাবিক ভাবেই মজুরি অর্থাৎ শ্রমশক্তির দামকেও নিয়ন্ত্রণ করে। মজুরি বাড়বে এবং কমবে চাহিদা ও যোগানের সম্পর্কানুসারে, শ্রমশক্তির ক্রেতা পুঁজিপতিরা এবং শ্রমশক্তির বিক্রেতা শ্রমিকদের মধ্যের প্রতিযোগিতার আকারানুসারে। মজুরির ওঠানামা সাধারণভাবে পণ্যের দামের ওঠানামার সঙ্গে একই সূত্রে গ্রথিত। কিন্তু এই ওঠানামার সীমার মধ্যে থেকেও শ্রমশক্তির দাম নির্ধারিত হবে এর উৎপাদনের খরচ দ্বারা, নির্ধারিত হবে সেই পণ্যের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম সময় দ্বারা, যে পণ্যের নাম : শ্রম শক্তি।
শ্রমশক্তির উৎপাদনের খরচটি তাহলে কি?
শ্রমজীবিকে শ্রমজীবি হিসাবে টিকিয়ে রাখতে,তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণবাবদ যে খরচ তাই হল শ্রমশক্তির উৎপাদনের খরচ।'

উদ্ধৃতির পরিমান আরও বাড়িয়ে চলা যায়, কিন্তু এখানে মোদ্দা কথা দুখানা।

এক, মজুরি বা শ্রমশক্তির দামও আর পাঁচটা পণ্যের দামের মতই একই সাধারণ নিয়মে নির্ধারিত হয়। সেই সাধারণ মার্কসবাদী নিয়মটি হল পণ্যের দাম নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনের সাধারণ খরচ দিয়ে। শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে সেই খরচটি কি? শ্রমজীবিকে শ্রমজীবি হিসাবে টিকিয়ে রাখতে,তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণবাবদ যে খরচ তাই হল শ্রমশক্তির উৎপাদনের খরচ।

দুই, শ্রমিকের মজুরির কোনো সার্বজনীন, চরম পরিমাপ নেই। তাকে টাকার অঙ্কে মাপা যায়, যাকে মার্কস বলেছেন নমিনাল ওয়েজ, বা রিয়েল ওয়েজ দিয়েও মাপা যায়, যার অর্থ হল ঐ পরিমান মজুরি দিয়ে কি পরিমান পণ্য কেনা যায়। এই রিয়েল ওয়েজ বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। কিন্তু সবার উপরে মজুরিকে যে ভাবে দেখতে হবে, তার যে প্রকৃত পরিমাপ, তা মূলত: আপেক্ষিক। শ্রমিক একটি নির্দিষ্ট সময় পরিশ্রম করে যে পরিমান বিনিময় মূল্য উৎপাদন করে, তার বেশিরভাগ অংশটাই যায় পুঁজির ঘরে, আর শ্রমিকের কাছে আসে তার অতি ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশ। এই দুইয়ের যা অনুপাত,তাই মজুরির পরিমাপ।

এই দুটি বিষয়ই একটি নির্দিষ্ট দিকে অঙ্গুলীনির্দেশ করে।

প্রথমত: শ্রমজীবিকে শ্রমজীবি হিসাবে টিকিয়ে রাখতে,তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণবাবদ যে খরচ, তা মোটেই কোনোক্রমে গ্রাসাচ্ছাদনের যে খরচ তার সঙ্গে এক নয়। কোনো কোনো অতি অদক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে এটা সত্যি হলেও হতে পারে, কিন্তু সাধারণভাবে এক নয়, দক্ষ শ্রমিককে দক্ষ করে তুলতে কোনোক্রমে গ্রাসাচ্ছাদনের চেয়ে অনেক বেশি খরচ লাগে। সময়ের সঙ্গে শ্রমের উৎপাদনশীলতা ক্রমশ: বাড়ে, সেই সঙ্গে বাড়ে শ্রমিকের কাজের জন্য দক্ষতার প্রয়োজন। এবং সেই দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের খরচও বাড়ে পাল্লা দিয়ে। ফলে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের খরচ ক্রমশ যে জায়গায় পৌঁছয়, তা যে কোনোক্রমে গ্রাসাচ্ছাদনের খরচের চেয়ে অনেক অনেক বেশি সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

দ্বিতীয়ত: মজুরির প্রকৃত পরিমাপ যদি একটি আপেক্ষিক বা আনুপাতিক পরিমাপই হয়,তাহলে মজুরির একটি ন্যূনতম ধ্রুবক মানের কোনো প্রশ্নই আসেনা। শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমে বাড়বে এটাই স্বাভাবিক,ফলে শ্রমিকের রিয়েল ওয়েজ ক্রমশ বাড়াটাও স্বাভাবিক। ফলে আপেক্ষিক বা আনুপাতিক হারে মজুরি আগের থেকে কমলেও ক্রমশ: কোনোক্রমে গ্রাসাচ্ছাদনের সময়ের মজুরির থেকে তা বাড়তে বাধ্য।

তৃতীয়ত: মার্কস অন্যত্র দেখিয়েছেন, যে কোনো পণ্যেরই উৎপাদন খরচ স্থান কাল নির্বিশেষে একটি ধ্রুবক নয়। প্রত্যেকটি পণ্যেরই একটি সামাজিক বা সমাজ স্বীকৃত উৎপাদন পদ্ধতি আছে, যে পদ্ধতি অনুসারে তার দাম নির্ধারিত হয়। যেমন,কোনো কামার যদি আজ সারাদিন ধরে প্রচন্ড পরিশ্রম করে কামারশালায় পিটে পিটে একখানা ছুঁচ বানিয়ে তারপর সেটাকে নিয়ে বাজারে বেচতে যায়, তাহলে সে মোটেই তার এতো পরিশ্রমের যথার্থ আর্থিক মূল্য পাবেনা। কারণ কামারশালায় পিটে ছুঁচ বানানোটা সামাজিক ভাবে স্বীকৃত উৎপাদন পদ্ধতি নয়। এর চেয়ে অনেক সহজে, অনেক কম খরচে এবং পরিমানে অনেক বেশি ছুঁচ এখন বানানো হয় কারখানায়, যে কারণে কারখানার ছুঁচ বানানোর পদ্ধতিটিই এখন সামাজিক ভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি এবং এই পদ্ধতিটি ই নির্ধারিত করে ছুঁচের দাম ঠিক কি হবে বাজারে। এখন, বেচারি কামার সারদিন পরিশ্রম করে একখানা ছুঁচ বানালেও, তাকে ঐ কারখানার পদ্ধতি নির্ধারিত দামেই ছুঁচখানিকে বেচতে হবে বাজারে।

তো, শ্রমশক্তি ও যদি একটি পণ্য হয়, তবে তারও একটি সমাজস্বীকৃত উৎপাদন পদ্ধতি থাকবে এবং সামজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। এখন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারটা বাদ দিলেও শ্রমজীবিকে স্রেফ শ্রমজীবি হিসাবে টিকিয়ে রাখতে ঠিক কতটা খরচ লাগবে, তা কিভাবে নির্ধারিত হবে? অবশ্যই তা নির্ধারিত হবে সামাজিক পটভূমিকা দ্বারা, যার মধ্যে অর্থনীতি বহির্ভূত বহু উপাদান থাকতে পারে এবং থাকবেও। অর্থনীতি বহির্ভূত বহু উপাদান, যেমন হাইজিন, যেমন চিকিৎসাশাস্ত্র, যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যেমন সামাজিক গঠন। এই মূহুর্তে প্রায় সারা পৃথিবীতে মানুষের স্রেফ টিকে থাকার খরচের মধ্যে ইলেকট্রিসিটি অন্তর্ভুক্ত, বিভিন্ন টীকাকরণ, স্যানিটেশানের ধারণাও অন্তর্ভুক্ত, আজ থেকে একশ বছর আগে যা অকল্পনীয় ছিল। এতো গেল সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন। স্থানগত পার্থক্যও কিছু কম না। আজকের দুনিয়ার আমেরিকা ভূখন্ডে এয়ারকন্ডিশানিং, ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি মানুষের স্রেফ টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান হিসাবে গণ্য হয়, ভারতের মতো তৃতীয়বিশ্বের দেশে যা অকল্পনীয়। কোনো কোনো দেশে একক মাতৃত্বের জন্য লম্বা ছুটি দেওয়া হয়, একক মাতৃত্ব যেখানে চালু নয় সেখানে তার প্রশ্নই আসেনা। হাইজিন,চিকিৎসাশাস্ত্র,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সামাজিক গঠন, অর্থনীতির সঙ্গে এদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভাবে একরকম যোগাযোগ থাকলেও, এরা কেউ ই অর্থনীতি নয় বা অর্থনীতি দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত কোনো বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্র নয়। এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব চলন আছে, এবং স্থান ও কালের পার্থক্যে এদের উপস্থিতি বিভিন্নরকম।

ফলে ন্যূনতম রিয়েল ওয়েজ বিভিন্ন স্থান ও কালে বিভিন্ন রকম। তাদের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকতে পারে ও রয়েছে। এবং এই আকাশপাতাল পার্থক্য থাকার অর্থ হল, সকল শ্রমিক শুধু কোনোক্রমে গ্রাসাচ্ছাদন করে কালাতিপাত করে, ইস্তাহারের এই প্রতিজ্ঞাটির সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়া।

ইস্তাহার

কমিউনিস্ট ইস্তাহারে আমরা প্রকৃত শ্রমিকের দুইটি চিন্‌হ দেখেছিলাম।

  ১) উৎপাদনের উপকরণ নিজেদের হাতে না থাকায় শ্রমিক বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচতে বাধ্য হয়
  ২) মজুরি হিসাবে সে/তারা যেটুকু পায় তার পরিমান শুধু এইটুকু যাতে কেবল কোনোক্রমে গ্রাসাচ্ছাদন করে এই অস্তিত্বটুকু চালিয়ে যাওয়া ও তার পুনরুৎপাদন করা চলে।

মার্কসবাদী তাত্ত্বিক শৃঙ্খলার মধ্যেই এই দুইটি চিন্‌হের দ্বিতীয়টি ভেঙে পড়ে, যদি তাকে ঠিক ভাবে জেরা করা যায়, আমরা দেখলাম। স্থান কাল নির্বিশেষে সমস্ত শ্রমিক মোটেই একরকম মজুরি পায়না, যা দিয়ে কোনো মতে গ্রাসাচ্ছাদন করা যায়। বস্তুত এই কোনোক্রমে বেঁচে থাকার ধারণাটি কোনো নির্দিষ্ট পজিটিভ অর্থই বহন করেনা। রাম ও রহিম, বিশ্বের দুই প্রান্তে থেকে একই কাজের জন্য যদি একে অপরের চেয়ে হাজার গুণ বেশি রিয়েল ওয়েজ পায়, তা হলে নেহাৎ অর্থনৈতিক মাপকাঠিতেই দুজনেই কোনোক্রমে জীবনধারণ করছে কথাটা বলার কোনো অর্থই থাকেনা।

আরও লক্ষ্যণীয় এই, যে, দ্বিতীয় চিন্‌হটি আমাদের জেরার মুখে ভেঙে পড়লেও, প্রথমটি কিন্তু অটুটই থেকে যায়। চরিত্রগত ভাবে এই দুজনের মধ্যে বেশ তফাৎ আছে। প্রথম চিন্‌হটি ওপেন এন্ডেড, যা কোনো আলোচনাকে শুরু করে বা করতে পারে, কিন্তু শেষ করেনা। কিন্তু দ্বিতীয় চিন্‌হটি সেই অসীম সম্ভাবনাময় আলোচনাকে একটি সীমাবদ্ধতায় শেষ করে দেয়। ফলে আমাদের জেরায় প্রথম চিন্‌হটি শুধু অটুট থাকে তাইইনা, যে মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ডিডাকশানগুলিকে দ্বিতীয় চিন্‌হটির বিরুদ্ধে আক্রমনে ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলি অনেকাংশেই প্রথম চিন্‌হটি থেকেই নি:সৃত। ফলে ইস্তাহারের রাজনৈতিক ডিসকোর্সে চিন্‌হদুটি একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।

ইস্তাহারের মধ্যে অবস্থান এবং গুরুত্বের প্রশ্নেও এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। ইস্তাহারে দ্বিতীয় চিন্‌হটি এসেছে মজুরি শ্রমের সরাসরি সংজ্ঞা হিসাবে, "প্রলেতারিয়েতরা ও কমিউনিস্টরা' শীর্ষক দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে। অন্যদিকে প্রথম চিন্‌হটি নেহাৎই একটি সংস্করণের পাদটীকায় স্থান পায়, মূল টেক্সটের অংশ হবার যোগ্যতা সে অর্জন করেনি। শুধু ঐ একটি জায়গায় নয়, একাধিকবার দৃঢ়ভাবে ইস্তাহার ঘোষণা করেছে দ্বিতীয় চিন্‌হটির কথা।

যেমন, "বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত' শীর্ষক প্রথম পরিচ্ছেদে ইস্তাহার জানাচ্ছে," সুতরাং একজন মজুরের উৎপাদন ব্যয়টি প্রায় একান্তই তাকে বাঁচিয়ে রাখার ও তার বংশরক্ষার পক্ষে অপরিহার্য অন্নবস্ত্রের সংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পণ্যের দাম, অতএব শ্রমেরও দাম তার উৎপাদন ব্যয়ের সমান। সুতরাং কাজের বিকর্ষণ যত বাড়ে, মজুরি তত কমে'।

স্পষ্টতই এখানে "শ্রম' বলতে "শ্রমশক্তি' বোঝানো হয়েছে। এই উদ্ধৃতিটি খুবই কৌতুহলোদ্দীপক, কারণ এটি পূর্বোল্লিখিত দ্বিতীয় চিন্‌হটির সজোর ঘোষণা হলেও, এখানে প্রথম চিন্‌হটিও উঁকি মেরেছে। "মজুরিশ্রম ও পুঁজি' তে যে যুক্তি পরম্পরা অনুসরণ করে শ্রমিকের মজুরি যে আসলে একটি আপেক্ষিক, আনুপাতিক পরিমাপ, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়েছে, এটি তারই সারসংক্ষেপ। এবং এই যুক্তিপরম্পরা, আগেই বলা হয়েছে, নি:সৃত হয় প্রথম চিন্‌হটি থেকেই। কিন্তু সারসংক্ষেপ হলেও, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা এখানে বাদ পড়ে গেছে যে "মজুরি তত কমে' বাক্যাংশটির "মজুরিশ্রম ও পুঁজি' স্বীকৃত অর্থ হল, "আনুপাতিক মজুরি তত কমে'। এই আনুপাতিক শব্দটি না থাকার ফলে প্রথম চিন্‌হটির উপস্থিতি সত্ত্বেও তা পরিণত হয়েছে দ্বিতীয় চিন্‌হটি। স্পষ্টত:ই বাক্যটি পড়ে মনে হয়, মজুরের মজুরি ক্রমশ: কমতে কমতে তলানিতে ঠেকে, সে ক্রমশ: পরিণত হয় আক্ষরিক অর্থে সর্বহারায়। আবার "সুতরাং একজন মজুরের উৎপাদন ব্যয়টি প্রায় একান্তই তাকে বাঁচিয়ে রাখার ও তার বংশরক্ষার পক্ষে অপরিহার্য অন্নবস্ত্রের সংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ' এই বাক্যটিতে "প্রায়' শব্দটি দেখুন,এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যে তা নজরে পড়েইনা। কিন্তু "প্রায়' শব্দটির মধ্যে দিয়ে যদি প্রথম চিন্‌হটি উঁকি মারে, তবে তার অর্থ বিপুল। এই প্রায়ের মধ্যেই থেকে গেছে স্থান ও কালভেদে রিয়েল ওয়েজের আকাশ পাতাল পার্থক্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত। কিন্তু এখানে বাক্যটি পড়ে মনে হয়, যে, আসলে মজুরের উৎপাদন ব্যয়টি "একান্তই তাকে বাঁচিয়ে রাখার ও তার বংশরক্ষার পক্ষে অপরিহার্য অন্নবস্ত্রের সংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ', সামান্য উনিশ বিশ থাকলেও থাকতে পারে কোনো কোনো জায়গায়, তাই আগে একটা "প্রায়' বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফলে, স্পষ্টত:ই দেখা যাচ্ছে, দুটি চিন্‌হের মধ্যে প্রাধান্যের প্রশ্নে ইস্তাহার দ্বিতীয়টিকেই বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, প্রথম চিন্‌হটি থেকে কিছু অংশ বর্জন করে এমন কৌশলে তাকে ব্যবহার করা হয়, তাকে এমন একটি অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়, যাতে প্রথম চিন্‌হটিও, মনে হয় যেন দ্বিতীয়টিকে সমর্থনই করছে। এই দুইটি চিন্‌হের মধ্যে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবার যে সম্ভাবনা, তাকে সম্পূর্ণ চাপা দেবার প্রচেষ্টা করা হয় এই কৌশলী ব্যবহারে,যাতে কোনো বিরোধ, কোনো অসঙ্গতি যেন মাথা ফুঁড়ে না বেরিয়ে আসতে পারে ইস্তাহারের রাজনৈতিক ডিসকোর্সে।

কিন্তু কেন এই প্রচেষ্টা?

রাজনীতি, ইস্তাহার ও বাধ্যবাধকতা

ইস্তাহার, তার নামের মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত, একটি রাজনৈতিক ইস্তাহার। বিশ্লেষণ নয়, তার মূল লক্ষ্য হল একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা তৈরি করা। বস্তুত: কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে লেনিনবাদী মূল ধারা, তার রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা ইস্তাহার থেকেই নি:সৃত হয়। ইস্তাহার, তার সাহিত্যিক গুণাবলীর বিশ্লেষণে অত্যন্ত সুলিখিত একটি পুস্তিকা, যার মুখবন্ধের প্রথম লাইনেই লেখা হয় যে ইউরোপ আজ কমিউনিজমের ভয়ে কাঁপছে, প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম লাইনে লেখা হয় আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাসই শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস, এবং যা শেষ হয় দুনিয়ার মজদুর এক হও এই ঘোষণায়। কিন্তু, ইস্তাহার, শেষ পর্যন্ত একটি নিছক সাহিত্যিক রচনা নয়, একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র, তার কিছু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে। এই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই ইস্তাহারকে প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম লাইন থেকে শেষ পরিচ্ছেদের এই শেষ লাইন পর্যন্ত বজায় রাখতে হয় একটি যৌক্তিক কন্টিনিউটি, এবং এই সরলরৈখিক যুক্তিপদ্ধতির মধ্যে মূর্তিমান প্রশ্নচিন্‌হ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যে খোঁচসমূহ, তাদেরকে আড়াল করে ফেলতে হয়। সকল ইতিহাসই শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস, এই সূচনাবিন্দু থেকে শুরু করে, ইস্তাহার দেখায়, আজকের দুনিয়া ক্রমেই দুটি স্পষ্ট বিভাজনে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিক ও পুঁজিপতি, এবং আসন্ন সমাজ পরিবর্তনের চিত্রনাট্যে শ্রমিক শ্রেণীকেই দেওয়া হয় নায়কের ভূমিকা।

ঠিক এই জায়গা থেকেই, শ্রমিক শ্রেণীকে চিত্রনাট্যের নায়ক বানানোর বাধ্যবাধকতা নিয়ে চলা শুরু করতে হয় ইস্তাহারকে। ফলে শ্রমিক শ্রেণী নামক নির্মানটিকে একটি শক্তপোক্ত যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে গেঁথে ফেলারও প্রয়োজন আসে। পৃথিবীর সমস্ত শ্রমিক একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে বিদ্যমান না হলে দুনিয়ার মজদুর এক হও স্লোগানটাই যে ফাঁকা জমিতে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে ইস্তাহারকে প্রমাণ করতে হয়, স্থান ও কাল নির্বিশেষে বিশ্বের প্রতিটি শ্রমিকের মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা বিদ্যমান, কারণ তাদের মধ্যে আছে সাম্যের একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি। বিশ্বের সকল শ্রমিকই একই রকম দু:খী, তাদের জীবনযাত্রার মান একই তলানিতে এসে ঠেকেছে, বিশ্বের প্রতিটি শ্রমিকই সর্বহারা, যাদের শেকল ছাড়া আর কোনো কিছুই হারাবার নেই। শুধু তাই নয়, শ্রমিকে শ্রমিকে এই যে সাম্য, এখান থেকেই সাম্যবাদী সমাজের সুখস্বপ্ন তার যাত্রা শুরু করে, যে সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে থেকেছে পরবর্তী প্রতিটি মূলধারার মার্কসবাদী ডিসকোর্সই।

ফলে বোঝা যাচ্ছে, ইস্তাহারের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডায়, সর্বহারা শ্রমিক, এই ধারণাটি, যাকে আমরা দ্বিতীয় চিন্‌হ বলছি, সেটি কি পরিমান গুরুত্বপূর্ণ। মার্কসবাদের কয়েকটি অন্তিম প্রতিপাদ্য সরাসরি নির্ভর করে আছে এই চিন্‌হের উপরে, ফলে দ্বিতীয় চিন্‌হটি যে প্রথমটির উপর অধিক গুরুত্ব পাবে সে নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। কারণ এখানে প্রথম চিন্‌হটিকে দুম করে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডায় এনে ফেললে, অনেক কিছুই গুলিয়ে যেতে পারে। বস্তুত: উৎপাদনের উপকরণ নিজেদের হাতে না থাকায় কেউ বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচতে বাধ্য হচ্ছে কিনা, শুধু এইটুকুকেই যদি শ্রমিকের মানদন্ড হিসাবে ধরা যায়, তাহলে অনেক কিছুই লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবি হিসাবে যাদেরকে ধরা হয়, তাদের প্রত্যেককেই শ্রমিকের স্বীকৃতি দিতে হবে, এবং "সর্বহারা শ্রমিক' নামক নির্মানটি ভেঙে পড়বে। গৃহবধূ নারীর শ্রম, যৌনকর্মীদের দেহ ভাড়া দেওয়া, এইসব ও ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়তে পারে শ্রমিকের এলাকাতে,মূলধারার মার্কসবাদ যে ঝুঁকি কখনই নিতে পারেনা। মার্কসবাদী রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার সর্বশেষ এবং অন্তিম লক্ষ্য হল সাম্য, পুঁজিবাদী সমাজে যে সাম্যের বাস্তব ভিত্তি রচিত হয় শ্রমিক শ্রেণীর আভ্যন্তরীন সাম্যের মধ্য দিয়ে।

ইস্তাহারকে এই রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে সম্মান দিতে হয়। প্রতিটি শ্রমিক একে অপরের সমান না হলে দুনিয়ার মজদুর কখনও এক হতে পারেনা। আমেরিকার শ্রমিক এয়ারকন্ডিশানিং এ আর ভারতের শ্রমিক প্যাচপ্যাচে গরমে ধূলো আর নোংরার মধ্যে ঠাসাঠাসি করে কাঁচা নর্দমার পাশে একঘরে সাতজন বসবাস করলে এই দুই শ্রমিক কখনও একে অপরের সঙ্গে সমান হতে পারেনা, তাদের ঐক্যের বাস্তব ভিত্তি বলতেও কিছু থাকেনা। তাই রাজনৈতিক কারণে ইস্তাহার শ্রমিকের ওপেন এন্ডেড সংজ্ঞাকে ছোটো করে ছেঁটে আনে "সর্বহারা শ্রমিক' নামক এক নির্মানের মধ্যে। এই শ্রমিক এক বিশুদ্ধ রাজনৈতিক নির্মান, কোনো বাস্তব বস্তু নয়। ইস্তাহারের মধ্যেই তাই রচিত হয় এক শ্রেণীবিভাজন, এক হায়ারার্কি, যেখানে অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিশ্লেষণের উপরে জায়গা পায় রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা, রাজনৈতিক আশাবাদ প্রয়োজন মত কেটে ছেঁটে নেয় অর্থনীতির "আধুনিক বৈজ্ঞানিক' বিশ্লেষণ পদ্ধতিকে।

তাই, মার্কসবাদী রাজনীতি, তা প্রাসঙ্গিক হোক বা অপ্রাসঙ্গিক, কোনো তথাকথিত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর উপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং তা নিছক নিজের রাজনীতির প্রয়োজনানুপাতে তৈরী করে নেয় নিজেরই বিজ্ঞানকে।