আপনার মতামত         


ভবিষ্যপুরাণ
রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রণম্য পাঠক, এই মুহূর্তে আপনি বাহিরে আসিলেন, মোবাইল বোতামে মৃদু চাপ দিলেন, ভূগর্ভ হইতে কামোদ্দীপক আশ্চর্য স্লিক শকট অনুগত ভৃত্যের মত আপনার সম্মুখে গরুড়সদৃশ করজোড় ভঙ্গিতে একরূপ উদয় হইল বলিয়া-- এই সমস্তই আমি জ্ঞাত আছি। আপনার জিহ্বা নাচিতেছে প্রশ্ন করিবার নিমিত্ত, অজস্র প্রশ্নে সজ্জিত আপনার যোদ্ধ্বৃবেশ-- ইহাও আমি বিলক্ষণ অবগত। তবে, এখনকারটি হইল, "কে বে তুই?' অর্থাৎ, আমি কে? বলিবার কথা, এই প্রশ্নটি এক অনন্তকে টানিয়া আনে এবং মনুষ্য প্রজাতিকে নানাভাবে বিড়ম্বিত করে। তদুপরি, আপনার যুগ- সময়ের নিকট খোয়া গিয়াছে। কল্পনা করুন, ভূত। আজ যদি কিংবা দিবাস্বপ্ন ভাবিলে অধিক সুবিধা হয়। দৈববাণী নহে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নহে, অথচ, আপনি শুনিতে পাইলেন; আমার প্রণাম গ্রহণ পর্যন্ত করিলেন; এই পরিস্থিতি উদ্ভটত্ব- সহ এক অপ্রমাদ বলিয়াই মানিতে হইবে। অন্যথায়, সিটি সেন্টারের প্রশØত কম উচ্চতার সিঁড়িই বা ভাঙিবেন কীরূপে। সুতরাং নিরাবয়ব হইলেও আমার প্রস্তাবটি বিবেচনা করুন, সম্মতি প্রদান করুন। কেননা, ভাবিয়া দেখুন মায়া-র স্বভাবই এই, ইহার স্বরূপ নির্ণয় এক নিদারুণ কঠিন কাজ, যেহেতু আপনার যুগ-সময়ে এই কথা গ্রাহ্য হইয়াছে যে, অসম্ভব বলিয়া কিছু নাই, সাইবার প্রকৌশলে সমস্তই সম্ভব এবং এইরূপ ফতোয়ার দরুন যে নিহত হইল তাহর নাম -- অসম্ভব। আমার স্বাধীকারপ্রমত্ততা মার্জনা করিবেন, যদি ক্ষমা নামের গুণটি এখন দোষে পর্যবসিত হইয়া থাকে, তাহা হইলে কালবিহীন জীবনে আমাকে দন্ডিতও করিতে পারেন। মায়ার কথা বলিতেছিলাম, ইহা তিন প্রকার, তুচ্ছ, অনির্বচনীয়, বাস্তবী। এই তিন রূপের পশ্চাতে থাকিয়া গেল তিনটি দৃষ্টিকোণ, শেষের রূপটি যেমন লৌকিক দৃষ্টিতেই সম্ভব।

বকোয়াজি, বাকতাল্লা বা বাত্তেল্লা, বাতেলা যা-ই বলুন না কেন, তাহারও এক সহনমাত্রা আছে; নেশার চরিত্র ও দ্রব্য এমনই পাল্টাইয়াছে যে গাঁজাখুরি গল্পের দিন গিয়াছে। তাহা না হইলে অযথা এত ভ্যাজভ্যাজ করিবার আবশ্যক হইত না। নেশা বর্তমানে দুইটিতে আসিয়া ঠেকিয়াছে, ভোগ এবং ক্ষমতা। ছাপ্পান্নভোগ এবং ক্ষমতার এক আশ্চর্য লীলাময় রূপ অতীত প্রত্যক্ষ করিয়াছে। আমার বয়েসের গাছপাথর নাই বলিয়া প্রসঙ্গে অধিষ্ঠান করা সর্বদা সম্ভব হয় না, কেহ কেহ ইহাকে ভীমরতি বলেন গাল পাড়িয়া, আমি অবশ্য তাহাতে আহ্লাদিত; কারণ ভীম আছেন রতি-ও ছাড়িয়া যান নাই। যাহা হউক, ক্ষমতা ও শক্তির মধ্যে কোন ভেদজ্ঞান আপনারা রাখেন না, এই প্রসঙ্গে কালক্ষেপ করিব না। অসম্ভবই অভিনবের গর্ভে ধরিলে এবং কী প্রকারে অভিনবের সৃষ্টি সম্ভব করা যায়, সেই সব প্রকারের জ্ঞান এবং প্রয়োগ নৈপুণ্য শাস্ত্রে শক্তি বলিয়া কথিত। আবার লোকত্তর আহ্লাদ বা চমৎকার সৃজনেই এই শক্তি প্রকাশিত হয়। শ্রদ্ধেয় পাঠক, আপনার দৃষ্টি, মুখমন্ডলের সুতার মত ভাসমান কৌতুক এবং নানা ভাব দেখিতে পাইতেছি। যাহার মধ্যে এই কথাটিও উত্তমরূপে মুদ্রিত "শালা জ্ঞান মারাচ্ছে'। বুঝিলাম ইশারাই ভাষা, আপনি বলিতে চাহিতেছেন, "বুঝেছিরে বাপ, সাহিত্য -ফাহিত্য নিয়ে হ্যাজাতে চাইছিস।' এইখানে আমি গুটিকয় ফুল আপনর পায়ে অর্পণ করি এবং বলি, ঐরূপ শক্তি হইতে আমি বঞ্চিত, আপনি ভুল করিয়াও উহা প্রত্যাশা করিবেন না। বিশেষত যখন আপনি সিটি সেন্টার নামক শীতল-বিপুল-বিপণিতে প্রমোদভ্রমণ সমাপ্তে অপ্রয়োজনীয়, আকর্ষণীয় পণ্য-সম্ভারে পূর্ণ ট্রলি ঠেলিয়া এখন বাহান্ন তলায় হাজার স্কো.ফি.-এ (এত শূন্যে তল-নির্মাণ এক আশ্চর্যই বটে; সেইখানে আপনি এমনকি শূন্য-উদ্যানও ডিসকাউন্ট হিসাবে লাভ করিয়াছেন।)। আমার নিবেদনটি শুনিয়া সম্মতি প্রদান করিলে আপনার অর্থ কিংবা সময় কোনকিছুরই ক্ষতি হইবে না। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি এমন কোন কর্মে আপনার সম্মতি মিলিবে না যাহাতে প্রফিটের নাম গন্ধ নাই। যেমন অদ্য প্রভূত সেল, অফার, ডিসকাউন্ট ছিল বলিয়াই আপনার ক্রয়কাম লাফাইয়া উঠিল এবং এই সব বিষয়ে সিদ্ধ্বান্ত গ্রহণে মস্তিস্কের ভূমিকা গৌণ, শরীরই রোমাঞ্চিত হইয়া, ঢেউ তুলিয়া বলে, " চল, চল, কিনি, চল কিনি, সময় নাই, এখুনি, সেরা সস্তার দ্রব্য অন্যে যদি কিনিয়া লয়, তাহা হইলে তুমি হারিলে। ভাবিতে পারিতেছ হার! পরাজয়!'

আপনার জীবনচর্চায় এহেন ভোগীর অধিষ্ঠান সম্পর্কিত বাজার সংস্কৃতির যে তত্ত্বাদি বিদ্যমান তদ্বিষয়ে কোনরূপ আপত্তি, প্রশ্ন, সমালোচনা, বা আপনাদের ভাষায় "ক্রিটিক' উপস্থাপনা আমার লক্ষ্য নহে। অতএব কোনরূপ পূর্ব মীমাংসা, উত্তর মীমাংসা, প্যাঁচ-পয়জার, আগম, নিগম, প্রস্থান ইত্যাদি স্থান পাইবে না। এতদ্ব্যতীত, চিন্তার এই সনাতনী কাঠামোর তক্তা সমূহ গঙ্গার পিটুলি জলে মৃত কুকুরের ন্যায় ঢোল হইয়া ফুলিয়া যে রাঙামুখো মেকলের আমলেই ভাসিয়া গিয়াছে তাহা এখন সর্বজনবিদিত। আমাদিগগের বিচারে প্রলয় অসিদ্ধ নহে। বিচ্ছেদও তদ্রুপ।

বস্তুত, দু:খনাগের বিষময় নি:শ্বাসে প্রতিমুহূর্তে দগ্ধ যে জগত, সেই জগত করুণাময় ইশ্বরসৃশ-ইহা সম্ভবই নহে। তথাপি এই বিষয়ে চুলচেরা, সুক্ষ, অতি সুক্ষ, তর্ক কম হয় নাই। সেই সমস্ত বিবেচনা, তর্কের পর্বত অপসারন করিল, ত্রিবর্গের সমন্বয় সাধন করিল যে, সমস্ত শিকল ভাঙিল যে, মুক্তির বন্যা আনিল যে, তাহাকে, বাজারকে আমার শতকোটি প্রণাম।

পাঠক, অতএব ক্রোধ সম্বরণ করুন। আপনার অতিপ্রিয় বাজার সত্বাকে বিন্দুমাত্র আঘাত করা, তাকে নিন্দামন্দ করা দশপ্রাণে ভোগস্পৃহাকে মহৎ মনে না করা ইত্যাদির সঙ্গে আমি নিজেকে বিন্দুমাত্র জড়াইব না। উহা পরিবেশবাদী কর্মসূচি, তাহাদের আদর্শ মানিলে তো পুনরায় নেংটি সম্বল হইব।যেরূপ জোত জুড়িয়া, মোবিল পুড়াইয়া শতেক বিঘা কর্ষণ, বিষকে অমৃত জ্ঞানে ব্যবহারের দরুন ফসল উৎসব, সেই সব সাফল্য মুহূর্তে মিলাইবে। না, ফিরিবার রাস্তা রাখি নাই। তদপেক্ষা বড় কথা ফিরিবই-বা কেন?

আত্মকথন বয়সের দোষ, এই দোষের মূল-ও মায়া। শরীর অশক্ত, ইন্দ্রিয় এখন সুখের মুখ নহে, দু:খের উৎস। মরিব নির্ঘাত, কিন্তু ভুলি কেমনে...

স্বাধীন ভারতে আমার বালক জীবন শুরু, জন্মসাল নির্ভুল বলিতে পারি, ১৯৩৭। সদ্য যুবক যখন, অর্থাৎ ১৯৬০-৬২সাল দেখিলাম দেশে গোলযোগের অন্ত নাই, সর্বত্র বিক্ষোভ ফুটিতেছে। বাঙাল সমস্যায় তো জর্জরিত, গোদের উপর বিষফোঁড়া কমিউনিষ্টদের প্রলয় নৃত্য। আমর জ্যাঠামশাই অবশ্য তখনই মুখমন্ডল বিকৃত করিয়া বলিয়াছিলেন, " গরুখেগো, মোছলমানদের সঙ্গে পোদ-ঘষা এই শালারা একদিন আমাদের মাথায় হাগবে, ব্যাটারা রাজা হওয়ার খোয়াব দেখে।'

ধীমান পাঠক, আপনি সহজেই অনুমান করিতে পারিতেছেন, বাস্তবতার যে বহুতল, তাহারই কোনো একটি নিরাপদ গৃহস্থ কোণে আমরা বাঁচিতাম। কথাটি বড়ই সরল হইল, বলা উচিত, এই খোপ বা রেশমগুটির মধ্যে দ হইয়া থাকিয়া কবে উড়িব, ডানা মেলিব তাহারই অপেক্ষায় ছিলাম।

এরূপ সমাজ-পরিবেশে জন্মিলে যাহা অবধারিত আমার ক্ষেত্রে তাহার যে কোনোরূপ ব্যতিক্রম ঘটিবে এরূপ দূরাশা ছিল না। এক, আমি পড়া মুখস্থ করিয়া, নির্ভুল বমন করিয়া কালে সরকারী অফিসার পদ অলঙ্কৃত করিতে পারিতাম। পদমাহাত্ম্যে উৎকোচের পর উৎকোচে ভাসিয়া যাওয়া অসম্ভব ছিল না। এইরূপে মধ্যবিত্ত গৃহস্থের সাধ্যাতীত বিত্তমল হাসিল করা এবং তদ্বারা নির্মিত দাপটের সিংহাসনে গ্যাঁট হইয়া বসিয়া থাকিতে পারিতাম। কর্মের মধ্যে কর্ম হইত কেবল সহি করা, টিক মারা। এই পথটি আমাকে যৎপরোনাস্তি হতাশ, বিরক্ত এবং এক প্রকার শূন্যতাবোধে মুড়িয়া ফেলিবে বিবেচনায় ঐদিক মাড়াই নাই। দ্বিতীয় পথ হইল এই নারকীয়, অসুন্দর ও প্রমাদের বিরুদ্ধ্বে অস্ত্রধারণ, বীরের ভূমিকা পালন, কমিউনিষ্ট হওয়া। সত্য বলিতে কি অতখানি সাহস, অবিচল বিশ্বাস এবং সকলকে পথ দেখাইবার গুরুভার গ্রহণের সাধ্য, শক্তি কোনোটাই আমার ছিল না।

আমি বাংলা ধরিলাম, গাঁজা পুড়াইলাম, ভুলিতে চাহিলাম এবং লোকে যাহাকে বলে উচ্ছন্নে যাওয়া সেইদিকে বিনা যত্নে গড়াইয়া চলিলাম, রামবাগানে এক বেশ্যাকে তো আমার অবিকল রাধা বলিয়া বিশ্বাস হইয়াছিল-- জয় রাধে!

মেঘের সঙ্গে চান্দের ভালাই কতকাল রয়।।
ক্ষণে দেখি অন্ধকার ক্ষণেকে উদয়।।

সুতরাং, ফিরিতে হইল ললাটলিপিবৎ। আপনি চঞ্চল হইতেছেন, বিরক্ত বোধ করিতেছেন, আপনার ভদ্রতায় টান পড়িতেছে। বিলক্ষণ বুঝিলাম। একদা যাহা কেচ্ছা হিসাবে গৃহীত হইত, ব্যভিচার বিবেচিত হইত, সেইসব ঘটনা ও বৃত্তান্ত এক্ষণে বিবর্ণ। স্বাধীনতা বস্তুটি এতদূর বিস্তৃত হইল যে একদা যাহা কেচ্ছা হিসাবে গৃহীত হইত, ব্যভিচার বিবেচিত হইত, সেইসব ঘটনা ও বৃত্তান্ত এক্ষণে বিবর্ণ। স্বাধীনতা বস্তুটি এতদূর বিস্তৃত হইল যে, স্বেচ্ছাচার, যাহা ইচ্ছা করা দোষ নয়, গুণও নয়, সে-সকলই নির্গুণ বিবেচিত হওয়ায় এই তল্লাটের কোথাও নাটকীয় বলিয়া কিছুই নাই; ব্যপার এতদূর গড়ইয়াছে যে শকথেরাপি পর্যন্ত অকেজো। যেজন্য, ফিরিয়া আসিলাম, বা ফিরিতে হইল বলায় পর্যন্ত আপনি কোনরূপ টেনশন অনুভব করিলেন না। পশ্চাৎপদতা, সংস্কার, মোহ, বাধ্যবাধকতা ছাড়াইয়া আমরা বহুদূর আসিয়া পড়িয়াছি। মনুষ্যজাতির শৈশব, বালক এবং সদ্য যৌবন অবস্থা তো কবেই অপসারিত।

হ্যাঁ, সত্য বটে।

যথার্থই, নষ্টালজিয়া ব্যাধিটিকে নির্মূল করিতে গণ-টিকাকরণ কর্মসূচির দশম বর্ষ পূর্তি উৎসব সম্প্রতি পালিত হইয়াছে। বিগত দশ বৎসরের অভিজ্ঞতার সারমর্ম এই; নষ্টালজিয়া মানে অতীত-বন্দি, অতীতের একখানি ষ্টিল ফটো ফ্রেমে বাঁধাইয়া বুকে করিয়া বসিয়া থাকা। যেমনটি এককালের ভিক্ষুকদের ভেক ছিল। রাধাকৃষ্ণ, ন্যাংটো কালী বা হনুমানের ফটো বুকে ঝুলাইয়া ভিক্ষা করিত। অতীত আদতে ওইরূপই, সে দুই হাত প্রসারিত করিয়া, বর্তমানের সামনে নতজানু হইয়া ভিক্ষা চাহিতেছে।

"ভ্যানতারা থামা' আপনি বলিতে চান, "অত হ্যাজানোর টাইম নেই', বলিতে চান "নাইট আউট করে প্রেজেন্টেশন কমপ্লিট করতে হবে'; শুকনো মুখে আরো বলিলেন "প্রজেক্ট অ্যাকসেপ্টেড না হলে গাড্ডায় পড়ে যাবো'।

শেষ করিলেন এই বলিয়া: "চটপট অফারটা বলে ফেলুন।'

অতীত উচ্ছেদের পর এই পরিস্থিতি, যাহা আপনাকে পূর্বরূপে নির্মাণ করিয়াছে। নবনির্মাণ হেতু আপনি আগের সহিত পরের তুলনা, নির্বাচন ইত্যাদি ভুলিলেন। সমুখ ব্যতীত কিছুই আর দেখিতে পান না। সমুখ অনিশ্চয়কে মহান করিল, নতুনের উর্বরতম গর্ভে পরিণত করিল; ফলে আপনি হর্ষ ও বিষাদের ভেদ ভুলিলেন, উৎপাদন ও সৃষ্টির মধ্যে কোনো তফাৎ করিলেন না, আনন্দ ছাড়িয়া চাহিদাকে কোলে তুলিলেন এবং স্বয়ং হাতিয়ার মাত্র হইলেন।

অধৈর্য হইবেন না, অফার বা প্রস্তাবটি আমি অবশ্যই প্রকাশ করিব। আপনাদের এই মহা বিপণিতীর্থে আমি বিগত এক সপ্তাহব্যাপী অন্নজলহীন অবস্থায় প্রতীক্ষা করিতেছি। ইতিপূর্বে অন্ততপক্ষে একশত ছাপ্পান্ন জনের কাছে আমি প্রস্তাবটি পেশ করিবার জন্যে প্রভূত যত্ন করিয়াও ব্যর্থ হইয়াছি। একমাত্র আপনার সঙ্গেই কথা এত দূর গড়াইতে পারিল। প্রত্যাশা এই যে, এ-বারের প্রয়াস নিষ্ফলা হইবে না। ইহার ভিতর একটি গুহ্য কথা আছে, আমি যাহা দর্শন ও শ্রবণ গোচর করাইতে চাহিতেছি, সেই পর্যন্ত পৌঁছিবার ধাত সকলের নাই। পরিবর্তনের যে বিপুল উদযোগ নবীন নীতি ও প্রকৌশল আশ্রয় করিয়া এই ভূখন্ডে প্রযুক্ত হইল তাহা এমন এক সর্বাত্মক বিপ্লব সম্পন করিয়াছে যে ঐরূপ ধাতের মানুষের সাক্ষাৎলাভ অসম্ভবই মনে হয়। বিবর্তন হইলে কথা ছিল, তাহাতে প্রাচীন বৃক্ষে নবপত্র ঝকঝক করতে থাকে, সেই বৃক্ষকোটরে অজগরের নিদ্রা, ডালে পক্ষীকুলের গীত সহজ এবং সম্ভব।

অত কথা সম্ভবত আর আবশ্যক দেখি না। আধার পাঠক হিসাবে পাঠক আপনাকে যথার্থ মনে হইতেছে। কাজের কথায় আসিব, তাহার আগে নিবেদন এই যে আমার বাচাল-স্বভাব মার্জনা করুন। আপনি আয়ুক্ষয় করিলেন, জীবনের খন্ড খন্ড অংশ মাংসের টুকরার মত উৎসর্গ করিলেন বৃদ্ধের প্রলাম শুনিতে।

তাই আপনাকে বন্দনা করি অগ্রে। সময় সম্পর্কিত যত উদ্বেগ, হাহাকার বিদ্যমান,সে-সমস্তই পরিত্যাগ করুন। এই বর্জন আপনাকে স্নিগ্ধতায় পূর্ণ করিবে, আপনি প্রবাহ বুঝিবেন। এখুনি করিতে হইবে, আর সময় নাই, সময় বহিয়া যাইতেছে , বা, সময় হয় নাই ইত্যকার ভাবনাপত্র আপনি খসিয়া পড়িতেছেন, মৃত পত্রের পতনের শব্দ পর্যন্ত শুনিতেছেন। যথার্থ কিনা?

দৃশ্য এবং অদৃশ্যের ভেদও ঘুচিবে অচিরেই; তাহারা পরস্পরের সহিত সাক্ষাৎ, আলিঙ্গন করিল বলিয়া।এজন্য স্মৃতি-শোধন আবশ্যক।আপনি হয়তো ভাবিতেছেন (কারণ আপনার কপালে দু-তিনটি রেখার ফুটিয়া ওঠা রীতিমত প্রত্যক্ষ করিতেছি), কোনো উন্মাদের কবলে পড়িলাম, কিংবা উচাটন, বশীকরণে সিদ্ধ তান্ত্রিকও হইতে পারে, বা তন্ত্রমার্গের এক উচ্চস্তরের সাধক, যেজন্য স্বর ভিন্ন তার অস্তিত্ব নাই। অথচ স্বরযন্ত্র, তথা ব্যক্তিটি নিজের সম্পর্কে জতটুকু বলিল তাহাতেও ঐরূপ সম্ভাবনা দেখি না।

আপনার সন্দেহ নিরসনে এইটুকু প্রকাশ থাউক যে যাহাকে আপনারা মেইনষ্ট্রিম বলিয়া জানেন, সেইখানে গুঁতাগুতি করিয়া বাঁচিবার ক্ষমতা, উপায় ও মনোভাব কিছুই আমার ছিল না। ফলে, ব্যবধান বাড়িল। বাস্তব হাস্যকর ঠেকিতে লাগিল, পতিত, পরিত্যাজ্য, অর্থহীনের যে লাশ এই বাস্তব গাদা করে, সেইখানে আমার ঠাঁই হইল। ইহা কিছুটা বাধ্যতামূলক, কিছুটা আমারই নির্বাচনও বটে। ধর্ম-অর্থ-কামের ত্রিবর্গ বর্জিত এক মাংসপিন্ড বলিয়া আমাকে যদি বিবেচনা করেন, আপত্তি করিব না। কিন্তু তাহা চুড়ান্ত নহে;শেষ এবং শুরু-র হদিশহারা হওয়াতে আমার চক্ষু ফুটিল। বাইরের আমি যতই জব্দ, যতই নাস্তানাবুদ হইতে লাগিল, ততই অনুভব করিলাম, পুংলিঙ্গধারী হওয়া সত্বেও আমার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে, আমি জন্ম দিতে চলিয়াছি, আমি স্বয়ম্ভু হইব, ইহাতে সন্দেহ নাই।

কথন দুর্বোধ্যতার দিকে গড়াইতেছে, অন্ততপক্ষে দুরূহতার দিকে তো বটেই; খরোষ্ঠী লিপি যে তাহাও তো নয়, সেক্ষেত্রে ভুর্জপত্রের স্তুপ ঠেলিয়া কোনো না কোনো পন্ডিত খাড়া হইয়া বলিতেন, ইহার মর্ম আমি প্রকাশ করিব। ইহা আদতেই অসেতুবন্ধ্য নহে।

স্মৃতি-শোধন প্রসঙ্গেই বরং ফেরা যাক। বালকেও জ্ঞাত যে, বাস্তব ঘাঁটিয়া, ছানিয়া এমনকী তাহাতে হারাইয়া নানা ঘটনা ও বস্তুর কথা মনে খোদাই হইয়া যায়, সেইসব খোদাই, চিহ্নের সহিত মায়াময় কিংবা দু:সহ সম্পর্ক পর্যন্ত গড়িয়া ওঠে, তাহারা মগজ অধিকার করে। আশ্চর্যের কথা ওই বাস্তব শৈশবাবধি আমাকে আপনাকে পীড়ন করিয়াছে। নিজের আহার্য্য হিসাবে প্রস্তুত করিয়াছে, ভাজিয়াছে, ভাঙিয়াছে, ছাঁচে ফেলিয়াছে, আমাদের যার-যার নিজস্বতাকে, বৈচিত্রকে পুড়াইয়া খাক করিয়াছে। আমরা শরণার্থী হইয়াছি। তখন সে কী উল্লাস! কী করুণা! ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের সে কী এলাহি কারবার!

এ সকলই যৌন লাঞ্ছনা, ধর্ষণ, এবং বুলেট নিক্ষেপ, এ সকলই আপনাকে ভিন্ন রূপে গড়িতে চাওয়া, আপনার মঙ্গল সাধনের জন্যে গ্রহব্যাপী এক পুনর্গঠন; যখন সবুজের ছদ্মবেশে, স্পষ্ট করিয়া বলিলে সবুজ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষপুটে ক্ষুধাকে অতীতে ঠেলিবার জয়ধ্বনি উঠিয়াছিল, জলজীব আমাদের নির্জলা করিবার, বীজহীন করিবার, খনন-ধর্ষণে রক্তাক্ত করিবার সেই সব ক্ষণকে মুর্খের ন্যায়, স্মৃতিরহিত, রক্তমাংস নির্মিত নির্জীব বস্তুর ন্যায় স্বাগত জানাইয়াছি, জয়ধ্বনি দিয়াছি... এই প্রকার করজোড়ে বিগলিতভাবে অতীতেও কতবারই কতবারই না ডুবিয়াছি! এসকলেরই সম্মিলিত ফল যৌথ- মানবাধিকার।

এখন শুশ্রুষা প্রয়োজন।

এখন কে কাহার শুশ্রুষা করে!

কাহিনী অতি প্রাচীন, অন্তত তাহার সারবস্তু তো বটেই। একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট হইবে। জ্যা-বদ্ধ তীর

যেদিন মুক্ত হইয়া ছুটিল, সেইদিনই কি তাহার বুলেট হওয়ার পথটি প্রশস্ত হয় নাই। আপন অন্তরের দিকে দৃষ্টি দিলে কী দেখি আমরা? সেইখানে প্রিয়-অপ্রিয়, কাঙ্খিত-ভয়প্রদ, আদর ও ঘৃণা, আগমন-প্রস্থান, স্বাধীনতা-আধিপত্য সমস্তই এক আলো-আঁধারিতে ডুবিতেছে, জাগিতেছে। এই ভাসিয়া উঠিল তো এই ডুবিল।

বৃত্তির কথা উঠিবেই, কারণ এখন ইহারই মূল ধরিয়া টানাটানি চলিতেছে, এমনই যে চাষাভুষা মানুষ দিশেহারা, তাহার, তাহাদের বৃত্তিকুশলতার আর কোনরূপ মূল্যই রহিল না। অথচ, দেখুন, বৃত্তি কী! সে অনেক কথা, সহস্র বৎসরের সাধনার কথা, যাহা জলাঞ্জলী দিব বলিয়া বহুকাল আগেই আমরা কৃতসংকল্প হইয়াছি।

যদ্বারা পরার্থ অভিমুখে যাত্রা করা সম্ভব, যাহার সাহায্যে পরার্থ অভিহিত হয়, তাহারই নাম বৃত্তি। সুকুমার বৃত্তি কথাটি আপনি বিস্মৃত হন নাই।

দুর্লক্ষ্যচিহ্না মহতাং হি বৃত্তি। ভারতী বৃত্তি। চিত্তবৃত্তি। বিনয়-বারিতবৃত্তি। এবং জীবিকোপায় তো বটেই। টীকাকার রঘুনাথকে বৃত্তিকার বলিয়া অভিহিত করিয়াছি। আরো বলিব, শুনুন, বৃত্তির অর্থ জ্ঞাপন করে যে বাক্য সাধ করিয়া তাহার নাম রাখিয়াছি বিগ্রহ। লৌকিক ও অলৌকিক বিগ্রহের প্রসঙ্গ না হয় ছাড়িয়াই দিলাম।

সার্ভিস, প্রফেশন ইত্যাদি রাঙামুখোরা তোতা-পড়া করাইল, এবং এমনকী তাহাতেও সম্পূর্ণ ডুবিলাম না। যে কারণে আমাদের নিকটতম পূর্বপুরুষ উনিশ শতকের বহু বঙ্গসন্তানের তুলনায় আমরা আজো বামনবৎ। তাঁহাদের মধ্যে প্রণম্যরা চাকুরি গ্রহণ করিলেও বৃত্তি ভুলেন নাই। অবশ্য হইতে পারে তদবধি একটিই সাধারণ নিয়মের, দুরন্ত গতির বশীভূত হইয়া, পেশাদার নামের এক নতুন চাকর সম্প্রদায়ে দেশটিকে পরিপূর্ণ করিবার মহাযজ্ঞেরও সূচনা ঘটিল। ভাবিলাম, অহো! ইহাতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কী অভিনবরূপেই খেলিয়া উঠিল।

হইতে পারে এ সকল কথা আপনর বড়োই ন্যাকান্যাকা লাগিতেছে। তথাপি, অর্কুট আশ্রিত আপনার সাইবার কমিউনিটির কেহই যেহেতু এইভাবে দেখে নাই, বলে নাই, আপনর কান তাই এই প্রাচীনে এক নতুন পাওয়ায় উদগ্রীবও বটে। অন্যথায় ইতিহাসের নির্দিষ্ট পথ আপনার অজানা নহে। ইনষ্টিটিউশন, অকাদেমি সম্পর্কেও বিলক্ষণ জ্ঞাত আছেন, বডি-শপিং ও সেজ-মজুর দেখিবার পর কর্পোরেট সাম্রাজ্যে নবতম দাস অনিবার্য জানিয়াও বৃত্তি প্রসঙ্গে কথাগুলি ভালো লাগিয়াছে যে বলিলেন, তাহাতে আমি ধন্য বোধ করিতেছি। আশা এখনো শুকাইয় অদগ্ধ তৃণ হয় নাই। আমি আপনকে চিনিলাম; কত- না চর্চা, কত সহস্র বৎসরের অভিজ্ঞতা আপনার মধ্যে ঘুমাইয়া আছে।

ইহাই কি কাহিনী নহে! মহাভারত তথা ইতিহাস নহে। জাতি গঠনের মানসে বঙ্কিম যে বলিলেন, কে লিখিবে বাঙালির ইতিহাস, কেন আপনি লিখিবেন, আমি লিখিব, সকলে লিখিবে। মিল কি পাইতেছেন না। সেই এক জিগির, আইস আমরা নতুন ইতিহাস লিখি।

আপনাকে মিনতি করি, আজ আমাকে বলিতে দিন,অনুগ্রহ করিয়া, নিরাবয়ব এই কন্ঠস্বরের প্রতি করুণা করিয়া শুনুন। ইহাতে লাভ না হউক আপনার কোনরূপ ক্ষতি হইবে না। কাল বিপর্যয়ে আপনি সকলই ভুলিয়াছেন, এই কথা, আপনারই আত্মকথা তাহা অবধি বুঝিতে পারিতেছেন না। মনে করিতেছেন যেন বহুদূর অতীত হইতে এই সকল শব্দ ভাসিয়া আসিতেছে। বিরক্ত বোধ করিতেছেন, কেননা আপনর জীবনের সহিত ইত্যকার কথার কোনো সম্পর্কই অনুভব করিতে পারিতেছেন না। বিস্মৃত হইয়াছেন যে, আপনি এক অতি প্রাচীন অশ্বত্থবৃক্ষ। আপনার শাখা ও কোটরে, পত্রপল্লবে, কুসুমে, ফলে, শিকড়ে, মৃত্তিকায়, কোটি কোটি জীবন স্পন্দনের কথা আর আপনার মনে নাই। এই সমস্তের সহিত আর্বানিটির কোনরূপ সম্পর্ক নাই।

মাননীয়, আমাকে এখুনি ত্যাগ করিবেন না। সত্য বটে এ-পর্যন্ত আমি প্রতিশ্রুতির দিকে একটি ধাপও অগ্রসর হইতে পারি নাই।

আপনি যথার্থই বলিলেন, কাহিনী কোথায়! আপনার সতর্কতা, আপনার চাহিদা-মনস্কতাকে আমি আদৌ খাটো করিবার পক্ষপাতী নই! যেমন আবার বলিতে চাহিতেছেন...
বলুন।
আমি আমার কান দুইটিকে গর্দভের ন্যায় বৃহৎ করিয়াছি, বলুন।
সত্য বটে, ইহাতে প্রলাপ-প্রবন্ধ-ইতিহাস একাকার হইয়া যাইতেছে।
কবুল করিতে বাধ্য যে কাঠামো বস্তুটি এই প্রলাপে হারাইয়াছে।
তথাপি।
অনুগ্রহ।
অনুগ্রহ করিয়া আপনার জীবনের একটি ঘন্টা অন্ততপক্ষে আমর জন্যে বরাদ্দ করুন। কিছু তামাশার বন্দোবস্ত করিয়াছি, যদিও এই কথা প্রকাশ থাকুক--এ বড়ো করুণ, আমরা পরে সেই দিকে গড়াইব, সময়যান, বিচিত্র শকট আপনাকে সেই স্থানে প্রেরণ করিবে। কিছু শর্তাদি আছে, যাহা ক্রমশ প্রকাশ্য।

ক্রৌঞ্চ-ক্রৌঞ্চি বসিয়া আছে বৃক্ষডালে।
এক ব্যাধ দুই পক্ষী বিন্ধিলেক নলে।।
বিন্ধিলেক ব্যাধ পক্ষী শৃঙ্গারের কালে।
ব্যাকুল হইয়া পড়ে বাল্মীকির কোলে।।

কৃত্তিবাস বিরচিত আদি কাব্যের "মা নিষাদ' উপাখ্যান আশা করি আপনি বিস্মৃত হন নাই, অবশ্য আমার এরূপ আশা করার ভিত্তিই বা কী, বরং ইহা দূরাশা বলিয়া বিবেচিত হউক। দস্যু রত্নাকর বল্মীকে সমাধিস্থ হইয়া পুনর্জন্ম লাভ করার পর, হিংসারহিত হওয়ার পর এই উপাখ্যান, তাঁহার কবিজন্ম। শোক শ্লোক হইল। ঘটনাটির বিস্তর কাব্যিক আলোচনা সম্ভব কিন্তু আপনার বড়োই তাড়া, কেন যে, কী যে মোক্ষলাভের জন্য আপনি এতদূর চঞ্চল তাহার নিশ্চয় করিয়া না জানিলেও, একথাই-বা কীরূপে বলি, "বন্ধু, আপনি কেবলই এক ধ্বংসের দিকে ছুটিতেছেন, বসুন্ধরা বিস্মৃত হইতেছেন। আর যদি বলিও, আপনি মানিবেন কেন, নতুন-নতুন অভ্যাস-সংস্কার ও বিশ্বাসের পরতের পর পরত পড়িয়াছে বিপুল এই সাজ আপনার সম্মতি ব্যতিরেক খুলিয়া আপনাকে নগ্ন করে কার সাধ্য!

একটি কথা বলিতে জিহ্বা চঞ্চল, বিশেষত যখন আপনি বলিলেন, "কীর্তিবাঁশ! নাম শুনেছি, পড়িনি।' আপনার উচ্চারণের দোষ ধরিব না, ক্রিত্তিবাস পড়েন নাই বলিয়া দূর ছাইও করিব না। শুধু জানিয়া রাখুন, এই আমাদের আত্মকথা, সেখানে ধ্বংসের স্থান নাই, হিংসার স্থান নাই। আমাদের কায়ের জন্ম হিংসা ও প্রেমের দ্বন্দে। আজ পর্যন্ত কি এই দ্বন্দকেই বহমান দেখি না!

আমারই বড়োই দোষ হইতেছে, জানি। আপনি একটি নতুন উপাখ্যান শুনিতে চাহেন, আর আই কি-না অতীতের জাবর কাটিতেছি। ইহার মধ্যেও একটি গুঢ় কথা আছে। যদি কখনো সময় পান, আমাদের ভাষায়, এমনকী পৈশাচী ভাষায় রচিত কাব্যও পড়েন, দেখিবেন মহাকাব্য ও পুরাণে বর্ণিত কাহিনীর খুঁট ধরিয়াই সকলে চলিয়াছেন। স্রোতের বিপরীতে মাঝি যেরূপ গুণ টানিয়া কোমর ভাঙিয়া, ধনুক হইয়া চলে, আমাদেরও সেইভাবেই চলিতে হইবে।

এ কেবল উত্থান-পতন, রোমাঞ্চ, বিস্ময়, রিরংসা ও কামকলা নহে যেমন, তেমনই এক মুখে নহে দশ মুখে বর্ণিত; স্থান কালের সীমা লঙ্ঘন করিল। সহসা, বৃত্তান্তটির ল্যাজামুড়া স্পষ্ট হইবার নহে; কারণ এই কথা -সাগরে মেলে নাই এমন বস্তু বিরল। একটি টুকরা গল্প বলি, আশা করি এই গল্প আপনাকে বিনোদনের সহিত বিশ্বাস ফিরিয়া পাইতে ইন্ধন যোগাইবে।

এই কাহিনী মাধব শোনেন সুন্দরলালের মুখে, সুন্দরলাল শুনিয়াছিলেন ওড়িশার এক আদিবাসী নারীর মুখে, অত:পর জ শোনেন মাধবের মুখে এবং আমি সম্প্রতি রায়গঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনাচক্রের ফাঁকে জ'রই মুখে শুনিয়াছি।

কাহিনী এইরূপ (স্মরনে রাখিবেন কাহিনী একটিই, কেবল বলিবার ধরণেই যত রূপান্তর, যত অভিনবত্ব) :
ওড়িশা, যে রাজ্যে বর্তমানে কর্পোরেট কর্তাগণ ঘন ঘন বিলাস-বহুল গাড়ি হাঁকাইয়া আদিবাসী, বনবাসীদের গ্রাম-গ্রামান্তর ছুটিয়া যাইতেছেন, যন্ত্রদানব মাটি খুঁড়িয়া একশেষ করিতেছে, নেতা- আমলা-পুলিশকর্তা-সাহেবসুবো মিলিয়া বিনাশকে উৎসব করিয়া তুলিয়াছে, কাহিনী সেই রাজ্যের একটি অঞ্চলের। কল্পনা করুন অঞ্চলটির, বা ওই গ্রামপুঞ্জের নাম ক। গ্রাম বলিতে ছোটো-ছোটো শান্ত বসতি, অঞ্চলটি পাহাড় সন্নিহিত। অতীতে পাহাড়টির ছিল ঘন সবুজ আচ্ছাদন, সেই আচ্ছাদনটি গ্রামবাসীদের পেটে যাওয়ায় পাহাড় বৃক্ষহীন, ন্যাড়া হইল। বৃষ্টি পথভ্রষ্ট হইল। জমি শুস্ক এবং অনুর্বর হইল।

গ্রামবাসীরা হা-অন্ন হা-অন্ন করিতে লাগিল। দিন যায়, মাস যায়, বৎসরের পর বৎসর ঘুরিয়া আসিল। কপালে করাঘাত করিয়া বৃদ্ধেরা বিলাপ করতে লাগিল। শুস্কতা এতদূর, যে, তাহাদের ক্রন্দন পর্যন্ত অশ্রুহীন; শিশুরা কাঁদিতে কাঁদিতে চক্ষু রগড়াইলে এখন রক্ত পড়ে।
রক্ত ঝরে।
কেউ-বা বলিল, ""হা অদৃষ্ট!''
কেহ বলিল, ""আমাদের ঈদৃশী অবস্থা কেন হইল?'
আক্ষেপ করুণ হইতে করুণতর শোনাইল, আমরা তো কখনো এইরূপ হা-ঘরে ছিলাম না। পাঠক এই স্থানে আপনার মনে পড়িতে পারিত খেলার প্রতিভা নামক একটি আখ্যানের কথাও। কিন্তু আপনি বাংলা সাহিত্যপাঠ বহুপুর্বেই বিষ্ঠাবৎ পরিত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া গৃহীত হউক। গ্রামবাসীদের সমবেত আক্ষেপে আমার দীর্ঘশ্বাসটি সযত্নে রাখিলাম। আক্ষেপ আবার শতধা বিভক্ত। হুতাশনের স্থানই বা কোথায়! এক্ষনে ধীরতা সহকারে কোনো কর্মেই ব্যাপৃত হওয়া অসম্ভব। কালশৈল আপনাকে কহিনী হইতে বিচ্ছিন্ন করিল, আপনার সময় কোথায়! আক্ষেপ অভিশাপ নহে, মায়ারই একপ্রকার অবশেষ। কীরূপে আপনারা অভিশপ্ত হইলেন, কাহিনীর নদী চিরসঙ্গী ছিল, আজ কেন নাই, কেন পাঠ আর প্রয়োজন অঙ্গাঙ্গী হইল। সেই বৃত্তান্তটি নিশ্চিহ্ন করিবার ব্যবস্থা, আয়োজন তো কবেই সম্পন্ন হইয়াছে।

কথা বৃহৎ, সকলেই তাহাতে নিজের মুখটি প্রকাশে উন্মুখ, বৃহৎ কথার শাখা-প্রশাখা, লতাপাতা, নদ-নদি, পাহাড়-অরণ্য, প্রাকৃতজন, নাগরইক ও আধুনিক সে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় বারংবার দেশ হইয়া উঠিতে চাহে। যে দেশ ডুবিয়াছে, হারাইয়াছে, কৃষ্ণবর্ণ ধূম যাহাকে গ্রাস করিলতাহাকে আর কোথা পাইব! যেজন্য

অপহৃত দেশটি, বিস্মৃত দেশটি এক সময় কথাপীঠ হওয়া সত্বেও আজ তার আখরগুলি পর্যন্ত খোওয়া গিয়াছে। যদিও হারাইবার কী পৈশাচিক উল্লাসই না আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি।

আমরা ক নামক গ্রামপুঞ্জের কথা বলিতেছিলাম। ভয়ঙ্কর ন্যাড়া, অভিশপ্ত অঞ্চলটিতে টিমটিম করিয়া একটি পাঠশালা চলিত। উক্ত পাঠশালার একমাত্র শিক্ষক গ্রামবাসীদের একটি সভা আহ্বান করিলেন। তখন পর্যন্ত শিক্ষকগণ আজিকার মত হীন হন নাই। লোক সমাজে শিক্ষকের জন্য শ্রদ্ধ্বর কিছু অবশেষ ছিল। শিক্ষক বলিলেন, আমাদের একজোট হইয়া বৃক্ষ রোপণ বৃক্ষের পরিচর্যা করিতে হইবে, ইহা ভিন্ন বাঁচিবার পথ নাই।

যেই কথা সেই কর্ম।

ন্যাড়া পাহাড়ে সবুজের বন্যা ডাকিল, কত রঙের, কত রূপের, কত না ধ্বনির পাখি আসিল, এমনকী আকাশে গাভীর বাঁট দেখা দিল।

তাহারা খুব করিয়া ভিজিল, নাচিল, গীত গাহিল এবং লাঙল সন্ধান করিল।

(আমার আশ্চর্য লাগিতেছে, সিটি সেন্টারের প্রশস্ত সিঁড়িতে এখন একটি জটলা দেখিতেছি। নানা বয়সের স্ত্রী-পুরুষ ক্রেতারা হাঁ করিয়া প্রতিটি কথা গিলিতেছে। তাহারা নিজ- নিজ আশু-কর্তব্য, দুরন্ত গতির জীবন হইতে যে এইভাবে কিছুক্ষণের জন্যেও সরিয়া আসিল, কাহিনীর জন্য শিশুর মত আগ্রহী হইল, ইহাতে আমি মুগ্ধ, ইহা নিমিত্ত আদি কবিদের আমি মনে-মনে প্রণাম করিলাম)।

সবুজের আরাধনাকারীরা নিয়ম করিল কেহ কোনো অবস্থাতেই বৃক্ষ-নিধন করিবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বা বার্ধক্যহেতু মৃত্যুমুখী বৃক্ষ দ্বারা গ্রামবাসীরা নিজেদের প্রয়োজন মিটাইবে। জ্বালানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যখন তারা বনমধ্যে যাইবে, তখন সম্পূর্ণ নিরস্ত্র থাকিবে। ফলকথা এই, যে ডাল, পাতা শুকাইয়াছে তাহারা শুধু তাহাই জ্বালানি হিসাবে সংগ্রহ করিবে।

বিজয়দত্ত নামক এক কৃষক এই নীতি লঙ্ঘন করিয়া একবাঋ একটি জারুল গাছ গোড়া হইতে কাটিয়া ফেলিল। বিজয়দত্ত যেমন পরিশ্রমী, তেমনই উচ্চাকাঙ্খী, সে একটি আশ্চর্য কল বানাইবে মানস করিয়াছিল। আমরা ওই কল সম্পর্কে কিছুমাত্র অবগত নহি। কারণ, কলটি ভূত হইয়া তাহার মস্তিস্কে ডিম পাড়িয়াছিল, বিজয়দত্ত সেই গোপনকথা কাহারও নিকট ফাঁস করে নাই।

প্রসঙ্গান্তরে যাই, যাহা জানি না তাহার সম্পর্কে কী-বা বলিব।

যে রাতে বিজয়দত্ত জারুল গাছটি কাটিয়া আনে তাহার পরদিন সূর্য উঠিবার মুহূর্তে যে সে দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিল, তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।

কী দেখিল সে?

গ্রামপুঞ্জের (নক্ষত্রপুঞ্জই-বা বলিব না কেন) প্রবীণ-প্রবীণারা তাহার গৃহ প্রাঙ্গনে হাত জোড় করিয়া সাষ্টাঙ্গে ( জানু, পদ, হস্ত, বক্ষ, শির, দৃষ্টি, বুদ্ধি ও বাক্য সহযোগে) প্রণাম করিতেছে। এই স্থলে মনে পড়িতে বাধ্য অষ্টাঙ্গ হৃদয় নামক সুত্রের কথাও। তবে তাহা কায়া চিকিৎসা-- আমরা তো রহিয়াছি সত্যাগ্রহের বীজে।
""বিজয় আমাদের বলো কী এমন অপরাধ করিলাম।''
""নিজেদের অজান্তে এমনকী অন্যায় আমরা করিলাম যে তুমি বাধ্য হইলে জারুল নিধনে?''

প্রিয় পাঠক,এই নিন পরিচ্ছন্ন রুমালটি। আপনার চোখে জল আসিতেছে। আপনি আমাকে স্তম্ভিত করিলেন। আর যাঁহারা সমবেত হইয়াছেন, দেখিতেছি সকলেই ভারাক্রান্ত। আশ্চর্য! ইহা প্রকৃতই আশ্চর্য! জারুল গাছ আপনারা চেনেন না। ট্যুরিষ্ট হিসাবে যে কখনো সংরক্ষিত বনে যান নাই এরূপ নহে। যদিও আপনাদের সেই সফর ডিজিটাল ক্যামেরা শুষিয়া নিয়াছে। বক্ষ, অরণ্য ও চাষাভুষা মানুষের সহিত আপনাদের জীবনের কী-বা সম্পর্ক! তবু যে চোখে জল আসিল, তবু যে প্রেম, বিরহ, শোক পর্যন্ত গড়াইল ইহা সম্ভবত নৃতাত্বিক-সঞ্চয়ের কারণে। যত বালি তুলিবেন, যত বালি সরাইবেন, ততই স্ফটিক জল দেখিবেন; ওই ফল্গুতে আপনার মুখ দেখাও কিছু অসম্ভব নহে।


দ্বিতীয় ভাগ


এক গ্রামের, বা গ্রামসমূহের বৃত্তান্ত সমাপ্ত হইবার পূর্বেই পাঠক সমাবেশটিতে ভাঙন ধরিল, যাহা গঙ্গার ভাঙনের সহিতই তুলনীয়। কেহ অভিমান ভরে বলিল, "" ইহাতে আমাদের কী-বা আসে যায়।'' কেহ-বা এই বলিয়া নাকচ করিল, ""বৃত্তান্তটির সহিত আমাদের জীবনের কোনো যোগ নাই।'' আমি উত্তর দিতে পারিলাম না, কারণ, জীবন বলিতে ইহারা যে ঠিক কী বুঝেন তাহা আমার জানা নাই। শুধু এইমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিলাম, কাহিনীর কোনো চরিত্র বা ঘটনার মধ্যে নিজেদের কোনোরূপ সাদৃশ্য, আদল দেখিতে না পাইয়া তাহাদের উৎসাহে ভাটার টান লাগিল। দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র কিংব বস্তুর ন্যায় সমাবেশটির প্রায় সমস্ত মানুষই ছিটকাইয়া গেল দ্রুতগতির ট্রেনের জানালা দিয়া যেভাবে প্রান্তর বা কোনো স্থাপত্যকে আমরা ছুটিয়া যাইতে দেখি। গাঁ গাঁ শব্দ এবং ঘন মেঘ উদগীরণ করিয়া গুটিকয় বাইক ছুটিল।, হৃদয়বিদারক শব্দ এবং ধোঁয়ার জ্বলনে আমার শোচনীয় হাল হইল।

আর ঠিক তখনই এক অন্ধ শিশু আমার পাঞ্জাবির খুঁট ধরিয়া টানিতে লাগিল, তাহার হাতে প্লাষ্টিকের একটি মেশিনগান।
শিশু বলিল, "" তুমি কি এই কল-টার কথা বলছিলে।''
আমি কাঁদিয়া ফেলিলাম, শিশুটিকে কোলে তুলিয়া তাহার মাথায়, গালে পাগলের মত চুমা খাইতে লাগিলাম। অবয়বী নই বলিয়া এই পাগলামি কাহারও নজরে আসিল না। বরং শিশুটির মা, শপিং সেন্টারের ট্রলি ঠেলিয়া যে আসিতেছিল, সে ক্রোধান্বিত হইয়া শিশুর হাত ধরিয়া হ্যাঁচকা টন দিল "" ফের তুমি নিজের মনে বকবক কোচ্ছো'' বলিয়া পণ্যের স্তুপের উপর, ট্রলিটিতে তাহাকে নিক্ষেপ করিল।

এ দৃশ্য এখন এতই গা সওয়া কেহ ভ্রুক্ষেপই করিল না, শিশুকে বিনিয়োগ ভাবাই বর্তমান দস্তুর হওয়ায় তাকে মোটিভেট করা, কর্মের বাজারে যাহাতে ভবিষ্যতে চড়া দাম ওঠে এইটাই লক্ষ্য হওয়ায়, স্নেহ, মায়া, পরিচর্যা নানারূপ নলবাহিত হইয়া আখেরে তাহাতে
ভ্যালু অ্যাডিশন সক্ষম কিনা সেইটিই বিবেচ্য বলিয়া অনুভূতিগুলিরও আশ্চর্য রূপান্তর ঘটিয়া গিয়াছে।

শিশুটিকে মার্চেন্ট অব ভেনিসের সমান্তরাল একটি দেশি গল্প শুনাইব ভাবিয়াছিলাম। যেহেতু, আপনারা মোটের উপর স্মৃতিভ্রষ্ট, যেহেতু ইনপুট ভিন্ন কিছুই প্রায় বোঝেন না, সমস্তই প্রোগ্রামিঙের অন্তর্গত করিয়াছেন, সেই কারণে গল্পের শ্রোতা হিসাবে আপনাদের শিশু ভাবিলে বড় একটা ভুল হয় না। দারিদ্র্যের আড়ত হিসাবে চিহ্নিত গ্রামের নিরক্ষর বয়স্কদের সঙ্গেও আপনাদের তফাৎ অনেক। সেই কারণেই পাঠক আপনাকে শিশু বলিয়া গণনা করি। শুধু একটি জিনিস ব্যতীত, শিশুর সরলতা আপনাদের নাই। গল্পটি এক লাইনে বলিব। ধৈর্যশীল হউন, আপনার দুরন্ত গতির জীবন, নষ্ট করিবার মতো সময় আপনার হাতে যে নাই তাহা বিলক্ষণ জানি।

ক্ষমাশীল এক রাজার কোলে রক্তচিহ্ন সমেত একটি কবুতর অকস্মাৎ শূন্য হইতে পড়িল। রাজা নিতান্তই ব্যস্ত হইয়া আহত কবুতরকে শুশ্রুষা করিলেন, কবুতর প্রাণ ফিরিয়া পাইয়া বকম বকম শব্দে রাজাকে অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাইল। কিছুক্ষণ পরে এক নিষাদ আসিয়া দাবি করিল কবুতরটি তাহার শিকার, সুতরাং তাহাকে ফিরাইয়া দেওয়া হোক। নিষাদের ব্যক্তিগত দাবি রাজা কবুল করিলেন বটে তবে কবুতরটি তাহাকে না দিয়া নিজের শরীর হইতে সম পরিমাণ মাংস কাটিয়া নিষাদকে দিলেন।

এই কাহিনী চক্ষে দেখিবার চেষ্টা করিও না, ইহা মন দিয়া দেখ। যখন মন দিয়া দেখিবার কথা বলিলাম তাহার দ্বারা আদপেই কল্পনাকে বুঝাইতেছি না। ইহা একরূপ দেবদর্শন। পাঠক আপনি ফ্যাশনদুরস্ত নাস্তিক হইলে এই কথায় নির্ঘাত হাসিবেন। অথচ, যখন আপনি সি ই , কর্পোরেটকর্তা, বিশ্ববাণিজ্যের বহুবিধ কল্পনায় মগজে ঢেউ তোলেন, তখন সেই ঢেউগুলি, নিত্য নতুন ধারণা ও কৌশলগুলিকে গভীরভাবে বাস্তব গণনা করেন, যাহা তখনো পর্যন্ত কল্পনা, খারাপ অর্থে ফন্দির অধিক কিছু নহে। আমার গ্রাম্য বুদ্ধিতে বোধহয় গল্পের এই রাজাটিকে ( যার রাখালরাজা হওয়াই সম্ভব) সিংহাসনচ্যুত করিয়া শতকের পর শতক ধরিয়া নিষাদকে নানা অস্ত্রশস্ত্র, ডিজাইনার নির্মিত পোশাক, জটিল নানাবিধ জ্ঞানের ক্ষমতায় সুসজ্জিত করিয়াছি এবং এই দীর্ঘ শ্রমে যাহা হারাইলাম তাহাই দিব্যদৃষ্টি।

ভেদ-ও কত! শ্বেতাঙ্গ কবি যদি উত্থাপন করিলেন শর্ত, ব্যবসার চুক্তি, কুশীদবৃত্তির যুক্তি, এই স্থলে উচ্চারিত জীবপ্রেম ও অহিংসার বাণী। "বর্ণমালা'-র (শিশুপাঠ্য গ্রন্থ) দ্বিতীয় ভাগেই কি ইহা কথিত হয় নাই যে, --চৌর্য ও মিথ্যা শঠতা দ্বারা উপার্জন করা অপেক্ষা সামান্য কর্ম করিয়াও জীবনরক্ষা করা শ্রেয়। অথচ, দেখুন আমাদিগের কি মতি!

কবুতরের বৃত্তান্ত হইতে স্বহস্তে নিজেদের উচ্ছেদ করিলাম।

আহত কবুতর, ছররা বিদ্ধ শামুকখোল কি আপনি কখনো দেখেন-ই নাই, ক্রৌঞ্চ-ক্রৌঞ্চী বৃত্তান্ত কি স্মরণে আসে না?

বিশ্বাস!
সাংস্কৃতিকভাবে এতখানি নির্ধন আমরা কখনো হই নাই--তথাপি আপনি ইহাকে দুর্ভিক্ষ গণনা করেন না, বরং প্রাচীনপন্থী হইয়া চাপিয়া যাইতে যান এমন শতেক দুর্ভিক্ষের কথা, বন্দনায় আনেন শুধু পণ্যদেবকে, তাহাকে ভিন্ন চেনেন চরাচরে এমন কেহই নাই।

আমি বৃদ্ধ হইয়াছি। আপনাদের জগতে আমার দিন ফুরাইল বলিয়া, এই তথ্য জ্ঞাত আছেন, তাই অনুমান করিতেছেন, যে সমাজ, যে ব্যবস্থা, আপনারা রচনা করিয়াছেন, তাহার সুফল পাইব না, সে কারণেই আমার মনে এত প্রশ্ন। ভবিষ্যত প্রজন্মের ভালমন্দ অপেক্ষা অরণ্য, জীবকুল, প্রেম ও অহিংসার প্রতি আমার পক্ষপাতের হেতুও বস্তুত আসন্ন মৃত্যুই।

চিন্তা অনেক হইল, জট ছাড়ানো দূরের কথা, বরং গিঁটের পর গিঁট এমন পড়িতেছে যে এখন তাহা এক মহাজটাজুট।

কিঞ্চিৎকাল নীরব থাকাই বরং শ্রেয়।

কিন্তু আর্তনাদ ও হাহাকার এমনই তীব্র, এতই বিপুল যে তাহা নৈ:শব্দ খানখান করিতেছে।

নারী চালান, শিশু চালান, মাদক চালান, অস্ত্র চালানের বাজার-ভুবন হইতে কী গোঙানি, কী আর্তস্বর, কী-বা বিস্ফোরণ!

উন্মাদ এবং শিশু ব্যতীত কেহই আর সুস্থ নহে।

আমার দমে টান পড়িতেছে। দেখিতেছি পাঠক সমাবেশটি খানখান হইল। শুধু অবশিষ্ট কৌতুহল একা আপনাতেই রহিয়াছে। বন্ধু, সহৃদয় পাঠক, আমি আপনাঋ নাম জানি না, তাহার বিশেষ প্রয়োজনও দেখি না। এখন ঘোষণা করিবাঋ সময়, আপনিই আজিকার বিজেতা, আপনাকে আমি আশ্চর্য সফরে লইব। গুটিকয় নিয়মনীতি ও শর্তের কথা শুনিয়া রাখুন। না, অল্প বিলম্ব আছে; শর্ত, চুক্তি প্রসঙ্গ পরে, পূর্বে একটি দুটি কথা, যাহা আপনি অবগত নহেন এরূপ নহে, তবে বিশেষরূপে লক্ষ করেন নাই, কথাটি জরুরি বিবেচনায়। এখনই পেশ করিব।

প্রথমে উল্লেখ করিব এক বানিয়া স্বপ্নদর্শনের কথা। এই স্বপ্নসুত্র অনুসারে ভূমন্ডলব্যাপী চরম সুখী ভোগী ভিন্ন কেহই রহিবে না। প্রকারান্তরে ভারতবাসী সকলেই মার্কিন মুলুকী ভোগীদের সমপর্যায়ভুক্ত হইবেন। এই উদ্দেশ্য যাহাতে সাধিত হয়, সেই কারণে একটি সংবাদপত্র (বাজারই যাহার প্রাণভ্রমর) নবরত্ন সভার আয়োজন করিল। বং-সন্তান, বরকলি, এম আই টি, হার্ভার্ড প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতায় রত যাঁহারা, সুখসাগরে ভাসিতেছেন যাঁহারা, দেশের জন্য তাঁহাদের অন্তর বাস্পাকুল হইল। বিশ্বের বানিয়াদিগের প্রস্তাবের সমর্থনে নয় কৃতবিদ্য ওই বং-রা একজোট হইয়া দৈনিকের উত্তর সম্পাদকীয়তে নয় শত শব্দ লিখিলেন, নয় শত ওয়ার্ড অব পাওয়ার। শাস্ত্রে কথিত আছে, শরীর, সম্পত্তি ও মন্ত্রণা এই তিনটি রাজ্যরক্ষার মূল। ভাবিবার কথা, মার্কিন মুলুক গৃহস্থালী পিছু যে পরিমাণ পণ্য এবং শক্তি (এনার্জি অর্থে) এবং অন্যান্য উপকরণ ভোগ করে তাহাতে অন্তত পঞ্চাশ কোটি ভারতীয় গৃহস্থালীর মোটের উপর হাসিয়া খেলিয়া চলিয়া যায়। এখন একটি সহজ পাটীগণিতের প্রশ্ন, যদি গৃহব্যাপী মার্কিন ভোগ-নীতি বা অভ্যাস প্রচলন করি বসুন্ধরার ভান্ডার শূন্য হইতে ক-দিন লাগিবে? বরং উল্টোপক্ষে মার্কিনিদেরই কি এই শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক নহে,-- ওরে, আহাম্মকের দল,ইন্দ্রিয়ের সুখগুলি কেন এমন রাক্ষস করিয়া তুলিলি? জীবন ভোগের নিমিত্ত, এই যদি তোদের সভ্যতার বাণী হয়, তাহা হইলে আমরা অসভ্য থাকাই সঙ্গত বোধ করি। গালি আসিতেছিল, খারাপ-খারাপ গালি, নিজেকে সামলাইলাম। আমাদের সংযত থাকিতেই হইবে।

ভোগের ওইরূপ মাপকাঠিতে মার্কিনিদের অপেক্ষা যে আমরা পঞ্চাশ গুণ অভাবী ইহাও তাহারাই নিরূপণ করিল। যত বিপত্তি এইখানে, দেশ-বিদেশ জুড়িয়া মহা কান্নাকাটি শুরু হইল; করুণার মেঘে আকাশ ঢাকিল। তাহারা এক সুবৃহৎ আমলাশোল আবিস্কার করিল।

এইখানে বলা কর্তব্য কাঁকড়াঝোর সন্নিহিত ওই গ্রামটিতে এক ভিন্ন বৃত্তান্তও আমি শুনিয়াছি। ভোলা নামের এক আদিবাসী , তীব্র অপমানবোধে জর্জরিত, নিজের ছায়াকে পর্যন্ত ঘৃণা করিতেছিল। কেননা মিডিয়া এন জি ও, প্রশাসক, নেতা এবং সাহেবসুবো আসিয়া কেবলই অনাহারে মৃত এইরূপ লাশের জন্য হন্যে হয়ে উঠিল। তাহাদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত ভোলা আকাশে বাতাসে কেবলই পচা মাংসের গন্ধ পাইতে লাগিল। অবস্থা এতদূর গড়াইল যে হাতুড়ে ডাক্তার, ওঝা কেহই কোনো সুরাহা করিতে পারিল না। এক রাত্রে ভোলা নিরুদ্দিষ্ট হইল। পরে জানিয়াছি সে জঙ্গলের পথ ধরিয়াছে। যদিও বিশেষসূত্রে আমি অবগত যে, মাওবাদীরাও তাহার সন্ধান পায় নাই।

ব্যাধির আড়ত, অশক্ত, দারিদ্র্যে নিমজ্জিতদের একখানি গ্রাফিক চিত্র কম্পিউটার আঁকিল। সেই চিত্রের পাশে সংখ্যা, স্তম্ভ ও রেখায় বহু কিছু বুঝাইতে চাহিল। সার কথা, সভ্যতার এই কলঙ্কমোচন করিতে হইবে। ব্যাধি নিরূপণের পর নিদান এবং চিকিৎসা অবশ্যম্ভাবী। দেশি- বিদেশি পন্ডিত, কর্পোরেট কর্তা, আমলা, নেতা, আত্মকেন্দ্রিক লেখক এবং ফিল্মি মাস্তানরা ইস্তক লাফাইতে লাগিল; পাইয়াছি, পাইয়াছি। সুবর্ণ সুযোগ, কোনোমতেই হাতছাড়া ইহা করা চলিবে না। পাঠক, আপনি সেই একমেবাদ্বিতীয়ং-কে বাজার বলিয়াই জানেন। এই স্থলে একটি পাশ-কথা বলি-- ভালো যে বাসিয়াছে একমাত্র সেই "একমেবাদ্বিতীয়ং' এই বেদবাক্যটি বুঝিয়াছে। এই কারণেই অতীতে অদ্বৈতবাদী ব্যক্তির পক্ষে দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ অসম্ভব ছিল। এখন বুঝিয়া লউন বাজার-প্রেম কী বস্তু!

কেন যে তাহারা আপদ, এই প্রশ্ন মাঠে মারা গেল। যেমন, কে বলিল ও কীজন্য ইহারা দরিদ্র, হতশ্রী-- এই প্রশ্ন অবান্তর বিবেচিত হইল। আপদের চিত্র আঁকিতে তাঁহারা এতই যত্ন করিয়াছিল যে, তাহাতে সীমা বলিয়া কিছু রহিল না। নিমিত্তই বা কোথায়! ইহাদের বিনাশ কাম্য, নবজন্মের প্রয়োজনেই ইহাদের ভিটামাটি ছাড়িতে হইবে।

আশ্চর্য ক্ষমতা ভাষার, সংখ্যার, বিচারের। কারণ, দেখুন বিনাশ আসিল দাতার বেশে। তাহার সে কী ব্যাপক উন্নয়নী-প্রতিভা। বক-রূপী যক্ষ প্রশ্ন করিয়াছিল, ""কী ত্যাগ করিলে প্রিয় হয়, কী ত্যাগ করিলে শোক হয় না, কী ত্যাগ করিলে অর্থবান হয় এবং কী ত্যাগ করিলে সুখী হয়।''

বাংলার চাষা স্বপ্নশূন্য হয় নাই। দেহ, প্রাণ, মন, বুদ্ধির সহিত চিত্তবৃত্তির মিলন আজও তাহার সহজ সাধনা। ত্যাগ বৃত্তান্তটি সে বিশেষরূপে উপলব্ধি করিয়াছে। ইহা আমি পরখ করিয়া দেখিয়াছি।

যদিও সে অসুস্থ অভিধা পাইল।

মোটের উপর সমস্তই বলা হইল। আমরা শীঘ্রই যাত্রা করিব। বিজেতা পাঠক আমি আপনাকে কুড়ি বৎসর পরের ঘটনা ও দৃশ্য সাক্ষী করিব। সময়যান আপনার সামনে উপস্থিত, অবশ্য তাহা দেখিবার চক্ষু আপনার নাই। দৃষ্টিদান পর্ব সম্পন্ন হইলেই আপনি সেই সুক্ষ্মযান দেখিতে পাইবেন। অযথা ভীত হইবেন না, এই সফরে আপনার বয়স এক মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়িবে না। শকট অরোহণের মুহূর্তে যাহা যে অবস্থায় আছে, সকলই যথাযথ সেই অবস্থায় ফিরিয়া পাইবেন।

ভ্রমণকালে দর্শন- শ্রবণ ভিন্ন কোনো কিছু করিবারই ক্ষমতা থাকিবে না, ইহাতে আতঙ্কিত হইবেন না। দর্শন- শ্রবণ আপনাকে স্মৃতি বঞ্চিত করিবে না। অর্থাৎ, সাময়িক কালের নিমিত্ত আপনার দেহটি খোওয়া যাইবে। ভাবিয়া দেখুন, আপনিই কি দেহ, বা দেহই কি আপনি। ত্বক, মাংস, মেদ, অস্থি ও মলেই যে আত্মবুদ্ধি-- বাজার কর্তৃক রচিত ওই তত্ব জড়দিগের, আমাদের নহে।

কাজের কথা বলি, আপনি এখন সাক্ষী হইতে চলিয়াছেন। অতএব, দেহ, দেহের ধর্ম, কর্ম, অবস্থাদি হইতে আপনি পৃথক হইবেন এই পৃথকতা ভিন্ন সাক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। সোজা উদাহরণ দিই, ঘটের দ্রষ্টা ঘট হইতে পারে না।

আপনি প্রস্তুত?

ভালো কথা। তাহা হইলে এই কাগজটিতে সহি করুন। বাহ! বেশ হইয়াছে। সহি দেখিয়া মনে হইতেছে বহুকাল যাবৎ আপনি কেবল নিজের নামটি লিখিতেই কলম ধরেন। হ্যাঁ, এইবার উঠুন, শকট উড়িল বলিয়া।

ভূপৃষ্ঠ যে এমনও হইতে পরে তাহা কল্পনার অতীত, দু:স্বপ্নে হানা দেওয়াও অসম্ভব। তৃণ বলিতে নাই। সবুজ বর্ণটি কখনো কোথাও ছিল এরূপও বোধ হইতেছে না। কীটপতঙ্গ নাই। অথচ প্রান্তর বিশাল। অসীম। শিশুরা যেইরূপ ভাবে, যে হাঁটিতে থাকিলে চলিতে থাকিলে যদি-বা এই প্রান্তর ফুরোয়, বুঝিতে হইবে সেইখানে পৃথিবীর শেষ, এইবার শূন্যে ঝাপাইতে হইবে।

ইহা নি:সন্দেহে ভীতিপ্রদ। বিশেষত জমাট বালির, মরুর ন্যায় প্রান্তর খাঁ খাঁ করিতেছে, আগুনের হলকা বহিতেছে বলিয়া ত্রাসের সঞ্চার হইল। নাকে মুখে আগুন -বাতাস আছড়াইয়া পড়িতেছে। বৃক্ষহীন এই প্রান্তরে বালি মুখে করিয়া, উড়াইয়া এমন প্রবল বাতাস কোথা হইতে আসিতেছে, এই প্রশ্ন পর্যন্ত মুখ খুলিতে সাহস পাইল না।

এইখানে ইস্পাত, সিমেন্ট, লোহার পাইপ, কনভেয়র বেল্ট, ঢেউ খেলানো টিন আর ঢালাই ছাত, বিশালাকৃতি কৃমির মতো জট ছাড়ানো পাইপে একশত একরব্যাপী একটি স্থাপত্য ভিন্ন কিছুই নাই। অন্তত, আর কিছুই নজরে আসিতেছে না। অনুমান করা সম্ভব কারখানটি পরিত্যক্ত। হইতে পারে প্রযুক্তিগত আয়ু ফুরাইয়াছে, এই বিপুলের স্থানে অন্যত্র ন্যানো-প্রযুক্তি গজাইয়াছে, আবার তাহা নাও হইতে পারে। কারখানাটি মরিয়াছে। কঙ্কালটি দাহ্য নহে, বিনাশযোগ্য নয় বলিয়া রহিয়া গেল, যেমত, পাইপের অভ্যন্তরে আরশোলা বাসা বাঁধিতে পারিয়াছে তাহারা মৃত্যুহীন বলিয়াই।

সম্পূর্ণ ন্যাড়া পতিত জমি, যাহা ঢেউ খেলানো, যাহার বুক ঘেঁষিয়া ধুলার শরীর আদর রচনা করে, সকলেই তাহারও তারিফ করিয়া থাকে। রুক্ষতার এক অপরূপ সৌন্দর্য আবিষ্কার করিতে কবির প্রয়োজন নাই। এই একটি কারখানার বস্তুময়, জড় শরীর সেই সৌন্দর্য নস্যাৎ তো করিলই, উপরন্তু এমন এক কদর্য্যতা টানিয়া আনিল যে চোখ আর খুলিতেই চাহে না। যেন ইহা অপেক্ষা অন্ধকারও ভালো। হায়, ইহা দেখিতে হইবে বলিয়াই কি চক্ষু! কী করিয়া এবং কেন যে এই মৃতভূমিতে তাহারা আসিল! আরো আশ্চর্যের কথা প্লাষ্টিক, পলিথিন, সিন্থেটিক পাইপ এবং অন্যান্য জঞ্জালের মধ্যে যে তাহারাও ছিল, মনুষ্য ছিল, তাহা কে বা ভাবিতে পারিয়াছে! পারমাণবিক, কিংবা রাসায়নিক যুদ্ধের পর যেমন হইতে পারে এখানকার পরিস্থিতি তদপেক্ষা ভালো তো কিছু নয়। তাহা হইলে এই তিনজন কীরূপে বাঁচিল, বাঁচিলই যদি এখন ইহারা কী করিবে। তবে কি ধ্বংসের বিনাশের বৃত্তান্তটি সবিস্তারে না জানানো পর্যন্ত এই তিনের মৃত্যু নাই। সেইজন্যই কি কোনোক্রমে তাহাদের প্রাণ এখনো ধক ধক করিতেছে।

আশ্চর্যের কথা,ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীণ সভ্যতার যে-সব প্রত্ন-স্থাপত্য আমরা এ যাবৎ দেখিয়াছি, সে-সবে মানুষের শিল্পবৃত্তির, মন আঙুলের তুলিতে যেমন সৌন্দর্য আঁকিয়া রাখিত, এই প্রান্তরে তাহার চিহ্ন অবধি নাই। ছোটো-ছোটো ইট ও পাথরে যে আর্দ্রতা থাকিত , নাই, তাহাও নাই। গুড়ি-গুড়ি সবুজের তো কথাই ওঠে না।

জিনসের একখানি মলিন প্যান্ট দূরে পড়িয়া আছে। তাজ্জবের কথা প্যান্টটির পিছনে চামড়ায় দাগিয়া দেওয়া "র‌্যাঙলার' শব্দটি এখনো পড়া সম্ভব। কোম্পানির সুনাম, গূণমান ইত্যাদির সাক্ষাৎ প্রমাণ ঐ প্যান্টটিকে বাতাস ঠেলিলে, সেই প্যান্টের খোল হইতে কঙ্কাল পা বাহির হইয়া পড়িল, বাতাস প্যান্টটি লইয়া খেলিতেছে। এইমাত্র এক ঝাপটে "র‌্যাংলার' সামান্য উড়িল। পরমুহূর্তে গোরুর গাড়ির ভাঙা চাকায় জড়াইয়া গেল।

অদূরে মরিচা ঢাকা সে ঢিপি দেখা যাইতেছে, আদপে তাহা একটি বহুমূল্য, বিলাসবহুল গাড়ির খোল। গাড়িটির তলার বেবাক জিনিস নোংরা লাগিয়া, মাটিতে বসিয়া আর প্রায় নাই বলিলেই চলে। গোরুর চাকাটি এই তল্লাটে কীরূপে আসিল তাহা বিস্ময়ের। কেননা তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিলেও এই প্রান্তরে কৃষি সভ্যতার অন্য কোনো চিহ্ন মিলিবে না।

যে তিনজনকে নড়াচড়া করিতে বালির স্তুপ ভাঙিয়া সম্ভবত অন্তিম বারের মতো জাগিয়া উঠিতে দেখিলাম, তাহারা গভীররূপে অবগত এই প্রান্তর তাহাদের খাইবে। বাঁচিবার আশা বহু পূর্বেই ঝরিয়া গিয়াছে। এখন বিবেচ্য শুধু এই তাহারা কি অপেক্ষা করিবে, না কি ওই কষ্টকর প্রতীক্ষা, ভয়ানককে ফাঁকি দিবার মানসে নিজেরাই কিছু করিবে। হৃদয়, অনুভব ইত্যাকার শব্দ ভুলিলেও, খাদ্য ও জলকষ্টে তাহাদের প্রাণবায়ু যাই-যাই হইলেও, মাথার মধ্যে প্যাঁচ এখনো কিঞ্চিৎ খেলিতে পারে। ভাবিবার, ফন্দি আঁটিবার ক্ষমতা ক্ষীণ হইয়া আছে সত্য কিন্তু সম্পূর্ণরূপে শুকাইয়া যায়।

সর্বাপেক্ষা কমবয়েসী যে, সে নারী হইলেও, এখন না আছে তার কোনোরূপ লিঙ্গ চেতনা, না এই বোধ যে মানুষের জন্ম সম্ভব করার দিব্য প্রতিভা তাহাকে এখনো ছাড়িয়া যায় নাই। বৃদ্ধ ( সম্ভবত অকালবৃদ্ধ, কেননা তাহার দৃষ্টি প্রশান্ত নহে বরং বাজের ন্যায়) এবং যুবক শতছিন্ন, বিচিত্র পোষাকের মেয়েটির দিকে মাঝে মাঝে দেখিতেছে বটে, তবে সেই দৃষ্টিতে কোনোরূপ সম্পর্ক নাই। একইরূপ দৃষ্টি অবশ্য মেয়েটিরও, যে নিবিষ্টচিত্তে একটি লৌহ শলাকা পাথরের টুকরোয় ঘষিতেছে এবং মাঝে মাঝে শলাকার ডগাটি পরখ করিতেছে। যতটা তীক্ষ্ণতা সে চাহিতেছে, শলাকা এখনো পর্যন্ত সেই স্তরে পৌঁছাইতে পারে নাই। যুবক জন্তুর ন্যায় মুখ ব্যাদান করিয়া প্রকাণ্ড হাই ছাড়িল। বৃদ্ধের কানে তাহার আঁচ পর্যন্ত লাগিল না।
--এট্টু জল খাব।
--চোপ। বোতল ছুঁবি না।
মেয়েটি শলাকা দেখাইল। ইঙ্গিত স্পষ্ট, বোতলে যে সামান্য জলটুকু আছে বৃদ্ধ সেইদিকে হাত বাড়াইলে রুক্ষ যুবতী বৃদ্ধের বুকে শলাকাটি গাঁথিয়া দিবে।

বৃদ্ধ নীরবে হাসিতেছে, তাহার দাড়ি গোঁফ, মুখের ভাঁজ, চোখের কোণ সমস্তই একযোগে হাসিতেছে।

কাছাকাছি অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ( ধূলি ধূসরিত হইলেও), শূন্য জলের বোতল, চামড়ার ব্যাগ ইত্যাদি থাকায় অনুমান করা যাইতে পারে একসঙ্গে বা আলাদা-আলাদা ভাবে দীর্ঘ পদযাত্রার শেষে তাহারা এইখানে সমবেত হইয়াছে। জীবনীশক্তি এখন আর নাই বলিলেই চলে। কোথা হইতে যে আসিল, সেই স্থান কি আরো নির্মম, বাঁচিবার প্রকৃতিগত তাড়নায় কি তাহারা সমস্ত পৃথিবী হাঁটিয়া ফুরাইছে, তিনজন কি তিনটি পৃথক-পৃথক দিক হইতে আসিল।
--দিক?
--দিক!
না, তাহারা দিক বলিয়া কিছু জানে না, এমনকী শব্দটি ইতিপূর্বে কখনো শোনেও নাই।

ভাষা ব্যবহারে তাহাদের কার্পণ্য লক্ষ করিবার মতো। খাদ্য ও জলাভাবে শরীর দড়ি-দড়ি হইল, পেশি সঞ্চালনের শক্তি প্রায় নি:শেষিত, এই অবস্থাতেও কথা এড়াইতে চাহে। মনে হওয়া সঙ্গত ইহারা ভাষা ভুলিল, দ্রুত ভাষা হারাইতেছে, ইহাদের জিহ্বায় বীণাপাণি আর অধিষ্ঠিত নাই।

অথচ, সন্দেহ করিবার হেতু নাই যে এই তিনের একটি দেশ ছিল, ভাষা তো ছিলই; এমন তো হইতে পারে না যে, মহাকাশ হইতে আসিয়াছে। সূর্যোদয় এবং সুর্যাস্ত যাহারা দেখিয়াছে তাহারা জানে এই হতভাগ্যদের দৃষ্টির গৌরবগাঁথা। মৃত, অনুর্বর এই ভূমিতে একদা ফসলের বন্যা বহিত। বর্ষা ঋতুটির সহিত ভূমির প্রণয় বৃত্তান্তই বা ভুলি কেমনে। এখানে ক্ষীণ শব্দে হিম পড়িত। ওই দেখুন কঙ্কালের মুণ্ডু, সেখানে অক্ষিকোটোরে জলের দাগ কি এখনো স্পষ্ট নয়। শিশুরা গবাদি পশু, নদী ও গ্রামের যে ছবি আঁকিত, এখনো আতিপাতি খুঁজিলে তাহার দু-একটি বিবর্ণ নিদর্শন পাওয়া অসম্ভব নয়। কাঁচা হাতের কাজ, দেখিলেই বুঝিবেন দুধের বচ্চারাই আঁকিয়াছে। খটকা লাগিবে, সত্যই কল্পনায় এতদূর সম্ভব নহে। যে দেখিয়াছে, সে আঁকিয়াছে।

ভাবিতে আশ্চর্য লাগে, হয়তো, হয়তোই বা কেন, নির্ঘাত একদিন এরা তিনজন শিশু ছিল। এখন যদিও তারা প্রায় ধাতু নির্মিত। গলার স্বর বিচিত্র, তাহাতে যন্ত্রের দাগ রীতিমতো দেখা যাইতেছে; যেন বা ওই বিপুল জড়পিন্ডবৎ কারখানাটির সঙ্গে ইহাদের কোনোরূপ যোগ আছে। ইহারা ক্রমে কারখানার অংশ, তাহার অঙ্গীভূত হইতেছে।

শিশুদের এমন কী তাড়া ছিল!

কেনই বা অতাহারা একটি লক্ষ্য খুঁজিল, অতীত- অভিযাত্রীদের ন্যায়, আক্রমণকারী যুদ্ধবাজদের ন্যায়, নিজেদের ভিটামাটি নরকে পাঠাইতে ব্যগ্র হইল, মনসামঙ্গল ভূলিল, সর্বনাশকে বরাত দিল কেবল এক নতুনের জন্য। এক স্বপ্নভূমি, সুখসাগর, সুক্ষ হাতিয়ার ও মহাভোগের সেই জীবনরূপী মায়া শেষপর্যন্ত এই মরু পাইল।
এখন, হা-জল! হা-জল!
এই তাহা হইলে লক্ষ্য।
এবং কি দ্রুতই না তাহারা এইখানে পৌঁছিল।

নিশ্চিত দলে আরো অনেকে ছিল, বেশ জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা করিয়া, নিশান উড়াইয়া, বাদ্য বাজাইয়া তাহারা রওয়ানা হইয়াছিল। রক্ত ঝরিয়াছে,তাহার চিহ্ন অবশ্য নাই। কাঁদিয়া চক্ষু লাল করিয়াছে, তাহারো কোনো সাক্ষ্য আর নাই।

যাহারা নিষেধ করিয়াছিল, নিরস্ত্র হইয়াও বাধা দিতে চাহিয়া মরিল। মরিয়া পাথরে নিজেদের নাম খোদাই করিল, এই তিনজন কোনকালে সেইসব শহিদবেদি ফেলিয়া, তাহাদের নির্বোধ এবং পশ্চাৎমুখী বিবেচনায় প্রত্যাখ্যান করিয়া, নিজেদের বুদ্ধিকে বাহবা দিতে-দিতে এতদূর আসিল। নরকরোটি এখন এই তিনকে দেখিয়া, তাহাদের অসংলগ্ন আচরণ, চাপা হিংসার কিছু মুদ্রা, খিঁচুনি এবং বাঁচিবার ইচ্ছা শুকাইল দেখিয়া বিকটরূপে যে হাসিতে চাহিতেছে তাহাতে সন্দেহ নাই। কারণ, কঙ্কালের মুণ্ডুর ফুটোফাটা ও গর্তসমূহে বাতাস ঢুকিয়া হি-হি শব্দে তোলপাড় করিতেছে।

এত সব কাণ্ডে তিনের প্রতি নজর দেওয়া, অন্তত একনিষ্ঠভাবে শুধু তাহাদেরই দেখা সম্ভব হয় নাই। এই তল্লাটে পরিবর্তনের সূচকের একান্ত অভাব। আলো আর অন্ধকার ব্যতীত সময়ান্তর বোঝা দূরহ। আর এক প্রকারে সময়ের অতিবাহিত হওয়া বোঝা গেল, বোতল এখন জলশূন্য।

মৃত্যু¤র জন্য কী আকুল প্রার্থনা! মেয়েটি মাটিতে লুটাইল, মুঠা মুঠা মাটি মুখে মাখিতেছে, বৃদ্ধ উপাসনা ভুলিলেও নতজানু এখন, তাহার চিবুক বুক ছুঁইল, যুবক লিঙ্গ বাহির করিয়া প্রস্রাব করিতে চাহিতেছে, প্রস্রাব কোথায়! শরীর পর্যন্ত জলশূন্য। তাহার লিঙ্গমুখে রক্তের জমাট ফোঁটা।

অনন্তর তাহারা সকলে এতদূর বিচ্ছিন্ন হইল, যে, পরস্পরের অস্তিত্ব ভুলিল। মনে পড়িতে পারে ব্যক্তি হইবার, একা হইবার মানসে ইহারা কঠিন সাধনা করিয়াছে। পাছে মায়া জন্মায় সেই আতঙ্কে পাখি পর্যন্ত পোষে নাই। প্রেম ভুলিয়াছে। বন্ধু খোঁজে নাই। কারণ, তাহারা প্রত্যেকে স্বতন্ত্র হওয়ার সাধনায় মন প্রাণ সপিয়াছিল। পরে, নিশ্চিত দুটি হাত এবং আঙুল মেলিয়া অঞ্জলি পাতিয়াছিল।
শূন্য।
শূন্য।

স্বগত মোহ দ্বারা বশীভূত হওয়ার সেই কাল যখন ফুরাইল, অথচ বাসনা তাহাদের শরীরে অজস্র লিঙ্গ ও যোনিরূপ ভোগাঙ্গ খড়গ দেখা দিল, প্রহারে -প্রহারে জর্জরিত করিল ( এই শুস্কতায় এই ক্ষুধায় প্রতিটি রোমকূপ অগ্নিসম জ্বলিতেছে), তখন ওই শলাকা তীক্ষ্ণ করার কাজটিতে যুবতী আত্মনিয়োগ করিল। নাকের বদলে নরুনের গল্প বাল্যে শুনিয়া থাকিলেও মর্ম গ্রহণ করিতে পারে নাই।

এখন তো পক্ষাপক্ষ বলিয়া কিছু নাই, ছায়া কায়া পর্যন্ত থাকিয়াও নাই হইল।

সহজনিদ্রালু হইতে পারিলে বাঁচিত। বৃদ্ধ ধুলায় মুখ ঘষিতে ঘষিতে গাঁজলা তুলিতেছে। যুবক উলঙ্গ হইল, এত চাপ তলপেটে তবু প্রস্রাব হয় না কেন!

যুবতী বিড়বিড় করিতে করিতে অস্ত্রটি প্রায় তৈয়ার করিয়া ফেলিল, এখন হাতিয়ারটি অতি তীক্ষ্ণ হইয়াছে। লোহা বা যে কোনো প্রকার এফোঁড় ওফোঁড় করিতে পারে।




---------------------------------
সৌজন্য: উৎসব ২০০৭, ভাষাবন্ধন