আপনার মতামত         


"জিহ্ব'
কৃষ্ণকলি রায়

আমার দাঁতে অনেকটা জীবন জড়িয়ে গেছে। জার্মান শেফার্ড জিভ ইচ্ছে মত ক্লান্ত হয়। ঐ সব ফাঁকফোকর ঘুরে 'তাড়ানো তাড়ানো' পরিচ্ছেদ গুলোতে চরম ক্লান্তি ওর। অন্য সময়ে ওকে ভার্মিয়ের বলে ডাকতেও ইচ্ছে করে কোনো কোনো দিন।
ভালোই। গুঁড়ো গুঁড়ো না তাড়ানো জীবন অনেক ক্ষণ ধরে জিভের আঁচে দমপুখ্‌ত,'চাওয়াদের' ঝিকমিকে সব চে ভালো বাসাটা থেকে আখরোট-বাসরে সেঁধিয়ে যায়। রোজ রোজ। অহনের সব বেলাগুলো, বার্ষিকগতির রাস্তায় পড়ে পাওয়া ঋতুরা,আমার শৈশব,কৈশোর,আমার প্রৌঢ়ত্ব,ইন্তেকাল,একমাত্র ওই টের পায়। জিভটা। আমার ভার্মিয়ের।
* * * * * * *

জলছবি কি জিনিষ? কালো কালো গাছ-গাছালিদের পেছন থেকে কালো একটা বল আকাশে উঠে যাচ্ছিলো। ভার্মিয়ের সেই সময় আখরোটের অসংখ্য ঘরে টরে-টক্কা পাঠায়। বিপ-বপ-বিপ-বিপ.....ওদের পক্ষে ডিকোড করা কঠিন নয় । এই তো,ব্লাড অরেঞ্জের মধ্যে আনারস,এক ভাগের হাত ধরে ২ ভাগ, দুজনেই তরল,আর.... আর... বরফ কুচি, অনেক খুশি খুশি বরফের কুচি। আমি দেখে ফেলায় মুচকি হেসে বললো 'জলছবি'। পাখি পাখি হয়েছিলো বাগানময়। আমার চুপচাপ দুনিয়া কোন তরঙ্গ তোলেনা। শুনতে পাচ্ছিলাম অনেক অনেক মারাশিনো চেরীকুচি জিভের পর্দা জুড়ে। তাহ'লে 'জলছবি'ই। তা, জিনিষটা কি?

জলছবি বেলায় আরো অনেকে ছিলো বুঝেছিলাম। মেঝেতে এলোমেলো ব'সে কাঠের দোলনা ঘোড়া। হাত দিতেই টুকটুক,টুকটুক। ব্লাড অরেঞ্জ-আনারস ঝাপসা। নতুন বিপ-বপরা আসছে। এবার কাঁচা আমের কুচি,নুন,লংকা গুঁড়ো। লংকা গুঁড়ো.... আর কি রে? একটা ঝুমঝুমি,ছাই রঙের। রুপোর হবে। নাড়াতেই জিভে দানা দানা চিনি ছড়িয়ে গেলো; একটু কিসমিস; বা:। আরো স্বাদ টোকা দিচ্ছিলো। কুর্দাক,মান্তি,বেশবারমাক। কোনদিনই দেখিনি তাদের,কিন্তু ছিলো ওরা। রং-ধনুকের দুনিয়ার ধারণা ওরাই কি?

গাছ আর গাছিদের জলসা ছিলো বোধহয়। সব্বার হাতে ফুলের থোকা। গাঢ় ছাই,ফিকে ছাই, ধূসর,কুচকুচে,ধপধপে। আমি স্পষ্ট টের পেলাম,কুচি কুচি মোরব্বা, কাগজিবাদামের ফালি,সেঁকা নারকোল কোরা, টং করে একজন ক্যান্ডিইড আদার কুচি ঝলক দিয়ে গেলো। র‌্যাস্পবেরী কেক, আরো বেরীরা সব,লাল,নীল,কালো। লাল,নীল,কালো,.... ভার্মিয়ের আঁকতে পারে। চোখ দিয়ে দেখতে গেলে সে-ই শুধু গাঢ় ছাই,ফিকে ছাই,ধূসর,কুচকুচে,ধপধপে।
গাছেদের সাথে টলমলে পা হাওয়ার বন্ধুত্ব। আমার অন্যমনস্ক জিভের ওপর দিয়ে টলমলে পা নিয়ে ফরাসী গাঁয়ের সেই সুন্দরী মেয়েটি হেঁটে চলে যাচ্ছিলো তখনই। মাদমোয়াজল ব্রুৎ ব্লঁ দ্য ব্লঁ । স্পার্কলিং ওয়াইন বলে ডাকলে ও রাগ করতো। ওর শরীরী সুগন্ধ আমার
নাকে ঝাপটা দেয় । সাদা ফুল,লেবুদের দলের কেউ, ঝলসানো বাদাম। ভারী অভিজাত। জিভ ছুঁয়ে যাবার সময় খুব রেশমী পোশাক পরেনি ও, বরং খানিক তৈলাক্ত। কিন্তু অসাধারণ পরিমিতি ওর পুরোটা জুড়ে। আর,বুদবুদরা ঝিলমিল ঝিলমিল। এও জলছবি?

* * * * * * *

এই সময়ে রোজ সে আসে। ছাইরং মাথা, চুনী চুনী চোখ,ছিটছিটে ডানা... উদাস ভাবে ও সেই কথাটা বলে যায়। একটানা,এক ঘেয়ে সুরে। সেই কথাটা আমার মনের ভেতরে পাতা উল্টে যাচ্ছিলো শুধু। যেখানে পাতলা মুশুর ডাল, গন্ধরাজ লেবু, একটু খানি লাল শাক ভাজা হয়তো। কোন একটা সময়ে রোজ পড়া হতো ওদের। কিম্বা,হতোনা। পাতা গুলো ঝটপট করে উল্টে যায়। ঝটপট? ছটফট? ঝিরি ঝিরি আলুভাজা ওর মধ্যে হিজিবিজি খেলা আঁকে। কাঁচকলার টুকরোর সাথে মাগুর মাছের ঝোল ছোট্ট একটু ঠোনা মেরে যায়। বড্ড বেশি একা একা,বড্ড বেশি মনখারাপ করানো সেই কথাটা বলে চলে ও,রোজ এই সময়ে। পাতারা ওল্টাতে থাকে । রোজ এই সময়ে। ঝটপট? ছটফট?

একই সময়ে, তোমাকে অসহ্য লাগে আমার নিনেল। তুমি কাছে এলেই শুধু তীক্ষ্ণ মিষ্টিতে জিভ এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায় আমার। চেষ্টা করেও লিখে যেতে পারেননি দুজন, এত তীক্ষ্ণ। শুধু ড়...বা ড়ং...মিঠা জহর। কোনদিন কে সি এন ছুঁয়েছো নিনেল জিভ দিয়ে? কোনদিন নিজেকে? অসহ্য.... তুমি কাছে এলেই ভার্মিয়ের ডুবে যেতো মহুয়ায় মহুয়ায়। অসহ্য..... তোমার ঠোঁট, ভার্মিয়ের বলেছিলো কুসুম কুসুম লিচু-মধুতে গোলমরিচ মেশানো। উন্মাদ জিভ তোমার বুক ছুঁলেই, ফরাসী ব্রী টুকরো টুকরো জিভের উত্তাপে গলে ছড়িয়ে পড়ে আমার ভিখারী মুখের সবটুকু জুড়ে। কে সি এন ছেয়ে ফেলে আমাকে,চারটে কুঠুরী ছিঁড়ে খুঁড়ে... তুমি কাছে এলেই..... অসহ্য লাগে তোমাকে আমার; নিনেল।

হাওয়া চলছে এখন,বড্ড বেশি একা একা, বড্ড বেশি হু হু। তীব্র হিমসাগর স্বাদ । কোত্থাও আর্দ্রতা লেখেনি প্রকৃতি,তবু মেলন মেলন সর্বত্র। তরমুজ, ক্যান্টালোপ, হানিডিউ ছাড়া কেউ আসেনা এখন আর। কিম্বা শুধু থান রঙা লিচু জিভ জুড়ে। এই সময়ে।

* * * * * * *

আমি ছবিটা দেখছিলাম। ঢলছে-দিনের হাতল ভাঙা পেয়ালায় ধীরে ধীরে কালো কফি ভর্তি হচ্ছে। মৃদু হেজেল বাদামের গন্ধ অলা। দ্বিপ্রাহরিক স্বাদেরা ডানা ঝাপটে বাসায় বসতে থাকে। পশ্চিম দিকটায় কালো গোলাটা অন্যমনস্ক ভাবে হারিয়ে যাচ্ছিলো। ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দ্বন্দ্বে পড়ি,এই সময়ে কি হেজেলবাদাম শুধু? হয়তো আর্ল গ্রে, হয়তো অরেঞ্জ পিকো .... তিক্ত মধুর স্বাদ জিভে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিকেল আসে, বিকেল যায়। কালো তরল,বেলান্তের পেয়ালা প্রায় ভর্তি হয়ে এলো। আর্লের হাত ধরে সুন্দরী লেমন রাইন্ড। ওয়াল্‌ৎজ নাচের আসরে অনেকজন ছোটো কালো পোশাক .... চিনি ঢেলে কোনদিন ওদের কুমারীত্ব নষ্ট করিনি আমি।

আমি ছবিটা দেখছিলাম। আরশি বলে 'এইখানটায় দেখো, কপালের ওপর থেকে কেশরেখা পেরিয়ে গোলমরিচের মধ্যে কত খানি নুন মিশে গেছে।' হাসি-রেখাঙ্কিত চোখদেরও দেখছিলাম। অবাধ্য চশমার দিকে। পুরু। রোজই, আরো। হয়তো কোনো আজব ত্রিকোণমিতির বই। ত্রিকোণমিতি বুঝিনা কোনদিন,আমি শুধু মেপল মধুর স্বাদ পেলাম। অল্প আঁচে সেঁকা পাইনবাদাম, পোড়া অ্যাম্ফোরা তামাক, পেয়ালাভর এখন ফ্রেঞ্চরোস্ট। তৃপ্তি। আমার অলক্ষ্যে ভার্মিয়ের আরশির দিকে চোখ মটকায় হয়তো। তৃপ্তি।
এমন দিনে পাতারা চুপিচুপি নি:শ্বাস ফেলে। কেউ কোনদিন স্ফিংস নামে ডাকেনি, তবু আগুন ছায় ওদের শরীর জুড়ে। ওদের ঘুম পায় খুউব, এমন দিনে। ক্লান্ত পাতারা..... আপেল আর দারচিনির স্বাদ। পর্ণমোচী দিনের রং ক্যারামেল স্বাদের মত ঠিক। অথবা বাদামী চিনি, কোরানো গাজর,অলস্পাইস। ছুটির মরশুম শুরু হলেই আমি বুঝতে পারি সমস্ত সত্বায় পাতারং উত্তাপে সেঁকা মূল-সব্জি, পাতারং কুমড়ো, বাটারনাট স্কোয়াশ.... ক্লান্ত দিন ঘরে ফিরছে এখন। ক্লান্ত বছর,রঙ্গীল ওমের কাছে।

* * * * * * *

ওর পায়ের শব্দ হয়না কোনদিন; যারা শুনতে পায়,তারা বলে। চুপটি পায়ে কখন যেন ও ধীরে ধীরে ছেয়ে যায় ও-ই ওপরটায়। চারপাশেও। রাত্রির কোন পায়ের শব্দ নেই। ওরা বলে। ঠিক না ভুল কে জানে? আমি কিন্তু ওর আসার শব্দ শুনতে পাই রোজই। কয়লার আঁচে সেঁকা মোটা মোটা রুটি,তুর ডাল,ঝাল কাঁচালংকা, ধনেপাতার চাটনী,শুনতে পাই জিভের মধ্যিখানটায়। ঠিক যখনই ও আসে। অনেক উঁচুতে কালোর মধ্যে সাদা সাদা ঝিকমিকে। কোন অভিধানে 'তারা' বলে লেখা আছে। ওদের দিকে তাকালেই কারা যেন আমাকে চুপিচুপি এক মুঠো ঝিকমিকে মিছরী দিয়ে যায়। নরম হাতে জড়িয়ে ধরেছিলো, ওকে তোমরা অন্ধকার বলে ডাকো? গাঢ় গানাশ,ডার্ক চকোলেটের। ওকে তোমরা অন্ধকার বলে ডাকো, সত্যি?

সবাই চলে গেছিলো। সব কুঁড়ি,ফুলের মেয়ে গুলো,পাতারা, সব্বাই। একা একা ডালপালারা আজকাল হিজিবিজি কাটে শুধু। ওদের মনখারাপ করে কিনা কেউ জানেনা। মাদাগাস্কার ভ্যনিলার স্বাদ .... কি জানি,এইই একলা লাগার গন্ধ কিনা? সাদা মাটিতে ক্ষুদে ক্ষুদে মোচা ছড়িয়েছিলো পাইনবন। কনিয়াকে টুসটুসে সোনালী কিশমিশ,লাল-সবুজ মোরব্বার মতো। ঘরের ভেতর চুল্লীতে ফিসফাস আগুন জ্বলে এখন। পাশে বসলেই টের পাই জিঞ্জারব্রেড ছাড়া কিছু নয়। হাসিখুশী বুড়ো মানুষটি চুল্লীর তাকে অনেক কিছু রেখে গেছে। ঝকমকে মোড়কের ভেতর সবটাতে জায়ফল, জায়ফল। আর সেই, সাদা চকোলেট এর টুকরো দেওয়া কুকীরা, দিদিমাদের বানানো।
অনেক অনেক সাদা আকাশ থেকে হেলেদুলে নেমে আসে। আমার জিভে অতি যত্নে তেলরং আঁকছিলো রামে ভেজানো কেক। তুলিগুলো এগনগ হয়তো।
"ত্বাচ' প্রত্যয় আমার শরীর জানেনি কোনদিন। নাহলে হয়তো বলতো "বড় শীত'। শিরার ভেতরে। আগুন নিভে যাবার শব্দ। পাইনা আমি। তবু নিভে গেছে কখন যেন। শিরার ভেতরে। ভার্মিয়ের স্তিমিত হপ ফলের স্বাদ এগিয়ে দিয়েছিলো। তেতো। আর কেউ নেই? কেউ না?
শুধু ভোঁতা তেতো , আমার সমস্ত জিভে। যন্ত্রনা?
চারপাশে অন্ধকার নামছে বুঝি? কেউ বলো না, অন্ধকার? বলো না। ভার্মিয়ের? স্বাদেরা সাড়া দেয়না কেন কেউ? বিস্বাদ.....ভা-আ-র-মি-য়ে-এ-এ-র। নেই। বিস্বাদ.....
সূপকথা ..... শেষ।