আপনার মতামত         


অন্তহীন বেদনাঋতুর গান ও বৃষ্টিঝরা কলকাতা
কৌশিক চক্রবর্তী

Between the desire/ and the spasm/ Between the potency/ And the existence/... Falls the shadow
: Thomas Stearns Eliot

বৃষ্টিস্নাত কলকাতা সন্ধের মুখোমুখি থমকে দাঁড়িয়ে। অদূরে টালিগঞ্জ রেলব্রিজ - আলো আঁধারি আর ঝিরঝিরে জলপতনের মধ্যে কিছুটা অশরীরী। ছায়ার মতন দাঁড়িয়ে। ক্রমাগত ছুটে আসতে থাকা গাড়ির হেডলাইটের ধাঁধানো হলদেটে আলোর এক বিস্তীর্ণ মাকড়সাজাল সারাটা শহরের আনাচে কানাচে। কোথাও এককোণে ধুঁকতে থাকা নেড়িকুকুর, গত কয়েকদিনের একনাগাড় বৃষ্টিতে ভিজে, ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বড় বাড়ির সিঁড়ির তলায় আশ্রয় নিতে গিয়ে ব্যর্থ, মনোরোগী দারোয়ানের লাঠির গুঁতো খেয়ে শেষমেষ চায়ের দোকানের আবর্জনার ঝুড়ির পাশে... গরম উচ্ছিষ্ট চা-পাতার ওম লেগে যার এই একঘেয়ে মনখারাপ ভিজে ভিজে সন্ধেবেলার মুখে হারিয়ে যাওয়া মা'য়ের কথা মনে পড়ে যায় হয়ত। হয়ত সেই কারণেই হঠাৎ করে মুখ তুলে সে করুণভাবে কেঁদে ওঠে, স্বভাবতই ব্যস্ত শহরের মানুষজন তর ক্ষিদে বা বিষন্নতার দিকে বিন্দুমাত্র দৃকপাত না করে সোজা যার যার লক্ষ্যস্থলের দিকে হাঁটতে থাকে।

প্রজাপতিরাও আছে প্রচুর- এরাও ঠিক মানুষের মত/ যেখানে খাবার আছে, যেখানে খাবার জন্মে/ সেইখানে মানুষেরা থাকি-
: বিনয় মজুমদার

একটানা বৃষ্টির পরে কেমন যেন থমকে থাকে চারপাশ। যেন কারোর কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, আকাশও মাঝে মাঝে থম মেরে যায়, লালচে মেঘের চাপ চাপ অন্ধকার নেমে আসে শহরের উপর, কালো ছাতার মতন। হঠাৎ করে সে ছাতার অজস্র ফুটোফাটার ভেতর দিয়ে দুটো - একটা তারা উঁকি মারে। নেড়ি কুত্তাটা মুখ তুলে চায়, এই বিশালতার নিচে শুয়ে আবার একটা রাত কাটাতে হবে এই আশঙ্কায় ভুগতে থাকে। রাস্তার মোড়ে অলস ট্র্যাফিক, ঘোলাটে নিয়নআলোর হাতছানি, বিজ্ঞাপনি ব্যানারে বুলাদির অমোঘবাণী, অন্তর্বাসের ছবি, চকোলেট হিরোর মুখ, আধুনিক প্রযুক্তির জয়গান... পাড়ার ছোট্ট ঘুপচি পানের দোকানে অবিরাম বেজে চলা এফ এম তরঙ্গ, তাকে ঘিরে কিছু মানুষের জটলা- উথলে ওঠা নানাবিধ ভাবনার বীজ, মতামতের স্রোত, তর্কের বন্যা। নেড়িকুকুরটা চায়ের দোকানের সামনে এক টুকরো শক্ত ও বাসি বিস্কুটের লোভে অনবরত ল্যাজ নাড়ে, কুঁই কুঁই শব্দ করে, ফুটপাথ ভিজে বলে আর শেষমেষ গড়াগড়ি খায় না। প্রাত্যহিক অভ্যাসমতো ক্ষিদে মেটানোর চেষ্টায় তার এই ভিক্ষাবৃত্তি একরকম অনিবার্যতা।

... it is speckled with hues / like quartz, its' as / verious as boredom....
: Derek Walcott

বৃষ্টিজনিত এই নাগরিক দিব্যোন্মাদনা হয়ত একমাত্র কলকাতাকেই মানায়। তার দেওয়ালে বৃষ্টির ম্লানমুখে আঁকা বিচিত্র প্যাটার্ন - কিউবিস্ট সভ্যতার গসপেল, রহস্যময় ঘন্টাধ্বনি এবং অন্তর্বর্তী ফিসফাসের ভেতর দিয়ে জানিয়ে দিয়ে যায় অস্তিত্ব নামক সেই অমোঘ হেঁয়ালির কথা। আজ তার হৃদপিন্ড প্রতিস্থাপন করে বসেছে সংবাদমাধ্যমের আনুভূমিক সৌন্দর্য ও বর্ণমালার সমতলে। একটানা বর্ষার জল পেয়ে আঠেরোর বি'র দোতলার অশ্বত্থচারাটার হঠাৎ করে যৌবনপ্রাপ্তি, বৃষ্টিশেষের ফুরফুরে হাওয়ায় সে দোল খায়, ঠিক পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ করে রাস্তার ধারে সাময়িক আস্তাকুঁড়, সকাল ন'টার বাঁশিতে সাফ হয়ে যাওয়া যার ভবিতব্য। সন্ধের মুখে সেখানে সিগারেটের ছাই ছাড়া কিছু থাকার সম্ভাবনা কম, জলের তোড়ে সেই অবশিষ্টাংশও নিরুদ্দেশ। কুড়ি নম্বরের একচিলতে রোয়াক ছিলো একসময়ের রাত্রিবাসের বিলাসিতা। ফুরফুরে হাওয়া, চাঁদের আলো, প্রশস্ত লাল মেঝে - সঙ্গী বলতে অন্তহীন অবসরের প্রাচুর্য; এখন নিরাপত্তাজনিত কারণে, হয়ত অবচেতনে জঙ্গিহানার আশংকাতে তাকে ঘিরে বিশ্রি লোহার গরাদ - বাড়ির একটা হাত অথবা পা অথবা যকৃত, ফুসফুস, অন্ত্র, - যা কিছু একটা বাঁধা পড়েছে জেলকুঠুরির আবডালে। নেড়িকুকুর ফাঁকতালে সিঁড়ির তলা খোঁজে, ফুটপাথের ধারে ধারে এখনও জল নামেনি, এখনও প্লাস্টিক জমে আছে নর্দমার খাঁজে, মাঝে মধ্যে দুএক কুচি খাবার ভেসে আসে। অনেকদিন আগে একবার ভেসে যাওয়া বাক্স থেকে আস্ত মাংসের টুকরো পেয়েছিল নেড়ি কুকুর... কী মহার্ঘ সেই স্বাদ! সকালবেলা লাঠির বাড়ি খেয়ে এখনও ডানপায়ের পিছন দিকটায় চিনচিনে ব্যথা, কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জলের কাছাকাছি এসে একবার নাক ঘষে হাতে তারপর সামনে বাড়িয়ে দেয়, কিছু প্রাপ্তিযোগের আশায়। সন্ধের মুখোমুখি ঘোলাটে অন্ধকার , লোডশেডিং, পাড়াজুড়ে একটা বুনো ঘুটঘুটে অন্ধকার... বারো নম্বরের গলি দিয়ে লোমওঠা বেড়ালটা একবার বেরিয়ে আসে, খাবারের তাড়নায় ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় একবার ডেকে, নেড়ি কুকুরটাকে দেখেই আবার ভেতরে সেঁধিয়ে যায়।

ওরা দেখতে চায় আমি ছটফট করতে করতে মরে যাচ্ছি। / ... এটা সত্যি মরছি আমি। তবে তা স্বেচ্ছায় কিছু, কিছু অনিচ্ছায়।
: ভাস্কর চক্রবর্তী

সে কোন জন্মের কথা মনে পড়ে! একটা ভুলে যাওয়া গন্ধ মনে পড়ে। সারা শরীর জুড়ে নরম ওম মাখা সেই রাত। মায়ের শরীরে মুখ গুঁজে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের সেইসব রাত। তবু মা-কে যে কেমন দেখতে ছিলো, বারবার ভাবনাটাকে অনেক অনেক দিন পিছিয়ে দিয়ে নেড়ি কুকুরটা খুঁড়তে থাকে স্মৃতির বালিয়াড়ি। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সুড়ঙ্গ করে ফেলে বারংবার অন্ধকারে হাতড়াতে থাকে অন্তহীন বেদনাঋতু। মা তার কাছে এখন কেবল এক স্মৃতিপরাগ, এক ফিরে ফিরে পাওয়া গন্ধের মেদুরতা; একলা রাতগুলোয়, ক্ষিদে চেপে থাকার রাতগুলোয় বৃষ্টিভেজা স্যাঁতস্যাঁতে শহুরে রাতগুলোয় যখন চারপাশে নৈ:শব্দ্য, কেবল একঘেয়ে বৃষ্টির ঝিরঝিরে শব্দ, যখন শুকনো সিঁড়ির তলা খোঁজবার ঘসঘসে শব্দ ঢেকে দেয় সমস্ত স্তব্ধতার মায়াবী কাটাকুটি খেলাকে, যখন হয়ত বসবার ঘরে রাত্রের খাবার শেষে কেউ টেলিভিশনের আলেয়ায় খোঁজে শুশ্রুষা, কেউবা নরম বিছানার আদর মাখতে মাখতে ডুব দেয় ক্লান্তিকর নিদ্রায়, আবার কেউবা একবার, খুব বিষন্নতা মেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখে, তখন দূর আকাশ থেকে যেন মা'র গন্ধ এসে লাগে। নেড়ি কুকুরটার সারাদিনের ঝড়াঝাটি, অভিমান, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইতে সেই গন্ধটুকু লেগে থাকে চোখে, মুখে, গায়ে...মা, তোমার মনে পড়ে আমায়? আমায় একবারটি ডাকবে? একবারটি আমার সামনেটায় এসে দাঁড়িয়ে কানে কানে ডাকবে? আমি সাড়া দেব। ছুট্টে গিয়ে তোমার কাছে গিয়ে দাঁড়াব... এইসব ভাবতে ভাবতে প্রতিদিনকার মৃত্যু মরে যেতে যেতে নেড়ি কুকুরটা ছটফট করতে করতে দশের এ'র গেটের ফাঁক দিয়ে ঢুকে মিটারবক্সের নিচটায় গুটিশুটি মেরে শোয়। রাজ্যের ঘুম তার চোখে, ক্রমশ চারপাশ নেশাতুর ও ধোঁয়াটে হয়ে যায়।


You become my prisons./ Try to kill me./ Once and for all./Do not kill me./With approaching steps.
:Mahmoud Darwish.

ঘুম ভাঙে প্রবল বৃষ্টির তোড়ে। তীব্র ছাট লেগে ধড়মড় করে উঠে বসে নেড়িকুকুর। গ্রিলের গেটের তলা দিয়ে জল ঢুকছে। পেটের কাছটায় ঠান্ডা স্রোতের স্পর্শ। আজ আর দুচোখ বোজার অবকাশ পাওয়া যাবে না। সারা শহর, এই সারা কলকাতাটা হয়ত বৃষ্টির তুমুল দাপটে ভেঙে পড়বে সামনে। দেওয়াল দিয়ে সজোরে বৃষ্টির জল এসে মিশছে রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোষ্টটার সামনে। যেন রাত্তিরের ঘুমিয়ে থাকা পাড়াটার গা থেকে সমস্ত রঙ শুষে নিয়ে একটা সাদা কালো ছবির শুটিংস্টক পড়ে রয়েছে হাতের কাছে। আবহসঙ্গীতের মতন মেঘের গর্জন, পাড়াটার অলিগলি দিয়ে একটা ভয়াবহ ঠান্ডা হাওয়া শনশন করে বইছে আর বন্ধ দরজাগুলোর কড়া নেড়ে দিয়ে এক কাল্পনিক যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। আজ বোধ হয় আর ভেসে যাওয়াটা অবাস্তব নয়, হু হু করে জল বেড়ে চলে। একটু আগে যেরকম মা'র গন্ধ ভাসছিল, এরকমই খুব বৃষ্টির দিনে সেই গন্ধটা, সেই নরম স্পর্শটা শেষ একবার পেয়েছিলো সে, আজ আবার যখন মাথার উপর এই বিরাট লালচে আকাশটা তর সমস্ত বাঁধ খুলে দিয়েছে; মনে হচ্ছে আজ সমস্ত কিছু ধুয়ে মুছে ভেসে যাবে অনেক গভীরে, তখন নেড়ি কুকুর ধড়মড় করে উঠে বসে, গা ঝাড়া দিয়ে একবার বাইরে মুখ বাড়ায়; কী দেখে কে জানে, কেবল তোড়ে ঝরে পড়া জল তার সারাটা মুখ ভিজিয়ে দেয়। সারা দিনের ভিজে ভিজে ঠান্ডা সোঁদা বিপন্নতার পরেও, সেই জলের ঝাপটায় ক্ষিদের জ্বালাপোড়াটুকু যেন কিছুটা হাল্কা হয়।

কোথাও নেমেছে বৃষ্টি। ঠান্ডা বাতাস বইছে কোতোয়ালি থানার গভীরে। / আর কি ফিরতে পারব পথে পথে মুঢ় মানবজন্মের ? / কানা গান গেয়ে? / ... তুমি সত্যকথা- তাই তোমাকেই এতসব বলি।
: উৎপলকুমার বসু

হঠাৎ করে কান্নার শব্দ কানে আসে। আরেকটা নেড়িকুকুরছানা, ঠান্ডায় ভিজে গায়ে কাঁপতে কাঁপতে কোনমতে হাঁচোড়পাঁচোড় করে প্রথমে সিঁড়ির প্রথম চৌকাঠ ভেঙে উঠে আসে, কুতকুতে চোখে চারিদিক একবার দুবার তিনবার দেখে, তারপর আমাদের প্রথম নেড়িকুকুরটাকে দেখে এগিয়ে আসে; ছোট্ট নাকটা দিয়ে কী শোঁকে সেই জানে, ছোট্ট ল্যাজটাও নাড়ে, কিছুটা স্বস্তি কিছুটা সম্মতিতে হয়তো তারও মনে পড়ে হারানো মা'য়ের কথা, মা-কে সেও হয়ত এমন ঘন বৃষ্টির দিনে খোঁজে, আর খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় এই নেড়িকুকুরটাকে। পেটে কাছটায় গুঁতিয়ে ঢোকে ছানাটা, তারপর কী নিশ্চিন্তে মুখ গুঁজে, একটা আশ্চর্য শব্দ করতে করতে একটা সময়ে ঘুমিয়েও পড়ে। মা-কে সেও হয়ত দেখেনি, মা-য়ের কেবল গন্ধই হয়ত সে পায়, আজ এই অপরিচিত শরীরের স্পর্শও তাকে সেই চেনা মায়ের গন্ধ মনে পড়িয়ে দিল; এভাবেই ভেবে নেওয়া যাক, এই বিপর্যয়ের দিনে দুটো অসহায় অস্তিত্ব একে অপরের কাছে ঋণী হয়ে গেল, আশ্রয় দেওয়া - নেওয়ার প্রক্রিয়ার এই মায়াবন্ধন কি সহজে ছাড়বে কোনদিন? এই অপরিচয়ের দূরত্ব কি কাল সকালে অদৃশ্য হয়ে যাবে?

And as we stray further from love / we multiply the words,/words and sentences so long and orderly./Had we remained together/ we could have become a silence.
:Yehuda Amichai



ছানাটাকে জড়িয়ে ধরে নেড়িকুকুরটা ক্লান্তভাবে আকাশের দিকে চায়, এখনও কতটা রাত কাটাতে হবে, এখনও অনেকটা বৃষ্টি পেরিয়ে তবে থামা। ক্ষিদে পায় খুব, ঘুমের ঘোরে নরম পাউরুটির গন্ধ নাকে এসে লাগে। এবারে আবার কিছু খাবারের সন্ধান করতে হবে তাকে। একঘেয়ে মনখারাপ ভিজে ভিজে এই কলকাতায় আবার তাকে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা আর আনন্দ দুই-ই ভাগ করে নিতে হবে। মা'র কথা খুব মনে পড়ে, এরকম বৃষ্টির দিনে, মা'য়ের গন্ধ এসে লাগে নাকে। হয়ত সেই কারণেই হয়তবা আকস্মিক এই অভিভাকত্বের উত্তেজনায় হঠাৎ করে মুখ তুলে সে করুণভাবে কেঁদে ওঠে। বুকের কাছটায় ঘুমন্ত ছানাটা একবার গুটিসুটি মেরে, নড়েচড়ে, আবার ঘুমিয়ে পড়ে। মা'র কথা মনে করতে করতে। নেড়ি কুকুরটার দুটো চোখও ঘুমে জড়িয়ে আসে। ছানাটাকে জাপটে ধরে, মা-কে জাপটে ধরে, সেও ক্লান্তিতে চোখ বোজে। বৃষ্টিভেজা ঠান্ডায় কেমন যেন শীত শীত করে!