
কলকাতার রয়াল হোটেলে লোকে খুব শখ হলে বিরিয়ানি খেতে যায় বা নিউ মার্কেটে আমিনিয়ায়। রয়াল হোটেল তখন খুব নামী। সেখানে ত্রিশ টাকা প্লেট খাসির বিরিয়ানি। লোকে মাটন বিরিয়ানি বলতো না। চিকেন তখনও মুরগি ছিল। কথায় কথায় এত ইংরেজিয়ানা ছিল না। আমরা পরিকল্পনা করলাম, ত্রিশ টাকা দাম নিচ্ছে! হোস্টেলে তখন মিল চার্জ এক টাকা আশি পয়সা হলেই ধুন্ধুমার বেধে যায়। অডিট হয়। এত কী করে হলো? ... ...

টেনের রেজাল্ট বেরোনোর পর থেকেই জয় এই শহরের হীরো হয়ে গেল, যে বাড়িতে যাও, সেখানেই শুধু তাকে নিয়ে আলোচনা। একদিন দাদার কাছে এসেছিল ইলেভেনের ফিজিক্সের কী ডিফিকাল্টি বুঝে নিতে। রাস্তায় জিজ্ঞেস করতে দাদাই বাড়িতে এসে ভালো করে বুঝে নিতে বলেছিল। সে কী বিপত্তি, মা দাদা বৌদি সব এসে জড়ো হল। তার মধ্যে দাদার চিৎকার, "দ্যাখ, এভাবেই ওরকম রেজাল্ট হয়, জয় এসেছে পড়া বুঝে নিতে আর তোকে ডেকে ডেকেও বই নিয়ে বসানো যায়না।" মাও মহা উৎসাহে যোগ দেয়, "শুধু কী তুই, কারুর কাছেই তো পড়তে চায়না, কী যে হবে ওর! এই তো জয় শরাফ স্যরের কাছে অংক করছে, শহরের সব ভালো ভালো ছেলেমেয়েরা তার কাছে অংক করে ইঞ্জিনিয়ারিং মেডিক্যাল পায়। আর এই মেয়ে একদিন গিয়ে বলে, শরাফ স্যর নাক খোঁটে, ওর কাছে পড়বনা। বালাসুন্দরমের কাছে কেমিস্ট্রী পড়বেনা কেন না সে এম কে ইয়াম আর এন কে ইয়ান বলে, কে বি গুপ্তা নাকি বই মুখস্থ করায়। হাজারটা বায়নাক্কা এর, এমন মেয়ে দেখেছিস জয়?" চশমার সরু স্টাইলিশ ফ্রেমের আড়ালে ঝকঝকে উজ্জ্বল চোখের, আপাতগম্ভীর মুখে কি চাপা হাসির আভাস? কিন্তু সে ছাই ভালো করে দেখার উপায় আছে এদের জ্বালায়! কী যে ভাবছে ওর সম্বন্ধে, ধরণী দ্বিধা হও ব্যাপার স্যাপার, ঝিমলি মানে মানে সরে পড়ে সেখান থেকে। ভাবছে কি, হয়ত ভাবছেই না, বয়ে গেছে তার, ওর মত বিচ্ছিরি, লেখাপড়ায় ফাঁকিবাজ, কোনোকিছুতেই ভালো নয় মেয়ের কথা ভাবতে! ... ...

অমলেন্দু বিশ্বাস সেই প্রজন্মের লোক যাদের সম্পর্কে ঠাট্টা করে বলা হতো যে তাঁদের জীবনের সংকল্প ছিল ‘আমার এই দেশেতে জন্ম, যেন ওই দেশেতেই মরি’। কিন্তু ঠাট্টায় যেটা ধরা পড়ে না তা হলো এই জন্ম আর মৃত্যুর ঠিকানা আলাদা হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা সহজ নয়। যাঁরা এর মধ্যে দিয়ে গেছেন, এবং যাবার সময়ে ভেবেছেন যাওয়াটা কিরকম, কোথায় যাচ্ছি, যেতে যেতে আমার আমিটার কি হচ্ছে - তাঁদের নিজের জীবন সম্পর্কে লেখার, আমাদের জগতে, একটা বিশাল প্রয়োজন আছে। একশো বছর আগে যা লেখা হতো সেগুলো ইউরোপ যাত্রীর পত্র, বা স্বল্প প্রবাসের কথা, সে প্রবাস যে বাসিন্দা তার সত্তাকেই পরিবর্তিত করে দেয় না। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এই প্রবাস অতি সাধারণ; অনেক সময় মনে হয় মধ্যবিত্ত ব্যক্তিদের জীবনের প্রথমটা এই প্রবাসেরই সুদূর ভূমিকা বা প্রস্তুতি। মনে রাখতে হয় অবশ্যই এই প্রবাসও পরিবর্তনশীল - ষাট-সত্তরের পাশ্চাত্য সমাজ এখনকার পাশ্চাত্য সমাজের মতো ছিল না; ষাট সত্তরের মধ্যবিত্ত বাঙালি সত্ত্বাও তার এখনকার অবতারের থেকে আলাদা ছিল। তার থেকেও বড়ো কথা, প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষ এই প্রবাসের ইতিহাসকে নিজের মতো করে তৈরী করে নেয়। এই সততভিন্নতার জন্যেই একজন ব্যক্তির এক বিশাল ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে যাত্রার কাহিনী আমাদের পড়তে ভালো লাগে। ... ...

এইখানে প্রকৃতি একটি ফাঁদ পেতে রেখেছেন। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে আরেকটি অন্তরীপ আছে তার নাম হাং ক্লিপ। নাবিক জানে ফেরার সময়ে মহাদেশের শেষ বিন্দুতে এসে জাহাজ যাবে উত্তর মুখে,সাদার্ন ক্রসকে চোখে রেখে, আফ্রিকার উপকূল যথারীতি রইবে ডান দিকে। তিনশো বছর আগে কিছু নাবিক ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের সময়ে এই হাংক্লিপ অন্তরীপকে কেপ অফ গুড হোপ ভেবে জাহাজের মুখ ঘুরিয়েছেন উত্তর দিকে, ফলে অনেকটা ঘুরে এসে আবার বুঝেছেন, উত্তর নয় এখন তাদের জাহাজের মুখ ঘোরাতে হবে দক্ষিণে, তবে পৌঁছুবেন আসল কেপ অফ গুড হোপে। এই ভ্রান্তির কারণে উপসাগরের নাম ফলস বে যার নাম হওয়া উচিত ছিল দি রং বে! হেলিকপটার থেকে দেখলে মনে হবে ফলস বে যেন একটি প্রকাণ্ড প্রাকৃতিক বাথটাব, প্রায় একটি বর্গক্ষেত্র, তিরিশ বাই তিরিশ কিলোমিটার! ... ...

গেরস্তের ঘরে ধান উঠচে, ঘরে ঘরে আমোদ আল্লাদ। বরের গলা জড়িয়ে নতুন পুরনো সব বউয়ের বায়না, এবার কিন্তু ওই গয়না/ শাড়িটা দিতে হবে। কতা দিয়েচো, ধান উটলে। ছেলে মেয়েরা খুশি। পরীক্ষা শেষ। যত খুশি খেলো। লুকোচুরি খেলার আদর্শ সময়। খামারে খামারে ধানের খড়ের, কুটির মেলা। লুকনো সোজা। তারপর সাঁঝবেলায় বাড়ি থেকে এটা সেটা এনে নিজেরাই রেঁধে বেড়ে ফিস্টি। ... ...

আফ্রিকা মহাদেশ পরিক্রমা করে ইউরোপ থেকে ভারত তথা পূর্ব এশিয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন পর্তুগিজ অভিযাত্রী নির্মম লুটেরা ভাস্কো দা গামা। সেই দীর্ঘ নৌ-সফরে নাবিকদের প্রয়োজন মাঝেমধ্যে স্থল-বিরতি, একটি সাময়িক আস্তানা, খাদ্য ও পানীয়ের সরবরাহ কেন্দ্র। লিসবন থেকে পালতোলা জাহাজের প্রায় তিন মাস লেগে যেত আফ্রিকার শেষপ্রান্তে পৌঁছতে, খানিক থেমে আবার যাত্রা। পূর্ব এশিয়া (ইস্ট ইন্ডিজ) যাওয়ার পথে একদিন ইয়ান ফান রিবেক হল্যান্ড থেকে আশি জন পুরুষ, আট জন মহিলা সহ তিনটি জাহাজ নিয়ে আটল্যান্টিকের অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা পেরিয়ে পাহাড়ের নিচে এই শান্ত বন্দরে নোঙর ফেললেন, সেদিন ৬ই এপ্রিল, ১৬৫২। রিবেক ও তার সঙ্গীদের জায়গাটা বেশ ভালো লেগে গেল। দূরে গাঢ় নীল সমুদ্র সফেন অথচ বন্দর নিস্তরঙ্গ, সামনে খাড়া পাহাড় যার শিখর একেবারে সমতল; তার নাম দিলেন টাফেলবার্গ, টেবল মাউন্টেন। ভারত, জাভা, বোর্নিও, মশলা-দ্বীপ নাহয় পরে যাওয়া যাবে। আগন্তুক ডাচ মানুষেরা ভাবলেন এখানেই আড্ডা গাড়া যাক - স্থানীয় মানুষদের উচ্ছেদ করে সংসার পাতলেন। সেই আফ্রিকার দক্ষিণতম ভূখণ্ডে শ্বেত-পদসঞ্চারের প্রারম্ভ, যার মাশুল গুণতে হবে সেখানে স্থিত বা আগত সকল অশ্বেতকায় মানুষকে, মালে, চিনা,ভারতীয়কে। এই অন্তরীপ শহর আর হাল ভেঙে ক্লান্ত নাবিকের কোনো বুড়ি ছোঁয়ার বন্দর রইল না। ক’টা দিন থেমে চাল কলা আলু কুমড়ো পটল জাহাজে তুলে নিয়ে, ফ্লাস্কে জল ভরে ভারত যাত্রার ওয়েটিং রুমও নয়। নতুন বিজনেস মডেল - জমিদারি, চাষবাস আর ভারত অভিযাত্রীরা যখন এখানে থামবেন তাঁদের ‘চায় গরম’ অফার করা, মোটরওয়ের রেস্তোরাঁর মতন। লোভী ডাচ ক্রমশ দখল করবেন চাষের জমি, লাগাবেন আঙুরের চারা, দূরে ভাগাবেন খোই খোই জাতিকে তাঁদের হাজার বছরের বাসভূমি থেকে। ... ...

আশির দশক পর্যন্ত গ্রাম বাংলার বেশিরভাগ ক্লাব ব্যস্ত থাকতো ফুটবল নিয়ে। পরের দিকে ক্রিকেট ভলিবল এসব আসে। এছাড়া কবাডি প্রতিযোগিতা হতো। আর ছিল যাত্রা গ্রামীণ কোনও মেলা বা উৎসব ঘিরে যাত্রা করা। বাইরের দল নিয়ে যাত্রার আয়োজন করা হতো ফুটবল মাঠের উন্নয়ন বা ইত্যাদি বিষয়ে। কিন্তু অ্যামেচার যাত্রা এবং নাটক ছিল ক্লাবগুলোর প্রাণ। এছাড়াও ক্যারাম, দাবা, চাইনিজ চেকার, তাস, দাবার আয়োজন থাকতো। আড্ডা ছিল ক্লাবের প্রাণ। পানভোজন ক্লাব সংস্কৃতির অঙ্গ হয়নি। অন্তত আশির দশক পর্যন্ত। ... ...

সত্তরের দশকে ফুটবল ঘিরে গ্রাম বাংলায় যে উন্মাদনা ছিল তা আজ কল্পনাই করা যায় না। ফুটবল খেলা মানে কয়েক হাজার দর্শক। আমাদের গ্রামের খেলা থাকলে বাচ্চা বুড়ো সবাই গ্রাম ফাঁকা করে ফুটবল ম্যাচ দেখতে ছুটতো। কেউ বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, ১০ কিলোমিটার দূরে পর্যন্ত হেঁটে যেত লোকে ফুটবল দেখতে। ... ...

সত্তর দশকের মাঝামাঝি শোনা গেল সবুজ বিপ্লবের কথা। আগে শুধু লোকে অ্যামোনিয়া আর ইউরিয়া দিতেন চাষের সময়। এবার এল পটাশ, গ্রোমোর, ইফকো কোম্পানির নানা সার। তাঁদের প্রতিনিধিরা চাষিদের নিয়ে বৈঠক করতে লাগলেন। বড় চাষির জমিতে বিনা পয়সায় সার দিয়ে দেখিয়ে দিল, ধান কত বেশি হচ্ছে। কেউ কেউ বললেন, সার দিয়ে দিয়ে জমির পোঙা মেরে দিচ্ছে। ছিবড়ে করে দিচ্ছে। কিন্তু সে কথা উন্নয়ন হাওয়ায় উড়ে গেল। একে একে এরপর নতুন ধান এল। বেশি ফলনের লক্ষ্যে। পাঞ্জাব খাস, আই আর এইট, মিনিকিট, বসুমতী, মশুরি এবং চীনা ধান তাই চুং। ... ...

আমার তা-ই মনে হয়েছে, বলে ফল্গু, কিন্তু এসপিণ্ডোলো ছাড়া আর কাউকেই বলিনি। তোদের বলছিলুম বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করেছি, সেই বিশেষজ্ঞ তিনিই। পেরুর পুলিশকে জানালে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা ছিল। কে দখল নেবে, ক্রেডিট কার – এইসব আন্তর্জাতিক কচকচি তৈরি হত। ব্যাপারটা তাই ছেড়ে দিয়েছি এসপিণ্ডোলোর হাতে। এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ফল্গু, কিন্তু এখনো কিছু জানালেন না এসপিণ্ডোলো। এদিকে পরশু দিনের ফ্লাইট কনফার্মেশন হয়ে গেছে আমাদের। ফেরবার আগে জানতে পারব কিনা কে জানে! ... ...

এলাকার বিধায়ক রামনারায়ণ গোস্বামীর খুব প্রিয় ছিলেন। সর্বভারতীয় কৃষক সমিতির নেতা করে তাঁকে দিল্লি না পাঠালে হয়তো বাবার পক্ষে একটু বেশি ভালো হতো। যাক, বাবার গলা শুনে চিন্তিত হলাম। কিছুদিন আগেই একটা মিলে চারজন শ্রমিক পুড়ে মারা গেছে। বাবা বারবার বলা সত্ত্বেও তেমন আন্দোলন করছে না পার্টি। কিছুদিন আগে বাড়িতে একটা ব্রাঞ্চ মিটিং হয়েছে। চাপা স্বরে কথা। কিছু শুনতে পাই নি। আর বাবা দাদা এঁরা তখনকার রীতি অনুযায়ী পার্টির ভেতরের কথা বাড়িতে বা বন্ধু দের কাউকে বলতেন না। খালি মিটিং শেষে এক পার্টি নেতার কথা শুনলাম, বাবাকে বলছেন, এনাম পার্টিতে আমার শিকড় অনেক ভিতরে। তুমি কিছু করতে পারবে না। ... ...

পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবেই বেঁচে থাকলেন। পার্টির গণসঙ্গীত স্কোয়াডে কিছু দিন ছিলেন। পরে সেসবে ভাটা পড়ে যায়। গণনাট্য সঙ্ঘের বর্ধমানের কর্তা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী আন্দোলনের নেতা। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছিল না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কলকাঠি তিনিই নাড়তেন। কে অধ্যাপক হবেন কে পদোন্নতি পাবেন বিশেষ করে কে চাকরি পাবেন কর্মচারী পদে অফিসার পদে-- সে সবের দণ্ড মুণ্ডের মালিক তিনিই। উপাচার্য যিনিই হোন, তিনিই শেষ কথা। ... ...

একটা ট্যাক্সি ডেকে সোজা ওরা পৌঁছোয় ট্যুরিস্ট ইনফর্মেশন সেন্টারে। সেখানে কামিলা আর শ্যাভেজের সঙ্গে বসে আছেন স্বাস্থ্যবান মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক। পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে অপেক্ষা না করে বলেন তিনি, ওয়েলকাম মিজ ফল্গু, প্লীজ সিট ডাউন। কনগ্র্যাচুলেশনস, যেভাবে আপনি – মুড়কিকে দেখিয়ে বলেন ভদ্রলোক – এই বাচ্চা মেয়েটাকে উদ্ধার করেছেন ফ্রম ক্যাপটিভিটি, তাতে আমরা সবাই আপনার ফ্যান হয়ে গেছি এখন। আই হ্যাপ্ন্ টু বি দ্য পুলিস চীফ হিয়ার, বলুন কী করতে পারি। ... ...

আপনার সঙ্গে রসিকতা করার ধৃষ্টতা আমার নেই স্যর, কিন্তু আমি দেখেছি। আপনি তো জানেন বিশাখাপত্তনমের পোর্টে সিঙ্গাপুর অভিমুখী জাহাজকে দাঁড় করিয়ে আমি এবং আমার বন্ধুরা ভারতথেরিয়ামকে নামিয়ে এনেছিলাম। আমি নিজের হাতে একা একা নামাইনি, কিন্তু সঙ্গে ছিলাম। ভারতথেরিয়ামকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, ছুঁয়েছি। আমি চিনতে ভুল করব না স্যর। এখন একটা খুব জরুরি কাজ করছিলাম, সেটা ফেলে রেখে আপনার সঙ্গে কথা বলছি, কারণ ওটাকে এখনই না বাঁচাতে পারলে হয়তো দেরি হয়ে যাবে। ... ...

নৌকো যখন দ্বীপের অনেকটা কাছাকাছি, ওরা দেখল দ্বীপের বেশ কিছু লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখছে নৌকোটাকে। নৌকোটা এসে দাঁড়ালো যখন তীরে, তখন প্রথম নামল রায়া, তারপর ফিনিগান। ওদের সঙ্গে দ্বীপের মানুষদের জন্যে কিছু উপহার ছিল, সেগুলো দিল ওরা। তারপর তিন-চারজন মাতব্বর জাতীয় লোক – পরে ওরা জানতে পেরেছিলো ওদের মধ্যে একজনের নাম অ্যাপো আর একজন সেরিপ – এগিয়ে এল রায়া আর ফিনিগানের দিকে। ... ...

ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রবাস কালে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার এক প্রণম্য পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছিল। দেবিন্দর কাপুর তখন আমাদের টোরোনটো অফিসের অধ্যক্ষ। কাজে এসেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট। আমাদের মতো কয়েকজন তরুণ অফিসারের সঙ্গে বাক্যালাপ করে কিছু আদেশ ও উপদেশ দিলেন। তার মধ্যে একটি বেশ মনে আছে। আজকাল প্রায় শোনা যায় প্ল্যান এ বা প্ল্যান বি। দেবিন্দর কাপুর বলেছিলেন বৎস গণ, সর্বদা জোব্বার ভিতরে একাধিক পরিকল্পনা রাখিও। অবস্থা বুঝিয়া তাহা বাহির করিও। এক লাইনের একই পরিকল্পনা একই প্রভুকে বারংবার দেখাইও না – যথাসম্ভব জটিল ভাবে ইহা পেশ করিবে যাহাতে তিনি কোন মতে বুঝিয়া না উঠিতে পারেন - কোন সহজ সূত্র দিবে না। চলিতে চলিতে পরিকল্পনা পরিবর্তন করিতে থাকিও। কোন বিচক্ষণ ব্যক্তি একটি বিশেষ প্ল্যানকে বলপূর্বক আজীবনের জন্য আলিঙ্গনবদ্ধ করেন না। শেষ করলেন এই বলে- বেটে চলতে রহো, সোচতে রহো, বদলতে রহো! আগে বড়োগে! সেই সুপরামর্শটি মনের ভেতর উদিত হল উল্কার মত। আমাদের কাজে মানে এই বাজারি লগ্নিদার খোঁজা বা সিনডিকেশানের কথা শুনলেই কর্তা ব্যক্তিরা জানতে চাইবেন আমার সমর কৌশল কি? ঠিক কি ভাবে আমরা মায়দান -এ- জংগে নামব? কাদের আমরা কম বেশি চিনি? কার কাছে ভিক্ষায় যাবো? কেন যাবো? ... ...

সোভিয়েত ও চীনা মডেলের মিশ্রণে সংসদীয় পথে সমাজতন্ত্র কায়েম নেহরুর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বিফলে যাচ্ছে, চীন অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীন তাদের এলাকা বলে দখল করে নেওয়ায়। আকসাই চীন নিজেদের কবলে রাখলেও পরে অরুণাচল প্রদেশ থেকে সেনা সরিয়ে নেয় চীন। এই যুদ্ধ ঘিরে উগ্র জাতীয়তাবাদ তীব্র হয়ে ওঠে। কমিউনিস্টদের দেশদ্রোহী বলা শুরু হয়। কোথাও কোথাও গায়ে হাত দেওয়া হয়। জেলে পোরা হয়। আর আমাদের গ্রামাঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি তখনও তত শক্তিশালী নয়, কিন্তু বাবার এলাকায় প্রভাব ছিল প্রচুর। সম্পত্তি, পরোপকার এবং খেলাধুলা যাত্রা ইত্যাদি নানা জনসংযোগের কারণে। ওই সময় বাবাদেরও চীনা দালাল বলে টিপ্প নি শুনতে হয়। চৌষট্টিতে বলে মাকু। এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি মার্ক্সবাদী -- 'না এক ভাই/ না এক পাই বলে' বলে শ্লোগান তোলে। তাতে খুব নিন্দা রটে। খবরের কাগজে এবং রেডিওতে তুলোধুনো করা হয় কমিউনিস্টদের। বেশ কিছু কমিউনিস্ট নয় এমন মুসলিম নেতাকে ১৯৬৫তে কারাবন্দি করা হয়। প্রখ্যাত বাগ্মী সৈয়দ বদরুদ্দোজাও নিপীড়ন থেকে ছাড় পাননি। তিনি তখন সাংসদ। আগে কমিউনিস্টদের চীনা দালাল বলা হচ্ছিল এবার বলা হলো মাকু চীনা পাকি। কুশপুত্তলিকা দাহ হলো বহু জায়গায় জ্যোতি বসুর। ব্রাত্য বসুর 'উইঙ্কল টুইঙ্কল' নাটকে দেবশঙ্কর হালদারের একটা অসাধারণ সংলাপ আছে এই নিয়ে। বাবার সামনে ছেলে গান্ধীবাদী বাবার নাম ধরে বলছেন, আমি কমিউনিস্ট। তীব্র সমালোচনা নিন্দা এবং অপপ্রচারের মুখেও কমিউনিস্টদের পিছু হঠতে দেখা যায় নি। ... ...

সিনেমার ওপরে লেখা থাকতো অনন্যা, অজন্তা। ওগুলো যে হলের নাম পরে বুঝেছি। আমি ভাবতাম লেখিকার নাম। ভাবতাম, এই বই তিনজন চারজন লিখেছে? কাউকে জিজ্ঞেস করতেও পারতাম না, লজ্জায়। একটা বিজ্ঞাপন ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শট গান। পাখি মারার ছররা বন্দুক। ৬০ টাকা দাম। ডাকযোগে পাঠানো হয়। শোনা গেল, দু একজন ঠকেছে। অন্যজায়গার। শুধু পাইপ এসেছে। ... ...

আমরা সকলেই নিজ-নিজ সংসার-পরিবারের প্রতি বিশ্বস্ত। আমাদের নিয়মিত নিশ্চিন্ত উপার্জনের প্রতি আমরা বিশ্বস্ত। রাজধানী এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কারণে কিছুটা প্রতিপত্তি উপভোগ এবং তার ফলে উপরি কিছু সুযোগ-সুবিধে লাভের প্রতি আমরা বিশ্বস্ত। আমাদের এই বিশ্বস্ততা অটুট থাকলে – আমরা রাজ্যের প্রতি তো বটেই – যে কোন রাজার প্রতিও সর্বদা বিশ্বস্ত থাকব। আমাদের এই সকল বিশ্বস্ততায় যদি কোনভাবেই হাত না পড়ে – তাহলে রাজার সিংহাসনে কখন কে বসল। কিংবা কখন কে উলটে গেল – তাতে কিছু কী যায় আসে আমাদের? আর আমাদের এই প্রভাব-প্রতিপত্তির সুবিধায় যদি কোনদিন টান পড়ে, বিপ্লবী হয়ে উঠতে আমাদের কতদিন লাগবে? ... ...

পড়েছিলাম, খানিকটা পড়েছিলাম, বলে উল্কি। লেকের মোটামুটি পূবে বলিভিয়া আর পশ্চিমে পেরু; পৃথিবীর উচ্চতম নাব্য সরোবর, দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম, বিরাট বড় জাহাজও অক্লেশে চলতে পারে। মুড়কি বলেছে যেদিকেই তাকানো যাক জল ছাড়া আর কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। এই লেকের ওপর ছোটবড় অন্তত একচল্লিশটা দ্বীপ আছে, কাজেই তার মধ্যে যে কোন একটা দ্বীপে মুড়কিকে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে। ... ...