
ছোড়দি সেতার বাজিয়ে গেয়েছিলেন, সঙ্গতে তবলায় পন্ডিতজি। গান শেষ হতে, বড়ো জ্যাঠা আর সতীশ কাকা দুজনেই দুষলেন পন্ডিতজিকে, অমন ম্লেচ্ছ গান শেখাবার জন্য। পন্ডিতজি তর্ক দিয়েছিলেন যে শহরের বহু গণ্যমান্য বাঙালি পরিবারে তিনি এই গান শিখিয়েছেন। তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, তারা সব ম্লেচ্ছ পরিবার, অব্রাহ্মণ। গানটা নিয়ে সমবেত প্রসাদপ্রার্থিরা যে একমত নন, তা স্পষ্ট হয়েছিল বড়িশা-বেহালার জ্ঞাতি দাশরথিজেঠুর এই মন্তব্যে, ""ওহে আমরা নিজেরাই তো ভঙ্গকুলীন, সিরাজদৌলার চাকর, আমাদের আবার মেলেচ্ছো''! ইমলিতলা পাড়ার কোনো বাসিন্দাকে কিন্তু ম্লেচ্ছ তকমা দেয়া হতো না। আমরা পাড়ার সমবয়সীদের সঙ্গে, চোর-পুলিশ খেলার সময়ে, যার বাড়িতে ইচ্ছে ঢুকে যে-কোনও ঘরে লুকিয়ে থাকতে পারতুম, এমনকি নাজিমদের পোড়ো বাড়িতে বা ওদের বাড়ির সামনের মসজিদে। নাজিমের দিদি কুলসুম আপা আমাদের বাড়িতে হাঁসের ডিম বিক্রি করতে এসে, মা আর কাকিমাদের সঙ্গে গল্প করতেন। ... ...

আগেকার বৈয়াকরণিক আর আভিধানিকদের গভীর বিশ্বাস ছিল যে সংস্কৃতই বাংলার জননী, আর সংস্কৃত ব্যাকরণই এর আদর্শ। শ্রীনাথ সেন যেমন লিখছেন তাঁর "প্রাকৃত ব্যাকরণ এবং অভিধানে', "বাঙ্গলা ভাষা সংস্কৃত ব্যাকরণের দ্বারা প্রশমিত হইতে পারে এবং তাহা হইলেই ইহার কল্যাণ' তিনি আরো স্পষ্ট করেই লিখছেন, বাংলা ব্যাকরণ," সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুষঙ্গী হইতে পারে, স্বতন্ত্র ব্যাকরণ হইতে পারে না।' সুতরাং দ্বিজে¾দ্রনাথ-রবী¾দ্রনাথ দুই ভাই এবং সাহিত্য পরিষদের অপরাপর বিদ্বজ্জনেরা সেই কাজগুলোই করলেন যেগুলো করলে বাংলাকে বাংলা বলে দাঁড় করানো যায়। কেরি যেখানে লিখেছিলেন বাংলার তিন চতুর্থাংশ শব্দ সংস্কৃত, সেখানে "বাংলা ভাষা পরিচয়ে' গিয়ে রবী¾দ্রনাথ লিখে ফেললেন, "বানানের ছদ্মবেশ ঘুচিয়ে দিলেই দেখা যাবে, বাংলায় তৎসম শব্দ নেই বললেই হয়।' ব্যাকরণের প্রচলিত উপাত্তগুলোকেই ধরে ধরে তাঁরা সমালোচনা শুরু করলেন, আর দেখিয়ে গেলেন সংস্কৃতের থেকে বাংলার তফাৎটা কোথায়। এই করতে গিয়ে রবী¾দ্রনাথকে দেখা গেল অসমিয়া-ওড়িয়া সহ আশেপাশের বেশকিছু ভাষা নিয়েও তুলনামূলক আলোচনাও করে নিতে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর "চর্যাপদে'র আবিষ্কারটাও মোটেও আকস্মিক ছিল না। তাও ছিল বাংলার "বাঙ্গালি'ত্ব আবিষ্কার প্রয়াসের অংশ মাত্র। ... ...

নিরাশ হতে হল ছাদে যাবার চেষ্টায়। দোতলা থেকে তেতলায় ওঠার সিঁড়িটিতে নাকি ফাটল দেখা দিযেছে, সেই কারণে এই সতর্কতা। ছাতেই সেই বার্মিজ ঢঙের চন্দ্রাতপ, প্যাভিলিয়ন, কবির অনেকটা সময় কেটেছিল এইখানে। অদেখা ইয়ারোর কিছু স্বপ্ন নিয়েই ফিরতে হল, তবে এভাবে দেখলে ব্যাপারটা হজম করা যায়। এর প্রতিকার করা আজকের প্রযুক্তি কৌশলের কাছে কিছুই নয়, বাংলাদেশে বহু ভালো প্রযুক্তিবিদ আছেন, আশা করি সরকার এতদিনে সব ঠিক করে তেতলা ওঠার পথটা খুলে দিয়েছেন। অসুবিধের মধ্যে গাইডরা সবসময় জিউলির আঠার মতো সঙ্গে ছিলেন, এই এঁদের কাজ, এতে আপত্তি করা যায় না। তাছাড়া যাঁর শবদেহ থেকে শ্মশ্রু উৎপাটিত হয়েছে, তাঁর মশারীর চাল যে চুরি হবে না, সে গ্যারাণ্টি কে দেবে। তবে একটু সময় একলা থেকে স্মরণ করতে পেলে ভালো লাগতো। ... ...

ধর্মের মূলকথাই হলো মানবিকতা। ধর্মকে বোঝার আর বোঝানোর মূলকথাও তাই। কোরানের ব্যাখ্যা করতে হলে আগে দেখা দরকার যে আমরা কোন পথে হাঁটবো। আমরা কি সেই পুরনো সময়ে আটকে থাকা আক্ষরিক মানে বেছে নেবো? নাকি দেশ-কালের উপযোগী ভাবার্থকে নিয়ে এগোবো? বলতে বাধ্য হতে হয় যে আমাদের মুসলিম বুদ্ধিজিবীদেরই কোথায় যেন খামতি থেকে গেছে। যাঁরা ইসলামের আসল ব্যখ্যা তুলে ধরতে পারতেন, ধর্মাচরণের রাস্তায় কোথায় যেন তাঁরা পিছিয়ে পড়েছেন। তার ফলে ধর্মকে লড়াইয়ের হাতিয়ার বানিয়ে একদল তথাকথিত ধর্মগুরু আজ সারা মুসলিম দুনিয়া কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের কাজই হলো মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বোঝানো যে "আমাদের ওপর অন্যায় হয়েছে, তাই এখন শোধ তোলার দিন'। এদেরই প্ররোচনায় মানুষের মনে প্রতিনিয়ত ঘৃণা আর তিক্ততা ভরে যাচ্ছে। আর সেই থেকেই রোজ তৈরী হচ্ছে হাজার হাজার সন্ত্রাসী, খুনে, আতংকবাদী। কোনো অর্থাভাব নয়, কোন বঞ্চনা নয়, শুধুমাত্র ঘৃণা আর বিকৃতির আদর্শ রোজই জন্ম দিচ্ছে উগ্রপন্থার। ... ...

আপাতত আমরা কেবলের দৌলতে বিদেশী সিনেমার সহজলভ্যতার (এবং সেই খাতিরে সাধারণ দর্শকের জ্ঞানোপলব্ধির প্রসার) বিষয়টি পরবর্তী কোনো কিস্তিতে আলোচনার জন্য তুলে রাখলাম। প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হল -কেবল টিভি যে সময়টুকু নিয়ে নিচ্ছে তার সঙ্গে সিনেমার উৎকর্ষের কী সম্পর্ক? একথা ঠিক যে কেবল টিভির প্রবেশ (বা অনুপ্রবেশ) দর্শকদের সময়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে অর্থাৎ আপনি যে সময়টুকু আগে সিনেমার পেছনে দিতে রাজি ছিলেন সেই সময়টুকুর দাম এখন অনেক বেশি, কারণ হাতের কাছেই রয়েছে অন্য বিকল্প। একথাও অনস্বীকার্য যে বিকল্পটি তুলনামূলক ভাবে বেশ শস্তাও। আপনি ওই দামি সময়টুকু কখন খরচ করবেন তাহলে? নিশ্চয় থোড় -বড়ি -খাড়া দেখে নয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আপনি সিনেমা হলের দিকে তখনই যাবেন যখন আপনি জানেন মনোরঞ্জন কি ইন্টেলেকচুয়াল স্টিমুলেশন যাই আপনার অভীষ্ট হোক না কেন সেটির মান সাদা বাংলায় একদম টপ-ক্লাস। তর্কের এই আঙ্গিকে তাহলে এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে চলচ্চিত্রের গুণগত মান সার্বিক ভাবে বাড়া উচিত চিত্র্যনাট্যই হোক কি সিনেমাটোগ্রাফি কি আইটেম নাম্বার - চাই "আউট অফ দ্য বক্স' ভাবনাচিন্তা। এই থিয়োরি অনুযায়ী তাহলে কম কিন্তু বেশ ভালো সিনেমার এই মুহূর্তে বাজার ডমিনেট করা উচিত কিন্তু সেটা কি আদৌ বাস্তব? ... ...

রাজ্য পরিচালনার ভার যে রাজনৈতিক দলের হাতেই থাকুক না কেন, শাসকশ্রেণী অর্থাৎ পুলিশবাহিনীর সঙ্গে তাদের অশুভ আঁতাত যে কোনও সময়েই বিয়ের মত বাঁধনের চাইতেও বেশী শক্তপোক্ত হয়ে দাঁড়ায়, এমনটা যেন একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে উঠেছে। আর ঠিক এমনটাই না হলে মনে হয় না যে ক্ষমতাসীন দলটির পক্ষে রাজ্যে শাসন করা আদৌ সম্ভব হবে। গোটা বিশ্ব জুড়ে মানুষ, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক নেতা, সবাই শান্তির কথা বলে, সমস্যা ইত্যাদির শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বাতলায়। কিন্তু তারা এই কথা বলে হয় শাসকদল অথবা জোটের অন্তর্ভূক্ত হয়ে, নিজের হাতের মুঠোয় পুলিশি ক্ষমতা রেখে। এ এক আজব পরিস্থিতি; আমি এক রাজনৈতিক নেতা সশস্ত্র পুলিশবাহিনী এবং কম্যান্ডোদের (আমার স্ট্যাটাস যদি তাই হয়) সুরক্ষাবেষ্টনীর মধ্যে থেকে সাধারণ জনগণকে হিতোপদেশ বিতরণ করতে আসবো, তাদের সমস্যার প্রজাতান্ত্রিক সুরাহা দর্শাবো, আমার নিরাপত্তারক্ষীরা পুরো ঘটনার সময় চারদিকে নজর রাখবে, তারা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে থাকবে, সেইসব সাধারণ মানুষ যারা ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করেছে তাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাবে, কারণ তারা দেখতে চায় কোন ভোট-নাগরিকের হাতে আমার সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। এত এত সংখ্যক পুলিশ আর সশস্ত্র কম্যান্ডোরা, বিপুল পরিমাণ এই আগ্নেয়াস্ত্রের ভান্ডার রক্ষীদল এবং প্রজাতন্ত্রের হাতে, এসব দেখে আমার মন কু-গায়, হয়ত প্রজাতন্ত্র একটা অতিবিপজ্জনক প্রস্তাবনা - এই বুঝি খুব খারাপ কিছু ঘটে গেল। এইভাবে দেখলে মনে হয় আমাদের গণতান্ত্রিক অব্যবস্থা একটা রূদ্ধশ্বাস থ্রীলার। ... ...

নীরদ সি. "আত্মঘাতী বাঙালী' বইটিতে তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গীতে বলেছিলেন "বাঙালীর জাতীয় যৌবনের প্রভাতের কথা দূরে থাকুক, সন্ধ্যার কথাও কেহ বলে না। শুধু উহাই আত্মঘাতী হইবার একটা লক্ষণ'। সেই হিসাবে "গান্ডু' সম্পর্কে কিছু কিলোবাইট খরচা না করলে শুধু যে কৃপণ হিসাবে বদনাম রটার সম্ভাবনা থাকবে তাই নয়, নীরদীয় উবাচ অনুযায়ী ব্রহ্মপাপী হয়ে থাকতে হবে। এখন প্রশ্ন একটাই - "গান্ডু' কি বাংলা সিনেমার ভোরের সূর্য নাকি মধ্যরাত্রির অন্ধকার? সে উত্তর দেওয়ার আগে কিছু প্রাককথন নিতান্তই দরকার। ... ...

জীবনে অনেক সময়ই এসেছে যখন আমার স্বদেশবাসী আমার গান নিয়ে নিন্দের ঝড় তুলেছেন,তীক্ষ্ণ সমালোচনায় আমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছেন,সে সময়গুলোয় নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিয়েছি। নির্বোধ আর ছোটমনের কতজনকেই তো আমাকে নীচু করার চেষ্টায় উঠেপড়ে লাগতে দেখলাম! কিন্তু এই জীবনেই আবার এইরকমও কিছু দুর্লভ মুহূর্ত আছে যখন মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে -- জীবন আমাকে এই রকম অসাধারণ কিছু ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি আসার সুযোগ দিয়েছে বলে, আমার হাত দিয়ে ওঁদের নিয়ে এরকম গান লিখিয়ে নিয়েছে বলে। ... ...

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করা, ভাবনাচিন্তা করা, প্রথা বহির্ভূত শিক্ষার সঙ্গে জড়িত থাকা, ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে এই উপলব্ধি হয়েছে যে বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা বলে যা প্রচলিত, তার সঙ্গে "শিক্ষা' র সম্পর্ক খুবই কম। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির এই সিস্টেমটাকে বরং বিদ্যালয়-ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। এই ব্যবস্থাটিতে শিক্ষা বস্তুটি অনুপস্থিত থাকে। কিন্তু এই ব্যবস্থা থেকে কিছুই শেখা হয় না তা বলে দেওয়া যায় না। যদিও কেউ কেউ তাই বলেন। এমনিতে ক্লাসরুমে বসে শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রদের যেটুকু ভাবের বিনিময় ঘটে, তাতে ছাত্র ও শিক্ষক উভয়েই যে জ্ঞানার্জন করেন, তা হয় ঘটনাচক্রে। তাই বলা যেতে পারে এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও ছাত্ররা একেবারে কিছু শেখে না তা নয়। তবে সে শিক্ষার পেছনে এই প্রচলিত ব্যবস্থার অবদান কম। "শিক্ষা' যেটুকু হয় সেটা হয় ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে কিছুটা বাইরে থেকে। ... ...

আয়লার পর সুন্দরবন গিয়ে আমার মনে হয়েছিল, যদি আয়লার ধ্বংসলীলা না ঘটতো তাহলে সুন্দরবনের সমস্যা দেশের তো বটেই, এমনকি রাজ্যের সচেতন মানুষদের কাছেও অজানা রয়ে যেতো। সুন্দরবনবাসীদের মুখে বার বার শোনা যাচ্ছিল, যদি আয়লার মত বা তার চেয়ে বড় কোনও সমুদ্র তুফান আবার হয়, তাহলে কি হবে। তারপর তিনবছর কেটেছে। আয়লার ভয়ঙ্কর ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণগুলি বিভিন্নজন, যারা বিষয়টি বোঝেন ও কাছ থেকে দেখেছেন,তাঁরা চিহ্নিত করেছিলেন। সমাধানের উপায়ও বাতলে দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল বাদাবন বাড়ান, এমব্যঙ্কমেন্ট সারানোর নিয়মিত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বীরভূমের পান্নালাল দাশগুপ্তের পথে ফ্লাড সেন্টার তৈরী পর্যন্ত নানারকম সমাধান সূত্র, এই পরামর্শগুলির পিছনে ভাবনা ছিল, সমবেদনা ছিল, ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতার জোর। কিন্তু কিছুই হয়ে ওঠেনি সুন্দরবনে। পানীয় জলের সংস্থান টুকুও নয়। ... ...

চলতি কনস্পিরেসি থিয়োরীগুলোর মধ্যে আমার সবচাইতে পছন্দেরটা হল পাকিস্তানকে বহির্বিশ্বের চোখে হেয় করার জন্য আমেরিকান সেনা ওসামা'কে অন্য কোথাও থেকে অপহরণ করে আবোত্তাবাদে এনে গুলি করে মারে! এটা করতে গিয়ে আমেরিকা নিশ্চই নিজেদের চারটে চপার আর নৌবহরের "এলিট' কম্যান্ডোদের নিরাপত্তার কথা ভেবে দেখেনি। দু:খের কথা হল, এইধরণের বস্তাপচা থিয়োরী পাকিস্তানের মূলধারার ভাবচিন্তারও একটা অংশ। আসলে, পাকিস্তানকে অপদস্থ করবার জন্য কোনও দেশকেই কিছু করতে হবে না। আত্মবীক্ষণের অণুমাত্র যদি আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে তাহলে একটা দেশ হিসেবে আমাদের লজ্জা বোধ করা উচিত। ... ...

"গো গোয়া'। গোয়া পর্যটনের বিজ্ঞাপন। প্রায় প্রতিটি রাজ্য, বিশেষ করে যারা পর্যটনকে ভালোরকম অর্থকরী শিল্প হিসেবে দেখছে, এই ক্যাচ ফ্রেসগুলি নিয়ে আসে। "ঈশ্বরের দেশ', "ভারতবর্ষের হৃদয়'...। আমাদের "গো গোয়া' স্থির হল অক্টোবরের শেষে। এই সময় কেরালায় দ্বিতীয় বর্ষাকাল। অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর। বিকেল থেকে মেঘ করে আসে, সারা রাত্তির বৃষ্টি। সকাল বেলায় নীলকান্তমণি আলোয় চারিদিক ঝকমক করে। পাঞ্জিম-এও দেখলাম মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের থাকার আস্তানা,শহরের ল্যাটিন পুরোনো হেরিটেজ অঞ্চল ফন্টেইনাস -এ। "পাঞ্জিম ইন'। বেশী পুরোনো নয়, উনিশ শতকে বানানো। রাস্তার দিকে রট আয়রনের "বালকাও'। ঝুল বারান্দা। ভেতরের ঘর,সিঁড়ি, দালানের পাষে মস্ত খাবার জায়গা কলোনিয়াল আসবাব, ছবি,আয়নায় সাজানো। সেরামিকের নীল-সবুজ টালি বসানো ফোর-পোস্টার বেড। ফন্টেইনাসে এই রকমই সব বাড়ী। সদর দরজার দেওয়ালে লাগানো নীল-সাদা হাতে আঁকা আজুলেজো (Azulejo) টালি তে গৃহকর্তার নাম, বাড়ীর নম্বর। রাস্তায় একটু এগিয়ে আঠেরো শতকের সেন্ট সেবাস্টিয়ান চার্চ। ... ...

আগের খসড়াটি পেয়ে অনেকেই নানা মতামত দিয়েছেন। তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। কিছু মতামতের ভিত্তিতে দ্বিতীয় খসড়াটিও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যথাস্থানে। সেটিই হুবহু আকারে এবার প্রকাশ করা হল বুলবুলভাজায়। সময়ের চাপে এবারও খসড়াটি ঠিক দানা বাঁধেনি। খসড়াটি আজ প্রকাশিত হলেও যেহেতু এটি পাঠানো হয়েছে যথেষ্ট আগেই, তাই সমস্ত মতামতগুলি নিয়ে এখানে আলোচনাও করা যায়নি। পরবর্তী খসড়ায় অতি অবশ্যই বাকি মতামতগুলিকে স্থান দেওয়া হবে। সে কারণেই এইটি নিয়েও আলোচনা আহ্বান করা হচ্ছে। ... ...

সত্যি বলতে কি দেশভাগের পর বাংলাদেশ (তখন বলতো পূর্ব পাকিস্তান) আর পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলে যে দাঙ্গা বেধেছিলো তখন থেকেই সংস্কৃতির আর ভাষা এই দুটো জিনিষ যে একেকটা রাজ্যের কাছে কত জরুরী তা কেউ ভেবেই দেখেনি। যে টুকরো টুকরো রাজ্যগুলো একসাথে মিলিয়ে দেশ তৈরী হলো তাদের সবার মুখের ভাষা যে তাদের পরিচয়ের একটা অঙ্গ এমনটা কারুর মনেই হয়নি। কোন দেশের সরকারের মনে যদি সবসময় ভয় থাকে যে "এই বুঝি রাজ্য গুলো সব আলাদা আলাদা হয়ে পড়লো', তাহলে সেদেশের মূল কাঠামোটাই যে কত নড়বড়ে তা বুঝতে কষ্ট হয়না। তখন মনে এই প্রশ্নটাও জাগে যে "দেশের কাঠামোটা সত্যিই কতটা ফাঁপা? কতদিন আর এমনি "একতা'র ভান করে চালানো যাবে?' ... ...

'আ স্ট্রীট কার নেমড ডিসায়ার', নাটকের এমন নাম শুনলেই মনে হয় এটা এমন একটা মানুষের লেখা যিনি খুব খুঁটিয়ে রাস্তা দেখতে ভালবাসেন। যিনি বস্তুত এতটাই নির্জন মানসিক পৃথিবীর বাসিন্দা যে এতটা খুঁটিয়ে রাস্তা দেখার অবকাশ পান।রাস্তার গাড়িটার নাম যে ইচ্ছা হতে পারে তা তিনি জানতে পারেন এবং গভীর মমতায় সংরক্ষণ করেন সেই জানাকে। জীবনের যে রাস্তায় এই ইচ্ছেগাড়িটি চলে সেই রাস্তার সম্পর্কে টেনেসির পর্যবেক্ষন নিয়েই এই নাটক। ... ...

হ্যঁ¡, আমি পারি। চুল্লিতে ইউরেনিয়াম ফিশনের সময় প্রায় দু'শ নতুন পদার্থ তৈরি হয়। এর সবগুলোই তেজস্ক্রিয় এবং মানুষের তৈরি। এর কোনোটা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী, কোনোটা কোটি কোটি বছর বেঁচে থাকে। এখন এর মধ্যে অনেকগুলো এক্সরে-র মতো গামা তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণ করে। কিন্তু অনেকেই তা করে না। অতএব যখন বাইরে থেকে আসা তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পরিমাপ করা হয়, অর্থাৎ আপনাকে একটা তেজস্ক্রিয় পদার্থের আবরণে ঢেকে ফেলা হয়, আপনি এক্স-রে ধরনের কোনো বাইরে থেকে আসা মাত্রা পান। কিন্তু এটা সকলের বোঝা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে, যদি আপনি প্লুটোনিয়াম, আমেরিসিয়াম, কিউরিয়াম বা তেজস্ক্রিয় আয়োডিন নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন, যদি পদার্থগুলো খাদ্য-শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে --- অ্যালগি, ক্রাস্টাসিয়ান, ছোটো মাছ, বড়ো মাছ, মানুষ ---- অথবা উদ্ভিদ, যেমন লেটুস, পালং, ঘাস থেকে গরুর শরীরে ও গরুর দুধে --- জৈবগতভাবে সঞ্চিত হয়, তাহলে আপনি আপনার শরীরের ভিতরে এইসব পদার্থ গ্রহণ করে নিচ্ছেন। এগুলো থাকছে, যেমন স্ট্রনশিয়াম ৯০ জমা হচ্ছে হাড়ে। সেখানে এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিমাণ একটি পরিচালন-জিনকে একটি কোষে পরিবর্তিত করে, যার থেকে পাঁচ বছর পরে আপনার লিউকোমিয়া হয়, কিংবা পনেরো বছর পরে হয় ক্যানসার। আর এই ব্যাপারটা অন্য সকল পদার্থের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই লোকে অস্পষ্টভাবে মাপা কিছু বাইরে থেকে আসা তেজস্ক্রিয়তার মাত্রার সঙ্গে অভ্যন্তরে বিকিরণকারী তেজস্ক্রিয়তার তফাতটা বোঝে না। আর তাই সকলকেই আভ্যন্তরীণ বিকিরণকে বুঝতে হবে। আমি আমার "নিউক্লিয়ার ম্যাডনেস' এবং সম্প্রতি প্রকাশিত "নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইজ নট দ্য আনসার টু গ্লোবাল ওয়ার্মিং' বই দুটোতে এই বিষয়টা নিয়ে লিখেছি যাতে সকলে বুঝতে পারে। ... ...

পরমাণু শক্তি চাই না। অনেকেরই ধারণা শক্তির এই চমকপ্রদ উৎসটি বাদ দিলে মানবজাতির শক্তির প্রয়োজন কিছুতেই মেটানো যাবে না। যদি বলা হয় পরমাণু শক্তি তো পৃথিবীতে ব্যবহৃত শক্তির ৬ শতাংশেরও কম যোগান দেয়, যেখানে জৈবভর অর্থাৎ কাঠ-পাতা, জীব-বর্জ্য, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি থেকে পাওয়া যায় ১০ শতাংশ। কী এমন প্রভাব পড়বে পরমাণুর অংশটা অন্য উৎস থেকে মেটালে? তখনই শোনা যাবে খনিজ জ্বালানির সীমিত ভাণ্ডারের সমস্যা। তেল-গ্যাস-কয়লার ভাণ্ডার সত্যিই সীমিত। যে ক্রমবর্ধমান হারে এগুলি পোড়ানো হচ্ছে তাতে কয়েক দশকের মধ্যেই তেল-কয়লা সরবরাহে টান ধরবে অবধারিত ভাবেই। ইদানীং আবার তেল-কয়লা জ্বালানোর জন্য অন্য এক গভীর সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে --- বিশ্বের উষ্ণায়ন ঘটছে এবং তার প্রতিকারে জোর চাপ বাড়ছে কার্বন-ভিত্তিক জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে এনে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে একটি সহনীয় মাত্রায় আনতে। সব মিলিয়ে এই শতাব্দীতে শক্তি সরবরাহের প্রধান উৎসগুলোর স্থায়িত্ব ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন শক্তির ক্ষেত্রে সাবেকি পথ ছেড়ে নতুন দিশার সন্ধান করতে হবে। ... ...

৩ এপ্রিল বিকেলবেলা যাদবপুর চিত্তরঞ্জন কলোনিতে 'শামিল ছোটোদের পাঠশালা'য় মন্থন পত্রিকার পক্ষ থেকে একটি আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছিল। এই সভায় জাপানের পরমাণু বিপর্যয় নিয়ে প্রাথমিকভাবে একটা ধারণা দেওয়ার জন্য সুজয় বসুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল এবং অনেকদিন থেকে আগ্রহী আরও বেশ কয়েকজন এই সভায় অংশ নিয়েছিলেন। সুজয় বসু বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। হিরোশিমা-নাগাসাকির স্মৃতি এখনও মুছে যায়নি। জাপানিদের মধ্যে পরমাণু বিরোধী যে সংগঠন আছে তা বেশ জোরালো। প'¡শের দশকের শুরু থেকে তারা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছিল। জাপানের শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘকাল ধরে একটা সমস্যার মধ্যে থেকে যাবে দেখে তারা শক্তি সমস্যা সমাধানের একটা চেষ্টা করে। কারণ পুনর্গঠনের কাজের জন্য, সব কিছু সারানোর জন্য শক্তি বা এনার্জি দরকার। জাপানের নিজস্ব কোনো খনিজ সম্পদ না থাকায় পরমাণু শক্তির ওপর তাদের একটা আকর্ষণ ছিল। ... ...

এই বইটা যারা কোলকাতাকে নোংরা করে আর পরিষ্কার করে তাদের জন্য। ... ...

এদেশের সমাজ, যেকোনো উন্নত সমাজের মতোই, প্রকৃতির দেওয়া জলকে ব্যবহার করবার বহু বহু উপায় জানত। পুকুর তার একটি। নদী থাকে নদীর জায়গায়, তার কিনারে বসে শহর, গ্রাম, শস্যের ক্ষেত। কিন্তু যেখানে বড় নদী নেই? সেখানে জলকে কীভাবে কাছে আনবে মানুষ? সেইসব কাছের জলভাণ্ডার ছিল পুকুর-দিঘি-সরোবর। এদেশে একটা বিরাট সুবিধা এই যে বর্ষার এক নির্দিষ্ট সময় আছে। প্রায় দিন তারিখও ঠিক আছে তার। যে অতিথি অঘোষিত, হঠাৎ আসেন, তাকে নিয়ে গৃহস্থ বিব্রত হতে পারেন, কিন্তু যে অতিথি আগাম খবর দিয়ে, তূরী-ভেরী বাজিয়ে 'রাজব্য উল্বতধ্বনির' প্রবেশ করেন তাঁর জন্য তৈরি থাকার সময় পাওয়া যায়, আয়োজন করা যায়। শেষ বসন্তে জল কমে যাবার পর থেকে পল্লির মানুষেরা নিজের নিজের এলাকার পুকুরের পাঁক কেটে তুলতেন। সেই তোলা পাঁকের কিছু অংশ নিয়ে সারা বছরে ভাঙাচোরা পাড়ের মেরামতি হত। বাকিটা বয়ে নিয়ে যেতেন নিজেদের জমিতে। গ্রীষ্মে শুকনো খরখরে হয়ে যাওয়া সেই পাঁক মাটি বর্ষার আগে আগে 'মই দিয়ে' খেতে ছড়িয়ে দিলে খুব ভালো সার হয় সেকথা জানা ছিল। সম্পূর্ণ গৃহস্থেরা পুকুর কাটাতেন, কেবল নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে নয়, বাইরেও। জল দান করা বড় পূণ্য কাজ ছিল। ... ...