• টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। যে কোনো নতুন আলোচনা শুরু করার আগে পুরোনো লিস্টি ধরে একবার একই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে কিনা দেখে নিলে ভালো হয়। পড়ুন, আর নতুন আলোচনা শুরু করার জন্য "নতুন আলোচনা" বোতামে ক্লিক করুন। দেখবেন বাংলা লেখার মতো নিজের মতামতকে জগৎসভায় ছড়িয়ে দেওয়াও জলের মতো সোজা।
  • নিমো গ্রামের গল্প

    সুকান্ত ঘোষ
    বিভাগ : অন্যান্য | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৫২০০ বার পঠিত
আরও পড়ুন
বলি! - Tridibesh Das
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2 | 3 | 4
  • Ela | 237812.69.453412.38 | ৩০ জুন ২০১৯ ১৬:২২381856
  • ইসসস, এইরকম একটা ভিয়েনওলা বিয়েবাড়ি সদ্য মিস করেছি ছাতার চাকরির চোটে। সুকির পেটখারাপ হোক।

    তবে লেখা বরাবরের মতো সুস্বাদু ও দারুণ!
  • Amit | 237812.68.6789.27 | ০১ জুলাই ২০১৯ ০৫:২৭381857
  • বাপরে, ওজন কি ল্যাব স্কেল বা সোনার দোকানে নিয়েছিলে ? একেবারে ৬৫৩ গ্রাম ? ডেসিমাল ছিল কোনো ?
  • সুকি | 237812.68.786712.15 | ২৭ জুলাই ২০১৯ ১৩:৩৫381858
  • বাবুর বিয়েতে জগা
    ---------------------------

    বাবুর বিয়েতে বরযাত্রী গিয়ে আমড়া পাড়ার ব্যাপারটা তো আগের বার বুঝিয়ে লিখলাম, কিন্তু তার আগে খেতে বসে যে জিনিসটা হয়েছিল সেটাও মনে হয় লিখে রাখা দরকার। তো হয়েছে কি গুটকে কচুরী দিয়ে টিফিন সাঁটিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে তো খিদে বাড়াচ্ছিলাম। এই করতে করতে এক সময় খাবার ডাক এল প্যান্ডালে। “গণেশ জননী ক্যাটারার” ছিল দায়িত্বে, ওলাইচণ্ডিতলা, শুঁড়েদূর্গাপুর নাকি কোনদিক থেকে আগত। পিছনের দিকে লাগানো ব্যানার দেখে সেরকমই মালুম পেলাম।

    গুটিগুটি পায়ে সাইডের দিকে একটা টেবিলে গিয়ে ঠাঁই নিলাম – চার জনের টেবিল, আমার সাথে টেবিলে ছিল পিসির ছেলে জগা। জুত করে বসে জল দিয়ে প্লেট ধুয়ে ভেজিটেবল চপের জন্য ওয়েট করছি। ব্যাপার হল আমি তখনও মেনু কার্ড দেখি নি, কিন্তু যে বিয়ে বাড়িতে টিফিনে গুটকে কচুরী খাওয়ানো হয়েছে, সেই বিয়ে বাড়িতে প্রথম পাতে ভেজিটেবল চপ আসবে না এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। এক চামচ কাসুন্দী ঢেলে দিয়ে গেল পাতে কালো জামা পরা ক্যাটারিং ছোকরা। তার পরে এল বহু প্রতীক্ষিত সেই চপ। তবে মাল ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গ্যাছে – এবং দরকোঁচা মেরে ওভাল আকৃতি দেখতে হয়ে গ্যাছে প্রায় লাল-মুখো ধেড়ে বাঁদর গুলোর বীচির মত। এখন মনযোগী পাঠক প্রশ্ন তুলতে পারেন যে লাল-মুখো বাঁদরের বীচি কেমন দেখতে হয় কেমন করে জানলাম বা সেই জিনিস নিয়ে নাড়াঘাঁটা করেছি কি? এই প্রসঙ্গে বলে রাখি আমি সত্যিই কিন্তু দীর্ঘদিন বাঁদর-দের কাছাকাছি ছিলাম ব্রুনাই -এ। বার বার তাদের তাড়া খেয়ে এবং বাড়ির বারান্দা, বাগান থেকে বাঁদর খেদিয়ে বাঁদর বিষয়ক সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট। কোন বাঁদর অ্যাগ্রেসীভ, কোন বাঁদর শান্ত, কার বীচি কেত বড়, কি রঙের হতে পারে, সে সব দূর থেকেই বলে দিতে পারি আজকাল। তবে বাঁদর বিষয়ক গল্প অন্য কোন সময়।

    সেই ঠান্ডা ভেজিটেবল চপে কামড় দিয়ে জগাকে বললাম, “কি রে, বিয়ে-থা কর এবার একটা”। জগা সেই কবে মাষ্টার্স ডিগ্রী কমপ্লিট করে এখন কাপড়ের ব্যবসা সামলাচ্ছে। প্রশ্ন করেই বুঝতে পারলাম, খুব সেন্সিটিভ জায়গায় হাত দিয়ে ফেলেছি। জগা বলল, “আর বলো না সুকান-দা, বিয়ে যে করব মেয়ে কোথায়?” আলোচনায় যা বুঝতে পারলাম, সে বড় করুণ অবস্থা গ্রামে গঞ্জে – চাকুরী না করলে মেয়েরা বিয়ে করতে রাজী হচ্ছে না, আর সরকারী চাকুরী না করলে মেয়ের বাবারা বিয়ে দিতে রাজী হচ্ছে না। আগে থেকে প্রেমে জড়িয়ে না পড়লে ব্যবসা করছে এমন ছেলের বিয়ে হওয়া প্রায় অসম্ভব।

    আর সেই অসম্ভব কেই সম্ভব করে নিয়মিতই আমার পিসতুতো বৌদি। আমার আরেক পিসির ছেলে সুবু-দার বৌ। এই যে বাবু-র বিয়ে খাচ্ছি, এই বিয়েও সম্ভব হয়েছিল বৌদির জন্য। না হলে বাবু-ও ব্যবসা করে – সূত্র মেনে বাবুর-ও বিয়ে হওয়া চাপের ছিল। বিয়ের সমন্ধ করে বেড়ানো বৌদি-র এখন হবি হয়ে গ্যাছে প্রায়। অবিবাহিত ভাই, দেওর ইত্যাদি ইত্যাদি দের বিয়ে দেবার পণ নিয়েছে বৌদি।
    আমার আর জগার আলোচনা চলছে রাধাবল্লভী দিয়ে ঘুঘনী খেতে খেতে – এমন সময় দেখি বৌদি হন্তদন্ত হয়ে প্যান্ডেলে ঢুকছে একটা লোকের সাথে। আমাদের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল – একেবারে আমাদের টেবিলের কাছে এসে জগা-কে বৌদি বলল, “এই জগা, চট করে একটু উঠে দাঁড়াও তো”। জগাও দেখি প্রশ্ন শুনেই তথমত খেতে তড়াং করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো সেই যেমন সিনেমায় আমেরিকার সৈন্য গুলো ‘ইয়েস স্যার’ বলে ঠুকে দাঁড়ায় তেমন। এবার সেই তড়াং করে উঠে দাঁড়ানোয় টেবিল গ্যাছে নড়ে, প্লাষ্টিকের জলের গ্লাস গ্যাছে উলটে আমার থালায় যেখানে তখনো ঘুঘনী উদরস্থ হবার জন্য ওয়েট করছিল। সেই ঘন ঘুঘনী ডায়লিউট হয়ে তুরন্ত টেবিল দিয়ে গড়িয়ে ডিজাইনার পাঞ্জাবীর কোলে। পাঞ্জাবী সামলাতে সামলাতে শুনলাম বৌদি লোকটাকে বলছে, “দেখে নিন তা হলে ভালো করে”। আড়চোখে দেখলাম লোকটা জগা-কে আগাপাস্তালা দেখে নিচ্ছে। আর জগাও হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কেস কিছুই বুঝতে পারছি না – একটা লোক রাতের বেলায় দুম করে একটা একটা ছেলে চেয়ে চেয়ে দেখবে কেন, আর সেই ছেলেই বা হাসি হাসি মুখে থাকবে কেন। প্রায় ৪০ সেকেন্ড মত দেখাদেখি শেষে বৌদি আর সেই লোকটা পিছু ফিরে চলে গেল। যেতে যেতে গুনি বৌদি বলছে, “দেখে নিলেন তো সব ঠিক ঠাক, বলেছিলাম না আমার সব দেওর-রাই লম্বা চওড়া, সেই নিয়ে আপনাকে কিছু চিন্তা করতে হবে না! তা হলে হয়ে যাবে তো?”

    জগা-কে বললাম, “এ্যাই খ্যাপাচোদা, বৌদি দাঁড়াতে বলল, আর তুই আগাপাস্তালা না দেখে হুড়ুম করে দাঁড়িয়ে গেলি? ব্যাপারটা কি?” জগা বলল সে নিজের স্বার্থেই দাঁড়িয়েছে, ওই লোকটা ঘটক। বরযাত্রী আসার আগে বৌদির সাথে কথা হয়ে গিয়েছিল যে বিয়ে বাড়িতে ভালো মেয়ে দেখলেই যেন সমন্ধ চালু হয়ে যায়। বাবুর বৌ-এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি-মেয়েকে বৌদি অলরেডি স্পট করে ফেলেছে – চেষ্টা চালাচ্ছে মোবাইল নাম্বার হাতানোর জন্য। হাতাতে পারলেই জগা-কে ট্রান্সফার করবে সেই নাম্বার এবং তারপর জগার নিজের ক্যালি। তবে সোনায় সোহাগার মতন সেই বিয়ে বাড়িতেই বৌদির দেখা হয়ে যায় চেনাশুনা এক ঘটকের সাথে। মেয়ে খোঁজার নেটওয়ার্ক আরো বাড়াবার জন্য বৌদি সেই ঘটকের সাথে কথা বলে নেয় এবং ফলত ঘটক নিজের আঁখো দেখা ছেলে যাচাই করতে আসে খাবার প্যান্ডেলে।

    আমি তাও জগা-কে বললাম, “সে ঘটক ঠিক আছে, কিন্তু তাবলে তুই এমন ভাবে নিজেকে দেখাবি? মান সম্মান নেই নাকি তোর?” জগা বলল, “তোমার আর কি? গোপাল ভাঁড় পড় নি? - গরু-হারালে এমনই হয় মা”।

    ফেরার সময় গাড়িতে জিজ্ঞেস করলাম – “বৌদি, তাহলে জগা-র হয়ে যাবে তো কনফার্মড?” বৌদি বলল, “হবে না মানে, স্পট করে ফেলেছি তা কটা সুন্দর মেয়েকে। তুমি তো জানো না, অমৃতা-কেও তো আমি একটা বিয়ে বাড়িতে এমন ভাবেই স্পট করেছিলাম। গিয়েই বড়-মামাকে (আমার বাবা) বলেছিলাম যে মানানসই মেয়ে পাওয়া গ্যাছে। বড়-মামা তখন বলেছিল, আমি সুকানকে ঘাঁটাতে পরব না, ইংল্যান্ডে কি একটা করছে এখন!”

    আমি আর কিছু জিঞ্জেস করলাম না – আবার কি গল্প বেরিয়ে পরে বৌদির ঝুলি থেকে! তবে মনে হচ্ছে জগার গতি হয়ে যাবে - বৌদি যেমন ভাবে উঠে পরে লেগেছে! এই বছর শেষের আগেই মনে হচ্ছে ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে আবার।
  • সুকি | 237812.68.345623.184 | ৩০ আগস্ট ২০১৯ ০৭:৫৫381859
  • বাবুলাল
    ------------------------------

    যখন মনে হয় জীবনটা খুবই একঘেয়ে হয়ে আসছে বা পানসে মেরে যাচ্ছে আশপাশ – বা মনে হচ্ছে চাকুরী সূত্রে বোরিং কাজ কর্ম করতে করতে আমি প্রচন্ড বোর হয়ে যাচ্ছি, তখন আমি বাবুলালের কথা ভাবি। বাবুলাল আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়।

    বাবুলালের কথা শুনি বড় জ্যাঠার কাছ থেকে। মেমারী স্টেশন বাজারে জ্যাঠার ছিট কাপড়ের তথা টেলারিং-এর দোকান ছিল এককালে। ছিট কাপড় কিনতে তাই প্রতি সপ্তাহে জ্যাঠাকে কলকাতার বড়বাজারে যেতে হত ওই এক মারোয়ারী মহাজনের কাছে। বড়বাজারের সেকালের ট্রাডিশন মেনে সেই মহাজন তক্তায় বসে বালিশে হেলান দিয়েই ব্যবসা পত্র সামলাতেন। জ্যাঠা গেলেই – “আরে ঘোষ বাবু, এই গরীবকে তো ভুলেই গেলেন” ইত্যাদি ইত্যাদি। এটাও সবার জানা যে মারোয়ারীদের এমনটা বলাই বিজনেসের স্টাইল। আমার জ্যাঠাকে হাজার বার কিনে বেচে দেবার ক্ষমতা রাখে সেই মারোয়ারী ব্যবসায়ী – কিন্তু তবুও ওমন করে বলবে (জ্যাঠা অবশ্য ভাবত সত্যি করেই মারোয়ারীর ব্যবসা ডুবে যাবে জ্যাঠা মাল না কিনলে!)।

    তো যাই হোক, প্রথম প্রথম কদিন গিয়ে জ্যাঠা অবাক হয়েছিল একটা লোককে দেখে – সেই রোগা মত লোকটা তক্তার পাশে একটা টুলে চুপ করে বসে থাকে। জ্যাঠা বেশ কিছু দিন ঠাওড় করতে পারছিল না, এর কাজটা কি! চা এনে দেবার অন্য লোক আছে, হিসেব করার অন্য লোক, ঝাঁট দেবার অন্য লোক। বেশী কিছু না বুঝলেও জ্যাঠা এটা জানত যে বিনা কারণে লোক পোষার বান্দা মারোয়ারী ব্যবসায়ী নয়। তাই কৌতূহল তুঙ্গে, কিন্তু মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতে পারছে না। একদিন সেই মহেন্দ্রক্ষণ এসে গেল যেদিন মহাজন হাঁক দিলেন, “বাবুলাল – বাবুলাল”। জ্যাঠা দেখল সেই রোগা লোকটা টুল থেকে উঠল – আচ্ছা, এর নাম তা হলে বাবুলাল! বাবুলাল এগিয়ে তক্তার কাছে গিয়ে মারোয়ারী মহাজনের একদিকের পাছাটা তুলে ধরল। পাছা তক্তার মাদুর থেকে একটু উপরে উঠলে – তিনি দিলেন বিশাল এক পাদ। যতক্ষণ পাদলেন, বাবুলাল ততক্ষন পাছা তুলে ধরে রাখল। পাদ শেষ হলে পাছা নামিয়ে বাবুলাল টুলে ফিরে গিয়ে বসে পড়ল – যতক্ষণ না আবার ডাক আসে!

    হয়েছে কি, সেই মারোয়ারী মহাজন বিশাল মোটা – মানে এতটাই মোটা যে নিজে পাছা তুলে পাদার ক্ষমতাও নেই। আর যতই পাদ পাক, পাছা কিছুতে চেপে থাকলে পাদার যে কি কষ্ট সেটা নিশ্চয়ই বিস্তারে কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। সেই পাছা তুলে ধরার জন্যই বাবুলালের নিয়োগ। তেনার পাদ পেলেই, ‘বাবুলাল’ বলে হাঁক এবং বাবুলাল দ্বারা পাছা উত্তলন এবং তার পর পাদ।
    যখনই ‘বোর হচ্ছি’ বলে ভাবনারা ডালপালা মেলার উপক্রম করে, আমি তখনি বাবুলালের কথা ভাবি। সেকালে মোবাইলও ছিল না – বিনা মোবাইলে, বিনা হেডফোনে বাবুলাল টুলে বলে আছে কখন তার বাবুর পাদ পাবে সেই অপেক্ষায়!

    বাবুলাল আমাকে অনুপ্ররণা যোগায়। পেটের দায়ে করা কোন কাজ বোরিং লাগলে বাবুলালের কথা ভাবুন, আপনিও অনুপ্রেরণা পাবেন।
  • Ela | 236712.158.566712.123 | ৩০ আগস্ট ২০১৯ ১১:১৭381860
  • হাহাচেথেছিটকেপগে।
  • b | 237812.68.674512.61 | ৩০ আগস্ট ২০১৯ ১১:২৪381861
  • খ্যা খ্যা। অষ্টম হেনরীর নাকি ওরকম একজন পোষা ডিউক ছিলেন, তিনি বড় কর্মের পরে সম্রাটের *** মুছে দিতেন।খুব গুরুত্বপূর্ণ আর সম্মানীয় পদ।
  • Amit | 237812.68.455623.240 | ৩০ আগস্ট ২০১৯ ১২:৪০381862
  • যাতা
  • সুকি | 236712.158.676712.36 | ৩১ আগস্ট ২০১৯ ০৮:৩৬381863
  • শ্রীদূর্গা টেলার্স
    --------------------------

    বড় জ্যাঠার ব্যাপারটা তা হলে একটু খোলসা করেই বলি। মেমারী স্টেশন বাজারে জ্যাঠার দোকান ছিল কাপড়ের ছিটের তথা টেলারিং-এর সেটা আগেই বলেছি – দোকানের নাম ছিল ‘শ্রী-দূর্গা’ টেলার্স। তার পাশেই আমাদের ঔষুধের দোকান ‘শ্রী-দূর্গা মেডিক্যাল হল’। বাড়িতে দূর্গা পুজো হয় বলে এবং মনে হয় কুলোদেবী দূর্গা – সেই কারণেই আমাদের সব ব্যবসাতেই দূর্গা নামের ছড়াছড়ি। বড় জ্যাঠার দোকান কি করে যে চলত সেটাই আমার রহস্য – অথচ এক কালে বেশ রমরমিয়ে চলত। তিন জন যে সেলাই করার কর্মচারী ছিল তার মধ্যে জ্যাঠার ডান হাত ছিল সাগর। আমরা বলতাম সাগর জ্যেঠু। ব্যবসা ক্রমশ পড়তির দিকে এলে, বাকি কর্মচারীরা বিদায় নেয় – কিন্তু সাগর জ্যেঠু থেকে যায়। বলত, “এই বয়সে আর কোথায় গিয়ে কাজ করব – বড়দার সাথে গল্প গুজব করে কাটিয়ে দিই দিন কটা”। সাগর জ্যেঠু, আমার জ্যেঠুকে বড়দা বলত, যেমনটা বলত আমার বাবা কাকারা।

    ব্যবসা পড়তি হয়ে আসছে – কিন্তু বড় জ্যেঠুর সে নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। আমি দেখছি যে খদ্দের ছিট কিনতে এসেছে, বড় জ্যাঠার উত্তর হল,
    “তোদের আর ছিট কেনার সময় হয় না? দেখছিস না যে বিশ্বাসের সাথে গল্প করছি! পরে আসবি – এখন যা”।

    বিশ্বাস হল গিয়ে জ্যাঠার ভাই কাম দোস্ত। বিশ্বাস মেমারী মার্কেটের নাম করা ডাক্তার ছিল তখন – একটা নার্সিংহোম ও চালাত নিজের বাড়ির পাশেই। তাই সেই ডাক্তার সকাল দশটার আপ ট্রেনে মেমারী থেকে বর্ধমান যেত মেডিক্যাল কলেজে। সকাল সাড়ে আট-টার সময় বিশ্বাস ডাক্তার জ্যাঠার দোকানে চলে আসত – সে না যাওয়া পর্যন্ত বেচাকেনা বন্ধ। এগারোটার পর আবার জ্যাঠার খিদে পেয়ে যেত, আমাদের মাল রাখার গুদামে গিয়ে আয়েশ করে জ্যাঠা খেত প্রায় একটা পর্যন্ত। খেয়েদেয়ে দোকানে ফিরে এসে ঝাঁপ বন্ধ করে চারটে পর্যন্ত ঘুম। যুক্তি ছিল গরমে আর কে খদ্দের আসবে! জ্যাঠা ঘুমাচ্ছে – কর্মচারী ঘুমাচ্ছে, উঁচু সিলিংয়ের দোকান – পুরানো দিনের ফ্যান ঘুরছে – মেঝেতে ঠান্ডা চ্যাটাই-য়ের মত পাতা – সেই বড় সুখের সময়।

    ঘুম থেকে উঠেই জ্যাঠা চা খাবে না – বিশ্বাস-এর জন্য ওয়েট করবে। পাঁচটার ট্রেনে বিশ্বাস ফিরবে বর্ধমান থেকে – আবার গুলতানি সেই সন্ধ্যে পর্যন্ত। আবার খদ্দের এল, জ্যাঠা বলছে,

    - “তোকে আবার এখনি আসতে হল, দুপুরের দিকে আসতে কি হয়, ফাঁকা থাকে তখন”?

    - দোকানের পাল্লা তো বন্ধ ছিল দেখলাম তখন

    - তা ডাকতে পারিস নি? জানিস তো ভিতরে আছি

    - পাগল, তোমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি, আর তুমি জুতো নিয়ে আমাকে মেমারী বাজারে তাড়া কর!

    আর একটু সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে, মাছের ব্যবসা সামলাতে উদয় হবে মেজো জ্যাঠা। তার পর দুই ভাই মিলে কালুর দোকানে চপ দিয়ে মুড়ি। খদ্দের এলে যুক্তি ছিল,

    “তোর জামা প্যান্টের মাপটা কোন হাত দিয়ে নেব? দেখতে পাচ্ছিস না দু-টো হাতই জোড়া এখন – পরে আয়”।

    তবুও ব্যবসা চলছিল। বড় জ্যাঠার টেলারিং ক্ষমতার প্রতি আমাদের বাড়ির কারো বিশ্বাস ছিল না তেমন – বাড়ির কেউ কাটাত না জামা কাপড় জ্যেঠুর কাছে। একবার পুজোর সময় বাবা বলল, “চল, এবার বড়দার কাছ থেকেই জামা – প্যান্ট বানিয়ে দিই তোদের”। আমি প্রায় কাঁদো কাঁদো, গোঁ ধরে আছি, জামা প্যান্ট আমি কাটাবো প্যারাগন নয়ত জয় টেলার্সে। গোঁ ধরে বাপকে কায়দা করা আমার ক্ষমতায় কুলায় নি কোন দিন। সেবার প্রথম জ্যাঠার দোকানে জামা কাপড় হল।

    ফাষ্ট ফরোয়ার্ড - পুজোর কয়দিন আগে অনেকে অনেক বার তাগাদা দেবার পর জ্যাঠা মাল ডেলিভারী দিল। বাড়িতে এনে ট্রায়াল দেবার জন্য সেই জামা প্যান্ট পরে বাবার সামনে এলে বাবা বুঝতে পারল কি ঐতিহাসিক ভুলটা হয়েছে বড় জ্যাঠার কাছে গিয়ে! বাঁ দিকে প্যান্টের ঝুল আর ডান দিকে প্যান্টের ঝুলের মধ্যে প্রায় দেড় ইঞ্চির মত পার্থক্য। প্যান্টের ঝুল বাঁ পায়ে গোড়ালির অনেক আগেই শেষ হয়ে গ্যাছে, আর ডান পায়ের ঝুল মাটিতে লুটাচ্ছে। অনুরূপ হল জামার হাতার কেস। ডান হাতের জামার ঝুল আমি যতই টানি, কিছুতেই কব্জি পেরুচ্ছে না!

    পরের দিন বাবা দোকানে গিয়ে সাগর জ্যেঠুকে প্রথমে ধরল

    - সাগরদা, এটা তুমি কি জামা – প্যান্ট বানিয়েছ সুকানের?

    - কেন কি হল আবার?

    - আরে হাত পায়ের ঝুলের মাপ তো কিছুই ঠিক নেই

    - তা আমি কি করব, বড়দা যে মাপ আমাকে দিয়েছে, সেটাই আমি সেলাই করেছি!

    এবার বাবা ধরল বড় জ্যাঠাকে

    - বড়দা, তুমি সুকানের কি মাপ নিলে যে প্যান্টের ঝুল দুপায়ে সমান হল না?

    - সুকান যদি সোজা হয়ে না দাঁড়ায় তো আমি কি করব?

    - সে কি গো, এত বেঁকে দাঁড়িয়ে ছিল যে ইঞ্চি দুয়েকের তফাত!

    - যাক গে, ঠিক করে দেব। তা জামাটা কেমন কেটেছি বল?

    - জামাতেও ওই একই করেছ তুমি – ডান হাতা কব্জি পেরুচ্ছে না।

    - তাই নাকি? আচ্ছা, ওটাও ঠিক করে দেব।

    - আচ্ছা বড়দা, সুকান না হয় সোজা হয়ে দাঁড়ায় নি। কিন্তু তুমি কি বলে জামার ডানদিকে ছটা বোতাম বসালে আর বাঁদিকে ঘর করলে সাতটা বোতামের? কোন বোতাম কি ঘরে লাগাবে সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না!

    সেই একবারই – এতেই নতুন জামা কাপড় কাটার শেষ বড় জ্যাঠার কাছে। আমার সেই জামা – প্যান্ট আর ঠিক করতে পারে নি জ্যাঠা। ঝুল কিছুতেই সমান হয় না দু দিকে। শেষে জ্যাঠা প্রস্তাব দিল, “তাহলে প্যান্টটা কেটে ফেলে বরং বাজার করার ব্যাগ বানিয়ে দিয়”। তাই হল শেষে, আমার পুজোর প্যান্টের কাপড় দিয়ে দু-টো বাজার করার ব্যাগ।

    আরো পরিষ্কার হল যে থানের ছিট থেকে কিছু বানানোর শিক্ষায় জ্যাঠার এবং সাগর জ্যেঠুর কিছু খামতি আছে – ইমাজিন করতে পারে না মনে হয় কি জিনিস দাঁড়াবে। কিন্তু একবার জামা বা প্যান্ট বানানো হয়ে গেলে তাকে সাইজ করে অন্য কিছু বানাতে তেনারা পারদর্শী।

    এর পর থেকে পুরানো প্যান্ট কেটে বাজারের ব্যাগ বা বড়-দের বেশীবার না পরা প্যান্ট কাটিয়ে ছোটদের প্যান্ট বানানো – এর মধ্যেই জ্যাঠার কার্যকলাপ সীমাবদ্ধা রাখা হত। সেই প্রাগঐতিহাসিক ব্যাগ মনে হয় আজও বাড়ির কোথাও একটা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। জ্যাঠার দোকান আজ আর নেই – সেই ব্যাগ গুলোই রয়ে গ্যাছে জ্যাঠার কারিগরী নিদর্শন হিসাবে।
  • সুকি | 237812.68.454512.144 | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৬:৪২381864
  • এই বয়সে মনে হচ্ছে আবার নতুন করে বাংলা ছড়া শিখতে হবে। মেহুল আজকাল কিছু ইংরাজী ছড়া শিখেছে আর শিখেছে দু চার কলি রবি ঠাকুরের গান। সেদিন আবার নতুন শেখা বাংলায় ‘হাট্টি মা টিম টিম’ শোনালো! এই পর্যন্ত গল্প ঠিক আছে, তারপর বলে আমাকে একটা ছড়া শোনাতে! ব্যাস আমি পড়লাম ফাঁপড়ে – বাংলা ছোটদের ছড়া আমি কোথা থেকে জানব!

    জয়েন্ট ফ্যামিলিতে হই হই করে বড় হবার সময় কে যে আমাদের ছড়া শেখাবে সেটা ঠিক ডেফিনেটিভ ছিল না। এ ভাবছিল ওর দায়িত্ব, সে ভাবছিল তার – এই করে করে আর ছড়া কিছুই শেখা হল না। এই গ্যাপটা যখন ধরা পড়ল, তখন নিজে হাতে আমাদের ছড়া শেখাবার দায়িত্ব তুলে নিল সেজকাকু। সে এক শিখিয়েছিল বটে – এমন শিখেছিলাম এই আজও মনে আছে। সেজকাকুর শেখানো প্রথম ছড়াটা নিম্নরূপঃ

    “ল্যাংচা রে ল্যাংচা, তোর বাপকে গিয়ে ভ্যেংচা
    লুঙ্গি খুলে পর গামছা
    তোর বড় ছেলে বাজারেতে ফুলুরি ভাজে
    তোর ছোট ছেলে কলেজ স্ট্রীটে লাইন মারে
    এই তো তোদের বংশ, বাপের অন্ন করিস ধ্বংস (২ বার)
    ল্যাংচা রে ল্যাংচা…”

    কালের সময় মেনে একসময় “নিমো উন্নত অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়”-এ ভর্তি হলাম। ইস্কুল চালু হবার পর একদিন ক্লাসে সিরাজ মাষ্টার আমাদের ছড়া শোনাতে বলল। অন্য ছেলেরা “আতা গাছে তোতা পাখি” ইত্যাদি ইত্যাদি আউড়ালো পটাপট। আমার টার্ন এলে যথারীতি সেজকাকার কাছে শেখা টাটকা সেই ছড়াটা আমি শোনালাম, ‘ল্যাংচা রে ল্যাংচা’। সেই ছড়া শুনতে শুনতে সিরাজ মাষ্টারের চোখ কপালে উঠে গেল – কেন গেল সেটা বুঝতে পারলাম না। একটুও না আটকে গলা কাঁপিয়ে শোনালাম – মনে রাখতে হবে সেজকাকা যাত্রা করত, তাই কেমন করে ছড়া ডেলিভারী হবে সেটাও আমাদের ভালো করে শিখিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সিরাজ মাষ্টারের ছড়ির উদুম প্যাঁদানি খেলাম।

    বাড়ি ফিরে এসে সেই ঘটনা বলতে সেজকাকা সবার কাছে বকুনি খেল আমাদের ছড়া শেখানোর জন্য। এতে কি ভুল ছিল আমি তখন তা বুঝতে পারি নি! আমার খুব মনের মত ছিল ল্যাংচা ছড়াটা। সিরাজ মাষ্টার প্যাঁদাবার পর থেকে সেজকাকা আর ছড়া শেখায় নি – লাইফে একটা বড় ফাঁক রয়ে গ্যাছে সেটা এখন টের পাচ্ছি।
  • সুকি | 236712.158.566712.143 | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৬:৪৩381866
  • ভোলা পাইকের সেবার খুব সকাল সকাল রেজাক-কাকার বাড়িতে গিয়ে হাজির। রেজাককা তখন সবে চা টা খেয়ে বর্তমান কাগজটা নিয়ে বাইরের দুয়ারে বসতে আসার তোড়জোড় করছে। ভোলা পাইকের গিয়ে হাঁক দিল

    - ও মাষ্টার, মাষ্টার

    - কে রে? ও ভোলা – কি চাই এত সকাল সকাল কি চাই? এখন গরু নেই

    - আরে না গরু না, ফরম নেবার জন্য এসেছি

    - কিসের ফর্ম?

    - আরে ওই যে পঞ্চায়েতে যাদের বাড়িতে এঁড়ে বাছুর হলে ভাতা পাবার দরখাস্ত করার ফরম

    - কিসের ফর্ম?

    রেজাক কাকা পড়ল আকাশ থেকে। রেজাককা মাষ্টারি করত নিমোর পাশের গ্রাম কাঁঠালগাছি প্রাইমারী ইস্কুলে – আর সেই ইস্কুলের পাশের ভোলা পাইকেরের বাড়ি। সেই সূত্র ধরেই কাঁঠাল গাছির লোকেরা রেজাক-কাকাকে মাষ্টার বলে ডাকত। আর ভোলা ছিল আমাদের নিমো গ্রামে মেজরিটি ডিল করতে থাকা গরু পাইকের। গরু মর মর হচ্ছে, নতুন গরু কিনতে হবে , চাষের বলদ – সবের মুসকিল আসান।

    ভোলা-কে নিমোর সিনিয়র পাবলিক ভালোবাসত কারণ গরু বিষয়ক অগত্যার গতি ছিল সে। আর ছেলেছোকরা-রা ভোলাকে খুব একটা পছন্দ না করলেও তার চার চার খানা সুন্দরী মেয়ের মুখ চেয়ে মানিয়ে নিয়েছিল। ভোলা তার চার মেয়েকে নিয়ে নিমোর ভিতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে দুপুর এগারোটা চল্লিশের ট্রেনে সিনেমা দেখতে নিয়ে যাচ্ছে সে এক দেখার মত দৃশ্য ছিল। তবে সেই গল্প পরে হবে – এখন জানাবার এটুকুই যে টাকা পয়সার হিসাবে ভোলা এতই পোক্ত ছিল যে মেয়েদের জানিয়ে রেখেছিল তাদের বিয়েতে এক পয়সাও সে খরচ করতে পারবে না। মেয়েদের পরিপূর্ণ ফ্রীডম ছিল নিজেদের পছন্দ মত বিয়ে করে ফেলার – ভোলাকে পয়সা খরচ না করতে পারলেই সে খুশী। এই কথা জানাজানি হবার পর বলাই বাহুল্য ভোলার মেয়েদের প্রেমিকের অভাব হয় নি। যত দূর মনে পড়ছে প্রথম দুজনের সাথে বিয়ে হয়ে গেল শীতকালে কাশ্মীর থেকে শাল বিক্রি করতে আসা দুই ব্যবসায়ী কাশ্মীরি ছোকরার।

    তো যাই হোক, সে দিনের ঘটনায় ফিরে আসি। যেদিক ভোলা রেজাক মাষ্টারের বাড়িতে এসেছে তার আগের দিন নিমোর রাস্তায় ভোলার সাথে দেখা হয়ে যায় মঙ্গল-কাকার। মঙ্গল-কাকাকে আমরা মঙলা-কা বলেই ডাকতাম। মঙলাকা ভোলাকে ডেকে বলে

    - এই ভোলা, তুই রেজাকের কাছ থেকে ফর্ম নিয়েছিস ?

    - কিসের ফর্ম গো মঙলা-দা?

    - দেখেচিস, শালা রেজাক সব নিজে তলে তলে মেরে দেবার ধান্দা। তোদের কাউকে জানায় নি পর্যন্ত

    - কি জানায় নি?

    - তুই শুনিস নি যে পঞ্চায়েত থেকে টাকা দেবে বলেছে যাদের বাড়িতে এঁড়ে বাছুর বিইয়েছে?

    - না শুনি নি তো! আমার বাড়িতেই তো গত দু সপ্তাহে তিনটে এঁড়ে বাচ্ছা বিইয়েছে

    - আরে এঁড়ে বাছুরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলেই তো তাদের ঠিক ঠাক দেখভাল করার জন্য পঞ্চায়েত থেকে টাকা দেবে। সবাইকে যাতে পঞ্চায়েতে এসে ভিড় না করতে হয়, তাই গ্রামের ইস্কুল থেকেই ফর্ম বিলি করতে দিয়েছে পঞ্চায়েত। সাথে করে এঁড়ে বাচ্ছা নিয়ে গিয়ে ফর্ম তুলতে হবে – পরে ভর্তি করে জমা দিলেই হবে

    - কই, আমাদের তো রেজাক মাষ্টার কিছু বলে নি!

    - বলবে কেন! শালা রেজাক দেখছে যে ফর্ম কেউ না তুললে পুরো টাকাটাই নিয়ে গাপ করে দেবে!

    - তাই নাকি? আচ্ছা আমি মাষ্টারের কাছে যাচ্ছি

    পরের দিন ইস্কুল খোলা পর্যন্ত তড় সয় নি ভোলার – সকাল হতেই তিনটে এঁড়ে বাছুর সাথে করে নিয়ে হাজির হয়েছে রেজাক-কাকার বাড়িতে। সব কথা শুনে তো রেজাক-কা আকাশ থেকে পড়ল

    - ভোলা, সকাল সকাল পাগলামি করিস নি! এঁড়ে বাছুরের জন্য এমন কোন ফর্ম পঞ্চায়েত বিলি করে নি

    - সে তো তুমি বলবেই মাষ্টার – কেউ টাকা না দাবী করলে, সবটাই হাপিস হয়ে যাবে!

    সে এক তুল-কালাম কান্ড রেজাক-কাকার বাড়ির সামনে। এঁড়ে বাছুর তিনটে কি করবে বুঝতে না পেরে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে – পুরো খিচুরী কেস।

    এ যুগে যারা ইমাম ভাতা, পুরোহিত ভাতা, কন্যাশ্রী, সাইকেল দেওয়া, দু-টাকার চাল ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামান, তাঁরা ভুলে যান সেযুগে এঁড়ে বাছুর বিয়োলে ভাতা প্রদানের কথা। মানুষের স্মৃতি শক্তি বড়ই দূর্বল! এই যেমন আমি ভুলে গেছি সেবার কত টাকা করে দেওয়া হয়েছিল এঁড়ে বাছুর বাবদ!
  • debu | 237812.68.343412.35 | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৪:১১381867
  • পাচালি টা ছাপান , ভাল হোচ্ছে
  • রঞ্জন | 236712.158.895612.202 | ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৫:১৭381868
  • ভাল বোলে ভাল! হাসতে হাসতে পেটে খিল।
    ল্যাংচা রে ল্যাংচা!
  • সুকি | 236712.158.676712.162 | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:২৯381869
  • আজকাল ইস্কুলে চাকুরী পেতে হলে কি না কি বেগ পেতে হচ্ছে বঙ্গে – প্রকৃত শিক্ষিত ছেলেরা তাদের প্রাপ্য চাকুরী পাচ্ছে না। চাকুরীর পরীক্ষা দেবে, তেমন পরীক্ষাও নাকি বহুদিন নেওয়া হয় নি। ঘুষ দিয়েও কাজ হচ্ছে না – কত ছেলে পুলে জমি জায়গা বিক্রী করে এখানে সেখানে ঘুষ গুঁজে বসে আছে – কিন্তু সেই টাকা কোথায় গেছে তাই ট্রেস করা যাচ্ছে না – প্রকৃত সত্য একটাই, আর তা হল চাকুরী নেই ইস্কুলে।

    এই সব অরাজকতা দেখে আমার সেই কংগ্রেসী পিরিওডের কথা মনে পড়ে গেল – কংগ্রেসী প্রদীপ তখন নিভে আসছে। যারা ফ্রন্টলাইন কর্মী, তারা ব্যাপারটা টের পাচ্ছে তলে তলে। এমন সময় একদিন ভ্যাঁটা আমার জ্যাঠা-কে বলল, “গুরু, কংগ্রেস তো মনে হচ্ছে গুটিয়ে আসছে। পার্টি করে তো আর বেশী দিন সংসার চলবে না। তা বুড়ো বয়সে খাব কি বউ নিয়ে? তুমি একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করে দাও”। জ্যাঠা এ হেন প্রস্তাব শুনে খুবই অবাক হল এবং দু:খ পেল – মনে হল যেন পিছন থেকে যেন কেউ ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। কোনক্রমে বলতে পারল, “ইউ টু ব্রুটাস!” ভ্যাঁটা শুনল জ্যাঠা জিজ্ঞেস করছে, “শেষে তুইও চাকরী করবি ভ্যাঁটা”? তাই উত্তর দিল, “গুরু, বাড়িতে বউ টিকতে দিচ্ছে না – জান নিয়ে টানাটানি, তুমি একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করে দাও”। জ্যাঠা কি করা যায় দেখা যাক বলে ভ্যাঁটাকে আস্বত্ব করল।

    বেশ কিছুদিন কেটে গ্যাছে ভ্যাঁটার চাকুরী রিকোয়েষ্টের পর। একদিন জ্যাঠা দোকানে বসে আছে – সকাল সকাল হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ভ্যাঁটা এসে হাজির – নেশায় চুড়। “গুরু, সর্বনাশ হয়ে গ্যাছে – তুমি বাঁচাও আমাকে”। জ্যাঠা অবাক – কংগ্রেস পিরিওডে ভ্যাঁটার সর্বনাশ করবে তেমন আবার হয় নাকি? তেমন জোর কার আছে! ভ্যাঁটার কান্না আর থামে না। খানিক বুঝিয়ে বাঝিয়ে যা বোঝা গেল, সর্বনাশটা নাকি জ্যাঠাই করেছে। ভ্যাঁটার চাকুরীর অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার চলে এসেছে! সে তো ভালো কথা, এতে সর্বনাশের কি হল? ভ্যাঁটা এবার মুখ খুলল, “গুরু, তা বলে গন্তার হাই ইস্কুলের হেড মাষ্টারের পোষ্ট? আমি তো কোন মতে নাম সই তো করতে পারি!” জ্যাঠা বলছে, “ এই বললি চাকরী করবি, আবার এখন এসে নাকে কাঁদছিস!” ভ্যাঁটা জানালো সে ওই হেডমাষ্টারের চাকুরী হারগিস করবে না। বলল, “গুরু, তুমি এমন একটা চাকুরী করে দাও – যেখানে আমাকে কাজ করতে হবে না। ফোর্থ ক্লাস স্টাফ হলেও হবে”। অনেক ভেবেচিন্তে ভ্যাঁটার চাকুরী করে দেওয়া হল মেমারী সেটেলমেন্ট অফিসে। সেই সেটেলমেন্ট অফিস তখন মেমারী স্টেশন বাজারের আমাদের দোকানের সামনের বিল্ডিং টায় তিন তলায় ছিল।

    চাকুরী শুরু করার পর বেশ কিছুদিন পর ভ্যাঁটা প্রথম বারের জন্য অফিসের ভিতরে ঢুকেছে – বড়বাবু নাকি বলেছে, “ভ্যাঁটা বাবু, আপনাকে তো অফিসে দেখিই না – অফিস আসতে হবে বৈকী মাঝে মাঝে”। ভ্যাঁটা অবাক হল – অফিসে যে মাঝে মাঝে আসতে হবে সেটাই তার কাছে নতুন ইনফো। তবে ভ্যাঁটা পরের দিন গেল অফিসে মদের নেশায় চূড় হয়ে। বড়বাবু আবার বললেন, “ভ্যাঁটা বাবু, মদ খেয়ে তো অফিস আসা যাবে না”! এবার গেল বিশাল খচে ভ্যাঁটা – “বাঁড়া অফিস আসতে হবে, কিন্তু মদ খাওয়া যাবে না! মামদো বাজি হচ্ছে নাকি? যে কোন একটা আপনাকে বেছে নিতে হবে, নয় আমি অফিস আসব না আর এলে মদ খেয়ে আসব”। বড়বাবু নাকি ভ্যাঁটার না অফিস আসাটাই চ্যুজ করেছিলেন।

    এই ভাবে প্রথম মাস কেটে গেল – মাইনের দিন হাজির। সেকালে নাকি এক দুই পাঁচ দশ টাকার খুচড়ো নোটে মাইনে দেওয়া হত ক্যাশ। ভ্যাঁটার সাথে তার বউ এসেছে মাইনের টাকা পাহারা দিতে – যাতে ভ্যাঁটা সব টাকা নিয়ে ফুর্তি করতে না পালিয়ে যায়। ভ্যাঁটা গেল তিন তলায় মাইনে আনতে – ভ্যাঁটার বউ আমাদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। মাইনে নিয়ে ভ্যাঁটা নেমে আসছে সিঁড়ি দিয়ে – আর বাঈজী বাড়িতে যেমন নোটের তাড়া থেকে আঙুল দিয়ে টাকা ওড়ায়, তেমন ভাবেই টাকা ওড়াতে ওড়াতে ভ্যাঁটা বলতে বলতে আসছে “গুরু মাইনে পেয়েছি, মাইনে পেয়েছি”। এই ভাবে সে যখন নীচের তলায় বউয়ের সামনে পৌঁছালো, তখন তার হাতে মাত্র কয়েকটা নোট পড়ে আছে। ভ্যাঁটার বউ আবার গিয়ে সিঁড়ি থেকে নোট গুলো কুড়িয়ে আনল।

    এর পর ভ্যাঁটা অনেক দিন চাকুরী করেছিল খাতায় কলমে কংগ্রেস পিরিওড পেরিয়ে যাবার পরেও। ভ্যাঁটা এক লেজেন্ডের নাম – আর লেজেন্ডদের চাকুরী এমন ভাবেই হওয়া উচিত, ফালতু পরীক্ষা দিয়ে নয়!

    ভ্যাঁটার আরো গল্প অন্য কোন সময়।
  • সুকি | 236712.158.676712.124 | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৩৯381870
  • ডি-কে ড্যান্স অ্যাকাডেমি
    ----------------------------------

    আর এক মাস বাদে দুর্গা পুজো – মাঝে মাঝে আমার চিন্তা হয় আজকাল নিমো বারোয়ারী তলার দুর্গা পুজোর বিসর্জনের সময় নাচবে কে? “ ডি-কে ড্যান্স অ্যাকাডেমি” – তো আজকে আর নেই!

    আমাদের ব্যাচের ছেলেরা তো প্রায় বুড়ো হতে চলল – কোমর ঘোরে না আর অনেকেরই। আমাদের পরের ব্যাচের ছেলেরা অনেক দিন টেনেছিল – আজকাল শুনছি তাদেরও সব বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, নতুন বিয়ে করা আনা বউ এবং পুজো দেখতে আসা শালি-শাশুড়ির সামনে নাচতে লজ্জা পাচ্ছে। আর তার পরের ব্যাচের কথা নাই বা বললাম – মোবাইল এসে সব শেষ করে দিয়েছে। তেনাদের না সময় আছে ক্রিকেট খেলায় – নিমোর ক্রিকেট টিম তো প্রায় উঠেই গেল। আর না সময় আছে বিসর্জনের সময় নাচা-র। তেনারা আবার ধেনো ইত্যাদি খান না, শুনলাম পাবলিক নাকি আজকাল পালাপর্বণে বিয়ার এনে খাচ্ছে! বুঝে গেলাম প্রায় সব শেষের পথে। আমাদের ট্রাডিশনের এখানেই ইতি। এবার থেকে শুধু তাসা, জগধম্পা বা কাড়াদগড় নয়, তার সাথে নাচার জন্য ছেলেও ভাড়া করতে হবে! কি অধপতন আমাদের হল কে জানে!

    আমার শেষ আশা ছিল হাজরাদের ভুলু। খুব রিসেন্টলি বিয়ে করে আনল – কিন্তু প্রেম করে বিয়ে, তাও আবার পাশের গ্রামের মেয়ে বলে আমার জোরালো ধারণা ছিল যে নাচের ট্রাডিশনটা ভুলু বজায় রাখবে – কারণ বিয়ের পর বউ-কে ইমপ্রেস করার কোন ব্যাপার এর মধ্যে ছিল না। কিন্তু বিধি বাদ সেধেছে – আগের বার গাজনের সময় নিমো গিয়ে দেখলাম যে ভুলু ইনজিওরড। লিগামেন্ট নাকি কি ছিঁড়ে বসে আছে – হাঁটুর অবস্থা বাজে। মেমারীর কুলদীপ ডাক্তারের বেড়িয়ে ফিরলে তার কাছে অপারেশন হবে তার জন্য ওয়েট হচ্ছে।

    তাহলে বাকি রইল আমার সেই ন্যাংটো বেলার দোস্ত দিবাকর, মানে দিবাকর কর্মকার। সংক্ষেপে ডি-কে, যার নামেই “ডি-কে ড্যান্স অ্যাকাডেমি”। বন্ধুদের মধ্যে পিন্টু আর দিবাকরই যা চেহারা ধরে রেখেছে এখনো – পিন্টুর দ্বারা নাচ হবার নয় বলে, দিবাকরের উপরেই ভরসা। তবে দিবাকরের ড্যান্সের উপর ঝোঁক সেই ছোটবেলা থেকেই। আমাদের গ্রামে ড্যান্স নামক আর্ট-টার মেটামরফসিস ঘটায় রেল স্টেশনের পাশের কেবিন পাড়ার সুধীর – তাকে নিমো গ্রামের ড্যান্সিং লেজেন্ড বলা যেতে পারে। পপ সংগীত জগতে মাইকেল জ্যাকসনের যা অবদান, আমাদের গ্রামের নাচের জগতে সুধীরের অবদান তার থেকে কোন অংশে কম নয়।

    তাসার বাজনার মাঝখানে হাত তুলে তুলে উদ্দাম নাচের গতানুগতিক প্রচলনের বাইরে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন জিনিস আমদানী করেছিল সুধীর। সে শুধু নিমো গ্রাম নয় – তার আশেপাশের গ্রামের নাচের ইতিহাসও বদলে দিয়েছিল। ওর জন্যই মূলত চালু হয়ে গিয়েছিল নানাবিধ ড্যান্স কম্পিটিশন। এবং বললে বিশ্বাস করবেন না – সুধীরের নাচ দেখতে পালা-পর্বণে আমাদের গ্রামে বাইরে থেকে লোক আসত। কথিত আছে সুধীর নাকি কলকাতার টলিউডে গিয়েও যে ভীড়ের নাচ বা এক্সর্টা যাদের বলা হয়, তাদের সাথে নেচেছিল কোন এক সিনেমার শুটিংয়ে প্রসেনজিতের সঙ্গে। সেই সুধীরেরও এক সময় বিয়ে হয়ে গেল – নাচ ছেড়ে নিমো স্টেশনে সাইকেল স্ট্যান্ডের ব্যবসায় মনোনিবেশ করল। তবে যাবার আগে সে নাচের ব্যাটন-টা হ্যান্ড ওভার করে দিয়ে গিয়েছিল দিবাকরের হাতে।

    দিবাকর সুধীরের কাছে নাচ শিখেছিল – এবং পরে নিজে নিজেই ড্যান্স ইস্কুল খোলে। “ডি-কে ড্যান্স আকাডেমী” – নিমো ভারত সমাজ ক্লাবের নীচের তলায় কোনের দিকে যে ঘরটা খালি আছে – যেখানে এককালে শোনপাপড়ির কারখানা ছিল, সেখানেই ডি-কে ড্যান্স আকাডেমী চালু হয়। বাই দি ওয়ে নাচের জগতে দিবাকর কর্মকার তখন ডি-কে হয়ে গ্যাছে! দিবাকর অবশ্য শুধু নাচ নয়, গানের জগতেও প্রবল ইন্টারেষ্ট নিয়েছিল। এত দিন পর ভাবি যে দিবাকরের গান নিয়ে নিয়ে বেশীর ভাগ সময়েই ঠাট্টা ইয়ার্কি করে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও হয়ত আমরা তাকে দিই নি। সে তখন কাজ করত রেলের কনট্রাকটরের আন্ডারে – সারাদিন সে প্রবল গরমে রেল লাইনে কাজ করে, রাতের বেলা টিমের সাথে গান প্র্যাক্টিস করত। আবার রাতের বেলায় ফাংশন থাকলে সারারাত বাইরে থেকে গান-টান করে বাড়ি ফিরে সকাল সকাল কাজে যাওয়া। আমি যেখানে ল্যাবে দু-চারটে এক্সপেরিমেন্ট করেই সন্ধ্যেবেলা ‘টায়ার্ড’ হয়ে ঘরে ল্যাদ খাচ্ছি – সেই মুহুর্তে দিবাকর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে রাতের বেলা গান প্র্যাকটিশ করছে সারাদিন হায়ে গতরে খেটে এসে।

    কিন্তু কথায় বলে গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না – আমাদের গ্রামে তখন নানা পার্বণ উপলক্ষ্যে ফাংশন দেওয়া চালু হয়ে গ্যাছে। যাত্রা – নাটক করার আর লোক নেই – তাই বাইরে থেকে পার্টি এনে ফাংশন। দিবাকর আমাদের নিমো ভারত সমাজের মিটিং-য়ে কতবার বলত, “আমাকে তোরা শুধু গানের টিম আনার দায়িত্ব দে – দেখিয়ে দেব ফাংশন কাকে বলে”। ক্লাব সেক্রেটারী ঘোষের লাল্টু হয়ত বলল, “তুই বাঁড়া চুপ করে বসে থাক – তোর টিমের বালের গান শুনলে আমরা ক্যালানী খেয়ে যাব – আর কেউ চাঁদাও দেবে না কোনদিন”। দিবাকর আর কারো সমর্থন পায় না। আমাকে বলত, “সুকান, তোকে একদিন আমার টিমের প্র্যাক্টিস দেখতে নিয়ে যাব”। আমি তখন নিমোতে থাকতাম না – খুব কম দিনের জন্য বাড়ি যেতাম বলে দিবাকরের টিমের গান আর শোনা হয় নি কোনদিন।

    এর বেশ কিছুদিন পরে একবার নিমো শিবতলায় কি একটা সভা না ছোট ফাংশন কি হচ্ছিল – সেবার দিবাকর অনেক অনুরোধের পর একটা গান করার সুযোগ পেয়েছিল – শুনলাম মিউজিক ট্র্যাক চালিয়ে সে কিশোর কুমারের গান গাইছে। ও যদি নিমো গ্রামের ছেলে না হত, তাহলে আমরা সেই গান হয়ত পয়সা দিয়েই শুনতে যেতাম।

    যাই হোক, ফিরে আসি ডি-কে এর প্রথম ভালোবাসা নাচে। এই নাচতে গিয়েই এক মেয়ের সাথে আলাপ, পরে যে দিবাকরের বউ হয়। বিয়ের পর সেই মেয়ে নাচ ছেড়ে যায় – দিবাকর একটু হতাশ হয়েছিল। আমাদের বলেছিল, মেয়েকে দেখবি নাচ শেখাবো কেমন। সে কথা রেখেছিল – তার মেয়েও খুব সুন্দর নাচত। অডিশন দিয়ে “ড্যান্স বাংলা ড্যান্স” তেও চান্স পেয়েছিল, কিন্তু কতৃপক্ষ অনেক টাকা চায় টিভিতে চান্স দেবার জন্য। সেই টাকা দেওয়ার ক্ষমতা বলাই বাহুল্য দিবাকরের ছিল না। তাই ডি-কে র সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয় নি। ওর মেয়ে নাচত আশে পাশের গ্রামের ফাংশানে বা অনেক হায়ার করা টিমের। কিন্তু গ্রাম বাংলায় যা হয় আর কি – মেয়ে একটু বড় হয়ে গেলে রাতের বেলা ফাংশানে নাচতে নিয়ে যাওয়া আর তার পর পাহারা দিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনা চাপের হয়ে যাচ্ছিল। এক সময় দিবাকরের মেয়েও নাচে ইতি দেয় – আরেক সম্ভাবনার পরিসমাপ্তি।

    ডি-কে ড্যান্স একাডেমিতে বেশ অনেক ছেলে মেয়ে নাচ শিখতে আসত। চলেও বেশ কিছু দিন – কিন্তু কালের নিয়মেই সেই নাচের ইস্কুল বন্ধ হয়ে যায়। ক্লাবের ঘরটা আবার খালি হয়ে গিয়ে আমাদের ফিষ্টি করার জায়গা হয়ে যায়। এখনো নিমো গেলে ডি-কে দেখা করে যায় – কাজে যাবার আগে, বা কাজ থেকে ফিরে। নিমো স্টেশনে বসে গল্প হয় – স্টেশন থেকে আমাদের ক্লাব ঘর দেখা যায়, আর দেখা যায় এক কালের ডি-কে ড্যান্স অ্যাকাডেমির বন্ধ জানালাটাও। আমরা দুজনে পুরানো দিনের কথা বলাবলি করি।

    আজ থেকে এগারো বছর আগের দুর্গা পুজোয় বিসর্জনের সময় নিমো গ্রামের শিবতলায় তোলা কিছু ছবি। সাদা গেঞ্জী পরে দিবাকর - সবুজ গেঞ্জীতে ভুলু। বাকিরাও কোন না কোন সময় দিবাকরের কাছ থেকে নাচের ট্রেনিং নিয়েছিল







  • সুকি | 236712.158.676712.124 | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৪১381871
  • তান্ত্রিক তপু
    -------------------

    এই তো গেল বার নিমো গিয়ে একদিন রেলগেটটা পেরুচ্ছি জি টি রোডের ধারে নিমো বটতলায় নকু-র দোকানে চিকেন পকোড়া খেতে যাব বলে, হঠ করে দেখি একটা মারুতি আর্টিগা আমার পাশে ক্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ালো। মুখ তুলে দেখলাম গাড়ি ভর্তি সব ফ্যামিলি টাইপের লোকজন, মেয়েরা শাড়ি গহনা পরে আছে। দেখেই বুঝে নিলাম ছেলে বা মেয়ে দেখতে এসেছে আমাদের গ্রামে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রশ্ন এল, “এ ভাই, তুমি তান্ত্রিক বাবার বাড়িটা কোনদিকে বলতে পারবে?” আমি বেশ ভালোই অবাক হলাম, নিমোতে আবার তান্ত্রিক কোথা থেকে এল! আমাকে চুপ থাকতে দেখে রেলগেটের পাশে নারান জামাইয়ের চায়ের দোকানে বসে থাকা সোনা-কাকা জিজ্ঞেস করল, “কি রে সুকান কি হল?” আমি বললাম, “কাকা এঁরা ভুল করে নিমোতে এসে তান্ত্রিক বাবা খুঁজছেন”। সোনাকাকা বলল, “না রে ভুল নয়, ওরা তোদের পাড়ার তপুর বাড়ি যাবে – তপু এখন বিরাট তান্ত্রিক হয়েছে তুই শুনিস নি?”।

    ভেবে দেখলাম ভুল আমারই – আমি শুনেছিলাম বৈকি, কিন্তু এমন হঠ করে বাইরের লোকের প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গেছি। আমার মনের মধ্যে তখন নকুর চিকেন পকোড়া ঘুরছিল। তবে এর জন্য তপু-দা নিজেও দায়ী – তান্ত্রিক হয়েছে, কিন্তু অ্যাপিয়ারেন্সের কোন চেঞ্জ আনে নি। তার উপর সেই দিন সকালেই আমাদের খামারে দেখা হল – তপুদা লাল গামছাটা পরে মুখে নিমের দাঁতন দিয়ে আমাদের পুকুরের পাশের মাঠটায় হাগতে যাচ্ছিল। আমি গিয়েছিলাম খামারের নারকেল গাছ গুলোয় কেমন ডাব হয়েছে দেখতে। তান্ত্রিকতা করে করে তপুদার এখন বার বাড়ন্ত – পয়সায় ওই গই নেই। হাই ফাই সব ক্লায়েন্ট – থানার বড়বাবু থেকে শুরু করে, পায়ে বাত ধরা বড়বাবুর শালি পর্যন্ত। তিন তলা বাড়ি হাঁকিয়েছে, কিন্তু পায়খানা সেই খোলা মাঠে করা চাই!

    এই খোলা মাঠে পায়খানা করার ব্যাপারটা একটু সাইকোলজিক্যাল – যাঁরা মাঠে পায়খানা না করেছেন তাঁরা এটা ঠিক বুঝতে পারবেন না। সেই যে গোপালদার বিয়ের পর প্রথম বার শ্বশুর এসেছে – একদিন আমাদের সাথে শ্বশুর মশাইয়ের সাথে দেখা, ষষ্ঠি ডাঙা মাঠের দিক থেকে দেখি একা একা আসছে। জিজ্ঞেস করলাম, “কি ব্যাপার, আপনি একা একা মাঠের দিকে কোথায় গিয়েছিলেন?” উনি বললেন, “এই বাবা, একটু বাহ্যি বসতে গিয়েছিলাম মাঠে”। বললাম, “সেকি বাড়িতে তো পায়খানা রয়েছে – খুব জোর পেয়ে গিয়েছিল নাকি?” গোপালদার শ্বশুর তারকেশ্বরের গ্রামের দিকের সরল লোক, বললেন, “না বাবারা, তোমাদের ওই পাকা পায়খানায় আমার ঠিক পোষায় না – চার দেওয়ালের মধ্যে কেমন বন্ধ বন্ধ লাগে – একটু খোলা হাওয়া না পেলে ঠিক পায়খানা হয় না”।

    নিমোর ছেলেদের প্রধান প্রবলেম হচ্ছে কোথায় কি বলতে হবে তাল জ্ঞান থাকে না মাঝে মাঝে, এই জন্য কত প্রেম অঙ্কুরেই শেষ হয়ে গ্যাছে কি বলব! আমি কিছু বলার আগেই কে পাশ থেকে ফুট কেটে উঠল, “শুধু খোলা হাওয়া নাকি ঘাসের সুড়সুড়িও লাগে ভালো ভাবে পায়খানা ক্লিয়ার করতে?” আমি কোনক্রমে তাকে চুপ করালাম। তবুও আবার একজন পরামর্শ দিল, “তবে বলছিলাম কি আপনি কালকে ওই ষষ্ঠি ডাঙা মাঠের দিকে যাবেন না, ওদিক টায় বেশ সাপের উপদ্রব আছে। আপনি বরং বামুন দের বাঁশ ঝাড়ের পাশটায় যাবেন”। পরের দিক আবার দেখা শ্বশুর মশাইয়ের সাথে – বামুনের বাঁশ বাগানের দিক থেকে ফিরছেন – গায়ে হাতে কাদা। কি হল জিজ্ঞেস করতে বললেন, “এ্যাই তোমরা কালকে এটা তো বল নি যে বাঁশ বাগানের দিকে কে শুয়োর পুষেছে, সেগুলো ওখানে ঘুরে বেরায়? আমার পায়খানা শেষ হয়নি তখনো, কোথা থেকে উদয় হয়ে গুঁতিয়ে ফেলে দিল গু খাবে বলে। পায়খানা শেষ করার তর সয় নি! এই দ্যাখো না কাদায় উলটে গিয়ে কি অবস্থা”। বটম লাইম, শুয়োর আর সাপের ভয় ছাড়া মাঠে পায়খানা স্বর্গসুখ।

    এই দ্যাখো ডাইভার্ট করে যাচ্ছি – তপুদার ব্যাপারে ফিরি। আমার মনে রাখা উচিত ছিল যে তান্ত্রিক মানে নিমোতে আজকাল তপুদাকেই বলা হচ্ছে। আগে আমাদের গ্রামে তান্ত্রিক ইত্যাদি তেমন কেউ ছিল না – কেবল জল পোড়া, বাণ মারা, বাটি চালা এই সব আমার বাল্যবন্ধু আলমের দাদু পচা মোড়লই করত। তবে পচা মোড়ল মানুষের কেস বেশী পেত না। সন্ধ্যের দিকে মানিক-কা হন্ত দন্ত হয়ত গিয়ে বলল, “ও পচাদা, কালো বাছুরটা তো এখনো বাড়ি ফিরল না। এদিক ওদিক খুঁজেও পেলাম না – তুমি একবার চট করে বাটি চেলে বলে দাও বাছুরটা কোন দিকে গ্যাছে”। তবে মানুষের কেস একেবারেই আসত না বললে ভুল হবে – কামারদের সাধনের ছেলে বাপন প্রায়ই বাড়ি থেকে পালাত – কোনবার বোম্বেতে সিনেমায় নামবে বলে, কোন বার যাত্রা দলের সাথে রান্না করতে – তা সাধনের বউ তাই ছিল পচা মোড়লের বাঁধা কাষ্টমার।

    সেই দিনটার কথা মনে পড়ে গেল যেদিন প্রথম জানতে পারলাম তপুদা তন্ত্রের দিকে এগুচ্ছে। সেদিন একটু রাতের দিকে নিমোর শুভ ঠাকুরের তলায় সব বসে বসে গ্যাঁজাচ্ছি। দেখি তপুদা টলমল করতে করতে সাইকেল নিয়ে এসে মন্দিরের সামনে রাস্তার ওদিকে জেলেদের দিলীপ-দার গোয়ালের বাইরে গোবর ডাঁই করা ছিল, সেখানে এসে সাইকেল নিয়ে গুঁজরে পড়ল। আমি গেছি ঘাবড়ে – যা শালা কি হল! ফাঁকা রাস্তায় গুঁজরে পরার কারণ কি! মুকুল-দা বলে উঠল, “ওফহ, আজকে আবার!” বুঝলুম এর হিষ্ট্রি আছে। তপুদা দেখলাম নিজের গোবরের গাদা থেকে উঠল, সাইকেলটাও টেনে তুলল। দিয়ে সাইকেলের পাশে অদৃশ্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে এমন ভাবে তাকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করল,

    “চাঁপি, তোর এত সাহস, তুই আমাকে ঠেলে ফেলি দিলি! তুই জানিস না তুই কার সাথে পাঙ্গা নিচ্ছিস। আর যদি কোন দিন আমার সাথে ফাজলামি করবি তো তোর একদিন কি আমার একদিন। নিমো গ্রামে ঢোকা তোর বন্ধ করে দেব আমি – জানিস যে ক্ষমতা আমার আছে?”

    এই সব বলতে বলতে তপুদা সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলে গেল। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না! আমি তো কাউকেই দেখতে পেলাম না তপুদার পাশে – আর চাঁপি ই বা এল কোথা থেকে এর মধ্যে। যা বুঝতে পারলাম, তপুদার দাবি হচ্ছে তার পড়ে যাবার সাথে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে সাইকেল চালাবার কোন সম্পর্ক নেই। এই শুভর তলায় এলেই নাকি চাঁপি তাকে ঠেলে ফেলে দেয়। চাঁপি হল গিয়ে ময়রাদের বাঁকুর বউ চাঁপার ডাকনাম। তা সে চাঁপি তো আত্মহত্যা করেছে মাস ছয়েক হল! তপুদার মতে চাঁপির আত্মা নিমো ছেড়ে বিশেষ করে ওর বাড়ির চত্তর ছেড়ে মুক্তি পাচ্ছে না। তাই তপুদাকে ভয় খাওয়ায় সাইকেল থেকে ঠেলে ফেলে দিয়ে – যদি তপুদা তন্ত্র ইত্যাদি করে চাঁপির আত্মাকে মুক্তি দিয়ে দেয়! সে গ্রাম ছেড়ে যেতে চাইছে না – রাগের মাথায় সুইসাইড করে ফেলেছে।

    তবে তপুদা অমায়িক লোক – কি ভাবে বলতে পারব না, তপুদার প্রসার বাড়তে শুরু করে। নিমোর খুব বেশী কাষ্টমার ছিল না – আমাদের শিল্পপতি রাজু কুমারের হাতের আটটা আঙটির মধ্যে অবশ্য তিনটে তপুদা দিয়েছিল। রাজু ব্যবসায়ী মানুষ – ব্যবসা করতে গেলে পাথর-আঙটি পরতে হয়। নিজের লক্ষ্মী লাভের সাথে সাথে বাড়িতে বড় করে লক্ষ্মী পুজো করা শুরু করল তপুদা। আমাদের বাড়িতেও নিমন্ত্রণ করত – সাথে পাড়ার সবাইকে। সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা আগেও বলত আর এখনো বলে তপুদা।

    এই সেদিন আমাদের বাড়ি এসেছিল মায়ের কাছে অনুমতি নিতে যে ছেলের বিয়েতে আমাদের খামারে প্যান্ডেল করবে – এটা একটা কার্টসির ব্যাপার আর কি। মা জানাল সেদিন চা খেতে খেতে তপু অনেক গল্প করল। বলল, “বুঝলেন কাকিমা, ঠাকুরের কৃপায় করে খাচ্ছি। না হলে তো আপনার জানেন সেই মেমারীর বামুন পাড়ায় খালের মিষ্টির দোকানের সামনের মসলার দোকান টার কোণে লটারী বিক্রী করতাম – তার পর এল আই সি ও করেছি। তারপর একদিন ঠাকুরের স্বপ্নাদেশ পেয়ে গিয়েই তো আজকে আমার এই বাড় বাড়ন্ত”। তপুদা নাকি ভর পেয়েছিল তার বাড়ির পিছনে একটা ডুমুর না ছাতিম কি গাছ আছে তার তলায় একদিন পেচ্ছাব করতে গিয়ে সন্ধ্যাবেলা।

    তপুদার সাথে চেনাশুনা আছে, তদোপরি পাড়ার লোক – আপনাদের কারো দরকার হলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন – বিনা কমিশনে আসল জিনিসের কাছে পৌঁছে দেব আপনাদের – গ্যারান্টি সহকারে। কাজ না হলে ফেসবুকে গালাগাল করতে পারেন আমাকে।
  • সুকি | 236712.158.676712.124 | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৪১381872
  • আলম এবং বড়-ভাই
    --------------------------

    মেমারী আনন্দম সিনেমা হলে বাহুবলী সিনেমা এসেছে – দিনের পর দিন উত্তাল করা ভীড়। টিকিট পাওয়া দুষ্কর, শেষবার এমন ক্রেজ দেখা গিয়েছিল ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ সিনেমার সময়, যখন আনন্দম সিনেমা হলের আশে পাশে তাঁবু খাটিয়ে লোকে থাকতে শুরু করে দিয়েছিল দূর দূর থেকে এসে। কিন্তু তা বলে আজকালকার এই মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে বাহুবলীর টিকিট পাওয়া যাবে না এবং সেই টিকিটের জন্য অনির্দিষ্ট কালের জন্য লাইন লাগাতে হবে এটা নিমোর ছেলেরা মেনে নিতে পারছিল না। কলকাতার লোকেরা যেমন আমাদের মত গ্রামের পাবলিকদের নিয়ে মাঝে মাঝে খিল্লি করেন, আমরাও তেমনি আমাদের থেকে বেশী গভীর গ্রামের লোকেদের নিয়ে টিকা-টিপ্পনী কাটি। আমরা নিজেরা চাষা হয়ে আক্ষেপ করতাম এই বলে যে, শালা উত্তরের চাষাগুলো সব শেষ করে দিল।

    সেদিন তাপস আর সৈকতের বাহুবলী দেখতে যাবার শখ হল দুপুরের দিকে – কিন্তু ততক্ষণে কি আর টিকিট পাওয়া যাবে? অগত্যার গতি আলম যার সাথে আনন্দম সিনেমা হলের মালিক-দের চেনা আছে। আসলে হয়েছে কি আলম যে ইমিটেশনের দোকানটা চালায়, সেই ঘরের মালিক হচ্ছে আনন্দম সিনেমার মালিক রামকৃষ্ণ এবং তার ভাই কাঞ্চন। দোকান হল গিয়ে রামকৃষ্ণের বাড়ির নীচে মেমারী স্টেশনের বাজারের হাজির দোকান আর পান-ওলার দোকানের মাঝের গলিটা দিয়ে গেলেই। আলম রামকৃষ্ণকে বলত বড়বাবু এবং কাঞ্চন-কে ছোটবাবু।

    এমনিতে আলমের মতন অভিনেতা খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না – একদিন গিয়ে রামকৃষ্ণের কাছে পড়ল, “বড় বাবু, আপনার নীচের একটা দোকান ঘর তো খালি হয়েছে – যদি এই গরীবকে দেন, তাহলে ছেলে বউ নিয়ে খেয়ে বাঁচি আর কি”। সেই কথা শুনে রামকৃষ্ণ গেল গেল – ফলে ঘরের সেলামী না নিয়ে শুরু মাস ভাড়ার ভিত্তিতে আলম শুরু করল তার ইমিটেশনের ব্যবসা। আরে ওইখানে কি দোকান চলে নাকি? – আগে চলত, কিন্তু আলমের খামখেয়ালীপনার জন্য মার্কেট নিজের হারাল। সে দোকান খোলা রাখবে কি – আর্ধেক সময় দোকান বন্ধ করে মাছ বাজারের ভিতর বা টিকিট কাউন্টারের সামনের বটতলায় তাস/জুয়া নিয়ে ব্যস্ত। রামকৃষ্ণ বাড়ি থেকে বেরুবার সময় এবং বাড়ি ঢোকার সময় আলম নিজের দোকান ঘুলে রাখত।

    সিনেমার টিকিটের জন্য তাপস আর সৈকত গিয়ে হাজির হল আলমের দোকানে – যাথারীতি দোকান বন্ধ, কিন্তু ওরা জানত কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে মালটাকে। সেই তাসের আসরে গিয়ে হাজির হল ওরা দুজন –

    - এ আলম, দুটো টিকিটের ব্যবস্থা করে দে না তোর বাবুদের বলে
    - (তাস হাতে, মুখে বিড়ি নিয়ে) এখন বকাস না, দেখছিস না প্রচুর ব্যস্ত? কোথাও উঠে যেতে পারব না আমি এখন
    - আরে তোকে যেতে হবে না, একটা ফোন-টন করে দেখ না
    - তোরা এত জ্বালাস না – আমার পকেট থেকে ফোনটা বের করে ছোট বাবুকে লাগা।

    তাপস ফোনটা আলামের পকেট থেকে বের করে ডায়াল করে আলমের কানের কাছে ধরল। আলমের দুহাত জোড়া – ফোন লাগলে, আলম বললঃ

    “ছোট বাবু, আমি আলম বলছি। বলছি কি একটা খুব বাজে কাজ করে ফেলেছি। গ্রামের ছোট ছেলে গুলো বলছিল সিনেমা দেখতে যাবে বাহুবলী – আমি তো আর বেশী কিছু না ভেবে টিকিটের ব্যবস্থা করে দেব বলে কথা দিয়ে ফেলেছি। সকালে আপনাকে তাড়াতাড়ি করে বেরোতে দেখে আর বলতে সাহস করি নি। এদিকে তো এখন আমার দোকানে নিমোর বাচ্ছা গুলো এসে হাজির। টিকিট করতে পারি নি বলে খুব কান্না কাটি করছে দোকানের সামনে, আপনার বাড়ির ঠিক তলায়। বলছি, কোন ভাবেই কি কিছু করা যাবে ছোটবাবু - ”

    এর পর কিছু হ্যাঁ হুঁ শোনা গেল আলমের – দিয়ে কল শেষ হয়ে গেলে বলল, “যা ব্যবস্থা হয়ে গ্যাছে টিকিটের – এখন আর বিরক্ত করিসনি তাস খেলার সময়। তাপস বলল, “ওই আলম, তা কার কাছে গিয়ে টিকিট চাইব”?
    উত্তর এল, “গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবি কাউন্টারের সামনে। ফার্ষ্ট বেল পড়ে যাবার পর দেখবি একজন এসে ‘আলমের লোক কে আছ’ বলে জানতে চাইবে। তাকে পয়সা দিয়ে টিকিট নিয়ে নিবি। এখন ভাগ”

    বাপের জমি জায়গা থেকে খাবার অভাব হত না আলমের – আর তাই দোকানে মন না দিয়ে তাস/জুয়া খেলেই কাটাচ্ছিল। সে যে কিছুই পারে না তা নয় – তার এই ইমিটেশনের ব্যবসার আগে সেই ওই বড়বাবুদেরই বাজারে, তার পাশের ‘বড় ভাই’ এর টেলারিং এর দোকানে কাজ করত। জামা কাপড় সেলাই করত – নিজেও টুকটাক কাটত নিজের বাড়িতে, মানে নিমোতে। কিন্তু বেশী কুঁড়ে হলে যা হয় আর কি। প্যান্ট সেলাই করে প্রতি পিস ৭০ টাকা করে পেত তখন – দুটো প্যান্ট সেলাই হয়ে গেলেই আলম খুশী বড়ভাইও খুশী।

    অনেক দিন টেলারিং এ গিয়ে জামা কাপড় কাটানো হয় না – তা সেবার পুজোর সময় গিয়ে ভাবলাম একটা জামা কাটাবো। সাথে ছিল ইন্দোনেশীয়ার বানডুং নামক জায়গা থেকে কেনা খুব দামী একটা ওদের হাতে বানানো স্পেশাল বাটিক কাজের ছিট। আমি নিমো এসে আলম-কে বললাম তুই আমার জামাটা কেটে দে – এই পুজোর সময় আর কোন দোকানে যাব কাটাতে। ছিটটা হাতে নিয়ে আলম বলল বিদেশী ছিট মনে হচ্ছে তো রে – আর কত নিয়েছে? দাম শুনে বলল,

    “তোর বাঁড়া মাথা খারাপ হয়ে গ্যাছে সুকান, এই ছিট আমি কাটব? কালকে তুই আমার সাথে যাবি, বড়-ভাইকে বলব জামা কেটে দেবে। এমন জামা বানিয়ে দেবে তোর ওই বিদেশীদের চোখ টেরিয়ে যাবে”

    পরের দিন আই আলমের সাথে গেলাম বড়-ভাইয়ের কাছে জামার মাপ দিতে। দোকানে মাপ দেবার জন্য লাইনে ছিল জনা তিনেক। আলম গিয়ে তাদের সাইডে করে দিল এই বলে যে, “তোদের বাঁড়া টাইমের কি দাম আছে? আগে সুকান-কে ছেড়ে দে, তোদের পরে হবে। সুকান-কে চিনিস? চিনিস না তো? ভালো জিনিস কবে আর চিনতে শিখলি! এই দ্যাখ বিদেশে থাকে কিন্তু পায়ে খাদিমের চটি পরে ঘোরে নিমো এলে। আর তোরা বাঁড়া মকদম মার্কেট থেকে এখানে সাইকেলে করে আসবি পায়ে পাম-শু মারিয়ে!”। দিয়ে ছিটটা ওদের দেখালো, “এ সব ছিট দেখেছিস কোনদিন? ভাগ্য ভালো এখনই সুকান এল। নে, একবার হাত বুলিয়ে নে ছিটটায়”।

    বড়-ভাইয়ের ব্যাপারটা আর একটু খোলসা করা যাক। ‘বড়-ভাই’ আমাদের দিকের খ্যাতনামা কারিগর। বড়-ভাই ই একমাত্র আমার দেখা টেলর যে দূর্গা-পূজার সময়েও ওভারটাইম করত না, সন্ধ্যে সাতটাতেই কারবার খতম। হাতের কাজের খ্যাতির জন্য অনেক উঠতি ছেলে পুলে নতুন কিছু স্টাইলে বানাবার জন্য আসত তার দোকানে। পরে যখন আলম বড়-ভাইয়ের কাছে কাজ করতে ঢুকল, তখন জানতে পারলাম যে, দিনে পাঁচ -টা প্যান্ট কাটা হচ্ছে বড় ভাইয়ের লাইফের মন্ত্র। ফলে অনেকে লাইন দিয়েও প্যান্ট কাটাতে পারত না। একবার এক উঠতি ছেলে কিভাবে যেন বড়-ভাইকে পটিয়ে ফেলে নতুন স্টাইলে প্যান্ট কেটে দেবার জন্য। এবার ফার্ষ্ট ফরোয়ার্ড প্যান্ট ডেলিভারী নেবার দিন। সেই ছেলে খালি বলে বড়-ভাইকে, “এই খানে প্লেট ঠিক আসে নি, এই খানে আরো দুটো ফলস্ বোতাম লাগানোর কথা ছিল”। বড়-ভাই শান্ত মনে সব কিছু শুনল, দিয়ে জানতে চাইল, ‘তুই প্যান্টের ছিটটা কোথা থেকে কিনেছিলি”। ছেলে বলে, “ওই তো সুধীর বস্ত্রালয় থেকে ১৭০ টাকা দিয়ে”। বড়-ভাই আলতো করে টেবিলের উপর থেকে কাঁচিটা তুলে নিয়ে প্যান্টটা কুচি কুচি করে কেটে দিল। সেই ছেলের মুখ হাঁ হয়ে গ্যাছে। বড়-ভাই আরো শান্ত ভাবে ড্রয়ার থেকে ১৭০ টাকা বের করে ছেলেটিকে কুচো প্যাণ্টের সাথে দিয়ে বলল, “যা, অন্য কোথা থেকে মন মত কাটিয়ে নিবি”।

    তো বলতে নেই, জামা বড় চমৎকার কেটে দিয়েছিল বড়-ভাই। এখনো আছে সেই জামা। আগের বারে নিমো থেকে শেওড়াফুলি আসব বলে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি আলম কোথায় যাচ্ছে হাতে ভাতের ব্যাগ নিয়ে। আমি বললাম, “কিরে আলম, এই ট্রেনে কোথায়?” বলল, “আরে তোকে তো বলা হয় নি সুকান, এখন চুঁচড়োতে লজেন্স কারখানায় কাজ করতে ঢুকেছি”। জানতে চাইলাম, “তা হলে তোর ইমিটেশনের দোকান কি হল?”। “ওই দোকানের বিক্রী কোথায়? জুয়া খেলাটা একটু কনট্রোলে আনতে চাইছি – এই তোর গা ছুঁয়ে বলছি অনেক দিন জুয়া খেলি নি। ছোট বাবুকে বলেছি – দোকানটা এখন তবে ছাড়ছি না। ছেলেটা একটু বড় হলেই ওখানে লাগিয়ে দেব – ভালো জায়গায় ঘর ওমন বিনা পয়সায় আর কোথায় পাব”।

    এক কামরেতেই উঠলাম – নিমো থেকে চুঁচড়ো প্রায় এক ঘন্টা ১০ মিনিটের ধাক্কা। বাকি যারা লজেন্স কারখানা বা দিল্লী রোডের অন্য কারখানায় কাজ করতে যায়, সেই ডেলি প্যাসেঞ্জাদের সাথেও আলাপ হয়ে গেল। অনেক ভিতরের খবর জানতে পারলাম। আপনারা দারুণ দারুণ বলে যে লজেন্স/চকোলেট খান, সেগুলো কি ভাবে তৈরী হচ্ছে তার ভিতরের খবরও জানলাম। তবে সে গল্প আপনাদের না শোনাই ভালো – কথায় বলে না, রেষ্টুরান্টের হেঁসেলে ঢুকতে নেই!
  • সুকি | 236712.158.676712.124 | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৮:৪২381873
  • রোড সেফটি
    -------------------

    আমার কোম্পানীতে হেলথ-সেফটি-এনভায়রনমেন্ট এই নিয়ে প্রচুর কড়াকড়ি, এর মধ্যে আবার বিশেষ জোর দেওয়া হয় রোড সেফটি নিয়ে। এর চক্করে পড়ে আমাকে ‘ডিফেন্সিভ ড্রাইভিং’ নামক একটা কোর্স করতে হয়েছিল প্রথম বারের মতন যখন ব্রুনাই-য়ে থাকতাম।

    ট্রেনিং প্র্যাকটিক্যাল শুরু হবার আগে থিওরী করতে হয় – তা সেই ক্লাস চলছে। ক্লাস এইট পাশ টাইপের লোকাল ছেলে ভরবেগ সংক্রান্ত লেকচার দিচ্ছে, হাফ এম ভি স্কোয়ার এই সব কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। তবে সে যা ব্যখ্যা করল ভরবেগের, তার থেকে প্রাচীন ভারতে প্লাষ্টিক সার্জারী চালু ছিল তা বেশী বিশ্বাস যোগ্য। হাসি হাসি মুখে বসে আছি – কি আর করব। লোকাল লোক, গালাগাল বা শক্ত কিছুও বলতে পারছি না। এক সময় বলল, “এবার আমরা দেখব যে ঘন্টা প্রতি ৬০ কিমি গতিবেগে গেলে ব্রেক মারা থেকে পুরোপুরি রুখতে কতখানি পথ অতিক্রম হয়”। আমি বুঝলাম পেচ্ছাপ বসতে যাবার সময় হয়ে গ্যাছে – এ জিনিস আঁক কষে বার করতে গেলে তুমি বাপ আর ডিফেন্সিভ ট্রেনিং সেন্টারে ঝুলে থাকতে না! ভাগ্য ভালো যে তার ফিজেক্সের জ্ঞান আতসবাজীর মতন ফুস করে ফুরিয়ে গেল খুব তাড়াতাড়ি।

    এরপর বলা হল তোমরা নিজেদের জীবন থেকে এমন একটা ঘটনা শেয়ার কর যার থেকে রোড সেফটি সচেতনতা যে জরুরী তা বুঝতে শুরু করেছিলে। সবাই এক এক করে রোমহর্ষক ঘটনা বলতে শুরু করল – তারা বাস্তবের নাকি ফাষ্ট এ্যাণ্ড ফিউরিয়াস সিনেমা থেকে ধার করা তা যাচাই করে নেবার চেষ্টা করছি – সাতটা সিনেমা মনে করে ক্রশ চেক করা মুখের কথা নয়! ভাবতে ভাবতে খেয়াল ছিল না আমার পালা চলে এসেছে কতক্ষণ, গল্প যে আমাকেও বানাতে হবে সেটা মনে ছিল না!

    তবে এই সব সন্ধিক্ষণে আমাকে উদ্ধারের জন্য সর্বদা হাত বাড়িয়ে দেয় নিমো গ্রাম। আমাদের গ্রামে ঘটে নি এমন ঘটনা যার সাথে বাস্তব জীবনের কিছু না কিছুর রেফারেন্স টানা যাবে না এমনটা হতেই পারে না। সেই যাত্রায় আমাকে উদ্ধার করল কালামকাকা।

    আমাদের পাড়ার মোটা শৈলেনের সমন্ধী বাবু তখন দিদির বাড়ি মানে আমাদের পাড়াতেই থাকত। চুটিয়ে প্রেম করছে সেই সময় কামাড়পাড়ার মেয়েটার সাথে। বাবুর বাইক চালানো বিখ্যাত ছিল – মানে এত জোরে গ্রামের ভিতর দিয়ে প্যাঁচালো রাস্তা দিয়ে হিরো হোন্ডা চালাতো যে ভয় হত এই বুঝি কেউ চাপা পড়ল। একদিন তেমনি জোরে নিমো ভারত সমাজের সামনে দিয়ে বাবুকে বাইক চালিয়ে আসতে দেখল কালাম-কাকা। সাহেবের বাড়ির সামনে রাস্তার মাঝে খানে দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল কালামকা।

    “বাবু দাঁড়া, দাঁড়া – কথা আছে”।

    বাবু ক্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ালো প্রায় পায়ের গোড়ায় এসে। কালাম-কা বলল,

    “আচ্ছা বাবু, তুই যে এত জোরে গাড়ি চালাস, যদি কোন দিন অ্যাক্সিডেন্ট করিস, তোর বডি-র পিসগুলো ঝুড়ি করে কুড়াতে তো করিম-কে ডাকতে হবে রে!”

    গল্প এখানেই শেষ – বাবু বলল, “কাকা এটা তো আমি ভেবে দেখি নি!” কালাম-কার মত এত ইমপ্যাক্ট ফুল রোড সেফটি নিয়ে ডায়লগ আমি আর কোন দিন শুনি নি।

    যারা ঝুড়ি করে কুড়ানোর রেফারেন্স জানেন না তাদের জন্য ফুটনোটে ব্যাখ্যাঃ

    নিমোতে তখন মাঝে মাঝেই রেল-লাইনে অ্যাক্সিডেন্ট হত। রেলে মাথা দিত অনেকে – মানে আত্মহত্যা করত। আত্মহত্যা করার জায়গা হিসাবে নিমো স্টেশনের আপ প্লাটফর্মের কাছে বেল-তলাটা এত বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল যে আশে পাশের এলাকা থেকেও অনেক পাবলিক সুইসাইড করতে আসত নিমোতে। সেই গল্প অন্যদিন হবে।

    যাঁরা রেলে অ্যাক্সিডেন্ট দেখেছেন তাঁরা হয়ত জানেন, রেল লাইনে মাথা দেওয়া তো আর গিলোটিনে গলা বাড়িয়ে দেওয়া নয় যে চুক করে মাথা একদিকে আর বডি একদিকে হয়ে গেল স্মুথলি। ঠিক মত বডি রেলে ফেলতে না পাড়লে সেই ট্রেনের সামনের জালতির পাল্লায় পরে বডি অনেক দূর টেনে হিঁচড়ে চলে যায়। এখানে কব্জি, সেখানে থাই, ওদিকে প-এর টুকরো – এমনটা হামেশাই হত। রেলে লাইন হল গিয়ে জি আর পি-র এলাকা – এখানে মারা গেলে সেই জি আর পি এসে বডি নিয়ে পোষ্টমর্টেম ইত্যাদি করবে – ফালতু ঝামেলা অনেক। তাই গ্রামের কেউ ট্রেনে সুইসাইড করলে তার বডি নিয়ে গিয়ে গ্রামের পাশের শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হত – পুলিশে খবর দেওয়া বাদ দিয়ে। ওই যে আগে বললাম, বডি মানে তো মাথা আর ধর দুপিস নয়! এইখানেই করিম-কার কেরামতি – স্টেশনের পাশে চায়ের দোকান করিম-কার। সে ঝুড়ি নিয়ে এসে বডি পার্টস কুড়িয়ে জড়ো করত – ভলেন্টারী সার্ভিস।

    এই ব্যাকগ্রাউন্ডটাও সেই দিন ট্রেনিং-এ বুঝিয়ে বলতে হয়েছিল কালামকার ডায়লগের ইম্প্যাক্ট বোঝাতে। শুনে সবাই একমত হল যে কালাম-কার ডায়লগ সত্যিই ইমপ্যাক্টফুল ছিল।
  • Ela | 236712.158.782323.63 | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১১:২৪381874
  • জমজমাট!
  • সুকি | 236712.158.676712.140 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৪৭381875
  • বোম-বাজী
    ----------------

    পুজো আর সপ্তাহ দুয়েক বাকি – আরো অনেক কিছুর সাথে দুর্গা পুজো মনে করিয়ে দেয় আমার রিসার্চ বিষয়ক প্রথম ব্যর্থতার কথা। বাড়িতে বাজি বানাতে গিয়ে – না, বাজি বানাতে ব্যর্থ হয় নি, ব্যর্থ হয়েছিলাম হাতে বানানো রংমশাল আর তুবড়ির ধোঁয়া কমাতে। বানাতাম সে সব মাল জবরদস্ত, কিন্তু বড় বেশী ধোঁয়া হত। সে অনেক দিন আগেকার কথা।

    বাড়িতে দুর্গাপুজো হয় আমাদের, বহু বছর ধরেই হয়। এক সময় আমাদের দাদারা লায়েক বয়েসে পৌঁছে ঠিক করল বাড়িতেই বোম বাজি ইত্যাদি বানাতে হবে। আমরা তখন খুবই ছোট। কানেকশন এল নেপালদার বন্ধু অদয়দার চেনা সূত্র ধরে – সেই মাষ্টার-এর সাথে। মাষ্টার নাকি কংগ্রেস জামানায় পেটো বানাতো দুরদার – সি পি এম আমলেও বানাতো, তবে খুব খাতির থাকলে তবেই। আমাদের পুরানো বাড়ির ছাদেই সেই বোম-বাজি বানানোর শুরু। তুবড়ির খোল কেনা আসত কুমোর বাড়ির থেকে – বাকি বোম বানানোর মালমশলা মেমারী বাজাদের এদিক ওদিক হতে। সোরা, গন্ধক, অ্যালুমিনিয়াম/লোহা চূড়, স্পাইরো পাউডার ইত্যাদি। তবে জমাটি কেস ছিল কাঠকয়লার বেলায়। সঠিক কাঠকয়লা নাকি বাজি বানানোর ক্ষেত্রে খুবই জরুরী – আর কোন ওলাউঠো নাকি বলেছিল সবচেয়ে ভালো কাঠকয়লা হয় আকন্দ গাছের গুঁড়ি পুড়িয়ে!

    এবার খোঁজ আকন্দ গাছ! তখনকার দিনে সবচেয়ে বেশী আকন্দ গাছ ছিল রেল লাইনের গা বরাবর – নিমো রেললাইনের গা ঘেঁষে রসুলপুরের দিকে এগিয়ে গেলে অনেক আকন্দ গাছ। এবার যাও হাতে শাবল এবং কাঁধে বস্তা নিয়ে সেই আকন্দ গাছের গোড়া খুঁড়তে! বস্তা করে আকন্দ গাছের গোড়া এনে তা ঢালা হত বাড়ির উঠানে গর্ত করে তার ভিতর – এর পর আগুন জ্বালিয়ে মাল দাও চাপা দিয়ে। ওই যে অন্তর্ধুম পাতন না কি বলে না! এক সময় আকন্দ গাছ কমে আসতে লাগল – তখন শিফট করা গেল কুল গাছের ডালে! সেই ডাল পুড়িয়ে নাকি ভালো কাঠ কয়লা হয়।

    আমাদের গ্রামে তখনো বিজলী আসে নি – মিক্সার তো দূরের কথা। সোরা বেঁটে দিত দিদিরা শিল নোড়ায়। রঙ মশলার ঠোঙা বানাতাম তখন কাগজ কেটে আমরা। মাষ্টার মশালার ভাগ ইত্যাদি শিখিয়ে দিয়ে গেল গদা-কাকুকে। আমি ছিলাম গদা-কাকুর এক নম্বর সহকারী – গদা কাকু কয় বছর সেই দায়িত্ব নিবার পরেই ব্যবসায় সিফট করে গেল। আর পুজোর সময় ব্যবসা ছেড়ে আসা যায় না – ফলে এই অপ্রাপ্তবয়েসে আমার ঘাড়ে এসে পড়ল বোম-বাজী তৈরীর গুরু দায়িত্ব! একটা খাতা ছিল আমার – চুপিচুপি অনেক কিছু লেখা, সেই খাতাতেই ফর্মুলা লিখে রাখলাম – বোম-বাজির মশালার ভাগ। যত্ন করে চাবি দেওয়া থাকত সেই খাতা আলমারীতে – ইনফ্যাক্ট আমার পর, মানে আমি দেশ ছাড়ার পর ব্যটন তুলে দেবার জন্য তেমন নির্ভরযোগ্য কাউকে পাই নি – ভায়েরা চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। আমার আন্ডারে কাজ করত তারা পুজোর সময় ঠিক আছে, কিন্তু নিজেরা আগ বাড়িয়ে পুজোর অনেক আগে থেকে সব কিছু ঠিক করে রাখা – এই সব পারত না। আমি ক্রমশ পুজোর খুব গায়ে গায়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করলাম – অত দেরীতে গিয়ে আর বাজি বানানো সম্ভব নয়। এক সময় বাজি বানানো বন্ধ হয়ে গেল বাড়িতে – আমরা দশমীর দিন বাজি কিনতে যেতে শুরু করলাম আমাদের গ্রাম থেকে কিছু দূরে গৌরীপুরে – চাচার কাছে। এর কিছু বছর পর চাচার বাজি কারখানায় আগুন লেগে মেয়ে, চাচা নিজে অনেক পুড়ে যায় – তবে সে গল্প অন্য কোন সময়ে।

    পুজো আসছে বলে পুরানো ছবিতে চোখ বুলাচ্ছিলাম – নষ্টালজিয়া আর কি! ছবি কিছু খুঁজে পেলাম।

    প্রথম ছবিতে দেখা যাবে আমার আন্ডারে ভাইরা বাজী তৈরীতে বসে – সারা গায়ে বারুদ লেগে। তখন আমার বাজি কারখানার জৌলুস পড়তির দিকে।



    দ্বিতীয় ছবিতে আমরা বাজী বানাতে বানাতে ব্রেক নিয়ে দুপুরে খেতে বসেছি – গায়ে হাতে ওই পরিমাণ বারুদ নিয়ে ম-কাকিমারা আমাদের ঘরের মধ্যে খেতে দিয়ে রাজী ছিল না। অগত্যা বাড়ির বাইরের উঠোনে বসে ভাত খাওয়া।



    পরের ছবি গুলোতে বাজী পোড়ানো – ধোঁয়ার চোটে হয়ত আপনি কিছু বুঝতেই পারবেন না! তবে এই ধোঁয়া আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমার প্রথম গবেষণার ব্যর্থতা।











  • সুকি | 237812.69.563412.229 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৫৩381877
  • নিমো স্টেশন
    ---------------

    সেদিন বিকেলে নিমো স্টেশনে বসে আছি, দেখলাম আমাদের বাউরি পাড়ার দুই বৌদি (আমরা ‘বউ’ বলি কথ্য ভাবে গ্রামে) আপ স্টেশনের উপর দিয়ে প্রায় ছুটছে – পাশ দিয়ে যাবার সময় শুনতে পেলাম একজন বলছে আরেক জনকে, “এই গোপাল-টাকে একদিন ঝাঁটা পেটা করতে হবে”। কে গোপাল ঠিক বুঝতে পারলাম না, কিন্তু পরে একটু সইয়ে নেবার পর টের পেলাম এ গোপাল আমার জ্যাঠার ছেলে গোপাল। ঝাঁটা পেটার কারণ বুঝতে হলে নিমো স্টেশনের বর্তমান পরিস্থিতি হালকা বুঝে নিতে হবে।

    হয়েছে কি উন্নত হতে গিয়ে নিমো স্টেশন পুরো ঘেঁটে গেছে। আগে নিমো স্টেশন ছিল প্লেন অ্যান্ড সিম্পল। দুটো প্লাটফর্ম আপ-ডাউন, টিকিট কাউন্টার, দিলীপ, হাবা, করিমের চায়ের দোকান ইত্যাদি। এবং ট্রেনের আগমণ বার্তা ঘোষণার কোন ব্যবস্থা ছিল না। দেশের উন্নতি হচ্ছে, সেই সাথে রেলেরও – সেই করতে গিয়ে ব্যান্ডেল থেকে বর্ধমান পর্যন্ত একটা থার্ড লাইন বসানো হয়েছে। বেশ কয়েক বছর কাজ চলার পর এখন সেই ট্র্যাকে ট্রেন যাতায়াত চালু হয়েছে। এবং সেই চালু হবার সাথে সাথে নিমোর মানুষের কনফিউশন শুরু। এই তৃতীয় ট্র্যাকটা হয়েছে আপ লাইনের এদিকে। পাশা পাশি জায়গা না থাকার জন্য, এখন নিমোর নতুন আপ প্লাটফর্মটা তৈরী হয়েছে পুরানো প্লাটফর্মের আগে (মানে বর্ধমানের দিকে)। ফলতঃ নিমোর এখনকার আপ প্লাটফর্ম এই ইয়া লম্বা, দুই প্লাট ফর্মের দৈর্ঘের যোগফল – খড়গপুরের থেকেও মনে হয় দৈর্ঘ্যে বেশী। সেদিন প্লাটফর্ম হেঁটে শেষ করে দেখলাম পাশের গাঁয়ের (সাপুড়) মুখে চলে এসেছি, সেই এত বড়। গ্রামের বড়রা ক্ষোভ প্রকাশ করছে এই বলে যে নিমো নামের স্টেশনের প্লাটফর্ম লম্বা হয়ে গিয়ে সাপুড় গ্রামের মুখ পর্যন্ত যাবে কেন!

    শুধু স্টেশন করেই ক্ষান্ত হয় নি রেল – চারিদিক ঘিরে দিয়ে স্টেশনের। পাশ দিয়ে সহজেই উঠে পড়ব প্লাটফর্মে সেটি আর হচ্ছে না – জিন্স পড়ে বেড়া ডিঙোতেই প্রবলেম। আর তা ছাড়া এই উন্নতি করতে গিয়ে আপ প্লাটফর্মের গায়ে সেই ফেমাস বেল গাছটাও কাটা পড়ে গ্যাছে। সেই গাছে যে ব্রহ্মদত্যিটা থাকত সে এখন কোথায় গেছে কে জানে! তান্ত্রিক তপুর সাথে কনসাল্ট করার টাইম পেলাম না। আগে এই বেল গাছে তলায় রেলে মাথা দিতে আসত কত লোকজন – সে নিমোর হোক কিংবা বাইরের গ্রাম থেকে। রেগে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়ে স্টেশনে টুক করে ট্রেনের তলায় মাথা দিয়ে দেওয়া, সে খুব হত আগে। কিন্তু সেদিন শুনলাম একজন বাড়ি থেকে গিয়ে মাথা দিয়ে গেছে, প্রথমত তো বেল গাছের তলা পায় নি বলে ইতস্তত করছিল, তবুও সেই বিশাল লম্বা প্লাটফর্মের উপর দিয়ে হেঁটে রেলে নামে – কিন্তু ততক্ষণে তার রাগ জল হয়ে গেছে! অত লম্বা প্লাটফর্ম হেঁটে পার হতে হলে রাগ ধরে রাখা যায় নাকি? নিমো গ্রামের পাশের শ্মশান নতুন পঞ্চায়েত এসে ভালো করে গড়ে তুলেছে, কিন্তু তাতে পোড়াবার জন্য বডি পাওয়া যাচ্ছে না! কি কেলো সে কি আর বলব!

    তবে সবচেয়ে বেশী প্রবলেম হয়েছে এই রেল লাইনগুলো একে অপরের সাথে কানেক্ট করে দিয়ে। আগে আপের ট্রেন আপে এবং ডাউনের ট্রেন ডাউনেই আসত – লাইন পাল্টাবার কোন উপায় ছিল না। কিন্তু এখন কোন প্লাটফর্মে গাড়ি আসবে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না! কোন অজ্ঞাত কারণ বশতঃ রেল এখনো প্লাটফর্ম গুলোর নাম্বারিং করে নি নিমোতে। ফলে কোন প্লাটফর্মে গাড়ি আসবে সেটা জ্যাঠা আর ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না।

    বাই দি ওয়ে নিমো স্টেশন মাষ্টার আমার সেজ জ্যাঠা। এখন রেল একটা মাইক এর একটা লাউড স্পীকার ফিট করে জ্যাঠাকে বলেছে গাড়ির খবর পাবলিককে জানাতে। একদিন জ্যাঠা বলছে “গাড়ি মেন লাইনে আসছে”, একদিন বলছে, “গাড়ি রিভার্স লাইনে আসছে”, অন্যদিন “গাড়ি নতুন লাইনে আসছে” – পাবলিক পুরো ঘেঁটে গেছে। স্টেশন ময় ছোটাছুটি এখন গেলেই দেখা যাবে। জ্যাঠা বাড়িতে খেতে বা বিশ্রাম নিতে গেলে টিকিট কাউন্টার দেখভাল করে গোপালদা। হয় কি, একটু উত্তেজিত হয়ে গেলে গোপাল-দা একটু তোতলা টাইপের হয়ে যায়। সেই জন্য গাড়ির খবর বলেই না প্রায় – একদিন অনেক চাপে পড়ে বলেছে। পাবলিক সেই মত প্লাটফর্মে গিয়ে ওয়েট করছে – শেষ মুহুর্তে শোনা গেল জ্যাঠা বাড়ি থেকে ঘুমিয়ে এসে মাইকে ঘোষণা করছে, “গোপাল আগে ভুল বলেছে – আপের গাড়ি নতুন প্লাটফর্মে আসছে”। এতক্ষণ লোক অপেক্ষা করছিল পুরানো প্লাটফর্মে – এবার ছোট সেই নতুন প্লাটফর্মে প্রায় ৪০০ মিটার! সেদিন আমি স্টেশনে ছিলাম, সেই তখনি ছুটতে ছুটতে বৌদিরা বলছিল গোপালদাকে ঝাঁটা পেটা করার কথা। তবে সেই একদিনই নয় – আমি পরে একদিন টিকিট কাটতে গিয়ে গোপালদার সাথে কাউন্টারে গল্প করছি দেখি একজন টিকিট দেবার খোপের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে গেল আবার সেই ঝাঁটা পেটার কথা!

    এই ভাবেই চলছে – নতুন যোগ হয়েছে দেখলাম বাসুদার চপ এবং খ্যাপাদার বারোভাজার দোকান। সন্ধ্যে ঘনালে বা রাত গভীর হয়ে এলে নিমো স্টেশন এখনো মায়বী হয়ে ওঠে! সাথের ছবি গুলো আগের সপ্তাহে তোলা।










  • সুকি | 237812.69.453412.44 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৫৭381878
  • লম্বু গাছ, খড়ের পালুই ও ভবানী হাজরার ছাগল
    -----------------------------------------------------

    সাথে ছবিটিতে যে গাছটি দেখা যাচ্ছে সেটি আমাদের খামারের সীমানায়, আর পাশের খড়ের পালুই-টি ভবানী হাজরার খামারের বাউন্ডারীতে। এই দুইয়ের মাঝখান দিয়ে কোন ভাবে ভারত-বাংলাদেশের মত সীমারেখা চলে গেছে। এবং ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এক ছবিতে আমাদের খামারের দিকে একটা সাদা ছাগল শুয়ে আছে লম্বু গাছের তলায়। ইহা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যাপার এই লেখার প্রেক্ষিতে।



    গাছটার নাম লম্বু-গাছ, যার বিজ্ঞান সম্মত নাম ‘লম্বু-লম্বু’, ইংরাজী নাম জানা নেই। জ্বালানী ছাড়া এই গাছের কাঠ দিয়ে আর কি হয় তাও জানি না বলাই বাহুল্য। অবশ্য নিমোর বিখ্যাত কাঠ মিস্ত্রি রবি শর্মা লম্বু কাঠের খাট বানিয়ে জলশিরীষ বা সোনাঝুরি এবং লোক বিশেষে সেগুন বলে চালাত সেটা বিলক্ষণ জানা।

    এবার পুজোতে বাড়ি গিয়ে শুনলাম এই লম্বু গাছ এবং খড়ের পালুই নিয়ে ভবানী হাজরা এবং আমার ভাই বাবু-র মধ্যে খুনসুটি শুরু হয়েছে। ভবানী হাজরা আমাদের সোনার বাংলা ক্লাবের শব্দ-প্রেক্ষণ এবং ডান্সিং অ্যারেঞ্জমেন্টের স্থায়ী দায়িত্বে থাকা ভুলুর দাদু। দেখা হল ভুলুর সাথে, সে এখন ২২০ সিসি-র কি একটা বাইক কিনে ঘুরছে। ওর কাছ থেকে জানতে পারলাম শুধু নিমো-মেমারীতেই নয়, বর্ধমানেও এবার পুজোর মার্কেট খুবই খারাপ ছিল। বর্ধমান স্টেশনের পিছন দিক দিয়ে বেরুলে যে মাল গুদামের দিকে যাওয়ার রাস্তা আছে (গুডশেড রোড) সেখানে ফার্ণিচার শো-রুম ‘খুবসুরৎ’ এর স্টোর ম্যানেজার। আপনারা কেউ যদি ওদিকে কিছু কিনতে যান, তাহলে ভুলুর কাছে আমার নাম রেফার করলে কিছু ডিসকাউন্টের চান্স রয়েছে।

    আলমের কানেকশন থেকে যেমন আনন্দম সিনেমা হলের টিকিট পাওয়া যায়, তেমনি ভুলুর কানেকশন থেকে বর্ধমান শহরের একটু বাইরে জি টি রোডের ধারে যে ‘ক্যান্টিন’ নামক বিখ্যাত রেষ্টুরান্ট হয়েছে সেখানে নবমীর রাতে বিনা লাইনে ভি আই পি ট্রিটমেন্ট পেতে পারেন। জানতে পারলাম যে নিমোর ছেলেরা ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে রাত দেড়টার সময় ‘ক্যান্টিন’-এ পৌঁছে দেখে যে তাদের আগে থালা বাটি হাতে আরো জনা পঞ্চাশ পাবলিক ওয়েট করছে। অগত্যা অত রাতে ভুলুকে কল দিতে হয় তার মালিক-কে এবং তেনার বলে দেবার ফলে উপরের তলায় বিশেষ ভাবে ব্যবস্থা হয়ে যায় নিমো পাবলিকের তুরন্ত।

    ভুলু ভালবেসে বিয়ে করেছে আমাদের পাশের কোলেপাড়া গ্রামের মেয়েকে। যতদূর মনে পড়ছে ভুলুর শ্বশুরের সাথে একসাথে মনে হয় কিছু ক্রিকেট খেলেছি। আমাকে পুজোর সময় ভুলু বলল, “দাদা, বিয়েতে তো বিশাল কিছু খাওয়াতে পারি নি – এই ছেলের অন্নপ্রাশনে সবাইকে জবরদস্ত খাওয়াবো”। মনে হচ্ছে সেই খাওয়াটাও মিস হল।

    প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছি – মানে যেটা এসটাবলিস করতে চাইছিলাম তা হলে – ভুলু পুরো মাইডিয়ার টাইপের ছেলে। কিন্তু ভুলুর দাদু ভবানী একটু তেরচা টাইপের লোক আছে বলেই আমরা ছোট বেলা থেকে জেনে এসেছিলাম। গরু – ছাগল – জমি নিয়েই তেনার জীবন কেটে গেল।

    লম্বু গাছের সাথে খড়ের পালুইয়ের সম্পর্ক বুঝতে না পেরে আমি বাবুকে ব্যাপারটা ক্লীয়ার করতে বললাম। বাবু আমাকে যা এক্সপ্লেন করল তাতে করে ভবানী হাজরার দাবী হচ্ছে আমাদের লম্বু গাছের পাতা থেকে জল টপটপ করে পরে খড়ের পালুই-য়ের খড় নষ্ট হচ্ছে তার।



    আমি এমনতর যুক্তি শুনে ঘাবড়ে গেলাম – বৃষ্টি হলে তো জল গাছ এবং পালুই-য়ের গাদা দুই জায়গা তেই পড়বে! আলাদা করে গাছের ডাল থেকে পালুই-য়ে জল যাবে কি করে!! ডিপে গিয়ে বুঝতে পারলাম, বৃষ্টির জল নয় – এই শীতকালের কুয়াশা আসছে, গাছের ডালে কুয়াশা জমে জল ড্রীপ করবে নাকি খড়ের উপর। এমন যুক্তি আমি বাঁড়া জীবনে শুনিনি – এমনটা বাবু জানাল, এবং আমি সহমত হলাম। তবুও গাছের ডাল কেটে ভবানী হাজরার খুঁচানোর হাত থেকে বাঁচতে রবি শর্মা-কে বলা হয়েছিল সেই লম্বু গাছ নিয়ে যা তাড়াতাড়ি। কিন্তু পুজোর বাজারে রবির হাজারো কাজ থাকায় লম্বু গাছ যেমন, তেমনই থাকে – আর ওদিকে ভবানী-র তাগাদাও শেষ হয় না। এর হাত থেকে নিস্তার পেতে বাবু এবার অন্য ট্যাকটিক্স নেয়। সে বলে ভবানী হাজরাকে, “ঠিক আছে আমি গাছের ডাল কেটে দেব, কিন্তু তোমার ছাগল যদি এবার থেকে আমার খামারে ঢোকে তা হলে ওই ছাগলের ঝোল হয়ে গিয়ে খাবার পাতে উঠতে বেশী সময় লাগবে না!” সেই শুনে নাকি ভবানী হাজরা একটু দমে গেছে – লোকে বলে নিজের ছেলেদের থেকেও ছাগল-গরু বেশী ভালোবাসত এককালে ভবানী হাজরা।



    আমাকে ভাই জিঞ্জেস করল – এই বুড়ো বয়েসে ভবানীর এমন করার কোন মানে হয়! আমি তখন ভাবতে বসলাম - সদ্য পড়ে শেষ করেছি “ভুঁইফোড়ের মনোবিদ্যাচর্চা”। সেই অ্যানালিসিস করে যা বুঝতে পারলাম, এই বয়েসে এসে ভাবনী হাজরা আর কথা বলার বেশী লোক পাচ্ছে না – কেউ বিশেষ পাত্তা দেয় না। আর বলতে কি লাইফে তেমন কোন সমস্যাও নেই। তাই এই সব অদ্ভূত সমস্যা খুঁজে নিয়ে এর তার সাথে গায়ে পরে খুনসুটি করে।

    তবে খড়ের পালুই-য়ে জল পড়ার ব্যাপারটা হালকা সেটেল হয়েছে শুনলাম – পরের বারে গিয়ে দেখতে হবে পুরোটা সলভ হয়েছে নাকি!
  • সুকি | 236712.158.786712.21 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:০০381879
  • আলু
    ----------------------

    আজকে আমষ্টারডাম শহরে হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই আলুর কথা মনে পড়ে গেল। যারা আমষ্টারডাম বা হল্যান্ডে এসেছেন তাঁরাই নিশ্চয়ই ডাচ আলু এবং তার থেকে তৈরী ফ্রাই-য়ের সাথে সম্যক পরিচিত। সেই আলুর ফ্রাই বা আলুভাজা যে কি লম্বা লম্বা সে আর কি বলব। তেমন ফ্রাই যে আলু থেকে কেটে বানানো হয় তা কত বড় হবে কল্পনা করে নিন আগে দেখে না থাকলে। থাক আর কষ্ট করে কল্পনা করতে হবে না, ডাচ আলুর টাটকা ছবি তুলে রেখেছি, দেখে নিন আটকে দিলেম এই লেখার সাথে। তবে ছবির সাথে স্কেল নেই বলে আপনি হয়ত আবার ভাবে বুঝতে পারবেন না এ আলু কত বড় – আমাদের চন্দ্রমুখী বা জ্যোতি এর কাছে নিতান্তই শিশু। পূর্ণবয়ষ্ক মানুষের পায়ের পাতার মত বড় এবং লম্বাটে হতে পারে সেই আলু।



    আমাদের যেমন ভাত, ডাচেদের তেমন আলু – মানব সভ্যতার সাথে অঙ্গাঅঙ্গি জড়িয়ে আছে কার্বোহাইড্রেট। ডাচ ক্যুজিন বলে তো তেমন কিছু হয় না, এই মালগুলো না জানে মশালার ব্যবহার, না জানে ভালো মাংসের কোন ডিস বানাতে। এমনকি আমেরিকা বা অষ্ট্রেলিয়ার পাবলিকদের ন্যায় বারবিকিউ-ও পারে না! তবে শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়ায় সাড়ে তিনশো বছর কাটিয়ে মশালা হালকা চিনেছে। এবং সেই খাবার আজকাল বিলক্ষণ ভালোবেসে ইন্দোনেশিয়ান খাবারকে নিজেদের বলে চালাবার চেষ্টা করছে! ঠিকক বৃটিশরা যেমন কারী নিজেদের দাবী করে নিয়ে নিল বলে – ডিক্সেনারী তে তো অনেক আগেই ঢুকিয়ে নিয়েছে, তা সে কেমব্রীজ বা ওয়েবষ্টার যাই হোক না কেন!



    যাই হোক, হল্যান্ডে আলুভাজা যতই ডাচ ডেলিকেসী বলে টুরিষ্টদের চালানো হোক না কেন – সত্যি কথা হল আমষ্টারডাম শহরে হাঁটতে হাঁটতে মেয়োনিজ দিয়ে গরম গরম আলুভাজা খেতে খুব একটা মন্দ লাগে না! আজ ছিল তেমনই এক দিন। আলুভাজা খেতে খেতে হাঁটতে গিয়ে বহুদিন আগে আলু নিয়ে আমাদেরই ইস্কুলের এক স্যারের কীর্তি কলাপ মনে পড়ে গেল।

    সেই স্যারের কাছে আমরা টিউশন পড়তাম – স্যারের বাড়ি ছিল মেমারীর কালিমাতা কোল্ডস্টোরের ঠিক সামনে। তো সেবার হয়েছে কি নতুন আলুর মারাত্মক দাম হয়েছে, চাষী বেজায় খুশী। তার আগের বছর আলুর একদম দাম ছিল না। স্যার করেছে কি তার দেশের বাড়ির এক চাষীকে টাকা দিয়েছে দাদন টাইপের ব্যবস্থায়। মনে ধরা যাক স্যার সেই চাষীকে আলু পাতার সময় ২০০০ টাকা দিয়েছে, মৌখিক চুক্তি হয়েছে যে আগের বছর আলুর গড় দাম দেখে স্যারকে সে কয় বস্তা আলু দেবে আলু উঠলে পড়ে। ধরা যাক আগের বছর আলুর গড় দাম ছিল ২০০ টাকা প্রতি বস্তা, এর অর্থ সেই চাষী আলু উঠলে স্যারকে ২০০০/২০০ = ১০ বস্তা আলু দেবে।

    এই পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু সেই বারে আলুর দাম হয়ে গেল ফট করে ৪০০ টাকা প্রতি বস্তা! এবার হয়েছে কি সেই চাষী আর স্যারকে ১০ বস্তা আলু দিতে চায় না! স্যার বলে, আগে যা কথা ছিল ততো বস্তাই আলু দিতে হবে – আর সেই চাষী বলে সে ৪০০ টাকা দরে আলু (মানে ৫ বস্তা) স্যারকে দেবে। এই নিয়ে বিশাল ক্যাঁচাল, স্যার আর আলু পায় না। আমাদের সকালে পড়াতে পড়াতে কালীমাতা কোল্ড স্টোরে আলু ঢোকাতে আসা দাঁড়িয়ে থাকা আলুর বস্তা ভর্তি গরুর গাড়ি এবং ট্রাকটার গুলোর দিকে উদাস চোখে চেয়ে থাকত! একদিন এই ভাবেই আমাদের পড়াতে পড়াতে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে কালীমাতার দিকে, হঠ করে দেখি স্যারের চোখে চাঞ্চল্য – জ্বলজ্বল করে উঠল চোখগুলো।

    “ওই গরুর গাড়ির সাথে ওটা তরুণ না”?

    এই বলে কিছু দেখা দেখি নেই, আমাদের স্যার পড়াচ্ছিলেন লুঙ্গি পরে। হাতের বই ফেলে দিয়ে লুঙ্গির কোঁচা পাকড়ে স্যার দিলেন ছুট দোতলা থেকে। আমরা উপর থেকে দেখছি, স্যার ছুটে গিয়ে সেই গরুর গাড়ির সামনে চলে গেলেন। গরু দুটোকে এড়িয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন কোনক্রমে এবং সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন আলুর বস্তার উপর। আমাদের প্রধান মন্ত্রী আজকাল যেমন বড় পাথরের উপর শুয়ে যোগব্যায়াম করেন, সেই অনুরূপ ভাবেই ছিল স্যারের শুয়ে পড়া। আলুর বস্তার উপর শুয়ে স্যার চিৎকার করছেন,

    “এ আলু আমার – এ আলু আমার। এ গাড়ি কোল্ড স্টোরে ঢুকতে হলে আমার বডির উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ আলু আমার, সব বস্তা আমার”।

    আশে পাশের লোক জন একটু ঘাবড়ে গেছে, আফটার অল স্যারকে সবাই চেনে আশেপাশে এবং সম্মান করে। কিন্তু আলুর মায়ায় স্যারের আর সেই সব মনে নেই, এবার চিৎকার করে আমাদের ডাকছে,

    “এ্যাই তোরা নেমে আয় তাড়াতাড়ি – এসে এ গাড়ি আটকা। তোরা থাকতে তোদের স্যারের উপর এত অনাচার হতে দিস না। তোদের স্যারের সব আলু এরা লুটে নিয়েছে”।

    এদিকে স্যারের লুঙ্গি প্রায় খুলে গ্যাছে ওরকম তড়িঘড়ি ভাবে দৌড়ে নামার জন্য। এক হাতে লুঙ্গির গিঁট ধরে অন্য হাতে আমাদের নীচে নামার জন্য ইশারা করছে স্যার – সবটাই আলুর বস্তার উপর শুয়ে শুয়ে।

    আজ আমষ্টারডামে হাঁটতে হাঁটতে আলুভাজায় কামড় দিতে দিতে সেই স্যারের আর্ত চিৎকার মনে পড়ে গেল, “এ আলু আমার” এবং “আমার সব আলু এরা লুটে নিল”। নিজের অজান্তেই কখন ঠোঁটের কোনে হাসি চলে এসেছিল, পাশের কলিগ কি হয়েছে জানতে চাইলে কিছু না বলে কাটিয়ে দিলাম।

    বড় জ্যাঠার বাঘ মারার গল্প ইংরাজীতে রব-কে শোনাতে সক্ষম হলেও, লুঙ্গির গিঁট ধরে ‘এ আলু আমার’ – জিনিস ইংরাজীতে অনুবাদ করে টম-কে শোনানোর মত এলেম আমার নেই!
  • সুকি | 237812.69.453412.164 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:০৮381880
  • বাড়ি ঘর
    -----------------------

    বিয়ে-থা করে সংসার বসানোর প্রাক্কালে আলোচনা উঠল বাড়িতে যে ঘরের সংখ্যা বাড়াবার তাহলে সময় এসেই গেল! ঘরের সংখ্যা কিভাবে বাড়ানো যাবে সেই নিয়ে বাপের সাথে নিম্নরূপ আলোচনা হল, আমি বললাম –

    - বলছি, তাহলে কলকাতার দিকে একটা ফ্ল্যাট দেখার চেষ্টা করি

    বাপ তখন চা খাচ্ছিল, আমার প্রস্তাব শুনে চা চলকে লুঙ্গিতে পরে গেল

    - বলিস কি! বাপ ঠাকুর-দার ভিটে ছেড়ে চলে যাব! বিদেশে থেকে থেকে মাথাটা একদম গ্যাছে নাকি তোর!

    আবার সপ্তাহ খানেক পর আলোচনা ভেসে উঠল ফোনে

    - বলছি কি, তাহলে ওই পুরানো বাড়ির ভিতরে গুঁজে না থেকে একটু বেরিয়ে এসে নিমো রেল-গেটের কাছে যে জমিটা আছে সেখানে একটু হাত-পা ছড়িয়ে বাড়ি করলে কেমন হয়
    - বলিস কি! বাপ ঠাকুর-দার ভিটে ছেড়ে উঠে যাব!

    আমার কাছে ব্যাক-আপ উত্তর ছিল না। ফলে সেই প্রসঙ্গের ইতি – ফাষ্ট ফরোয়ার্ড আরো কিছু সপ্তাহ, এবার একটা এসপার ওসপার করতেই হবে কোথায় বাড়ি হবে সেই নিয়ে

    - বলছি কি, রেল গেটের কাছে না হোক, নিমো স্টেশনের কাছে ঠাকুর-ঝি পুকুরের পাড়ে যে জায়গাটা আছে সেখানেই বাড়ি করলে কেমন হয়! উত্তর-দক্ষিণ সবই খোলা
    - বলিস কি! বাপ ঠাকুর-দার ভিটে ছেড়ে উঠে যাব!
    - তাহলে বাড়ি কোথায় হবে?
    - তোকে ও সব ভাবতে হবে না, পুরানো বাড়ির উঠোনের দক্ষিন দিকে অনেক জায়গা আছে – পাঁচিল, ফাঁচিল অ্যাডজাষ্ট করে ওখানেই হয়ে যাবে।
    - ধুর ওখানে আবার কেউ বাড়ি করে নাকি?
    - তাহলে তুই যেখানে চাস গিয়ে বাড়ি কেনগা যা, কলকাতা-ফোলকাতা, ইংল্যান্ড-হ্ল্যান্ড – যেখানে মন চায়। খালি আমাদের জড়াস না, বাপ-ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে যেতে পারব না।

    আমি বুঝে গেলাম এই নিয়ে ফালতু বাক্য ব্যয় করে লাভ নেই। নেগোশিয়েশনে চলে গেলাম –

    - ঠিক আছে বাড়ি ওখানেই হোক, তুমি মেপে বল কতটা জায়গা বেরোবে, আমি ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে প্ল্যান করাচ্ছি।
    - ইঞ্জিনিয়ার বাড়ির প্ল্যান করবে? কিছু বুঝিস তুই বাড়ি তৈরীর?
    - আরে ওই পুরানো ধাঁচের বাড়ি হলে হবে না, একটু নতুন টাইপের না করলে হয় নাকি?
    - কে ইঞ্জিনিয়ার প্ল্যান দেবে তোর বাড়ির। ওই তো সেদিন বর্ধমানে বিয়ে খেতে গিয়ে দেখলাম ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে প্ল্যান করিয়ে বানানোর বাড়ি! ঘরের ছাদে কোন বীম নেই! ওই ঘর টিকবে?
    - যুগ এখন অনেক এগিয়ে গ্যাছে। এখন পিলার দিয়ে বাড়ি হয় – পিলার মেন লোড নেয়। তাই আর বীমের দরকার পরে না।
    - তোকে আমি আগেই বলে দিলাম, এই পিলার-ফিলার দিয়ে ডিজাইন আমি একদম ঢুকতে দেব না। গঙ্গার ইঁট দিয়ে বাড়ি বানাবো, তার কাছে তোর ওই পিলার! আমাদের পুরানো বাড়িটার বয়স কত হল? কিছু হয়েছে দেখেছিস? আর কাগজে পড়িস না যে বড় শহরে বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে ধুপ ধাপ? সব পিলারের বাড়ি।

    বরাবরেই মত আমি আবার হেরে গেলাম যুক্তিতে, তবুও একটা শেষ চেষ্টা দিলাম

    - ঠিক আছে পিলারের বাড়ি হবে না। কিন্তু বাড়ির ডিজাইন করবে কে?
    - বাড়ির আবার ডিজাইন কি? আমি একদিন মুর্শেদ-কে নিয়ে বসে ঠিক করে নেব।
    - না না, তোমার আর মুর্শেদ-কার দ্বারা মর্ডান ডিজাইন হবে না। তুমি আমাকে কতটা জায়গা বলে দাও, আমি দেখি মেমারী থেকে চেনা ইঞ্জিনিয়ার কাউকে পাঠাতে পারি কি না।

    কি ভেবে বাপ রাজী হয়ে গেল। অনেক কষ্টে মেমারীর মিউনিসিপ্যালিটির দুই কিংবদন্তী ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বললাম, তারা আমার দাদার মত। একদিন তারা নিমো গেল বাড়ির জায়গাটা দেখতে – আমি ভাবলাম, যাক তাহলে কাজ মিটে গেল। এবার ওই দাদাদের কাছ থেকে ডিজাইন নিয়ে নিলেই হবে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাপকে ফোন করলাম –

    - বলছি তাহলে ওরা যা প্ল্যান দিয়ে গ্যাছে সেটা দিয়েই তুমি কাজ শুরু করে দাও
    - কার প্ল্যান?
    - কার আবার, সেদিন মেমারী থেকে ইঞ্জিনিয়ার এসেছিল না?
    - ও গুলো ইঞ্জিনিয়ার? ওদের দিয়ে বাড়ি করালে একটা বর্ষা পেরোবে না আমি বুঝে গেছি
    - আবার কি হল?
    - কিছু জানে ওরা? জায়গায় মাপই বলতে পারছে না? শতক, বিঘে, কাটা – কিছুর মাপই তো জানে না? স্কোয়ার ফুট নাকি সব দিয়ে মাপছিল।
    - ঠিক আছে, একটা প্ল্যান তো কিছু দিয়ে গ্যাছে নাকি? আমাকে তুমি সেটাই পাঠাও
    - প্ল্যান কোথায় পাব? খাতা পত্র তো কিছুই নিয়ে আসে নি। আমার কাছে সাদা পাতা চাইলে আমি হাতের কাছে দেবীপুরে সামনে যে যাত্রাটা আসছে সেটার লিফলেট ছিল সেটাই দিলাম। তার পিছনেই তো দেখলাম কি সব এঁকে।
    - ওই তো এঁকে দিয়েছে। তুমি আমাকে ওটা পাঠাও।
    - সেই কাগজটাই তো পাচ্ছি না আর। তোর মা সকালে ঝাঁট দিয়ে ফেলে দিয়েছে মনে হচ্ছে।

    ব্যাস, ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বাড়ি বানানোর সখ মিটে গেল! বাপ ডেকে নিয়ে এল মুর্শেদ-কাকা কে। আমাদের পুরানো বাড়ি করেছিল মুর্শেদ-কাকার ভাই তপু-দা। তপু-দা ততদিনে মারা গ্যাছে কম বয়েসে, ওদের অন্যভাই হাফিজুল-দা ফিরে গ্যাছে মুর্শিদাবাদে। বাপ আর মুর্শেদ-কা মিলে প্ল্যান বানালো। অমৃতার শখ ছিল একটা গোল বারান্দা হবে আর সিঁড়ি উঠবে গোল হয়ে। ঘরের পিছনের দিকের অ্যাটাচ বারান্দার এক ভাগে মাথায় কোন ছাদ থাকবে না – অমৃতা বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসত। আর থাকবে খোলা ছাদ। তবে যাই হোক আমাদের নতুন বাড়ির চারিদিকে কিন্তু খুব সবুজে ভরা ছিল। বাড়ির পুবে ছিল ছোট বাগান, হিটুদের বাড়ি, আমাদের খামার বাড়ি, দক্ষিণে ছিল হিটুদের পুকুর, পশ্চিমে ছিল মোড়লদের বাগান। পুকুর আর বাগান পেরোলেই নিমো গ্রামের শেষ – দিগন্ত জোড়া সবুজ মাঠ, মাঠের ওদিকে কোলেপাড়া গ্রাম।







    বাড়ির স্ট্রাকচার পুরোপুরি খাড়া হলে দেখা গেল – খোলা বারান্দা আছে, কিন্তু তা আর গোল করা হয় নি, আয়তক্ষেত্র হয়েছে। গোল সিঁড়ি করতে আরো বেশী জায়গা চাই বলে সেখানেও কমপ্রোমাইজ করা হয়েছে। কিন্তু খোলা ছাদ রয়েছে অনেকটা – বড় প্রিয় সেই ছাদ।







    ঘরের দেওয়ালের রঙ, সিঁড়ির রেলিং এর ডিজাইন, বারান্দার গ্রীলের ডিজাইন সবই অমৃতার এঁকে দেওয়া। নিমোর ছেলেরা সবাই যে বখাটে এমন নয়, কিন্তু করিতকর্মা ছেলেও আছে। নীচের লিষ্ট সেই সব কৃতী পাবলিকেরঃ

    ১। রাজমিস্ত্রীঃ মুর্শেদ কাকা
    ২। কাঠ মিস্ত্রীঃ রবি। রবির বাপ রাজারাম ছিল আমাদের পুরানো বাড়ির কাঠমিস্ত্রী
    ৩। গ্রীল/লোহা ইত্যাদিঃ হরি। হরি আমাদের বাল্যকালের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন এখন নিমো বটতলায় ‘সায়নী ইঞ্জিনিয়ারীং ওয়ার্কস’ এর মালিক
    ৪। রঙ মিস্ত্রীঃ নিমোর পাশের গ্রাম ক্যাম্পের কতগুলো ছেলে। যারা রাত জেগে মোমবাতি জ্বালিয়ে রং করে কাজ শেষ করেছিল
    ৫। পাথরের মিস্ত্রীঃ এই মালটাকে ঠিক ট্রেস করা যেত না – একদিন কাজ করে চার দিন ডুব। রিউমার আসত সে দুবাই চলে গ্যাছে কাজ করতে, কেউ বলত সৌদি – আবার আমাদের চমকে দিয়ে কোনদিন চলে আসত কাজ করতে।
    ৬। আসবাব পত্রঃ সন্তু। সন্তু আমার বাল্যবন্ধু, সে আজ দীর্ঘকাল বর্ধমান পার্কাস রোডের ফার্ণিচারের দোকান ‘মল্লিক ব্রাদার্স’ এর ম্যানেজার।

    কাঠের কাজ প্রশংসিত হয়েছিল রবির – সে কাজ করেছিল মূলত সেগুন কাঠের। আমাদের কোথায় কোন পুকুরের পাড়ে একটা সেগুন কাঠ ছিল, সেটা ফাড়িয়ে কাঠ বের করা এবং আরো সেগুন কাঠ কেনা সবটাই বাপের ডাইরেকশনে করেছিল রবি।





    মেহুল বড় হচ্ছে – মায়ের মত সেও সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকে মাঝে মাঝে আনমনে। সাথের ছবি সেই বাড়ির এবং ছাদে দাঁড়িয়ে অনন্ত সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকা মেহুলের।



  • সুকি | 237812.69.453412.116 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:১১381881
  • পরামর্শ
    ----------------

    অনেকদিন ধরে ভাবি রাজেশদার অমূল্য পরামর্শগুলি ফেসবুকে লিখি, কিন্তু পাবলিক যদি আমাকে হাল্কা অসভ্য ভাবে, সেই চিন্তায় আর লিখি নি। পরে ভেবে দেখলাম এই সব অসভ্য বিষয়ক ধারণা ভিক্টোরিয়ান প্রভাব মাত্র আর তাছাড়া বহু অমূল্য পরামর্শ এই ভাবেই দেওয়া হয়েছে যুগ যুগ ধরে।

    রাজেশদা ছিল আমার থেকে কিছু সিনিয়ার, বহুকাল আগে হাউসমেট। আমরা তখন একই কোম্পানীতে কাজ করতাম, ভাইয়ের মত ভালোবেসে অনেক কিছু শেখাত দাদা। কলাইয়ের ডাল, ভালো পাবদা মাছ কেনা, লুচি ফুলকো হবার রহস্য - এমন অনেক কিছু আর্ট আমার রাজেশদার কাছ থেকেই শেখা।

    সেই রাজেশদা আমাকে বার বার বলত সুকান্ত, ঠিক বয়েসে বিয়ে করবে, আমার মত দেরী করবে না। আমি কারণ জানতে চাইলে ব্যাকগ্রাউন্ড ঘটনা সে ব্যাখা করে। রাজেশদা তখন দিনে চাকুরী করে রাতে যাদবপুর থেকে বি ই পড়ছে। শনিবার করে গ্রামে ফেরে। একদিন রাতের বেলা ফিরছে আর গ্রামের এক জ্যাঠার সাথে দেখাঃ

    - তা রাজেশ, বিয়ে থা কর এবার। তোর মায়ের তো বয়স হচ্ছে নাকি? আমাদের কাছে মাঝে মাঝে দুঃখ করে

    - বিয়ে করব জ্যাঠা ঠিকই, আগে আর একটু দাঁড়িয়ে নিই

    - আর কত দাঁড়াবি? ওদিকে যে ওটা আর দাঁড়াবে না!

    এই জন্যই রাজেশদা ঠিক সময়ে বিয়ে করার কথা বলত।

    আজকাল যতবার এই শীতের দেশে যাই, রাজেশদার পরামর্শ খুব মনে পড়ে। এই যেমন গত সপ্তাহে ইংল্যান্ডে বা হল্যান্ডে গিয়ে মনে পড়ছিল।

    ঠান্ডার দেশে গিয়ে পই পই করে টাইট রাজু বা ভি আই পি ফ্রেঞ্চী জাঞ্জিয়া পরে থাকতে বলত রাজেশদা, ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য।রাজেশদার মতামত ছিল গরমের দেশের ছেলেদের এক প্রধান প্রবলেম হল, জাঙ্গিয়া পরে থাকা। রাজেশদার মতে গরমের সময় ট্রেনে বাসে ছেলেদের উতপটাং তিরিক্ষি মেজাজের মূল কারণ জাঞ্জিয়া জনিত অস্বস্তি, চুলকানী এবং হেনস্থা। প্রবল চুলকাচ্ছে, কিন্তু হাত যাচ্ছে না ভীড়ের জন্য!

    সেই প্রবল গরমে ঘাম হয়ে শরীরের ঢাকা জায়গায় থেকে গিয়ে এক বাজে অবস্থার সৃষ্টি করে, তা নিয়ে বিশেষ কোন দ্বিমত ছিল না। কিন্তু তার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য অনেক ছেলে ছোকরা যে ল্যুজ আন্ডারপ্যান্ট পরত, এটা রাজেশদার পছন্দ ছিল না। রাজেশদার অভিমত ছিল, আণ্ডারপ্যান্ট পরে থাকলে বীচি ঝুলে যায় – এবং আমাদের মত নওজোয়ানদের (বিশেষ করে অবিবাহিত) বীচি ঝুলে যাওয়া কোন কাজের কথা নয়।

    তাই ইংল্যাণ্ড পড়তে আসার আগে রাজেশদা বলেছিল, “সুকান্ত, ঠান্ডার দেশে যাচ্ছ তো, একদিক দিয়ে ভালো হল। বীচি ঝুলে যাবার ব্যাপারটা যেটা তোমাকে আমি অনেকবার বুঝিয়েছিলাম, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না আর। তুমি এখান থেকে রাজু বা ভি আই পি নিয়ে যাও কিনে অনেকগুলো – ঠান্ডায় বীচি গরমও থাকবে, আর ঝুলে যাবার ভয়ও থাকবে না”।

    সেদিন ভোরে আমষ্টারডামের তাপমাত্রা মাইনাস দুই ডিগ্রী হয়ে গিয়েছিল - ভোর ভোর তাই আবার রাজেশদার কথা মনে পড়ে গেল।
  • সুকি | 237812.68.454512.90 | ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:১২381882
  • ফ্যাশন, ছোটমামা ততসহ দুচার কথা
    ----------------------------------------

    আগের দিন দেখলাম বন্ধু মহলে ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে – তবে সেই সব আলোচনা মহিলাদের শাড়ি, পোষাক ইত্যাদি নিয়ে। ছেলেদের ফ্যাশন নিয়ে কে আর মাথা ঘামায় তেমন! এমনটা ভাবার খানিক পরেই ছোটমামার কথা ইয়াদ এসে গেল, যে এককালে গ্রামের দিকে ফ্যাশন কিং ছিল বলতে গেলে। মামা আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড, কিন্তু ট্যাগাবো না – তাহলেই চিনে ফেলার সম্ভাবনা এবং হয়ত প্রোফাইলে গিয়ে ছবি দেখা যাবে নিজের মুরগীর পোলট্রী ফার্মের পাশে বাঁশের মাচায় লুঙ্গী পরে বসে বসে খইনী মুলছে বা ভুঁড়ি চুলকাচ্ছে। সেই ছবি দেখলে আমার উপপাদ্য বিশ্বাস করতে পাবলিকের মনে দ্বন্দ চলে আসবে – অথচ কথা আমার নিদারুণ সত্যি।

    মামা ছাড়াও ফ্যাশন বিষয়ে মনে চলে আসে আমার নিমোর কামারদের বেচা-দার কথা। বেচা-দা জমি চাষে সিফটে করে যাবার আগে নিমোতে লুঙ্গি পরে মাঠে কাজ করতে যাবার চল ছিল। এবং মাঠের কাজ অনুযায়ী সেই লুঙ্গি যেখানে ওঠার স্বাভাবিক নিয়মে সেখানেই উঠত। এই যেমন হালদারদের মানিক-কা ধান জমিতে জল পাওয়াতে গেল, কিন্তু জল নিয়ে পাশের জমির সাথে কম্পিটিশনে নেমে লুঙ্গি কোথায় থাকত তার কোন শেষ নেই। এবার ঘটনা হল মাঠে কাজ করতে বাউরি পাড়ার বৌদি-রাও যেত। কথিত আছে মানিক-কা লুঙ্গি সামলে রাখতে নাকি উপরতলা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তো যাই হোক সেবার বেচা-দা বেড়াতে গেল তার ভাই সোনা-দার কাছে বোম্বেতে যে সেখানে সোনা-রূপোর কাজ শিখত। ফিরে এসে দেখি বেচা-দা আর লুঙ্গি ছুঁয়ে দেখছে না – ফুলপ্যান্ট পরে গোড়ালির কাছটা কিছুটা মুড়ে নিয়ে মাঠে যাওয়া শুরু করল।

    এ যে কি এক যুগান্তকারী ব্যাপার সেটা এতোদিন পরে আর লিখে বোঝানো যাবে না। সেই দেখা দেখি অনেকেই মাঠে প্যান্ট পরে যাওয়া শুরু করে দিল। নিমোর মাঠে সবুজ বিপ্লব দেখা গেল আলু-ধান এর ফলনে। কাজের এফিসিয়েন্সি বেড়ে গেল। হিসাব করে দেখা গেল মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রতি জনা ঘন্টায় মিনিমাম ৫ মিনিট সময় ব্যায় করে নিজের লুঙ্গি ঠিক করতে। তার মানে গড়ে ছয় ঘন্টা কাজ করলে লুঙ্গির জন্য অপচয় ৩০ মিনিট, অর্থৎ প্রতি ১২ জন ক্ষেত মজুর মাঠে কাজ করলে একজন পরিমাপ শুধু লুঙ্গি ঠিক করতে নষ্ট হচ্ছে! গড়ে যদি ধরা যায় প্রতিদিন নিমো মাঠে ১২০ জন ক্ষেতমজুর কাজ করছে, তাহলে বেচাদা প্যান্ট পরে চাষ আবাদ চালু করে ১০ জন ক্ষেতমজুরের অপব্যায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এর পরেও নিমোতে সবুজ বিপ্লব আসবে না তো কোথায় আসবে?

    এবারে পুজোয় নিমোতে গিয়ে একদিন রাস্তায় বেচা-দার সাথে দেখা – হিরো সাইকেল চালিয়ে, সাইকেলের দুদিকে ইয়াব্বর দুধের ক্যান ঝুলিয়ে ফিরছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা হল – জানালো ছয় না আটটা জার্সি গরু পুষেছে, প্রায় ১৮ কিলো করে দুধ দিচ্ছে এক একটা গরু, লাভই লাভ। কাঠের কাজ করা একদম প্রায় ছেড়ে দিয়েছে – গোমাতা দয়ায় হই হই করে লাইফ চলছে।

    এবার মামার কথায় ফিরে আসি। বলতে নেই, মামা আমার সেই যৌবন বেলা থেকেই হিরো হিরো দেখতে। বাঙালী মধ্যবিত্ত বাড়িতে কত যে আগল থাকে যা পেরনো হয়ে ওঠে না অনেক সময়, ছোট মামা তার উদাহরণ। বড়মামা বাইরে থাকত বলে ছোট মামাকে বাড়িতে থাকতে হবেই – সেই ডি ডি ওয়ান টু এর আমলে ছোটমামা সিরিয়ালে অভিনয়ের জন্য চান্স পেয়েছিল। যাওয়া হল না বাড়ি ছেড়ে – কদিন ময়দানে ভালো ক্লাবে ক্রিকেট/ফুটবল দুইই খেলল, কিন্তু বেশী দিন ডেলি প্যাসেঞ্জারী করা গেল না। পরে আর্মির চাকুরী – সেও না। কলেজ লাইফে মামার ছেলে বন্ধু প্রায় ছিলই না বলতে গেলে, চারিদিকে শুধু মেয়ে বেষ্টিত হয়ে থাকা।

    ফ্যাশন জগতে মামার নিম্নলিখিত প্রধান অবদানঃ

    ১) জানালা-দরজার পর্দার ছিট দিয়ে জামা বানানো শুরু। জামালপুরের বন্ধু টেলারের কাছ থেকে একদিন দেখি কি এক চকরাবকারা জামা বানিয়ে পরে এসেছে। তেমন ছাপা জিনিস আগে কোনদিন দেখি নি। মামা জানালো যে জামালপুরের বিখ্যাত দর্জিকে দিয়ে বানানো, পর্দার ছিট দিয়ে

    ২) মেমারী কলেজে পড়ার সময় নতুন ডিজাইনের ব্যাগ। একসময় মামা ব্যাগ বানিয়ে আনলো হলুদ রঙের পটাশের (জমিতে দেবার সার) বস্তা কেটে। হাতে পটাশের বস্তা দিয়ে বানানো ব্যাগ নিয়ে তারপর কত ছেলে কলেজ যেতে শুরু করল।

    ৩) মামার বন্ধু খোকন দিল্লীতে এমব্রয়েডরীর কাজ করত – তখন কার দিনে জামার পিছনে এক বিশাল এমব্রয়েডরী করা বাঘ সাঁটানো, সে এক দেখার মত জিনিস।

    এ ছাড়াও আছে নানা প্রকার কারুকাজ জামায় – মামার আর সেই দর্জী বন্ধুর বানানো।

    মামা এখন সুগুণা মুরগীর চাষ করছে পোলট্রী ফার্মে – প্রায় হাজার দশেকের মত ক্যাপাসিটি, আরো বাড়ানোর তাল করছে। অবশ্য এই ব্যাবসাটা অনেকদিন স্টেবল আছে। এর আগে মামা ট্রাই করেছে যথাক্রমে, ওষুধের দোকান, বই-খাতা সাপ্লাইয়ের দোকান, কেবল অপারেটরের ব্যবসা, প্যান্ডেল-ডেকরেশনের ব্যবসা ইত্যাদি।

    আগে মামা গায়ে পর্দার ছিট দিয়ে বানানো জামা গলিয়ে, হাতে হলুদ পটাশের বস্তা কেটে বানানো ব্যাগ নিয়ে কলেজ বান্ধবীদের সাথে মেমারীর জয়ন্তী সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেত – আর এখন হিরো বাইক চালিয়ে সাদা প্লাষ্টিকের ব্যাগ নিয়ে মুরগীর ভ্যাকসিন আনতে যায়। মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পরিসমাপ্তি এই ভাবেই হয় আর সমস্ত বাঙালী ফ্যাশন শেষ হয় লুঙ্গিতে।
  • b | 237812.68.454512.210 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:২০381883
  • ওহ সুকি অনেকদিন পর।
  • ন্যাড়া | 237812.68.344512.53 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১১:১৫381884
  • একবার নিমোয় গিয়ে সুকির বাড়িতে থাকবই থাকব, ওই সবুজ কংক্রিট হয়ে যাবার আগেই।
  • aranya | 237812.68.233412.52 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১২:২৭381885
  • ফাটাফাটি। সুকি রকস :-)
  • lcm | 236712.158.90056.117 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১২:৩৮381886
  • সময় পেলে "লুচি ফুলকো হবার রহস্য"-টা একটু লিখো
  • দa | 236712.158.786712.21 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৪২381888
  • শাড়ি, ওড়না এমনকি ধুতি কেটেও জানলা দরজার পর্দা বানাতে দেখেছি। কিন্তু পর্দা কেটে জামা! এমন উল্টোযাত্রার কথা এই প্রথম পড়লাম।
    আর পটাশের ব্যাগ -- ঋদিউস, রিইউজ, রিসাইকল এর একেবারে জলজ্যান্ত উদাহরণ।
  • | 236712.158.676712.40 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৪৩381889
  • শাড়ি, ওড়না এমনকি ধুতি কেটেও জানলা দরজার পর্দা বানাতে দেখেছি। কিন্তু পর্দা কেটে জামা! এমন উল্টোযাত্রার কথা এই প্রথম পড়লাম।
    আর পটাশের ব্যাগ -- রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকল এর একেবারে জলজ্যান্ত উদাহরণ।
  • Ruchira | 237812.68.344512.71 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২১:০৩381890
  • পর্দা কেটে জামা - Scarlett O'Hara - Gone with the Wind
  • সুকি | 237812.69.453412.44 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২১:১৬381891
  • b, ন্যাড়াদা, অরণ্যদা, লসাগুদা, দ-দি, রুচিরা - সবাইকে ধন্যবাদ

    ন্যাড়াদা,
    সব সময় ওয়েল-কাম, সময় করে চলেই এস না একবার।

    লসাগু-দা,
    শেখার পর দেখলাম লুচি ফোলাবার টেকনিক এতই সোজা যে এখানে লিখতে লজ্জা করছে। ভালো করে ময়দা থেসে থেসে মাখতে হবে - ঠিক মত ময়াম/ময়ান দিতে হবে। খানিকক্ষণ জিরোতে দিতে হবে সেই নেচীকে। তারপর বেলে গরম তেলে ছাড়া, তেলের টেম্পারেচার খুবই ইমপরটেন্ট। তারপর ছাঁকনির উলটো পিঠটা করে ভাসমান লুচি-টিকে আলতো করে তেলে চাপ দিতে হবে দুই একবার। ব্যাস!

    দ-দি, এই সব ঘটনা সেই ১৯৯১-৯২ সালের - তখন আমাদের দিকে রিসাইকেল কনসেপ্ট আসে নি। মামা এসব ফ্যাশন বলেই চালু করেছিল :)

    রুচিরা - আমার মামার সাথে গন উইথ দ্যা উইন্ডের কোনই সম্পর্ক ছিল না, বলাই বাহুল্য :)
  • b | 236712.158.676712.40 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২২:৫৬381892
  • হ্যাঁ, বরঞ্চ বাবুলালের সাথে সম্পর্ক ছিলো, এরকম বলা যায়।
  • সুকি | 237812.68.454512.132 | ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ২৩:১২381893
  • এত জটিল রসিকতা করলে খেলা যাবে না, আর একটু হলে বুঝতেই পারছিলাম না!
  • Titir | 237812.69.01900.15 | ১৯ নভেম্বর ২০১৯ ০২:৪৫381894
  • দারুন লেখা। আর বাড়ি তৈরির ব্যাপারে আমার বাবার সঙ্গে প্রচন্ড মিল পেলাম। বাবা আমার কাছে (USA ) এসে কিছুদিন ছিলেন। তাই দেশে যখন বাড়ি তৈরির প্ল্যান হাল ভাবলাম বাবা তাহলে এখানে মত কিছুটা করবে। কিন্তু কোথায় কি? ভাই, দাদা আর আমি বলে বলে বাড়ির ব্যাপারে হয়রান হয়ে গেলাম।এমনকি যে মিস্ত্রি বানিয়েছিল সেও বলল কিছু রুম আর একটু বড় করে দাও। কিন্তু বাবার মতের পরিবর্তন হয় নি। আর গ্রাম বলে জায়গার অভাব ছিল না।
  • Sound of Music | 236712.158.566712.63 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:১৩381895
  • পর্দা কেটে জামার কথা হচ্ছে অথচ "ডো এ ডিয়ার" ভুলে গেলেন!!
  • lcm | 236712.158.565623.225 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৩:২৫381896
  • থ্যাংকু সুকি।
    এটা ঠিক লুচি টই নয়, তবু বলেই ফেলি, কিন্তু আমার লুচি সংক্রান্ত প্রশ্নটা আরও একটু ডিটেইলে - - মানে ফুলকো তো বটেই, কিন্তু দুটো পাশ সমান পাতলা হয় কি করে, জেনারেলি যেটা হয়, লুচি ফোলে মোটামুটি, একটা পাশ হয় খুব মুচমুচে শৌখিন, আর অন্য পাশটা মোটা ক্যাতক্যাতে হয়ে যায়।
  • b | 236712.158.786712.9 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:২৯381897
  • এল সি এম যে কি বলেন। একটা দিক তো ফুলকো হবেই। কলকেতার আগেকার বাবুরা বেলা বারোটায় ঘুম থেকে উঠে লুচির ঐ ফুলকো, পাতলা দিকটা দিয়েই ব্রেকফাস্ট করতেন। বাকিটা বেড়াল খেতো।
  • | 236712.158.786712.69 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৪:৪৩381899
  • সুকি, থ্যাংক ইউ বস। সব সময়েই নিমো ও তুমি হলে গিয়ে গুরুদেব কম্বো।

    "মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পরিসমাপ্তি এই ভাবেই হয় আর সমস্ত বাঙালী ফ্যাশন শেষ হয় লুঙ্গিতে।" এটা তে আমি যেহেতু লুঙ্গি পছন্দ করি ও পরে থাকি, তাই একটু ব্যথা পেয়েছি, তবে বেশি না। লুঙ্গি জিনিসটা জেনে রেখো ফ্যাশনের শেষ নয়, শুরু।
  • সুকি | 237812.69.563412.135 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৭:৩৪381900
  • না, না আমি লুঙ্গিকে কোন ভাবেই অবমাননা করতে চাই নি! আমি মামার স্বপ্নের পরিসমাপ্তির কথা বলতে চেয়েছিলাম, তবে সেটা লুঙ্গি পরার জন্য বোঝাতে চাই নি।
  • র২হ | 236712.158.786712.13 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৮:৩৮381901
  • লুঙ্গী যে সাম্যবাদ ও বিশ্বশান্তির ভবিষ্যত এ আমি সবসময়ই জানি।

    শীর্ষেন্দু ও আনন্দমেলাজনিত কনফ্লিক্টের পরেও লুঙ্গীই এমন এক সূত্র যা খনুদা ও অরণ্যদাকে এক পাতায় ধরে রাখে।
  • | 236712.158.676712.20 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ১৯:৪৬381902
  • হুতো, মার খাবি;-)
    সুকি, তুমি যা লিখেছো বেশ করেছো। কেউ কিসু মনে করে নি, আমি ইয়ার্কি করছিলাম।
    আমার প্রবল তথা বিপুল আমি এবং আমার লুঙ্গি প্রেম, যাঁদের কাছে প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান তাঁরা বিব্রত এবং আক্রান্ত বোধ করেন। যেহেতু দৃশ্যে কল্পনার অবকাশ প্রায়শ অনুপস্থিত থাকে।

    যাঁরা শুধু কল্পনায় আমাকে লুঙ্গি সহ ভেবেই লজ্জা পেয়েছেন, তাঁরা অভিবাসী হয়েছেন বা সন্যাস নিয়েছেন শোনা যায়। বা শিশু সাহিত্যের বাইরে পা রাখতে সাহস করেন নি।

    যাঁরা এমনকি কল্পনা করতেও নজ্জা পান, তাঁদের জন্য বিংশশতকীয় অনুকম্পা ও ঊনবিংশতকীয় আদি ব্রাহ্ম সমাজ ছাড়া কিছু তেমন কিছু পাচ্ছি না।

    লুঙ্গি প্রেমে, হে দোহারবৃন্দ, আমার ঈশ্বর হতেও লজ্জা করে না;-)


    (এ প্রসঙ্গেও, বলতে নেই, আমার একটি নিবন্ধ আছে, কারণ ভবদুলাল ও শোনা যায় ধুতি কে স্বগৃহে লুঙ্গি রূপেই আপন করতেন)

    ;-)
  • সুকি | 236712.158.566712.63 | ২১ নভেম্বর ২০১৯ ২১:০৬381903
  • আজ কা তুঘলক
    --------------------

    মহম্মদ বিন তুঘলকের সাথে দেখা করে হয়ে ওঠে নি আমার, যদিও মেমারী বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দিরের ক্লাসমেট হালিম জগবন্ধু স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিল দেখা করা যাবে কিনা। আমরা তখন ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি, জগবন্ধু বাবু আমাদের ইতিহাস পড়াতেন – সেদিন পড়াচ্ছেন তুঘলকের খামখেয়ালীপনার কথা। কিছুটা শুনে হালিম পিছনের দিক থেকে জিজ্ঞেস করল,

    “স্যার, একটা কথা বলছিলাম, এই বিন তুঘলকের সাথে দেখা করা যায় না ইস্কুল থেকে মিছিল করে গিয়ে?”

    আসলে ভেবে দেখলে হালিমের দোষ ছিল না, তখন প্রবল পরাক্রান্ত সি পি এমের আর এ বি টি এ-এর আমল। আজ মিছিল করে উৎপল দত্তের ‘ঝড়’ সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তো কাল গ্যাট চুক্তির প্রতিবাদে মেমারী শহর পরিক্রমা। এছাড়া ডি ওয়াই এফ আই, নাট্য মেলা, বইমেলা ইত্যাদি ইত্যাদি তো আছেই – কিছু হলেই আমরা মিছিল করে ঘুরতাম মেমারী বাজার আর বদলে পেতাম একটা করে বাপুজীর কেক ইস্কুলে ফিরে আসার পর। তবে সেদিন জগবন্ধু বাবুর রেগে গেলেন হালিমের প্রস্তাব শুনে, বললেন, “এটাকে ক্লাস থেকে বের করে দে তো”। তারপরে অনেকের কাছে একদম ক্লিয়ার হল যে বিন তুঘলক বহুদিন টেঁসে গ্যাছে।

    আজকাল অবশ্য অনেকে মমতা দিদি-কে বিন তুঘলকের মহিলা ভার্সন বলেন। তবে দিদি তুঘলকিয় হয়ে ওঠার বহু আগে আমরা ইস্কুল ছেড়েছি, তা না হলে কে জানে বিন তুঘলকের সাথে মিট করার হালিমের প্রবল ইচ্ছাটা পূর্ণ হয়ে যেত, তা যতই হোক না সে এক আধুনিক ভার্সন।

    আমার দিক থেকে বলতে পারি মহম্মদ বিন তুঘলক-কে দেখা একদম মিস করি নি, কারণ আমার হাতের কাছে ছিল মহেন্দ্রনাথ ঘোষ, মায়ের মামা – মানে আমার দাদু। মহেন্দ্র ঘোষ বহু অংশে স্বয়ং তুখলক-কেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত। আমার মা ছোট বেলায় মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছিল, তাই মায়ের মামা নিজের দাদুর মতই ছিল ঘেঁষাঘেঁষি তে।

    মায়ের মামারা বেশ ভালো বড়লোক ছিল সেই আমলে। প্রায় ৬০-৭০ বিঘে মত জমি, তার পর যা হয় আর কি বর্গা ইত্যাদি হয়ে গিয়ে সেটা বিঘে চল্লিশে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া ছিল ধানকল, সারের দোকান, ট্রাকটর, পুকুর, বাগান ইত্যাদি ইত্যাদি। গ্রাম্য লাইফ নিয়ে যাদের ধারণা আছে তারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ব্যাপার খুব একটা মন্দ ছিল না। বেশী জমি জায়গা থাকলে ঘটিরা যা করে দাদুও সেটা করল – বাপ-ঠাকুরদা তো কষ্ট করে খেটে খুটে সম্পত্তি বানিয়ে গ্যাছে, তাহলে আমি আর খামোখা খাটবো কেন! খামখেয়ালীপনার চূড়ান্ত এবং বসে বসে সম্পত্তি উড়িয়ে যেতে লাগল, একে একে সারের দোকান, ধানকল সব বিক্রী হয়ে গেল। তার পর শুরু হল জমি বিক্রী করা। এখন মামারা বড় হয়ে মনে হয় আর জমি বিক্রী করা একটু রুখেছে।

    দাদুর বাড়ির সামনে ছিল বেশ বড় ফাঁকা জায়গা, বড় জামরুল গাছটার সামনে। বাড়ির একপাশে গোয়াল বাড়ি, মাল রাখার গুদাম – অন্যদিকে বাগান। বৈঠক খানার ঘরে বসে ফুরফুরে হাওয়ায় বিকেলে চা খেতে অবশ্য ভালোই লাগত। অবশ্য তখনো আমাদের চা খাবার বয়স হয় নি – আমরা দেখতাম বাইরের ঘরে বাজী তৈরী হওয়া। বৈশাখ মাসে শেষ মঙ্গলবারে সেই গ্রামের বিখ্যাত কালিপুজো উপলক্ষ্যে। সেখানে দেখেই আমার বাজি তৈরীর প্রথম প্রাথমিক জ্ঞান।

    একবার দাদুর শখ হল গোলাপ বাগান করবে – যা মনে করা তো সেই কাজ। বাড়ির সামনে জায়গাটা ঘিরে মাটি তৈরী করে গোলাপের বাগান শুরু হল – জল তোলার পাম্প ইত্যাদি বসিয়ে। কোথা থেকে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট রকমের গোলাপ লাগানো হল। বলতে নেই সময় মেনে, পরম যত্ন পেয়ে – নির্ভেজাল গোবর সার পেয়ে সেই বাগান গোলাপ ফুলে ভরে উঠল। বহু দূর-দূর থেকে লোকজন গোলাপ বাগান দেখতে আসতে শুরু করল – লোকে বাগান দেখে বাঃ বাঃ করছে, আর দাদু পরম তৃপ্তি ভরে বৈঠকখানায় বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে! আমার দুই মামাকে ভার দেওয়া হয়েছিল গোলাপ বাগানের ওভারঅল দেখভাল করার জন্য। সেই করতে গিয়ে মামাদের উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর কমে গেল।

    এর পর দাদুর ঝোঁক হল ব্যবসার দিকে – নিজে প্রচুর পেটুক মানুষ হবার জন্য, সারের ব্যবসা থেকে সিফট করে খুলল মিষ্টির দোকান খানপুর মার্কেটে প্রাইম জায়গায়। সে মিষ্টির দোকান বিশাল হিট – বিশেষ করে বিকেলে সিঙ্গারা কিনতে আসার জন্য পাবলিকের লম্বা লাইন পরে যেত। ব্যবসা দুরদার চলছে, আর এদিকে মামারা বলছে, বাবা তুমি সিঙ্গারা নয়ত মিষ্টির দোকান কোন একটা বন্ধ কর। এই ভাবে বেশী দিন টানা যাবে না! এক একটা সিঙ্গারা বেচে প্রায় ৭০ পয়সা লস! কাজু, কিসমিস ইত্যাদি পুরে মিশিয়ে দাদু সিঙ্গারা বানিয়ে বিক্রী শুরু করে প্রতি পিস এক টাকা করে! এদিকে বানাতে খরচা প্রায় এক টাকা সত্তর পয়সা! মামারা কিছু বলতে গেলেই উত্তর আসত, এই তমুকের ব্যাটা আমি, লোককে বাজে জিনিস খাওয়াবো! মিষ্টি বেচেও অনুরূপ ক্ষতি, পাঁচ টাকা সাইজের রসগোল্লা বানিয়ে বিক্রী হচ্ছে দুই-টাকা পিস করে! অনেক ঝামেলা ইত্যাদি করে সেই মিষ্টির দোকান বন্ধ করা গেল।

    দাদু আমাকে মাঝে মাঝে বলত, ওসব ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিছু নয় বুঝলি, আসল চাকরী হল স্কুল মাষ্টারি। চাকরি করতে হলে মাষ্টারী করাই বেষ্ট, দুই মামার তাই ছোট বেলা থেকেই ট্রেনিং হত ইস্কুল মাষ্টার হবার জন্য। খাদ্যরসিক এবং পেটুক মানুষ, গাওয়া ঘিয়ের লুচি, মিষ্টি, পাঁঠার মাংস ইত্যাদি ছাড়া দাদুর মুখে রুচত না অন্য কিছু। এদিকে বয়স হচ্ছে – একসময় মামিমারা বলল, “বাবা, বয়স হচ্ছে তো, তাই আপনাকে আর ওই সব রীচ খাবার দেওয়া যাবে না”। এসব শুনে দাদু ফায়ার, “নিজের সর্বনাশ আমি নিজেই করেছি তোমাদের ঘরে এনে, তখন কি আর জানতাম আমার সাজানো সংসার ছাড়খাড় করে দেবে তোমরা!” ছোট মামি আবার একটু মর্ডান টাইপের, ফুট কেটে ফেলল, “কোথায় সাজানো নষ্ট হচ্ছে বাবা? শুধু একটু খাওয়া কনট্রোল করার কথা হচ্ছে”। দাদু নাকি উত্তর দিয়েছিল, “সাজিয়ে যদি খাবারই সামনে না এল তাহলে আর সাজানো সংসারের মানে কি?”

    তবুও দাদুকে গাওয়া ঘিয়ের লুচি খেতে দেওয়া হল না আগের মত বেশী বেশী – এত অত্যাচার মহেন্দ্র ঘোষের সইল না। বলল, “আমি আলাদা হয়ে যাব। তোরা দুই ভাই একসাথে থাক। আমি আর তোদের মা এবার থেকে আলাদা খাব, নিজের লুচি নিজে রেঁধে নেব”। এইভাবে একই বাড়িতে দুই হেঁসেল চালু হত – যে মানুষ জীবনে এক গ্লাস গড়িয়ে খায় নি, সে লুচি ভাজবে সেটা ভাবাই মূর্খামি। দিদার ভাঙা শরীরে চাপ পড়ে গেল – বেগতিক দেখে মামিমারা পিছিয়ে গেল। আবার একসাথে রাঁধা শুরু হয়ে গেল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দাদু গাওয়া ঘিয়ের লুচি এখনো চালিয়ে যাচ্ছে, সাথে পাঠাঁর মাংস।

    আর আমার মামারা দাদুর মত পুরো তুখলকিয় না হলেও, হালকা ছাপ পেয়েছে। দুপুরে ভাত খাবার পর তেনারা নাকি বাইকে দশ কিলোমিটার গিয়ে পান খেয়ে আসেন, কোন একটা দোকানে স্পেশাল পান সাজে!
  • aranya | 236712.158.2367.60 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৫:০৪381904
  • সত্যি, লুঙ্গি একটা ব্যাপার, শীর্ষেন্দুর গদ্যের মতই মোলায়েম, ফুরফুরে, মজাদার
  • aranya | 236712.158.2367.60 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৫:০৬381905
  • আর লুঙ্গি -তেই ফ্যাশন সেশ, এটা সুকি ঠিকই লিখেচে। বাহারী, রঙিন লুঙ্গি -র চেয়ে বড় ফ্যাশন আর কি ই বা হতে পারে
  • Ekak | 236712.158.895612.198 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৬:১০381906
  • হা, এটা ঠিক। র‌্যাপ অন -এর দুনিয়ায় এতো বেশি ভ্যরিএশন আছে , এতো টেক্স্চার , যে কোন না কোনোটা ভালো লেগেই যায়।

    আগেও লিখেছি, ব্যাঙ্গলোর বেশ লুঙ্গি ফ্রেন্ডলি। মুন্ডু পরে আপনি শপিঙ্গ মল থেকে কাজের জায়গা যেখানেই জান, সমোস্যা নেই।

    কোল্কতায় মনে হয়, এতো টা এক্সেপ্টেড না।
  • রঞ্জন | 236712.158.895612.102 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:৪৪381907
  • "একডজন সুকি" এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।
    আগে সুকির লেখা পড়ে ফিকফিক, খিকখিক, খ্যা-খ্যা করে হাসতাম। এবার প্রথম চারটে লেখার পর নষ্টালজিয়ায় ডুবে উদাস মন। তারপর ভাগ্যিস "রাজেশদা " এলেন।
    সাতসকালে মনটা ভাল হয়ে গেল। মহারাষ্ট্রে যাই ঘটুক, আমার কি !
    বেঁচে থাকো সুকি। রবি ঠাকুরের দাড়ির মত পরমায়ু হোক তোমার।

    আমি এখন লুঙ্গি পড়েই টাইপাচ্ছি। ছোটকার--গুরুর চিন্টুবাবুর পিতৃদেব-- দেওয়া উপহার।
  • সুকি | 237812.69.453412.116 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ০৯:৫৪381908
  • আমি লুঙ্গি বিষয়ে সবার সাথে একমত।

    ব্যাঙ্গালোরে শুধু লুঙ্গি নয়, ফেত্তা মারা ধুতি পরেও লোকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে - ওতে আরো হাওয়া খেলে মনে হয়। বাংলাদেশে লুঙ্গি কিন্তু আমাদের কলকাতার থেকে বেশি গ্রহনীয়, হুমায়ুণ আহমেদকে আমি দিব্য লুঙ্গি পরে দাপটে ইন্টারভিউ দিতে দেখেছিলাম।
  • শিবাংশু | 237812.68.674512.115 | ২৪ নভেম্বর ২০১৯ ১০:৪৬381910
  • কুমুদিদি কি এপাড়া থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত? এ বিষয়ে তাঁর বাইটই শেষ কথা...
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1 | 2 | 3 | 4
  • গুরুর মোবাইল অ্যাপ চান? খুব সহজ, অ্যাপ ডাউনলোড/ইনস্টল কিস্যু করার দরকার নেই । ফোনের ব্রাউজারে সাইট খুলুন, Add to Home Screen করুন, ইন্সট্রাকশন ফলো করুন, অ্যাপ-এর আইকন তৈরী হবে । খেয়াল রাখবেন, গুরুর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে গুরুতে লগইন করা বাঞ্ছনীয়।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত