আপনার মতামত         


          আমার সত্তর (শেষ পর্ব)

          দীপ্তেন


সেই সময়

শুনুন রণজিৎ সিংহের কবিতা "আমার বর্তমান'(অংশ)।ঐ সময়েই লেখা।

কার্নিস খামচে শুন্যে লটকে থাক আমার বর্তমান। নিশ্বাস ফেলিস না, নড়িস না চড়িস না একটুও। তোকে গিলে নিক অন্ধকার। তোকে আড়াল দিক জঙ্গল। মাঘের উত্তুরে হাওয়ার সঙ্গে হোক তোর বোঝাপড়া। আরো কিছুক্ষন,আরো কিছুক্ষন,ওরে আমার বর্তমান কার্নিস খামচে শুন্যে লটকে থাক।

তোকে তাক করছে থ্রী নট থ্রী। তোর তল্লাশে ফিরছে সাদা পোষাক। তোর ঘাড় মটকাতে চায় শাস্ত্র আর শুদ্ধাচার। তুই অন্ধকারে অন্ধকার হয়ে যা অথবা নিস্তব্ধতায় নিস্তব্ধ ।


সত্তর সালে বাইশে এপ্রিল পার্টির প্রথম জন্মদিন।লোকাল ইউনিটের ডাক পেয়ে জমা হলাম বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে। বিকেল তিনটে নাগাদ। কি প্রোগ্রাম কিছুই জানি না কিন্তু মিনিট পনেরোর মধ্যে চারিদিক ভরে গেলো। সামান্য কিছু মেয়ে,অল্প সংখ্যক মধ্য বয়সী - বাকি সব - হাজারে হাজারে স্কুল কলেজ ইউনিভারসিটির ছেলে। বোধ হয় ষাট হাজার। আপনা থেকেই মিছিল হয়ে গেলো আর সেই ষাট হাজার তরুণ পায়ে কেঁপে গেলো ডিহি কলকাতা। বোনাসের দাবীতে বাধ্য হয়ে আসা মিছিল এটা নয়, ভাড়া করা মানুষের ক্লান্ত পায়ে হাঁটা নয়- দুর্দান্ত সজীব টগবগে মিছিল। এক সময়ে মিছিল চল্লো দৌড়ে। আর শ্লোগান ছিলো গলা ফাটিয়ে। সন্ধ্যা নেমে আসতেই এক জন দুজন করে মিছিলে থেকে চলে গেলো সবাই - যেন শুন্য থেকে জমায়েৎ আর শুন্যেই মিলিয়ে গেলো।

বছর না ঘুরতেই কোথায় গেলো সেই উদ্দীপ্ত তারুন্য। চোখের কোলে সমূহ পরাভব। এরা কারা? কোনো নীতি নেই, শুধু গায়ের জোরের হুমকি। আর তখন ই শুরু হয়ে গেলো উপদলের সংঘর্ষ। তুই বেড়াল না মুই বেড়াল। কে বেশী হুলো।

গোপাল সেন মারা গেলেন। "তোমরা আমায় মারছো কেন?' বলে থর থর করে কেঁপে রক্তাক্ত লুটিয়ে পড়লেন হেমন্ত বসু। কিছুদিন পরেই জানা গেলো সেটা ছিলো অন্তর্দলীয় বিবাদের ফল। কিন্তু তখন হিস্টিরিয়ায় ভুগছে দেশ। কে জানে কার জন্য ছুরি তুলছে ঘাতক। জমির লড়াই ? ব্যর্থ প্রেম ? পুজোর চাঁদা ? পাড়ায় পাড়ায় চলছে অ্যাকশন। দক্ষিনের ছেলেরা আসে উত্তর শহরতলীতে আর উত্তরের ছেলেরা যায় অন্য পাড়ায় - যাতে চিনতে না পারে পাড়ার লোকেরা আততায়ীর মুখ। বেশ কিছু কাল্ট ফিগার ও হয়ে উঠেছেন কয়েক জন। কসবার অমুক, শ্যামপুকুরের তমুক, জগাই এবং মাধাই। এঁরা আবার ঘোরা ফেরা করতেন তাদের বডিগার্ড নিয়ে। কয়েক জন কে দেখলেই চেনা যেতো - যেন বড় বেশি নিশ্চুপ, খুবই একাকী। শুধু ঠান্ডা চোখ দুটো ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক। কি কারনে জানি না - সেই অ্যাকশন স্কোয়াডের ছেলেরা সবাই কেড্‌স বা ক্যাম্বিসের জুতো পরে ঘুরতো। ঐ জুতো দেখলেই অনেক সময় চিনতে পারতাম ।

সেই খুনের রাজনীতি - খতমের রাজনীতি তে ভেসে গেলো একটা প্রজন্ম। অন্ধ ঘরের রাজা তখন খুব হাসছিলেন। এমনই হয়। বোকা ছেলের দল।

বীরভুমের আন্দোলনও শেষ হয়ে গেলো। একদিনে আট জন জোতদার মারা গেলো।মিলিটারী নামলো আর প্রায় রাতারাতি সংগঠন চুরমার হয়ে গেলো।

বীরভুমে ছিলো বিক্রম । বাঁশবনে লুকিয়ে দুদিন কিছু না খেয়ে কোনোরকমে কলকাতা ফিরে এলো। "সি আর পি এসেছিলো তো পুরো গাঁয়ের লোক তেড়ে গেছিলো। আজ ইসপার উসপার হয়ে যাবে।বর্শা বল্লম রামদা কোদাল নিয়ে তল্লাটের সবাই তাড়া করে ফেরৎ পাঠিয়ে দিলো সি আর পি কে।' সবার কি হাসি। মুক্তাঞ্চল হয়ে গেলো রামপুরহাট ,নানুর।

কিন্তু আর্মির সাথে লড়াই ? সেটা আর সম্ভব ছিলো না।

এবার একটু পুরোনো তত্ত্ব কপচাই ? মাও বল্লেন পার্টি,মিলিশিয়া আর যুক্ত ফ্রন্ট - এই তিন 'ম্যাজিক অস্ত্র' মিলেই চীন'এ সফল বিপ্লব। তো আমাদের পার্টি ছিলো বড়ই অনভিজ্ঞ।মিলিশিয়া বলতে কিছু ই ছিলো না। অস্ত্র বলতে গাদা বন্দুক আর পেটো। সব থেকে দুর্বল ছিলো যুক্তফ্রন্ট। কারুর সাথেই বোঝাপড়া নেই। সবাই খারাপ। সবাই সি আই এর চর। তার ফলে পশ্চিম বঙ্গে কোনোদিন ঘাঁটি বাঁধতে পারলো না পার্টি। কিন্ত এম সি সি এর কয়েক বছর পর ও কাকসা বুদবুদে টিঁকে ছিলো। প্রায় বছর খানেক। আমরা পারিনি।



বন্দুকের ঘুম হয় না,
জেগে জেগে সে শুধু স্বপ্ন দেখে হাজার হাজার বন্দুকের। আর দিন যায়।



এই সত্তর সাল থেকে পঁচাত্তর - এই পাঁচ বছর কিরকম যেন একটা জলে ভেজা ডায়রীর মতন।

পাতাগুলো সেঁটে গেছে - একটার থেকে আরেকটাকে আলাদা করতে পারছি না,আর হাতের লেখাটাও কত যায়গাতেই আর পড়া যাচ্ছে না।

শুধু মনে পড়ে ঐ গড় গড়ানি। চারিদিকেই শুধু সন্ত্রাস। যত দিন যায় খাকী বুট আর শাসক দলের গুন্ডাবাহিনী আরো আরো লজ্জাহীন হয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে মারা জলভাত। মিসাতে আটকে আছে প্রায় দশ হাজার ছেলে মেয়ে। পাড়া ছাড়া কতজনে ?

পাড়ায় পাড়ায় চিরুনি তল্লাসী চলছে সারা রাত। পুলিশ আর সি আর পি আসতো বিভিন্ন কোম্পানীর বাসে করে - পাছে লোকে টের পায় বিশাল পুলিশী কনভয় রওনা হচ্ছে। টাইমিং ঠিক করে ঘিরে ধরতো পাড়া। সব রাস্তা আর গলির মুখে পুলিশ।আর উঁচু বাড়ীর ছাদেও বন্দুক বাগিয়ে তারা। মধ্য রাত্রে কার্নিশে কার্নিশ বদল সম্ভব ছিলো না। প্রতিটি বাড়ির সব কটি ছেলেকে নিয়ে যেতো থানায় বারো থেকে বত্রিশ - অল্প বয়স্ক সবাই শত্রু। সেখানে সারিবদ্ধ আতংকগ্রস্থ ছেলেদের সামনে বোরখা পরে আসতো কোনো বিশ্বাসহন্তা - চিনিয়ে দিতো কোন কোন ছেলে "পার্টি' করে।টেনে হিঁচড়ে তক্ষুনি তারা গারদের মধ্যে। তাদের আর্তনাদ শুনতে শুনতে বাকী ছেলেরা আবার বাড়ি ফিরে যেতো।

তো একাত্তরে ডিহি কলকাতায় সামান্যই টুকরো টাকরা জমি ছিলো পার্টির দখলে । কাশীপুর বরানগরে এক ধাক্কায় প্রায় শ দেড়েক ছেলেকে খুন করে তাদের মৃতদেহ ঠেলা গাড়ীতে চাপিয়ে মুখে আলকাতরার পোঁচ মেরে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হলো।

অগাস্টের মাঝামাঝি। আর এর দু দিন পরে হাওড়াতে। প্রতিবাদ করার লোক তখন আর নেই।

একাত্তরে বাংলা দেশের মুক্তি যুদ্ধ হলে বহু ঘর ছাড়া ছেলে বাংলা দেশে চলে যায়। মুক্তি বাহিনীর সাথে থাকে - ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে প্রশিক্ষন নেয়। তবে সত্যি ফ্রন্ট লাইনে গিয়ে কেউ তেমন যুদ্ধ করেছে বলে শুনি নি।যুদ্ধ শেষ হলে অনেকেই দেশে ফিরে এসে থিতু হয়। পুলিশ ও খুব আর ঘাঁটায় নি।

সে সময় অসীম চট্টোর গ্রুপ চীনা পার্টির সরকারী লাইন বরাবর এই যুদ্ধের খুব বিরোধিতা করেছিলো এবং রাজাকারদের দেশপ্রেমিক পাকিস্তানী জনতা বলে খুব সমর্থন করতো। বাকীরা প্রায় সবাই ই মুক্তি যুদ্ধের সমর্থক ছিলো।

মানস যুদ্ধ শেষে আমায় বল্লো "মাইরি,রাস্তায় রাস্তায় কত এল এম জি,সেল্ফ লোডিং রাইফেল পড়ে রয়েছে। কেউ নেবার নেই। দেশে নিয়ে এসেই বা কি করবো? কাকে দেবো?' মানস সার্টিফিকেট ও পেয়েছিলো - মুক্তিবাহিনীর সদর দফতর থেকে। সেইটা বগলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে চাকরির সন্ধান করছিলো - শেষ যখন আমার সাথে যোগাযোগ ছিলো।

৭৭ সালে বামফ্রন্ট ফিরে এলে সন্তোষ রানা কানু সান্যাল এরা মিছিল করলেন বরানগরে। তদন্ত কমিশন বসাও। দোষীদের শাস্তি দেও। এমন কি মমতা ব্যানার্জীও বল্লেন - সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের সাথে এক মঞ্চে বসে। ঐ বরানগরেই। জ্যোতি বসুও কম চেঁচান নি। আহা- শহরের মধ্যে গণহত্যা? কি পাপ।

কিন্তু কিছু হয় নি। হবার কথাও ছিলো না। সত্যি সত্যি পুলিশের কিছু হয় না কি ? রুনু গুহনিয়োগীর ও কিছু হয় নি।

বোকা ছেলে - ও গুলো বলতে হয়। পার্টিতে ছেলে ছোকরারা থাকে। অল্প বয়স - মাথা গরম,তায় আবার আদর্শ টাদর্শ - ঐ সব হিজিবিজি ব্যাপার। তাই বলতে হয়। কবিতা লিখতে হয়। গণসংগীতে গলা মিলাতে হয়। পুলিশের কিছু হয় না। খুনেদেরও না।



নিহত ছেলের মা

আকাশ ভরে আছে ভস্মে
দেবতাদের অভিমান এইরকম
আর আমাদের বুক থেকে চরাচরব্যাপী কালো হাওয়ার উত্থান
এ ছাড়া
আর কোনো শান্তি নেই অশান্তি ও না।



কাল ছিলো সোনার ছেলেদের আত্মত্যাগের দিন - রাত না পোহাতেই গুন্ডাদের দখলে দেশ। কথায় কথায় ছুরি চলে। এলাকা দখলের দিন। শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াই। বর্ধমান ইউনিভারসিটিতে ভাইস চ্যান্সেলরের ঘরেই দুই গ্রুপ সিপির মারামারি - এক নেতা - অখিলেশ ঐ ঘরেই ছুরিকাহত হয়ে মারা গেলেন। বাবুলাল বিশ্বকর্মার মৃত্যুদিনে "অমর শহীদ" নামে একটি কবিতা দুটি মেয়ে রাতের অন্ধকারে সেঁটে দিয়েছিলো কলেজের দেওয়ালে - ওর থেকে বেশী প্রতিবাদ তখন আর সম্ভব ছিলো না। সেই অপরাধে শুধু সন্দেহ করেই প্রায় ধর্ষণ করা হয়েছিলো আরেকটি মেয়েকে।

তারই মধ্যে পরীক্ষা চলছে। পার্ট ওয়ানে যে যার কলেজে - "হোম সিট"। কেননা অন্য কলেজে গেলে লাশ পড়ে যেতে পারে। ইনভিজিলেন্সের কোনো বালাই ই নেই। লুকোছাপার ঘটনাও নেই। বেঞ্চির উপর ডাঁই করে রাখা বই। গোল হয়ে চেয়ার টেনে সবাই মিলে উত্তর লিখছি - চা খাছি আর সিগারেট। "একজামিনেশন ইজ দ্য ফেস্টিভ্যাল অফ মাসেস"। এই গণ টোকাটুকি চলবে প্রায় এক দশক - সেই সত্তরের শেষে বামফ্রন্ট এসে কোনো রকমে আবার ঠিক ঠাক পরীক্ষা চালু করবে। পার্ট টুর পরীক্ষায় অন্য কলেজে সিট পড়লো। সেখানে অন্য গ্রুপের ছাত্র পরিষদ। তার নেতা চোখ পাকিয়ে এসে শাসিয়ে গেলো - যখন তখন হাত চলবে। ভয়ে টোকা টুকি তো দুরস্থান - কেউ পিছন ফিরতে ও সাহস পেলো না প্রথম ও দ্বিতীয় দিন। তৃতীয় দিন এলেন যুবনেতা লক্ষীদা - তার হস্তক্ষেপণে আবার টোকাটুকির স্বর্ণদিন ফিরে এলো। কিন্তু ততদিনে ডাহা ফেল করে গেলো কিছু ছেলে। আমাদের কলেজের বড় নেতাও টুকতে পারেন নি - ফলে তিনি ইংরাজিতে অনার্স নিয়ে সসন্মানে পাস করলেন কিন্তু সমস্ত ছাত্রদের জন্য (সেই সময়ে) যে কম্পালসারি ইংরাজি ছিলো তাতে বেমালুম ফ্যাল করে গেলেন।ইংরাজি অনার্সের ছাত্র ইতিহাসে তিনিই প্রথম এই কান্ডটি করেছিলেন।

শুধু টিঁকে থাকার যুদ্ধ। কোনো রকমে বেঁচে থাকার যুদ্ধ। নাক মাটিতে ঠেকিয়ে - সরীসৃপের জীবন। একটা অস্ত্রের জন্য খুব টানাটানি। কোনো রকমে বিশাল টাকা খরচা করে পিস্তল যোগাড় হলো। অজয় একটা ছোটো ব্যাগে সেটা নিয়ে বাগমারীর চায়ের দোকানে যেতেই ছেঁকে ফেললো সাদা পোষাকের পুলিশ। মিসায় একবছর। প্রথম থেকেই ওটা ছিলো ফাঁদ। কলকাতা ডকের যে লোকটি পিস্তল বেচেছিলো -যে খানে পৌছে দেবার কথা ছিলো, যার হাতে - সব,সব জানতো পুলিশ।

এই সব ছোটো খাটো খুব অবভিয়াস কৌশলও আমরা জানতাম না। বুঝতাম না। দলে দলে ডোডো পাখীদের মতন শিকারীর ফাঁদের দিকে হেঁটে গেছি -"গুলিবিদ্ধ,ছুরিবিদ্ধ ,অপাপবিদ্ধের দল'।

চারু মজুমদার ধরা পরলেন। দশ বারো দিন পর লক আপেই মৃত্যু। যার অঙ্গুলী নির্দেশে ঐ গেরেফতারী হয়েছিলো তিনি ও বাঁচেন নি। প্রায় দশ বছর বাদে এক নিশ্চিন্ত সকালে রিক্সা করে বাজারে যাওয়ার পথে পাঁচ ছজন আততায়ীর ছুরি ঝলসে উঠেছিলো। জলপাইগুড়ি শহরের জনবহুল রাস্তায় এই খতম অভিযান সেরে লোকারণ্যে হারিয়ে গেছিলো আততায়ীরা।

চারুবাবুর মৃত্যুর পর সংগঠন চুরমার হয়ে গেলো। সুব্রত দত্ত কিছুদিন টানলেন তারপর যতদিন না বিনোদ মিশ্র এসে হাল না ধরলেন ততদিন পার্টি শুধু ভেঙেই যাচ্ছিলো। কত উপদল। কত নেতা। সবাই দিশেহারা। শুধু সকলেই বুঝেছিলেন আবেগ দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের মোকাবেলা সম্ভব নয়।তার জন্য ও চাই প্রশিক্ষণ। আর শহুরে যুবকের আদর্শে ভরা বুক আর স্বপ্ন দেখা চোখ শুধুই আরো গভীর ভুলভুলাইয়ায় ঠেলে দেয় । তাই শহর ছেড়ে পার্টি পথ ধরলো প্রত্যন্ত গাঁয়ের পথে,গভীর জঙ্গলে। প্রথম থেকেই শুরু হলো আধুনিক অস্ত্র আর সামরিক শিক্ষার উপর কড়া নজর।কিন্তু সে আরেক গপ্পো।

বাহাত্তরের ভোট হলো যেন এক তামাশা। আর তিয়াত্তরের সন্ধ্যাবেলায় বাড়ীতে হাজির খুব অমায়িক এক পুলিশ। "পুরোনো অ্যাকটিভিস্টদের নিয়ে একটা ইয়ে করছি - বুইলে না। তা আই বি আপিসে কাল দশটার সময় একবার এসো।'

পরের দিন আই বির বড় সাহেব নানান প্রশ্ন করলেন। তিন জন চার জন একই সাথে প্রশ্ন করছেন। পুরোনো বন্ধুরা কে কোথায়।কাদের সাথে যোগাযোগ আছে? "আচ্ছা অরুণাভ বিশ্বাস - এখন কোথায় বলতে পারো?' আমি অম্লান বদলে বলি "অরুণ তো,যদ্দুর জানি প্রেসিডেন্সী জেলেই আছে। ছাড়া পেয়েছে তো শুনি নি।' মিষ্টি হেসে বড় সাহেব একখানা ফটো এগিয়ে দ্যান। "তো গত সপ্তাহে অরুনাভের সাথে হাজরা পার্কে কি কচ্ছিলে?' নির্বাক আমাকে বল্লেন খুব ঠান্ডা গলায়। "কার কি অ্যাটিচুড সেটা আমরা জানি। পড়াশুনা করছো করে যাও। অরুণাভও মেইনস্ট্রীমে ফিরে এসেছে। আবার কলেজে ভর্তি হবে। শোনো, আর চান্স কিন্তু পাবে না।এইটাই লাস্ট।"

ঐ অ্যাটিচুডের পরীক্ষা আবার দিতে হয়েছিলো লর্ড সিনহা রোডে- এমারজেন্সীর সময়। "প্রাক্তন নকশালদের সাথে আমরা মাঝে মাঝে আলোচনা করি। বুঝতে চেষ্টা করি তারা কি ভাবছে,অ্যাঁ?' তো প্রায় ঘন্টা দুয়েক অমন প্রশ্নবান আর আলোচনার পর সাদাপোষাকের একজন একটি রুপালী ছোট্ট পিস্তল দিয়ে আমার গালে বুলিয়ে দিলেন " মারা পড়ে যাবেন। স্রেফ মারা পরে যাবেন। ও পথে আর যাবেন না। '

কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসগরের গলা জুড়ে গেছে। অসাবধানে কাজ হয়েছে - এখনো গেলে গলায় কালো দাগ দেখতে পাবেন। আশুতোষ ভবনে দু দল পরিষদের খুব মারামারি, ধাক্কাধাক্কি। ছিঁড়ে ফেলে দিলো অতুলবসুর আঁকা রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। নীতি-টিতি নয়। স্রেফ তোড় করে দেওয়া। ব্যাপক হাঙ্গামা। বিন্দাস।

এই করতে করতে ৭৫ সালে এমারজেন্সী। তাতে আমাদের কি আসে যায় ? আমার এমারজেন্সী চলছে সেই সত্তর সাল থেকেই। তাবৎ শিল্পী বুদ্ধিজীবীরা কোথায় মুখ লুকাবেন বুঝতে পারছেন না।
ইন্দিরা গান্ধী এসে তলব করলেন পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্টির ধারক বাহকদের। রাজভবনে সার দিয়ে বসে গেলেন শান্ত ইস্কুলের ছেলেদের মতন। নীতির কথায় গুলি মারুন - আরে ঐ যে কবি মদ্যপ, সেই যে আধ পাগলা শিল্পী, সংসারের কোনো ধর্ম মানেন নি সেই গেঁজেল পদ্যকার, বাউন্ডুলে রাগী নাট্যকার ,চির প্রেমিক কথাশিল্পী, সবাই - সবাই ছিলেন হাজিরার খাতায়।

না,দোষ দেই না কাউকেই। আমি নিজেই তো বালিতে মুখ গুঁজে। তবে সাংস্কৃতির জগতে যারা খুব মন দিয়ে ঐ ইমেজ গুলো ছড়াচ্ছিল্লেন তারাও ব্যবসায়ী। তাদের কবিতা,গান,নাটক এই সবের সাথে নোংরা পাজামা,কানে গোঁজা বিড়ি,অবিন্যস্ত চুল, সোনাগাছিতে উন্মত্ততা, মাদ্যিক কাল্ট - এরাও পণ্য। এমারজেন্সীর এক গুঁতো এদের সবাইকে ল্যাংটো করে দিয়েছিলো । মুখ গোঁজার জন্য অত বড় মরুভুমি আর ছিলো না।

শুধু বলি ,এই সত্তরের দশকের অরাজকতা ,অনৈতিকতা কেটে গেছে মোটামুটি প্রতিবাদ ছাড়াই। ঘোষ মশাই বুড়ি ছুঁয়ে গেছেন । প্রতি সপ্তাহেই কলাম লিখতেন - তো প্রায় দুশো সপ্তাহে ঐ একবারই পুলিশি অত্যাচার নিয়ে লিখেছিলেন।সেটাই কুমীরছানার মতন তুলে নিজের নিরপেক্ষতা প্রমান করেছেন বারবার। লাশের পাহাড় কিন্তু উঁচু হয়েছে রোজই।তবু বলি হিজড়েদের ভীড়ে তাও একবার আঙুলটা তুলেছিলেন তিনি ই।

সেই সর্বব্যাপী ক্লীবতা আর ভীরুতার মধ্যেই আমি বড় হলাম। চোখ মেলে দেখলাম রাজা বদল। কিন্তু সেই উত্তাল সময় আমার চোখে পরিয়ে দিয়েছিলো মায়া চশমা - তাতে লাল সবুজ গেরুয়া কোনো রং কেই আর আলাদা দেখি না।

সত্তরের শেষ ওসময়েই।বাকিটা যা ছিলো তা শুধু মোমেন্টামের খেলা। অল্প বিস্তর যা ফারাক দেখা যায় তা শুধুই লোক দেখানো। এও এক খেলা।

সমীরের সাথে দেখা হলো এই সেদিন। মেয়েকে ভর্তি করতে এসেছে ব্যাঙ্গালোরে।কার কাছে থেকে যোগাড় করেছে আমার ফোন নাম্বার। প্রায় পঁচিশ বছর পর দেখা হবে। হোটেলে মুখোমুখী হয়ে অবাক হই - এই সেই সমীর? পাকাচুল,মোটা চশমা, ভুঁড়ি । সত্যি,পুরোনো বন্ধুদের সাথে অনেকদিন পর দেখা হলে পষ্ট বোঝা যায় বয়সে বেড়েছে।

"ব্লাড প্রেশারে বড্ড কষ্ট পাছি' সমীর বলে "সুগারটাও"। আমি জানাই আমার কলেস্টরলের হিসাব। "বেশী ড্রিংক করিস ' সমীর সাবধান করে।আমি আঙুল নেড়ে বলি "সিগ্রেটটা ছড়তে পাল্লি না এখনো ?'

"মনে পড়ে? ' সমীর বলে "জ্যোতিটা বাঁচলই না।পেটে এইসা মেরেছিলো একদম গুবলেট হয়ে গেলো।'

"কিন্তু কেকাদি ঠিক হয়ে গেলো।অত ইলেকট্রিক শক দিয়েছিলো -কিরম পাগলটা হয়ে গেছিলো।এখন আছে নেব্রাস্কায়'।

"মনে পড়ে ?'

"সেই ধর্মতলার স্ট্রীটে আমাদের দৌড়। খুব বোম ফাটছিলো তালতলায়"।

আমরা একটু চুপচাপ হয়ে যাই। কেউ বিড় বিড় করে বলে "বাড়ি ফিরে অনেকক্ষন ধুয়েছিলাম। অনেকক্ষন। কিন্তু রক্তের গন্ধটা অনেকদিন রয়ে গেছিলো।কিছুতেই.....'

(সমাপ্ত)