এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • দোলজ‍্যোৎস্নায় শুশুনিয়া‌য় - ১৩

    সমরেশ মুখার্জী লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৬ মে ২০২৪ | ২৪৬ বার পঠিত
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
    প্রবৃত্তি ও নীতিবোধের দ্বন্দ্ব

    সুমন বলে, "আচ্ছা, একটা কাল্পনিক পরিস্থিতি ভাব। পাপিয়া একটি কুড়ি বছরের মেয়ে। প্রিয় একটি বাইশ বছরের ছেলে। দুজনের‌ই শৈশব, কৈশর কুয়াশা‌চ্ছন্ন। ওদের আলাপ হলো। পরস্পর‌কে পছন্দ হোলো। বছর দুয়েকের মেলামেশা‌য় তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়লো। মাস ছয়েক লিভ টুগেদার করে তারা নিজেদের অন্তরঙ্গ ভাবে জানলো। এবার যখন তারা বিয়ে করবে ভাবলো তখন জানা গেল তারা এক‌ই মায়ের সন্তান। অর্থাৎ সহোদর ভাই বোন। খুব ছোটবেলা‌য় তারা কোনো ভাবে আলাদা হয়ে গেছিল। আইন‌ত ও সামাজিক‌ বিধানে এ সম্পর্ক নিষিদ্ধ। তাই বিয়ে করা গেল না। এবার কি তারা এক বাড়িতে ভাই বোন হিসেবে থাকতে পারবে?"

    ওরা তিনজনে‌ খানিক মুখ চাওয়া‌চায়ি করে। শেষে তুলি বলে, "তুই একটা বিটকেল সিচুয়েশন দিলি। এরপর এক বাড়িতে থাকা তো দুরের কথা পরস্পরের দিকে তাকাতে‌ও ওদের লজ্জা করবে।"

    সুমন বলে, “বেশ। এবারে ধর, কিছুদিন পর আরো অনুসন্ধানে জানা গেল, প্রাথমিক‌ভাবে যা জানা গেছি‌ল, তা ঠিক নয়। অর্থাৎ তারা সহোদর ভাই বোন নয়। এবার তাদের মনোভাব কেমন হবে?”

    তুলি বলে, “এসব কী গুগলি ছাড়ছিস রে তুই!”

    ঈশু বলে, “সহোদর ভাই বোন যখন নয় তখন তারা অবশ্যই রিলিভড্ ফিল করবে, কারণ এবার আর বিয়েতে মানসিক, সামাজিক কোনো বাধাই র‌ইলো না।” চুণি‌ও ওর মতে সায় দেয়।

    সুমন বলে, "এই বিটকেল কাল্পনিক সিচুয়েশনটা হচ্ছে প্রবৃত্তির সাথে নীতিবোধের দ্বন্দ্বের উদাহরণ। প্রবৃত্তির তাড়না আদিম, অকৃত্রিম, স্বাভাবিক। তাই পাপিয়া প্রিয় পরস্পরের প্রতি স্বাভাবিক‌ভাবে আকৃষ্ট হয়েছে। নীতিবোধ, সংস্কার ইত‍্যাদি অনুশাসন নির্ধারিত হয় কিছু সামাজিক উদ্দেশ্যসাধনে। তাই তা আরোপিত। সেই অনুশাসন পালনের তাগিদ তাই যত না আন্তরিক তার থেকেও বেশি পরিণতি নির্ভর। তবে নানান সামাজিক আচার, প্রথা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বহুদিন ধরে পালনে তৈরী হয় সমষ্টিগত অভ‍্যাস, লোকাচার মানে customs, rituals যেটা অজান্তে প্রভাবিত করে মানুষ‌কে।” 

    “এই উদাহরণে প্রথমে পাপিয়া ও প্রিয় ছ মাস লিভ ইনের পর সানন্দে বিয়ে করতে যাচ্ছিল। যখন জানলো ওরা ভাইবোন তারপর ওদের পক্ষে এক সাথে  থাকা মানসিক যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে। সেটা অপরাধবোধের জন‍্য নয় কারণ অতীতে তাদের মিলনের বিচ‍্যূতি হয়েছে অজান্তে। তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এরপরে‌ও একসাথে থাকলে ওদের সম্পর্কে‌ দ্বিমাত্রিক (প্রবৃত্তি ও নীতিবোধের) টানাপোড়েন ওদের জীবন দূর্বিষহ করে তুলবে। অবশেষে যখন জানলো তারা আসলে সহোদর ভাইবোন নয়, আবার উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। এই থিমের ওপর নারায়ণ সান‍্যালের একটা সুলিখিত উপন্যাস পড়েছি‌লাম - তাজের স্বপ্ন।”  

    "তবে বিচ‍্যূতি ঘটার আগেই সংযমের উদাহরণ‌ও আছে। যেমন যম আর যমী যমজ ভাই বোন হয়েও যমী তার ভাই কামনা করে। যমের মনে হয় সেটা ঠিক নয়। সে বোনকে বুঝি‌য়ে সুঝিয়ে তার থেকে দু্রে চলে যায়। তাই আজ‌ও ভাই ফোঁটার দিন বোন না বুঝেই আউড়ে যায় - "ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা৷ যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি‌ও দিই ভাইকে ফোঁটা"। অর্থাৎ ভাইকে কামনা করে যে বিচ‍্যূতি যমী বা যমুনার হয়েছিল, তা যেন আমার কখনো না হয়।"

    চুনী বলে, "এটা তো জানতাম‌ না!"

    সুমন বলে, "এমন অনেক সামাজিক প্রথা আছে যার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য না জেনে‌ই আমরা তা পালন করে থাকি। যম আর যমীর উদাহরণ তো পৌরাণিক, কিন্তু বাস্তব উদাহরণ‌ও আছে। যেমন ধর কবি উইলিয়াম ওয়ার্ড‌সওয়ার্থ ও তাঁর বোন ডরোথির কথা। তাঁরা একসাথে থাকতেন ইংল্যান্ডের ছবির মতো লেক ডিস্ট্রিক্টের গ্ৰাসমেয়ারে। প্রায়‌ই তাঁরা দুজন ও কবি কোলরিজ একসাথে দীর্ঘ পদচারণায় যেতেন। জন্মতারিখ‌গুলো খেয়াল কর - উইলিয়াম ৭ই এপ্রিল ১৭৭০, ডরোথি ২৫শে ডিসেম্বর ১৭৭১ এবং কোলরিজ ২১শে অক্টোবর ১৭৭২. কোলরিজ সুদর্শন। তবু দশ মাসের বড় কোলরিজের সাথে ডরোথি‌র কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠলো না। তৈরী হোলো একুশ মাসের ছোট ভাই উইলিয়ামের প্রতি দূর্বোধ‍্য আকর্ষণ।" 

    "তবে ডরোথির তাঁর প্রতি দূর্বল‌তা সত্ত্বেও উইলিয়াম কিন্তু দিদির দূর্বলতা‌য় ভেসে যাননি। যমের মতো দুরেও চলে যাননি। এক‌ই বাড়িতে থাকতেন তাঁরা। উইলিয়াম যেদিন মেরী হাচিনসনকে বিয়ে করলেন, সেদিন ডরোথি নিজের আঙুলে একটি আংটি পরে বিছানায় উপুড় হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আংটিটা সে এতোদিন সযত্নে রক্ষা করে রেখেছিল তার ভাবী প্রেমিকের জন‍্য। ডরোথি আর বিয়েই করলো না। ভায়ের বিয়েতে ডরোথি চার্চে যায়নি। নতুন বৌকে নিয়ে ভাইকে আসতে দেখে ডরোথি সেই যে চিলেকোঠায় গিয়ে ঢুকলো,  বেরোলো কুড়ি বছর বাদে উইলিয়ামের মৃত্যুর পর। উইলিয়াম মারা গিয়ে ডরোথি‌কে তাঁর প্রতি অবুঝ আকর্ষণ থেকে মুক্তি দিয়ে গেলেন। এক বাড়িতে থেকেও বিয়ের পর ডরোথি আর কখনো ভাইয়ের মুখোমুখি হয় নি। আত্মহত্যা নয়, ডরোথি বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায় আত্মনির্বাসন।  আমৃত্যু উইলিয়াম‌ও এজন‍্য নিদারুণ মনোকষ্ট পেয়েছেন। এহেন সব সম্পর্কের স্বত্তা অনুধাবন প্রচলিত ধারণায় অসম্ভব।"

    সুমন চুপ করতে ওরা স্থব্ধবাক। মৃদুমন্দ হাওয়া দিচ্ছে। দুর থেকে অজানা রাতচরা পাখির ডাক ভেসে আসছে। উজ্জ্বল জ‍্যোৎস্না। আনন্দ‌ময় পরিবেশ। তবু দুই শতাব্দী অতীতে দুর দেশের ডরোথি‌র অবুঝ দুঃখ কিছুক্ষণ যেন ভারী হয়ে চেপে থাকে সেখানে।

    ইডিপাস কমপ্লেক্সে‌র অন‍্য দিক

    কিন্তু সুমনকে আজ বলায় পেয়েছে। ও বলে চলে "ফ্রয়েডের সমসাময়িক, ফিনল্যান্ডের এডওয়ার্ড ওয়াটারমার্ক-এর মতবাদ ছিল ফ্রয়েডের বিপরীত। তাঁর মতে এক‌ই পরিবারে শৈশব থেকে একসাথে বড় হ‌ওয়ার ফলে‌ই অতি নিকট রক্ত সম্পর্কে‌র মধ‍্যে কোনো যৌন আকর্ষণ তৈরী‌ হয়‌ না। ফ্রয়েড প্রবর্তিত ইডিপাস কমপ্লেক্সের ভিত্তি‌ অনেক‌টাই তাঁর নিজের‌ জীবনের অভিজ্ঞতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। তিনি সাত বছর অবধি বিছানায় হিসি ক‍রে ফেলতেন বলে বাবার কাছে ধাতানি খেতেন, "এ ছেলের দ্বারা কিস‍্যূ হবে না"। ফলে বাবার প্রতি তাঁর তৈরী হয়েছিল তীব্র বীতরাগ। যেমন হয়েছিল কাফকার তাঁর অত‍্যন্ত রাশভারী পিতার প্রতি। কিন্তু ফ্রয়েডের মা এ্যামেলিয়া তাঁকে খুব ভালো‌বাসতেন। খুব উৎসাহ দিতে‌ন, ভাবতেন সে বড় হয়ে নিশ্চিত বিরাট কিছু করবে। ফ্রয়েড বলতেন, তাঁর জীবনে মায়ের জায়গা আর কোনো মহিলা নিতে পারবে না। ফ্রয়েডের স্ত্রী মার্থাও সেটা বুঝতেন। কিন্তু মা ও সন্তানের মধ‍্যে শৈশবে‌ যে শারীরিক নৈকট্য থাকে ফ্রয়েডের সাথে এ্যামেলিয়ার তা ছিল না। ফ্রয়েড শৈশব থেকে কোলে, কাঁখে করে বড় হয়েছেন তাঁর দুধ-মার কাছে…"

    - "দুধ-মা? সেটা আবার কী?" অবাক গলায় প্রশ্নটা করে‌ই চুনি বলে ফেলে, "সরি, সরি, আমি‌ও তুলির মতো কথার মাঝে কথা বলে ফেললাম।"

    সুমন বলে, "না, না, ঠিক আছে। তুই একটা শব্দের মানে জানিস না, তাই জানতে চেয়েছিস। তাতে কী হয়েছে। অতীতে অভিজাত মহলে কিছু মহিলা‌ শুধুই গৃহবধূ হয়ে অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে থাকতে চাইতেন না। তাঁদের থাকতো ক্ষমতা‌র উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা বহু পুরুষের নয়নের মণি হয়ে থাকার বাসনা। তাঁদের কুহকী যৌবনের মাদকতায় তাঁরা পছন্দের পুরুষ‌দের মজিয়ে রাখতে ভালো‌বাসতেন। ফলে তাঁরা মা হতে চাইতে‌ন‌ না। অসাবধানতাবশতঃ হয়ে গেলে - তখন তো আর বেবিফুডের চল ছিল না - তাঁরা একটি দুগ্ধ‌বতী ধা‌ইমা নিযুক্ত ক‍রতেন শিশু‌কে স্তন‍্যপান করাতে এবং নিজের ফিগার ঠিক রাখতে। ফলে গর্ভধারিণী না হলেও দুধ-মার সাথে শিশুটির যে একাত্মতা তৈরী হোতো তার কিয়দংশ‌ও হোতো নাঊ জন্ম-মায়ের সাথে।"

    সুমন বলে, "আর একটা উদাহরণ দি‌ই। শের আফগানের সাথে বিয়ের পর মেহেরুন্নিসা বেগম বা নুরজাহানের একমাত্র কন‍্যা লাডলীর জন্ম হয়, তাও হয়তো তিনি চাননি। হয়তো এ্যামেলিয়ার মতোই লাডলী‌কে‌ও তিনি রেখেছিলেন কোনো দুধ-মার হেফাজতে। তাই আজীবন নুরজাহানের সাথে লাডলী‌র সম্পর্ক ছিল শীতল। জাহাঙ্গীর ষড়যন্ত্র করে শের আফগানকে হত‍্যা করলেন। লোক-দেখানো তিন বছর শোক পালন করে নূর সেই সেলিম বা জাহাঙ্গীর‌কে‌ই বিয়ে করেন। কারণ সেলিমের প্রতি‌ই ছিল তাঁর প্রথম প্রেম, গোপন অনুরাগ।" 

    "নুরের ছিল আকাশচুম্বী উচ্চাশা। ভেবেছিলেন তাঁর রূপের রোশনাইতে জাহাঙ্গীরকে মজিয়ে বকলমে তিনি‌ই হবেন ভারতের সম্রাজ্ঞী। সে স্বপ্ন অনেকটা‌ পূরণ‌ও হয়েছিল কারণ আরো ১৮টি পত্নী থাকা স্বত্ত্বেও জাহাঙ্গীর মদিরাক্ষী নুরজাহানের মোহে ছিলেন বিভোর। রাজকার্যের অনেক ব‍্যাপারে তিনি নুরের ওপর নির্ভর করতেন। আকবরের‌র আমল থেকে মোহর কাটা হোতো গোল করে।  নুরের প্রেমে মোহাচ্ছন্ন জাহাঙ্গীর হুকুম দিলেন চৌকো মোহর কাটানোর - তাতে বাদশাহ সেলিমের সাথে নুরের নাম‌ও খোদাই করা হলো। দূর্ধর্ষ চাঘতাই মোগল বংশে সেই প্রথম কোনো জেনানা‌র নাম‌ও দেখা গেল সুলতানী মোহরে। ব‍্যবসায়ী‌রা ভালো ভাবে নিলো না তা। মোহরের দাম পড়ে গেল বাদশা দর বেঁধে দেওয়া সত্ত্বেও।"

    "জাহাঙ্গীর মানে জগতজয়ী। আর নূরজাহান মানে জগতের আলো। দীর্ঘ ১৬ বছরের বিবাহিত জীবনে জগতের আলো প্রায় নিত‍্য নিশীথে জগতজয়ী‌র শয‍্যা আলো করেও দ্বিতীয়‌বার আর মা হননি। শয‍্যাক্রীড়ার সাথে গর্ভসঞ্চারে‌র অমোঘ কার্যকারণ সম্পর্ক সর্বজনবিদিত। একটু আগে আমরা ঈশুর কাছে‌ই জেনেছি শাহজাহান ও মূমতাজের মধ‍্যে সেই কার্যকারণ সম্পন্ন হয়েছিল উনিশ বছরে চোদ্দো‌বার। সেলিমের‌ পিতা হবার যোগ্যতা‌ও ছিল সংশয়াতীত। হিসাব অনুযায়ী পাঁচ বৈধ পত্নী ও দুই জন রক্ষিতা‌র মাধ‍্যমে সেলিম ৫ টি পুত্র ও ১০টি কন‍্যা সন্তানের জনক হয়েছিলেন। হিসাববহির্ভূত কিছু থাকলে তা ঐতিহাসিক‌রা লিখে যাননি।”

    ঈশু বলে, “প্রিয় পত্নী হ‌ওয়া সত্ত্বেও জাহাঙ্গীর ও নূরজাহানের কিন্তু কোনো সন্তান ছিল‌না।”

    সুমন বলে, “ঠিক বলেছিস।  কিন্তু ১৬ বছরের বিবাহিত জীবনে নূর সেলিমের সন্তান ধারণ করেননি কেন? ১৬১১ খ্রীষ্টাব্দে ৪২ বছর বয়সী সেলিমের সাথে বিবাহকালে নূরের বয়স ছিল ৩৪ - প্রাইম টাইম। হতে পারে তার আগেই ১৮টি পত্নী, বহু উপপত্নী ও হারেমবাসিনীদের সাথে শয‍্যাক্রীড়া করে ১৫টি সন্তানের জন্ম দিয়ে জগতজয়ী সেলিম থিতিয়ে গেছি‌লেন। তিনি প্রথমবার পিতা হন ১৮ বছরে। শেষবার ২৮ বছর বয়সে ১৫৯৭ সালে। দশ বছরে ম‍্যারাথন গতিতে পঞ্চদশ সন্তানের জনক হয়ে হয়তো জগতজয়ী‌র কোটা ফুরিয়ে গেসলো। তাই ৫৮ বছর বয়সে ভবলোক ত‍্যাগ করার আগে নূর সহ ১৯জন পত্নীর কারুর মাধ‍্যমে‌ই সেলিম আর পিতা হননি।"

    “অথচ চার্লি চ‍্যাপলিন ৫৪ বছর বয়সে চতুর্থ‌বার বিয়ে করলেন তাঁর থেকে ৩৬ বছরের ছোট অষ্টাদশী উনা ওনিলকে। উনা 'না না করকে' চার্লি‌কে উপহার দিলেন ৮টি অমৃতস‍্য পুত্র-কন‍্যা। বাকি তিনটে বিবাহ থেকে উৎপন্ন হয়েছে আরো তিনটি - কুল মিলাকে একাদশ পুত্র-কন‍্যার জনক চার্লি এগারোতম পুত্র ক্রিস্টোফারের পিতা হয়েছিলেন ৭৩ বছর বয়সে - উনা তখন ৩৭. সুতরাং পিতা হবার পক্ষে ৫৮ বছর বয়সটা খুব বেশী নয়। নূরের সাথে সেলিমের বিবাহ হয় শেষবার পিতা হ‌ওয়া‌র ১৪ বছর পরে ১৬১১ সালে। তাহলে দ্বিতীয়‌বার জননী না হ‌ওয়া‌র কারণ অবশ্যই নূর নিজে নন।”

    চুনি বলে, “জেঠু, তুই কিন্তু ফ্রয়েড থেকে অনেক দুরে সরে গেছিস।”

    সুমন বলে, “এই হচ্ছে আমার দোষ। আমি এমন কাছাখোলা আড্ডায় তালগাছের মতো সটান কথা বলতে পারি না। আমগাছের মতো ডালপালা মেলে ফেলি।”

    তুলি বলে, “তাতে কী হয়েছে। অনেক বিচিত্র সব ব‍্যাপার‌ও তো জানা‌ যাচ্ছে।”

    সুমন বলে, “আচ্ছা ফিরে আসছি ফ্রয়েডে। ওনার ক্ষেত্রে দুধ-মার ওপর কোনো ইডিপাস কমপ্লেক্স তৈরী হয়নি, হয়েছে তাঁর জন্ম-মায়ের ওপর যাকে তিনি হয়তো ঠিক মা বলে কখোনো ভাবেন‌ই নি। তাঁকে দেখতেন এমন এক মহিলা হিসেবে যিনি তাঁর জীবনে ছিলেন বিশেষ অনুপ্রেরণা স্বরূপ। একবার প্রাকযৌবনে ট্রেন যাত্রায় পোষাক বদলের সময় তিনি এ্যামেলিয়া‌কে নগ্ন অবস্থায় দেখে ফেলেন। সেই অয়দিপাউসের মতো‌, যা দেখার নয় তাই দেখে, তিনি এমন বিচলিত হয়ে যান যে আমৃত্যু সেই ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। গ্ৰীক নাটকে থিবেসে যোকাস্তার গর্ভে অয়দিপাউসের জন্ম হলেও সে পালিত পুত্র হিসেবে শৈশব থেকে বহুদুরে কোরিন্থে বড় হয় তার পালক পিতা পলিবাস ও পালিকা মাতা মেরোপের কাছে। নিঃসন্তান মেরোপ তাকে কোলেপিঠে করে অত‍্যন্ত আদরে মানুষ করেন। তবু মেরোপের প্রতি অয়দিপাউসের ইডিপাস কমপ্লেক্স জনিত তির্যক শারীরিক আকর্ষণ তৈরী হয়নি।"

    "তাই ফ্রয়েডের ইডিপাস কমপ্লেক্স তত্ত্ব যেন প্রকারান্তরে ওয়াটারমার্কের মতবাদ‌কে‌ই বেশি মান‍্যতা দেয়। ফ্রয়েড তাঁর নিজের এবং গুটিকয় নমুনা‌র অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে একটি তত্ত্ব খাড়া করলেন এবং তা সার্বজনীন সম্ভাব‍্যতা বলে দেগে দিলেন। এটা ঠিক মানা যায় না। তাই তাঁর ইডিপাস কমপ্লেক্স তত্ত্ব সবচেয়ে বিতর্কিত। তা যেন নিয়মের থেকে ব‍্যতিক্রম, প্রবণতা‌র থেকে বিচ‍্যূতি‌কেই বেশি সূচীত করে।"

    হবো না মোরা তিন বাঁদর

    "তাহলে বলা যায় অবিরত অকপট অভিনিবিষ্ট অনুসন্ধিৎসায় অন্বেষিত অভিজ্ঞতার উপলব্ধি‌তেই অভীষ্টসিদ্ধি সম্ভব - অর্থাৎ জ্ঞানার্জন।"

    ফোঁস করে একটা জোর নিঃশ্বাস ফেলে ঈশু বলে ওঠে, "উরেঃ বাবা, জেঠু,  thou-thy-thee-shalt গোছের ভিক্টোরিয়া‌ন ইংরেজি‌র মতো এ কী হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ‌ বাংলা বললি রে ভাই!"

    তুলি ধরে সানাইয়ের পোঁ, "এ্যাতো অ-কারান্ত শব্দের সমাহারে যেন মনে হোলো - অ এ অজগর আসছে তেড়ে।"

    চুনি‌র তৎক্ষণাৎ ফোড়ন, "তাই আ-এ আত্মারাম গেল খাঁচা ছেড়ে।"

    সুমন অট্টহাস‍্য করে বলে, "বাঃ, দারুণ বললি তো তোরা। একদম ইন্সট‍্যান্ট কফি‌র মতো। কী তাল, মিল! ঐ বিটকেল বাক‍্য‌টা আমি মজা করতে বলেছি। অনেকক্ষণ ধরে হ‍্যাজর হ‍্যাজর করে সিরিয়াসলি হেজিয়ে চলেছি তো। তাই আবার একটু কমিক রিলিফ নিলাম। তবে জোকস এ্যাপার্ট, যা বলতে চেয়েছি তা নিশ্চ‌ই বুঝেছি‌স। সেই তিনটে বিখ্যাত বাঁদরের মতো চোখে, কানে সংস্কারের ঠুলি না পরে থেকে আমরা যদি মুক্ত মনে দেখতে, শুনতে, ভাবতে এবং বলতে পারি - সেটাই মুক্তমনস্কতার পরিচয়। সবসময় হয়তো কোনো সিদ্ধান্তে নাও আসতে পারি। তাতে ক্ষতি নেই। নানা কিছু নিয়ে ভাবার চেষ্টা‌ও তো এক ধরনের মানসিক ঋদ্ধ‌তার অনুশীলন। তাই না?"

    ঈশু বলে, "ঠিক বলেছিস। দ‍্যাখ, এই ক‍্যাম্পিংয়ে একমাত্র গৌরব ছাড়া আমরা আর কে কতটা রক ক্লাইম্বিং করতে পারবো জানি না তবে আজকের এই আলোচনা‌টা আমি খুব এনজয় ক‍রলাম। অনেক কিছু জানলাম। এর আগে কোনোদিন এমন সব স্পর্শকাতর বিষয়ে এভাবে খোলামেলা আলোচনা কারুর সাথে হয়নি। তাই এই আউটিংটা বহুদিন  মনে থাকবে আমার। থ‍্যাঙ্কস জেঠু। তোকে প্রায়শঃ‌ই চ‍্যাংড়ামি করতে দেখে ভাবতাম তুই একটা লঘুচিত্ত, চপলমতির ছেলে। তুই যে এমন সব সংবেদনশীল বিষয়ে‌ও এতো সাবলীল ভাবে আলোচনা করতে পারিস, জানা ছিলো না।" 

    সুমন ক‍্যাচ লোফার ভঙ্গিতে ঈশুর দেওয়া থ‍্যাঙ্কস‌টা নিয়ে বলে, "বাহ‍্যিকভাবে দেখে, ওপর ওপর ব‍্যবহারে অনেক মানুষ‌কে‌ই ঠিক চেনা যায় না। অনেকে আবার জল মাকড়সার মতো জলের ওপর তলে ভেসে বেড়াতে‌ই ভালো‌বাসে। তাদের কোনো কিছু নিয়ে‌ই গভীরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। তবে কেউ কেউ হয় হিমশৈলের মতো। দশ পারসেন্ট দৃশ‍্যমান। নব্ব‌ই পারসেন্ট ডুবে থাকে জলের তলায়। তাদের সাথে খোলামেলা আলোচনা না হলে তাদের স্বরূপ বোঝা যায় না। যেমন আমি‌ও এতোদিন তোকে দেখে ভাবতাম খুব ডাঁটিয়াল। তাই কাউকে পাত্তা দিতে চাস না। আমার‌ও সে ভুল ভাঙলো।"
     
    তুলি বলে, "ঠিক বলেছিস জেঠু। ওপর ওপর দেখে অনেককেই ঠিক বোঝা যায় না।"
     
    চুনি বলে, "আজকের এই আলোচনা‌টা আমি‌ও খুব এনজয় করলাম।" 
     
    ঈশু বলে, "এবার চল আমরা শুতে যাই, অনেক রাত হয়েছে। কাল সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।" 
     
    তখন‌ও সুমন জানতো না আগামীকাল গভীর রাতে ওকেই আবার এই কথাটা বলতে হবে ঈশুকে, অন‍্য এক পরিস্থিতি‌তে।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
  • ব্লগ | ২৬ মে ২০২৪ | ২৪৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সমরেশ মুখার্জী | ২৮ মে ২০২৪ ২১:২৩532453
  • রঞ্জন রায়ের ২৫.৫ এর ট‌ই‌ “বাবুলাল গলির ফুগগা বাঈ” লেখা‌য় মন্তব্য করতে গিয়ে ১০ নম্বর পয়েন্টে কথাপ্রসঙ্গে লিখেছি‌লাম - “গল্পের ছলে বা আকারে ইংগিতে‌ নয় - প্রবৃত্তি, প্রবণতা বিষয়ক এমন কিছু প্রসঙ্গ সরাসরি আলোচনা করেছি আমার “দোলজ‍্যোৎস্নায় শুশুনিয়ায়” লেখায় ৪ থেকে ১৩ পর্বে। ভেবেছিলাম কেউ হয়তো কোনো পার্সপেক্টিভ জানাবে। আজ অবধি গুরুর কোনো ঋদ্ধ পাঠক কোনো মতামত করেনি। হয়তো ঐ বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা কারুর পছন্দ হয়নি।”

    আমার মন্তব্যে বোল্ডিত বাক‍্যের ওপর kk লিখলেন -  নট নেসেসারিলি। ঐ সিরিজের পর্বগুলো আমি ওপর ওপর দেখেছি। পড়তে গিয়ে কোনো কারণে ফোকাস নড়ে গেছে, তবে ইচ্ছে আছে মন দিয়ে পড়ে বুঝে দেখার। তাহলে হয়তো মন্তব্যও আসতে পারে। তবে কোনো লেখায় মন্তব্য না করা মানেই সেটা পছন্দ না হওয়া নয়। নিজেকে "ঋদ্ধ পাঠক" বলে‌ও ক্লেম করছি না। এই মন্তব্যটা রঞ্জনদা'র লেখায় করা  হয়তো উচিত হলোনা। কিন্তু ভাটে লিখলে irrelevant লাগতে পারে ভেবে এখানেই লিখলাম। 

    আমি‌ও সেই ভেবেই ওটা এখানে সরিয়ে আনলাম। 

    @kk - আমার অভিমত ছিল Generalised observation - কোনো ব‍্যক্তি‌বিশেষের জন‍্য নয়। ঐ লেখাটির ক্ষেত্রে আপনি কেবল ২য় পর্বে জেন গুড‌অল প্রসঙ্গে ছোট্ট মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ৪ থেকে ১৩ = ১০টা পর্ব  “কোনো কারণে” মন দিয়ে পড়া হয়নি বলে কিছু বলেননি। সে ঠিক আছে। 

    ৫ম পর্বে অমিতাভ বলেছেন “আগ্রহ নিয়ে পড়ছি কিন্তু গল্পের অ্যাকাডেমিক ন‍্যারেশনের ঝোঁক তার রসগ্রহণে কিছুটা বাধা দিচ্ছে। এটা আমার নিজের অসুবিধাও হতে পারে।” তাতে আমি জানি‌য়েছি‌লাম - ঐ অংশটা ঠিক গল্প নয়। 

    তবে লেখা‌টা মন দিয়ে না পড়েও আপনি মন্তব্য না করা নিয়ে মন্তব্য করেছেন দেখে ভালো লাগলো। আপনি (দারুণ, সমৃদ্ধ হলাম, পড়ছি, চালিয়ে যান গোছের) চালু মন্তব্য করেন না। আপনার সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু আকর্ষণীয় পার্সপেক্টিভ পাওয়া যায়। আপনার প্রেক্ষাপট অজানা তবে নানা পাঠমন্তব‍্য এবং ভাটচ‍্যাটের প্রকাশভঙ্গি‌র ভিত্তি‌তে আপনাকে গুরুর মুষ্টিমেয় ঋদ্ধপাঠকের একজন মনে করি। Sugar-coated কথা বলা আমার স্বভাব নয়। তাই এটা ব‍্যাজস্তুতি হিসেবে নেবেন না। আপনি নিজেকে কী ভাবেন সেটা আপনার মূল‍্যায়ন। 

    আমার মন্তব্য সচরাচর কার্যকারণ সম্পর্করহিত হয় না। এক্ষেত্রেও তা ছিল না। আমি দরের লেখক ন‌ই। কেউ আমায় চেনেনা। আমি‌ও কাউকে চিনি‌না। তবু গুরুতে আমার অনেক লেখার ওপর অনেক অচেনা পাঠক‌ কিছু সুচিন্তিত মন্তব্য করেছেন। তাই এই লেখাটি‌র ক্ষেত্রে দশটি পর্বে কোনো মন্তব্য না পেয়ে মনে হয়েছে ঐ দশ পর্বের বিষয়বস্তু বা ন‍্যারেশন অনেকের পছন্দ হয়নি। এটা হতেই পারে। কারুর সব লেখা পছন্দসই হবে তার কোনো মানে নেই। দেখা যাক এর পরবর্তী পর্বগুলো কারুর কেমন লাগে - অবশ্যই যদি কেউ জানায় - তাদের পছন্দ বা অপছন্দ।

    ভালো থাকবেন।
  • kk | 172.56.32.178 | ২৮ মে ২০২৪ ২২:৫২532456
  • "তাই এই লেখাটি‌র ক্ষেত্রে দশটি পর্বে কোনো মন্তব্য না পেয়ে মনে হয়েছে ঐ দশ পর্বের বিষয়বস্তু বা ন‍্যারেশন অনেকের পছন্দ হয়নি। এটা হতেই পারে। কারুর সব লেখা পছন্দসই হবে তার কোনো মানে নেই।"
     
    হ্যাঁ, এটা হতেও পারে। গুরুতে এই ট্রেন্ডটা আছে যে কোনো লেখা ভালো না লাগে অনেকে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। এই বিষয়েও আমি আপনার সাথে একমত যে কারুর সব লেখা সবার ভালো লাগতেই হবে এমন কথা নেই। যেমন আপনি বলেছেন, চলুক লেখা। তারপর দেখা যাক। আমি আপাতত এই সিরিজ (আর অন্য কয়েকজন লেখকের কয়েকটা লেখা) 'পড়তে হবে' লিস্টে তুলে রেখেছি।
    আপনি আমার মন্তব্যের উত্তর দিয়েছেন সেটা ভালো লাগলো। এই যে আপনি সচরাচর পাঠকের সাথে ইন্টের‌্যাক্ট করেন এটা বেশ ভালো লাগে। এতে অনেক সময় অনেক ভুল বোঝাবুঝি ক্লিয়ার হয়ে যায়।
    আপনিও ভালো থাকবেন।
  • রমিত চট্টোপাধ্যায় | ২৮ মে ২০২৪ ২৩:১৬532457
  • সমরেশবাবু কোন একটা লেখায় আগেই জানিয়েছিলেন, দোল জ্যোৎস্নায় শুশুনিয়ায় বলে বাইশ পর্বের এক দীর্ঘ লেখা পোস্ট করবেন। আমি দেখছিলাম এক এক পর্ব করে প্রকাশিত হচ্ছিল লেখা, আমার পড়া হচ্ছিল না। কাল রাত্রে টানা 13টা পর্ব পড়ে ফেললাম। এবার পরের পর্বের জন্য আবার অপেক্ষা।
     
    প্রথম দিকের পর্ব গুলোতে জনারটা ছিল কিছু তরুণ তরুণীর প্রাণোচ্ছল দিনযাপনের স্মৃতিকথা। কিন্তু হঠাৎই সেটা বাঁক খেয়ে প্রথমে নারী ও পুরুষের সমতা সম্মন্ধে ও পরে মানব মনের নানান অলিগলিতে হাঁটা নিয়ে আলোচনা শুরু হল। এবার হঠাৎ এই জনরা চেঞ্জে পাঠকরা একটু ভড়কে যাবেন এটা স্বাভাবিক, কারণ লেখক তাদের জন্য একটা এক্সপেক্টেশন সেট করে দিয়েছিলেন শুরুতে। 
     
    তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার আলোচনাটা ভালোই লেগেছে, যা বলেছেন ঠিকঠাকই বলেছেন। কিন্তু একটা জিনিস আপনাকে জানাচ্ছি, আপনি সমালোচনা খোলা মনে নেন বলেই জানাচ্ছি, তা হল আলোচনার সময়ে আপনি যে ডায়লগটা লিখেছেন, তা কিছুটা রিপিটটিভ লেগেছে ও কিছুটা একতরফা লেকচারের মতো শুনিয়েছে। এবার হতে পারে আসল ঘটনাক্রম ওভাবেই ঘটেছিল, তাই সেটা আপনি বদলাননি। কিন্তু সুমন টানা বলে চলেছে ও মাঝে মাঝে ঈশু ও তুলি বলছে বাপরে জেঠু তুই কত জানিস, এই জায়গার সংলাপগুলো যদি আরেকটু অন্যভাবে লেখা যেত, হয়তো আরেকটু ভালো লাগত পড়তে। 
    যেখানে তুলি গাঁট্টা মারে পিঠে এবং তা তখন যে টপিকটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল সেটারই উদাহরণ পাওয়া যায় সেই জায়গাটা বেশ ভালো লেগেছে ও ন্যাচারাল লেগেছে।
     
    তবে পড়ে মনে হচ্ছে এরপর আবার এই সিরিজটায় আরেকটা জনার বদল আসবে ও আলোচনা ছেড়ে আবার উচ্ছল দিন স্বপ্ন রঙিনের দিকে ফিরে আসবে। আমি ভুলও হতে পারি অবশ্য। :-)
     
     
  • সমরেশ মুখার্জী | ২৯ মে ২০২৪ ০০:৩৭532459
  • @রমিতলান,

    প্রথমতঃ-  আপনার অনুমান কোথায় ভুল হয়েছে বলি - “হতে পারে আসল ঘটনাক্রম ওভাবেই ঘটেছিল, তাই সেটা আপনি বদলাননি।” - এই খানে। কারণ ১ম পর্বে প্রাককথনে‌ই লিখে‌ছিলাম -  “কিছু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নির্মিত। যেমন সুমন, ঈশিতা, তিলোত্তমা ও চন্দ্রিমা‌র মধ‍্যে দীর্ঘ আলোচনা।” অর্থাৎ বাস্তবে ঐ আলোচনা হয়‌ই নি। ওটা সম্পূর্ণ আমার কল্পনা। ১৯৮৪ সালে চারটি সমবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ‍্যে  এমন খোলা‌মেলা আলোচনা অকল্পনীয়। ২০২৪‌এও সম্ভব কিনা জানিনা।

     ফলে লিখতে গিয়ে আমার‌ও মনে হয়েছে তুলি, ঈশু ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ে, চুণি পড়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। আর সুমন ইঁট, বালি, সিমেন্ট ঘাঁটা D2D ঘষটানো মাল। সে কী করে এতো গভীরে গিয়ে এসব বলছে? তাই মাঝে মাঝে তুলি, ঈশুর মুখে ঐসব সংলাপ বসাতে হয়েছে - যাতে পাঠকের ধন্দের নিরসন ওদের‌ মাধ‍্যমে‌ই করে দেওয়া যায়। সেই জন‍্য‌ই আমদানি করেছি আরো দুটি কল্পিত চরিত্র - ডাক্তার দীপ ও তাঁর পরিচিত মনোবৈজ্ঞানিক ডঃ সুশীল মজুমদার - সুমনের ঐসব ব‍্যাপারে ধারণা‌ কীভাবে তৈরী হোলো তার প্রেক্ষিত হিসেবে।

    বলেছিলাম না - মন্তব্য হোক বা লেখা - সচরাচর আমার কার্যকারণ সম্পর্ক এবং ডিটেইলস নড়বড়ে নয়। তাই দীপ ডাক্তারের বয়স রাখতে চেয়েছি ৪৭ এর কোটায় যাতে বছর চব্বিশের সুমনের সাথে বন্ধু‌র মতো আলোচনা হতে পারে। আড্ডা‌বাজ ডাক্তার হতে হলে তার অন‍্য ইনকাম সোর্স থাকতে হয়। তাই মিলিটারী পেনশন। কিন্তু আর্মি‌তে ডাক্তারের ৫৬ সালের আগে অবসর হয় না। ফলে তাকে ২২ বছর কাজ করে আর্মি থেকে অবসর নেওয়াতে হোলো যাতে পেনশন পায়। অবসরে‌র গ্ৰাউন্ড IED বিস্ফোরণে বাঁ পা জখম। ৮৪তে আলোচনা হচ্ছে, তাই ৮০তে আসামে মিলিটারি অপারেশনে কাল্পনিক ডাক্তারকে জখম করতে হোলো। 

    সেদিন সৈকত “এখন চালচিত্র” লেখার ওপর সত‍্যজিতের ডিটেলিংয়ের প্রতি অবশেসন নিয়ে লিখেছেন। অতোটা না হলেও, কাল্পনিক লেখায় আমি‌ও একটু ডিটেলিংয়ে নজর দিই। বাস্তব অভিজ্ঞতা‌ ভিত্তি‌ক একাকী ভ্রমণের যে আখ‍্যান‌গুলি লিখছি - সেখানে সামান্য একটু ইতিহাস, ভূগোলের ডিটেলিং খুঁজতে হয়। নাহলে ওসব লেখা - দীপাঞ্জন যেমন সঠিক বলেছেন - পথ চলতে আলাপ কিছু আকর্ষনীয় মানুষের গল্প। ওখানে‌ কল্পনার আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

    দ্বিতীয়‌তঃ- ঠিক বলেছেন। প্রথম তিন পর্বে পাঠক কাহিনীর যে দিশা ভেবেছি‌লেন চতুর্থ পর্বের মাঝামাঝি থেকে তা অন‍্য, জটিল দিকে চলে গেল। এটাই অমিতাভ ৫ম পর্বে বলেছেন “গল্পের অ্যাকাডেমিক ন‍্যারেশনের ঝোঁক তার রসগ্রহণে কিছুটা বাধা দিচ্ছে।” এই সম্ভাবনা আমার‌ও মনে হয়েছিল। এতো দীর্ঘ সময় ধরে এমন সব গহীন স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা পাঠকের রুচি‌তে স‌ইবে কিনা।  তবে এই লেখাটা আমি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে লিখেছি‌লাম। বিভিন্ন সময়ে নানা ভাবনা এক জায়গায় ধরার চেষ্টা। যেমন ভাটের নানা আলোচনা অনেকে একটা ট‌ই খুলে এক জায়গায় রাখতে বলে - তেমন।

    তৃতীয়‌তঃ - শেষে যা ভেবেছেন - একদম spot on - “তবে পড়ে মনে হচ্ছে এরপর আবার এই সিরিজটায় আরেকটা জনার বদল আসবে।”

    এই যে একটা বড় লেখা চলার মাঝে পাঠকের মনোভাব জানতে পারা - এইটা যে কোনো লেখকের কাছে আকর্ষণীয় প্রাপ্তি।

    ভালো থাকবেন।

     
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ২৯ মে ২০২৪ ০০:৪৭532460
  • স‍্যাম, এই "পাঠকের রুচি‌তে স‌ইবে কিনা" - বিষয়ে আমার সংযোজন, আমার নিজের রুচি হিসেবে, বিষয় নিয়ে গল্প  আমার রুচিতে খুব সইবে। কিন্তু গল্প যখন গল্প বলা ছাপিয়ে অ্যাকাডেমিক ন‍্যারেশন হয়েছে বলে বোধ হতে থাকে, সে গল্প থেক আমার মন উঠে যায়। 
  • রমিত চট্টোপাধ্যায় | ২৯ মে ২০২৪ ০১:০৪532463
  • আচ্ছা বুঝেছি, আমি একটা লাইন গ্লস ওভার করে গিয়ে বিশাল পা হড়কেছি। কি আর করা যাবে ¯\_(ツ)_/¯
     
    আপনার ডিটেলিং খুবই ভালো হয়েছে, মানে সত্যিই মনে হয়েছে সবটা। হ্যাঁ, এটাও কিছুটা মনে হচ্ছিল যে সেই সময়ের তুলনায় অনেকটাই প্রোগ্রেসিভ ব্যাপার, বাট আপনাকে বেনিফিট অফ ডাউট দিয়েছিলাম আরকি। 
     
    তবে সেক্ষেত্রে এই দীর্ঘ আলোচনাটা আলাদা করে ব্লগে পোস্ট করলে মনে হয় আর বেটার হতো। সেই সম্মন্ধেই আলোচনা করা যেত আর আপনার শুশুনিয়ায় কিসসা আরো নির্মেদ হতো। যাই হোক মহাভারতে গীতা ঢুকে পড়েছে যেকালে আর কিছু করার নেই। এবার আবার কুরুক্ষেত্রে কি হচ্ছে জানার অপেক্ষা।
  • সমরেশ মুখার্জী | ২৯ মে ২০২৪ ২১:৫২532488
  • “মহাভারতে গীতা ঢুকে পড়েছে” - এই দারুণ উপমাটির জন‍্য রমিতকে স‍্যালুট জানা‌ই।

    কিছু লেখা‌র ক্ষেত্রে লেখক-পাঠকের মধ‍্যে কৌতূহলোদ্দীপক আদানপ্রদান - আমার কাছে এটাই গুরুর ‌USP. বাস্তবে চেনাজানা থাকলে চক্ষুলজ্জায় ভার্চুয়াল গণ্ডি‌তেও পিঠ চাপড়ানো‌র একটু তাগিদ কাজ করে। কিন্তু প্রকৃত নৈর্ব্যক্তিক ফিডব্যাক পাওয়া যায় অচেনা পাঠকের থেকে। যতক্ষণ তা বিষয়ে সূচীমূখ ও আঙ্গিকে মার্জিত, রুচি‌কর লাগে। কখনো পাঠকের অপছন্দ বিরক্তি‌সূচক ভঙ্গিতে প্রকাশ পায়। যদি লেখকের লেখনী‌তে কোনো ইজম, সম্প্রদায়, বিষয়ে তিনি যা বলছেন সেটাই শেষ কথা জাতীয় এ্যাটিচ‍্যুড প্রকাশ না পায় তাহলে পাঠকের অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া আমার অশোভন মনে হয়। মতের অমিল হলে‌ই মতামত অমার্জিত হবে সেটা কাম‍্য নয়।

    সীমিত জ্ঞান, বুদ্ধি নিয়ে আমি বিতর্কিত বিষয়ে লিখতে যাই না। আমি সাধারণ বিষয়ে লিখি। তাতে‌ও কিছু ক্ষেত্রে - হয়তো, মনেহয় গোছের শব্দের ব‍্যবহার সূচীত করে আমি যা  বলছি তাই ধ্রুব‌সত‍্য বা শেষকথা নয়। তা নিয়ে কেউ সমধর্মী বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করলে‌ ভালো লাগে। 

    ভাটে, লেখায়, মন্তব্যে অনেককে গভীর প্রত‍্যয়ে বলতে দেখেছি। হয়তো তারা ঐসব বিষয় নিঃসন্দেহে জানেন, বোঝেন। তাই ওভাবে লেখেন। 
     
    রমিত বলেছেন, এ লেখায় ৪ থেকে ১০ পর্বটা আলাদা করে লিখলে আলাদা করে পড়া ও তা নিয়ে আলোচনা হতে পারতো। এটা স্বীকৃত এ্যাপ্রোচ। যেমন রঞ্জন রায়ের “আদি শঙ্করার মায়াবাদ”, শিবাংশু‌র “কালী এক অনার্য ওডিসি” ইত‍্যাদি। কিন্তু রমিত এটা বলেননি যে ঐ দশটি পর্ব পড়তে অনাগ্ৰহ বা বুঝতে অসুবিধা হয়েছে। সেটা বলেছেন অমিতাভ। উনি গল্পের মধ‍্যে এ্যাকাডেমিক টোনে আলোচনা‌য় আগ্ৰহ হারিয়ে ফেলেছেন। 
     
    অর্থাৎ বিষয় নয়, উপস্থাপনার আঙ্গিকে‌র জন‍্য ওনার ঐ অংশটা পড়তে আগ্ৰহ হয়নি। যদিও আমি দুবার বলেছি ঐ অংশটা গল্প নয় এবং তার একটা যোগসূত্র একদম শেষে বোঝা যেতে পারে। কিন্তু উনি জানালেন - গল্প এবং বিষয়ধর্মী আলোচনা উনি আলাদা পড়তে পছন্দ করেন। এ দুয়ের সংশ্লেষণ ওনার পছন্দ নয়। কোনো অসুবিধে নেই। পসন্দ অপনি অপনি।

    আমার কিন্তু সুনীলের পূর্ব-পশ্চিম উপন‍্যাসে কাল্পনিক ঘটনা‌প্রবাহের সাথে মাঝে মাঝে সেই সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির বর্ণনা বেশ লেগেছে। কোনো ছন্দপতন হয়নি। বরং একটা‌না ঐসব বিষয়ে আলাদা করে রাজনৈতিক আখ‍্যান পড়তে হলে মাথা ভোঁ ভোঁ করতো। দেশভাগের রাজনীতি, ইতিহাস বহু নিবন্ধ‌কারের ফেবারিট টপিক।

    নারায়ন সান‍্যালের বিশ্বাসঘাতক লেখায় জমজমাট সাসপেন্সের সাথে আণবিক বোমা তৈরির কিছু বৈজ্ঞানিক আলোচনা, গজমুক্তা উপন‍্যাসে কাল্পনিক আখ‍্যানের মাঝে হাতি সংক্রান্ত বিষয় - এমন প‍্যাকেজে পরিবেশন বেশ লেগেছে। অশ্লীলতার দায়ে উপন‍্যাসে টানটান ঘটনার মাঝে সাহিত‍্যে অশ্লীলতা‌র সংজ্ঞা, অশ্লীল প্রকাশভঙ্গির মধ‍্যে‌ও কোনো Redeeming feature আছে কিনা, এ জাতীয় তাত্ত্বিক আলোচনা‌ বেশ লেগেছে। আবার অমন বিষয়ে টানা নিবন্ধের মতো লেখা আশুতোষের ”নিষিদ্ধ ব‌ই” একটা‌না পড়তে পারিনি। 

    ঐসব লেখায় সমান্তরাল বিষয়গুলি প্রতিটি আলাদা ভাবে scholarly article হিসেবে পেশ করার উপযুক্ত। তবে সুনীল, নারায়ণের পাকা লেখা‌র সাথে তো আর আমার লেখা‌র তুলনা চলে না। আমার লেখায় অমন এ্যাকাডেমিক টোনে আলোচনা চলেও‌ছে অনেকক্ষণ ধরে। ফলে তা পাঠকের ভালো নাই লাগতে পারে। তবে ভালো/মন্দ লাগা ছাড়িয়ে ভেবেছিলাম কেউ হয়তো ঐসব বিষয়ে আরো কিছু সূত্র দেবে বা বিরোধিতা করবে। সেটা না দেখে একটু অবাক লেগেছে। 

    শান্তি‌নিকেতনে একবার সুনীল ও শক্তি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন কবিতা বিষয়ক ক্লাস নিতে। সুনীল কী বলবেন বিষয় ঠিক করে, পড়াশোনা করে গিয়ে ক্লাস‌রুমে লেকচার দিয়েছেন। ওনার ধারণা নিজে কবিতা লেখা আর কবিতা নিয়ে ক্লাস নেওয়া দুটো আলাদা ব‍্যাপার। শক্তির ধারণা কবিতা মঙ্গল‌কাব‍্য বা ইকনমিক্সের মতো ক্লাসে বসে আলোচনা‌র বিষয় নয়। কবিতা‌র জায়গা অনুভূতি‌র স্তরে। তাই শক্তি ছেলেমেয়েদের সাথে গাছের তলায় বসে বা মাঠে হাঁটতে হাঁটতে কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। 
     
    ভালো / খারাপের, পছন্দ / অপছন্দের বাইনারি নয় - দুজনের উপস্থাপনের আঙ্গিক ভিন্নভাবে ছাত্রছাত্রীদের প্রভাবিত করেছে। তাই হয়তো ব‍্যক্তিগত রুচিতে গ্ৰহণযোগ‍্য‌তার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট‌ভাবে কিছু বলা যায় না। তবে অধিকাংশ‌জনের যেটা পছন্দ হয় সেটা‌‌ই মান‍্যতা পায়। ক্ষীণস্বর চিরকাল‌ই ভীড়ে হারিয়ে যায়।
     
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ৩০ মে ২০২৪ ০০:১৪532491
  • স‍্যাম, সব ভালো লাগা না-লাগা কার্য-কারণ ব‍্যাখ‍্যা করে বুঝিয়ে দিতে পারব, আমি অত ধীমান পাঠক নই। আমি শুধু আমার পছন্দ-অপছন্দের সাধারণ অভিমুখ, স্বতঃপ্রবণতা জানিয়েছি। এবার, সেই জানানোর সাথে আপনার অনুভব না মিলতেই পারে। আমার কথা এখানেই শেষ।
  • সমরেশ মুখার্জী | ৩০ মে ২০২৪ ১১:০৯532499
  • @ অমিতাভ,

    “সব ভালো লাগা না-লাগা কার্য-কারণ ব‍্যাখ‍্যা করে বুঝিয়ে দিতে পারব, আমি অত ধীমান পাঠক নই। … আমার কথা এখানেই শেষ।”

    আপনার মন্তব্যের প্রথম বাক‍্য প্রসঙ্গে বলি - আপনাকে বা কাউকে‌ই আমি কিছু ব‍্যাখ‍্যা করে বুঝি‌য়ে দিতে বলিনি - বরং আমি‌ই ব‍্যাখ‍্যা করেছি আমার ভাবনা। তাহলে কেন অমন দায়বদ্ধতা অনুভব করলেন? আর শেষ বাক‍্যটা লাগলো করণ থাপারের ইন্টারভিউ থেকে উনি‌জীর “দোস্তি বনে রহে, বাত খতম” বলে উঠে চলে যাওয়ার মতো।

    গাছ নিজে বলে না, সে কী, তাই ঐ বাগধারা প্রচলিত -  ফলেন পরিচয়তে। তেমনি আপনি কী ধরণের পাঠক তা আপনার নানা মন্তব্য থেকে কিছু ধারণা হয়েছিল। সাম্প্রতিক উদাহরণ - যদুবাবু‌র ভক্স পপুলিতে আপনার মন্তব্য (১.৫) - “সত্য, তাকে পাওয়া ইত্যাদি নিয়ে কথা এলেই আমার মিরোস্লাভ হোলুবকে মনে পড়ে যায়।”  
     
    কবিতা আমি বুঝি না। আমি গদ‍্যময়। তাই হোলুবের নাম‌ প্রথম শুনলাম আপনার মন্তব্যে। তেমনি জিব্রান, জয়েস, কাফকা, সার্ত্র, দেকার্তে, কান্ট, হেগেল‌, দান্তে … এসব নাম‌‌ও শুধু‌ই শুনেছি - গুরুতে নানা‌জনের আলোচনা‌য়। ঐ লেখাতেই আপনি কনডরসে-র উপপাদ্য বুঝতে চেষ্টা করলেন। তবু আপনার ধারণা‌ - আপনি ধীমান পাঠক নন‍। বেশ। 

    তবে বারংবার বলেছি ছাত্রজীবনে ১২ ক্লাশ অবধি ইংরেজি, বাংলা কোনো ভাষাই মন দিয়ে পড়িনি। তার ছাপ রয়ে গেছে পরীক্ষার ফলে ৩৭/৪২ %. এটা bragging নয় raw fact. সেই দীনতা কাটিয়ে উঠতে লেখ‍্য মাধ‍্যমে (লেখায়, মন্তব‍্যে) গুছিয়ে ভাবনা পরিবেশন করি। কারণ শুনেছি মনের ভাবনা গুছিয়ে ভাষায় প্রকাশ করা এক ধরণের Rich Cognitive Function.  

    প্রথাগত পরিসরে পড়াশোনা সীমিত বলে মুক্ত পরিসরে কিছু অচেনা লোকজনের সাথে মনখুলে আলোচনা‌ করে তাদের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে চাই। উদাহরণ - রঞ্জন রায়ের ট‌ই ফুগগা বাঈ নিয়ে গল্পের শেষটা কীভাবে হলে আমার ভালো লাগতো তাই নিয়ে আমার অভিমত মুক্ত‌কণ্ঠে জানি‌য়েছি। রঞ্জন রায় জানতে চাননি। 

    আসলে পড়াশোনা, জ্ঞান, বুদ্ধি কম বলেই হয়তো সর্বসমক্ষে নিজের ভাবনা অকপটে ব‍্যক্ত করতে পারি। তাতে মনে হয়না আমি কারুর দৃষ্টিতে ছোট হয়ে গেলাম। বলে না, অন্ধের কি বা দিন কি বা রাত্রি। তেমনি A fool has nothing to lose if he speaks his mind open just like a beggar has nothing to lose if he sleeps at the open.  আমি এই দর্শনে বিশ্বাসী।
     
    গুরুর ফোরাম ঋদ্ধসত্তা, মুক্ত‌মনাদের - এমনটাই আমার ধারণা। তাই এক্ষেত্রেও লেখা‌র আঙ্গিক - পাঠকের প্রতিক্রিয়া - এই সব নিয়ে কিছু  ভাবনা মুক্ত‌মনে আলোচনা করেছি‌লাম। অন্তিমে এ‌কটা Concluding Statement লিখেছি‌লাম - “তাই হয়তো ব‍্যক্তিগত রুচিতে গ্ৰহণযোগ‍্য‌তার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট‌ভাবে কিছু বলা যায় না।”। 

    তারপরেও আপনার ঐ মন্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে তাই ব‍্যর্থ হলাম।

    আপনার কথা আপাতত এখানেই শেষ হলেও আমার অন‍্য লেখায় যেখানে ইচ্ছে হবে মনখুলে মন্তব্য করবেন। আপনার ভাষা, আঙ্গিক মার্জিত। তাই যাই লিখুন তা কখনো মেনে নিতে না পারলেও মানে লাগেনা। 
     
    ভালো থাকবেন।

     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন