এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অথ পটেশ্বরী কথা

    ঝর্না বিশ্বাস লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২২ বার পঠিত
  • আজ পটেশ্বরী যখন ঝিমোচ্ছিল তখন আচমকা ওর মস্তিষ্কে ঢুকে গেল গল্পের অতি ক্ষুদ্র ছানারা...ঢুকেই তাদের দৌরাত্ম শুরু...একেকটা একেক দিকে লাফাচ্ছে। সামলাতে গিয়ে পটেশ্বরীর হাল, নাজেহাল। ওরা প্রত্যেকে কিছু বলতে চায়। কিন্তু আলাদা করে শোনার মত সময় ও ধৈর্য্য কোনটাই দেয় না পটেশ্বরী...
    রাগে অভিমানে ওরা মুখ ফুলিয়ে থিতিয়ে যায় ভেতরেই... তখন ওদেরই এক পুঁচকে ফস্কে গিয়ে লিখিয়ে নেয় কিছুটা...
    সেটাই নিয়ে এলো পটেশ্বরী...

    “অথ পটেশ্বরী কথা”


    গল্পটা যখন শুরু হচ্ছে, পটেশ্বরীর ক্লাস নাইন...
    সেভেন - এইটের সমস্ত খারাপ লাগা মিটিয়ে ভালো হবার প্রচেষ্টায় ও এখন একটু গল্প টল্প পড়ে...পড়ে কটা কবিতাও...আনন্দবাজার তখন ছাপত মন কেমনের কাহিনী...আর ওর কেবলই মনে পড়ে যেত সদ্য আলাপ হওয়া ছেলেটিকে...
    যাক, এ এক বছরে সেও নির্ঘাত ভুলে গেছে ভেবে মন ভালো করত পটেশ্বরী...ঠাকুমা তখন মাদুরে বসে একাই ছক্কা পুট। ওর খুব কাছের মানুষ ঠাকুমা...পিঠ ঠেকিয়ে বসে, চাল উলটে দেয়...আর রাগে গজগজ করতে করতে ঠাকুমার মুখে বাঙাল ভাষার বুলি ফুরফুর করে ওড়ে...পটেশ্বরী আবার সাজিয়ে দেয় গুটিগুলো...
    এমনটা রোজ রোজ হয়, ভেতর ঘরে চারটে মানুষ - তাও কেমন আলাদা হয়ে থাকে...
    নাইনে ওঠার পর থেকেই পটেশ্বরী দেখে মা-কে একটা দুধ সাদা গাড়িতে করে প্রায়ই নিয়ে যাওয়া হয়...বাবা যান সাথে, আসে সেজ মামাও...বেশ কিছুদিন মা আর বাড়ি আসে না...চিঠি লেখে হাসপাতালে বসে,
    - তোর দিদির খুব জেদ। এবার সেকেন্ড হলো কেন?
    বোন সে চিঠি দেয় পটেশ্বরীর হাতে অনেক অনেক বছর পর...মা তখন নেই, তবে চিঠিটা আছে। মায়ের হাতের স্পষ্ট লেখা -  হাসপাতালের আয়া মাসি আজ খুব লেটে এসেছে...সব লিখে রাখে মা...
    পটেশ্বরী সে চিঠি সামলে রাখে নিজস্ব ফাইলে...যেখানে হাত দিতে মানা আছে সকলের...
    স্মৃতির পুটুলি যেন... খুললেই ঝুপ্পুস অন্ধকার...


    সেদিনের অত বড় বাড়িটা আস্তে আস্তে দুই ভাগ হয়ে যায়। সাক্ষী থাকে উঠোন জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছটা...কত অত্যাচার সহ্য করেছে ও পটেশ্বরীর।
    পটেশ্বরী দেখে দুটো আলাদা ছাদ, ওর খুব ইচ্ছে হয় মাঝ বরাবর রাস্তা করে দেবে...
    কিন্তু সব ইচ্ছে তো আর ফল দেয় না...তাই ও সব বাক্সবন্দী করে মন দেয় পড়াশুনায়।
    এলেন বহু মাস্টারও...বছর এক পরপর তাদের বদল হয়। কারো সময়ের সাথে মেলে না, কারো শর্ত সপ্তাহে তিন দিন।
    তাহলে কি হুল্লোড় করেই কেটে যাবে?
    কিন্তু সে গুড়ে বালি। মামা তাঁর এক বন্ধুকে ধরে নিয়ে আসে, বিএসসি ফাইনাল দিয়েছে..
    সে মাস্টারও “পারব পারব” করে মাথা নাড়িয়ে চলে যেতেই পটেশ্বরীর মনে হয়, এবার থেকে আর যাই হোক বিজ্ঞানে সবাইকে টেক্কা দেওয়া যাবে। কিন্তু সে এক দীপাবলিতে নিজের হাতে রঙ মশলা ও তুবড়ি বানিয়ে উপহার দিয়ে যায় ছাত্রীটিকে...
    সেদিন সে তুবড়ি জ্বললও অনেকক্ষণ, তবে উনি পড়ানো ছেড়ে দিলেন।
    পটেশ্বরী চুপ থেকে আরো চুপ হয়ে যায়...নজর এখন লম্বা একটানা রাস্তাটায়...
     

    এরপর গল্পকে ঘুরতেও হলো সময়ের চালে...একটু পিছিয়ে পড়ল পটেশ্বরী। তখন ঘুড়ি ওড়ানোর দিন...বৃষ্টি হব হব-তে ফড়িংএর ছুটোছুটি... বড় সুন্দর সেই ছেলেবেলা, বড় তাড়াতাড়ি হারিয়েও যায়...
    এর মাঝে দেখা দেন কিছু গানদিদির মতো মানুষ যারা অভয় দেন, হবে হবে – চালিয়ে যা... যদিও মন বসে না পটেশ্বরীর।
    কিতকিত, এক্কা দোক্কার দিন কাটতে না কাটতেই ওদের পাড়ার সব টালির ছাদগুলো ক্রমশ পাকা হতে শুরু করে। আর মাঠগুলো কেমন ছোট হয়ে যায় অনেকটা। তখন ছাদে ছাদে কথা বলে শুধু। আর মানুষেরা একে অপরের মুখ দেখে অনেক অনেক দিন পর...
    সবার বাড়ির দেওয়ালগুলো উঁচু হতে থাকে...এ বাড়ির নুন-হলুদ-ঝাঁঝ আগে জানালা দিয়েই পৌঁছে যেত ও বাড়িতে, এখন পাহাড় প্রতীম এক ইঁটবাক্স যেন...ইচ্ছে হলেও সরানো যায় না...
    তখন থেকেই সম্পর্ক বুঝতে শুরু করে পটেশ্বরী... এক কঠিন জাদুবাক্স যা জুড়লে শুধুই মায়া বাড়ে।
    পটেশ্বরীকে কাব্যিক করে তুলতে সে এক মাস্টারই যথেষ্ট...বাংলায় এমএ এক সাইকেল বাবু। মা-বাবার পরেই তাঁর হাতখানা মাথায় পড়তে পটেশ্বরী মানুষ হতে শুরু করে। এখন আর ফড়িং এর লেজে সুতো বেঁধে ওড়াওড়ি দেখে না । বরং খাঁচায় আটকানো টিয়া পাখিকে উড়িয়ে দিতেই আনন্দ।
     

    গ্রামারে ভুল ও অপটু ইংরেজিতে, তবু চিঠি লেখা চাই। চিঠির অসুখ বা অসুখের চিঠি দুটোতেই বেশ ভালোভাবে আক্রান্ত হয় পটেশ্বরী। কিন্তু সে চিঠির গন্তব্য নেই, তাই জমতে জমতে পাহাড় হতেই সে বুঝল বৃথাই সময় নষ্ট, অন্য কিছু হোক...
    বাড়ির নারকেল গাছগুলোর মতন তখন বাড়তে লাগলো পটেশ্বরী। বয়স বাড়লে স্বভাবও বদলে যায় তাই ধীর স্থির ভাবগুলো তাঁর ক্রমে ক্রমে শেখা...এখন আর ঝপাং করে রাগ করতে পারেনা সে...বরং অন্যের রাগ থামাতে তাকে নিজেই ঝুঁকে যেতে হয় অনেক - অনেকটা।
    ক্লাস তখন টেন। হাতে লাল মলাটের টেস্ট পেপার, গত পাঁচ বছরের একসাথে নিয়ে ছাদের ঘরে পড়াতে আসতেন মনোরথ স্যার। একেই তাঁর সারাদিনের ক্লান্তি। সব ছেলেপুলে পড়িয়ে সবার শেষে এ বাড়িতে। হুকুম হত অনেক। এ এক অন্য অভিভাবক যেন মাথার ওপর।
    বাবা তখন ব্যস্ত ভীষণ – হাসপাতাল হাসপাতাল...


    মায়েরা কখন খায়, কখন ঘুমোয় কেউ জানেনা। তাদের আভ্যন্তরীন হার্ডডিস্কে লুকনো থাকে অনেক ছোট ছোট চিপস যা দিয়ে সহজেই তারা মেপে নিতে পারেন ছেলে মেয়েদের কম বেশি প্রয়োজনটা।
    পটেশ্বরীর পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। পটেশ্বরীর মা ছিলেন সুপার উইমেন, যিনি ঘর ও বাইরে দুটো সমান ভাবে সামলাতেন। সেই চঞ্চল মানুষটাকে এভাবে ঝিমিয়ে পড়তে দেখে খারাপ লাগত পটেশ্বরীর। কিন্তু এই অসুখের নাকি প্রতিকার নেই। দেখতে দেখতে সময় যায়। সারা বাড়িতে তখন ওষুধ ওষুধ গন্ধ। কিছুতেই ভালো হচ্ছে না মায়ের শরীর... পটেশ্বরীর স্বপ্নগুলো আস্তে আস্তে গুটিয়ে যায় সব। এগারো ক্লাসে উঠতে না উঠতেই মায়ের অসুখ হয় চরমে।
    পটেশ্বরী ঠাকুর মানত খুব...মানত জ্যোতীষবিদ্যাও...কিন্তু সেই সব কিছু  মিথ্যে করে ফেব্রুয়ারীর এক শেষ দিনে ফুল সাজানো গাড়িতে মা চলে গেল। আর সেই দিন থেকেই এক ঝটকায় বয়স বেড়ে গেল পটেশ্বরীর। ঘুরে গেল ভাগ্যের চাকাও বিপরীতে...

    “যা পেয়েছি কেন তা চাই না, যা চেয়েছি কেন তা পাই না”...
     
    - ঝর্না বিশ্বাস
     
    [ছবি- আর্ন্তজাল]  
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন