এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বারুইপুরে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিভবন

    Surajit Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ নভেম্বর ২০২২ | ৮৭ বার পঠিত
  • সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, এযাবৎকালের বাংলা সাহিত্যের অগ্রণী মনীষীদের অন্যতম এক ঋষি। যিনি বাংলা সাহিত্যকে যাঁরা আঁতুরঘর থেকে টেনে এনে নিজেদের চেষ্টায় প্রাপ্তবয়স্করূপে রূপান্তরিত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি সরকারী চাকুরীর পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেছেন আজীবন। বারুইপুরের প্রশাসনিক দিকের কথা বলতে গেলে বলা যায় যে, ১৮৫৮ সালে প্রথম বারুইপুর মহকুমা গঠিত হয়। আবার ১৮৮৩ সালে সেই মহকুমা মিশে যায় আলিপুর মহকুমার সঙ্গে। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবার গঠিত হয় বারুইপুর মহকুমা, যা এখনও চলছে। বারুইপুরে আমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে দেখতে পাই একই সঙ্গে মহকুমা শাসক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর, রেজিস্টার এবং পুলিশের অধিকর্তা হিসেবে ১৮৬৪ সালের ৫ মার্চ তারিখ থেকে ১৮৬৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর তারিখ পর্যন্ত্য, এরপরে বদলি হয়ে তিনি ১৫ই ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে যোগদান করেন। মাঝখানে অবশ্য কিছুদিন ডায়মন্ডহারবার এবং আলিপুরে বদলি হয়েছিলেন।

    জনশ্রুতি ছিল যে, বারুইপুর প্রধান ডাকঘর প্রাঙ্গনে যে প্রাচীন বাড়ীটির ভগ্নাবশেষ ছিল, সেটি বঙ্কিমচন্দ্রের আদালত। এইখানেই তিনি বারুইপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে চাকুরী করাকালীন আদালত চালাতেন। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই বাড়ীটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে দুই রকমের মত পাওয়া যায়, যার প্রথমটি হলো, এই বাড়ীটিই ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের আদালত। বাড়ীটিতে বিচারকের বসার মতো বেদী ছিল, পিছনে লম্বা কুঠুরী ছিল, উত্তরের দেওয়ালে জেল-গরাদের মতো লম্বা লম্বা জানালা ছিল। আবার বহু প্রাচীনকাল থেকেই জায়গাটির উত্তরে উকিলপাড়া, উকিলদের সেরেস্তা এবং প্রাচীনকালে এই বাড়ীটির কাছেই ছিল বারুইপুরের জেলখানা। যেগুলো বাড়ীটি আদালত ছিল বা আদালতের একটি অংশ (কয়েদখানা) ছিল বলেই যে জনশ্রুতি তার পক্ষেই যায়। কিন্তু ১৯৮৪ সালে আলিপুর জেলা জজের রেকর্ডরুমে বারুইপুর আদালত সংক্রান্ত একটি প্রাচীন দলিল পাওয়া গেছে এবং আর একটি দলিল পাওয়া গেছে রামনগর কালিদাস দত্ত স্মৃতি সংগ্রহশালা থেকে। দলিল দুটিতে যে সিলমোহরের ছাপ পাওয়া যায় সেখানে স্পষ্ট লেখা, "মানিকতলা মুন্সেফী বিচারালয়। বারুইপুর চৌকি।" আলিপুর থেকে পাওয়া দলিলটিতে সাল হিসেবে লেখা ১৮৬২ আর রামনগর থেকে পাওয়া দলিলটিতে সাল হিসেবে লেখা ১৮৬৭। দুটি সিলমোহরের ছাপেই ব্রিটিশ রাজমুকুটের (ক্রাউন) ছবি। সুতরাং সাল হিসেবে দেখা যাচ্ছে কলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার (১৮৬২) সাথে সাথেই বারুইপুরে ইংরেজ সরকার আদালত প্রতিষ্ঠিত করেছিল। যেহেতু এখনও অব্দি পাওয়া নবুদে ১৮৬২ সালের আগের কোনো সিলমোহরের ছাপ পাওয়া যায়নি তাই বারুইপুর আদালতের প্রতিষ্ঠা হিসেবে ১৮৬২ সালকেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে মানিকতলা বলে বারুইপুরে কোনো জায়গা নেই অর্থাৎ কালের গর্ভে সেই নাম হারিয়ে গেছে। বর্তমানের পদ্মপুকুর নামক জায়গাটিতে কুলপি রোড - আমতলা রোডের তেমাথার পূর্বদিকে মানিকতলা বলে জায়গা ছিল বলেই জানা যায় শহরের প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে যেখানে শহরের প্রখ্যাত শল্য চিকিৎসক স্বর্গত অর্ধচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের ভিটা বা বাসস্থান ছিল। সম্ভবতঃ সেইখানেই বারুইপুরের প্রথম মুন্সেফী আদালত কাজ করতো। সুতরাং বারুইপুর প্রধান ডাকঘর প্রাঙ্গনে যে বাড়ীটির ভগ্নাবশেষ পাওয়া যায় সেটি বঙ্কিমচন্দ্রের আদালত ছিল বলে অকাট্য প্রমান নেই। আবার জনশ্রুতি বা পারিপার্শ্বিক প্রমানগুলোকেও (বাড়ীটির কয়েদখানার আদল, বিচারকের বসার জন্য বেদীর মতো জায়গা, উত্তরের বহু প্রাচীন উকিলপাড়া, উকিলদের সেরেস্তা, প্রাচীনকালের জেলখানা) অগ্রাহ্য করার মতো অকাট্য প্রমান নেই।

    মানিকতলার সঠিক অবস্থান সম্পর্কে কোনো নবুদ বা প্রমান পাওয়া যায়না। আবার সেই সময়ে নিম্ন আদালত দুই ধরণের ছিল, যা আজও আছে, মুন্সেফ আদালত এবং ফৌজদারি আদালত। মুন্সেফ আদালত নিম্নতম ছিল এবং তা পরিচালনা করতেন মুন্সেফরা আর ফৌজদারি আদালত মহকুমা সদরে অবস্থান করতো এবং পরিচালনা করতেন ম্যাজিস্ট্রেটরা। বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন মহকুমা শাসক এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর, সুতরাং তিনি মুন্সেফী আদালতে বসবেন এবং বিচার করবেন এটা কষ্টকল্পনা। দলিল যা পাওয়া গেছে সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের সই নেই, ফলে বঙ্কিমচন্দ্রের আদালতের ক্ষেত্রে সেইগুলো অকাট্য প্রমান বলে ধরে নেওয়া যায়না। আলিপুরের রেকর্ডরুম থেকে পাওয়া ১৮৬৭ সালের একটি নথিতে (কেস নং ৫৬০/১৮৬৭, বাদী কার্তিক মন্ডল বনাম বিবাদী নবীনচন্দ্র ঘোষ, বাদীপক্ষের উকিলবাবু ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ ঘোষাল আর বিবাদীপক্ষের উকিলবাবু ছিলেন রামগোপাল চক্রবর্তী) দেখা যায় মুন্সেফ ছিলেন হরিনারায়ণ রায় এবং মামলার প্রত্যয়িত নকলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সই করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সুতরাং বঙ্কিমচন্দ্র মুন্সেফী আদালত চালাতেন না এটা পরিষ্কার। আবার অনেকের মতেই সেইসময়ে মানিকতলা মুন্সেফ আদালতে দেওয়ানী ও ফৌজদারি দুই ধরণের মামলাই হতো। সুতরাং দেওয়ানী ও ফৌজদারি আদালত একই বাড়ীতে অর্থাৎ স্বর্গত অর্ধচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ীতে অবস্থান করতো এটা ধরে নিলে বারুইপুর প্রধান ডাকঘরের প্রাঙ্গনের প্রাচীন বাড়ীটির ধ্বংসাবশেষকে গঠনমূলক স্থাপত্যের কারণে এবং পারিপার্শ্বিকতার কারণে আদালতের অংশ ছাড়া অন্যকিছু বলা যুক্তিযুক্ত নয়। আবার মুন্সেফ আদালত ও ফৌজদারি আদালত আলাদা জায়গায় অবস্থান করতো এর স্বপক্ষে বা বিপক্ষেও কোনো নবুদ পাওয়া যায়না। স্থানীয়ভাবে এই বাড়ীটি পুরোনো ডাকঘর হিসেবেও পরিচিত ছিল। কিন্তু সেই গঠনমূলক স্থাপত্যের কারণেই বাড়ীটিকে ডাকঘর বা ডাকঘরের অংশ বলা যায়না। অকাট্য প্রমান কোনক্ষেত্রেই পাওয়া যায়না, সবটাই কিছু কিছু তথ্য এবং নবুদের ওপর ভিত্তি করে অনুমান আর জনশ্রুতি।

    আবার ১৯৮৪ সালে "মানিকতলা মুন্সেফী বিচারালয়। বারুইপুর চৌকি"-এর নবুদ পাওয়ার আগে অব্দি মানে সুদীর্ঘকালের জনশ্রুতি ছিল যে, এই বাড়ীটিই ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের আদালত। সুতরাং জনশ্রুতিতে বাড়ীটি আদালতের অংশ (কয়েদখানা ইত্যাদি) থেকে পূর্ণাঙ্গ আদালতের রূপ পেয়েছিল পারিপার্শ্বিকতা ও স্থাপত্যের কারণেই, সেটা হওয়ার সম্ভাবনাও ফেলে দেওয়া যায়না। আর বর্তমানকালের পরিস্থিতি ছিল, বাড়ীটি পুরোপুরি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছিল এবং একে পূর্বের রূপে ফেরানো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। সেইকারণেই ডাকবিভাগ সেই জায়গায় নতুন একটি স্থাপত্য গড়ে তুলেছে সাম্প্রতিককালে। কোনোপক্ষের তথ্যের সমর্থনেই কোনোরকম অকাট্য প্রমান না থাকায় জনশ্রুতিকে সন্মান জানিয়ে ডাকবিভাগ সেই জায়গায় নতুন বাড়ী গড়ে তুলেছে যেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের বিভিন্ন পর্ব তুলে ধরা হয়েছে ছবি ও লেখার মাধ্যমে। বঙ্কিমচন্দ্রের একটি আবক্ষ মূর্তিও বসানো হয়েছে সামনের অংশে। বারুইপুরের মহকুমা শাসক, ফৌজদারি আদালতের বিচারক এবং পুলিশের অধিকর্তা হিসেবে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের অবদানকে সন্মান জানিয়েছে ডাক বিভাগ। তাঁরই স্মৃতিতে নতুন বাড়ীটির নাম দেওয়া হয়েছে "বঙ্কিম ভবন"।



























  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন