এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নবমীর প্রার্থনা

    Himadrisekhar Datta লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ অক্টোবর ২০২২ | ৬৯ বার পঠিত
  • যেও না রজনী আজি লয়ে তারাদলে....

    কবি সেই কবে এই লাইন লিখে গেছেন, আপামর বাঙালির মনের কথা ভেবে। আজ সেই নবমী তিথি। সেই ছোট বা যুবা বেলা আজ আর আমার নেই। সময় সাগরের তীরে বসে মুঠো করে বালি ধরে রাখার চেষ্টা যতই করো না হাত খালিই থেকে যাবে। হাত খালি হলেও মনের মধ্যে স্মৃতি নামে এক বিষম বস্তুর অবস্থান, সে সময়ের সাপেক্ষে পুরোনো ফেলে আসা দিনের মুহুর্তগুলি, মনের পর্দায় সিনেমার মত ফুটে ওঠে। একদা যে ছবি রং, খুশী, বাক্যে আর অনুভূতিতে ভরপুর ছিল, এখন তা সাদাকালো আর নির্বাক। 

    সেই ছোট বেলা থেকে পুজোর সমস্ত স্মৃতিগুলো এবারেও মনের মধ্যে ঝাঁকি দর্শন দিয়ে গেল। আমার ক্লাসের বন্ধু দেবাশিষদের বাড়িতে দুর্গাপূজা হত। আমি, আমার ভাই, অন্য বন্ধুরা সকলে তাতে যোগ দিতাম। অঞ্জলি, খাওয়া দাওয়া, দশমীর প্রণাম আশীর্বাদ সব যেন কোন এক সাজানো অর্কেস্ট্রার মত পর পর নিয়ম মেনে বেজে যেত। সেই গানের শুরু হত, মহালয়ার দিন ভোর চারটেয়। একটা সকাল, একটা ভোর, ঠিক তার আগের দিনের ভোর থেকে, একদম আলাদা কি করে যে মহালয়ার দিন হয়ে যেত, তা তখন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারতাম না। আজও তার সবটা বুঝি না, তবে, এই বাৎসরিক পুজোর আগমনীতে, মনের তারে, কোথাও একটা সুরের টান পরে, সে কথা বাঙালি ছাড়া আর কেউ বোধহয় তেমন করে বুঝবে না। কিন্তু এ সত্যি। 
    সেই সব আনন্দের দিনগুলি এখন আর তেমন প্রবলভাবে আমার মধ্যে অনুঘটকের কাজ করে না। এখন বিক্রিয়া হয় অনেক ধীরে ধীরে। কখনও হয়ই না তেমন। কেবল বয়েস বেড়ে গেছে বলে? না, আসলে মনটা বদলে গেছে। মন এখন নানা কারণেই ভারাক্রান্ত থাকে - কাজের অকাজের সব কিছুর দিন ফুরিয়ে গেলেও, মনের মধ্যে আশা ইচ্ছা স্বপ্ন কল্পনা, এগুলি তেমন ভাবে হ্রাস পায় নি। কেন? খুব টনটনেভাবে বুঝি, এগুলিকেও চির বিদায় দেবার সময় হয়ে গেছে। তার জন্য মনের প্রশিক্ষিত প্রকৃত জ্ঞানলব্ধ স্থিতি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু জীবনকে চালিয়ে নিতে গিয়ে, সব শিখেও কিছু আসল সঠিক বিদ্যা অনুশীলন করা হয়ে ওঠে নি। তাই তো শরীর আর মন দুইই ভারাক্রান্ত থাকে।

    কোন বিশেষ অনুষ্ঠান বা গ্যাদারিং কচ্চিত কদাচিত, সেই ভার কিছুটা কখনও কখনও সামান্য হলেও লাঘব করে। জীবনের সামনে এক নতুন দর্শন খুলে যায়। 

    চল্লিশ বছর পরে এই প্রথম বছর কলকাতায় পূজো কাটালাম। মহালয়ার সন্ধ্যায় আমাদের স্কুলের বন্ধুরা যারা রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে, আজ থেকে ৪৯ বছর আগে, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার মাধ্যমে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে গেছিলাম, তারা জনাকয়েক মিলে, আমাদের সেই সময়কার দুজন মাস্টারমশাইকে সম্বর্ধনা দেওয়া হল। ছোট অনুষ্ঠান, কিন্তু পুরোনো সব বন্ধুদের সাথে দেখা হল, আর মরচে পড়ে যাওয়া কত স্মৃতির জানালার ভুলে থাকা লোহার কপাটগুলি এক ধাক্কায় খুলে গেল। পঞ্চাশ বছর আগেকার সেই পৃথিবীটা থেকে, এক ঝড়ের মত, সেই সব ঘটনা আর দিনগুলো আজকের বুড়ো হয়ে যাওয়া জীবনের তটরেখায় আছড়ে পড়লো। এমন একটা সন্ধ্যা, অনেক টাকার বিনিময়েও কিনতে পাওয়া যায় না পৃথিবীর কোনো হাটে। আমরা হুড়োহুড়ি করে দুলালদা আর বোলানদা'র সাথে ছবি তুললাম। এক ঐতিহাসিক মুহুর্ত বৈকি। আজকে স্যারেদের এইসব ছাত্ররাও সকলেই রিটায়ার্ড - সিনিয়র সিটিজেন। এমন ঘটনা রোজ রোজ ঘটে না। মাথার ওপরে গুরুদ্বয়কে পেয়ে, আমরা যেন নিমেষেই সেদিনের মত ছাত্র হয়ে গেলাম। সময়কে উলটো দিকে টাইম মেশিন হয়ত কোনদিন নিয়ে যেতে পারবে, কিন্তু তেমন মেশিন ছাড়াই, আমরা পিছিয়ে গিয়ে ঘুরে আসলাম ষাটের দশকের সেই স্কুলের দিনগুলোতে। বেঁচে থাকতে এমন ঘটনার সাক্ষী হব এমন তো কলকাতায় পৌঁছেও ভাবি নি। 

    তেমনই ভাবে, দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ পাড়ায়, এক সার্বজনীন দুর্গা পূজোয়, আমার বিশেষ আত্মীয়ের মাধ্যমে জুড়ে গেলাম, দুটো দিনের জন্য। আমেদাবাদে থাকার সময় '৯৭ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত চাঁদখেড়া বেঙ্গল কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনে প্রত্যক্ষ ভাবে পূজোর কাজে কর্মে জড়িত থাকতাম। সেটা কমিটির ভেতরে বা বাইরে থেকেও।   তেমনই ভাবে হঠাৎ করে যে টালিগঞ্জের পুজোয় জুড়ে যাব ভাবি নি। ফিরে পেলাম সেই পুরোনো অনুভূতি আর খুশি। 

    জীবনের হাল যার হাতে ধরা, ঠিকানায় পৌঁছে দেবার আগে এই পৃথিবীর আরও কত শত ঘাট ঘুরিয়ে নিয়ে কবে যে দশাশ্বমেধ ঘাটে গিয়ে নোঙর ফেলে দেবেন, তা সে কেবল সেই পাটনীই বলতে পারে। আমার তো শুধু ভেসে যাওয়াই কাজ। ভাল করে ভেসে বেড়ানোর জন্য একটাই করণীয়, ভার কম করা। আজকের নবমীতে, এই প্রতিজ্ঞা করি - মনের ভার লঘু করতে, এখন থেকে দৃষ্টিকে ভিতরের পানে যেন ঘুরিয়ে দিতে পারি। মা দুর্গার কাছে, তার যাবার বেলায়, এই প্রার্থনা জানাই।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া দিন