এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অসুরপক্ষের বিনাশ

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ অক্টোবর ২০২২ | ১০৭ বার পঠিত
  • মনে  পড়ে যায় শৈশবের সেই দিনগুলি, আমার উমা দিদির আঙুল ধরে হেঁটে যাওয়া এক মণ্ডপ থেকে আরেক মণ্ডপে পায়ের ফোস্কা নিয়ে, কিন্তু মুখে লেগে থাকত কিছু হয়নি অভিনয়ের প্রলেপ। তবে ফিরতে হোতো উমা দিদির ঘাড়ে চেপেই, ফাঁকি কি দেওয়া যায় উমা দিদির চোখকে। মনের আলমারিতে নাড়া দিয়ে স্মৃতির দুয়ারে ভেসে আসে সেই ছোটবেলার দুষ্টুমির কথা - অঞ্জলির ফুল ছুঁড়ে দেওয়ার কথা,  শিউলির পাপড়ির লেখা  সেই মেঘবালিকার হলুদ্রাভ পিঠে লেগে থাকার কথা, পিছন ফিরে সেই আড়চোখে তার মিষ্টি চাউনির কথা।
    মনে পড়ে শরতের ঘুঘু ডাকা দুপুরের একফালি নরম রোদে বসে, মায়ের পাকা চুলে বিলি কাটতে কাটতে দিদি মিঠে বুলিতে শোনাত পুস্পাঞ্জলি, ভোগের খিচুড়ি আর কত সুখের প্রতিমা দর্শনের গপ্পো – আর তার সাথে আমার দুষ্টুমির গপ্পো। আমাদের বাড়ির পাশের বড় মাঠে হবে আজও যাত্রাপালা, বিদ্যাসাগর। শুরু হবে অনেক রাতে, দশটার পর। আগেভাগেই দিদি বুদ্ধি করে নিয়ে নিত মায়ের অনুমতি। গুনগুনিয়ে গাইতে থাকত  কবিগুরুর গান, “আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা /  গেঁথেছি শেফালিমালা। /  নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে /  সাজিয়ে এনেছি ডালা। / এসো গো শারদলক্ষ্মী,  তোমার / শুভ্র মেঘের রথে, / এসো নির্মল নীল পথে ----“
    মনে পড়ে ছোটোবেলায়  দিদিকে যখন প্রশ্ন করতাম, সবাই বলে অসুরের রক্ত যেখানেই  পড়ে আবার একটা অসুরের জন্ম হয় - সেটা কী ? দিদি তখন বোঝাত, ‘দুর্গা’মা আমাদের অসুরবিনাশিনী। মানে সমস্ত অসুরদেরকে বধ করেন। আসলে অসুরের নিবাস আমাদের মধ্যেই। আমাদের কামনা, বাসনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদমাশ্চর্য ও অহংকার এক একজন অসুর। মা এদেরকেই বধ করেন। রক্ত যেখানে পড়ছে, সেখানেই এক একজন অসুর সৃষ্টি হচ্ছে। এই রক্তবীজ অসুরগুলি হলো আমাদের কামনা, বাসনা, লোভ, মোহ, অহংকার। একটা কামনা পূর্ণ হলে, আমরা আরও লোভী হয়ে উঠি। মোহগ্রস্ত হয়ে আর একটি বাসনার উদ্ভব হয়। ধীরে ধীরে মানুষ লোভ, ক্ষমতার বশবর্তী হয়ে অহংকারী হয়ে ওঠে। এর নিবৃত্তি হয় না। এটাকেই রক্ত বীজ অসুরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কামনা-বাসনা-লোভ-মোহ এইগুলির নিবৃত্তি হলে রক্ত বীজ অসুরেরও নাশ হয়ে যাবে। দুর্গা’মা প্রতি বৎসর এসে আমাদের জাগিয়ে দিয়ে যান, সাধনার দ্বারা আমাদের এই আসুরিক বৃত্তিগুলিকে নাশ করতে। তাইতো মাকে বলা হয় দেশমাতৃকারূপিণী সৃষ্টি - স্থিতি - সংহারকারিণী 'দেবী দুর্গা'।‘
    দিদি আরও বলত, ‘ত্রেতা যুগে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম দশমীর দিনেই দশানন রাবণকে বধ করেছিলেন। সনাতন মতে জ্ঞান, সম্পদ এবং শক্তির প্রতিক নারী। পুরাণ অনুযায়ী, ধরায় অসুরদের অত্যাচার বাড়লে এই তিন শক্তির মিলিত রূপ থেকে জন্ম নেয় দেবীদুর্গা। দশভুজা বধ করেন মহিষাসুরকে।‘
    উমা দিদির কাঁধে চড়ে দুই হাতে গলা জড়িয়ে খিলখিল করে হেসে বলতাম, ‘যেমন তুমি আমার দুগ্গাদিদি, তাই না দিদি ! তুমি যেমন রক্ষা করো আমাকে সব বিপদ থেকে।‘ উমাদিদি মুখ ঘুরিয়ে ফিক করে একটা হাসি দিত। কী মিষ্টি হাসি দিদির, প্রাণটা জুড়িয়ে যেত একদম। বড় হয়ে যখন পড়লাম ‘পথের পাঁচালি’ দুই চোখ ভাসাতে ভাসাতে, জানতে পারলাম আমাদের সবারই আছে দুগ্গাদিদি কিম্বা দুগ্গা’মা। তারা আছে আমাদের আসেপাশেই, সবসময় রক্ষা করতে তাদের ভাই অথবা বাবা কিম্বা স্বামীকে।
    বড় হয়ে জানতে পারলাম, পিতৃপক্ষ হল আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের অব্যবহিত পূর্বের কৃষ্ণপক্ষ। দেবীপক্ষ মহালয়ার প্রতিপদ থেকে শুরু এবং কোজাগরি পূর্ণিমা পর্যন্ত। দাদুর থেকে শৈশবে জেনেছিলাম পক্ষ দুইটি – কৃষ্ণপক্ষ আর শুক্লপক্ষ। কিন্তু আজকাল ভাবতে বাধ্য করায়, পক্ষ কী এই দুইটিতেই সীমাবদ্ধ ? পক্ষ তো এখন অনেক – প্রথমপক্ষ, দ্বিতীয়পক্ষ, মিত্রপক্ষ, বিরোধীপক্ষ, সরকারপক্ষ, বিপক্ষ, আরও অনেক। আর মানুষের এক পক্ষ থেকে আরেক পক্ষে স্থানান্তর, এ যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক সংসারের বাজার করার পর্যায়ে। যেখানে বেশি সুবিধা প্রাপ্তির আশ্বাস, সেই পক্ষের দিকেই হেলে যাওয়া – যোগদান করা। কোনো ন্যায়-নীতির বালাই নেই। কে যে পক্ষে, আর কে যে বিপক্ষে – বোঝাই দায়। এ নিয়েই চলে টানাটানি, আর পাইয়ে দেওয়ার হিসেব। চলে দুর্নীতি, টাকার খেলা, ক্ষমতার খেলা। আর সাধারণ মানুষ এই চাপে, গোলকধাঁধায় পড়ে হয় বিপর্যস্ত। 
    কিন্তু যে অনুভূতি আসে হৃদয়ে পিতৃপক্ষ আর দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেটি হচ্ছে আর একটি পক্ষের আবির্ভাব। যে আবার কৃষ্ণপক্ষ আর শুক্লপক্ষ’এর মতোই ঘুরেফিরে আসে বারবার। আবার অনেকসময় শেষ হয়না এই পক্ষকালের পরিসীমা পনেরো দিনেও। ছোটবেলায় দিদি এবং গুরুজনেরা যা শিখিয়েছিলেন মনে হয় সব যেন ঠিক নয়। দুর্গা’মা যতই চেষ্টা করুন আমাদের এই আসুরিক বৃত্তিগুলিকে নাশ করতে, ঘুরেফিরে আবার আবির্ভাব হয় কামনা, বাসনা, লোভ নামক আসুরিক বৃত্তিগুলি আমাদের মধ্যে। যখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে মোরোদাবাদে ধর্ষিতা কিশোরীর শরীর, বেরেলির গণধর্ষণের দৃশ্য, লখিমপুর খেরির ঘটনা, হাথরস-উন্নাও-নির্ভয়া-হাসখালি-বগটুই এবং আরও অনেক কাহিনি এবং তার সাথে জুড়ে যায় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির সংবাদ, তখন মনের আঙিনায় একটাই প্রশ্ন জেগে ওঠে – হয়েছে কী আমাদের অসুরপক্ষের বিনাশ প্রকৃতপক্ষে ?  
    বলিউড তো আমাদের এই শতাব্দীতে কম নারীকেন্দ্রিক সিনেমা উপহার দেয়নি, যেন দুর্গা’মায়েরই আবির্ভাব এক একটি সিনেমাতে। কহানী, থপ্পড়, মর্দানি, পিঙ্ক, এন এইচ টেন এবং আরও অনেক। প্রত্যেকটি সিনেমাতেই নারীর আবির্ভাব মা দুর্গা রূপেই। বিনাশ করতে, নির্মূল করতে আমাদের মধ্যেকার আসুরিক প্রবৃত্তিগুলিকে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যি ঘটনার অবলম্বনে দেখানো হয়েছে রেইড। কিন্তু তাও হয়না আমাদের শিক্ষা। বিনাশ হয়না আমাদের কামনা-বাসনা-লোভ-মোহ। দুর্নীতি যেন ঢুকে রয়েছে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
    দেবীপুজোর মুখে প্রশ্ন , কবে হবে এই অসুরপক্ষের বিনাশ। এই পক্ষকে কী চিরতরে বিসর্জন দেওয়া যায় না মূর্তিপ্রতিমা বিসর্জনের সহিত ? পারিনা কী আমরা আমাদের এই আসুরিক বৃত্তিগুলির নির্বংশ করতে স্থায়িভাবে ? চেষ্টা করে দেখি না কিছুদিনের জন্য এই রাজনৈতিক খেলা, রাজনীতি এবং দুর্নীতিযুক্ত লোকগুলিকে সরিয়ে দিতে আমাদের মনের থেকে। শুদ্ধি করি আমাদের নিজেদেরকে। ডুব দিয়ে আসি একটা পুকুরে, গঙ্গায় মূর্তিপ্রতিমার বিসর্জনের সহিত। দমিত করি, ভাসিয়ে দিই আমাদের আসুরিক বৃত্তিগুলিকে।  দুর্গা’মাকে লাভ করতে হলে অসুরকে অর্থাৎ পাশবিক, স্বার্থপর চিন্তাগুলোকে ধ্বংস করতে হবে আমাদের। তবেই মায়ের কৃপা পাওয়া যাবে। তাঁর কৃপা পেলেই ঋদ্ধি, সিদ্ধি, বিদ্যা, ধন অর্থাৎ সব ইচ্ছা আমাদের পূরণ হবে।

     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন