এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ

  • ভারতের ‘স্বধর্ম’ কী?

    যোগেন্দ্র যাদব
    আলোচনা | সমাজ | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৫১৯ বার পঠিত
  • ছবি - র২হ


    “ভারতের স্বধর্মের ওপর বিধর্মী হামলা বন্ধ করার একটি প্রয়াস হিসেবেও আমরা ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’কে চিহ্নিত করতে পারি।”

    স্পষ্টতই, শুরুর এই বাক্যটি অধিকাংশ মানুষের কৌতূহল মেটায় না। বরং উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন বেশি আসতে থাকে।

    ভারতের স্বধর্ম কী? ব্যক্তি বা বর্ণের স্বধর্মের কথা আপনি শুনেছেন। কিন্তু দেশেরও কি স্বধর্ম থাকতে পারে? স্বধর্মের মতো একটি শব্দ শুনলে কিছু লোক আতঙ্কিত হয় যে এটি একটি জাতীয় ধর্মের মতো কিছু। কিছু দেশে ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম সরকারিভাবে স্বীকৃত। তার আদলে কিছু মানুষ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাইছেন। তাহলে ভারতের স্বধর্মের ভাবনা কি কোথাও এই বিষয়টিতেই ইঙ্গিত করছে? যাই হোক, এখন প্রশ্ন, ভারতের স্বধর্ম কোথায় পাব? এটা কে ব্যাখ্যা করবে? আসুন ভগবদ্গীতা দিয়ে শুরু করি। ধর্মের ধারণাটি এই গ্রন্থ থেকে শুরু হওয়ার কারণে নয়। বরং ভগবদ্গীতা বৈদিক ঐতিহ্য এবং বৌদ্ধ প্রতিস্পর্ধার মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে দেশীয় সভ্যতার কিছু মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়।

    গীতার এক প্রসিদ্ধ শ্লোক: “শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ / স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ” (ভগবদ্গীতা ৩. ৩৫)। অর্থাৎ, অন্য সৎকর্মশীলের ধর্মের চেয়ে নিজের ধর্মই সর্বোত্তম। যদি সদগুণের অভাব থাকে, তাহলেও। নিজের ধর্মে মরে যাওয়াও কল্যাণকর। অন্যের ধর্ম গ্রহণ করলে ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে। স্পষ্টতই, এখানে ধর্ম মানে মজহব বা রিলিজিয়ন নয়। এটি হিন্দু, ইসলাম বা খ্রিস্টান ধর্ম বোঝাচ্ছে না। এগুলোকে সম্প্রদায় বলা উচিত। এখানে ধর্ম হল সেই বিষয়, যা ধারণ করার যোগ্য। যা নৈতিক।

    একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট করা দরকার যে, ধর্মের এই ব্যাখ্যা ব্রাহ্মণ্যবাদী নয়। অবশ্য, ভগবদ্গীতায় বলা স্বধর্মের কথা ব্যবহার করে বর্ণবাদী গোঁড়ামিকে শক্তিশালী করতে দেখা যায়। কিন্তু প্রথম থেকেই ধর্মের ব্রাহ্মণ্য ব্যাখ্যা ও সাধকদের ব্যাখ্যার দুটি ধারা একসঙ্গে চলে। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম যেকোন একটি জাতি, সম্প্রদায় বা পরিস্থিতির সাথে যুক্ত। কিন্তু সাধকদের ঐতিহ্য ধর্মকে একটি সাধারণ নৈতিক আদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অশোকের শিলালিপির ‘ধম্ম’ এই ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত। ভারতের স্বধর্মের ব্যাখ্যাকে আমাদের সভ্যতার এই মহৎ স্রোতের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

    ‘স্বধর্ম’ হল দুটি উপাদানের সঙ্গম: ‘স্ব’ এবং ‘ধর্ম’। ‘স্বার্থ’-র মধ্যে ‘স্ব’ আছে কিন্তু ‘ধর্ম’ নেই। অন্যদিকে ‘সর্বধর্ম’-তে ‘ধর্ম’ আছে, কিন্তু ‘স্ব’ নেই। স্বধর্মের একটি উপাদান ধারককে নির্দেশ করে এবং অন্যটি অধিকারীর দিক নির্দেশ করে। স্বধর্ম কেবল একটি স্বভাব নয়, সাধারণ প্রবৃত্তি নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রবণতা নয়। স্বভাব ভালো হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। সাধারণ প্রবৃত্তি প্রায়ই পতনের দিকে নিয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মনোভাব নিপীড়নমূলক এবং অন্যায় হতে পারে। কিন্তু স্বধর্ম কখনোই অন্যায় হতে পারে না। স্বধর্ম কোনো চিরন্তন নৈতিক মূল্যবোধ নয়। কারণ কিছু শাশ্বত মূল্যবোধ স্ব-এর সঙ্গে সম্পর্কিত নাও হতে পারে।

    স্বধর্মের ধারণা বুঝতে হলে পরধর্ম, অধর্ম ও বিধর্মের অর্থ বুঝতে হবে। অন্যায় বুঝতে অসুবিধা হয় না। অধর্ম সেটা, যা ধর্মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ধর্ম যদি পুণ্য উৎপাদন করে, তবে ধর্ম থেকে পলায়ন বা পতনের ফলে যে অপকর্মের উদ্ভব হয় তার মূলে রয়েছে অধর্ম। অনেক সময় অন্যায় কাজ ভন্ডামিতে রূপ নেয়। অধর্ম কিন্তু ধর্মকে প্রশ্ন করে না। মুখে ধর্মকে সম্মান করে কিন্তু বাস্তবে অবজ্ঞা করে। এটি সমস্ত মানব সমাজের সাধারণ প্রবণতা। যেমন সকালে মন্দিরে যাওয়ার পর সারাদিন পাপ কাজ করা। কিংবা অহিংসার বাণী শুনিয়ে তারপর কথায় ও কাজে হিংসার প্রয়োগ করে যাওয়া। এমন উদাহরণ প্রচুর দেখা যায়।

    এই ধরনের অন্যায়কে এড়িয়ে যাওয়া এবং বর্জন করা আমাদের কর্তব্য। পরধর্ম এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পরধর্ম মানে অন্যের ধর্ম। এটিও ধারণ করে। কিন্তু সময়, স্থান, পরিস্থিতির জন্য সঠিক নয়। এটি ধর্মের রূপ নিয়ে থাকে, তাই লোভনীয়। কিন্তু বিচ্যুতি আনে, তাই ভীতিকর। প্রায়শই অন্যের স্বধর্মের অনুকরণ বা দাসত্ব অতি-ধর্মের আকর্ষণ সৃষ্টি করে। অন্যের বানানো পথে চলার নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার মিথ্যা মোহ আমাদেরকে পরধর্মের দিকে টানে। আধুনিকতার নামে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পশ্চিমি ভাষা, পোশাক, খাবার ও ব্যবহারের অনুকরণ কিংবা ইউরোপের মতাদর্শ ও প্রতিশ্রুতিকে অন্ধভাবে অনুকরণ করার প্রবণতা পরধর্মের প্রতি আকর্ষণের নমুনা। ভগবদ্গীতা আমাদের সতর্ক করে যে পরধর্মকে সম্মান করার সময় এটি এড়িয়ে চলাই ভালো।

    বিধর্মের বিপদ অধর্ম বা পরধর্ম থেকে আলাদা। যা ধর্মের বিরোধিতা করে তাকেই বিধর্ম বলে। বিধর্ম শুধুমাত্র ধর্মের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়, ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে ধর্মকে খণ্ডন করতে যায়। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক বিচ্যুতি। কারণ স্বধর্মকে একটি ধর্ম হিসাবে বিবেচনা করে না এবং ক্রমাগত ভাঙার চেষ্টা করে। বৈদিক পরম্পরা যখন জৈন এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল, সেটা ছিল বিধর্মের আক্রমণ। বিধর্ম প্রতিরোধ করা অপরিহার্য।

    ধর্মের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিনোবা ভাবে বলেছিলেন: “স্বধর্মের প্রতি ভালবাসা, পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অধর্মের প্রতি উপেক্ষা মিলে ধর্ম গড়ে ওঠে”। এটির পরিবর্ধন করে বলা যেতে পারে, ধর্ম পালনের অর্থ হল স্বধর্মের প্রতি ভালবাসা, পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, অধর্মের প্রতি উপেক্ষা এবং বিধর্মকে প্রতিরোধ। কিন্তু একটি দেশের স্বধর্ম থাকতে পারে কি? আমরা কীভাবে বলতে পারি যে ভারতে আজ যা ঘটছে তা আমাদের দেশের স্বধর্মের উপর আক্রমণ? পরের পর্বে এই প্রশ্নের উত্তর পাবেন।


    লেখক যোগেন্দ্র যাদব রাজনৈতিক দল স্বরাজ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা।
    অনুবাদ: সুদীপ্ত রায়

  • আলোচনা | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৫১৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • santosh banerjee | ১৩ অক্টোবর ২০২২ ১২:৩৬512802
  • শ্রদ্ধেয় যোগেন্দ্র জী , নমষ্কার জানবেন। আপনার ওপর অশেষ ভরসা আর আশা আছে, বিশেষ করে এই সময়ে, যখন আমাদের অতীতের ভুল আর বর্তমান এর চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা' র মধ্যে ও আপনি আলো জ্বালিয়ে চলেছেন, আমাদের পথ দেখাতে সচেষ্ট হয়েছেন। স্য্যার, আমি কংগ্রেস বা বাম বা অতি বাম অথবা কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সমর্থক না। কিন্তু, ঠিক যেভাবে প্রয়াত জয়প্রকাশ নারায়ণ ৭৭ এর দুঃসময়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে , সব দলকে নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর অপশাসন কে শেষ করে নতুন ভাবে ভারত কে জাগ্রত করে ছিলেন, ঠিক একই ভাবে কংগ্রেস ঐ fascist দলটাকে রুখে দিক। একমাত্র কংগ্রেস পারে এটা করতে। সমর্থন করছি এই যাত্র কে। আমাদের ""নানান মতে নানান ‌‌‌‌‌দলে দলাদলি "" থাকলেও অর্জুনের তীর যেন পাখীর  চোখেই তাক করা থাকে। ধন্যবাদ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন