এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অনন্যা নারী 

    Sayanti Mandal লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৯৬ বার পঠিত | রেটিং ৩ (১ জন)
  • পর্ব  ৮ 

    গাড়ি পার্ক করতে জয়িতার অনেকটা সময় চলে গেল। পিছন ফিরে তুতুল কে দেখল জয়িতা। তুতুল একটা চকোলেট মন দিয়ে চুষে যাচ্ছে। জয়িতা দ্রুত হাতে পরপর কাজগুলো করে যাচ্ছে। সমস্যা হল তুতুল এখন হাঁটতে শিখেছে। কিছুতেই সে পেরাম্বুলেটারে বসবে না। কিন্তু মার্কেটিং করতে মেয়েকে এমনি ছেড়ে দিলে এক দণ্ড  এক জায়গায় থাকবে না। জোর করেই জয়িতা তুতুলকে নিয়ে পেরাম্বুলেটারে বসিয়ে সিট বেল্ট বেঁধে দিল। সপ্তাহের সব জিনিস প্রায় শেষ। জয়িতা কাজের দিনে কিচ্ছু সময় পায়নি।ইদানিং জয়িতা একটা লাইব্রেরিতে কাজ নিয়েছে। সেখান থেকে মাঝখানে যে বেড়িয়ে আসবে সে উপায় নেই। কাজের শেষেও জয়িতা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করে না । মেয়েকে ডে কেয়ারে রেখে যায়। মনটা ভীষণ ছটফট করে। সপ্তাহের দিনগুলো যে কিভাবে কেটে যায় জয়িতা বুঝতেও পারে না।
    অর্ণব প্রায় ছ মাস হল চলে গেছে।জয়িতা কোনোদিনই নিজের জোর খাটাতে পারেনি।অর্ণবের কাজের সুত্রেই লিন্ডার সাথে অর্ণবের পরিচয়। প্রায় তার পর থেকে অর্ণব সেমিনারের জন্য এখানে সেখানে যেত। সাথে লিন্ডাও। জয়িতা ভিতর ভিতর অস্থির হলেও কিছু করে উঠতে পারেনি। যেন এক অনিবার্য পরিণতি  ক্রমশ জয়িতার জীবনে নেমে আসছিল। জয়িতা অর্ণবের জীবনে অবান্তর হয়ে গেল। অর্ণব যেদিন ডিভোর্সের কথা বলল জয়িতা কিছু বলতে পারেনি,শুধু স্তব্ধ হয়ে গেছিল। জয়িতা  ভাবতে পারেনি অর্ণব সত্যি তাকে আর তুতুলকে ছেড়ে চলে যাবে।
    প্রথম কদিন জয়িতা কি করবে কিছু ভেবে পাইনি।অর্ণবের হাত ধরে সে বাড়ির বাইরে বেড়িয়েছিল। সেই অর্ণব আজ মাঝপথে তার হাত ছেড়ে দিল।কদিন জয়িতা শুধু কেঁদেছিল।  তুতুল ততদিনে বেশ বড় হয়েছে। কথা বলতে ,হাঁটতে শিখেছে। মায়ের কান্না দেখে সেও কদিন খুব কান্নাকাটি করল।তারপর একদিন কান্নাটাও নিজের কাছে বিরক্তিকর ঠেকল।জয়িতা মন শক্ত করে নিয়েছিল। এমনিও জয়িতার জীবনটা কিছুদিন থেকে শুধু তুতুল কে ঘিরেই চলছিল। অর্ণব যেন থেকেও ছিলনা। মেয়েকে আঁকড়ে জয়িতা আবার চলা শুরু করল।একবার ভেবেছিলো ইন্ডিয়া ফিরে যাবে। তারপর নিজেই নিজেকে বকা দিয়েছিল।
     
     
    লাইব্রেরির কাজটা পেতে সপ্তাহখানেক লেগেছিল। সে কদিন জয়িতা রোজ বেড়িয়ে পড়ত তুতুল কে নিয়ে । গাড়ি চালিয়ে কোন একটা রাস্তা ধরে। তুতুল ব্যাক সিটে ঘুমিয়ে পড়ত কখনো কখনো। দিন শেষে ফিরে আসত বাড়িতে। ততদিনে মা জেনে গেছে সব। হয়ত চলেও আসত। কিন্তু বাবার শরীরটা হঠাৎ খারাপ করে। মা আসতে পারেনি। জয়িতা একটু থিতু হয়েই ইণ্ডিয়া যাবে ঠিক করেছে। অর্ণবের মা ও জেনেছিল।অর্ণবের মা কিন্তু এখনও জয়িতাকে চিঠি লেখেন। জয়িতাও উত্তর দেয়।জয় জানতে পেরে গরম গরম চিঠি লিখেছিল। জয়িতার সাথে অর্ণবের পরিচয় করানোর জন্য নিজেকে দুষেছিল। সব সম্পর্ক গুলো ঠিক থাকলো। শুধু যেটা সুত্র ছিল সেটা কেটে গেল কখন যেন।
    আজ এই মালটিষ্টোরে বেশ ভিড়। জয়িতা অভ্যস্ত হাতে প্রয়োজনীয় জিনিস তুলতে লাগল। তুতুল চুপ করে বসে।মুখটা গম্ভীর। মেয়ের একটুতেই রাগ হয়ে যায়।আর রাগলে চুপ করে থাকে। অনেকটা অর্ণবের মতো। জয়িতা অনেক চেষ্টা করেও অর্ণবের মনের পুরো হদিশ কোনোদিন পায়নি। অথচ প্রথম প্রথম সব কিছু ঠিক ছিল। এদেশে আসার  পর এরকম সপ্তাঅন্তেই তারা দুজনে যাবতীয় কেনাকাটা করতে বেড়োত। অর্ণব তখন জয়িতাকে সব কিছু বুঝিয়ে দিত। জয়িতা জিজ্ঞেস করার আগেই অর্ণব গাইডের মতো সব বলে যেত।অর্ণবের জন্যই জয়িতা খুব তাড়াতাড়ি প্রবাসের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।পরের দিকে জয়িতার আর তেমন অসুবিধা হয়নি। এখন তো জয়িতার পাশে  অর্ণব নেই।একাই তাকে সব করতে হয়।
    কাউণ্টারে লম্বা লাইন।বাড়ি ফিরে লাঞ্চ বানাতে হবে। তুতুলের জন্য যা করে জয়িতা তাই একটু বেশি করে নেয়। নিজের জন্য আলাদা কিছু করতে আর ভালো লাগে না। বিয়ের আগে জয়িতা রান্নার ‘ র’ জানত না। বাড়িতে মা শান্তাপিসি দুজনেই রান্নাতে পটু।জয়িতা বিয়ের পর যা কিছু শিখেছে। অর্ণব খেতে ভালবাসত। জয়িতা মা র কাছ থেকে চিটিতে রান্নার রেসিপি জেনে নিত। অর্ণবের বিদেশি বন্ধুরাও মাঝে মাঝে নিমন্ত্রণ পেত। জয়িতার রান্নার বেশ প্রশংসা ছিল। আসলে অর্ণবের জীবনকে ঘিরেই জয়িতার দিন কাটতো। সবটাই অর্ণবকে ঘিরে। জয়িতার নিজের বলে কিছু ছিল না।অনেকবার ভেবেছিলো পি এইচ ডি টা করলে হয়। অ্যাপ্লাইও করেছিল। শেষ পর্যন্ত হয়নি। অর্ণবের পড়া ,কেরিয়ার এই সব তালে জয়িতার ইচ্ছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
    ষ্টোর থেকে বেড়োতে বেশ দেরি হয়ে গেল।তুতুলকে গাড়িতে বসানোর আগে জয়িতা কিছুক্ষনের জন্য বন্ধন মুক্ত করে দিল। গোমড়া মুখে হাসি যেন ধরে না। পারকিং লটের ফাঁকা জায়গাতে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলো।  সাথে জয়িতা। দু একজন আদর করে তুতুলের গাল টিপে দিল। মেয়ের এখন সেদিকে লক্ষ্য নেই। অন্য সময় হলে আর দেখতে হত না। গাল টাল মুছে মুখ গোমড়া করে থাকতো।
    বাড়ি ফিরে ঘরে ঢোকার আগে লেটার বক্সটা দেখল জয়িতা। মা র চিঠি এসেছে। জয়েরও একটা। তুতুলকে বসার ঘরে  রেখে দ্রুত কিচেনে চলে এলো। মেয়ের খাবারটা রেডি করলো তাড়াতাড়ি। খাবার নিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসলো। মেয়ে কলকল করে কিসব বলে যাচ্ছে।চিঠিগুলোর দিকে মন জয়িতার। জয়ের চিঠি টা খুলল আগে। মাসিক পত্রিকা টাও আছে সাথে।  চোখ বোলাতে বোলাতে নিজের নামটাও দেখতে পেলো। এই একটা জিনিস জয়িতাকে নতুন প্রাণ দেয়।  চিঠিটা পরে পড়বে।
     
     
    মার চিঠিটা খূলে পড়তে লাগলো।বেশিক্ষণ পড়তে পারলো না। যে দুঃসংবাদ বয়ে চিঠিটা এসেছে তাতে জয়িতা স্তব্ধ হয়ে গেলো। জয়িতা তো যাবেই ঠিক করেছিলো। বাবা সেটূকূ সময়ও দিলনা।হাত থেকে চিঠিটা খসে পড়ল। চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এলো।ছোট্টো তুতুল খেলছিলো।  এদিকে নজর আসতেই দেখে মা কাঁদছে। খেলা ভুলে মা র কোলে চেপে বসলো।  আর অবুঝ প্রাণীর মতো মাম মাম করতে লাগলো। জয়িতার জীবনটা কেন এরকম ভাবে শুধুই দুঃখের গর্তে সেঁধিয়ে যাচ্ছে? জয়িতা  দু হাত তুলে ওঠার চেষ্টা করছে । তবু যেন শুধুই নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে জয়িতা জীবনের লড়াই করবে। তার শক্ত হাতগূলো কেন এভাবে আলগা হয়ে যাচ্ছে। কী তার অপরাধ। বুঝতে পারে না। ইচ্ছে করছে দৌড়ে মা র কাছে চলে যেতে। খুব জড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু এটো দূরে আজ সে যে সেই উপায়টুকুও নেই।ভীষণ একা বোধ হোল জয়িতার ।মা র পরিবর্তে  তুতুলকে জড়িয়ে ধরল জয়িতা। কষ্টটা কান্না হয়ে নেমে এলো।
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন