বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মুক্তগদ্যঃ  নিশীথরাতের নাম ভালোবাসা

    Krishna Malik (Pal ) লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ জুলাই ২০২২ | ২৬২ বার পঠিত
  • এই নিশুতিরাতের কোলে আমার ভাঙাচোরা দেহ পড়ে আছে।  তার শান্ত কোলে মাথা রাখি, যেন মায়েরই তেলহলুদমাখা আঁচল। সে আমার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে দুয়োরাণীর গল্প শোনায়।  আমলকি গাছের পাতার ফাঁকে চাঁদ পোষা সারমেয়টি, সামনের জোড়া পায়ের ফাঁকে মাথা রেখে হাওয়া মাখতে মাখতে সেই গল্প শোনে। আমার চোখের কোণ থেকে গলে গলে পড়ে শূন্যতার নানা রঙ। যখন বুকের খোল শূন্যতার ভরাটে বানভাসি, তখন চোখের প্রণালী যে বাড়তিটুকু গড়িয়ে দেয়, তাকে ভালোবাসা বলে জানে মধ্যযামের পৃথিবী। এসব সময়ে আমি নিজেকে নিজে বলে চলি, ভালো আছি, ভালো আছি, ভালো আছি, ভালোই ---। 
       
     দিন যায় ব্যস্ততায়। সেই ব্যস্ততার ভেতর যদি নিজেই  নিজেকে লিপ্ত রাখি কাজে, তবে নিজেকে ছুটিও তো দিতে পারি? তবু আমাদের আছে অনিকেত ভাবনা। তাই ব্যস্ততাকে তুমি কখনও কখনও ভান বলে গোপনে ডেকো।
        
         দিন যায় কত রঙের অপমানে। অপমানে ভিজে যাওয়া কাপড় বারবার পাল্টে সাফসুতরো হয়ে এসে দাঁড়িয়েছি আয়নার সামনে। দেখি সারা গায়ে তখনও লেগে আছে অপরাজিতা ফুল ডলা নীলরঙের দাগ। নীলরঙ স্বপ্নের, নীল রঙ প্রেমের। নীলরঙ যে অপমানেরও!
          দিঘি ভেসে যাওয়া মোয়ানের জলে নীলরঙ বারবার ধুয়েও রয়ে গেছে কিশোরীবেলা। চুপ করে থেকে চাগিয়ে তুলি অতীতের হাওয়াকল। যেন ভেঁপুতে ভোঁ ফুটলে, হারিয়ে যাওয়া মেলার মানুষ ফতিঙ্গায় হাওয়া ঠেলে এসে পড়বে কুয়াশা কুয়াশা বাঁকে। ওই তো, বহুদূর থেকে ভেসে আসছে বুকের লাবডুপে আনন্দ ভরে কিছু মানুষের ওমলাগা জড়াজড়ি ডাক।  ভেসে আসছে পথের কোলাহল। ধুলো ছিটকে উঠছে সুখ সুখ পায়ের ঘুঙুরপাতে। ফিনকি ওঠা জ্যোৎস্নার ভরা কোটালের দোখনো বাতাসে অন্য কোনো দ্রাঘিমা থেকে ডাকনামের ধারাপাতের সুর ওঠে চাপা কোলাহলে।
     
        তবু কিছুতেই জেগে উঠছে না প্রাণ। বরং মুছে যায় জন্মদাগ।  মুছে যায় ভালোবাসার কোজাগরি।  বুড়িবসন্ত খেলার সঙ্গীরা হাত ছুট হতে গিয়ে মোর হয়ে বসে আছে অসীমের বারান্দায়।  তার মাটি কত রোদবৃষ্টিকে আটকে দমফতুর হয়ে শেষ নিঃশ্বাসেও মায়া মাখিয়ে রেখে গেছে! সেখানে তারা জলছবি।  বুড়ি উঠে গেলে তবে নতুনখেলা।
         কিন্তু জানি মোর হওয়া সঙ্গীরা আর জেগে উঠবে না, কারণ এ খেলার শেষ নেই। তাই চারপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শূন্যতার গাঢ় গরিমা।  আর নতুন বর্ষার উঠো মাছের মতো নীচ থেকে অজস্র মুখ উঠে আসে, কিন্তু দু’হাতের ফাঁক গলে  সময়ের সঙ্গে বেরিয়ে যায় সব জল, সব রঙ আর মুখগুলো। 
         
           প্রসারিত এই জীবন তবু নিরন্তর গড়ার প্রচেষ্টা।  ক্ষয়ে যাওয়া পরিত্যক্ত বারান্দায় মাটি লেপন অতিথি সমাগমের আশায়। অথচ জানি, সব প্রস্তুতি লগ্নভ্রষ্টার মতো নিভে যায় বারবার। আমরা প্রত্যাশায় হাত পেতে রাখি, ভুলে যাই আমাদের সব পেতে নেই। 
       
         আকাশের রঙ বুঝি পাল্টাল! এখন সে মেঘরঙা যুবকের মতো।  তার সঙ্গে কিছু গল্পও বাকি থেকে গেছে কতদিন। এসো, আজ তোমায় বলি জনান্তিকে। তুমি পাশ ফিরে শোও, পাহারায় থাকা কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমন্ডল পা পালটে দাঁড়াক গল্পের টানে টানে। মেঘলা যুবক, তুমি কি আজ অভিমানী? তাই ছায়াপথ বেয়ে গড়িয়ে নামছে তোমার ব্যথার ফেনা? আমাকে সঙ্গে নাও না! আমিও তোমার ব্যথার পাশে হাতে মাথা রেখে বসে থাকব সারা রাত, আর তুমি ঝরে গেলে ভিজে উঠব নতুন পরিধেয়ে।  ক্লান্ত দেখায় কেন তোমার বিহান বেলার গালের তিল? সেখানে অন্যমনস্ক এক বিগত শোকের সুষমা তোমাকে বেশ মন্ডিত করে রাখে। কিছুই বোলো না তুমি।কোনো বীথির বিজনে তুমি সংগোপনেও নামিয়ে রেখো না জমে ওঠা পুঞ্জ পুঞ্জ জলসম্ভব বাকদান।
       
           অথচ ভোরের বাঁশির মতো ভৈরবী নামিয়ে আসি অমলতাসের ব্যাপ্ত হরিদ্রায়। সমস্ত ভার নামিয়ে রেখে আমি তোমার সেচনের প্রার্থী ফসলের প্রত্যাশায়। নাহলে বাকি দিন কটা কেবলই ব্যস্ততার ভানে কাটবে যে! কারণ আমাদের যে কোনো স্মৃতিচারণ জুড়ে কেবলই কুয়াশার বাঁক। যতই কান্না জমে থাক, দিগন্ত ঝাঁকিয়ে সেই জলছবি জীবনের ভেঁপুর সুর আর উঠবে না। অন্তত তোমার অলোকসম্ভব দান বিফলে না যায়, তাই গন্ডী টেনে দিতে চাই সুরক্ষার। যেমন করে জলভরা মেঘের মতো এক নারীর রোগা ও পরিশ্রান্ত দুটি হাত ভৈরবী সুরে গোবরের বেড়ি টেনে দিত গৃহস্থ কল্যাণে। 
         ওগো কাদম্বিনী, গন্ডী কেটে বেরোতে চাই না বলে প্রতিটি ব্রত অনিঃশেষ ভালোবাসা। এই  নিশীথ রাতের নৈঃশব্দ গাঢ় করে হাওয়াও বলে যায় তোমার নাম।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ঋ ফ ন | ২০ জুলাই ২০২২ ০০:০৩510056
  • ভালো লিখেছেন।
  • ইন্দ্রনীল বক্সী | 2405:201:9003:73:3dc8:c2ee:b674:f20c | ২১ জুলাই ২০২২ ১৬:০০510092
  • দারুন গদ্য!  নাকি কবিতাই?  একান্ত ডুব সাঁতারে সবুজ দিঘির জলে পর্দা সরে সরে উন্মুক্ত হচ্ছে কাব্য সরনী। উপভোগ করলাম। 
  • Krishna Malik (Pal ) | ১৫ আগস্ট ২০২২ ১৮:০২511030
  • ধন্যবাদ ঋ ফ ন। ধন্যবাদ ইন্দ্রনীল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন