ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হৃদয় সিঞ্চন করা একটি চিঠি 

    Supriya Debroy লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ জুন ২০২২ | ১২৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • 'তুমি এবার যখন কলেজের হোস্টেলে যাওয়ার জন্য বেরোলে, তোমার মুখটা খুব শুকনো দেখাচ্ছিলো। প্রত্যেকবার হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরার জন্য দমদমের বাড়ি থেকে ট্যাক্সি নিয়ে যাও। এবার তোমার মায়ের থেকে ট্যাক্সি ভাড়া নিলে না। জানালে ১১-এ বাসে করে চলে যাবে। ১৪ টাকা ট্যাক্সি ভাড়া বাঁচানোর জন্য বাড়ি থেকে নির্ধারিত বেরোনোর সময়ের এক ঘন্টা আগেই বেরিয়ে গেলে। তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। আমাদের ঠিক চলে যাবে। তোমাকে প্রত্যেক মাসে হোস্টেল এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ৩০০ টাকা পাঠিয়ে দেব, কোনো অসুবিধা হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা যখন কোনো দোষ করিনি, সাসপেনশন অর্ডার খুব শীঘ্র'ই তুলে নেবে। তুমি এই নিয়ে একদম ভাবনা-চিন্তা কোরো না। আমি তো আছি। পড়াশুনাটা ঠিকমতন করে করবে। তোমার মায়ের অনেক আশা, আমাদের বংশের তুমি প্রথম ইঞ্জিনিয়ার হবে।' - তোমার আশীর্বাদক বাবা।
    উত্তরে জানাই 'ধানবাদ স্টেশনে দাদামনি (জামাইবাবু) এসেছিলেন, আমার সাথে দেখা করতে। আনন্দবাজার পত্রিকাতে ছোট্ট করে ভিতরের পাতায় তোমাদের যে খবরটি বেরিয়েছিল, সেটা দিদির চোখে পড়ে। দাদামনি জোর করে আমার হাতে ৩০০ টাকা গুঁজে দেন। তুমি পরেরমাসে আমাকে আর টাকা পাঠাবে না। যখন লাগবে জানিয়ে দেব, তার আগে পাঠাবে না। তুমি এবং মা আমার প্রণাম নিও এবং পল্লবকে আমার আদর জানিও।'
    আমি যখন আরইসি (এখন এনআইটি) কুরুক্ষেত্রতে চতুর্থ বর্ষ'তে পড়ি, তখন বাবার জিআরপি'র তরফ থেকে বেলঘরিয়া স্টেশনে পোস্টিং ছিল। বৈদ্যুতিক গোলোযোগের কারণে ট্রেন সকাল থেকে বন্ধ, অফিসযাত্রীরা অনেকটা সময় অপেক্ষা করার পর কোনো সদুত্তর রেল বিভাগ থেকে না পেয়ে - স্টেশন মাস্টার এবং অন্যান্য ঘরগুলির জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন। স্টেশন মাস্টার ও অন্যান্য রেলওয়ে স্টাফদের মারধর করেন। বাবা ওনার চারজন কনস্টেবল নিয়ে কেন এই ঘটনাটি আটকাতে পারেননি, সেই কারণে পেপার'এ অনেক লেখালেখি হওয়ার জন্য বাবা এবং চারজন কনস্টেবলকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। সাসপেন্ড থাকাকালীন মাইনে অর্ধেক পাবেন। আমি ঐসময় কলেজের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম। কলেজে ফেরত যাওয়ার ঠিক একদিন আগে এই ঘটনাটি ঘটে। তখন বাবার মাইনে ছিল সাকুল্যে ১১০০ টাকা। ভাই পল্লব ডিপ্লোমা পড়ছে। আমাকে প্রতিমাসে ৩০০ টাকা পাঠানো বেশ কষ্টকরই ছিল তখন। বাবা এবং মা বেশ কষ্ট করেই আমাদের তিন ভাই-বোনকে পড়াশুনা করিয়েছেন। যাইহোক, সাসপেনশন অর্ডার তিন মাস পর তুলে নেওয়া হয়।
    'আমি তো আছি' - চিঠিটির এই একটি বাক্যই উপলব্ধি করায়, সন্তানের কাছে বাবা এক পরম নির্ভরতার প্রতীক, যেন একটি বটবৃক্ষের ছায়া। বাবা হলেন নীরবে বয়ে চলা এক নদী। নীরবে বহমান তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপ। জীবনের সমস্ত উপার্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেন। জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে হয়তো একটি বাড়ি তৈরী করেন - যে বাড়িতে দীর্ঘসময় রাজত্ব করি আমরা। যিনি বানালেন তিনি হয়তো বাড়িঘরের সেই সুখের সময়গুলোতে পাশে থাকেন না, থাকেন আলোকবর্ষ দূরে। নিজের সবটুকু দিয়ে যিনি সন্তানদের আগলে রাখেন তিনি হলেন বাবা।

    আমরা যখন দুর্গাপুরে থাকতাম আর আমি পড়তাম তৃতীয় শ্রেণীতে, ইংরেজি পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যাবেলায় বাবা আমাকে এবং ভাইকে বললেন - চল রাস্তায় ঘুরে আসি। আগামীকাল পরীক্ষার কথা জানাতে, উনি বললেন - পরীক্ষার আগের দিন পড়তে হবে না। সবকিছুই তো তোদের পড়া আছে। পরীক্ষার আগের দিন মনকে উন্মুক্ত রাখতে হয়। খোলা মনে পরীক্ষা দিলে, দেখবি কোনো টেনশন থাকবে না এবং পরীক্ষা ভালো হবে। দুর্গাপুরের প্রশস্ত রাস্তায় বাবার সাথে হাটতে হাটতে গল্প করতে করতে সত্যিই মনটা এতো ভালো হয়ে গিয়েছিল এবং পরেরদিন পরীক্ষা খুবই ভালো হয়েছিল। বাবার এই উপদেশ শিরোধার্য করে, এরপর থেকে কোনোদিন আমি পরীক্ষার আগেরদিন রাতে পড়তাম না।
    মা-বাবাই পৃথিবীর সব সন্তানের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। মায়ের ওপর সন্তানের নির্ভরতা বেশি হলেও বাবার ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের কাছে বিশ্বাসের আরেক নাম বাবা, যার পথনির্দেশে আমাদের জীবন হয়ে ওঠে সুগম। ওনার উপদেশে পৃথিবীর সব দুর্গম পথেই পা রাখা যায় অতি আস্থার সঙ্গে।

    প্রতিবছর জুনের তৃতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় 'বাবা দিবস'। দিবসটি প্রথম পালিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১০ সালে। ওয়াশিংটনের স্পোকনিতে জন ব্রুস ডোড 'বাবা দিবস' দিনটির সূচনা করেন। ডোড'এর মা যখন ছয় ভাই-বোনের জন্ম দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন তাদের বাবা উইলিয়াম স্মার্ট সন্তানদের মায়ের মতন স্নেহ-ভালোবাসা দিয়েই বড় করেন। ডোড বড় হয়ে যখন উপলব্ধি করতে পারেন বাবার স্বার্থত্যাগ, অক্লান্ত পরিশ্রম তাদের মানুষ করার পিছনে - ১৯১০ সালে ১৯ জুন ওয়াশিংটনে প্রথম জাঁকজমকের সাথে 'বাবা দিবস' পালন করেন। ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বেনিস জনসন জাতীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের ঘোষণা করেন। এরপর ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন জুনের তৃতীয় রবিবারে 'বাবা দিবস' পালনের স্বীকৃতি দেন। যদিও বেশিরভাগ দেশ'ই ভারতসহ জুন মাসের তৃতীয় রবিবারে 'বাবা দিবস' পালন করেন, তবে কিছু কিছু দেশ যেমন ইজিপ্ট, সুদান 'বাবা দিবস' পালন করেন ২১ জুন। রোমানিয়া ৮ মে, অস্ট্রেলিয়া ৪ সেপ্টেম্বর। 
    যেই দিনই হোক 'বাবা দিবস' পালন, সকল বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সমস্ত সন্তানরা এটাই জানাতে চায় 'বাবা' কিংবা 'মাতৃ দিবস' কোনো একটি দিনের নয় - সন্তানদের কাছে বছরের প্রতিটি দিনই হচ্ছে 'বাবা এবং মা দিবস'। প্রতিদিনই তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর দিন, তাঁদের স্বার্থহীন স্নেহ-ভালোবাসা-ত্যাগের জন্য।   

     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন