ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পরাণ বাগ্দী - ৮ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৭ জুন ২০২২ | ১৬৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • আজ বুধবার । মৌসুমীর লাইব্রেরী যাবার দিন । সন্ধে ছটা নাগাদ সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
    বই ফেরত দিয়ে কাউন্টারে স্লিপ জমা করে টেবিলের দিকে সরে এসে দাঁড়িয়ে একটা বাংলা সাপ্তাহিকীর পাতা খুলে সেই দিকে চেয়ে রইল । পাতার অক্ষরগুলো কিছুই মাথায় ঢুকছে না । মনের ভিতর এলোমেলো চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে ।যেন পরীক্ষা হলে বসে আছে প্রশ্নপত্র পাবার প্রতীক্ষায় ।  প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে গেলে জড়তা কেটে যায় । তার উচ্চমাধ্যমিক শুরু হতে এখনও প্রায় দু মাস । কিন্তু সেটার সম্মুখীন হওয়াটা এখন অতি সহজ সরল ব্যাপার মনে হচ্ছে মৌসুমীর । এ পরীক্ষাটা কিভাবে সামলে নেওয়া যাবে সেই হিসেব ঘুরছে মনের ভিতর । 
         হিসেব অনুযায়ী গন্ধে গন্ধে হাজির হয়ে যাবার কথা বসন্তর । মৌসুমী বারবার গেটের দিকে দেখতে লাগল । মালতীলতা ঝাড়ের ওপরে টিমটিমে আলো জ্বলছে । একপাশে তার সাইকেলটা রাখা আছে । 
    মিনিট দশেক পরে মৌসুমীর ডাক এল । বইও পেয়ে গেল । ভাবল, কি করবে এখন ... চলে যাবে , নাকি বসন্তর অপেক্ষায় বসে থাকবে । একটা চেয়ার খালি হয়েছে । মৌসুমী সেখানে বসে পড়ল । একটা ম্যাগাজিনে চোখ বোলাতে লাগল অন্যমনস্কভাবে । সাতটা বেজে গেছে । আজ বোধহয় বসন্ত আর আসবে না । একটা দিন গেল । অন্য কোথাও ওকে ধরবার চেষ্টা করতে হবে । লাইব্রেরী অবশ্য সাড়ে আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে । কিন্তু এত দেরিতে বসন্ত আসে না । হাতে খুব বেশি দিন সময় নেই । কলতান স্যার অবশ্য তাড়াহুড়ো করতে বারণ করেছেন । বলেছেন, দরকার হলে হিয়ারিং-এর ডেট পিছিয়ে দেবার জন্য অ্যপীল করা যেতে পারে । সে আরও দশ বারো মিনিট অন্যমনস্কভাবে ম্যাগাজিন নিয়ে নাড়াচাড়া করল .... তার জীবনে একটা অভূতপূর্ব উদ্বেগ বুকের ভিতর নিয়ে । পরীক্ষার হলে  প্রশ্নপত্র হাতে না আসা পর্যন্ত উদ্বেগ বাষ্পীভূত হওয়া মুশকিল । 
    সাড়ে সাতটা বেজে গেল । এর চেয়ে বেশি দেরি হলে বাড়িতে মা চিন্তা করবে । প্রায়ই বলে ,
     ' বেশি রাত কোর না ... দিনকাল ভালো না ...'
    মৌসুমী এবার উঠে পড়ল । গেটের কাছে গিয়ে সাইকেলটা নিতে যাবে এমন সময় প্রশ্নপত্র  হাতে এসে গেল আচমকা । ঝড়ের বেগে সাইকেল চালিয়ে খসস্... করে এসে থামল বসন্ত মন্ডল । থেমেই সামনে দেখল মেঘ না  চাইতেই জল ..... মৌসুমী দাঁড়িয়ে আছে। সে একটু থতমত খেয়ে অপ্রস্তুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মৌসুমীর মুখের দিকে । 
    ----- ' এই ... মানে ... এলাম ... সন্দীপের সঙ্গে কথা ছিল একটু...সন্দীপ ওই যে লাইব্রেরিয়ান ...দেরি হয়ে গেল ... তোর হয়ে গেছে ? '
    মৌসুমীর কাছে  সাধারনতঃ মুখ ঝামটা খেতে অভ্যস্ত বসন্ত ওইরকম কোন ঝাপটারই প্রত্যাশা করছিল । কিন্তু তাকে বিস্মিত করে দিয়ে  মৃদুস্বরে অতি কোমল একটা উত্তর এল ----- ' হুঁ ... অনেকক্ষণ ... এত দেরি হল ? ' 
    বসন্ত একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা মেরে গেল । কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না । এই প্রশ্নপত্রে সে জীবনে কখনও পরীক্ষা দেয়নি । দেখল যে মৌসুমী নিষ্পলক দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে । বসন্ত প্রথমে ভাবল সে বোধহয় স্বপ্ন দেখছে ।  দেয়ালের নীচু রেলিং-এ ঠক করে মাথাটা ঠুকল সে । উঃ ... বলে অস্ফূট শব্দ বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে । ভাবল, যা দেখছে , সেটা তা'লে সত্যি ... 
    ----- ' দেরি হয়ে গেল .... মহাজন এসেছিল টাকা নিতে ... যত বাজে কাজ ... উপায় নেই ... তুই কি যাচ্ছিস ? '
    মৌসুমী প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে গেছে । উদ্বেগও ঝরে গেছে । সে মেধাবী ছাত্রীর মতো খাতায় উত্তর লিখতে শুরু করল ।
    আবার নীচু গলায় কোমল স্বরে বলল, ' হ্যা... চলেই তো যাচ্ছিলাম ... কিন্তু রাত হয়ে গেছে .... এখানে তোমার কথা হয়ে গেলে নয় একসঙ্গে ... ' মৌসুমী গেটের মুখ থেকে সরে গিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল । বসন্ত দেখল ডাকাবুকো মৌসুমীর মুখে কেমন ম্লান ছায়া ... দুঃখী দুঃখী ভাব । 
    রেলিং-এ মাথা ঠুকে ব্যথা পাবার পরেও বসন্ত নিশ্চিত হতে পারছিল না যে, সে যা দেখছে তা স্বপ্ন না সত্যি । তার সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল । 
    সে অকৃত্রিম উদ্বেগে মৌসুমীকে জিজ্ঞাসা করল,  ' তোর কি শরীর খারাপ ? মানস ভটচাজকে ডাকব এখানে ..... আচ্ছা দাঁড়া এক্ষুণি কল দিচ্ছি ... ' বলে বসন্ত পকেট থেকে মোবাইল বার করল ... '
    ----- ' আরে না না ... বসন্তদা ... ডাক্তার ডাকতে হবে না ... কিছু হয়নি আমার ... '
    অপরাধীদেরও একটা গোপন আবেশ বিহ্বল সত্ত্বা থাকতে পারে , সেটা হয়ত সারাজীবন ধুলোমাটি চাপা পড়ে থাকে ।  
    বসন্ত প্রগাঢ় চোখে মৌসুমীর দিকে তাকিয়ে রইল ।  
    মৌসুমী বলল, ' চল তা'লে যাওয়া যাক ... '
    সে জানে বসন্তর এখানে আদৌ কোন কাজ নেই। 
    রাস্তায় বেরিয়ে দুজনে সাইকেলে উঠল । সাইকেল চলতে লাগল ।  দুজনেই চুপচাপ ।মৌসুমী কথা বলছে না কারণ প্রয়োজনের বেশি কথা বলার কোন তাগিদ তার নেই । আর বসন্ত নীরব আছে ... পাছে অনাবশ্যক শব্দের গোলমালে আতরের গন্ধের মতো নবনীত আবেশ চকিতে  ভেসে চলে যায়।   
    মন্ডলবাড়ির কাছাকাছি এসে গেল ওদের সাইকেল । মৌসুমীই কথা বলল । 
    ----- ' আবার তা'লে কবে ... ' 
    বসন্তর বুকের বাঁ দিকে দশ রিখটার মাত্রায় একটা প্রবল ভূকম্প হল । সে নিজেকে সামলে কি একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল । কিন্তু তার আগেই মৌসুমী বলল, ' কাল বিকেল পাঁচটায় কুলতলার বড় মাঠে ... দেরি করো না কিন্তু ...'
    মৌসুমীর সাইকেল চলে গেল । বসন্ত নিজের সাইকেলের ওপর ভর দিয়ে টলতে টলতে বাড়ি ঢুকল নেশাসক্তের মতো ‌। নেশা অনেক রকমের হয় ... 
    বাড়ি ফিরে মৌসুমী কলতানকে ফোন লাগাল ।
    ------ ' হ্যা  স্যার ... প্রথম পত্রের পরীক্ষাটা ভালই হয়েছে । কাল সেকেন্ড পেপার আছে । দেখি কি হয় ... '    
    ------ ' আমি জানতাম তুমি পারবে । কাল কিন্তু ডিভাইসটা ইউজ করো । জামার ওপর থেকে টাচ করলেই অন হয়ে যাবে ... আর একটা টাচ করলে অফ ... বেস্ট অব লাক ... মনে রেখ কালকের পেপারটা কিন্তু ইজি হবে না ... টেক কেয়ার ... ' 
       (ক্রমশঃ )
    ************************************************************************************

     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Mousumi Banerjee | ১৭ জুন ২০২২ ১৪:০৩509096
  • এরপরই আসল খেলা!!!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন