এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জাপান ৫

    Rumjhum Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩০ এপ্রিল ২০২২ | ২৩৫ বার পঠিত
  • জাপান পূর্ব এশিয়ার সব থেকে বড়ো দ্বীপপুঞ্জের দেশ। যদিও ছোট ছোট অসংখ্য দ্বীপের সমাহার সেখানে তবু মোটের ওপর চারটে প্রধান দ্বীপ হল হোক্কাইডো, হোনশু, শিকোকু আর কিঊশু। উত্তর থেকে দক্ষিণ, আর পূর্ব থেকে পশ্চিম সমুদ্র দিয়ে ঘেরা এক ভূখন্ড জুড়ে কতো যে পুরাণ, কতো যে ইতিহাস ছড়িয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই। দক্ষিণপূর্বের এক কোণ ছুঁয়ে আছে চীন সাগর, পূর্বে আছে ফিলিপিন সাগর আর প্রশান্ত মহাসাগর, আর পশ্চিমে জাপান সাগর কোরিয়া আর রাশিয়ার থেকে জাপানকে আলাদা করেছে। তাছাড়াও দ্বীপগুলোর মধ্যে মধ্যে আছে অসংখ্য খাঁড়ি। কি করে সৃষ্টি হলো এমন আশ্চর্য এক দেশ? ভারি আকর্ষণীয় সেই পুরাণ কথা। ৭১২ খ্রীষ্টাব্দে জাপানে লেখা হয় প্রথম বই। নাম কোজিকি। সেই বইতেই বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য বিশেষত: জাপানের সৃষ্টি রহস্য বর্ণনা করা আছে। সৃষ্টির গোড়ার দিকে বিশ্ব ছিল এক তাল কাদার মতো। না ছিল তার আকার না ছিল স্বর্গ মর্ত্যের বিভাজন। ক্রমশ: বিরাট এক আলোড়নে সেই তালগোল পাকানো বস্তু থেকে হাল্কা হয়ে ওপরে উঠল স্বর্গ আর নীচের কাদার মতো ভারি জিনিসটা থেকে জন্ম নিল পৃথিবী। আর জন্ম নিল অসংখ্য কামী। শিন্তো দর্শনে কামী হল আত্মা। কামীর কোনও ভাল মন্দ নেই। কামী প্রকৃতিরই অঙ্গ। সৃষ্টি আর লয় দুই নিয়েই কামী। মহাবিশ্বের পারস্পরিক সম্বন্ধযুক্ত বিপুল শক্তিরাশির বিমূর্ত প্রকাশ এই কামী। প্রাকৃতিক শক্তি, পশু পাখি, এমনকি মৃত্যুর পর মানুষও কামীতে পরিণত হতে পারে। কামী অর্থাৎ প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে প্রকৃতিও আমাদের প্রতিপালন করবে আর তাকে অবজ্ঞা করলে পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে কামীর ধ্বংসলীলা। যত জানছিলাম তত অবাক হচ্ছিলাম। এও কি সম্ভব? আজ থেকে তেরশো বছর আগে প্রকৃতি সম্বন্ধে মানুষের যে ধারণা গড়ে উঠেছিল বিজ্ঞানের এত উন্নতির পরেও সে ধারণার মূল বিষয়টি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রাথমিকভাবে অনেক কামীর জন্ম হল তারা কেউ হল মেঘ, কারো চোখ থেকে জন্ম নিল চাঁদ আবার কারও বা নিশ্বাস থেকে তৈরি হল ঝড়। এমন করে কামীর সাত পুরুষ জন্মাবার পর এলো ইযানাগী আর ইযানামী। এই দুই জন মিলে জন্ম দিলো জাপান দ্বীপ পুঞ্জের আর অনেক অনেক কামীর। আমাতেরু, স্বর্গের দ্যুতি বলেই যাকে উল্লেখ করা হয়েছে কোজিকিতে তিনি আসলে স্বয়ং সূর্যের দেবী। জাপানের রাজবংশ নাকি সরাসরি তাঁরই বংশধর। নিন্দুকে বলে কোজিকিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে রাজার বংশকে দেবতার অংশ করে তোলা হয়েছে। সে যাই হোক, মোদ্দা কথা হলো এই সৃষ্টি তত্ত্বই শিন্তো ধর্মের আধার। জাপানের প্রাচীনতম এই ধর্মের বৈশিষ্ট্য হল এই ধর্মের কোনও প্রবক্তা নেই, অন্যান্য ধর্মের মতো প্রচার বা প্রসারের কোন চল নেই। জাপানের সংস্কৃতিতে প্রোথিত আছে শিন্তো ধর্মের মূল। সেই অর্থে দেখতে গেলে শিন্তো, ধর্ম কম দর্শন বেশি। শিন্তো শব্দের মানে হল 'ঈশ্বরের পথ।যুগে যুগে জাপানের মানুষের সমাজ জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এবং বিদেশিদের প্রভাবে কামীর স্বরূপ বদলেছে কিন্তু বদলায়নি তার বিস্তৃতি। প্রচলিত বিশ্বাস আর নির্দিষ্ট কিছু আচার আচরণের মধ্যে দিয়ে এই ধর্ম শত শত বছর পেরিয়ে আজও জাপানের আশি শতাংশ মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আজও এই একবিংশ শতাব্দীতেও নতুন বছর শুরুর দিন তারা কনকনে ঠান্ডা জলে দাঁড়িয়ে শুদ্ধিকরণে বিশ্বাসী।
     
    কিয়োতোতে যেখানে থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে তাকে হোটেল না বলে গেস্ট হাউস বলাই ভাল। খুবই পরিচ্ছন্ন থাকার বন্দোবস্ত। আমদের জন্য দোতলায় একটা আট বিছানার ডরমেটরি বুক করা হয়েছিল। নীচে বাসনপত্র সমেত একটা রান্নাঘর আছে, আছে কাপড় কাচার মেশিন। সেখানে কয়েন ব্যবহার করে কাপড় কেচে শুকোনোর ব্যবস্থা আছে। এই কয়েন দিয়ে কাপড় ধোয়ার মেশিন জাপানের শহরগুলোতে পাবলিক টয়লেটের মতোই রাস্তাতে বসানো আছে। নিশিকশাইতে ছুটির দিনে মেশিনগুলোর সামনে ভীড় উপচে পড়ে। দেখলাম গেস্ট হাউসে অনেক বিদেশিও আছেন। আমরা সঙ্গে করে কিছুটা গোবিন্দভোগ চাল আর ঘি নিয়ে গেছিলাম। কারণ জাপানের খাবারে আমরা কেউই অভ্যস্ত নই তাই রেস্ট্রুরেন্টে গিয়ে খাবার খাওয়া আমাদের পক্ষে বেশ অসুবিধাজনক। আমাদের ছানাগুলো অবশ্য গেস্ট হাউসে আসার আগে একটা দোকান থেকে বেন্টো বক্স কিনে নিয়ে এসেছিল। বেন্টো বক্স সম্বন্ধে দুচার কথা বলবার লোভ সামলাতে পারছি না। জাপানের বেন্টো বক্সের গায়েও লেগে আছে ইতিহাসের গন্ধ। নিছক প্রয়োজন থেকে জাত্যাভিমানের প্রতীক হয়ে উঠতে এই বেন্টো বক্সের লেগেছে বেশ কয়েক শো বছর। প্রথাগতভাবে বেন্টো বক্স বস্তুটি হল বাঁশ বা কাঠের তৈরি বাক্সের ভেতর সুষম পুষ্টিকর খাবার এক সঙ্গে প্যাক করা থাকে। 

    জাপানের এর চল শুরু হয় কামাকুরা পর্যায়ে, আজ থেকে আটশো বছর আগে। সে সময়ে সাধারণ মানুষ কাজে যাওয়ার আগে ছোট্ট ব্যাগে চাল রান্না করে তারপর শুকিয়ে খাওয়ার জন্য সঙ্গে নিত। পরবর্তী সময়ে এই আজ থেকে দুশো বছর আগে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার সময় কোমরে খাওয়ার বাক্স বেঁধে নিয়ে যেতে শুরু করল সাধারণ মানুষ। কি থাকত এই কোশি বেন্টো বক্সে? রাইস বল, সামুদ্রিক জীব, মাসরুম, আচার, বাঁশ গাছের কান্ড দিয়ে বানানো সব্জি এই সব দিয়ে প্যাকড লাঞ্চ বানানো হতো। উনিশ শতকের শেষে জাপানে রেল ব্যবস্থা চালু হল তখন রেল স্টেশনে পাওয়া যেতে লাগল একিবেন্টো। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে বেন্টো বক্স হয়ে দাঁড়ালো পয়সাওয়ালা মানুষের আভিজাত্যের প্রতীক। তখন সদ্য বাজারে আলুমিনিয়ামের চল হয়েছে। এই হল বেন্টো বক্সের বিবর্তনের ইতিহাস। মাঝে জনপ্রিয়তা হারালেও মাইক্রোওভেনের উদ্ভব হওয়ায় আর আধুনিক শহুরে জীবনশৈলিতে রান্না করার উৎসাহ কমায় বেন্টো বক্স আম জাপানীর পুষ্টির দায়িত্ব গ্রহন করেছে সন্দেহ নেই। অফিস ফেরতা কোন রেস্ট্রুরেন্টে বসে বা কনভিনিয়েন্ট স্টোর থেকে একটা বেন্টো বক্স কিনে নিলে পুষ্টি নিয়েও ভাবনা নেই আর রান্না করার খরচ বা হ্যাপা কোনোটাই নেই। বাচ্চাদের আনা বেন্টো বক্সে উঁকি দিয়ে দেখলাম তাতে আছে অল্প চটচটে জাপানী ভাত ওপরে একটু কালো তিল ছড়ানো, সঙ্গে চিকেন পকোড়ার মতো বেশ কয়েকটা চিকেন ভাজার টুকরো, কিছুটা স্যালাড আর একটা রান্না করা  সব্জি। এই গেল বেন্টো বক্সের ইতিকথা।  

    ঠিক হল কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে প্রথমে গিওন কর্ণার যাব তারপর ইয়াসিকা স্রাইন আর ফুশিমি ইনারি স্রাইন হয়ে রাতে ফিরব। অন্য সদস্যরা বিছানার কোমল সুখ পেয়ে নড়তে চাইল না। অতএব রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়ে আমরা দু'বোন বেরিয়ে পড়লাম সুন্দরী কিয়োতোর নৈশ সৌন্দর্য উপভোগ করব বলে। সে রাত আমার জীবনে এক অনন্য অভিজ্ঞতার রাত। বিদেশের মাটিতে আমরা দুই মহিলা সেই রাতে এক অনবদ্য স্বাধীনতার আস্বাদ পেয়েছিলাম, যে স্বাধীনতা আমার নিজের দেশে চল্লিশ বছরের জীবনে পেতে পারিনি। কোনো এক আসন্ন বিপদের ভয়ে পুরুষ সঙ্গী ছাড়া রাতের বেলা নিজের দেশে এমনভাবে ঘুরে বেড়ানোর কথা কখনও ভাবতেও পারিনি। তাই সেই রাত, বিদেশের মাটিতে নিজের স্বাধীন সত্ত্বাকে ছুঁয়ে দেখার সেই অবসর আমাদের মধ্যে এই বোধ জাগিয়ে তুলেছিল যে গড়ে তোলা যদি সভ্যতা হয় তবে সেই উন্নত সভ্যতাকে বয়ে নিয়ে চলাই সংস্কৃতি। আর জাপানের সংস্কৃতি নারীকে সেই মর্যাদা দিয়েছে যেখানে সে নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে। রাতের শহরে সে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়াতেও পারে।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন