এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হোটেল ম্যানেজার - ৮ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ২২৪ বার পঠিত
  • নিখিল রাস্তায় বেরিয়ে এসে কলটা রিসিভ করল— ‘ হ্যালো.... কি ব্যাপার ? ‘
    ওদিক থেকে মধুর ব্রীড়া মাখানো গলায় অনিন্দিতার কথা  শোনা গেল— ‘ তুমি আমার ওপর খুব রাগ করে আছ, না ? সেটাই স্বাভাবিক.... কিন্তু বিশ্বাস কর ....’
    নিখিল অনিন্দিতার কথা আগে বাড়তে দেয় না। কড়কড়ে দশ হাজার টাকা বেহাত হবার শোক এখনও ফিকে হয়নি তার । সে বেশ কর্কশ ভঙ্গীতে বলল, ‘ ওসব ফালতু নকড়া ছাড়। অাসল ধান্দাটা কি বলতো সোনা ! ‘
    — ‘ তুমি এত রাগ করে থেক না.... আমার কোন উপায় ছিল না..... আমি বাধ্য হয়ে.... তোমার সঙ্গে দেখা হলে সবকিছু বলব.... ‘
    — ‘ আমার সঙ্গে কোথায় দেখা করবে ? ‘
    — ‘ কেন ওই তিলোত্তমায় । অসুবিধে হবে ? ‘ অনিন্দিতা কন্ঠের মধুরতা বজায় রাখে।
    — ‘ সুবিধে অসুবিধের ব্যাপার নয়। আমি এখন কাঁথিতে নেই।’
    — ‘ তবে .... তবে কোথায় আছ ?’
    — ‘ কলকাতায় । একটা কাজে এসেছি। ‘
    — ‘ ও :  তাই বল । আমি তো ভাবলাম ট্রান্সফার টার হয়ে গেলে বুঝি .... যাক ফিরছ কবে ? ‘
    — ‘ কেন বলতো সোনা ... তোমার ধান্দাটা কি ? আমি যেদিনই ফিরি না কেন , তুমি আর আমার সঙ্গে দেখা করো না। আমি ধরে নেব আমার দশ হাজার টাকা হারিয়ে গেছে। তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। অমন সাহিত্যবোধসম্পন্ন একটা মেয়ে যে এরকম হতে পারে তা তোমার সঙ্গে যোগাযোগ না হলে বিশ্বাস করতাম না। যাক যা গেছে তা গেছে। এনাফ ইজ এনাফ। সম্পর্কটায় এখানেই ইতি টানার দরকার।’
    এইখানে অনিন্দিতা তীব্র কন্ঠে মুখর হয়ে ওঠে , ‘ না নিখিল তা হয় না। আমাদের সম্পর্কে কখনও ইতি পড়তে পারে না। আমাদের বন্ধুত্ব সব গতানুগতিক সম্পর্কের অনেক ওপরে। আমরা দুজন....’
    নিখিল আর থাকতে না পেরে বলে উঠল, ‘ ব্যাস ব্যাস.... আর বাজে বকো না। এবার থাম তুমি। এখন আর কথা বলতে পারছি না। ঠি ক আছে কাল পরশুর মধ্যে ফিরব আমি কাঁথিতে.... তখন দেখা হবে।’
    বলে নিখিল লাইন কেটে দেয়। নিখিল পোড় খাওয়া লোক। সে জানত টাকার ধান্দায় অনিন্দিতা আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। নিখিল মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ভালিয়ে টাকাটা আদায় করার চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে যে, ওভাবে জীবনেও কাজ হাসিল হবে না। তাই সে রুক্ষ রাস্তাটাই নিল। তাছাড়া অনিন্দিতার ওপর তার রোমান্টিক নেশা গেছে কেটে।
       ঘরে ঢুকতেই মৃদুলা জিজ্ঞেস করল, ‘ কি হল, কার ফোন এসেছিল ? ‘
    — ‘ ও..ই অফিসের ফোন। বিকাশ ফোন করেছিল। একটা ফাইল খুঁজে পাচ্ছে না। তাই.... ‘
    মৃদুলা একথা শুনে মুখটা কেমন ব্যাঁকা মতো করে অদ্ভুতভাবে হেসে বলল, ‘ অফিসের ফো...ন ! তা, তার জন্য বাইরে গিয়ে কথা বলতে হল ! ‘
    —‘ হ্যাঁ, ঘরের ভেতর নেট পাওয়া যায় না ঠিক মত.... । তাই.... খুব মুশ্কিল হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন .... চলে না এভাবে .... শোনা যায় না কিছু ..... ‘ নিখিল নানারকম অসংলগ্ন সাফাই দেয়।
    মৃদুলা আবার মুখটা ব্যাঁকা মতো করে শ্লেষ মাখানো শব্দ নি:সরণ করে ,  ‘ একদম ঠি ক .... একদম ঠি ক ....এভাবে চলে না মোটেই চলে না।’
    দুদিন পরে নিখিল কাঁথির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। বেরোবার ঘন্টাখানেক আগে আট হাজার টাকা বার করে মৃদুলার হাতে দিল। ‘দু নম্বরী‘ আমদানিটা  নি:সঙ্কোচে হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিল মৃদুলা। মুখটা আর মোটেই ব্যাঁকা মতো দেখাচ্ছিল না। বেশ চাঁদপানা হয়ে উঠল। এটা সংসার খরচের বাইরে অতিরিক্ত টাকা। বোধহয় সামনে পুজো আসছে বলে কেনাকাটার টাকা। দুই মেয়েকে লুকিয়েই বৌকে টাকাটা দিল নিখিল। বোধহয় ঘুষ হিসেবে। ঐশীর ব্যাপারটা আপাতত: চাপা পড়ে রইল। ধর্ষণের ফলে ঐশীর যদি গর্ভসঞ্চারঘটিত সমস্যার উদ্ভব হয় তাহলে কি হবে তা নিয়ে এক্ষুণি মাথা ঘামাতে চাইল না নিখিল । 

       সোমবার দিন নিখিল ভোরের  বাসে রওয়ানা দিল। দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ পৌঁছে অফিসে যাবার ইচ্ছে আছে।  একগাদা পার্টির আসার কথা আছে। সামনে পুজো আসছে। এই মরশুমে ভালরকম আমদানির দরকার। সংসার তো হাঁ করে আছে। যত ফেলবে তত গিলবে। টাকার অনন্ত ক্ষুধা এ সংসারের ।
    বাস থেকে নেমে সোজা অফিসে গেল। অফিসে ঠি ক ঢোকার মুখে নিখিলের মোবাইল বেজে উঠল। অনিন্দিতার ফোন। নিখিল কলটা নিল। ওদিক থেকে অনিন্দিতা রীতিমতো ব্যস্ত গলায় বলে উঠল, ‘ নিখিল তুমি কাঁথিতে ফিরেছ ? ‘
    নিখিল সত্যি কথাটাই বলল। উত্তর এল, ‘ ঠি ক আছে , আমি সন্ধে সাতটা নাগাদ যাব। আজ রাত্রে তিলোত্তমাতেই থাকব।’
    এতে নিখিলের সম্মতি আছে কিনা সে প্রশ্নের ধার কাছ দিয়েই গেল না।

    সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরাট পন্ডিত ব্যক্তি। তিনি পদার্থবিদ, বৈজ্ঞানিক, অধ্যাপক এবং অনেক বিজ্ঞান গ্রন্থের লেখক শুধু নয় সমাজসংষ্কারমূলক চিন্তাবিদও বটে।বিকেলবেলায় দুলাল সরকার ব্যস্ত হয়ে পড়ল সূর্যকান্তকে নিয়ে। তিনি কাঁথি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে এক সায়েন্স সেমিনারে বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। কলেজের ফিজিক্সের বিভাগীয় প্রধানের তিনি বিশেষ পরিচিত। তার আমন্ত্রণেই তিনি এসেছেন।সভাগৃহের দরজা ছিল সবার জন্য অবারিত এবং উন্মুক্ত।আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল অনেককে। দু:খের বিষয় গুটিকয়েকের বেশি শ্রোতা পাওয়া গেল না। এটা কোন নাচ গানের ধামাকাধর্মী মাচা নয়। কজন আর আগ্রহী হবে এতে ! কুড়িয়ে বাড়িয়ে জনা চল্লিশ। তার মধ্যে বেশির ভাগই কাঁথি কলেজের লোক। যাই হোক, তা নিয়ে জ্ঞানতপস্বী সূর্যকান্তের কোন নৈরাশ্য দেখা গেল না। তিনি উদার আগ্রহে অতি প্রাঞ্জল ভাষায় ব্ল্যাক হোল, গড পার্টিকল থেকে বোসন কনা পর্যন্ত নানা তত্ত্ব আলোচনা করলেন আলোক উদ্ভাসিত আনন্দে। ঠি ক যেন কোন ক্লাস নাইনের ছাত্রকে বিজ্ঞান বোঝাচ্ছেন। তার শ্রোতার সংখ্যা কত তিনি খেয়ালই করলেন না। এরপর তিনি সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন। সারা পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের সমানাধিকার এবং সমাজতন্ত্রের বিবর্তন এবং ক্ষয় সম্পর্কে নতুন নতুন দিক উন্মোচন করলেন তার ভাষণে। সেখানে উপস্থিত সামান্য সংখ্যক কিছু মানুষ হয়ত তাতে আলোকিত হল। 
    আজ রাতটা সূর্যকান্ত স্যারকে কাঁথিতে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করা হল। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু কারো বাড়িতে থাকতে রাজি হলেন না। বললেন, কারো আতিথ্য গ্রহন করতে তিনি অত্যন্ত বিড়ম্বিত বোধ করেন। 
    ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের এইচ ও ডি  বিভাঙ্কুরবাবু তিলোত্তমা লজে সূর্যকান্তের সেদিন রাতটা থাকার ব্যবস্থা করলেন। কারণ কোন দামী হোটেলে তিনি উঠবেন না এটা বিভাঙ্কুর মৈত্র জানেন।

      সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান বয়স সাতষট্টি বছর। তিনি একদমই রাশভারি গম্ভীর প্রকৃতির নয়। চুপচাপ থাকতে পারেন না। সবসময়েই কোন একজনকে চাই তার, যে কোন একটা বিষয়ে কিছু না কিছু বলার এবং শোনার জন্য। যেমন এখন তিলোত্তমার কাউন্টারে ম্যানেজার দুলালচন্দ্র সরকারকে পেয়ে গেলেন। 
    সন্ধে সাতটা এখন। সূর্যকান্ত স্যারের বেঁটেখাটো চেহারা।ফর্সা রঙ। দোহারা গড়ন। গালে কাঁচাপাকা দাড়ি। দুলাল স্যারের জন্য তিনতলায় কুড়ি নম্বর ঘরটা রেখেছে। ওনাকে ওখানে  পৌঁছে দিতে পারলে বাঁচে দুলাল। কিন্তু সূর্যকান্তবাবু লোকজন ছাড়া থাকতে পারেন না। নির্জনে তপস্যা করা তার ধাতে নেই। তিনি দুলালের কাউন্টারের সামনে রাখা একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। বিদ্যার মহীরুহের সামনে দুলাল প্রবল কুন্ঠার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইল। এনাকে কুড়ি নম্বরে গ্যারেজ করে দিতে পারলে দুলাল হাঁফ ছেড়ে বাঁচত। কিন্তু তা হবার নয়। তিনি দুলালকে বললেন, ‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন ? বসুন না । ‘
    দুলাল ভীষণ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল— ‘ না... মানে.... এ..ই 
    ঠি ক আছে .... ‘ বলতে বলতে নিরুপায় হয়ে কাউন্টারের সামনে রাখা আর একটা চেয়ারে বসল। 
    কিন্তু দুলালের যাবতীয় কুন্ঠা ও অস্বস্তি দুমিনিটের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। সূর্যকান্ত স্যার জ্ঞানবিজ্ঞানের কোন প্রসঙ্গের ধার কাছ দিয়ে গেলেন না।ঘরে 
    টি ভি-টা চালু ছিল। ওখানে আই লীগের একটা পুরণো খেলা দেখাচ্ছিল। তিনি সে দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ না: .... মোহনবাগান এবারে আর লীগ পাবে না মনে হচ্ছে। আর পেয়েই বা লাভ কি । সবই তো ভাড়া করা বিদেশী প্লেয়ার। তারাই তো সব টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে।’
    দুলালের সব অস্বস্তি ঝরে পড়ে যায়। সে মুহুর্তের মধ্যে অন্তরঙ্গ বোধ করতে থাকে। সে স্যারের কথায় সম্পূর্ণ ঐক্যমত প্রকাশ করে— ‘ হ্যাঁ স্যার.... একদম খাঁটি কথা বলেছেন। আমাদের ছেলেগুলো কিছু করতে পারছে না....’
    সেই শুরু হল। তারপর দুলাল এই লজে কতদিন চাকরি করছে। এই লজটা কতদিন হয়েছে, মোট কটা ঘর আছে, কাঁথি জায়গাটা কেমন, শীতকালে কেমন ঠান্ডা পড়ে, বর্ষাকালে কেমন বর্ষা হয়, সেবার সাইক্লোনে কতটা ক্ষতি হয়েছে এখানে, এখানে চাষবাসের হাল কেমন, চাষীদের কি হাল,ব্যবসার অবস্থা কেমন — কথায় কথায় নানা কথা বলতে থাকলেন তিনি, নিতান্তই ঘরোয়া, আটপৌরে বাক্যালাপে। মনে হতে লাগল, দুলাল যেন তার বহুকালের পুরনো বন্ধু। জ্ঞানবিজ্ঞানের আবডাল ভেঙে স্যারের সঙ্গে পরম স্বতস্ফূর্ততায় ওতপ্রোত হতে লাগল দুলাল। তার মতো একজন অকিঞ্চিৎকর মানুষের সঙ্গে সূর্যকান্ত স্যার যে এতটা সময় দিচ্ছেন তাতে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধায় দুলালের মাথা নুয়ে পড়তে লাগল। এই উচ্চতার কোন মানুষের সংস্পর্শে দুলাল আগে কখনও আসেনি। সে ভাবল, এত বড় মাপের একজন মানুষের কাছে নিজের ছোট ছোট কিছু দু:খ নিবেদন করতে লজ্জার কি আছে, সংকোচেরই বা কি আছে। সে সূর্যকান্তবাবুর একটানা বাক্যস্রোতে একটা ছোট বিরতির জন্য অপেক্ষা করে ছিল। 
    সেই ফাঁকটা পেল খানিকক্ষণ পরে।সে বলল, ‘ স্যার .... কিছু যদি মনে না করেন..... একটা কথা বলব ? ‘
    — ‘ হ্যাঁ নিশ্চয়ই। বলুন না। আমি কারো কথায় কিছু মনে করি না। সত্য সত্যই থাকে , সত্যকে কখনও মিথ্যা প্রতিপন্ন করা যায় না.... ‘ ।
    ব্যাপারটা জটিল দিকে মোড় নিচ্ছে দেখে দুলাল রাশ টেনে ধরবার চেষ্টা করে— ‘ না স্যার ... মানে .... ওরকম কিছু না ..... আমি বলছিলাম যে, যা বাজার পড়েছে সংসার চালানো খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। আপনাকে বলতে লজ্জা নেই খুব কষ্টেসৃষ্টে লাইফ চলছে।তাই .....’
    দুলালের কথা শেষ হয় না।সূর্যকান্তবাবু কথাটা ধরে নেন— ‘নিশ্চয়ই ..... এই কথাটাই তো আমি সবাইকে বলি। মানুষকে যদি ভাল রাখতে না পার তা হলে বিজ্ঞান চর্চা করে লাভটা কি ! হ্যাঁ কি যেন বলছিলেন আপনি ?’
    দুলাল আর সময় নষ্ট করে না।বলে— ‘ আপনার তো অনেক জায়গায় চেনাজানা।যদি কাউকে বলে মোটামুটি একটা জায়গায় কোন চাকরির ব্যবস্থা করে দেন.....’
    — ‘ চাকরি ! কার ? ‘ 
    — ‘ আমার স্যার । খুব কষ্টে আছি । স্ত্রী অসুস্থ.... ভীষণ টানাটানি .... এই মাইনেতে চলে না। ‘
    সূর্যকান্ত স্যারের মুখে ব্যথার ছায়া পড়ল । বলেন, ‘ বটেই তো, বটেই তো..... আমি বুঝি.... আমি বুঝি.... কত লোক কত কষ্ট পাচ্ছে..... নিশ্চয়ই চেষ্টা করব আপনার জন্য। আপনার বায়োডাটাটা..... আচ্ছা ঠি ক  আছে তার দরকার নেই। এই নিন আমার কার্ড। ওতে আমার অ্যাড্রেস দেওয়া আছে। ফোন নাম্বারও দেওয়া আছে।আমি কলকাতায় রিপন স্ট্রীটে থাকি। আমাকে দুদিন আগে ফোন করে নিয়ে ওখানে আমার কাছে চলে আসবেন।তারপর দেখা যাক .....’
    — ‘ আপনাকে আমি কি বলব স্যার বুঝতে পারছি না। আপনি এতবড় একজন মানুষ হয়ে আমার মতো একজন সামান্য মানুষের এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন..... ‘
    সূর্যকান্ত স্যার সোজা তাকালেন দুলালের দিকে। প্রসন্ন মুখে বললেন, ‘ নাগো দুলালবাবু..... এ ব্রহ্মান্ডে ছোট বড় বলে কিছু নেই। আসলে এই বিশাল অসীম অনন্ত মহাবিশ্বে  আমরা সকলেই অতি ক্ষুদ্র। তোমাতে আমাতে কোন তফাৎ নেই।’
    দুলাল বিভোর হয়ে স্যারের কথা শুনতে লাগল। 
    ঠি ক এই সময়ে নিখিল অফিসের কাজ সেরে লজে এসে পৌঁছল। আশ্চর্যের ব্যাপার উল্টোদিক দিয়ে অনিন্দিতাও সেই মুহুর্তে তিলোত্তমার গেটে এসে পৌঁছল। মুখামুখি দেখা হয়ে গেল দুজনে।

       বাপি ট্রেতে করে ক গ্লাস চা নিয়ে ওপরে গেল। দু একটা ঘরে চায়ের গ্লাস নামিয়ে দিয়ে ছ নম্বরের দরজায় টোকা দিল।অমিতাভ ভেতর থেকে বলল, ‘ খোলা আছে। ভেতরে আয়।’ 
    ............      ...........     .............
     
    অনিন্দিতা একগাল হেসে বলল, ‘কখন ফিরেছ ? চল ওপরে চল ।’
    নিখিলের রোমান্সের মৌতাত গেছে ধুয়ে। সে এত সহজে গলল না। সে জানে অনিন্দিতা কোন বড় ধান্দায় এখানে এসেছে।
    সে বলল, ‘ ওপরে যাবার দরকার নেই। যা বলার এখানেই বল।এ পাশে সরে এস।’ বলে চা সিঙ্গাড়ার দোকান ছাড়িয়ে ফাঁকা জায়গাটার দিকে হাঁটতে লাগল নিখিল । অনিন্দিতাও বাধ্য হয়ে তাকে অনুসরণ করল।
     ওখানে একটা ঝোপ রয়েছে।তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ বল , কি বলবে।’
    অনিন্দিতা কয়েক মুহুর্ত সময় নিল। তারপর কোন ভূমিকা না করেই বলল, ‘ একটা পুলিশ কেস হয়েছে .....জামিন পাওয়া যায়নি।’
    নিখিল চমকে ওঠে । এতটা সে আশা করেনি। ভেবেছিল অনিন্দিতা টাকা পয়সা চাইবে।
    — ‘ পুলিশ কেস ! .....তার মানে ? কার নামে ? ‘
    — ‘ আমার স্বামীর নামে। ‘
    নিখিল আকাশ থেকে পড়ে — ‘সে কি ! ! কেন ? ....কি করেছে ? ‘
    — ‘ আমার ভাসুর মার্ডারড হয়েছে । সাসপেক্ট হিসেবে পুলিশ আমার হাসব্যান্ডকে ইমপ্লিকেট করেছে। ‘
    — ‘ ইমপ্লিকেট করেছে মানে ? উইদাউট কগনিজিবল এভিডেন্স কেস দেওয়া যায় নাকি ?’
    — ‘ প্রাইমা ফেসি এভিডেন্স কিছু পাওয়া গেছে। সেই বেসিসে....’
    —- অঁ.... তা আমায় কি করতে হবে ?’
    — ‘ বেল-এর ব্যবস্থাটা করতে হবে । কোন কনক্রিট এভিডেন্স তো নেই। উইটনেসও নেই। বেল পেতে অসুবিধে হবার কথা না। কিন্তু কেসটা ঠি ক  মতো সাজাতে না পারলে বেল নাকচ হতে পারে। তাই....’
    — ‘ তাই... কি ?’
    — ‘ একটা ভাল লইয়ার দরকার।’
    — ‘ তুমি আমাকে কি ভাব বলতো ? আমি কি বিরাট শাহেনশা নাকি ? উকিল দরকার তো আমি কি করব ? আচ্ছা জ্বালা .... আমি বলে সরকারি অফিসের একটা ক্লাস থ্রি এমপ্লয়ি.... কবে কোথায় পাঠায় তার নেই ঠি ক.....আমি কিনা....’
    — ‘ না নিখিল, ও কথা বোল না। ওটা তোমার বাহ্যিক পরিচয়।তোমার আসল শক্তি বা ক্ষমতা এসবের বাইরে। সেটা অনেক বেশি।’ অনিন্দিতা গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে। তারপর বলে, ‘ একটা উপযুক্ত ক্রিমিনাল লইয়ারের ব্যবস্থা তোমাকে করে দিতে হবে।’
    — ‘ না না আমার দ্বারা ওসব হবে না। আচ্ছা একটা কথা স্পষ্ট করে বলতো ..... তোমার কি মনে হয় তোমার বর সত্যিই মার্ডারটা করেছে, নাকি এটা পুলিশের সাজানো ?’
    — ‘সত্যি কথা বলতে কি সঠিক জানি না। ভাসুরের ওপর ওর একটা সন্দেহ তো ছিলই। কিন্তু এখন সেসব ভেবে লাভ নেই। এখন আমার লক্ষ্য হল ওকে বাঁচানো। তার জন্য যা করতে হয়.... ।তোমার কাছে শুধু উকিল নয় , টাকার সাহায্যও চাইতে এসেছি..... যতটা তোমার পক্ষে সম্ভব।তার বদলে আমার সব কিছু নিয়ে নাও ..... কোন আপত্তি নেই। ‘ বলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে অনিন্দিতা। এমন একটা অদ্ভুত চরিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিখিল বিপুল বিভ্রান্তিতে হয়রাণ হতে থাকে। চাপা পড়ে যায় তার চুরি যাওয়া দশ হাজার টাকার প্রসঙ্গ ।
      ( ক্রমশ: )
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে প্রতিক্রিয়া দিন