ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • স্প্রিন্টার - ৮

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৭ জানুয়ারি ২০২২ | ২৭৫ বার পঠিত
  • এর মধ্যে মোহিনীমোহন ও নিরুপমার মেয়ে জামাই বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ একদিন এসে হাজির। নিরুপমা ভাবলেন নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। অন্তত বছর তিনেক বাপ মায়ের কোন খোঁজখবর নেয় না। ছেলেমেয়েরা কেউ আসেনি অবশ্য। যেমন মেয়ে শর্মিষ্ঠা তেমন জামাই বাবাজি জয়ন্ত। দুটোই সমান মতলববাজ। যেমন দ্যাবা তেমনি দেবী।পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে নিরুপমা অনুমান করল জোড়ে নিশ্চয়ই ছক কষছে মোহিনীবাবু মারা যাবার আগেই বাড়িটা নিজেদের নামে লিখিয়ে নেবার জন্য। নিরুপমা ভেবে পান না এত তাড়াহুড়ো কিসের। তারা মরলে বাড়িটা তো নিয়মমাফিক এমনিই পাবে শর্মিষ্ঠা। তাদের গত হওয়া পর্যন্ত তর সইছে না বোধহয় মেয়ে জামাইয়ের।

    নিরুপমা ভাবেন, মেয়েরাই সাধারণত: মা বাবার অবলম্বন হয় ছেলে যদি না-ও দেখে। কিন্তু তাদের কি কপাল....। বাবলু মোটেই এরকম ছিল না। তার পুরো রোজগারটাই বাবার হাতে তুলে দিত।
    —‘কিরে .... তোদের কি খবর ? কতদিন কোন খোঁজখবর নেই ..... তোর বাবার শরীর তো খুব খারাপ .... কোন কিছু মনে রাখতে পারে না ..... মাঝে মাঝে শুধু বাবলুর নাম করে..... ভাগ্যিস একটা বাচ্চা ছেলে ..... সে একজন সাঙ্ঘাতিক ভাল খেলোয়াড়.... সে এখানে এসে পড়েছিল .... সেই তো বলতে গেলে সুস্থ করল ..... ও: সে কি বিপদ গেছে আমাদের .....‘
    —‘আর বল কেন .... আমাদের মরার সময় নেই ...... হ্যাঁ কি যেন বলছিলে .... খেলোয়াড় না কি ....’
    নিরুপমা ভাবলেন এদের সঙ্গে এসব বৃত্তান্ত আলোচনা না করাই ভাল।
    তিনি কথাটা ঘুরিয়ে দিলেন,‘হ্যারে ....ফুচান আর বেচু কেমন আছে ?‘
    —‘ওরা ভাল আছে। ফুচান এল আই সি-তে চাকরি করছে এই বছরখানেক হল, আর বেচু বিএস সি ফাইনাল ইয়ার। ওদের খুব নিয়ে আসার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আজকালকার ছেলেমেয়ে তো।তারপর বড় হয়ে গেছে .... বাবা মায়ের কথা শুনলে তো।’
    নিরুপমা মনে মনে ভাবলেন, তোমাদেরই তো ছেলেমেয়ে।কত ভাল আর হবে!
    মোহিনীমোহনবাবু এই মুহুর্তে একদম স্বাভাবিক অবস্থায় আছেন। তিনি মেয়ে জামাইয়ের আগমনে বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি খুব মন দিয়ে একটা বাংলা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। কাগজ থেকে মুখ না তুলেই দায়সারা ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করলেন‘রাত্রে খাওয়াদাওয়া করে যাবি তো ?‘
    এতে দুটো বক্তব্য একসঙ্গে রাখা হল — এক, এখানে রাত্রিবাস করার আদৌ কোন প্রস্তাব নেই। আর দুই, নৈশাহার করে যাবার কোন জোরাল অনুরোধ নেই।
    তবে শর্মিষ্ঠা-জয়ন্ত দম্পতির গায়ের চামড়া একটু মোটা। তারা এতে মোটেই হতাশ বা অপমানিত বোধ করল না।
    খুব স্বাভাবিক গলায় জামাই বাবাজি বলল,‘হ্যাঁ ডিনারটা করে গেলেই ভাল হয়। বেশি রাত হয়ে গেলে অবশ্য রিটার্ন করা মুশ্কিল হয়ে যাবে.... বেশি রাতে ওদিকের রাস্তাটাও সেফ নয়। একেবারে রাউডি ডেন হয়ে গেছে। ইন দ্যাট কেস নাইটটা এখানে স্টে করে যাওয়াই ভাল।‘
    শর্মিষ্ঠা তার কথা সমর্থন করে বলল,‘হ্যাঁ .... সেটাই।‘
    মোহিনীবাবু এখন কোন ডেলিউসরি ডিসঅর্ডার-এর ঘেরাটোপে নেই। শুভর বন্য গতির রশ্মি যে তার মস্তিষ্কের এক কোণে উজ্জ্বল আলো ফেলেছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
    মোহিনীবাবু তার মেয়ে জামাইয়ের এখানে রাত্রিবাসের ব্যাপার নিয়ে নাড়াঘাটা সরাসরি খারিজ করে দিলেন। তিনি মেয়েকে বললেন,‘না না .....দিনকাল ভাল না .... সন্ধের মুখেই বেরিয়ে পড়া ভাল।এখানে শুবি কোথায় ? বিকেলে জলখাবারের ব্যবস্থা করছি। চাউমিন খাবি তো ? নাকি ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন ? কালীপদর দোকানে ফোন করছি। সাড়ে ছটা নাগাদ দিয়ে যাবে গরম গরম।দারুন বানায় ওরা। আমার ওসব খাওয়া বারণ। এক সময়ে প্রচুর খেয়েছি ..... আ: অপূর্ব অপূর্ব ...’
    মোহিনীবাবু নানা অবান্তর কথার কৌশলে কথাবার্তার ধারা অন্য খাতে নিয়ে যেতে চাইছেন। মেয়ে জামাইয়ের অভিসন্ধি সফল না হতে দেবার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর। তিনি ঠি ক করেই নিয়েছেন ওদের কিছুতেই রাত্রে এখানে থাকতে দেবেন না। এদের রাত্রে এখানে থাকতে দেওয়াটা তাদের বুড়ো বুড়ির পক্ষে মোটেই নিরাপদ হবে না। কোন বিশ্বাস নেই ওদের।
    নিজের মেয়ের সম্বন্ধে এধরণের ভাবনা চিন্তা বহন করা সত্যিই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু নিরুপমাদেবীদের বিষাক্ত পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের মনের ভিতর জ্বালাময় ক্ষতচিহ্ন জাগিয়ে রেখেছে। তারা আর তাদের মেয়ে জামাইকে বিশ্বাস করেন না। বড় দুর্বিষহ এ যন্ত্রনা। অপরিমেয় বিষয় বাসনা যে মানুষকে
    কোথায় নিয়ে যেতে পারে শর্মিষ্ঠারা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।ওসব কথা মোহিনীবাবুরা মনে রাখতে চান না, তবু ঘুমন্ত ঢেউ কখনও কখনও জেগে ওঠে মনের পাথারে।
    সে যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ফ্রায়েড রাইস চিলি চিকেন অর্ডার হল। মোহিনীবাবুদের চাঁচাছোলা প্রত্যাখ্যানের পরও নির্লজ্জভাবে গপগপ করে খেয়ে নিল। তারপর বাধ্য হয়ে সন্ধে সাতটা নাগাদ ওখান থেকে বিদায় নেবার জন্য তৈরি হল একটা ক্যাব বুক করে।

    শর্মিষ্ঠারা সবে দরজার বাইরে পা রেখেছে সেই সময়ে দরজার সামনে শুভ আবির্ভূত হল।
    মোহিনীমোহনের ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু নিরুপমা সরল মনে বলে বসলেন,‘এই যে..... ওই যে খেলোয়াড়ের কথা বলছিলাম না.... এই হল সেই দৌড়বীর। সাঙ্ঘাতিক দৌড়য় ..... কেউ পারে না ওর সঙ্গে ....’
    শর্মিষ্ঠা কোন কথা না বলে শুভর দিকে তাকিয়ে আপাদমস্তক মাপতে লাগল। তার স্বামী জয়ন্ত বলে উঠল,‘ও আচ্ছা .... স্প্রিন্টার ..... মানে অ্যাথলিট। কোথায় কমপিট করে, স্কুল লেভেলে নাকি ?‘
    —‘আমি অলিম্পিকের জন্য তৈরি হচ্ছি’, শুভ শান্ত গলায় জানায়।
    এ কথায় জয়ন্ত হো হো করে হেসে উঠল। বলল,‘খুব মজার ছেলে দেখছি.... বেশ রসিক কিন্তু .... দারুন .....’
    নিরুপমা বলল,‘কোন রসিকতার ব্যাপার নেই এতে জয়ন্ত.... কথাটা জলজ্যান্ত সত্য।’
    —‘তাই নাকি! কিরকম .... কিরকম ?‘
    —‘সেটা কিছুদিনের মধ্যেই জানতে পারবে।‘
    —‘আচ্ছা! এইরকম ব্যাপার ?‘
    তারপর ঠোঁটের কোনে একটা ব্যাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,‘অপেক্ষায় থাকব .... অপেক্ষায় থাকব ..... বেশ ইনটারেস্টিং ব্যাপার কিন্তু.... একেবারে অ..লি...ম্পিক! তা ভাল .... হায় ভগবান .... জোক অফ দি সেঞ্চুরি ....‘
    এবার মোহিনীবাবু বললেন,‘হ্যাঁ বাবা সেই ভাল .... অপেক্ষায় থেক .... তোমরা এবার বেরিয়ে পড় ..... দুগ্গা দুগ্গা..... রাত বেড়ে যাচ্ছে .... আর মেলা দেরি করা
    ঠি ক না ..... রাউডিরা সব বেরিয়ে পড়বে রাস্তায়.....‘
    জয়ন্ত নির্বিকারভাবে বলল,‘হ্যাঁ আমরা আসি ..... আর একদিন আসবখন....আজ কথাবার্তা তেমন হল না ....’
    বলে দুজনে বাবা মাকে ঢিপ ঢিপ করে পেন্নাম করল।
    শুভর দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত মুচকি হেসে বলল,‘ঠিক আছে ব্রাদার .... খবরটা পাবার অপেক্ষায় থাকব।‘
    শুভ একগাল হেসে বলল,‘নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই কাকু .... আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’
    এহেন ঠান্ডা চ্যালেঞ্জের কোন প্রত্যুত্তর দিল না জয়ন্ত বা শর্মিষ্ঠা। অবহেলাভরে‘আসি‘বলে দুজনে নেমে গেল রাস্তায়।
    মোহিনীমোহনবাবু স্বগতোক্তি করলেন,‘আপদ গেল‘।

    কদিন ধরে দেবেশ নস্করের মন বড় উতলা হয়েছে ছেলের জন্য। মা মরা ছেলেকে ছেড়ে একটানা এতদিন সে থাকেনি কখনও। কোথায় কোন বিদেশ বিভুঁইয়ে নাকি যেতে হবে তাকে দৌড়বার জন্য। কি ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার! তার চেয়ে এখানে ব্রজেনবাবুর তৃপ্তি হোটেলে দিব্যি ছিল। মধ্যমগ্রাম থেকে হৃদয়পুর পর্যন্ত বাপ ব্যাটায় মিলে ভ্যান টানতে পারলে রোজগার তো খারাপ কিছু
    হয় না। কি দরকার ওসব ঝকমারিতে গিয়ে। সে ঠি ক করল স্পন্দন স্যারকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে।
    দেবেশ বারবার ঠেলা মারার ফলে ব্রজেন বক্সী একদিন রাত্তিরবেলায় স্পন্দনকে ফোন করল। সে জানাল,‘ছেলের জন্য দেবেশের মন বড় চঞ্চল হয়েছে। ছেলেকে বিদেশে দৌড়তে যেতে হবে শুনে সে খুব মনমরা হয়ে আছে। আপনি যদি স্যার একবার শুভকে নিয়ে এখানে ঘুরে যান তাহলে খুব ভাল হয়। এসে দেবেশকে একটু বুঝিয়ে বলেন দিকি যাতে সে একটু নির্ভয় পায়....’। ব্রজেনবাবু বোধহয়‘অভয় পায়’ বলতে চাইলেন।
    স্পন্দন জানাল,‘ঠিক আছে .... আমি পরশুদিন শুভকে নিয়ে মধ্যমগ্রামে যাব।কালকেই যেতাম, কিন্তু কালকে হবে না কারণ কাল ভোরে শুভর কাছ থেকে প্রেরণা নিতে এক ফিল্মস্টার আসবে। তারপর আমাকে অফিস যেতে হবে। সেখানে অনেক কাজ জমে আছে ....’
    —‘ফিল্মস্টার কি নিতে আসবে বললেন ?‘ব্রজেনবাবু বললেন।
    —‘ওই প্রের...., না কিছু না ....এমনি বললাম আর কি ....’ স্পন্দন অকারণে বিশদে যেতে চাইল না।

    লাভলির স্বামী দুদিন ধরে লাভলির ফ্ল্যাটে ফেরেনি। সত্যেন্দ্রনাথের কব্জায় পড়ল নাকি!

    ......... ........ ............ ........

    ব্রজেনবাবুর হোটেলের সামনে দেবেশের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ব্রজেনের কাউন্টারের পাশে একটা চেয়ারে দেবেশ নস্কর ঠায় বসে আছে। বেলা প্রায় একটা বাজে এখন। আজ মনসাতলায় হাটবার আছে। প্রচুর সওয়ারির আনাগোনা আজ। কিন্তু দেবেশের মন নেই ভ্যান টানায়। সে আনমনা হয়ে বসে আছে।
    ব্রজেনবাবু বললেন,‘বললাম তো .... কাল আসবে।স্পন্দন স্যার নিয়ে আসবে। তুই নিশ্চিন্তে থাক। তোর এত চিন্তা কিসের অমি বুঝতে পারছি না। তুই তোর কাজে যা ..... আজ হাটবার .... দুটো পয়সা রোজগার হত।’
    —‘না ব্রজেনদা .... আপনি আর একবার ফোন করেন ওনারে .... আমার মন বড় অস্থির হয়েছে .... খুব বিশ্রী স্বপ্ন দেখলাম মঙ্গলবার রাতে .... আমার মন খুব খারাপ’।
    —‘আরে ওসব স্বপ্ন টপ্ন কিছু মেলে না। ঘুম পাতলা হলে লোকে স্বপ্ন দেখে। আমি ওরকম কত স্বপ্ন দেখি। সেসব নিয়ে মাথা ঘামাই নাকি ? তাছাড়া শুভ তো কাল আসছেই। তখন যা ব্যবস্থা করার করিস। এখন যা .... কাজে যা....
    হাটবারে দুপয়সা রোজগারের সুযোগ ছাড়িস না। যা যা ....’।

    দেবেশ বিরসবদনে আস্তে আস্তে রাস্তায় তার ভ্যানের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে হর্ণ বাজাতে লাগল। সে শুভর ব্যাপারে কি একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছে মঙ্গলবারে।

    ............ .......... .............

    দেশবন্ধু পার্কে ভোরবেলায় স্পন্দনের হুইসল্ বেজে উঠল। টর্নেডোর ঝটকার মতো ছুটে আসছে শুভ পুব থেকে পশ্চিমে। স্টপ ওয়াচ চলছে .... চিক্ চিক্ চিক্ চিক্ ..... নাইন পয়েন্ট এইট সিক্স সেকেন্ড। স্পন্দনের মুখ বেজার হয়ে গেল। নাইন পয়েন্ট ফাইভের মধ্যে রাখতেই হবে। সুরিন্দর এখন সিলেকশান কমিটির মাথা হলেও প্যাঁচালো রাজনীতি হবে তাতে সন্দেহ নেই।স্পন্দন জিজ্ঞেস করল,‘তোর কি রানিং শ্যুয়ে কোন প্রবলেম হচ্ছে ?’
    —‘না, সেরকম তো কিছু মনে হচ্ছে না .... তবে মাঠের অবস্থা বেশ খারাপ। ওপর থেকে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ঘাসের নীচে মাটি মাঝে মাঝে এবড়ো খেবড়ো।ঘাসও শিশিরে ভেজা।‘
    —‘ও ... আই সি .... এটা বোঝা উচিৎ ছিল আমার। সেটাই তো ভাবছি .... স্পীড কেন কমল! খুব রিস্ক নেওয়া হয়ে গেছে। যদি অ্যাঙ্কলে কোন স্প্রেন হত! ও মাই গড .... খুব বেঁচে গেছি। মুশ্কিল হয়ে গেল। ওদিকে লেডিজ পার্কটা পাওয়া গেলে ভাল হত। ওখানে পিচটা খুব স্মুথ। কিন্তু ওটায় প্র্যাকটিস করতে গেলে পারমিশান করাতে হবে। দেখি কি করা যায়।’
    সকাল ছটা বাজল। শীতের সকাল। এখনও ভাল করে আলো ফোটেনি। গাছতলায় দাঁড়িয়ে সেই লোকটা দাঁতন করা শেষ করে পুকুরের দিকে গেল বোধহয় মুখ ধুতে। স্পন্দনের হঠাৎ নজরে পড়ল মাঠের ধারে পেভমেন্টে এক ভদ্রলোক, সাদা ঢোলা সালোয়ার কুর্তা পরা, ওড়না দিয়ে মাথা এবং মুখের খানিকটা ঢাকা এক ভদ্রমহিলা এবং একটা বাচ্ছা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
    স্পন্দন আন্দাজ করল এ-ই সেই চিত্রতারকা লাভলি রায়। স্পন্দন ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। কৌস্তভ লাহিড়ি স্পন্দনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। কৌস্তভ বলল,‘....পাছে মবড্ হয় সেই ভয়ে ওড়নায় মুখের কাছটা কভার করে আছে ....’
    স্পন্দন জানাল, গ্রাউন্ডের অবস্থা
    তেমন ভাল নয়। এখানে স্প্রিন্ট করা একটু রিস্ক হয়ে যাবে। ভেরি সরি স্যার ....। লেডিজ পার্কে হতে পারে। ওটার গ্রাউন্ড কন্ডিশান ভাল। কিন্তু ঢুকতে দেবে না ....’
    কৌস্তভ বলল,‘কে বলেছে ঢুকতে দেবে না। এখন লেডিজ এন্ট্রির টাইম নয়। আসুন তো দেখি ....‘
    লেডিজ পার্কে ছাঁটা ঘাসের মসৃন মাঠ। শিশির শুকিয়ে আসছে ....।
    একটা মালি যে গেটের তালা খুলে দিয়েছিল কৌস্তভের আই কার্ড দেখে, পাঁচিলের ধারে বসে এখন আগাছা তুলছে। তাছাড়া মাঠ জনমানবশূন্য।লাভলি তার ছেলেকে নিয়ে ছাউনি ঘরের মধ্যে দিয়ে দাঁড়াল। শুভর নিকটবর্তী হওয়া বারণ আছে। অগুন্তি পাখি ভোরের আলো মেখে গাছের ডালে ডালে কিচির মিচির করছে। লাভলি দেখল নীল জামা পরা এক কিশোর এক নীল পাখির মতো, হুইসল্ বাজার পর নিমেষের মধ্যে হাওয়ায় ভেসে এল এপারে। নীরব, অমল পরিপার্শ্ব।
    ঘোর লেগে গেল লাভলির মনে।সে ভুলে গেল অভ্র গোস্বামীর কদর্যতা। সমাজ সংসারের জ্বালাময় টানাপোড়েন।
    শুভ আবার গিয়ে দাঁড়িয়েছে স্টার্টিং পয়েন্টে। আবার একটা নীল পাখি দুরন্ত গতিতে ভেসে আসতে লাগল। এমন গতিময় মানুষ লাভলি কখনও দেখেনি।চার বছরের বাচ্চা জিটো হাঁ করে তাকিয়ে ছিল শুভর দৌড়ের দিকে। তার মধ্যেও বোধহয় কিছু আবেশের দোলা লাগল।
    শিশুরা অনুকরণপ্রবণ। শুভর ঝড় সহসা তার মধ্যেও সঞ্চারিত হল। সে হঠাৎ মায়ের পাশ ছেড়ে এক ছুটে মাঠে নেমে গেল এবং নিজেকে বোধহয় শুভর প্রতিচ্ছবি মনে করে প্রাণপণে দৌড়তে লাগল সারা মাঠময়। কিছুক্ষণ দৌড়বার পর একসময়ে মাঠের মাঝখানে থামল এবং একজন পাকা অ্যাথলিটের মতো কোমরে হাত দিয়ে মাথা নীচু করে গম্ভীরমুখে কি চিন্তা করতে লাগল। মাঠে আর যে চারজন ছিল তারা এই অনুপম এবং অননুকরনীয় দৃশ্য দেখে হাসিতে ফেটে পড়ল।
    ‘ডিসট্র্যাকশান’ এড়ানোর জন্য পূর্ব শর্ত অনুযায়ী লাভলির সঙ্গে শুভর কোন মোলাকাত হল না।
    কিন্তু একটা অনিন্দ্যসুন্দর মাধুর্যের রেশ থেকে গেল লাভলির মনে।
    কৌস্তভের সকাল আটটা থেকে ডিউটি অাছে। সে এবার ফেরবার জন্য ব্যস্ত হল। স্পন্দনকে বলল,‘খুব ভাল লাগল। আবার একদিন আসার ইচ্ছে রইল।’
    স্পন্দন একগাল হেসে নীরবে করমর্দন করল কৌস্তভের সঙ্গে। কিন্তু ওদের আবার আসতে বলার কথাটা তার মুখে ইচ্ছাকৃতভাবেই অনুচ্চারিত রইল।
    লাভলিরা মাঠ থেকে বিদায় নেবার পর স্পন্দন মনে মনে ভাবল,‘ওসির সঙ্গে লাভলির ইকোয়েশনটা কি ঠি ক বোঝা গেল না .... মরুকগে, শুভর নিবিড় অনুশীলনে ব্যাঘাত না ঘটলেই হল।‘
    গাড়ি সবে খান্নার মোড় ছাড়িয়েছে। কৌস্তভের মোবাইল বেজে উঠল। থানার একজন এস আই ফোন করেছে।
    কৌস্তভের মুখের ভাঁজগুলো বদলে গেল এর মুহুর্তে। মুখে বলল,‘ও, মাই গড.... কি বলছ কি!‘
    তারপর একটু চুপ করে ওদিকের কথা শুনল চিন্তাকুল মুখে। আবার বলল,‘বডি কোথায় ? .... ওক্কে..... আমি এক ঘন্টার মধ্যে থানায় পৌঁছচ্ছি।টেক কেয়ার আনটিল দেন। রাখলাম.....‘।
    লাভলি কোন অজানা উদ্বেগে আকুল হয়ে উঠল।
    —-‘কি হয়েছে ?’
    কৌস্তভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল মাথা নীচু করে দু আঙুল দিয়ে কপালটা টিপে ধরে। তারপর মৃদু কন্ঠে জানাল,‘অভ্র গোস্বামীর ডেডবডি পাওয়া গেছে আধঘন্টা আগে।আনোয়ার শা রোডের একটা ফ্ল্যাটে। সাসপেক্টেড সুইসাইড। বডি এখনও মর্গে যায়নি। জিটো মায়ের পাশে বসে জানলা দিয়ে রাস্তা দেখতে দেখতে যাচ্ছিল। শুভর মায়াবী দৌড়ের সম্মোহনে এখনও মেতে আছে তার কিশলয় মন।লাভলির মুখ ভয়ে দুশ্চিন্তায় ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগের দেশবন্ধু পার্কে লেডিজ পার্কের অনাবিল আবহ যেন মরীচিকাময় স্বপ্নের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল।

    ......... ......... ..........

    দেবেশের দৃঢ় ধারণা শেষ রাতে দেখা স্বপ্ন কখনও মিথ্যে হতে পারে না। শুভকে নিয়ে মঙ্গলবারে দেখা ওই দু:স্বপ্নটা শেষ রাতেই ছিল। কিন্তু স্বপ্নটা ঠি ক কি ছিল সেটা তার মুখ দিয়ে কিছুতেই বার করা গেল না।
    —-‘ওসব কথা থাক .... ওসব যেখানে সেখানে বলাটা মোটে ভাল কাজ না। আমার মন মোটে ভাল লাগছে না .....‘দেবেশ জানায়।
    স্বপ্নবৃত্তান্ত জানাটা স্পন্দনের কাছে মোটেই জরুরী ব্যাপার নয়। কিন্তু সে দেবেশকে নিয়ে রীতিমতো আতান্তরে পড়ে গেল। মা মরা ছেলেকে সে কারো সঙ্গে বাইরে যেতে দিতে রাজি নয়। এমনকি কোজিকোডেও নয়। স্পন্দন ভাবল, ওখানকার ইভেন্টটা সেরে আসতে পারলেও বাঁচা যেত। শেষে শুভ তার বাপকে বোঝাতে বসল। বলল,‘তুমি কিছু চিন্তা করো না বাবা.... ওসব কখনও ফলে না। এতদূর এগিয়ে তারপর যদি দৌড়তে না যাওয়া হয় কেমন বাজে ব্যাপার হবে বল তো .... এক কাজ কর, তুমিও আমাদের সঙ্গে কোজিকোড়ে চল।মোহিনী দাদুরাও তো যাবে .... দেখবে কেমন মজা হবে। এক বিছানাতেই নয় দুজন শোব ....’
    শুনে স্পন্দন ধমক দিয়ে বলল,‘অ্যা..ই চুপ কর, কি সব আজে বাজে বকছিস! এক বিছানায় দুজন মানে ?’
    দেবেশ তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল।
    ব্রজেনবাবু হেসে বললেন,‘দেখ কান্ড ....’

    ( এরপর পরের পর্বে )
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন