ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ইনসুয়িং ইয়র্কার - ১

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ জানুয়ারি ২০২২ | ২৮৫ বার পঠিত
  • অশোকতরু মুখোপাধ্যায় হুইলচেয়ারে ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। তার ছায়াসঙ্গী হল বিনোদ । বিনোদবিহারি জাতে বিহারি। সে-ই অশোকতরুবাবুর অন্ধের যষ্ঠি। রান্নাবান্না, বাজারহাট থেকে শুরু করে অশোকতরুবাবুর যাবতীয় পরিচর্যা সবই করে সে। কাজের একজন মাসি আছে অবশ্য। বাসন মাজা, ঘর মোছা, জামাকাপড় কাচার জন্য।

    অশোকতরুবাবু রুরকি আই আই টি -র অধ্যাপক ছিলেন মেটালার্জি বিভাগে। ষাট বছরে রিটায়ারমেন্ট। তার পরে বছর তিনেক এক্সটেনশান। কিন্তু স্বাভাবিক মেয়াদই তিনি শেষ করতে পারেননি। তার যখন আটান্ন বছর একটা বড় মাত্রার সেরিব্রাল অ্যাটাক হয় ক্যামপাসের মধ্যেই।প্রচুর চিকিৎসার পর তিনি প্রাণে বেঁচে যান বটে তবে অধ্যাপনার কাজে আর ফিরতে পারেননি এবং তার চলা ফেরা পুরোপুরি হুইলচেয়ার নির্ভর হয়ে পড়ে। এখন থাকেন শ্যামবাজারের কাছে হিমাদ্রি অ্যাপার্টমেন্টে।

    অশোকতরুবাবুর স্ত্রী সূর্যতপা একটি কলেজের অধ্যাপিকা ছিলেন অর্থনীতি বিভাগে। তিনিও বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। সূর্যতপা বহুদিন ধরেই স্বামীবিচ্ছিন্না। শোনা যায় আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং বর্তমানে কানাডায় থাকেন।

    এর মধ্যে একটা অসমঞ্জস অধ্যায় হল এদের দুজনের মেয়ে দীপশিখা। সে একেবারেই মা বাবার মতো নয়। তিরিশের আশেপাশে বয়স। সেও মায়ের মতোই অর্থনীতির এম এ । কিন্তু পড়ানো টড়ানোর ধার কাছ দিয়ে যাবার কোন ঝোঁক তার নেই। সে তার বাবার সঙ্গে থাকে। তার ঝোঁকের ধরণটা একটু অভিনব ও বিচিত্র। মানে, আমাদের দেশের কোন মেয়ের পক্ষে বেশ বিচিত্র।

    তার একটা ক্রিকেট ক্লাব আছে।তার বিয়ে থা করার কোন ইচ্ছে বা পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না । সুতরাং স্বাভাবিক সামাজিক রীতি অনুসারে তার কোন সন্তানাদি থাকার কথা নয়। নেইও। ক্লাবের জনা ষোল সতের ছেলে হল তার সব কিছু, তা সে ভাই বলুন, সন্তান বলুন .... সবকিছু।

    দীপশিখা মুখার্জি ট্রাকস্যুট পরে প্র্যাকটিসে নামেন ক্লাবের প্লেয়ারদের সঙ্গে এবং পাকাপোক্ত কোচের মতো নানারকম টিপসও দেন।

    মৈনাক দলের মিডিয়াম পেসার। নতুন বলে ভাল ইনসুয়িং করায়। পুরনো বলে ইনসুয়িং আউটসুয়িং দুটোই পারে। তা, এই মৈনাককে বলের পালিশ করা দিকটা ভেতরদিকে রেখে কিভাবে বলের সেলাইয়ের ওপর তর্জনি দিয়ে গ্রিপ করলে শার্প ইনসুইঙ্গার হতে পারে তা নিয়ে প্রতিদিনই বিস্তর জ্ঞান দেয়। মৈনাকের এসব জানা, তবু রেহাই নেই দীপশিখার হাত থেকে। তাকে দীপশিখার কাছ থেকে ইনসুয়িং ইয়র্কার শিখতেই হবে। কোন বোলারের হাত থেকে বেরনো এটাই দীপশিখার সবচেয়ে প্রিয় ডেলিভারি। লাল বলটা ধনুকের মতো হাওয়ায় বাঁক নিয়ে অফস্টাম্পের ঠিক বাইরে ব্যাটসম্যানের পায়ের গোড়ায় পড়ে বিদ্যুতের গতিতে ব্যাট আর প্যাডের ছিদ্রপথে ঢুকে খটাসস্ করে স্টাম্পে গিয়ে ছোবল মারছে এটা নাকি দীপশিখার কাছে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য। তার কাছে আউটসুয়িং ডেলিভারি হল ব্যাটসম্যানকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ফাঁদে ফেলা । আর ইনসুয়িং হল সত্যিকারের ম্যানলি চ্যালেঞ্জ। সরাসরি আক্রমণ ব্যাটসম্যানের তাগৎকে।

    প্রতিদিন দীপশিখাদির বকবকানি শুনতে একটু বিরক্তি লাগে। কিন্তু কিছু করার নেই। এই ক্লাব থেকেই মৈনাকের ক্রিকেট জীবনের ভিত তৈরি হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই এবং এই ইন্দো-এরিয়ান স্পোর্টিং-এর মালিক কাম কোচ হল দীপশিখা মুখার্জি। তাছাড়া, দীপশিখা তার থেকে প্রায় তের বছরের বড় , এটাও সব সময়ে তার মাথায় থাকে। মৈনাকের বয়স এখন একুশ আর বাইশের মাঝামাঝি।

    বাবা মায়ের মতো মাস্টারি করা দীপশিখার ধাতে নেই। সেটা করলে অনেক আগেই করতে পারত। কিন্তু তা বলে দীপশিখা মুখার্জি মোটেই ন্যালাক্ষ্যাপা ধরণের নয়। তার খুব আধুনিক মানের একটা বিউটি পার্লার আছে। তাছাড়া তার বুটিকের ব্যবসাও আছে। সব মিলিয়ে মোট পাঁচজন কর্মচারি কাজ করে। উপার্জনের টাকার অনেকটাই ক্রিকেট ক্লাবে ঢালে দীপশিখা । এমন অভিনব কোচ কাম মালিক বিশ্বের কোন ক্লাবে আছে কিনা কে জানে। এ তো আর আই পি এল -এর ফ্র্যানচাইজি নয়,তবু ....।

    বিয়ে থা নামক চিন্তাভাবনা থেকে দীপশিখা সহস্র হস্ত দূরে । বিয়ে করে আর কি হবে। তার সন্তান তো হয়েই গেছে । এই ইন্দো এরিয়ানই তার সন্তান, তার মনন চিন্তন সবকিছু।

    বেলা পাঁচটা । মৈনাক পিঠে কিটস ঝুলিয়ে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরছিল। একটানা নেট ছিল বেলা একটা থেকে সাড়ে চারটে পর্যন্ত। লীগের খেলা শুরু হবার আগে সামনে অনেকগুলো ফ্রেন্ডলি ম্যাচ আছে। সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ প্র্যাকটিস হিসেবে। দীপশিখা এই ম্যাচগুলোর ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। শুধু ম্যাচ প্র্যাকটিস নয়, এগুলো দীপশিখার কাছে নতুন উজ্জীবনের শিরা উপশিরা। আর তার কাছে মস্ত ভরসা হল মৈনাকের বোলিং। ডানকাঁধ কতটা বাঁদিকে ঘুরলে ইনসুইং বেশি পাওয়া যাবে তা নিয়ে দীপশিখার চিন্তার শেষ নেই। তার কথা হল— ‘ ব্যাটসম্যানরা ইনিংস গড়ে, কিন্তু ম্যাচ জেতায় বোলাররা .... বুঝলি তো ...... ’ শুনে শুনে পচে গেছে। প্রতিবারই মৈনাক ঘাড় নাড়ে বিজ্ঞের মতো।

    মৈনাক দেখল রাস্তার ওপারে বেথুন কলেজের সামনে দিয়ে ঋতাভরী যাচ্ছে বাড়ির উল্টোদিকে হাতিবাগানের দিকে। কোন কাজ আছে নিশ্চয়ই। বেথুনেই পড়ে ও। মৈনাক যাচ্ছে হেদুয়ার সামনে দিয়ে বিবেকানন্দ রোডের দিকে। তার বাড়ি চালতাবাগানে। কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কখনও কখনও কোন অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন না হলেও কারো কারো হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। মৈনাক দেখল ঋতাভরী মাথা নীচু করে কি ভাবতে ভাবতে যাচ্ছে। সে ভাবল, সামনে গিয়ে একবার কথা বলেই দেখা যাক না। কি আর হবে ! কিছু না হয় না হবে । অপমান নিশ্চয়ই করবে না। এক পাড়াতেই তো থাকে । অন্য কেউ লাইনে আছে কিনা জানা নেই মৈনাকের। তা যদি থাকে তালে তো .....

    এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনেকটা সময় বেরিয়ে গেল প্রতিবারের মতো। দুজন দুজনের থেকে অনেকটা দূরে চলে গেছে ততক্ষণে। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । ওসব মিষ্টি মিষ্টি ব্যাপার তাকে মানায় না। ঋতাভরীদের বাড়িটা ঠি ক চেনে না মৈনাক। চোরবাগানের দিকটায় হবে মনে হয়। পাস কোর্সে বি কম পাস করে বসে থাকা তার মতো একটা বেকার ছেলের পক্ষে ওসব স্বপ্নবিলাস বড়ই হাস্যকর । বাবার একটা ছোট স্টেশনারি দোকানের আয়ে সংসার চলে। তার ওপরে এক বিয়ের যোগ্য দিদি এবং নীচে এক ভাই আছে। সে ক্লাস টেনে পড়ে। মাঝে মাঝে বাবার দোকানে গিয়েও বসে অরিত্র। পড়াশোনায় তেমন মাথা নেই । ওই টেনেটুনে ক্লাসে ওঠে আর কি । মৈনাকের মা ক্যানসারে মারা গেছে বছর দুই আগে। যাবার আগে পরিবারকে নি:স্ব করে দিয়ে গেছে। বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে এসে বাঁদিকে ঘুরল লোহাপট্টির দিকে যাবে বলে। ভাবল, কেন যে ওসব মতিভ্রম হয় তার। দীপশিখাদির ফেভারিট ডেলিভারি ইনসুয়িং ইয়র্কার দিয়ে এতসব সমস্যার স্টাম্প ওড়ানো কি সম্ভব ! ওসব অবাস্তব স্বপ্ন না দেখাই ভাল।

    বাড়ি ফিরতে মৈনাকের দিদি সায়ন্তী বলল, ‘ লেবুতলার ক্লাব থেকে কজন এসেছিল। শনিবারে ম্যাচ আছে হোয়াইট বর্ডার মাঠে। ফোন নম্বর দিয়ে গেছে। ’
    মৈনাক কিটস নামাতে নামাতে বলল, ‘ ও: .... শনিবারে হবে না। প্র্যাকটিস আছে। ’
    — ‘ প্র্যাকটিস মানে, ওই ইন্দো এরিয়ানে? কিছু লাভ আছে ওখানে খেলে? যাতে পাকাপাকি কিছু হয় .... দুটো পয়সার মুখ দেখা যায় সেই চেষ্টা কর ....’ সায়ন্তীর স্বর বেশ তেঁতো শোনায়।
    — ‘ সেই চেষ্টাই তো করছি। কিন্তু বেইমানি করতে পারব না। দীপশিখা ম্যাডাম আমাকে অনেক হেল্প করেছে। আমাকে জিরো থেকে তুলে এনেছে। ওনার জন্যই এইসব ক্লাবগুলো আমাকে চেনে। আমি তো টেনিস বলের টুর্নামেন্টে খেপ খেলে বেড়াতাম। ’
    মৈনাক জামা খুলে ঘাম মুছতে মুছতে নিজের মতামত জানায়।

    — ‘ তা যা ভাল বোঝ কর। আমার তো এদিকে তোমাদের সংসার ঠেলতে ঠেলতে হাড় ভাজা ভাজা হয়ে গেল। আমার দ্বারা আর বেশি দিন হবে না .... বলে দিলাম। যেদিকে দুচোখ চায় বেরিয়ে যাব বলে দিলাম ....’ , বলে সায়ন্তী কোন উত্তরের প্রতীক্ষা না করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

    মৈনাক চুপচাপ বসে থাকে। দিদির কথার উত্তর দেবার কোন মানে হয় না। কারণ এসব গৎ বাঁধা কথার কোন উত্তর হয় না। সায়ন্তীর বিয়ে থা দেবার দায়িত্ব তার বাবার। কিন্তু তিনি সব বুঝেও বোবা কালা হয়ে থাকেন। কারণ আপাতত: মেয়ের বিয়ে দেবার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই। আর মৈনাকের মাত্র বাইশ বয়স বয়সে সে সামর্থ্য থাকবে সেটা আশা করাই অন্যায়।
    আর একটা কথা হল, মৈনাক তার দিদিকে ভালভাবেই চেনে। বিয়ে টিয়ে করে তাদের সংসারকে ভাসিয়ে দিয়ে সে তার বরের সঙ্গে এ বাড়ি থেকে কেটে পড়বে এটা অসম্ভব ব্যাপার বলেই মনে হয় মৈনাকের। সে তার দিদিকে হাড়ে হাড়ে চেনে। ওই কথাগুলো আদৌ তার মনের কথা নয়।

    শনিবার জোরদার প্র্যাকটিস হল। কারণ হাতে আর সময় নেই।লীগ শুরু হবার দিন এগিয়ে আসছে। দীপশিখার মরবার সময় নেই। ব্যাটসম্যান, বোলার, এমনকি উইকেটকিপার প্রত্যয় কুন্ডুকেও অবিশ্রান্ত পরামর্শ এবং টি পস দিয়ে যেতে লাগল। সকলেই গম্ভীরমুখে সে পরামর্শ গ্রহণ করতেও লাগল।এটাই হল ইন্দো এরিয়ান স্পোর্টিং-এর সাফল্যের এবং একাত্মতার মূলমন্ত্র। দীপশিখা মুখার্জির ওপর তাদের নির্ভেজাল বিশ্বস্ততা এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ আনুগত্যই তাদের দলীয় কাঠিন্যের আসল কারণ।

    নেট সেশানের শেষের দিকে দীপশিখা রোজকার মতো মৈনাকের বলের সিমের ওপর তর্জনি, বলের পালিশ এবং ডান কাঁধের গতিবিধি নিয়ে পড়ল প্রায় আধঘন্টা খানেক।
    কাল একটা ফ্রেন্ডলি আছে দেশপ্রিয় পার্কে। ভিনটেজ টাইট্যানিকের এর সঙ্গে। রীতিমতো তৈরি টিম টাইট্যানিক। বিশেষ করে ব্যাটিং। ওদের ব্যাটিং ভাঙা খুব শক্ত। তাই এই ম্যাচ নিয়ে দীপশিখা এবং তার ছেলেরা খুব সিরিয়াস।

    রবিবার সকালে মৈনাকের ভাই দোকানে বসে। বাবা বাড়িতে থাকে। মৈনাক বেরোবার সময় বাবা পরেশ ঘোষালকে বলে, ‘ ম্যাচ আছে যাচ্ছি.... ’
    পরেশবাবু চরম বিরক্তিমাখা মুখে বললেন, ‘ হ্যাঁ ওই করে বেড়াও ..... যাও ... যাও .... ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াও গে .... কোন শ্রাদ্ধে যে লাগবে কে জানে..... সংসারের এই হাল... আর উনি খেলে বেড়াচ্ছেন। বাপ মরলে কত ধানে কত চাল সব টের পাবে.... ওই ভদ্রমহিলাই ছেলেগুলোর মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে। সোনার চামচ নিয়ে জন্মেছে সব... কি আর বুঝবে।..... খাচ্ছে দাচ্ছে আর ক্রিকেট খেলিয়ে বেড়াচ্ছে .... হুঁ : ’

    এসব রোজকার ব্যাপার। কথাগুলো গায়ে মাখল না মৈনাক।

    দেশপ্রিয় পার্কে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ। সম্বুদ্ধ সিংহরায় এবারে টাইট্যানিকের খুব আঁটোসাঁটো টিম করেছেন, বিশেষ করে ব্যাটিং সাইড। ন নম্বর পর্যন্ত ব্যাট করতে পারে। ছ নম্বর পর্যন্ত ক্লাব ক্রিকেটের সেঞ্চুরিয়ান। দুটো অস্থায়ী ছাউনি তৈরি হয়েছে। একটা লম্বালম্বি একদিকের উইকেটের পেছনে। আর একটা একদিকের মিড উইকেটের দিকে।

    দীপশিখার ইন্দো এরিয়ান জায়গা পেয়েছে ওই মিড উইকেটের দিকের ছাউনিতে। মুশ্কিল হল, ওখান থেকে বলের মুভমেন্ট কিছু বোঝা যায় না যে সুযোগটা সম্বুদ্ধ সিংহরায়রা পাবেন।

    মার্চ মাস পড়ে গেছে। শীতের নরম ভাব আর নেই। রোদের জ্বালা বাড়ছে ক্রমশ । খানিকক্ষণ মাঠে দাঁড়ালেই ঘামে ভিজে যাচ্ছে জামা।

    টাইট্যানিক টসে জিতে ফিল্ডিং নিল। ওদের বোলিং লাইন আপও খারাপ না, বিশেষ করে শুরুর দুটো বোলার। ইন্দো এরিয়ানের শুরুটা কিন্তু খারাপ হল না। শুভমিত ঘোষ আর অর্ক মন্ডল দুজনেই হাফ সেঞ্চুরি করল। প্রথম উইকেট পড়ল একশ পাঁচ রানে। নিল ওদের একজন অফস্পিনার। অর্ক চমৎকার ব্যাট করছিল। অফস্পিনারের ফ্লিপার বুঝতে না পেরে এল বি ডব্লিউ হল। তার পরের বলেই সপ্তর্ষি ব্যানার্জি আউট হয়ে গেল। সপ্তর্ষি দীপশিখার দলের এক প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। এ বলটাও সোজা বল ছিল। গুডলেংথ স্পট থেকে আচমকা লাফিয়ে উঠল। সপ্তর্ষি ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলতে গিয়েছিল। সবে উইকেটে এসেছে, সামলাতে পারল না। ব্যাটের ভেতরের দিকের কানায় লেগে লেগ গালিতে সহজ ক্যাচ গেল। ব্যাটসম্যানদের জন্য ক্রিকেট হল এক বলের খেলা। ওভার শেষ। অফস্পিনারের হ্যাটট্রিকের সুযোগ থাকল। পরের ওভার একজন মিডিয়াম পেসারের। কোন উইকেট পড়ল না।

    ওই অফস্পিনারের নতুন ওভার শুরু। সে হ্যাটট্রিকের সামনে। প্রথম বল..... অফস্টাম্পের বাইরে। সামান্য টার্ন ছিল। স্কোয়্যার কাট মারার জায়গা ছিল না। শুভমিত তবু স্কোয়্যার কাট মারতে গেল এবং ফস্কাল। উইকেটকিপার বল ধরার পর পেছনের সবাই মিলে লাফাতে লাগল চেঁচাতে চেঁচাতে। কপাল ভাল কানা নেয়নি। কিন্তু শুভমিতের মাথায় রক্ত গরম হয়ে গেছে। তার সাবধান হবার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। পরের বল একটু কম লেংথে, আবার অফস্টাম্পের বাইরে। শুভমিত চোখ কান বুজে চালাল। উদ্দেশ্য ছিল কভারের ওপর দিয়ে ছয়। ব্যাটের বাইরের দিকের কানায় লেগে ডিপ পয়েন্ট বাউন্ডারি ফিল্ডারের হাতে লোপ্পা ক্যাচ। দীপশিখার মুখ যন্ত্রনায় কুঁচকে গেল।

    তারপরে এরকম সহজ উইকেটে সাধারণ মানের বোলিংয়ের বিরুদ্ধে ইন্ডোএরিয়ানের ব্যাটিং বিপর্যয় দেখে বোঝা গেল কেন ক্রিকেটকে গভীর অনিশ্চয়তার খেলা বলা হয়। এক উইকেটে একশ পাঁচ থেকে একশ তিপান্ন রানে পুরো দল গুটিয়ে গেল মাত্র বিয়াল্লিশ ওভারে। মৈনাক দলের এগারো নম্বর ব্যাটসম্যান। দুটো ছয়, একটা চার মারল। নইলে এই রানও হত না।
    টাইট্যানিকের ব্যাটিং শক্তি বিবেচনা করলে এই সামান্য রান নিয়ে লড়াই করা প্রায় অসম্ভব। আর সবাই জানে সাদা বলে সুইং টুয়িং বেশিক্ষণ হয় না।

    সম্বুদ্ধ সিংহরায় ফুরফুরে মেজাজে সামিয়ানার নীচে একটা ঠান্ডা পানীয়ের বোতল নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। মহা খুশিতে সবার জন্য জম্পেশ লাঞ্চের ব্যবস্থা করলেন।

    দীপশিখা মৈনাকের কাছে গিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু অনেকটা নির্ভর করে আছি তোর ওপর।’

    পুরো টিমকে বলল, ‘এই স্কোরেও জেতা যায়। শুধু বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমরাই জিতব। উইলপাওয়ারের জোরে জীবনে সব কিছু করা যায়। একটা খেলায় জেতা তো অতি সামান্য ব্যাপার। নাথিং ইজ ইমপসিবল ইন লাইফ।’

    বেলা আড়াইটের সময় আম্পায়ার দুজন মাঠে নামলেন।

    ফিল্ডিং করতে মাঠে নেমে গেল ইন্দো এরিয়ানের এগারোজন টগবগ করে ফুটতে ফুটতে। দলের সবচেয়ে সিনিয়র প্লেয়ার উইকেট কিপার প্রত্যয় কুন্ডু এই দলের অধিনায়ক।

    দীপশিখা মাঠের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল একা একা।

    ( পরের অংশ পরের পর্বে )
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 2601:84:4600:5410:9f:eea7:8f3c:c8e | ০৯ জানুয়ারি ২০২২ ০৬:৫৬502564
  • বাঃ 
  • Anjan Banerjee | ০৯ জানুয়ারি ২০২২ ০৮:৫৬502569
  • ধন্যবাদ 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন