• খেরোর খাতা

  • দেওয়ালি পুতুল

    Manab Mondal লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ নভেম্বর ২০২১ | ৭২ বার পঠিত
  • বাংলার পুতুল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আগে বলেছি, আজ যেসব পুতুল গুলি তৈরি হয়েছে তার বেশি র ভাগ ধর্মীয় উৎসব এর কারনে। দীপান্বিতা উৎসব বাংলা সেজে ওঠে আলোক মালায়।দীপ লক্ষ্মী বা দেওয়ালি অথবা দীপাবলি পুতুল দিয়ে দেওয়ালি উৎসব প্রদীপ সাজানো । পোড়ামাটির তৈরি পুতুলের নিচের অংশটা হয় গোলাকার চাকে তৈরি ফাঁপা-- যা ঘাগরার মতো দেখতে হলেও সেটি বাতি দন্ড। উপরের অংশে দেহ ও মাটি জুড়ে নারী মূর্তির দেখতে হয়।এর সঙ্গে দুহাত উঁচু করা এ পুতুলের দুই হাতে দুটি এবং মাথায় একটি প্রদীপ সাঁটা থাকে,যাকে বলা হয় তিন প্রদীপের পুতুল। এ পুতুলের আকার ও শৈলির মধ্যে বেশ আদিমতার বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়।

     

     

    ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের তাগিদে এই লোক শিল্পটির উদ্ভব হলেও,  সারিবদ্ধ প্রদীপ সাজানোর দরুন এর গঠন সৌন্দর্য য অতুলনীয়। তা ছাড়া, ধর্মীয় এই দীপলক্ষ্মী পুতুল নির্দেশ করে ধন সম্পদ বৃদ্ধির প্রতীক বা লক্ষ্মীর ভাবমূর্তি- - তাই দেওয়ালিতে এই পুতুল এত জনপ্রিয়। দীপ লক্ষ্মী পুতুল পাওয়া যায় পুরুলিয়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম জেলায়।

     

     

    বিদ্যুৎ বাতি আলো অনেক রঙীন, উজ্জ্বল, আর বৈচিত্র্যময়। তাই এই পুতুল এর চাহিদা কমেছে
    মেদিনীপুরএর মির্জাবাজার  এলাকায় 70 টি কুমোর পরিবারের বাস। বংশ পরম্পরায় তাঁরা মাটির বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে আসছেন।  কোনওটির হাতে ধরা প্রদীপ। ৪টি থেকে ১৪টি পর্যন্ত প্রদীপ থাকে। কুমোরপাড়ায় ঢুকলেই চোখে পড়বে থরে থরে সাজানো মাটির প্রদীপ, দেওয়ালি পুতুল। কিন্তু সেভাবে ক্রেতা নেই।

     

                           

     

    এই পুতুলের জন্ম পুরুলিয়াতেই। আঠেরো শতকে আজকের ঝড়খণ্ড থেকে একদল কুমোর পুরুলিয়ার বলরামপুর, ছাতাটাঁড় ও কুক্কড়ু গ্রামে বসবাস শুরু করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে পুরুলিয়া জেলার বলরামপুর, ছাতাটাড় গ্রামে দিওয়ালি পুতুল পুজোর প্রথম প্রচলন শুরু হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দেওয়ালি পুতুল তৈরি করা শুরু করেন এরাই।তাঁদের হাতেই প্রথম তৈরি হয় দীপাবলি পুতুল। পরে, এই পুতুল ছড়িয়ে পড়ে মেদিনীপুরেও। তারপর কালক্রমে, এই পুতুলের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় পশ্চিম মেদিনীপুরের মির্জাবাজার।  সেখান থেকে পূজার প্রচলন শুরু হয় অবিভক্ত মেদিনীপুরেও। অবিভক্ত মেদিনীপুর শহরের মির্জাপুর বাজারে 1857  সালে পুতুল নির্মাণ শুরু হয় বলে জানালেন কয়েকজন প্রবীণ পুতুল শিল্পী। তারপর থেকে বংশপরম্পরায় দেওয়ালি পুতুল নির্মাণ করে আসছেন মির্জাপুরের বাজারের বহু শিল্পী।

     

     

    নানা ধরনের দীপাবলি পুতুলের মধ্যে অন্যতম ঘোড়ায় উপবিষ্টা পুতুল। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বেগুনি, সোনালি রং গায়ে মেখে ঘোড়ায় উপবিষ্টা এই নারী-পুতুলের গড়ন দেখে বিস্ময় জাগে। যেন, অমানিশা অবসানের লক্ষে রওনা দিতে সে প্রস্তুত। তার পরনে ঘাঘরার মতো ভূষণ, যার রং ও রেখায় নান্দনিকতার ছোঁয়া। নলাকার দুটি হাত মাথার ওপর বর্ধিত, যার লাগোয়া তিনটি প্রদীপ। ঘোড়ার পায়ের অবস্থান স্পষ্টতই গতির ইঙ্গিত বহন করছে।এ প্রসঙ্গে বলা যায়।মির্জাবাজারে কুমোরপাড়ার পত্তন হয়েছিল ১৮৫৭ সালে। মহাবিদ্রোহের সূত্রপাতও এই বছরেই। সেই বিদ্রোহের যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া রানি লক্ষ্মীবাইয়ের গল্প-কিংবদন্তীরা কি এসে পৌঁছেছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের কুমোরপাড়াতেও।তারপর, পুতুলেও জড়িয়ে গেছিলো সেই ইতিহাস। একদিকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বালানো রানি, অন্যদিকে অন্ধকার ঘুচিয়ে আলোর দিশা আনার প্রতীক এই পুতুল।

     

     

    দেওয়ালি পুতুল তৈরির উপাদান মূলত মাটি। মাটি দিয়ে পুতুল তৈরি করে সেটিকে পুড়িয়ে তার ওপর রং করা হয়। পুতুলের আদল নারীমূর্তি। এতে রয়েছে তিনটি অংশ। কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত ছাঁচে তৈরি করা হয়। আর কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত ঘাগড়া পরিহিতার আদলে তৈরি করা হয়। এটি তৈরি করা হয় কুমোরের চাকায়। এই নিচের অংশটা দেখতে অনেকটা উপুর করা গ্লাসের মত। আর পুতুলের হাত এবং তাতে প্রদীপ সংযোজন হাত দিয়ে তৈরি করতে হয়। হাত কখনো কখনো দুটি চারটি এমনকি ছোট হয়। পুতুলের শরীরে বেশিসংখ্যক প্রদীপ লাগানোর জন্যই হাতের সংখ্যা কম বেশি হয়। কখনো কখনো পুতুলের হাতের মুষ্টি কুপি ধরানোর আদলে তৈরি হয়।

     

     

    মেদিনীপুর জেলাকে বলা যেতেই পারে মৃৎশিল্পের গর্ভগৃহ। আর, এহেন যোগসূত্রের মূলে রয়েছে নদীর প্রভাব। অন্য কতগুলি নদীর মতোই কংসাবতী তথা কাঁসাই যার অন্যতম প্রাণশক্তি। এমনকি বলা যেতে পারে, কাঁসাইয়ের সঙ্গে যেন একপ্রকারের নাড়ির যোগ এখানকার মৃৎশিল্পের।সময় বদলে সাথে সাথে দেওয়ালি পুতুলের এই সাবেকিয়ানায় অনেকটাই বদল এসেছে। দেওয়ালি পুতুল নারীমূর্তি জায়গায় কখনো বজরং বালীর মূর্তি, রাবণের মূর্তি, দুর্গার মূর্তি, বিদঘুটে রাক্ষসের মূর্তি, ময়ূর সহ বিভিন্ন পশু পাখির মূর্তি এমনকি লাফিং বুদ্ধ মূর্তি তৈরি করতে তাতে প্রদীপ লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দর্শনীয় করে তুলতে পুতুলকে পড়ানো হচ্ছে ভেলভেট বা রঙিন কাগজের কাপড়, মাথায় লাগানো হচ্ছে ফলস চুলও। এই ভাবেই বাজারে মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য স্থানীয় শিল্পীরা অর্থাৎ পালেরা তাদের দেওয়ালি পুতুলের কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
    ঝারগ্রামের পাঁচ মাথার মোড় এর বাজারে এরকম  দেওয়ালি পুতুলের পরিবর্তন চোখে পড়ে। এইভাবে চলতে থাকলে আমাদের আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই লোকশিল্প টি হয়তো সকলের অজান্তে হারিয়ে যাবে বা  লুপ্ত হয়ে যাবে।

     

     

  • ০২ নভেম্বর ২০২১ | ৭২ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন