ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শেয়াল

    Swati Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৩৪২ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • ছোটোবেলায় দূর সম্পর্কের এক দাদুর বাড়ি বেড়াতে যেতাম স্কুলের ছুটিছাটায়। প্রত্যন্ত গ্ৰামে বৈদ্যুতিক বাতি বিহীন ছিল সেই বাড়ি। গ্ৰামের সাথে পরিচয় আমার সেই সময় থেকে। যেখানে রাতের অন্ধকারে জোনাকের আলো আর জোড়ায় জোড়ায় জ্বলন্ত নিশ্চুপ চোখের চাহনি ছিল চাঁদের সাথী।

    সেইরকম সত্যিকারের রাতের কোলে লন্ঠনের আলোয় দিদিমা পড়ে শোনাতেন ঊপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনির বই। ঘুম ঘুম চোখে আমরা হাঁ করে গিলতাম সেসব। সব চরিত্রের মধ্যে আমার আগ্ৰহ হত শেয়ালকে নিয়ে। মনে হত রাতের অন্ধকারে একা একা একটা শেয়াল চোখে চশমা এঁটে হেঁটে চলেছে। সে যেন বড় একা।

    মন জানতে চাইত শেয়াল যে পন্ডিত এ কথা জানলে কে? নিতান্তই ছোটোখাটো বন্য প্রানী। বাঘ, সিংহের রাজত্বে নেহাত ছাপোষা প্রজা। অথচ তার ক্ষুরধার বুদ্ধির জোরে সে একের পর এক কিভাবে তাবড় তাবড় ক্ষমতাশালী প্রানীকুলকে ঘোল খাইয়ে চলেছে সে কথা সত্যজিতের পিতামহ তাঁর ছোট্ট ছোট্ট নাতি, নাতনিদের জন্য সেই কবে বলে গেছেন।

    টুনটুনির বইতে একটা গল্প পড়েছিলাম, নাম বাঘের পালকি চড়া। সেখানে বাঘ মামা তার ভাগ্নে শেয়ালকে খাওয়ার নেমন্তন্ন করেছে। এখন রাজামশাই এর নেমন্তন্ন বলে কথা। বেশ ভালরকম ভুঁড়িভোজের আশাতেই গেছে শেয়াল। কিন্তু খেতে গিয়ে জুটলো বড় বড় শক্ত শক্ত হাড়, তাকে জব্দ করার মত দাঁতের জোর শেয়ালের নেই। তাই পেটে চড়চড়ে খিদে আর মনে একরাশ অপমান নিয়ে শেয়ালকে ফিরতে হল। কারণ বাঘের সাথে সম্মুখ সমরে যাবার মত ক্ষমতা তার নেই। আর সে দুঃসাহস যদি করেও ফেলে তবে বাঘের খাবার থালাই কেবল ভরবে। কিন্তু এই অপমান সে ভোলে না। ওৎ পেতে বসে থাকে। ফন্দি আঁটে, বুদ্ধি খাটায়। এবং অবশেষে বাঘকে পালকি চড়ায়। তবে পালকির বর্ণনা পড়তে হলে গল্পটি পড়তে হবে। অসম বলের লড়াইয়ে শেয়ালই বরাবর বিজয়ীর মেডেল পেয়েছে।

    আর একটি গল্প খুব অবাক করেছে আমায়। বোকা কুমীর আর শেয়ালের গল্প। ছোটোবেলায় অনেকবার পড়েছি। এবং প্রতিবার কুমীরের জন্য মন খারাপ হয়েছে। তাই একদিন মেয়েকে শোনালাম। কুমীর আর শেয়াল গেছে আলু চাষ করতে। হাজার দাঁতওলা বিশাল শক্তিধর কুমীর আলু চাষ সম্পর্কে কিছুই জানে না। বেশী লাভের আশায় আর লোভের বসে সে আলু গাছের মাটির ওপরের অংশ দাবী করল। শেয়াল তাতেই রাজী। কিন্তু অজ্ঞতার ফল যা হবার তাই হল। বছরের শেষে কুমীর খালি হাতে ফিরল। প্রতিবার চাষের শেষে এক‌ই ঘটনা। গল্প শোনার পর মেয়ের দেখলাম অন্য মত।তার বক্তব্য কুমীর বোকা। সে তার বোকামির সাজা পেয়েছে। শেয়াল তাকে ঠকায় নি। বুঝলাম দেশ, কাল, যুগ পেরিয়ে শেয়াল মনুষ্য সমাজে প্রবেশ করেছে। বোকার আর কোনো জায়গাই র‌ইল না।

    ঊপেন্দ্রকিশোর তার কোনো গল্পের শেষেই কোনো নীতিকথা লেখেন নি। তিনি জানতেন সবার নীতি এক নয়।

    শেয়ালকে বরাবরই খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছে। বুদ্ধি আছে, মাংসাশী, সাহসের ও অধিকারি, তবু রাজা সাজতে তাকে নীল রং মাখতে হয়। ফন্দি ফিকির করে এটা সেটা করে টিকে থাকতে হয়। ক্ষমতাবান সবলদের ভিড়ে একটু বাড়তি লভ্যাংশ ঘরে তুলতেই তার এত কাঠ খড় পোড়ানো। সে বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাকে অশ্রদ্ধা করা যায়, অপছন্দ করা যায় কিন্তু তার বুদ্ধিকে এড়ানো যায় না। মাত্র এই বুদ্ধির জোরেই সে বাঘ সিংহের শিকারে ভাগ বসায়। দলে ঘোরে না। শুধু নিজেকে রক্ষা করতে পারে। সন্তান পালনে যত্নশীল।

    ইদানিং চারপাশে অনেক শেয়াল দেখি। জঙ্গল কমে যত ইট, কাঠ, পাথরের ভীড় হচ্ছে তত দেখি। মাঝে মাঝে আয়নাতেও ঝলকে ওঠে। IUCN এর দেওয়া তালিকাতেও শেয়াল বিপন্ন প্রানীর তালিকায় একেবারে তলাতেই রয়েছে। অথচ বাঘ, বিলুপ্ত হতে বসেছে। কুমীরের জন্য ও সংরক্ষণ প্রকল্প করতে হয়েছে। এরা অনেক অনেক শক্তিশালী ছিল। জলে, জঙ্গলে রাজত্ব করেছিল। কিন্তু নিজেদের বিপদ আঁচ করতে পারত না বোধ হয়। শেয়াল কিন্তু টিকে গেল তার পন্ডিতির জোরে। ক্ষমতায়, বলে, শৌর্যে, বীর্যে রাজরাজাদের সে আবার হারিয়ে দিল। ও রাজা হতে পারে নি। ঠিক যেন অনুগত প্রজাও হতে পারে নি।তবু ভীড়ের মাঝে একটা চরিত্র হয়ে টিকে গেল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৬:৫২498426
  • শৈশবের শেয়াল এখন আর পন্ডিত নয়, 
    চিপস চুইংগম শিশুদের কাছে বুঝি অপরিচিত। 
     
    এরপরেও শেয়াল তো টিকে আছেই,  বিলুপ্ত প্রায় প্রাণী। 
     
    তবে মজিলা ফায়ারফক্স এর এখনো খুব দাপট! :)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন