ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শোলে এবং সত্যজিৎ

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৬৩৬১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (৩ জন)
  • বেনেগাল লিখেছেন, "বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সবসময়েই ভেবেছে, সত্যজিৎ রায় ভারতের জন্য ঠিক কাজ করছেননা। রাজকাপুরের সঙ্গে তাঁর একবার বিরাট ঝামেলা হয়েছিল। রাজ কাপুরের সিনেমা 'জাগতে রহো' পরিচালনা করেছিলেন বাংলার বিখ্যাত নাট্যপরিচালক শম্ভূ মিত্র। সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ের যা উচ্চতা, নাটকে তিনি তার সমানই ছিলেন। শম্ভূ সিনেমাটা বানিয়েছিলেন, এবং ১৯৬৪তে কারলভি ভেরি উৎসবে সেটা রাজকাপুরকে সেটা একটা পুরষ্কারও জিতিয়ে দেয়। ওই একই বছর ভেনিসে অপরাজিত জেতে স্বর্ণ সিংহ। তারপর রাজকাপুর এবং সত্যজিৎ রায়ের কোনো একটা অনুষ্ঠানে দেখা হয়। সত্যজিৎ বলেন, বাংলা সিনেমার জন্য এটা একটা বিরাট সম্মান। 
     
    রাজ কাপুর বলেন, 'বাংলা কেন, আপনি ভারতীয় না? আপনি কেন বলেন, আপনি একজন বাঙালি চিত্রপরিচালক?'
     
    সত্যজিৎ বলেন, কারণ, 'আমি একজন বাঙালি চিত্রপরিচালক'। 
     
    রাজ কাপুর বলেন, 'ভগবানের দিব্যি, আপনি নিজেকে ভারতীয় চিত্রপরিচালক বলতে পারেননা কেন?'" *
     
    বোম্বের সঙ্গে, দিল্লির সঙ্গে বাঙালির এই দড়ি-টানাটানি সেই ১৯৪৭ থেকে। দেশভাগের পর এই সেই সময়, বাংলা যখন প্রবল গাড্ডায় । বাংলা সিনেমার বাজার এক ধাক্কায় অর্ধেক হয়ে গেছে, বিপুল সংখ্যক হল পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেছে, এক তৃতীয়াংশ স্টুডিওর কাজ নেই। তদুপরি ফিনান্সের সংকট, একটা একটা করে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নিউ থিয়েটার্স সহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলি ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার বাংলা সিনেমা রপ্তানির ব্যবস্থা না বোম্বের সিনেমাকে বিশ্বজুড়ে প্রোমোট করছে। কলকাতা থেকে বোম্বেতে ব্রেনড্রেন চলছে। হিন্দি সিনেমাকেই সরকারি মদতে "ভারতীয়" সিনেমা হিসেবে প্রোজেক্ট করা হচ্ছে। যার একমাত্র অর্থ হল, সিনেমার অন্য কেন্দ্রগুলিকে ধ্বংস করা। বাংলার সিনেমা তারপরেও ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। একদিকে সত্যজিৎ রায়রা। অন্যদিকে মায়ামায় সাদাকালো জনপ্রিয় জলছবি। বাঙালি রোমান্স, বাঙালির  রূপকথা, উত্তম-সুচিত্রার মহাজুটি এমনি আসেনি। চড়াদাগের রঙিন মোটাদাগের হিন্দি সিনেমার জবাবে সেই ছিল বাংলার শৈল্পিক প্রতিরোধ। সত্যজিৎ রায় নামক ঢ্যাঙা লোকটি, একটুও উচ্চকিত না হয়েই, এই প্রতিরোধের প্রতীক ছিলেন। বল্লভভাই প্যাটেল বলেছিলেন, বাঙালি শুধু কাঁদতে জানে।  নার্গিস বলেছিলেন সত্যজিৎ রায় দারিদ্র‌্য বেচেন। ভুল কিছু বলেননি, ওঁরা ভারতীয়ত্বর নামে মোটা দাগের হিন্দুস্তানি বেচেন, এইটা কেবল বলেননি। 
     
    তো, তারপর যা হয়। মহানায়কের স্বর্ণযুগ তো আসলে ততটা স্বর্ণালী ছিলনা। স্রোতের মতো আসছে, হলে-হলে চলছে, বোম্বের সস্তা সিনেমা। যে পদ্ধতিতে ইংরেজ ধ্বংস করেছিল বাংলার বস্ত্রশিল্পকে, বাংলা সিনেমার ধ্বংস হওয়া তার চেয়ে আলাদা কিছু না। স্বয়ং মহানায়ক এবং মহানায়িকাও দৌড়চ্ছেন বোম্বেতে সিনেমা করতে, স্বর্ণযুগ যে আসলে পতনের যুগ, তার অব্যর্থ প্রমাণ এর চেয়ে বেশি আর কী হয়। এরপর বাংলার লো-টেক, লো-বাজেট শৈল্পিক উৎকর্ষময় সিনেমা-টিনেমা ক্রমশ উঠে যাবে, রাজত্ব করবে চড়া-দাগের হিন্দি সিনেমা। এই নিয়েও চমৎকার মন্তব্য আছে রায়বাবুর। শোলে বেরিয়েছিল ৭৫ সাল নাগাদ। পরবর্তীতে শোলে নিয়ে সত্যজিৎ বলেছিলেন, "খুবই দক্ষ, খুবই যোগ্য সিনেমা, যদিও শৈল্পিক ভাবে খুবই নিচু মানের"।** এর চেয়ে ভদ্র হ্যাটা আর কী হতে পারে। যে, ব্যাটারা ওয়েস্টার্ন টুকে একটা ফ্ল্যাট ভারতীয়ত্ব খুব দক্ষতার সঙ্গেই বানিয়েছে। কিন্তু ওটা শিল্প হয়নি। এটা কিন্তু "শিল্প হয়নি" বলে এলিটদের নাক কোঁচকানো নয়। এটা হল নকলনবিশীকে হ্যাটা। 
     
    হিন্দি সিনেমা, গান-টান সমেত, এইসময় মূলত টুকে-টুকেই চলেছে। আর দিগ্বিজয় করে ফেলার পর, বাঙালি মননও ক্রমশ ওটাকেই মোক্ষ বলে ভেবেছে। যেভাবে ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড় বাজারে জনপ্রিয় হয়েছিল, ফর্মুলা সেই একই। ওটাই বেঞ্চমার্ক হয়ে গেছে। তারপর বাঙালি সেই হিন্দি সিনেমা টুকে-টুকে খারাপতর সিনেমা বানিয়েছে ক্রমশ। সৃষ্টিশীলতা উবে গেছে। মধ্যও না, ক্রমশ নিম্নমেধার কারবার চারদিকে।
     
    তো, সে যা হবার তাইই হচ্ছে, হবে। কিন্তু শোলের কথা উঠলেই, বারবার, ঢ্যাঙা লোকটির "যদিও শৈল্পিক ভাবে খুবই নিচু মানের", কথাটা মনে পড়ে। 
     
    *মিহির বোসের বলিউড আ হিস্টরি, পাতা ১৮৮-৯ থেকে অনুদিত।
    ** সাক্ষাৎকার। ইন্ডিয়া টুডে। ১৯৮৩।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২২:৩৬497763
  • নেড়ুখোকন তো ন্যাড়াদাকে বলে বোধি। এখানে হেহে তো ন্যাড়াদা নয়। এলেবেলে হেহেকে ন্যাড়াদা ভাবছেন নাকি? 
     
    ডিসি, তাহলে আরেকবার স্যাট করে শোলেটাই দেখে নি বরম। :-)
  • dc | 122.183.166.239 | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২২:৪৮497764
  • দ দি, হ্যাঁ :-)
  • হেহে | 216.244.74.202 | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২২:৪৯497765
  • বিদ্যাসাগর মার্কা যুক্তি দেওয়া সুরু হয়ে গেল। ছবির কত বাজেট ক'পাতার স্ক্রিপ্ট ক'হাজার শব্দসংখ্যা এসব আপুনি গুনে বেড়ান গে। ছবি সিল্পো হল কিনা সেটা ছবি দেখেই বুজতে হবে। ভুবন সোম খুবই বালের ছবি। শতরঞ্জ কি খিলাড়ি পিরিয়ড পিস। সেটা বানাতে খাটনি আচে, রিসার্চ আচে। এ ত রিত্ত্বিক ঘট নয় যে যুতগের সাউন্ড সিঙ্ক না করলেও আঁতেলরা অহো কি শৈল্পিক বলে আকাশ ফাটিয়ে ফেলবে। ইহা সত্যজিৎ রায়ের ছবি, বার্লিনে স্বর্ণভল্লুক নমিনেশন পাবে, বুয়েছো ম্যাস্টর? (শিক্ষকদিবসে দুটো লালসুতো বিড়ি গিফটো করলুম)
  • সিএস | 49.37.32.200 | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২২:৫৮497767
  • গপ্পো, সীন, স্ক্রীপ্ট, ভিলেনের ম্যানারিজম, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, থীম মিউজিকের প্রথম অংশটা, বিখ্যাত গানটি , সবই বিবিধ ওয়েস্টার্ণের এখান সেখান থেকে টোকা, একটু বদল টদল করে।

    শোলের কথা বলছি।
     
  • এলেবেলে | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২৩:২৮497769
  • দ-দি, আপনাদের ন্যাড়াদাকে যে এখানে নেড়ুখোকন বলা হয়, সেটা জানতামই না। আমার কয়েনেজটা পছন্দ হয়েছে তাই ব্যবহার করেছি। সমস্ত আলোচনা যখন খেউড়ে এসে শেষ হয় মানে একদলের সেটাই তীব্র মনোবাসনা, তাদের জন্য এটি অতি অ্যাপ্ট বিশেষণ।
     
    আর যুতগের সাউন্ড সিঙ্ক মানে জর্জ ও সুশীল মল্লিক নিয়ে একটা কাহানি আছে। সেটা না জানলে নেড়ুখোকনরা চারুলতার কিশোরের রোবিন্দোসঙ্গীত নিয়ে আহা-উহু করুন গে।
  • এলেবেলে | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২৩:৩০497770
  • ওই *লের রিসার্চের ১০৮। গুচ্ছের অ্যানাক্রনিজমে ভর্তি। তাই নিয়ে আবার...হে হে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন