ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • #ছড়িয়ে_জড়িয়ে (পর্ব-৩) 

    Tanima Hazra লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ আগস্ট ২০২১ | ৬৯১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ইকির মিকির চামচিকির
    চামে কাটা মজুমদার,
    ধেয়ে এল দামোদর।
    দামোদরের হাঁড়িকুড়ি,
    দুয়োরে বসে চাল কাড়ি,
    চাল কাড়তে হলো বেলা,
    ভাত খাবি আয় জামাইশালা।
    ভাতে পড়ল মাছি,
    কোদাল দিয়ে চাঁছি,
    কোদাল হলো ভোঁতা,
    খা কামারের মাথা।

    ছড়াটির ছত্রে ছত্রে চিত্রিত গ্রাম বাংলার সাধারন মানুষের জীবন যাত্রার চিত্র। বাদশাহ বা রাজা কয়েকটি গ্রামের খাজনা আদায়ের জন্য এর শ্রেণীর তহশিলদার নিযুক্ত করতেন এদের বলা হত "মুজলিমদার"। মজুমদার কথাটি এরই অপভ্রংশ। "ইকির মিকির চাম চিকির" কথাটি সম্ভবত সেই অত্যাচারী শাসক শ্রেণীভুক্ত কর আদায়কারীর চিত্র তুলে ধরেছে। যারা দাঁত কিড়মিড় করে পিঠের ছালচামড়া তুলে নেবার হুমকি দিচ্ছে নিরীহ কৃষককে। চামে কাটা মজুমদার অর্থে ছাল চামড়া ছাড়িয়ে প্রবল অত্যাচারকারী কে বোঝানো হয়েছে। একদিকে কর আদায়ের জন্য অত্যাচার অন্যদিকে দামোদরের প্রবল বন্যা।

    উল্লেখ্য সে সময় কোন বাঁধ ব্যারেজ স্বভাবতই নির্মিত হয়নি, সুতরাং নিরুপায় চাষা অনিবার্য কারনেই গৃহহীন ও সর্বহারা। বন্যায় ঘরের বাসনপত্র সব ভেসে গেছে। তাই দামোদরের পলিমাটি দিয়ে তৈরী মাটির বাসনই সম্বল। আর ঠাঁই পরের দুয়োরের পরিত্যক্ত জমি। উদর পূর্তির জন্য জুটেছে আকাড়া দুমুঠো চাল। তাই বেছে কাড়া করে রন্ধনের আয়োজন। কথায় বলে না ভিক্ষের চাল আবার কাড়া না আকাড়া। তা সেই চাল ফুটিয়ে চলে বাঁচার লড়াই। বন্যায় ভেসে মেয়েজামাই ও আজ গলগ্রহ। নিজেদের জুটুক না জুটুক জামাইকে তো এক থালা বেড়ে দিতেই হয় তাই বিরক্ত শ্বাশুড়ীর ক্ষেদোক্তি "ভাত খাবি আয় জামাই শালা"।

    এদিকে ঘরের মানুষটাকে পাইকবরকন্দাজ হাঁকিয়ে বেঁধে নিয়ে গেছে মজুমদারের বাহিনী। তাই অপেক্ষায় বসে বসে ভাতে মাছি বসছে। এরপরে আবার শুরু হচ্ছে অনাবাদী পোড়ো জমি কোদাল দিয়ে পরিস্কার করে পুনর্বাসনের তোড়জোড়। সেই অমানুষিক শ্রমে মজবুত কোদাল ও ভোঁতা হয়ে যাবার জোগাড়। বিরক্ত চাষার কন্ঠে তাই কামারের প্রতি উঠে আসে বিষোদগার।বড়ই বেদনাদীর্ণ করুণগাথা।

    মাংসে মাংস বৃদ্ধি,
    ঘৃতে বৃদ্ধি বল,
    দুগ্ধে শুক্র বৃদ্ধি,
    শাকে বৃদ্ধি মল।
    মাছ চিনে গভীর জল,
    পাখি চিনে উঁচু ডাল,
    মানুষ অমানুষ যে না চিনে
    তার বড়ো পোড়া কপাল।

    এখানে এই ছড়ায় বিবিধ খাদ্যের গুণাগুণ এবং প্রাণীর বসবাস এবং বিবেচনা সংক্রান্ত জীবন বোধের ব্যাখ্যা রয়েছে।

    পরের হাতের পিঠা,
    চাইয়া খাইতে মিঠা,
    পরের হাতের পান,
    খাইতা মুখে গান।
    আহ্লাদী লো ঢ্যাপার কই,
    গতর গাতর না নাড়াইয়া,
    এমন্যা ঠমক পাইলি কই?

    অতিমাত্রায় সুচতুর ভাবে আহ্লাদীপণা দেখিয়ে অন্যকে দিয়ে কাজ হাসিল করে নিজের ধান্ধা গুছিয়ে নেওয়ার কাহিনীই এই ছড়ার মর্মার্থ।

    ভাত পায় না চা চায়,
    মিঞা আমার সাইকেল চড়ে গোসল যায়,
    আহ্লাদী বৌ তুমি
    চিকণ তুমার গা,
    ঝোলে না দিও হলদি,
    ধুইয়ো তুমার পা,
    আরশী রে দেখ মুখ,
    আমার প্যাটে কিল,
    রন্ধনের মাছ দেখ
    খাইয়া গেল চিল,
    ভিজা চাল চাবাইয়া খাবাম
    আর না গো কাইন্দো,
    আকাশের চন্দর আইন্যা দিবাম,
    বাতাসে পাতিয়া ফান্দ।

    রূপসী বউ বিয়ে করে কপালে ভাতই জোটে না, চা চাইবে সে কোন লজ্জায়। ঝোলে দেবার হলুদ দিয়ে সে গা পা মেজে রূপ খোলতাই করতে ব্যস্ত। এই অবসরে রান্নাঘর থেকে মাছ চিলে এসে নিয়ে গেছে। ভিজা চাল আঁচে চড়িয়ে ভাত রান্ধা হয় নাই। বেলা বয়ে গেছে। তাই সে সোহাগিনী রূপসী কাঁদতে বসেছে। গৃহকর্তার প্যাটে কিল দিয়ে খিদে সহ্য করেও তাকে ভোলাচ্ছেন বাতাসে ফাঁদ পেতে আকাশের চাঁদ এনে দেবেন এই বলে। এক রম্য বাতাবরণ এর মধ্যে মজার সংসার চালচিত্র।

    আবার,

    মুঘল পাঠান হদ্দ হলো
    ফারসী পড়ে তাঁতি,
    সুপারি থুইয়া ফেলে
    পাথর কাটেন জাঁতি।

    এখানে যার যা কম্ম নয়, সাধ্য নয় তা করার চেষ্টা। ছড়ায় ছড়ায় জীবন বোধের বিন্দু বিন্দু আকর যেন ছড়ানো ছিটানো।
    (চলবে)
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২৯ আগস্ট ২০২১ ১০:৩০497335
  • দারুণ গ্রামীণ ছড়া বিশ্লেষণ! 
     
    পরের লেখায় "ওপেনটি বায়স্কোপ",  "আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি", "সারে গামা পাধানি, বোমা ফেলেছে জাপানি" ইত্যাদি ছড়ার সমাজ ব্যাখ্যা চাই। 
     
    আরো লিখুন 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন