• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

  • প্রফুল্লচন্দ্র বনাম জগদীশ-বিবেকানন্দ : দুই প্যারাডাইমের দ্বন্দ্ব

    আশীষ লাহিড়ী
    আলোচনা | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি | ০২ আগস্ট ২০২১ | ১৮৩২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • আজ ২রা আগস্ট, ২০২১, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মদিন। ২০১০ তাঁর সার্ধশতবর্ষ পেরোনোর পর বাঙালি আবার বিস্মরণের শিকার হয়েছে। সারা জীবনের আত্মত্যাগ, বিপুল সামাজিক ও দেশব্রতী কর্মকান্ডের পর এই সার্থক বিজ্ঞানীর সঠিক মূল্যায়ন হয় না। সমসাময়িক অন্যান্যদের নিয়ে তাও যেটুকু চর্চা, প্রফুল্ল চন্দ্রকে নিয়ে সেটুকুও অনুপস্থিত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এ দেশের প্রথম ভারী রাসায়নিক শিল্পের কারখানা সরকারি খাতায় দেউলিয়া ঘোষণা হয়েছে, তার বিকিয়ে যাবার দিনও সমাগত সেই কথা মনে রেখে আচার্যের ১৬২তম জন্মদিবসে গুরুচন্ডা৯ প্রকাশ করছে এক গুচ্ছ প্রবন্ধ। এই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি, এই আমাদের দীর্ঘশ্বাস!

    একটা সময় ছিল যখন দর্শন আর বিজ্ঞান আলাদা ছিল না। ইউরোপে সতেরো শতকে বিজ্ঞান-বিপ্লব ঘটার পর থেকে বিজ্ঞান ক্ৰমে একটা স্বয়ংস্বতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তার নিজস্ব, অর্থাৎ দর্শনের থেকে স্বতন্ত্র, এক পদ্ধতিতন্ত্র ও যুক্তিধারা ক্রমে সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করতে থাকে। কিন্তু ভারতে বিজ্ঞান-বিপ্লব না--ঘটায় দর্শন-বিজ্ঞান বিচ্ছেদের এই অভিঘাতের তাৎপর্য ঔপনিবেশিক ভারতের মনীষীদের, এমনকি অনেক বিজ্ঞানীর, মননকে বিশেষ স্পর্শ করেনি। তাই নিখাদ বিজ্ঞানের আলোচনাতেও তাঁরা অনেক সময় অধিবিদ্যক প্রসঙ্গ টেনে আনতে কুণ্ঠা বোধ করতেন না। তা তাঁদের জাতীয়তাবাদী, উপনিবেশবাদ-বিরোধী আবেগকে তৃপ্ত করত। বলা যেতে পারে, সেটাই ছিল জাতীয়তাবাদী মননের মূলস্রোত। যাঁরা এর প্রধান ব্যতিক্রম, অর্থাৎ যাঁরা জাতীয়তাবাদী হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞান-দর্শন বিচ্ছেদের ঐ তাৎপর্য অনুধাবন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। বঙ্গদেশে যে-চিন্তাধারাটিকে বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের সাক্ষাৎ উত্তরসূরি বলা চলে, তার প্রতিনিধি প্রফুল্লচন্দ্র।


    প্রফুল্লচন্দ্র: জাতীয়তাবাদ ও বিজ্ঞানের ইতিহাসচর্চাঃ

    প্রফুল্লচন্দ্রের A History of Hindu Chemistry (প্রথম খণ্ড ১৯০২, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯০৯) একটি চিরায়ত গ্রন্থ। এই বই লেখার ইতিহাসটি শিক্ষাপ্রদ। প্রেসিডেন্সি কলেজের লাইব্রেরিতে বিখ্যাত ফরাসি জৈব রসায়নবিদ পিয়ের বের্তেলো (Pierre Eugene Marcellin Berthellot, 1827-1907) রচিত গ্রীক আলকেমির ইতিহাস (LAcheraistes Grecs) পড়ে তিনি মুগ্ধ হন। বের্তেলোকে জানান, প্রাচীন ভারতেও আলকেমির চর্চা অনেক দূর এগিয়েছিল। ১৮৯৭ সালে বের্তেলো এ বিষয়ে বিশদ জানতে চেয়ে তাঁকে একটি চিঠি লেখেন। প্রবীণ প্রসিদ্ধ রসায়নবিদের এই আন্তরিক সাড়া প্রফুল্লচন্দ্রকে উৎসাহিত করে। ‘রসেন্দ্রসারসংগ্রহ’ গ্রন্থের ভূমিকা অংশের ভিত্তিতে একটি লেখা তিনি বের্তেলোকে পাঠান। সেটিকে উপজীব্য করে বের্তেলো Journal des Sawants পত্রিকায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। সেই প্রবন্ধের কয়েকটি মুদ্রিত কপি, এবং সীরিয়, আরবি ও মধ্যযুগের আলকেমি সম্পর্কে তাঁর সুবিশাল রচনাসংগ্রহ উপহার দেন এই অনুজ বাঙালি রসায়নবিদকে। প্রফুল্লচন্দ্রের বয়স তখনো চল্লিশ পেরোয়নি।

    বের্তেলোর বইগুলি পড়ে তাঁর মনে হল, ঐ ধাঁচে প্রাচীন ভারতের আলকেমি-চর্চার একটি ইতিহাস লিখবেন তিনি। শুরু হয়ে গেল কাজ। মূল গ্রন্থগুলির পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য দেশ-বিদেশের বহু লাইব্রেরিতে সন্ধান চলল। পণ্ডিত নবকান্ত কবিভূষণ এ কাজে তাঁকে সাহায্য করলেন। বছর চারেকের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ১৯০২ সালে বেরোল A History of Hindu Chemistry-র প্রথম খণ্ড। একজন বিশেষজ্ঞ ও সক্রিয় বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে পুরোদস্তুর গবেষণা করে আস্ত একখানা প্রামাণ্য বই লিখছেন, এরকম ঘটনা পৃথিবীতে খুব বেশি ঘটেনি। বোর্তেলোকে বাদ দিলে, এর সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন, বলাই বাহুল্য, জে ডি বার্নাল । জোসেফ নীডহ্যামকেও এই গোত্রে ফেলা যায়, যদিও জীবনের দ্বিতীয় অর্ধে তিনি আর সক্রিয় বিজ্ঞানচর্চা করতেন না। Journal des Savants-এর জানুয়ারি ১৯০৩ সংখ্যায় প্রফুল্লচন্দ্রের বইয়ের তেরো পৃষ্ঠাব্যাপী এক সমালোচনার শেষে বের্তেলো লেখেন: ‘বিজ্ঞান ও মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সংযোজিত হল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতার মধ্যে পারস্পরিক মননগত লেনদেনের যে-সম্পর্ক চলে আসছে, তারই স্বীকৃতি স্বরূপ এই নতুন অধ্যায়টি সবিশেষ উপযোগী’


    পিয়ের বের্তেলো

    এর তাৎপর্য, বিজ্ঞানের ইউরোপ-কেন্দ্রিক উৎপত্তি সম্বন্ধে যে-ধারণা তখন বিদ্বৎমহলে প্রচলিত ছিল, তা বদলানোর মতো মালমশলা পেশ করলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ইতালির Archivio di storia della Scienzia এই বইয়ের সমালোচনা করে যে-কথা বলল তা আরো তাৎপর্যপূর্ণ: ‘সবদেশেই একদল লোক থাকে, নির্বোধ সংকীর্ণ স্বাজাত্যবোধের দ্বারা চালিত হয়ে যারা বিশ্বাস করে যে বিজ্ঞান কেবল তাদেরই দেশে বিকশিত হয়েছে, এবং সেটা তাদেরই সম্পত্তি। কিন্তু আরেকদল মানুষ আছে যাঁদের রয়েছে উপযুক্ত শিক্ষাগত প্রস্তুতি, রয়েছে তথ্য সংগ্রহ করার, বিচার করার ও তা নিয়ে লেখবার মতো মনীষা। এঁরা যখন নিজ দেশ সম্বন্ধে প্রকৃত মমত্ব ও স্বাভাবিক দক্ষতা নিয়ে কোনো কাজে নিয়োজিত হন, তখন তাঁদের মধ্যে কাজ করে একটা উদার দর্শন, একটা সংস্কারমুক্ত মন। সুতরাং ,এঁদের রচনা আমরা গভীর মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করতে বাধ্য ৷ ভারতে রসায়নের ক্ষেত্রে স্যার পি সি রায়ের স্থান ঠিক এরকমই। তাঁর কাছে আমরা অনেক কাজের জন্যই ঋণী। ... কিন্তু যে মহান কীর্তির জন্য তাঁর নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে সেটি হল তাঁর রচিত আদিকাল থেকে শুরু করে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যকাল পর্যন্ত ভারতীয় রসায়নচর্চার এই অতুলনীয় ইতিহাসটি।’

    আরেক জগদ্বিখ্যাত রসায়নবিদ আরেনিয়াস (Svante August Arrhenius, 1859-1927) আচার্য রায়ের বইয়ের কিছু কিছু অংশ নিয়ে আলোচনা করে দেখালেন, ধাতুঘটিত, বিশেষ করে পারদঘটিত ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারতই বিশ্বে অগ্রণী। Nature, Knowledge, American Chemical Journal প্রভৃতি প্রসিদ্ধ পত্রিকাতেও এ বইয়ের সপ্রশংস সমালোচনা বেরোল। বিভিন্ন ভাষায় এর কিছুকিছু অংশ অনুদিত হল।

    A History of Hindu Chemistry-র দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয় ১৯০৯ সালে। তার আগেই ১৯০৭ সালে প্রফুল্লচন্দ্রের গুরুপ্রতিম বের্তেলো মারা গেছেন। তাঁরই স্মৃতির উদ্দেশে দ্বিতীয় খণ্ডটি উৎসর্গিত হয়। Journal Asilatique- এ এটির সমালোচনা লেখেন সিলভ্যা লেভি। তিনি রায়ের বহুভাষিক দক্ষতায় চমৎকৃত হন।


    বইটি লিখে আচার্য রায় একটি জাতীয়তাবাদী কর্তব্য সম্পাদন করেছিলেন। দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় সেই জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্য তিনি গোপন করেননি: ‘হিন্দুজাতির এক গৌরবময় অতীত ছিল, এবং এক সুপ্ত কিন্তু বিশাল সম্ভাবনা আছে; সে আরো গৌরবময় এক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম। বিশ্বসভায় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে আমার দেশবাসী যদি তাদের হৃত স্থান পুনরুদ্ধারের কাজে এই বই থেকে প্রেরণা পায়, তাহলে জানব আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।’ ভারতীয় অর্থে ‘হিন্দু' শব্দ ব্যবহারের যে-দুঃখজনক রেওয়াজ তখনকার দিনে চালু হয়েছিল, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ও তা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের ধারেকাছেও যায়নি। অথচ যে-সময় তিনি বইটি লিখছেন, অর্থাৎ উনবিংশ শতকের শেষ দশক, তখন কিন্তু শিক্ষিত বাঙালি হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদে হাবুডুবু খাচ্ছে। সেই স্রোতের ভগীরথ, বলাই বাহুল্য, স্বামী বিবেকানন্দ। সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘পরমহংসকে নিয়ে neo-Hinduismএর revivalএর সূত্রপাত করেন বিবেকানন্দ। ... স্বামীজীই বাংলাদেশের মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন কালীঘাটের দিকে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর যে-বিচারশীলতা ও যুক্তিবাদের ধারা বইয়ে দিয়েছিলেন আমাদের দেশে তার স্রোত রুদ্ধ করে দেন বিবেকানন্দ neo-Hinduismএর বালির বাঁধ খাড়া করে। ... যে অলস মনগুলো রামমোহন, বিদ্যাসাগর প্রভৃতির ধাক্কায় জেগে উঠেছিল, ভিতরে ভিতরে অস্বস্তি বোধ করছিল সেগুলোকে তিনি আশ্বাস দিলেন যে ঘেঁটু পূজার মধ্যেও সত্য আছে। অজ্ঞানরা এই আশ্বাস পেয়ে – যত মত তত পথ – আবার নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে লাগল [1]

    কিন্তু নিছক কালী কিংবা ঘেঁটু পুজোর গণ-উপযোগিতা নয়, হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ ব্যাপকভাবে আচ্ছন্ন করেছিল উচ্চচিন্তার জগৎকেও, এমনকি বিজ্ঞানচর্চার জগৎকেও। সেই পরিপ্রেক্ষিতটা পরিষ্কার করে না নিলে আচার্য রায়ের বিজ্ঞান-ইতিহাস চর্চার অনন্য গুরুত্বটি অনুধাবন করা যাবে না।

    বিবেকানন্দ, জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক বিজ্ঞান

    আধুনিক বিজ্ঞানের তুলনায় প্রাচীন ভারতীয় দর্শনচিন্তা ও ধর্মচর্চার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রবল সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী তাগিদে বিবেকানন্দ অনেক সময় বেশ উগ্রভাবে আধুনিক বিজ্ঞানকে আক্রমণ করেছিলেন, বলেছিলেন, ধর্মের প্রাচীন পোপের বিরুদ্ধে আমরা বিজ্ঞানের আধুনিক পোপ বসাইয়াছি। শুধু তাই নয়, আধুনিক বিজ্ঞান যেসব তত্ত্ব আবিষ্কার করছে তার সবই যে প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকরা অনেক আগেই জানতেন, সেকথাটা তিনি বেশ উচ্চকণ্ঠে প্রচার করতেন। সেটা করতে গিয়ে অনেক সময় তিনি বিজ্ঞান, দর্শন আর ধর্মের সীমারেখাগুলো মুছে দিতেন। একটি উদাহরণ। প্রাণী কতকগুলো সহজাত সংস্কার নিয়েই জন্মায়, আর সেইসব সহজাত সংস্কার তার পিতা ও মাতার কাছে থেকে পাওয়া ‘বায়ো-প্লাজমিক সেল’-এর মধ্যে ‘লুক্কায়িত’ থাকতে পারে (মেণ্ডেলের ‘ফ্যাক্টর-তত্ত্ব’ ১৯০০ সালের আগে বিজ্ঞানীমহলে পাকাপাকিভাবে স্বীকৃত হয়নি), এই ধারণাকে সরাসরি অস্বীকার করে ১৮৯৬ সালে তিনি বলেন, “যতদিন না এই জড়বাদীরা প্রমাণ করিতে পারেন, কি করিয়া ঐ সংস্কার ঐ কোষে থাকিতে পারে, ... ততদিন তাঁহাদের সিদ্ধান্ত স্বীকার করিয়া লওয়া যাইতে পারে না।” কিন্তু তাই বলে প্রশ্নটাকে অতদিন মুলতুবি রাখতে দিতে রাজি নন তিনি। তাঁর কাছে ঐ রহস্যের সমাধান তৈরিই আছে:

    আত্মা কিন্তু জন্মান্তর গ্রহণ করেন -- শরীরের পর শরীর শরীর নির্মাণ করেন; আর আমরা যে-কোনো চিন্তা করি, যে-কোনো কাজ করি, তাহাই সূক্ষ্মভাবে থাকিয়া যায়, আবার সময় হইলেই উহারা স্থূল ব্যক্তভাব ধারণ করিতে উন্মুখ হয়[2]

    প্রমাণ? প্রমাণের দরকার নেই, কেননা সর্বজ্ঞ ঋষিরা এই কথা বলে গেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের কাছ থেকে পদে পদে তিনি ‘এম্পিরিক্যাল’ প্রমাণ দাবি করেন, কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় সর্বজ্ঞতার ক্ষেত্রে প্রমাণ-নিরপেক্ষভাবে শুধু অবরোহী যুক্তির সাহায্যে আপন বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ ধরনের যুক্তিপ্রয়োগ দর্শনে অবশ্যই গ্রাহ্য, কিন্তু আধুনিক -- অর্থাৎ সতেরো শতকোত্তর -- বিজ্ঞানে নয়। আধুনিক বিজ্ঞান বলবে এটা হাইপোথিসিস মাত্র; যতক্ষণ না এর সপক্ষে পরীক্ষাসিদ্ধ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি-অনুগ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ এর সত্যতা বিতর্কিত।

    ১৮৯৩-এ শিকাগো বক্তৃতার পর থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত বিবেকানন্দ পাশ্চাত্যে যেসব বক্তৃতা দেন তার মধ্যে থেকে তিনটে মূল হাইপোথিসিস বেরিয়ে আসে:
    ১। জীব আর অজীবের মধ্যে আসলে কোনো ভেদ নেই।
    ২। অজৈব পদার্থ বৈদ্যুতিক উদ্দীপনায় সাড়া দেয়, যা জীবনের মৌলিক ধর্ম।
    ৩। অদ্বৈতবাদ আর সাংখ্যদর্শনে অজৈব জগৎ, উদ্ভিদ জগৎ আর প্রাণীজগতের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার ধারণা ব্যক্ত হয়েছে।

    এই দার্শনিক মতকে সম্পূর্ণতা দেবার জন্য তার প্রয়োজন ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের পদ্ধতি-অনু্মোদিত কিছু ‘এম্পিরিক্যাল’ অর্থাৎ লেবরেটরিতে পরীক্ষিত ও গণিতসিদ্ধ কিছু প্রমাণ। স্বদেশে জগদীশচন্দ্র এবং আমেরিকাতে নিকোলা টেসলাকে (Nikola Tesla, ১৮৫৬-১৯৪৩) দিয়ে অদ্বৈতবাদী সৃষ্টিতত্ত্বের সপক্ষে এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্য অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে ওঠেন। লক্ষণীয়, এই কর্মসূচিতে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কোনো স্থান ছিল না। বিবেকানন্দ তাঁর প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি, তিনিও দেখাননি। কেন এই ঘটনা ঘটল, সেটাই আমাদের আলোচ্য।

    জগদীশ - নিবেদিতা - বিবেকানন্দ

    প্রফুল্লচন্দ্র যে সময় A History of Hinda Chemistry-র জন্য তথ্য সংগ্রহে ও গবেষণায় মেতেছেন, ঠিক সেই সময়েই ১৮৯৮ সালে ভগিনী নিবেদিতার দেখা হয় ক্ষুদ্র-তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ-বিশেষজ্ঞ জগদীশচন্দ্র বসুর।


    প্রথম আলাপের দিনই ‘জগদীশ স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “অদ্বৈতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য বিজ্ঞানের প্রমাণ চান? ... জ্ঞান আর বিজ্ঞানের উপলব্ধি যে একই জিনিস, এ আপনি বিশ্বাস করেন?” “উপনিষদগুলোতে তো তেমন ইশারাই আছে --”, নিবেদিতা বললেন [3]


    ব্রাহ্ম জগদীশচন্দ্র কিন্তু বিবেকানন্দর সমালোচনা আর শ্রীরামকৃষ্ণের নিন্দা করতে কসুর করলেন না। কয়েক বছর আগেই ইংল্যান্ডে বিবেকানন্দের বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মানুষটিই যখন তাঁর গুরুপূজা আর নিবেদিতার কালীর মতো অন্যান্য পূজায় মগ্ন হলেন, তখন জগদীশচন্দ্রের মনে হল, এক সময়কার এই বীর নায়কটি কালে হয়ে পড়েছেন এক নতুন ধর্মসম্প্রদায়ের নেতা মাত্র [4]। বিবেকানন্দ যেভাবে শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার বলে প্রচার করে চলেছিলেন, তাতে জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞানী মন ক্ষুব্ধ হয়েছিলো। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মতে ‘সংকীর্ণ ছাঁচে গড়া এক মানুষ, যিনি মেয়েদের প্রায় আধা-শয়তানী মনে করতেন, আর তাই মহিলা দেখলেই মূর্চ্ছা যেতেন’!! [5] এমন রামকৃষ্ণ-বিরোধী ও বিবেকানন্দ-সমালোচক মানুষটির সঙ্গে কী করে নিবেদিতার একটা মতাদর্শগত সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠল, সেটা খুবই আশ্চর্যের বিষয়। নিবেদিতার ফরাসি জীবনীকার লিজেল রেমঁ-র মতে, ধর্মতাত্ত্বিক ও সমাজনৈতিক দিক থেকে নিবেদিতার -- ও বিবেকানন্দের -- সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের কোনো মিল না থাকলেও তাঁরা বিজ্ঞান ও অদ্বৈতবাদী দর্শন বিষয়ক একটা বোঝাপড়ায় আসতে চেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বন্ধনের সূত্রটি ছিল সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম। নিবেদিতা হলেন এ প্রক্রিয়ার অনুঘটক। একটা পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথও সেই কর্মসূচিতে সামিল হয়েছিলেন, তবে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের ধরন আর জীবনদর্শন দুইই পরে অনেক বদলে গিয়েছিল।

    বিবেকানন্দ কিছুকাল ধরেই শুধু সর্বজীব নয়, সর্বপদার্থের মধ্যে প্রাণিক ঐক্যের কথা বলে আসছিলেন। ১৮৯২ সালে হরিপদ মিত্রকে তিনি বলেছিলেন:

    প্রথমে তাপ, আলো ও তড়িৎ … বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন জিনিস বলিয়া সকলে জানিত। এখন প্রমাণিত হইয়াছে, ঐগুলি সব এক, এক শক্তিরই অবস্থান্তর মাত্র। লোকে প্রথমে সমস্ত পদার্থ গুলি চেতন, অচেতন ও উদ্ভিদ -- এই তিনি শ্রেণীতে বিভক্ত করিল। তারপর দেখিল যে, উদ্ভিদের প্রাণ আছে, অন্য সকল চেতন প্রাণীর ন্যায় গমনশক্তি নাই মাত্র। আবার কিছুদিন পরে দেখা যাইবে, আমরা যাহাকে অচেতন বলি, তাহাদর ও অল্পবিস্তর চৈতন্য আছে।

    বিবেকানন্দ রচনাবলীর সম্পাদক পাদটীকায় যথার্থ ই বলেছেন, “স্বামীজী যখন পূর্বোক্ত কথাগুলি বলেন, তখন অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসু-প্রচারিত তড়িত-প্রবাহযোগে জড়বস্তুর চেতনবৎ আচরণ (Response of Inorganic Matter to Electric Currents) এই অপূর্ব তত্ত্ব প্রকাশিত হয় নাই [6]। সেটা আরো আট বছর পরের ঘটনা। তার অনেক আগে, ১৮৯৩ সালে, তিনি অদ্বৈতবাদী তত্ত্বের গাণিতিক সমর্থন খোঁজার চেষ্টা করেন। সে-প্রয়াসে তাঁর সহযোগী হন নিকোলা টেসলা (১৮৫৬-১৯৪৩)।

    নিকোলা টেসলা

    নিকোলা টেসলা-কে অনায়াসেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি-উদ্ভাবকদের একজন বলে গণ্য করা যায়। টেসলার জন্ম ক্রোয়েশিয়ায়। বাবা মিলুটিন টেসলা ছিলেন সার্বিয়ান অর্থোডক্স চার্চের যাজক। মা দিয়ুকা মান্দিচ (Djuka Mandic) গৃহবধূ, কিন্তু ঘর-গেরস্থালির নিত্যনতুন যন্ত্রকৌশল উদ্ভাবনে সিদ্ধহস্ত। প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন নিকোলা। ইচ্ছে ছিল পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতে বিশেষজ্ঞ হবেন। কিন্তু অচিরেই তড়িৎশক্তির মহিমা তাঁর মন হরণ করে। ঐ ক্ষেত্রে ব্যবহারিক কিছু করাই তাঁর জীবনের স্বপ্ন হয়ে ওঠে। ১৮৮১ সালে বুদাপেস্টের এক টেলিফোন কম্পানিতে বৈদুতিক এনজিনিয়ারের পদে যোগ দেন। এর পর লাফে লাফে উন্নতি। প্রথমে প্যারিসের কন্টিনেন্টাল এডিসন কম্পানিতে ডাইনামো ডিজাইন করার কাজ। অবশেষে ১৮৮৪ সালে, আটাশ বছর বয়সে, খোদ টমাস এডিসনের কাছ থেকে ডাক পেয়ে নিউ ইয়র্ক চলে আসেন। সেখানেই কাটে তাঁর বাকি জীবন।


    নিকোলা টেসলা

    ভুল বাংলায় যাকে আমরা ‘এসি কারেন্ট’ বলি, সেটি টেসলারই উদ্ভাবনা। ডিসি-র বদলে এসি-র উপযোগিতা যে কত বেশি তা সাক্ষাৎ হাতেকলমে দেখিয়ে দেওয়ার পরেও তাঁর বস্ টমাস আলভা এডিসন তা চালু করতে রাজি হননি। কেননা ততদিনে এডিসনের ডিসি-সাম্রাজ্য বহুদূর বিস্তৃত। এসি চালু হলে সে-সাম্রাজ্য ধসে যাবে, আর নতুন এসি-সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হবেন টেসলা। হয়েছিলও তাই। এডিসনের সঙ্গে ঝগড়া করে। আলাদা হয়ে যান টেসলা। বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস মারফত তাঁর এসি প্রযুক্তি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে যায়। আজ কুমোরটুলি, চিৎপুর আর ভবানীপুরের কিছু পুরোনো বাড়ি ছাড়া সারা পৃথিবীতে কোথাও ডিসি-র ব্যবহার আছে কিনা সন্দেহ।

    ১৮৮৮ সালে টেসলা তাঁর জগদ্বিখ্যাত ইন্ডাকশন কয়েল মোটর উদ্ভাবন করেন। ১৮৯১ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট মেলায় তাঁর ট্রান্সফর্মারের সাহায্যে তিনি দেখান, ২৫০০০ ভোল্ট এসি বা পর্যাবৃত্ত বিদ্যুৎপ্রবাহকে ১০৯ মাইল দূরত্ব পর্যন্ত ৭৭ শতাংশ কর্মদক্ষতা (এফিশিয়েন্সি) বজায় রেখে প্রেরণ করা সম্ভব। এরই চূড়ান্তরূপ প্রদর্শন হয় ১৮৯৩ সালে শিকাগোতে। সে প্রসঙ্গে একটু পরেই আসছি। তার আগে আরো যেসব অজস্র উদ্ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম, তার দু একটি উল্লেখ করি। আমরা যেমন দাবি করি যে মার্কনির আগেই জগদীশচন্দ্র রেডিয়ো উদ্ভাবন করেছিলেন, মার্কিন দেশের লোকও দাবি করে যে সে কৃতিত্ব আসলে টেসলারই পাওনা। বাস্তবিক, মার্কনির নেওয়া পেটেন্টের বিরুদ্ধে টেসলা মামলা করেছিলেন এবং বহু বছর পর ১৯৪৩ সালে তাঁর মৃত্যুর অল্পকাল পরে আদালত তাঁর সপক্ষে রায় দেয় ৷ এক্স-রে উৎপাদন করার কাজেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য ছিল।

    এবার আসি শিকাগো প্রসঙ্গে। ১৮৯৩ সালে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড কলাম্বিয়ান এক্সপোজিশন। নতুন নতুন প্রযুক্তি আর শিল্পোদ্যোগের সেই প্রদর্শনী ছিল বিশ্বের কাছে সাবালক মার্কিন শিল্প পুঁজিতন্ত্রের দৃপ্ত আত্মঘোষণা। সেই মেলাতে সারা দুনিয়াকে চমকে দিয়ে টেসলা পুনরায় দেখান যে পর্যাবৃত্ত প্রবাহ (অল্টারনেটিং কারেষ্ট) সরল প্রবাহের (ডাইরেক্ট কারেন্ট) তুলনায় কত শক্তিশালী। বস্তুত, ঐ প্রদর্শনীতেই বিশ শতকের প্রধান শক্তি জোগানদার হিসেবে তাঁর উদ্ভাবিত এসি-প্রযুক্তির জয়যাত্রা নিরঙ্কুশ হয়ে যায়।

    বৈদান্তিক সৃষ্টিতত্ত্বের গাণিতিক মডেল

    ১৮৯৩ সালের শিকাগোর ঐ ওয়ার্লড কলাম্বিয়ান এক্সপোজিশন-এর অঙ্গ হিসেবেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ব ধর্ম সংসদ। আমরা জানি, সেখানেই ‘আমেরিকার ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দের’ কাছে বক্তৃতা দিয়ে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান স্বামী বিবেকানন্দ। যাঁরা তাঁর বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হন, তাঁদের অন্যতম নিকোলা টেসলা। বিবেকানন্দর বক্তব্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমে বাড়তে থাকে।

    ১৮৯৬ সালের গোড়ার দিকে বিবেকানন্দ যেসব বক্তৃতা দেন, টেসলা তার বেশির ভাগ, এমনকি হয়তো সবকটিতেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মুখোমুখি আলাপ হয় ১৮৯৬ সালে। সে-আলাপের অনুঘটক ছিলেন বিবেকানন্দের আর এক ভক্ত -- বিখ্যাত ফরাসি অভিনেত্রী সারা বার্নহার্ট।


    সারা বার্নহার্ট (Sarah Bernhardt, ১৮৪৪-১৯২৩)

    সারা বার্নহার্ট নিজের সাঁলয় পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানী, মনীষী ও শিল্পীদের নিমন্ত্রণ করতেন। খুব সম্ভব সেইরকম এক পার্টিতে বিবেকানন্দ আর টেসলা দুজনেই আমন্ত্রিত ছিলেন। সারা সেদিন অভিনয় করছিলেন ‘বুদ্ধ’ নামক নাটকের (ফরাসি অনুবাদে) একটি চরিত্রে। স্বামী বিবেকানন্দর সঙ্গে তিনিই টেসলার আলাপ করিয়ে দেন। এঁদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চলে। বিবেকানন্দ এই প্রসঙ্গে ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৬ ই এইচ স্টার্ডিকে এক চিঠিতে লেখেন:

    মিঃ টেসলা বৈদান্তিক প্রাণ ও আকাশ এবং কল্পের তত্ত্ব শুনে মুগ্ধ হলেন। তাঁর মতে আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কেবল এই তত্ত্বগুলিই গ্রহণীয়। আকাশ ও প্রাণ আবার জগদ্ব্যাপী মহৎ, সমষ্টি-মন, বা ঈশ্বর থেকে উৎপন্ন হয়। মিঃ টেসলা মনে করেন, তিনি গণিতের সাহায্যে দেখিয়ে দিতে পারেন যে, জড় ও শক্তি উভয়কে অব্যক্ত শক্তিতে পরিণত করা যেতে পারে। আগামী সপ্তাহে এই নূতন পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেখবার জন্য তাঁর কাছে আমার যাবার কথা আছে। তা যদি প্রমাণিত হয়ে যায়, তবে বৈদান্তিক সৃষ্টিতত্ত্ব দৃঢ়তম ভিত্তির উপর স্থাপিত হবে
    [7]

    এরও একটা পটভূমি আছে। ১৮৯৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিবেকানন্দ ‘ঈথর’ (The Ether) নামে এক প্রবন্ধ লেখেন নিউ ইয়র্ক মেডিকেল টাইমস নামক প্রসিদ্ধ এক বিজ্ঞানপত্রিকায়। তাতে তিনি লেখেন:

    অতএব আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হই যে ঈথর ... দ্বারা দেশকে (স্পেস) ব্যাখ্যা করা যায় না। কেননা দেশ-ব্যতিরেকে আমরা ঈথরকে ভাবতে পারি না। কাজেই, এমন কিছু যদি থাকে যা এই দেশকে ব্যাখ্যা করতে পারবে, সেটা হবে এমনই একটা কিছু যা তার অনন্ত সত্তার মধ্যেই স্বয়ং অনন্ত দেশকে অনুধাবন করতে সক্ষম। আর একমাত্র অনন্ত মন ছাড়া আর কোন জিনিস আছে যা অনন্ত দেশকেও অনুধাবন করতে পারে? [8]

    এই ঈথর বিষয়টি টেসলার খুব প্রিয় ছিল। ম্যাক্সওয়েল এবং হাজের ঈথর-প্রকল্পের তিনি বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, ঈথর অবশ্যই আছে, কিন্তু সে-ঈথরের চরিত্র ম্যাক্সওয়েল এবং হাজ-কথিত ঈথরের চেয়ে আলাদা। কাজেই বিবেকানন্দর এই প্রবন্ধটি তাঁর বিশেষ আগ্রহ জাগাবে, এটা খুব স্বাভাবিক। এ বিষয়ে বিবেকানন্দের সঙ্গে টেলার তাৎপর্যময় আলোচনা হয়েছিল। বিবেকানন্দ আশা করেন, টেসলা বৈদান্তিক প্রাণ ও আকাশের ঐক্য-ধারণার গাণিতিক প্রমাণ প্রদর্শন করবেন; আর টেসলা চেয়েছিলেন, বিবেকানন্দ ঈথর সম্বন্ধে তাঁর দার্শনিক ভাবনাকে আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করবেন। আলোচনার একটা পর্যায়ে বিবেকানন্দ টেসলাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, প্রাণহীন জড়পদার্থ আর শক্তির মধ্যে সমতুল্যতা প্রতিষ্ঠা কি সম্ভব বলে তিনি মনে করেন? টেসলা কী বলেছিলেন তার স্পষ্ট কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না, কিন্তু তিনি সেটা সম্ভব বলে আশা পোষণ করেছিলেন, এ অনুমান যুক্তিসম্মত।


    প্রথম পাশ্চাত্য ভ্রমণ সেরে দেশে ফিরে বিবেকানন্দ ভারতের বহু জায়গায় বক্তৃতা দেন। ১৮৯৭ সালে কুম্ভকোথমে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি মন্তব্য করেন:

    “আমাকে পাশ্চাত্যদেশের অনেক ভাল ভাল বৈজ্ঞানিক বলিয়াছেন, বেদান্তের সিদ্ধান্তগুলি অপূর্ব যুক্তিপূর্ণ। আমার সহিত ইহাদের একজনের বিশেষ পরিচয় আছে। এদিকে ইঁহার খাইবার বা গবেষণাগার হইতে বাহির হইবার অবকাশ নাই, অথচ তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার বেদান্তবিষয়ক বক্তৃতা শুনিতেছেন। কারণ জিজ্ঞসা করিলে তিনি বলেন -- বেদান্তের উপদেশগুলি এতদূর বিজ্ঞানসম্মত, বর্তমান যুগের অভাব ও আকাঙ্ক্ষাগুলি বেদান্ত এত সুন্দরভাবে পূরণ করিয়া থাকে, আর আধুনিক বিজ্ঞান যে-সকল সিদ্ধান্তে উপনীত হইতেছে, সেগুলির সহিত বেদান্তের এত সামঞ্জস্য যে, আমি উহার প্রতি আকৃষ্ট না হইয়া থাকিতে পারি না [9]।”

    এই ‘একজন বৈজ্ঞানিক’ হলেন নিকোলা টেসলা।

    টেসলা বিবেকানন্দের কাছে বেদান্ত ও সাংখ্যের মিলিত সৃষ্টিতত্ত্ব শুনে মুগ্ধ হন। সাংখ্যে জড়পদার্থ আর শক্তির মধ্যে যে-সাদৃশ্যের কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কিছু কিছু ধারণার মিল বিশেষভাবে নাড়া দেয় তাঁকে। ১৮৯৭-র কুম্ভকোথম বক্তৃতায় বিবেকানন্দ মন্তব্য করেন যে, “আমাদের নিকট এক যাঁহারা এই বিষয়ের বিশেষ আলোচনা করিয়াছেন, তাঁহাদেরও নিকট ইহা স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে আধুনিক বিজ্ঞান যে-সকল সিদ্ধান্তে উপনীত হইতেছে, বেদান্ত অনেক শতাব্দী আগেই সেই-সকল সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছিল; কেকল, আধুনিক বিজ্ঞানে সেগুলি জড়শক্তি রূপে উল্লিখিত হইতেছে মাত্র [10]। ১৮৯৭ সালের ১২ নভেম্বর লাহোরের একটি বক্তৃতাতেও তিনি বলেন:

    শক্তিবর্গ প্রাণরূপ এক শক্তিতে এবং জড়বর্গ আকাশরুপ এক বস্তুতে পর্যবসিত হইয়াছে। সেই দুইটির মধ্যে কি আবার কোনরূপ একত্ব বাহির করা যাইতে পারে? ইহাদিগকেও কি এক তত্ত্বে পর্যবসিত করা যাইতে পারে? আমাদের আধুনিক বিজ্ঞান এখানে নীরব -- কোনরূপ মীমাংসা করিতে পারে না [11]

    বিবেকানন্দের আশা, “মিঃ টেসলা মনে করেন, তিনি গণিতের সাহায্যে দেখিয়ে দিতে পারেন যে, জড় ও শক্তি উভয়কে অব্যক্ত শক্তিতে পরিণত করা যেতে পারে। ... তা যদি প্রমাণিত হয়ে যায়, তবে বৈদান্তিক সৃষ্টিতত্ত্ব দৃঢ়তম ভিত্তির উপর স্থাপিত হবে।”

    কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও টেসলা সে কাজ করতে পারেননি।

    টেসলা - আইনস্টাইন বিসংবাদ


  • ১৯০২ সালে বিবেকানন্দর মৃত্যু হয়। ‘… ১৯০৫ সালে (স্বামী বিবেকানন্দর প্রয়াণের ঠিক তিন বছর পরে) স্বামিজীর এই ঐক্য-ব্যাখ্যার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দাখিল করেন আইনস্টাইন, তাঁর “আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে”, যা প্রকাশিত হয়েছিল Annalen der Physik পত্রিকায়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, “কোনো বস্তুর ভর তার শক্তি-উপাদানের পরিমাপ।” [12] স্বামী তথাগতানন্দের মতে, তিনি তত্ত্বগতভাবে প্রমাণ করলেন যে সকল ভর শক্তির মধ্যে সংহত হয়। এই সম্পর্কসূত্রটি প্রকাশ পেল তাঁর সেই বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 -এ।

    স্বামী তথাগতানন্দের ভাষায়, বিবেকানন্দ টেসলাকে যা প্রমাণ করতে বলেছিলেন তা হল: ‘বেদান্তের আকাশ আর প্রাণ, এই দুটিই মহাজাগতিক বাস্তবতা থেকে বিনির্গত সূক্ষ্ম শক্তি ভিন্ন আর কিছুই নয়। প্রাণ প্রতিভাত হয় ভৌত বল রূপে; আর আকাশ প্রতিভাত হয় চেতন পদার্থ রূপে। এ জগৎ অন্তরালবর্তী কোনো ঐক্যসারী শক্তির অস্তিত্ববিহীন নিছক এক আণবিক বিন্যাস নয়। আকাশ আর প্রাণ বিচ্ছিন্ন নয় -- একটা শক্তি বা বল রয়েছে যা আকাশ আর প্রাণকে এক করে।’ [13] আইনস্টাইনের ঐ সমীকরণ যদি বিবেকানন্দর হাইপোথিসিসকে সমর্থন করে, তাহলে বিবেকানন্দর অন্যতম গুণমুগ্ধ টেসলার তো হরষিত হবার কথা। কিন্তু ঘটনা তার বিপরীত।

    আপেক্ষিকতার তত্ত্ব যখন প্রকাশিত হয়, টেসলা তখন তাঁর খ্যাতি ও প্রতিপত্তির তুঙ্গে। সেই সময় থেকে সারা জীবন ধরে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তিনি এই তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করে গেছেন। আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে তিনি তার সীমিত ও সার্বিক কোনো দিক থেকেই গ্রহণ করতে পারেননি। আগেই লক্ষ্য করেছি, তাঁর প্রধান আগ্রহের ক্ষেত্র ছিল লুমিনিফেরাস ঈথর। বিবেকানন্দর ঈথর বিষয়ক প্রবন্ধ তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে ঈথরের অস্তিত্ব আছে, যদিও সে-ঈথরের চরিত্র তাঁর মতে ম্যাক্সওয়েল-প্রকল্পিত ঈথরের চেয়ে আলাদা। অথচ ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লি-র বিখ্যাত ‘নঞর্থক’ পরীক্ষা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে ঈথরের অস্তিত্ব নেই। আইনস্টাইন স্পষ্ট করে দেখালেন, ঈথর নামক কাল্পনিক যে-মাধ্যমটির কথা ধরে নিয়ে উনিশ শতকের পদার্থবিজ্ঞান এগিয়েছিল, সেরকম কোনো কাল্পনিক মাধ্যমকে ধরে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ঈথরকে বাদ দিয়েই মহাবিশ্বের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ঠিক এই জায়গাতেই টেসলার আপত্তি। ১৯৩২ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি বলেন, ‘জড়পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং বলকে জড়পদার্থে পরিণত করা নিয়ে আইনস্টাইনের তত্ত্ব ‘উদ্ভট ও অবাস্তব’ (absurd)। তিনি এর তুলনা করেন দেহ আর মনের প্রভেদের সঙ্গে। তাঁর কথায়, বল (force) হল ‘জড়পদার্থেরই একটি ক্রিয়া’, তাই দেহ ছাড়া মন যেমন থাকতে পারে না, তেমনি ‘জড়পদার্থ ছাড়া কোনো বল থাকতে পারে না।' অর্থাৎ বিবেকানন্দ তাঁকে যা প্রমাণ করতে বলেছিলেন, আইনস্টাইনকে উপলক্ষ্য করে তিনি ঠিক তার বিপরীত মত প্রকাশ করলেন।

    এখানেই শেষ নয়। আমরা জানি, দেশ-কাল-ভিত্তিক এক নতুন ধরনের অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির প্রয়োগ করে আইনস্টাইন দেখান যে, মহাবিশ্বের বৃহৎ ও ভারী বস্তুগুলির সন্নিহিত দেশ (space) হয় বক্র। বলা বাহুল্য, বহু বিজ্ঞানীই এই সম্পূর্ণ নতুন ও ‘কাণ্ডজ্ঞান-বিরোধী’ ধারণা মেনে নিতে পারেননি। টেসলাও তাঁদের মধ্যে একজন। ১৯৩২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি চাঁছাছোলা ভাষায় বলেন, “আমি মনে করি দেশ কখনো বেঁকে যেতে পারে না। তার সহজ কারণটা এই যে দেশের কোনো ধর্ম (property) থাকতে পারে না। ... ধর্মের কথা আমরা তখনই বলতে পারি যখন আমাদের বিচার্য বিষয় হল জড়পদার্থ যা কিনা দেশকে ভরাট করে রাখে। বৃহৎ বস্তুর উপস্থিতিতে দেশ বক্র হয়ে যায়, একথা বলাও যা, আর কোনোকিছু শূন্যের ওপর ক্রিয়া করতে পারে -- একথা বলাও তাই। অন্যের কথা বলতে পারি না, কিন্তু আমি এরকম একটা মত কিছুতেই মেনে নিতে পারব না।” [14]

    এতক্ষণের আলোচনার ভিত্তিতে কয়েকটা কথা পরিষ্কার করে বলা যেতে পারে। এক, বাস্তবতার চরিত্র সম্বন্ধে বিবেকানন্দের সাংখ্য-বেদান্ত-ভিত্তিক, প্রাণ ও আকাশ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা টেসলাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এটি আয়ত্ত করার জন্য তিনি কিছু কিছু সংস্কৃত চর্চাও করেছিলেন বলে শোনা যায়। তিনি ঐ তত্ত্বের ভিত্তিতে মহাবিশ্বের একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। দুই, বিবেকানন্দের মৃত্যুর অল্পকাল পরেই, আইনস্টাইন তাঁর সীমিত আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রণয়ন করেন। সে-তত্ত্ব এই কথা বলে যে, আলোর গতিবেগ ধ্রুব, অনাপেক্ষিক; তা কোনো মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল নয়। সুতরাং ঈথর জাতীয় কোনো সর্বব্যাপী মাধ্যমের অস্তিত্ব কল্পনা করে নেওয়া নিষ্প্রয়োজন। তিন, টেসলা ‘জড়পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং বলকে জড়পদার্থে পরিণত করা নিয়ে আইনস্টাইনের তত্ত্বকে ‘উদ্ভট ও অবাস্তব’ (absurd) বলেন।

    অথচ বিবেকানন্দ-ভক্তরা ঠিক ঐ ঘটনাটির উল্লেখ করেই দাবি করেন যে, টেসলার বিবেকানন্দ-নির্দেশিত অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন আইনস্টাইন! তাঁরা দাবি করেন যে, ‘টেসলা শক্তি আর জড়পদার্থের সদৃশতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, একথা মনে হয় ঠিক। কারণ তা যদি তিনি দেখাতে পারতেন, তাহলে স্বামী বিবেকানন্দ নিশ্চয় সে-ঘটনাটা উল্লেখ করে যেতেন। তবে ঐ সূত্রের গাণিতিক প্রমাণ সত্যিই পাওয়া গিয়েছিল বছ দশেক পরে, যখন আলবার্ট আইনস্টাইন আপেক্ষিকতা বিষয়ে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। প্রাচ্যে যা পাঁচ হাজার বছর আগে থেকেই জানা ছিল, প্রতীচী তখন তা জানতে পারল। [15]

    চার, ‘বৃহৎ বস্তুর উপস্থিতিতে দেশ বক্র হয়ে যায়’ – আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তরে এই বৈপ্লবিক ধারণাটি নিয়ে খানিকটা বক্রোক্তিই করেছিলেন টেসলা। তিনি দৃঢ়ভাবে ঈথর-তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, যদিও সে-ঈথর ম্যাক্সওয়েল-প্রকল্পিত ঈথর নয়।


    প্রসঙ্গক্রমে অবশাই উল্লেখ করব যে ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিতর্কে আইনস্টাইন খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি একজন ‘রিয়ালিস্ট', অর্থাৎ মানুষের মন-নিরপেক্ষ অবজেকটিভ বাস্তবতার অস্তিত্বে তিনি বিশ্বাসী। এ বিষয়ে বিবেকানন্দের বিশ্বাস সম্পূর্ণ বিপরীত: ‘এমন কিছু যদি থাকে যা এই দেশকে ব্যাখ্যা করতে পারবে, সেটা হবে এমনই একটা কিছু যা তার অনন্ত সত্তার মধ্যেই স্বয়ং অনন্ত দেশকে অনুধাবন করতে সক্ষম। আর একমাত্র অনন্ত মন ছাড়া আর কোন জিনিস আছে যা অনন্ত দেশকেও অনুধাবন করতে পারে?' সুতরাং আইনস্টাইন টেসলার আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করে বিবেকানন্দ-কল্পিত অদ্বৈতবাদী হাইপোথিসিসকে সত্য বলে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, এমন কথা সত্যের অপলাপ।

    একদেশদর্শী জাতীয়তাবাদ

    একটা ব্যাপার খুবই অবাক করে। জগদীশচন্দ্র বসুর মধ্যে বিবেকানন্দ ও নিবেদিত প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞান-মনীষার নবোদিত আইকন খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রাচীন ভারত আধুনিক পাশ্চাত্যের তুলনায় জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অনেক অগ্রসর ছিল, এই ছিল তাঁদের প্রতিপাদ্য। বিবেকানন্দ নিকোলা টেসলাকে দিয়ে বৈদান্তিক সৃষ্টিতত্ত্বের গাণিতিক মডেল তৈরি করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, জগদীশচন্দ্রকে দিয়ে অদ্বৈতবাদের পরীক্ষাসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। অথচ প্রফুল্লচন্দ্র রায় যখন তাঁর বইতে প্রাচীন ভারতের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক গৌরবের তথ্যপ্রমাণসমৃদ্ধ পরিচয় মেলে ধরলেন, তখন নিবেদিতা নীরব! (বিবেকানন্দ অবশ্য তখন প্রয়াত)। প্রফুল্লচন্দ্রের বইটি সম্বন্ধে নিবেদিতার কোনো মন্তব্য, এমনকি প্রতিক্রিয়াও জানা যায় কি? এই নীরবতার একটা কারণ কি এই যে বিবেকানন্দ, জগদীশচন্দ্র ও নিবেদিতা ভারতীয় সভ্যতার কেবল সেই রূপটিকেই বিশ্বে প্রক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন যেটি দ্বন্দ্বহীনভাবে অদ্বৈতবাদী আধ্যাত্মিকতায় সিঞ্চিত এবং যা ‘পাশ্চাত্য’ বিজ্ঞান-আবিষ্কৃত সব বৈজ্ঞানিক তত্ত্বেরই পুর্বসুরি ও প্রাচীন আকর?

    অথচ ভারতে সংশয়বাদী, অনীশ্বরবাদী কিংবা অনাধ্যাত্মিক দর্শনের কোনো অভাব ছিল না। অনেকের মতে অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার তুলনায় এসবের চর্চা ভারতে কিছু বেশি পরিমাণেই হয়েছিল। অদ্বৈতবাদেরই মতো, বৈশেষিক কিংবা চার্বাকও তো আগাপাশতলা ভারতীয় দর্শন। এই দর্শনগুলি সম্বন্ধে জাতীয়তাবাদী বিবেকানন্দ, নিবেদিতা এবং জগদীশচন্দ্র কার্যত নীরব। ভারতের বিভিন্ন দর্শনের মধ্যে যে-মতাদর্শগত সংঘাত চলেছিল, এবং সে-সংঘাত ভারতের বিজ্ঞানচর্চাকে যেভাবে প্রভাবিত করেছিল, তার কোনো মূল্যায়ন এঁদের রচনায় পাই না। অথচ সে-মূল্যায়ন ব্যতিরেকেই এঁরা সুনিশ্চিত যে অদ্বৈতবাদই প্রকৃত ভারতীয় দর্শন এবং তা আধুনিক বিজ্ঞানের পূর্বসূরি। সারা বিশ্বকে বিবেকানন্দ এই কথা বুঝিয়েছিলেন। জগদীশচন্দ্রও এই ভাবনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। যদি বলি, এই জাতীয়তাবাদ একদেশদর্শী, ভুল করব কি?

    রবীন্দ্রনাথ, আমরা জানি, শঙ্করের অদ্বৈতবাদী মায়াবাদের বিরোধী ছিলেন। মূর্তিপূজার প্রতি, বিশেষত পশুবলির প্রতি তাঁর প্রবল বিতৃষ্ণার কথা সুবিদিত। অথচ অদ্বৈতবাদী হিন্দু মূর্তিপূজক বিবেকানন্দের সঙ্গে তাঁর মতাদর্শগত বিরোধ যত তীব্ৰই হোক, জীবনের একটা পর্যায়ে তিনিও এই একদেশদর্শী দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক-জাতীয়তাবাদী প্রকল্পে পুরোপুরি সামিল হয়েছিলেন। ১০ মে, ১৯০১ সালে রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে জগদীশচন্দ্র যে-বক্তৃতা দেন, তার নিবেদিতা-প্রেরিত প্রতিবেদনের অনুবাদ সাগ্রহে ছাপেন রবীন্দ্রনাথ: “আমরা অনুভব করিলাম যে, এতদিন পরে ভারতবর্ষ -- শিষ্যভাবেও নহে, সমকক্ষভাবেও নহে, গুরুভাবে পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকসভায় উত্থিত হইয়া আপনার জ্ঞানশ্রেষ্ঠতা সপ্রমাণ করিল -- পদার্থতত্ত্বজ্ঞানী ও ব্ৰহ্মজ্ঞানীর মধ্যে প্রভেদ, তাহা পরিস্ফুট করিয়া দিল।’ [16]

    অদ্বৈতবাদ ও জাতিভেদই পতনের মূল কারণ

    ঠিক ঐ পর্বেই এই একদেশদর্শী প্রকল্পের প্রত্যক্ষ বিরোধিতায় নেমেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র, যাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনা উপরি-উক্তদের তুলনায় কিছু কম ছিল না। উচ্ছ্বাসের ফেনা সরিয়ে তিনি বাস্তবসম্মত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হলেন। তিনি দেখালেন,

    প্রাচীন ভারতে প্রয়োজনীয় কৌশলশিক্ষা (the useful Arts) এবং বিবিধ বিজ্ঞানের চর্চা (যা নিছক হস্তশিল্প থেকে আলাদা) করতেন উচ্চশ্রেণীভুক্ত লোকেরা। ... দুঃখের কথা, অত্যন্ত কট্টর রূপে জাতিভেদপ্রথা যখন প্রতিষ্ঠিত হল, তখন এসবের জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেল।[17]

    জাতিভেদপ্রথার মূল ভিত্তি হল বংশানুক্রমিক পেশা। রায় বলছেন:

    বৈদিক যুগে ঋষি বা পুরোহিতরা একটা স্বয়ংস্বতন্ত্র বর্ণের অন্তর্গত ছিলেন না। সুযোগসুবিধা ও স্বাভাবিক প্রবণতা অনুযায়ী তাঁরা বিভিন্ন পেশা বেছে নিতেন।... কিন্তু বৌদ্ধধর্মের পতন অথবা বহিষ্কারের পর ব্রাহ্মণরা যখন নতুন করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন তখন এ সবই বদলে গেল।[18]

    ভারতের অতি-উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধঃপতনের কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি লেখেন:

    সুশ্রুতের মতে শল্যচিকিৎসার ছাত্রের পক্ষে শবব্যবচ্ছেদ ছাড়া জ্ঞান লাভ অসম্ভব। পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ মারফত সংগৃহীত জ্ঞানের উপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এই মহাবিশারদ। কিন্তু মনুর কাছে এসবের কোনো মূল্য ছিল না। ... তাই আমরা দেখতে পাই, বাগভটের সময়ের কিছুকাল পর থেকেই শল্যছুরিকার ব্যবহারকে নিরুৎসাহ করা হয়। অঙ্গসংস্থানবিদ্যা (অ্যানাটমি) আর শল্যচিকিৎসার চর্চা ক্রমে বন্ধ হয়ে গেল। কার্যত হিন্দুদের কাছে এসব বিজ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেল। [19]

    জাতিভেদপ্রথার প্রকোপ বিজ্ঞানচর্চার এই বিলুপ্তির একটা কারণ। অন্য কারণটি দার্শনিক বা মতাদর্শগত। সেই দার্শনিক আক্রমণের হোতা শঙ্করাচার্য।

    বৌদ্ধবৈরী শঙ্করাচার্যের উত্থানের সঙ্গে ভারতীয় বিজ্ঞানের অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াটি নিবিড়ভাবে যুক্ত বলে তিনি মনে করেন -

    শঙ্কর কর্তৃক পরিশীলিত ও সম্প্রসারিত বেদান্তদর্শন, যা এই কথা শেখায় যে এই বস্তুজগতের বাস্তব অস্তিত্ব নেই, তাও ভৌত বিজ্ঞানের চর্চাকে হীন প্রতিপন্ন করে তোলার জন্য বহুলাংশে দায়ী।

    এর বিপরীতে প্রফুল্লচন্দ্র স্থাপন করেন কণাদের পরমাণুতত্ত্ব এবং বৈশেষিক দর্শনকে। ঐ দর্শনকে শঙ্কর যেভাবে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছেন তার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি:

    কণাদ ও তাঁর দর্শনতন্ত্রের নিন্দায় শঙ্কর খড়্গহস্ত। শঙ্করের বেদান্তভায্য থেকে দু একটি অংশ তুলে দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। শঙ্কর বলছেন, ‘অতএব ইহা প্রতীয়মান হয় যে পরমাণু-মতের সপক্ষে যে সকল যুক্তি উপস্থাপন করা হয় তাহা নিতান্তই দুর্বল; শাস্ত্রের যে সকল অনুচ্ছেদে ব্ৰহ্মকেই আদিকারণ বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে, ঐ মত তাহার বিরোধী। মনু প্রভৃতি প্রামাণিক শাস্ত্র-ব্যাখ্যাতাগণের কেহই ঐ মতকে সমর্থন করেন না। অতএব যেসকল উচ্চমনা ব্যক্তি আপন আত্মিক মঙ্গলকে মূল্য দেন তাঁহাদের সকলেরই উচিত ঐ মতকে অগ্রাহ্য করা। [20]

    শঙ্করের মতে বৈশেষিক দর্শন ‘অর্ধ-সর্বনাশী অথবা অর্ধ-ধ্বংসাত্মক’। অথচ প্রফুল্লচন্দ্র জানাচ্ছেন, কণাদের ‘শব্দ-পরিবহণ তত্ত্ব আজ এতদিন পরেও আমাদের বিমুগ্ধ শ্রদ্ধা ও বিস্ময় না জাগিয়ে পারে না। আলোক ও তাপ যে একই মৌলিক বস্তুসত্তার রকমফের মাত্র, এই মর্মে তাঁর বিবৃতিও কিছু কম চমকপ্রদ নয়। কণাদ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসমূহকে যে-ছয়টি বর্গে বিন্যস্ত করেন (দ্রব্য, গুণ, কর্ম, জাতি, বিশেষ ও সমবায়) তার বৈজ্ঞানিক পরিচ্ছন্নতা প্রফুল্লচন্দ্রকে মুগ্ধ করে। বৈশেষিক দর্শন নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করে তিনি দেখাতে চান, প্রাচীন, অর্থাৎ শঙ্কর-পূর্ববর্তী ভারতবর্ষ বিজ্ঞানচর্চায় এবং বিজ্ঞানভাবনায়, তত্ত্বে ও প্রয়োগে, অতীব উন্নত ছিল। অথচ সেই বৈশেষিককে এবং পরমাণুবাদকে, এক কথায় ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার বিশ্লেষণী ধারাটিকে, অন্যায়ভাবে আক্রমণ করেছিলেন অদ্বৈতবাদী শঙ্করাচার্য। সে-আক্রমণে শঙ্করই জিতেছিলেন। প্রাচীন ভারতের বৈজ্ঞানিক পতনের এটাই প্রধান দার্শনিক কারণ।

    তিনি দেখালেন, গুপ্ত-পরবর্তী যুগ থেকে ভারতের সংস্কৃতির একটা ক্রমিক দ্বিখণ্ডন ঘটতে থাকে। ক্রমে সংকীর্ণ হতে থাকে পরীক্ষা ও নিরীক্ষা-নির্ভর বিজ্ঞানের স্থান। তুর্কি আক্রমণ সেই দ্বিখণ্ডনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ততদিনে আরবি বিজ্ঞানচর্চার বেগবতী ধারাও স্তিমিত হয়ে গেছে। ফলে একদিকে সক্রিয় আরবি বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে ভারতীয়দের তেমন কোনো যোগ গড়ে উঠল না, অন্যদিকে ভারতের নিজস্ব বিজ্ঞানচর্চার ধারাও হয়ে এল শীর্ণ। কয়েক শতকের মধ্যে সুশৃঙ্খল পরীক্ষাভিত্তিক আরোহী বিজ্ঞানচর্চা ভারত থেকে কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেল। ‘সমাজের মননশীল অংশের সঙ্গে করণকৌশলের চর্চাকারী অংশের কোনো যোগ রহিল না; কাজেই বিবিধ ব্যাপার কেমন করিয়া এবং কেন ঘটে, কার্য এবং কারণের সমন্বয় কী করিয়া সাধন করা যায় সে সকলের বোধ, এককথায় অনুসন্ধানের প্রবৃত্তি, ধীরে ধীরে লোপ পাইয়া গেল। ... ভারতবর্ষ তখনকার মতো পরীক্ষানির্ভর ও বিশেষ ঘটনা হইতে সামান্য সিদ্ধান্তমূলক আরোহী (inductive) বিজ্ঞানকে বিদায় দিল। ভারতের মাটি একজন বয়েল, একজন দেকার্ত বা একজন নিউটনের জন্ম দেওয়ার পক্ষে মানসিকভাবে অক্ষম হইয়া উঠিল, এদেশের নাম বিশ্বের বিজ্ঞান-মানচিত্র হইতে মুছিয়া গেল।’ [21]

    আধ্যাত্মিকতা ও অধিবিদ্যাই ভারতীয় সভ্যতার মূলাধার, এই ধারণা খণ্ডন করার কাজটা প্রথম করেছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-৮৬)। অক্ষয়কুমারের সেই বক্তব্যকে আরো গবেষণাসমৃদ্ধ, বস্তুনিষ্ঠ, সংগঠিত ও বিস্তারিত রূপ দিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ১৯১৮ সালে তিনি বলেন,

    "সচরাচর ইহাই স্বীকৃত যে হিন্দুরা ছিল এক স্বপ্নচারী, অধ্যাত্ম-রহস্য-মগ্ন জাতি, অধিবিদ্যক দূরকল্পনা ও আধ্যাত্মিক ধ্যানই তাহাদের কাজ। অতীব জটিল সাংখ্য-দর্শন ও গীতা সমেত উপনিষদ, ষড়দর্শন প্রভৃতি অমূল্য সম্পদের স্রষ্টারূপে হিন্দুরা ন্যায্য মর্যাদারই অধিকারী। কিন্তু পরীক্ষা-নির্ভর বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও যে তাহাদের মস্ত অবদান রহিয়াছে সে-সম্বন্ধে বর্তমানে প্রায় কেহই জ্ঞাত নহে।" [22]

    আপন বক্তব্যের সপক্ষে ত্রয়োদশ অথবা চতুর্দশ শতাব্দীতে লেখা রামচন্দ্রের ‘রসেন্দ্রচিন্তামণি’ বই থেকে উদ্ধৃতি দেন তিনি: ‘পরীক্ষার দ্বারা যাহার সত্যাসত্য নিরূপণ করিতে সমর্থ হই নাই, এমন সকল কিছু আমি বর্জন করিয়াছি। ... প্রকৃত শিক্ষক তাঁহারাই যাঁহারা শিক্ষালব্ধ বিষয়কে প্রয়োগ করিতে সক্ষম। অপরাপর শিক্ষক ও শিষ্যরা মরে অভিনেতাদের সঙ্গেই তুলনীয়। যশোধরের রচিত ‘রসপ্রকাশসুধাকর’ বইতে লেখা হয়েছিল: ‘এই গ্রন্থে বর্ণিত যাবতীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়াদি আমার স্বহস্তে সম্পাদিত হইয়াছে। অন্যের মুখে শ্রবণ করিয়া আমি কিছু লিপিবদ্ধ করিতেছি না। আমার নিজস্ব প্রত্যয় ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই যাবতীয় বিষয় বর্ণনা করিলাম। [23]

    অর্থাৎ, একদিকে বিবেকানন্দ-জগদীশচন্দ্রের অদ্বৈতবাদ-সর্বস্ব প্যারাডাইম, অন্যদিকে প্রফুল্লচন্দ্রের অদ্বৈতবাদ-বিরোধী প্যারাডাইম, এই দুয়ের উদ্ভব একই সঙ্গে হয়েছিল। প্রফুল্লচন্দ্র এবং জগদীশচন্দ্র আক্ষরিকভাবেই প্রতিবেশী হিসেবে বছরের পর বছর বাস করলেও এই নিয়ে এঁদের মধ্যে কী ধরনের তর্কবিতর্ক হয়েছিল, তার কোনো বিবরণ আমি পাইনি। কোনো সহৃদয় পাঠক যদি এ বিষয়ে আলোকপাত করতে পারেন, কৃতজ্ঞ থাকব।

    উপসংহার

    এমন নয় যে কেবল প্রাচীন বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ইতিহাস চর্চার গজদন্তমিনারেই তাঁর জীবন আবদ্ধ ছিল। বৈজ্ঞানিক মনোভাবের সঙ্গে সমসাময়িক সামাজিক ও জাতীয়তাবাদী অগ্রগতির অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক বিষয়ে সারাজীবনই মুখর ছিলেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে ১৯৩৭ সালে 'জাতীয় মুক্তির পথে অন্তরায়’ শীর্ষক বক্তৃতায় বিজ্ঞান-শিক্ষিত বাঙালিদের কুসংস্কারাচ্ছন্নতা নিয়ে, “এ্যাও হয়, অও হয়”-মনোভাব নিয়ে আক্ষেপ করেছিলেন: “আজ অর্ধ শতাব্দীকাল ছাত্রদিগকে [গ্রহণের] এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া আসিলাম, তাহারাও বেশ বুঝিল এবং মানিয়া লইল; কিন্তু গ্রহণের দিন যেই ঘরে ঘরে শঙ্খ-ঘণ্টা বাজিয়া উঠে এবং খোল-করতাল সহযোগে দলে দলে কীর্তনীয়ারা রাস্তায় মিছিল বাহির করে, অমনি এই সকল সত্যের পূজারীরাও সকল শিক্ষা দীক্ষা জলাঞ্জলি দিয়া দলে ভিড়িতে আরম্ভ করে এবং ঘরে ঘরে অশৌচান্তের মত হাঁড়িকুঁড়ি ফেলার ধুম লাগিয়া যায়। যে-জাতির ‘শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেও ভাবের ঘরে এত লুকোচুরি ... সে জাতি কেমন করিয়া জগতের নিকট সগর্বে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবে তাহা আমার বুদ্ধির অতীত।” [24]

    জ্ঞান, অবিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান, অদ্বৈতবাদ, কালীপুজো, শনিপুজো, মন্ত্রতন্ত্র, চরণামৃত, জ্যোতিষ, জলপড়া, সবই শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে সমান আদরে সমাদৃত। অজস্র পরস্পর-বিরোধী বিশ্বাস ও আচারকে একই সঙ্গে লালন করবার যে-ধারা বাঙালি শিক্ষিতদের মধ্যে গড়ে উঠেছে, যা আজ বিষমহীরুহের আকার ধারণ করেছে, তারই বিরুদ্ধে ছিল তাঁর দূরদর্শী জেহাদ। প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানচর্চার গৌরবময় ইতিহাস অনুসন্ধানের পেছনেও এই মনোভাবটাই কাজ করেছিল। এটাই তাঁর জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্য। অপ্রিয় সত্য না-বলার সুপরিচিত হিতোপদেশকে উলটে দিয়ে তিনি তাই বলেছিলেন:

    ‘আপনারা দেশের মধ্যে প্রচার করুন, – “সত্যং ব্রুয়াৎ, প্রিয়ং ব্রুয়াৎ, ব্রুয়াচ্চ সত্যমপ্রিয়ং” – সত্য কথা বল, হিত কথা বল, এবং সত্য কথা বলিলে যদি লোকের অপ্রিয় হইতে হয়, তথাপি সত্য কথাই বল। যুবকদিগকে জনে জনে ডাকিয়া বলুন, - মিথ্যার উপর জাতি গঠন করিতে চাও? তা কি কখনও হয়? জগতের ইতিহাসে কোথায়ও হইয়াছে? চোরাবালির ভিতের উপর স্বাধীনতার তাজমহল গড়া যায় না।’ [25]





    সূত্রনির্দেশ:

    [1] মানবমন, জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৮৯
    [2] ঐ, ২:১৩২
    [3] দেবাঞ্জন সেনগুপ্ত, ‘নিবেদিতা ও রবীন্দ্রনাথ: এক ব্যতিক্রমী বন্ধুতা’, অনুষ্টুপ, জগদীশচন্দ্র বসু বিশেষ সংখ্যা, ২০০৮, পৃষ্ঠা ১৬১
    [4]
    [5]
    [6] স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, উদ্বোধন, কলকাতা ১৯৬২, ৯:৩৮৪
    [7] বাণী ও রচনা, ৭: ২২১
    [8] Collected Works of Swami Vivekananda, IX: 289 থেকে অনুদিত।
    [9] বাণী ও রচনা, ৫:৭৩-৭৪
    [10] ঐ , ৫:৭৩।
    [11] ঐ, ৫:৩০৪-৫
    [12] Walter Isaacson, Einstein: His Life and Universe (New York: Simon & Schuster, 2007, p. 138. স্বামী তথাগতানন্দের বইতে উদ্ধৃত।
    [13] Swami Tathagatananda, Albert Einstein: His Human Side, The Vedanta Society of New York, New York, 2008, Appendix
    [14] New York Herald Tribune, Sept. 11, 1932, quoted in Miles Mathis, Tesla and Einstein Were Both Right < milesmathis.com/tesla.html> Accessed on 4.7.2011
    [15] Toby Grotz, (President, Wireless Engineering), Nikola Tesla and Swami Vivekananda, Tesla Memorial Society of New York, Accessed on 4.7.2011
    [16] চিঠিপত্র, বিশ্বভারতী ১৯৯৩ , ৬ : ১১০-১১৩
    [17] Prafulla Chandra Ray, A History of Hindu Chemistry, Vol. I, Chuckerverty, Chatterjee & Co. Ltd, Calcutta; London: Probstham & Co., (1902) 1904 (2nd Ed), p. 190, বাংলা অনুবাদ আমার।
    [18] ibid, p. 192
    [19] ibid, p. 193
    [20] ibid, Vol. II, p. 17
    [21] দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান-ইতিহাসবিদ’ ••••••••••• ••• প্রবন্ধে উদ্ধৃত, অন্বেষা, প্রফুল্লচন্দ্র রায়। বিশেষ সংখ্যা, নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৮৫, পৃষ্ঠা ৪৭।
    [22]
    [23]
    [24] প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জাতীয় মুক্তির পথে অন্তরায়, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ, কলকাতা ১৯৩৭(?), পৃষ্ঠা ৪-৫
    [25] ঐ, পৃষ্ঠা ৪১

  • বিভাগ : আলোচনা | ০২ আগস্ট ২০২১ | ১৮৩২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • Rabindranath Majimdar | ০৪ আগস্ট ২০২১ ১৩:৩৯496405
  • আশীষ বাবুর লেখারগুণমুগ্ধ পাঠক আমি /বিপুল তথ্য বিরাট ক্যানভাস যৌক্তিক উপস্থাপন /


    অনেক অজানা তথ্যে সমৃদ্ধ তাঁর লেখা থেকে নানা ভাবে উপকৃত ও অনুপ্রাণিত হই /


    কিন্তু একটা খটকা মন থেকে যায় না /


    যে  কোন বিখ্যাত মানুষের মধ্যে বাস করে একজন অতি সাধারণ মানুষ / সেখানে কত বৈপরীত্যের সমাহার / সৎ অসৎ ভালো মন্দের এক অদ্ভুত কোলাজ /ইতিহাসও তেমনি/ জীবন থেকে এই ধারণা বা উপলব্ধি /


    তথ্য-তত্ত্বের চক মেলানো ছকে তাদেরকে ফেলতেই পারি কিন্তু তা কি সেই সময়ের বাস্তবতাকে তুলে ধরার পক্ষে যথেষ্ট ?


    অথবা সেটিই কি একমাত্র বাস্তব ?

  • একক | 2409:4060:e91:a4fa:c179:b6ef:e788:f280 | ০৪ আগস্ট ২০২১ ১৬:০৯496409
  • এক্টা সুপর্ফিশিঅল দাগের দুপাশ ধরে থিওরি আর ইনফর্মেশন সাজানো হোয়েচে। অমন দাগ কি কোথাও নেই ? আচে । মাইক্রো লেভেলে শত শত আচে , আবার জুড়ে জুড়ে লম্বা আল কাটতে গেলে   পরস্পর্বিরোধিতার মহাভারত নেবে যাবে । সেটাই স্বাভাবিক । প্রাবন্ধিকের বাইনারিবিলাসের সুবিধে করে দেওঅর জোন্যে তো কেও জীবন যাপন করেন না । ইন্টারেস্টিঙ্গ লোকেরা তো করেন ই না । 


    ভারতে বিগ্গ্যন চর্চা থেমে থাকার কারন ইত্যাদি অঙ্গ্শ টি বোরোম ইন্টরেস্তিঙ্গ , শন্কর স্কুল  কে কতোটা দায়ি করা যায়  সেটা বা সমাজ -রাজ্নৈতিক প্রেক্খিত । আরো ফোকসড লেখার আশায় রৈলুম । 

  • হীরেন সিংহরায় | ০৫ আগস্ট ২০২১ ০৪:০২496427
  • অসাধারন জ্ঞান ও তথ্য সমৃদ্ধ এই রচনাটি পড়বার সুযোগ পেয়ে ধন্য হলাম। 

  • সাম্য | 176.10.99.200 | ০৬ আগস্ট ২০২১ ০৭:৪৪496491
  • পিওর ট্র্যাশ র্্যাপড ইন ভেগোলজি।

  • Prabhas Sen | ১০ আগস্ট ২০২১ ১৩:৩৫496627
  • আশীষ লাহিডি মশাই  সুলেখক, অগাধ পাণ্ডিত্য। তিনিও যাকে বলে sweeping statement   দিয়েছেন। যুবক  রবীন্দ্র নাথ কালী সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হলেও পরে ঐ মা কালীর অনুষঙ্গে দেশাত্মবোধক গান লিখতে দ্বিধা করেন নি: ডান হাতে তোর খড্গ দোলে বা হাত করে শঙ্কা হরণ।


    বিবেকানন্দ  তাঁর স্বল্প জীবনে বরাবর বিজ্ঞান শিক্ষার সপক্ষে জোরালো স ওয়াল করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত  সঙ্ঘ সারা ভারতে শিক্ষার  যে বিপুল  কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছেন তা কি শ্রীলাহিড়ির নজরে পড়েনি? বিবেকানন্দের নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক  বিজ্ঞানের  চর্চা ও গবেষণা চলছে। 


    আমি দার্শনিক  নই।তবে এটুকু জানি যে শঙ্কর এর ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যার  বিপরীতে বিবেকানন্দ  বলেন ব্রহ্ম সত্য জগৎ সত্য এবং মানুষ ই ঈশ্বর। 

  • পাতা :
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন