• খেরোর খাতা

  • ডাউনসাইজিং এবং

    Prabhash Chandra Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ এপ্রিল ২০২১ | ৪৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ■■■■■


    ডাউনসাইজিং এবং


    তিনি বসে আছেন প্রকান্ড এক সেক্রেটারিয়েট টেবিলের একদিকে, অত্যন্ত আরামদায়ক একটি চেয়ারে। সামনে টেবিলের উপর খোলা, সরকারি পয়সায় কেনা তাঁর ব‍্যক্তিগত ল‍্যাপটপ। 


    উল্টো দিকে বসে আছেন এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক। ভদ্রলোক তাঁর অধীনস্থ একটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। কম্পিউটারের পর্দায় ভদ্রলোকের বিস্তারিত তথ্য জ্বলজ্বল করছে।


    তিনি খুব বেশিদিন এখানে আসেন নি। বস্তুত সর্বভারতীয় চাকরির শর্ত অনুযায়ী কোথাওই তাঁর স্থায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদী নয়। সামনে উদ্দিষ্ট ভদ্রলোকের নাম তাঁর জানার কথা থাকলেও, নবাগত বলে তিনি ভদ্রলোকের নাম, আগে জানতেন না। গতকালই কম্পিউটারের দৌলতে সেটা জানা হয়েছে। সবার সব খুঁটিনাটি বিষয় এখন কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে বন্দী।


    এখানে সরকারি ব‍্যবস্থায় এখনো ব্রিটিশ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সুতরাং, আধুনিক ম‍্যানেজমেন্টের দর্শন মোতাবেক, ম‍্যানেজারেরা অধস্তনদের যতটা কাছাকাছি আসেন, এখানে সেটা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দুপক্ষের মধ্যে ব‍্যবধান বিস্তর। কলোনিয়াল ব‍্যবস্থার অনুসারী সরকারি ক্ষেত্রে, উর্ধ্বতন এবং অধস্তনের মধ্যে তফাৎটা আসমান জমিন। 


    স্পষ্টতই দুটো ক্লাসে বিভক্ত।


    এবং প্রথম ট্রেনিংয়ের প্রথম দিনেই সেটা তাঁদের মগজে সেঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে পশ্চিম দেশের এক বিশেষ ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেনিংয়ের নামে তফাৎটা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। শুনেছেন, একদা তাঁর এক সিনিয়র অফিসার, লাঞ্চের অবসরে, দেওয়ালে সাঁটানো এক বিশেষ সংবাদপত্র, সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিয়মিত পড়তেন বলে, তাঁর উপরওয়ালার কাছে বকুনি খেয়েছিলেন।


    সে ভদ্রলোক তারপর আর বেশি উঁচুতে উঠতে পারেন নি।


    হঠাৎ এক ঝলকে নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়লো। বাবা ছিলেন শিক্ষক। কট্টর বামপন্থী। সে আমলে শিক্ষকদের মাইনে তেমন কিছু ছিল না। মূল বেতন স্কুল থেকে পেলেও ডিএ হিসেবে সরকার থেকে কিছু ম‍্যাচিং গ্রান্ট পাওয়া যেত। সেও খুব অনিয়মিত। তিন চার মাস বাদে বাদে একবগ্গা থোক কিছু টাকা। তাতেও সংসারে যাকে বলে স্বচ্ছলতা, তেমন কিছু ছিল না। ১৯৭৭ নতুন সরকার আসার কিছু পরে শিক্ষকদের মাইনের দায়, সরকার নিজের কাঁধে তুলে নিলে, আর্থিক অবস্থার বেশ কিছুটা উন্নতি ঘটে। 


    তাঁরা নিজেরা তিন ভাইবোন, লেখাপড়ায় যথেষ্ট ভালো ছিলেন। অতএব পড়ার খরচের ব‍্যাপারে আলাদা ভাবে চিন্তা করতে হয় নি। স্কুলে ফ্রি আর বইপত্র, সেও নতুন খুব একটা জোটে নি। তখনকার রেওয়াজ মতো, কিছু কিছু পুরোনো বই আধা দামে উঁচু ক্লাসের দাদা দিদিদের কাছ থেকে কিনে নেওয়া যেত। সম্মান নিয়ে টানাটানি হয় নি কখনো।


    উচ্চ মাধ্যমিক অথবা জয়েন্টের ফলাফল উঁচুর দিকে থাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার দিকেই ঝুঁকতে হলো, নতুবা প্রথম দিকে ইচ্ছে ছিল বিজ্ঞান না পড়ে, ইতিহাস নিয়ে পাশ করে অধ‍্যাপনার দিকে যাওয়া। অঙ্কে অতিরিক্ত ভালো হওয়াটাই এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।


    মাধ্যমিক পাশ করার পর, স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার কথা বলায়, বাবাও অবশেষে তাঁদের অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেও আর দ্বিধা করেন নি।


    কলেজ সংলগ্ন বিশ্ববিদ্যালয়, প্রায়শই বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠলেও তার আঁচ তাঁদের কলেজে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো না। কেন, জানেন না, শুনেছিলেন, সত্তর দশকের উত্তপ্ত সময়ে সাধারণ কলেজ থেকে নামজাদা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেও মেডিক্যাল অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রীরা নিজেদের পড়াশোনা নিয়েই ব‍্যস্ত থাকতো। 


    ব‍্যতিক্রম নিশ্চয়ই ছিল-


    বাড়িতে পড়াশোনার চল থাকাতে কম বয়স থেকেই পাবলো নেরুদা, জ‍্যাক লন্ডন, কাফকা, রেমার্কের লেখার অনুরাগী পাঠক ছিলেন। পাশের পাড়ার পাবলিক লাইব্রেরি ছিল বালক বয়সের সব পেয়েছির খাজানা।


    একসময় ইচ্ছে হয়েছিল, স্প‍্যানিশ শিখবেন। কিছুটা এগিয়েও ছিলেন, নেরুদা,মার্কেজের লেখা মূল ভাষায় পড়ার ইচ্ছে ছিল, তবে সেটা ফলপ্রসূ হয়নি।


    এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের গান যে ভালোবাসেন, সেটা তাঁর ফোনের রিংটোন শুনলে বোঝা যায়।


    বাবা নাম রেখেছিলেন 'পাবলো'।


    ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় যথেষ্ট ভালো নাম্বার নিয়ে পাশ করে একটি আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে করতে হঠাৎ করেই এই সর্বভারতীয় পরীক্ষায় বসা। সেখানেও প্রথম চেষ্টাতেই সফল। 


    অতঃপর--


    ফিরে এলেন বর্তমানে--


    এতক্ষণে উল্টো দিকে বসে থাকা ভদ্রলোকের মধ্যে নিজেকে কল্পনা করে একটু অস্বস্তি বোধ করলেন।


    তিনি নিজেই আজ প্রশাসনের অঙ্গ হয়ে বসে আছেন। তাঁর ইচ্ছা অনিচ্ছাতে কিছুই যায় আসে না। চাকরির শর্ত অনুযায়ী তাঁকে সরকারের নীতি মানতে হবে।


    শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরটি শব্দ নিরোধক বলে বাইরের কোন আওয়াজ ঘরটিতে আসছে না। তাঁর অধীনস্ত যে কেউ এ ঘরে ঢুকলে, নিশ্চিত তাদের উপর কিছুটা পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হয়।


    বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে তিনি সামনের ভদ্রলোকের উপর সেই চাপ কিছুটা বাড়িয়ে তুলতে চাইছেন।


    পর্দায় চোখ রেখে তিনি দেখলেন ভদ্রলোকের নাম অনিল কুন্ডু, বয়স বাহান্ন। পেরেন্টাল কর্মক্ষেত্র টাটানগর। 


    অনিল কুন্ডু বামপন্থী ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় ব‍্যক্তি। 


    তিনি যে পদে কাজ করেন, সেটাকে বলে ওয়ার্কচার্যড পোস্ট। বিভিন্ন ডিভিশনের ওয়ার্কশপ গুলোর আধুনিকিকরণ প্রকল্পের কারণে হেড কোয়ার্টারে,  ডিভিশনগুলো থেকে পদ এবং মানুষ নিয়ে এসে সেকশনটি খোলা হয়েছিল। তার নাম তাই, মর্ডানাইজেশন সেল।


    এখন সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক ওয়ার্কশপগুলো বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হবে। অতএব ওই ডিপার্টমেন্ট আর রাখার প্রয়োজন হবে না।


    মাত্র দিন দুয়েক আগে জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে অফিস কমপ্লেক্সের বিল্ডিংগুলো পরিদর্শন করতে বেড়িয়েছিলেন, প্রকান্ড বিল্ডিংগুলোর মস্ত বড়ো বড়ো ফাঁকা ঘরগুলো যেন গিলতে এসেছিল। কিছু কিছু ঘরে পঞ্চাশ একশো জনের ফাঁকা চেয়ার টেবিল, চার পাঁচজন কর্মচারী, মাথা গুঁজে কাজ করছে।


    ওই বিভাগে এখনো যতজন কর্মচারী কাজ করেন সবই ওয়ার্কচার্যড পোস্টে, বিভিন্ন ডিভিশন থেকে তুলে আনা। 


    সরাসরি ছাঁটাই করতে গেলে রাজনৈতিক ঝামেলা হতে পারে। 


    সুতরাং মূল‍্যায়ন পদ্ধতি। তারপর উদ্বৃত্ত কর্মচারীদের হ‍্যান্ডসেক করে বিদায় দেওয়া হবে। তবে সে হ‍্যান্ডসেক গোল্ডেন হবে কি না, সেটা এখনো অনিশ্চিত।


    কেবল অনিল বাবুদের বিভাগেই নয়, এরকম আরও অন‍্য অন‍্য বিভাগের পদও সংকোচন করতে হবে। 


    সরকার এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন, 'ডাউনসাইজিং',


    'ডাউনসাইজিং'


    প্রতিটি বিভাগীয় প্রধানকে আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যে সব কর্মচারী পঞ্চাশ পার করে ফেলেছেন অথবা তিরিশ বছর চাকরি হয়ে গেছে, তাঁদের কাজের মূল‍্যায়ন করতে হবে। অনেকেই ইতিমধ্যে সে তথ্য জমা দিয়ে গেছেন। যাঁরা দেননি, তাঁদের মধ্যে অনিলবাবু অন‍্যতম। এটা অবশ্য পুরোপুরি ঠিক নয়, তিনি তাঁর বিভাগের সবাইয়েরই নিয়মিত বার্ষিক মূল‍্যায়ন করেছেন আর সবার ক্ষেত্রেই 'গুড' 'ভেরি'গুড' আবার দুএকজনকে 'আউটস্ট‍্যানডিং এবং কাউকে ইন্ডিসপেনসেবল' বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তিনি কারও বিরুদ্ধে উদ্বৃত্ত ঘোষণার শরিক হতে চান না। 


    আসলে ভদ্রলোক একটু অন্য ধাতুতে গড়া। এখানে আসার সময় তাঁর পূর্বসূরির কাছে শুনেছিলেন, এই লোকটি দু-দুবার অফিসার পদে প্রমোশন প্রত‍্যাখ‍্যান করেছেন। এর দ্বিবিধ কারণ থাকতে পারে। তিনি কম্পিউটারের পর্দায় দেখতে পাচ্ছেন অনিলবাবু এখানে আসার আগে বহুবার বদলির চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে নিজের বৃদ্ধ বাপ মায়ের বয়স জনিত অসুস্থতা এবং স্ত্রীর দুরারোগ্য ব‍্যাধির উল্লেখ করেছেন। একটাই সন্তান,এবং সেও জন্ম থেকে অটিজম নামক ব‍্যাধির শিকার আর তার বয়সও বেশ কম। 


    প্রমোশন হলে, নিশ্চিত বদলি। সুতরাং সংসারের চাপ, খুব স্বাভাবিক একটি কারণ হতে পারে,


    দ্বিতীয়টি হলো, ইউনিয়ন। 


    তিনি শুনেছেন, আগেও অনেকে, ইউনিয়ন করতে পারবেন না বলে প্রমোশন নেননি।


    মানুষ এখনো এতটা 'নীতিবাগীশ' আছে!


    তিনি অবাক হন।


    নিজের কথা জানেন। তাঁদের ক্ষেত্রে একটা পর্যায় পর্যন্ত পদোন্নতি স্বাভাবিক হলেও, পরের পর্যায়ে এসে সেটা নির্ভর করে উপরওয়ালাদের ওপর। সে ক্ষেত্রে সিআর(CR -Cofedential Report) অর্থাৎ উপরওয়ালার দেওয়া বার্ষিক মূল‍্যায়ন বস্তুটি তাঁদের ক্ষেত্রেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত অফিস পলিটিক্স। ঠিক অফিস পলিটিক্স নয়, অফিসার পলিটিক্স। এটা অবশ্য কোন রাজনৈতিক দলের রাজনীতি নয়, আবার হ‍্যাঁও বটে। এখানে উপরওয়ালাদের, যেনতেন প্রকারেণ খুশী রাখাটাই দস্তুর। সে নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা থাকে। তাছাড়াও, জাতপাত, রাজ‍্য, ভাষা ইত্যাদি বিষয়ে মুখ শোঁকাশুঁকি তো আছেই। আগে উত্তর এবং দক্ষিণীদের আধিপত্য ছিল। ইদানিং পশ্চিমাদের দাপট বেড়ে গেছে। 


    এটা প্রত‍্যাশিত। ক্ষমতার অলিন্দে এখন তাঁদেরই রমরমা।


    সরকারি ক্ষেত্রে এফিসিয়েন্সির কদর কতটা, সেটা তিনি আজও বুঝতে পারলেন না।


    অনিলবাবু মানুষটি আসেনও অনেকটা দূর থেকে। প্রায় এক ঘন্টার ট্রেন, তারপর, স্টেশন থেকে চার্টার্ড বাসে সেও প্রায় এক ঘন্টা।


    নাঃ, এ তথ্য তাঁর সামনের পর্দায় নেই। তিনি এটা জেনেছেন, তাঁর পিওন পঞ্চাননের কাছ থেকে। পিওনদের অফিস শুরু হয় সাড়ে নয়টা থেকে। সে আসে দশটা কুড়ি পঁচিশ নাগাদ। এটুকু আশকারা তিনি তাঁর পিওনকে দেন। প্রত‍্যুৎত্তরে সে নিচের তলার দুএকটি গোপন অথবা প্রয়োজনীয় খবরাখবর জোগান দেয়। যদিও তিনি জানেন, একসময় এই পঞ্চাননও আর থাকবে না। বাইরের কন্ট্রাক্টর খুব কম পয়সায় কাজের মানুষ যোগান দেবে।


    সরকারি কাজে সবকিছুই যুক্তি এবং আইনসিদ্ধ জাস্টিফিকেশন দিয়ে তৈরি করতে হয়। নচেৎ পরবর্তীতে সমস্যা হতে পারে। সেই জাস্টিফিকেশন নীচের থেকে তৈরি হয়ে আসে। তাঁদের মতো পদাধিকারীরা কেবল চোখ বুলিয়ে সেটাতে সই করে দেন। সেটাই দস্তুর।


    সুতরাং এই মানুষটিকে দিয়ে, না, এই মানুষটিকে দিয়ে নয়, এই মানুষগুলোকে দিয়ে যেভাবে হোক কার্যসিদ্ধি করাতে হবে। এবং তিনি এতক্ষণ ধরে তারই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।


    - তা অনিলবাবু, কেমন আছেন ! 


    অনেক অধস্তন, উপরওয়ালার এমন আন্তরিক সম্ভাষণে বিগলিত বোধ করেন। এঁর অবশ্য তেমন প্রতিক্রিয়া হলো না।


    - কেন ডেকেছেন, স‍্যার-


    - আপনার সেকশনের স্টাফদের মূল‍্যায়ন হয়ে গেছে?


    - আপনারা যেভাবে বলেছেন, সে ভাবে করা হয়নি। তাদের তো নিয়মমাফিক বার্ষিক মূল‍্যায়ন করা হয়ে থাকে, আর সেটা আগেই ডেপুটির হাতে দিয়ে দিয়েছি। হয়তো, আপনার আগে যিনি ছিলেন, ডেপুটির হাত ঘুরে তাঁর কাছেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।


    রিসেশন, 


    দেশটা আজ ভয়ানক সংকটের মধ্যে পড়েছে। অর্থনৈতিক সংকট। তারমধ্যে সম্প্রতি করোনা প‍্যান্ডামিকের কারণে হঠাৎ ডাকা লকডাউনে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ হারিয়ে পথে বসেছে। সরকার তাদের জন্য কিছুই করেনি। উচিত ছিল তাদের হাতে অর্থ তুলে দিয়ে তাদের ঘরে ফেরার ব‍্যবস্থা করা। 


    অর্থনৈতিক সংকট-


    সরকারের মতে কর্মী সংকোচন, ব‍্যাঙ্ক পোস্ট অফিসের জমা টাকায় সুদ ছাঁটাই, রান্নার গ‍্যাস, পেট্রোল ডিজেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি যত রকমের পন্থা আছে, প্রয়োগ করে অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে।


    অথচ উপায় ছিল, বিশ্বের অন‍্যান‍্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে কোম্পানি (corporate tax) ট‍্যাক্স বেশ কম। সেই ট‍্যাক্স বাড়ানো যেত। বিশেষ করে লকডাউনের সময় অধিকাংশ Manufacturing company ধুঁকতে থাকলেও, কিছু কিছু কোম্পানি তাদের লাভের অঙ্ক তিনশ গুণ বাড়িয়ে নিয়েছে।


    তিনি জানেন না, এভাবে কি করে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতে পারে। সহজ কথায়, মানুষের হাতে পয়সা না থাকলে খরচ করবেন কিভাবে! 


    অর্থনীতি তাঁর বিষয় নয়। এক অর্থনীতির অধ্যাপক বন্ধু কথায় কথায় অর্থনীতিবিদ কেইনসের কথা বলেছিলেন। মানুষের হাতে পয়সা দিতে হবে। নতুন নতুন চাকরি সৃষ্টি করতে হবে। হ‍্যাঁ, প্রয়োজন না হলেও-


    তবেই তো মানুষ জিনিস কিনবেন।


    মাত্র দিনকয়েক আগে ইউটিউবে লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসের একজন অধ্যাপক ডঃ মৈত্রীশ ঘটকের একটি সেমিনারে রাখা বক্তব্য তাঁর হাতে এসেছিল, বিষয়টি ছিল ওয়েলফেয়ার ইকোনমিকস এবং এদেশে তার প্রয়োগ। মাথায় চিন্তা থাকায় তেমন মনোযোগ দিতে পারেননি। ভালো লাগলেও সবটা পুঙ্খানপুঙ্খভাবে মনে করতে পারছেন না। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, সবটা ভালো করে বোধগম্যও হয় নি।


    তবে এটা মনে আছে, তিনি বলেছিলেন প্রত্যেক মানষের হাতে সরকার থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ সাহায্য তুলে দিতে হবে। এবং সেটা নিয়মিত আর কোনো বাছবিচার না করে।


    এ মুহূর্তে অবশ্য সে সব ভাবনার কোন মানে হয় না। 


    তিনি জানেন, আজ তাঁদের সংস্থায় কর্মী সংকোচন হচ্ছে, কাল প্রাইভেটাইজেসনের নামে ডিপার্টমেন্ট ধরে ধরে কোন পশ্চিমা কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হবে। এরপর ব্যাংক, বীমা, টেলিফোন, ইত্যাদি তিল তিল করে তৈরি করা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পালা। যার নিদর্শন ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।


    যে যে কারণগুলোর জন্য একসময় ব্যাংক জাতীয়করণ হয়েছিল, আজও তা বিদ্যমান। প্রয়োজনটা বরং আরও বেশি - 


    তিনি আর কিইবা করতে পারেন। 


    যারা পারতো, সেই দেশের মানুষ যদি সচেতন না হয় -


    আসলে তিনি তো একটি বিশাল যন্ত্রের অংশ মাত্র।


    কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ভাবছেন, এবার চাপ দিতে হবে। এতো সিনিয়র এবং সিনসিয়ার মানুষকে ইনসাবঅর্ডিনেশনের চার্জে বরখাস্ত করা মুশকিল। আর দুর্নীতিরও কোন প্রশ্ন নেই। তবে লোকটিকে শাস্তিমূলক বদলি করে তার আসল জায়গায় অনায়াসে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো যায়। এবং সেটা শেষমেশ করে দেওয়াও সম্ভব। 


    - আচ্ছা আপনার পোস্টিং তো টাটানগরে ছিল।


    - হ‍্যাঁ, স‍্যার,


    - এখন এখানে কাজ না থাকলে আপনাকে তো ওখানেই পাঠিয়ে দিতে হবে।


    যে লোকটি দুবার প্রমোশনের লোভও বাইরে যাওয়ার ভয়ে প্রত‍্যাখ‍্যান করেছে, ভেবেছিলেন এবারও সেরকমটাই হবে। কিন্তু তাঁর ধারণা ভুল প্রমাণিত করে লোকটা উঠে দাঁড়ালো, 


    - যদি তাই হয় স‍্যার, তাই হবে। আমার পক্ষে কর্মীসংকোচনের পক্ষে কোন জাস্টিফিকেশন তৈরী করা সম্ভব হবে না। আর বিগত পনেরো কুড়ি বছর ধরে কোথাও কোন নিয়মিত নিয়োগ হয়নি, অথচ শতকরা আশি ভাগ কর্মী ইতিমধ্যে অবসর নিয়েছেন। এখনো প্রতি মাসে এক বিরাট সংখ্যক মানুষ অবসরে চলে যাচ্ছেন। সে শূন্যতা আর পূরণ করা হচ্ছে না। এখনই লোক যথেষ্ট কম। পাঁচ জনের কাজ, একজনকে দিয়ে করাতে হচ্ছে। তাছাড়া আপনার ধারণাটাও ঠিক নয়। আমাদের সেকশনটিতে মর্ডানাইজেশনের কাজ বন্ধ হয়েছে বটে, তবে মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে অনেক দিন আগেই আমাদের জুড়ে দেওয়া হয়েছে।


    লোকটি বেরিয়ে যাওয়ার সময়, দরজার ফাঁক দিয়ে একটা ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে এলো, 


    ডাউনসাইজিং চলবে না, চলবে না--


    আজ ইউনিয়নের প্রতিবাদ সভা আছে -


    - এক সময়ে হাজার হাজার মানুষের জমজমাট অফিস কমপ্লেক্সটিতে এখন সবসময় এক ভীতিকর নীরবতা।


    অবশিষ্ট খুব বেশি আর নেই - 


    কমজোরি আওয়াজটা হয়তো সেটাই জানান দিচ্ছে----


    প্রভাস চন্দ্র রায়


    Prabhash Chandra Roy


    Id 89588433

  • ০৪ এপ্রিল ২০২১ | ৪৮ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
একা - Shah Alam Ranzu
আরও পড়ুন
গল্প - moulik majumder
আরও পড়ুন
গল্প - moulik majumder
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন