• টইপত্তর  বাকিসব  মোচ্ছব

  • বড়গল্প সরমা রঞ্জন রায়

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    বাকিসব | মোচ্ছব | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৪১৪ বার পঠিত | ১ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার

  • শুক্রবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই শুভময়ের মন আনচান; অফিসের কাজে মন বসে না। অথচ এই ওষুধের কোম্পানির সব অফিসে শনি-রবি ছুটি থাকে। তাই শুক্কুরবারে গোটা সপ্তাহের কাজ গুছিয়ে নিতে গিয়ে বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হয়ে যায়। তার উপর এটা হল কোরবা শহরের এরিয়া অফিস এবং ঈশ্বরের ভুলে শুভময় হয়েছে এরিয়া ম্যানেজার, অর্থাৎ এই অফিসের কর্তা। কাজেই লাঞ্চের পরে একটা ছোটখাট মিটিং, জোনাল এবং হেড অফিসের তাগাদা, কিছু রিপোর্ট তৈরি, কিছু পেন্ডিং ইনভয়েস এবং বিলের ফয়সালা আর টেবিলে কাঁচের শীটের নিচে একবার চোখ বুলিয়ে মান্থলি ও কোয়াটার্লি টার্গেট থেকে কে কতটা পিছিয়ে তা বুঝে নিয়ে অন্যদের কানে মন্ত্র দেয়া- এতসব ঝক্কি পুইয়ে চেয়ার ছাড়তে ছাড়তে আকাশে সন্ধ্যেতারা উঠে পড়ে।

    কিন্তু গত তিনটে শুক্কুরবার থেকে ও নিজের অধীনস্থ অফিসারকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বেশ আগে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ছে। ও সরমার সঙ্গে একটা খেলায় মেতেছে। ঠিক খেলা নয়, বরং পাঞ্জা লড়া বললেই হয়। তিনবারই সরমা জিতেছে। কিন্তু আজ? শুভময় হারতে চায় না, সে বিজনেস টার্গেট হোক, বা ব্যক্তিগত জীবনে।

    ও নিজের ব্রিফকেস এবং লাঞ্চবক্স ডিকিতে তুলে রেখে গাড়ি স্টার্ট দেয়। অফিস কোরবা শহরের ট্রান্সপোর্ট নগর পাড়ায়, কফি হাউস এবং সেন্ট্রাল পয়েন্ট হোটেলের উল্টোদিকে। এটা নতুন গড়ে ওঠা কমার্শিয়াল এলাকা। বাড়ি নিয়েছে পুরনো কোরবার সীতামড়ি এলাকায়, আহিরণ নদীর কাছে। মোটামুটি কম ভাড়াতেই ভাল বাংলো ধরনের বাড়ি, সঙ্গে বাগান এবং পেছনে একটা সার্ভেন্ট কোয়ার্টার মতন। সরমার বাগানের শখ, মালি সপ্তাহে তিনদিন আসে; তবে বাগান প্রাণ পেয়েছে সরমার হাতের ছোঁয়ায়। শুভময়ের গাছপালা বাগান এসব ভালই লাগে। কিন্তু এ নিয়ে সময় দেওয়ার মত মন নেই। সরমা প্রথম প্রথম নতুন গোলাপের চারা আনা হলে বা বড় মাপের ডালিয়া ফুটে উঠলে ওকে ডেকে নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে দেখাত। কিন্তু প্রত্যেকবার একইরকম এক্সেলেন্ট! ওয়ান্ডারফুল! শুনে শুনে ও ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছে। এখন আর কিছু বলে না ।

    মিনিট কুড়ি লাগে ওর গাড়িতে। এখনও সূর্য পুরোপুরি ডোবে নি। শুভময় ঘরের কাছে এসে প্রায় দু’শো মিটার আগে থেকেই ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। সরমা যেন ওর অসময়ে বাড়ি ফেরা টের না পায়।

    পাহাড়ি শহর কোরবায় অধিকাংশ রাস্তাতেই চড়াই উৎরাই আছে। শুভময়ের বাড়িটি রাস্তার শেষপ্রান্তে একটু ঢালানের দিকে। তাই ওর গাড়ি নিঃশব্দে গড়িয়ে পৌঁছে যায় ঘরের দোরগোড়ায়; সাবধানে গাড়িটি দাঁড় করিয়ে বাগানের গেট আলতো হাতে খোলে। কোন শব্দ হয় না। এবার ও পা টিপে টিপে ঘরের দরজার কাছে গিয়ে কলিং বেলের বোতামে হাত দেয়। কিন্তু প্রত্যেকবার বেল টেপার আগেই খুলে যায় দরজা, চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকে সরমা। স্মিত হেসে বলে - এস।

    এবারেও শুভময় হেরে গেল। এত সতর্ক হয়ে পায়ে কোন শব্দ না করে দরজার কাছে পৌঁছে গেছল। কিন্তু বেল টেপার আগেই সরমা দরজা খুলে দিল!

    আচ্ছা, ও কী করে টের পেয়ে গেল? শুধু আজ নয়, প্রত্যেকবারই? ওর কি কোন অতীন্দ্রিয় শক্তি আছে? অথবা কুকুরের মত গন্ধ শোঁকার ক্ষমতা?

    সরমা! কুকুরের দেবী, নাকি বিভীষণের বৌ?

    না, ও বিভীষণের পত্নী কখনই না। এ’রকম ভাবলে তো শুভময়কেই বিভীষণ হতে হয় । পঞ্চম বাহিনী? সাবোতাজ? পেছন থেকে ছুরি মারা! ধ্যাৎ।

    শুভময় বিশ্বস্ত, ও কাউকেই ঠকাতে পারে না -- না বৌকে, না নিজের কোম্পানিকে। ও কখনও ফলস টিএ বিলস ক্লেইম করে না। যখন এম আর হয়ে চাকরি শুরু করেছিল তখনও ডাক্তারকে দেয়ার ফ্রি স্যাম্পলগুলো ওষুধের দোকানে বেচে দেয় নি। ফলে কিছু সহকর্মী বন্ধু হতে হতে হল না, দূরে সরে গেল। দু’একজন বেনামি কমপ্লেন করেছিল, সুবিধে করতে পারেনি। বরং এতে ওর প্রমোশন সহজে হয়ে গেল।

    ওর কোন আফশোস নেই, তবে একটা ঘটনা ছাড়া। ফুলি!

    ওর বারো বছর বয়সে বাবা চলে গেলেন, সাতদিন ভুগে। পরে জানা গেল মস্তিষ্ক জ্বর, সময়মত ধরা পড়েনি। শ্রাদ্ধশান্তি মিটলে ছোটমামা এসে বড়দি ও ভাগ্নেকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।

    ধানবাদ। বড়মামা মাইনিং কলেজের বড়বাবু, ছোটমামা পাঞ্চেতের ডিভিসিতে অ্যাকাউন্ট্যান্ট। বাবার পাসবুকে যা সামান্য সঞ্চয় ছিল এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে যা পাওয়া গেছল তা ওর মা বড়মামার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুইমামা পরামর্শ করে টাকাটা স্থানীয় ব্যাংকে মা ও ছেলের জয়েন্ট একাউন্ট খুলে জমা করে দিয়ে বললেন – বেবি, তোদের মা-ব্যাটার খাওয়া-খরচা নেব, এমন ভাবলি কী করে? এটা থাক, ছেলে বড় হয়ে যদি বাইরে পড়তে যায়, বা নিজে কোন কিছু করতে চায়, তখন কাজে লাগবে।

    সব চলছিল নিয়মমাফিক। মামা-মামীমারা ওদের কর্তব্য করে যেতেন। ওকে বাবা-বাছা-আহা রে করে মাথায় তোলেন নি। আবার নিজেদের দুই ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া বা জামাকাপড়ে কোন ওরা- আমরা করেন নি। ফলে শুভময় ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড না হলেও মোটামুটি ভাল রেজাল্ট করে স্কুলের বেড়া টপকে স্থানীয় কলেজে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হল।

    বাড়িতে সবাই খুশি। দুই মামা মিলে ওকে একটা টু-ইন-ওয়ান টেপ রেকর্ডার কিনে দিলেন। ও সবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

    একদিন মাকে বলল - ব্যস, তিনটে বছর। গ্র্যাজুয়েট হয়ে নিই। তারপর একটা চাকরি খুঁজে আলাদা বাসা করে তোমায় নিয়ে যাব। মা কেঁদে ফেললেন।

    কথাটা কি করে যেন বড়মামীমার কানে গেল। উনি এসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন - হ্যাঁরে, এখানে কি তোর খুব কষ্ট হচ্ছে? আমরা কি তোকে মারি না ধরি? তাহলে? এখনই তোকে চাকরি-বাকরির কথা ভাবতে হবে না।

    বড়মামা এসে বোঝালেন - শুধু গ্র্যাজুয়েট হলে আজকালকার বাজারে কেউ পোঁছে না। ভালভাবে এমএসসি পুরো কর। তারপর ওসব ভেবো।

    মামা-মামীরা ভাবলেন ছেলেটা বড় হচ্ছে, কলেজে পড়ে, একটু প্রাইভেসি একটু নিরিবিলি চায় বোধহয়।

    ফলে ওকে বইপত্তর-বিছানা-টেপ রেকর্ডার নিয়ে ছাদের চিলেকোঠার ঘরে উঠে যেতে হল। প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগলেও ধীরে ধীরে এই নতুন ব্যবস্থাটাই বেশ পছন্দ হয়ে গেল। বেশি রাত্রি পর্য্যন্ত আলো জ্বালিয়ে পড়াশুনো করে, টেপ বাজিয়ে কানে হেড ফোন লাগিয়ে গান শোনে। কলেজের বন্ধুদের থেকে গুলাম আলি বা মেহেদি হাসানের গজলের ক্যাসেট নিয়ে আসে। এভাবে কেটে গেল দুটো বছর। এবার ফাইনাল ইয়ার। দিব্যি চলছিল। কিন্তু ওর নিজস্ব তপোবনে ঢুকে সব লন্ডভন্ড করে দিল ফুলি।

    ফুলি ওর বড়মামার মেয়ে, তিন বছরের ছোট। এতদিন খেয়াল হয় নি যে ফুলি খুকি থেকে মেয়ে হয়ে উঠেছে। এবার স্কুল পাস করে স্থানীয় গার্লস ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়েছে। ওকে মামা একটি টাইটান রিস্ট ওয়াচ কিনে দিলেন। কিন্তু খাওয়ার টেবিলে ফুলি জিজ্ঞেস করে বসল - শুভ, তুই আমায় কিছু দিবি নে ?

    নাঃ, ফুলি কিছুতেই ওকে দাদা বলবে না। ওর কথা হল শুভ’র সঙ্গে ‘দা’ জুড়ে দিলে হবে শুভদা, মেয়েদের নাম? এ মা!

    ছোটমামীমা বললেন - ও কোত্থেকে দেবে? ও কি চাকরি করে?

    --চাকরি না করলেও পকেটে পয়সা ঠিকই আসে। নইলে সিগ্রেট খায় কী করে?

    শুভ সিগ্রেট খায়? সবাই হতভম্ব।

    ফুলি ঠোঁট টিপে হাসে। মা শুভ’র দিকে তাকিয়ে আছেন।

    অস্বস্তি কাটাতে শুভ বলে ফেলে - তোর কি চাই?

    ফুলি আবার হাসে। -ঘুষ দিচ্ছিস? তা হোক, কিছু তো দে।

    দামি কিছু চাইছি না । তুই আমাকে একটা ছোটমত লেডিজ পার্স কিনে দে। মঙ্গতরামের দোকানে পেয়ে যাবি; শস্তা, পঞ্চাশ থেকে একশ’ টাকার মধ্যে।

    শুভ টের পায় -- ফুলি বড় হচ্ছে।

    একেকদিন চলে আসে ছাদে, শুভকে বলে বোটানির কিছু লেভেল ডায়গ্রাম দেখিয়ে দিতে। বারণ করলে জিদ করে, বলে মা বলেছে দাদার কাছে পড়া বুঝে নে।

    সেদিন শুভ কানে হেডফোন লাগিয়ে নোটস বানাতে ব্যস্ত, ওকে হাত নেড়ে বিদায় করে দিচ্ছিল, ফুলি ওর কান থেকে ওটা খুলে নেয়। বলে – আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিস কেন রে ?

    -সেবার সিগ্রেট খাওয়ার কথা নিয়ে চুকলি করেছিলি, ভুলে গেলি? তোর মত মেয়েকে কে হেল্প করে!

    --শোন না, সেটা বোকামি করেছিলাম, আর হবে না; এই দেখ, কান মূলছি।

    -এখন এসব ন্যাকামি করে কি হবে? মার কাছে দিব্যি গেলেছি, সিগ্রেট খাওয়া ছেড়ে দিতে হল ।

    -সত্যি ছেড়ে দিয়েছিস? বিশ্বাস হয় না। কাছে আয়, হাঁ কর দেখি!

    -মানে? এই দেখ।

    শুভ বড় করে হাঁ করে ।

    --সত্যি তো! একেবারে ছেড়ে দিলি? আসলে আমার না ছেলেদের গায়ে সিগ্রেটের গন্ধ ভাল লাগে।

    -- আচ্ছা, এখন?

    শুভ বড় করে শ্বাস ছাড়ে । ফুলি মজা পায়, ওর মুখ গন্ধ শুঁকবে বলে আরও কাছে এগিয়ে আসে।

    কেমন করে যেন দুজনের মুখ জোড়া লেগে যায় । অজানা কোন বুনো ফুলের গন্ধ, শুভ’র রক্ত চলাচল দ্রুত হয় । কিন্তু ভেতর থেকে কেউ নিষেধের আঙুল তোলে – এটা ঠিক নয়, ফুলি যে বোন হয় ! আপন মামাতো বোন। ও ছাড়াতে চায়, কিন্তু ফুলির আঙুল ওর ঘাড় ও কাঁধ খামচে ধরেছে।

    একটা অতীন্দ্রিয় কিছু, একটা সিক্সথ সেন্স, ওকে কোন তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতির জানান দেয়। ও হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চোখ তুলে তাকায় -- বিশহাজার ভোল্টের শক। বড়মামীমা ছাদে কাপড় মেলতে এসে স্ট্যাচু হয়ে গেছেন। ফুলি পেছন ফেরে। এটাই যেন গ্রিন সিগন্যালের কাজ করল। ও উঠে দাঁড়ানোর সময় পেল না। ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে থাকেন ওর মা। তারপর সপাটে দুটো চড় কষিয়ে বিনুনি ধরে টানতে টানতে ওকে নিচে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে শুভ’র দিকে একবার ফিরে তাকালেন। সে চোখে ঝরছে ঘেন্না।

    শুভ সন্ধ্যের আগে চিলেকোঠা থেকে নিচে নামে নি। খাওয়ার সময় ওকে ডাকতে ওপরে উঠে এলেন বড়মামা। বললেন - ফাইনাল পরীক্ষার দু’মাস বাকি। যেদিন শেষ হবে তার পরের দিন সকালবেলায় মাকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে। এ বাড়িতে আর নয় । এখন থেকেই বন্ধুবান্ধবদের বলে ঘর খোঁজা শুরু কর। আর খাওয়ার সময় ছাড়া নিচে নামবে না।

    সবকিছু এক অভাবিত ঘটনায় পালটে গেল। এ বাড়িতে কেউ ওর সঙ্গে কথা বলে না। ছোট ভাইটাও না। ফুলিকে বোধহয় ওর সামনে আসতে বারণ করে দেয়া হয়েছে।

    সবার খাওয়া হলে নিচে থেকে কেউ আওয়াজ দেয়। ও নামলে পরে দেখতে পায় টেবিল খালি, ওর মা ওকে ভাত বেড়ে দেন। একটাও কথা বলেন না। ও মুখ নিচু করে মুখে গরাস তোলে। একটা অস্ফুট আওয়াজ, মা ফুঁপিয়ে উঠেছেন।

    সামনে ফাইনাল পরীক্ষা; শুভময়কে জোর করে পড়াতে মন লাগাতে হচ্ছে। ও ভেবে পায় না ওর পৃথিবীটা কি করে এমন ওলট-পালট হয়ে গেল।

    কিন্তু ভগবান বোধহয় ওর কথা না ভাবলেও ওর মা’র কান্না শুনতে পেয়েছিলেন। শেষ দুটো পেপারের মাঝে সাতদিনের গ্যাপ। তিনদিন কেটে গেছে। এমন সময় ছোটমামা একদিন বিকেলে ওকে নিচে ডেকে পাঠালেন। নেমে দেখে বাইরের ঘরে ছোটমামার সঙ্গে বসে একজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক। টুথব্রাশ গোঁফ আর হেনা দিয়ে ডাই করা লালচে চুলে একটু অদ্ভূত দেখাচ্ছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে উনি শুভময়কে কেমিস্ট্রি আর বোটানির কিছু প্রাথমিক প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন - চাকরি করবে? খুব খাটুনি আছে, গোড়ায় পয়সাকড়ি খুব বেশি দিতে পারব না । তবে মন দিয়ে কাজ করলে উন্নতির চান্স আছে ।

    শুভ কিছু বলার আগেই ছোটমামা বলে উঠলেন - ও সব পারবে। খাটতে পারে। তুমি ওকে নিয়ে নাও সতুদা, ঠকবে না, আমি বলছি ।

    ও অবাক। প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বলল - কাজটা কী?

    ভদ্রলোক ভুরূ তুলে ছোটমামার দিকে তাকালেন।

    ছোটমামা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হুড়মুড়িয়ে বললেন - ওঃ , দাঁড়া, পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। ইনি তোর ছোটমাইমার বড়দা, সত্যব্রত দত্ত। রাঁচিতে থাকেন। আগে একটা বড় ওষুধের কোম্পানিতে জি এম ছিলেন। এখন একটা নতুন বিদেশি কোম্পানির পার্টনার এবং গোটা পূর্বাঞ্চলের মার্কেটিং চিফ। বিহারে অফিস খুলছে, ওরা নতুন রিক্রুট করছেন। আর বড়দা -- এ হল আমার ভাগ্নে শুভ, এর কথা তো তোমায় আগেই বলেছি।

    উনি বললেন - কবে থেকে জয়েন করতে চাও?

    -মানে, পরীক্ষা? ইন্টারভিউ?

    -সে তো এখখুনি হয়ে গেল। আমি বলি কি, তুমি ফাইনাল ইয়ারের বাকি দুটো পেপার দিয়ে পরের দিনই রাঁচি চলে এস। আমার কার্ডটা রাখ। তোমার স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট এবং সেকন্ড ইয়ার পর্য্যন্ত মার্কশিট আর দুটো পাসপোর্ট সাইজের ফটো সঙ্গে এনো। টিকিট জমা দিলে ভাড়াটা ফেরত পেয়ে যাবে।

    ছোটমামার মুখটা হাসিহাসি। বললেন—যা, ওনাকে প্রণাম কর; তারপর ওপরে গিয়ে পড়তে বস।

    ও নিচু হলে উনি বাধা দিয়ে ওর মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন - একটা কথা, আমার পরিচয়ে এই কোম্পানিতে ঢুকছ; পরিশ্রম করে বিজনেস বাড়ালে তোমারও আখেরে ভাল হবে। কিন্তু ফলস বিলিং, ওষুধের স্যাম্পল বেচে দেওয়া – এসব যেন শুনতে না হয় । এ’সব ব্যাপারে কাউকে কোন সেকেন্ড চান্স দিই না ।

    শুভময় বাকি পেপারগুলো একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে মা ও মামাদের প্রণাম সেরে একটা তোরঙ্গ এবং বিছানা বগলে করে রাঁচির বাসে উঠল। সাতদিনের ট্রেনিং পর ও একটা দু’কামরার ঘর ভাড়া করে মাকে নিয়ে এল। শুভ এখন মিঃ শুভময় ডে, এম আর। একটা ধামসা গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগ, ধোপদুরস্ত পোষাক এবং গলায় টাই - শুভকে চেনা মুশকিল। আবার রোদ্দূরে ঘোরার সময় রোদচশমা। সপ্তাহে পাঁচদিন ট্যুরেই থাকে। নতুন নতুন শহর, ছোট ছোট জনপদ, ঘনবসতির গ্রাম - কিছুই বাদ পড়ে না। মাঝে মাঝে ডাক্তারদের কিছু অনায্য আবদারও সামলাতে হয়। এই এলাকায় কম্পিটিশন কম, কিন্তু হাতুড়ে ডাক্তারের চল বেশি। তাই অন্য কোম্পানির এম আর এদিকে খুব একটা আসে না। বলে এই এলাকার বিজনেস পোটেনশিয়াল কম। কিন্তু একবছর পর যখন শুভময়ের পরিশ্রম পড়তি জমিতে ফসল ফলিয়ে দেখাল, তখন অন্য কোম্পানিগুলোর জোনাল অফিস নড়েচড়ে বসল। ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। শুভময়দের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বাজার জমিয়ে নিয়েছে। ওরা কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়।

    মা সারাদিন বাড়িতে একাই থাকেন। শুভ ফেরে রাত্রে, মাসে অন্ততঃ বিশদিন ট্যুরে যেতে হয়। একটি সাঁওতালি বয়স্কা মেয়ে আছে ঘরের কাজ করার জন্যে, শুভ বাইরে গেলে ও এসে সামনের ঘরটায় মাটিতে বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে। ঘরের পেছন দিকে একফালি খালি জমিতে কপিকল লাগানো পাতকুয়ো, তার পাশে মা লাগিয়েছেন নয়নতারা ও টগর ফুলের গাছ। এছাড়া রয়েছে লাউকুমড়ো, লঙ্কা ও পুঁই। সাঁওতাল মেয়েটি এনে দিল জবাফুলের আর নিমের চারা। বলল এতে নাকি হাওয়া সাফ সুতরো হয়ে যায়। কোন অপদেবতার নজর লাগে না।

    সত্যিই কি লাগে না? নাকি সমস্ত অপদেবতা একযোগে স্থির করেছেন যে শুভকে থিতু হতে দেয়া চলবে না?

    মায়ের শরীর খারাপের খবর পেয়ে ও যখন ফিল্ড থেকে পড়িমরি করে চারঘন্টার বাস জার্নি করে রাঁচি পৌঁছে হাসপাতালে গেল তখন হাসপাতালের চাকাওলা স্ট্রেচারে মায়ের নিঃস্পন্দ শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা হয়ে গেছে।

    ভোরবেলা কুয়োতলায় হাতমুখ ধোবার সময় মাকে সাপে কামড়ায়। সাঁওতাল মেয়েটি নিজের বুদ্ধিমত কিছু ঝাড়ফুঁক করে। কিন্তু উনি ক্রমশঃ নেতিয়ে পড়ছেন দেখে পাশের বাড়িতে খবর দিলে ওরা হাসপাতালে নিয়ে যায়, শুভর অফিসে খবর দেয়।

    তবে সাপটা সম্ভবতঃ কেউটে, বেশিক্ষণ সময় দেয় নি।

    মামাবাড়িতে খবর দেয়া হয়েছিল, ছোটমামা এসেছিলেন। শ্রাদ্ধশান্তি চুকলে শুভ রাঁচি ছেড়ে লোহারডাগা শহরের ব্রাঞ্চ অফিসের কাছে ঘর নেয়। মা চলে গেলে বোঝে যে রাঁচিতে ও আর থাকতে পারবে না। আরও বোঝে যে এরপর ওর মামাবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কও শেষ। শুভ ভাবে ভালই হয়েছে। আরও টের পায় যে মেয়েদের ব্যাপারে ওর বয়সোচিত আগ্রহ অনেকখানি কমে গেছে।

    এবার শুভ ঝাড়া-হাত-পা; জীবন এখন ওর কোম্পানি, মার্কেট শেয়ার, কম্পিটিশন, পারফরম্যান্স - এসবের মধ্যেই সীমিত হয়ে গেছে। কখনও সখনও কলিগদের সঙ্গে উইক এন্ডে রাঁচি এসে সিনেমা যাওয়া, রেস্ট্যুরেন্টে খাওয়া এবং হুড্রু ফলসের ধারে পিকনিক, এসব হয় বটে, তবে শুভ যেন এ নিয়ে অন্যদের মত মেতে ওঠে না। কিন্তু রাঁচি অফিসে শুভকে সবাই চেনে। ওর হার-না-মানা জিদ এবং মার্কেটিং নিয়ে এলাকার লোকজনের মন ও কালচার বুঝে নতুন নতুন এপ্রোচ ভাল ফল দিয়েছে।

    সবুরে মেওয়া ফলেছে। একদিন মিঃ সত্যব্রত দত্ত ওকে ডেকে পাঠালেন। উনি এবং শুভ, কেউই নিজেদের পারিবারিক যোগাযোগ নিয়ে অফিসের মধ্যে কোন কথা বলেন নি, নইলে নিঘঘাৎ শুভ’র চামচা উপাধি জুটত।

    --তোমার প্রমোশন হচ্ছে, কিন্তু একটা কন্ডিশন আছে।

    ও কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে।

    -- ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে রিজিওনাল অফিসে তোমার পোস্টিং। বড় অফিস, রিজিওনাল ম্যানেজারের আন্ডারে ছ’জন এরিয়া অফিসার। আপাততঃ একবছর প্রোবেশনে থাকতে হবে। যদি পারফরম্যান্স স্যাটিস্ফ্যাক্টরি হয়, তো তোমাকে কোন একটা এরিয়া অফিসে ইন্ডিপেন্ডেন্ট চার্জ নিতে হবে। পারবে তো ?

    শুভ কোন কথা না বলে মাথা হেলিয়ে সায় দেয়।



    রায়পুরের এমজি রোড বা মহাত্মা গান্ধী রোডের উপর ইন্ডিয়ান অয়েলের পেট্রোল পাম্পের পাশের দোতলা বাড়িটি আজ বেশ সরগরম। আসলে এটি একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, মানে অফিস। দোতলায় একটা বড় হলঘর; দলের বিভিন্ন শাখা সংগঠন ও ইউনিটের মিটিং এবং সম্মেলনের জন্যে ব্যবহার করা হয় ।

    আজকে হাওয়া গরম। মহিলা সমিতির ইলেকশন পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। উঠতি বয়সের মেয়েরা এটাকে ইয়ং ব্রিগ্রেডের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে। ওরা মূল দলের জেলা কমিটিতে আবেদন জানিয়েছিল কুর্সী দখল করে ভ্যারেন্ডা ভাজতে থাকা পুরনো বয়স্কাদের হঠিয়ে দিয়ে নিউ ব্লাড আনা হোক। নইলে আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনে ভরাডুবির সম্ভাবনা। মহিলাদের জন্যে রিজার্ভ সীটগুলো হাতছাড়া হবে। গতবারে যারা পার্টির জেতা ক্যান্ডিডেট, তাদের বিরুদ্ধে পাবলিকের অসন্তোষ বাড়ছে। জনতার মধ্যে গিয়ে নিয়মিত জনসংযোগ করা দরকার।

    পার্টির উচ্চস্তরের অবজার্ভার বললেন যে নতুনরাও কিছু করে দেখাক। ওদের কল্পনার জনসংযোগের নমুনা পেশ করুক; তারপর ইলেকশন হবে। চেঁচামেচি গুনগুন থেমে গেল।

    বয়স্ক মহিলারা মুচকি হাসলেন। একজন দামি শাড়ি এবং গয়নায় গলা ঢাকা মহিলা পাশের কপালে বড় টিপ সিল্কের সালোয়ার-কুর্তাকে ঠেলা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন - দেখলেন তো মিসেস শান্ডিল্য, কাজ করার কথা উঠতেই সবার বাক্যি হরে গেছে।

    আস্তে আস্তে আবার ছোট ছোট গ্রুপে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।

    ইতিমধ্যে একজন এসে সবাইকে ইয়াবড় কেটলি থেকে ছোট ছোট প্লাস্টিকের কাপে চা ঢেলে ধরিয়ে দিয়েছে। সবাই মাটিতে পাতা শতরঞ্জির উপর বসে ছিলেন। উঠতে গিয়ে দু’একজন অসাবধানে চায়ের কাপ উলটে দিয়েছেন।

    এমন সময় একটি মেয়ে এগিয়ে গিয়ে মাইকের সামনে বসা অবজার্ভারের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিল। উনি একনজর দেখে পাশে সঞ্চালকের হাতে সেটা ধরিয়ে দিয়ে কিছু বললেন।

    মাইক গমগম করে উঠল ।

    সভী লোগ জরা ধ্যান সে সুনেঁ, হমারী সক্রিয় অ্যাকটিভিস্ট কুমারী সরমা বিশ্বাসনে এক প্রস্তাব ভেজি হ্যায়। সরমা বহনকো ম্যাঁয় অপনী বাত রখনেকে লিয়ে আমন্ত্রিত করতী হুঁ।

    এগিয়ে এল মেয়েটি। স্পষ্টভাষায় বলল যে আগামী মাসে রায়পুর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের অভনপুর মিউনিসিপ্যালিটির মাঠে একটি আই-ক্যাম্প অর্গানাইজ করতে চায়। তাতে অন্ততঃ চারজন ডাক্তার এসে কাছাকাছি গাঁ থেকে আসা দেড়শ’ লোকের বিনে পয়সায় চোখ দেখবেন। পঞ্চায়েতের সাহায্য নিয়ে আগে থেকেই পেশেন্টদের নাম রেজিস্ট্রি করা থাকবে। রোগীদের ছানি কাটানো এবং বিনে পয়সায় চশমা ও ওষুধ দেয়া হবে।

    প্রশ্ন উঠল – এতে দলের বা মহিলা সংগঠনের কী লাভ হবে? আর এই রাজসূয় যজ্ঞির খরচা কে যোগাবে? মহিলা সমিতির ফান্ডে এত টাকা নেই। এবং গোটা প্রোগ্রামটার দায়িত্ব কে নেবে?

    মেয়েটি সপ্রতিভ, হোমওয়ার্ক করে এসেছিল।

    বলল যে কাজ হবে মহিলা সমিতির ব্যানারে, কিন্তু দায়িত্ব সামলাবে ও এবং ওর তিন সঙ্গী। ফান্ড মবিলাইজ করার দায়িত্ব, পঞ্চায়েত এবং ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ – সব এরা করে নেবে। বড়রা ব্যাগড়া না দিলেই হল। এবং এই ক্যাম্পের সাফল্যের জন্যে সমিতির অ্যাক্টিভিস্টদের একমাস ধরে গ্রামগুলোর ঘরে ঘরে গিয়ে কেন এই ক্যাম্প, আমাদের দলের কি কি জনকল্যাণমূলক প্রোগ্রাম আছে সেসবের কথা বলতে হবে। এর চেয়ে ভাল প্রচার এবং জনসংযোগ আর কি হতে পারে! এই সুযোগে পঞ্চায়েত স্তরের ইউনিটগুলো সক্রিয় হবে, --সেটা বাড়তি পাওনা।

    সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মিসেস শান্ডিল্য মুখ গোমড়া করা মিসেস সায়গলকে বললেন - ইয়ে লৌন্ডী হ্যায় কৌন? খুদ কো কুছ জ্যাদা সমঝতী হ্যায়।
    (এই ছুঁড়িটা কে বলুন তো? নিজেকে একটু বেশি বুঝদার ভাবে মনে হচ্ছে।)

    --আরে এ হল বায়রন বাজারের এক বাঙালী আছে না, ওই যে মাছের ঠিকেদার, গতবার কর্পোরেশনে দাঁড়িয়েছিল, তার মেয়ে।

    -আপনি বিশোয়াস ঠিকেদারের কথা বলছেন? ও আজকাল সিভিল কন্ট্রাক্টরিও করছে। এই তো গতমাসে আমার কর্তার থেকে একটা জলের ওভারহেড ট্যাংক বানানোর পেটি নিয়েছে।

    -হ্যাঁ, হ্যাঁ; ওই বাঙালী আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। বহোত চালু চিজ, দেখিয়ে না, অপনী বেটি কো রাজনীতি কে ময়দান মে উতার দিয়ে।

    সরমা বিশ্বাস আর সোনালী হিরওয়ানি। একজন শান্ত গম্ভীর, অন্যজন নটখট চুলবুলি। সোনালীর অনেক বন্ধু, ছেলেমেয়ে সব মিলিয়ে অনেক। সরমার মাত্র একজন - সোনালী।

    ফার্স্ট ইয়ারেই একটা কান্ড হয়েছিল। হোলির পর কলেজ খুললে কিছু ছেলেমেয়ে কলেজের লনে আবির খেলেছিল। ঘরে ফেরার সময় সোনালীর চেহারা নানা রঙের ফাগে বিচিত্ররূপ; অথচ সরমাকে দেখলে মনে হচ্ছিল সদ্য স্নান করে এসেছে।

    গেটের মুখে পথ আটকালো দুটি সিনিয়র ছেলে। সোনালী হাত নেড়ে বলল, এই না না, আর না -- সারাদিন ধরে অনেক হয়েছে।

    কিন্তু ওরা বলল যে তাহলে এটুকুতে আর কি আসবে যাবে !

    একপ্রস্থ ঝাপটাঝাপটি, সোনালীর মুখ আরক্তিম। এবার সরমার পালা। সরমা ওদের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল - আমি হোলির পরে রঙ খেলি না।

    ওরা এগিয়ে এল। থোড়া সা লগা দুঁ? আপ কিঁউ কোরা কাগজ বনী রহোগী?

    একটু রঙ লাগালে কী হয়? কেন শুদুমুদু সাদা কাগজ হয়ে থাকতে চান?

    সরমা ওদের লম্বামত ছেলেটির চোখে চোখ রেখে বলল - একদফে বোল দিয়া না!

    ওর শান্ত গভীর স্বরে এমন একটা কিছু ছিল যে ছেলেদুটো চোখ নামাল, তারপর কেটে পড়ল।

    সোনালী সেদিন থেকেই ওর ফ্যান। বলে - তুই একদম আলাদা। অন্য বাঙালী মেয়েদের মত ছুঁইমুই না ।

    সরমা হাসে না, বলে - ওসব কিছু না । নিজের উপর বিশ্বাস রাখ, তুইও পারবি।

    তারপর থেকে কলেজের সোশ্যাল, ইউনিয়নের ডেপুটেশন, মেমোর‍্যান্ডাম - সবকিছুতেই সরমা ও সোনালীর যুগলবন্দী চলতে থাকে। এখন ওরা এমএ’র ফার্স্ট ইয়ার। দুজনেই নিয়েছে সমাজবিজ্ঞান। সরমার বিষয়টা বেশ পছন্দ; ভেবেছে পরে ছত্তিশগড়ের মারিয়া আদিবাসীদের নিয়ে রিসার্চ করবে। সোনালী ভর্তি হয়েছে স্রেফ সরমার পাশে থাকবে বলে ।

    আই-ক্যাম্পের তারিখ এগিয়ে আসছে। প্রচার ভালই হয়েছে। অভনপুর পঞ্চায়েত প্রধান খুব সাহায্য করছেন। বোলিয়ে ম্যাডামজী, অউর ক্যা সেবা চাহিয়ে, অউর ক্যা করুঁ?

    সামনের বছর পঞ্চায়েত ইলেকশন; এই আই-ক্যাম্প দশগাঁয়ে সরপঞ্চের গুণ গাইবে।

    কিন্তু ওষুধপত্তর? বিনে পয়সায়? চারজনের জায়গায় মাত্র একজন ডাক্তার রাজি হয়েছেন।

    তাছাড়া সেদিনের তাঁবু, মাইক, ফোটোগ্রাফার? প্রেস? গেস্টদের নিয়ে আসার জন্যে গাড়ি? পঞ্চায়েত থেকে স্বাগত-তোরণ আর গাঁয়ের লোকজনের জন্যে চায়ের ব্যবস্থা হয়ে গেল। সোনালী ও সরমার বাড়ি থেকে জুটল দুটো গাড়ি। এতেই কাজ চালাতে হবে। রায়পুর থেকে অভনপুর প্রায় উনতিরিশ কিলোমিটার। তেল পুড়বে ভালোই।

    সরমা নিজের মধ্যে একটা চাপা টেনশন টের পাচ্ছিল। এমন সময় সোনালী বলল - সরু, তেরে পাস এক দাওয়া-দারুওয়ালে হ্যায় না? তেরে হী জাত কে?

    সরমা প্রথমে অবাক হল। তারপর খেয়াল হল যে আছে বটে একজন। ওদের দোতলা বাড়ির আঙিনার একপাশে তিনটে ভাড়াটে খোলি আছে। প্রত্যেকটাতে দুটো করে কামরা, একটা শোয়ার আর একটা রান্নার। পেছনদিকে কমন বাথরুম এবং স্নান ও কাপড়কাচার জায়গা। এগুলোতে অল্প ভাড়ায় ব্যাচেলর ছেলেপুলে ও কিছু ছাত্র থাকে। অধিকাংশই ছ’মাসের মধ্যে চলে যায়। শুধু একজন টিকে আছে দেড় বছর ধরে। সম্ভবতঃ মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ। সাতসকালে হেলমেট লাগিয়ে একটা হিরো-হোন্ডা বাইকে সওয়ার হয়ে কোথাও বেরিয়ে যায়, ফেরে রাত করে। ওর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় শুধু রবিবারে। সেদিন ও ধপাস ধপাস করে কাপড় কাচে, রান্না করে আর একটু জোরে বাঙলা গান বাজাতে থাকে। সরমার দোতলার জানলা থেকে শোনা যায়।

    সরমা হেসে ফেলল - ওঃ, ওই ভ্যাবাগঙ্গারামটা? ওকে দিয়ে কাজ হবে?

    --আরে বলে তো দ্যাখ; একে ব্যাচেলর,তায় বাঙালী। তোর মত মেয়ে যখন ভিজে ভিজে গলায় বলবে ‘থোড়া মদদ কীজিয়ে না’ !

    --হট রে শালী! খালি ফালতু বাত।

    মুখে যাই বলুক, ও কিন্তু রোববার দিন বেলা দশটায় বাঙালী ভাড়াটের ঘরে কড়া নাড়ল। কেউ এল না। ভেতর থেকে কোন সিডি প্লেয়ারে জোরে জোরে গান বাজছে। গানটা সরমা আগে কখনও শোনেনি । একটা হেঁড়ে গলা গাইছে—“আর কি কখনও কবে, এমন সন্ধ্যা হবে?”

    সরমার পিত্তি জ্বলে গেল। এই কড়া রোদে ‘এমন সন্ধ্যা হবে’ বলে কান্নাকাটি! এসব বাঙালীরাই পারে, বিশেষ করে কোলকাতার বাঙালী। এ ছেলেটা তাই হবে। ও এবার অধৈর্য হয়ে কড়া নাড়ল। এবার ভেতর থেকে আওয়াজ শোনা গেল—“আ রহা হুঁ না ইয়ার! দরওয়াজা তোড় ডালোগে ক্যা?”

    দরজা খুলে যায়।

    একটি শ্যামলা রঙের বক্সার পরা ছেলে খালি গায়ে অবাক চোখে সরমাকে দেখছে, দু’চোখের তারায় কিছু প্রশ্ন। সরমা একটু অপ্রস্তুত, তিন সেকেন্ড। তারপর ছেলেটি - এক মিনিট! বলে সরমাকে প্রায় স্ট্যাচু করে রেখে ভেতরে চলে যায়, এবং একটা পাজামায় ঠ্যাং গলিয়ে তোয়ালে কাঁধে নিয়ে দ্রুত ফিরে আসে। তারপর সপ্রতিভ ভাবে বলে - বোলিয়ে জী, ক্যা সেবা করুঁ?

    সরমা নিজেকে সামলিয়ে নিয়েছে। বাংলায় বলে - আমি সরমা বিশ্বাস, এ’বাড়ির রবীন বিশ্বাস আমার বাবা। আমরা কলেজের মেয়েরা মিলে অভনপুরের কাছে মিউনিসিপ্যালিটির মাঠে পরের রবিবারে একটি আই-ক্যাম্প করছি। আপনি বোধহয় কোন ওষূধের কোম্পানিতে কাজ করেন।তাই বলছিলাম যদি ওই ক্যাম্পের জন্যে কিছু ওষুধ ডোনেশন হিসেবে পাওয়া যায়?

    ছেলেটি কিছু না বলে সরমার দিকে তাকিয়ে থাকে। দশ সেকেন্ড।

    সরমা অস্বস্তি বোধ করে। জানতে চায় এটা সম্ভব কিনা, নাহলে সোজাসুজি বলে দিন।

    --হতে পারে, কিন্তু তার আগে আপনাকে আপনাদের সংগঠনের লেটার প্যাডে আমাকে একটা অ্যাপ্লিকেশন দিতে হবে। তাতে ক্যাম্পের পারপাজ ছাড়াও দিনক্ষণ, জায়গা, চিফ গেস্টের নাম এবং এক্সপেক্টেড লোকসংখ্যা ও কীধরণের ওষুধ এবং তার কোয়ান্টিটি সব স্পষ্ট করে লিখতে হবে।

    সরমার হাড়পিত্তি জ্বলে যায় । ক’টা ফ্রি স্যাম্পেলের ওষুধ দেবে তারজন্যে এত লফড়া? এসব তো ওরা এমনিই পায়, অনেকে ব্ল্যাকে বেচেও দেয়। ছেলেটা একটা মেয়েকে পেয়ে ভাও খাচ্ছে।

    --হ্যাঁ, হ্যাঁ, এরপর আপনি ওই অ্যাপ্লিকেশন হেড অফিসে ফরওয়ার্ড করবেন, তারপর জবাব আসতে আসতে আমাদের তারিখ পেরিয়ে যাবে, ওসব আমার ঢের দ্যাখা আছে। একজন এমআর এর নিজের দমে যতটা হয় সেটুকু দিন, খামোখা আমার সময় নষ্ট করবেন না।

    ছেলেটি হেসে ফেলে।

    - সবটা না শুনেই রেগে যাচ্ছেন? শুনুন, আপনার কাজ ধরে নিন হয়ে গেছে। কিন্তু কী ধরণের ওষুধ, সেগুলো আমার কোম্পানির প্রোডাক্ট কিনা, এসব না জেনে কী করে ফাইনাল কথা বলি?আমার আরও কিছু জানার ছিল, যে পরিমাণ লোক হবে সেই হিসেবে শামিয়ানা লাগাতে হবে, মাইক ও ফোটোগ্রাফার চাই, পরের দিন খবরের কাগজে খবর আসা চাই, ভেতরের বা পেছনের পাতায়। তারপর অতিথিদের জন্য নাস্তা এবং গ্রামবাসীদের জন্যে দু’দফা চা এসব ভেবেছেন? উম, কত বাজেট আপনাদের?

    সরমা বোল্ড আউট, এতকিছু খুঁটিয়ে ভাবেনি। মানে, ভেবেছে কিন্তু আবছা আবছা; টাকাপয়সা? বাপির কাছে কিছু চাইবে? কতটা?

    ও বিপন্ন মুখে ছেলেটার দিকে তাকায়।

    ছেলেটা এবার জানতে চায় ক’জন আই-সার্জন জোগাড় হয়েছে।

    সরমা আরও চুপসে যায়, মিনমিন করে জানায় - একজন। চারজন হলে ভাল হত।

    ছেলেটা বুঝে যায়। ওকে বলে - একমিনিট দাঁড়ান, ম্যাডাম! তারপর দ্রুত ঘরে ঢুকে একটি স্লিপে ওই পয়েন্টগুলো লিখে সরমাকে ধরিয়ে দেয়, তার সঙ্গে একটি আইভরি কাগজে ছাপা ভিজিটিং কার্ড।

    বলে, এই অ্যাড্রেসে অ্যাপ্লিকেশন দিন। বিকেলের মধ্যে তৈরি করে রাখুন। আমি এসে নিয়ে যাব। সরমা কার্ডটা মন দিয়ে দেখে।

    শুভময় ডে, এরিয়া ম্যানেজার! চারশ’ চল্লিশ ভোল্টের ঝটকা!

    চোখ তুলে তাকায়। ছেলেটার চোখ হাসছে, এই ঝটকা লাগাটা উপভোগ করছে।

    শুনুন, আপনি গাঁয়ের লোকদের আনা ইত্যাদির ব্যবস্থা করুন, লজিস্টিক প্রবলেমের দিকটা আমি দেখছি। প্যান্ডেল,মাইক, ফোটোগ্রাফি, প্রেস, লাইট, এবং চারজন চোখের ডাক্তারকে আনা আমার দায়িত্ব। ওরাই আমাকে লিস্টি করে দেবে কি কি অষুধ কত কোয়ান্টিটি সব। অবশ্যি চা-নাস্তা এবং হ্যান্ডবিল ছাপানো এর খরচা আপনাদের সমিতি দিক।

    সরমা ঠিক শুনছে তো? এতসব অযাচিত সাহায্য? কেন? এই ছেলেটার নিশ্চয়ই কোন মতলব আছে। সরমা অস্বস্তি বোধ করে কথা ঘোরাতে চায়।

    আপনার জোনাল অফিস এতসব বায়নাক্কা স্যাংশন করবে তো? চানে কে ঝাড় মেঁ চড়া কর আখির মেঁ--?

    ছোলাগাছে চড়িয়ে শেষে---?

    -না না, এটুকু বাজেট আমার পাওয়ারের মধ্যে, কিন্তু আমারও কিছু শর্ত আছে।

    হুঁ, এইবার ঝাঁপির থেকে সাপটা বেরোবে, দেখা যাক।

    সরমা সাপের ছোবল সামলাতে তৈরি হয়। কঠিন মুখে জানতে চায়-কী সেই শর্ত?

    --কোন আকাশের চাঁদ চাইছি না। প্যান্ডেলে গ্রামবাসীদের ‘স্বাগতম’ লিখে আমার কোম্পানির নাম লেখা দশটা ব্যানার রাস্তা থেকে প্যান্ডেল অব্দি টাঙানো থাকবে। আসলে আমি আপনাদের কোন ফেভর করছি না। এটা আমার মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি।

    চলে আসার আগে সরমা পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে শুভময়ের দিকে তাকায়, সে চোখে কৃতজ্ঞতা। শুভময় দেখে মেয়েটির চোখ গভীর অতল। সরমা খেয়াল করে শুভময়ের সাবানের ছিটে লাগা রোমশ বুক, নির্মেদ পেট আর দাড়ি না কামানো চিবুকে একটা কাটা দাগ।



    এসে গেছে সেই বিশেষ রোববার । বেলা ন’টা বাজে, ভাদ্রের চড়া রোদ্দুর। তাপ বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল দিয়ে চড়ছে সরমার মেজাজ। সকাল আটটায় সোনালী এবং সমিতির আরও দুজনকে নিয়ে বাপির গাড়ি করে ও অকুস্থলে হাজির। আর এক ঘন্টা পরে বেলা দশটা নাগাদ আই ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা।

    কিন্তু একী! খালি মাঠ খাঁ খাঁ করছে। এর মধ্যে তো প্যান্ডাল সামিয়ানা এবং ছ’টা কাঠের চৌকি লাগিয়ে তাতে সতরঞ্চি বিছিয়ে একটা স্টেজমত তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। আর তারটার টেনে মাইক এবং বড় রাস্তা থেকে ব্যানার? কোথায় কি সব ভোঁ ভাঁ। ও নিজে কাল ছেলেটার ঘরে ওদের মহিলা সমিতির ছ’টা ব্যানার পৌঁছে দিয়েছিল। ছেলেটা বলেছিল লোক লাগিয়ে ওদের ওষুধ কোমপানির ব্যানার আর মহিলা সমিতির- সব একসঙ্গে টাঙিয়ে দেবে। সরমার চিন্তা করার কোন দরকার নেই।

    সরমা ওকে বিশ্বাস করেছিল। সেটাই হয়েছে কাল। এর চেয়ে নিজেরা করলে অনেক ভাল হত, না হয় ছোট ক্যাম্প হত, একটি ডাক্তার নিয়ে। আর এখন? পার্টির সিনিয়র মহিলারা সব হাসবে।

    মিসেস শান্ডিল্যকে ভাল করে চেনা আছে। জিভে খুব ধার। বলবে - চৌবেজী গয়ে থে ছব্বেজী বননে, লৌট আয়ে দুবেজী বনকর।

    ‘চার আনার হল সাধ হবে ছ’আনা,
    ফিরে এল বেচারা হয়ে দু’আনা’!

    সোনালীরও মুখ শুকিয়ে গেছে। অব কা হোগা রে সরু!

    সরমা জবাব দেয় না। ঘড়ি আজ বড্ড তাড়াতাড়ি চলছে, সাড়ে ন’টা। ইতিমধ্যে একটা সাদা রঙের প্রিমিয়ার পদ্মিনী গাড়ি এসে মাঠের পাশে থেমেছে। তার থেকে রবীন বিশ্বাস মশাই ও তার গিন্নি নেমে হন্তদন্ত হয়ে মেয়ে সরমাকে পাকড়াও করেন।

    --এই গাড়িটাই পাঠিয়ে দে চিফ গেস্ট জনপদ পঞ্চায়েতের অধ্যক্ষকে ওর বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে।

    সরমা জবাব দেয়না।

    কী হল তোর?

    দেখতে পাচ্ছ না কী হয়েছে? সব তোমার বেইমান ভাড়াটে ছেলেটার কান্ড! খালি বড় বড় কথা। আধঘন্টাও বাকি নেই, এখখুনি দশ গাঁয়ের লোকজন আসতে শুরু করবে। একটা শামিয়ানাও টাঙানো হয়নি। বাপি, ওই ছেলেটাকে কালকের মধ্যে আমাদের ঘর খালি করে অন্য কোথাও উঠে যেতে বলবে। ভারি আমার এরিয়া ম্যানেজার! সব ঝুঠ! ওই কার্ড নিঘঘাৎ ওর বসের বা অন্য কারও। একটা ব্যানারও লাগেনি। আমি শিওর, ওর বস পারমিশন দেয়নি। কাওয়ার্ড! সত্যি কথাটা বলার সাহস নেই।

    -কিন্ত মা, রাস্তার থেকে ব্যানার তো লেগে গেছে। আমরা আসার সময় দেখলাম। দুটো ছেলেকে দেখলাম একটা মইয়ে চড়ে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে বেঁধে দিচ্ছে, তোদের সমিতিরও ছিল।

    উত্তেজিত মেয়েকে শান্ত করতে বিশ্বাস গিন্নি বললেন।

    তুমি ঠিক দেখেছ?

    শুধু আমি কেন, তোর বাপিও দেখেছে।

    আরে ওই তো এসে গেছে! বিশ্বাসবাবু চেঁচিয়ে উঠে দ্রুতপায়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে যান। সরমা এবার ঘাড় ঘোরায়।

    কখন প্রায় নিঃশব্দে মাঠের আরেক মাথায় এসে থেমেছে একটা মালবাহী মাটাডোর ভ্যান। তার থেকে একটি কিশোর ও জনাচারেক মাঝবয়েসি নেমে কিছু বাঁশের খুঁটি, শাবল, দড়িদড়া আর তেরপল ও কানাতের কাপড় নামিয়ে ফেলছে। ইতিমধ্যে প্রায় ভ্যানের পেছন পেছন এসে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছে একটি সাদা অ্যাম্বাসাডর। তার থেকেও নামছে তিনজন যুবক। সবার চোখে রোদচশমা। তাদের মধ্যে একজনের হাতে একটা ব্রিফকেস। সে এসে বিশ্বাসবাবুকে নমস্কার করে বলে-কোন চিন্তা করবেন না স্যার, এরা আমার পুরনো লোক। সব কাজ ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে হয়ে যাবে।

    শুভময় সরমাকে উপেক্ষা করে সামিয়ানার লোকদের কিছু নির্দেশ দেয়। পনের মিনিটের মধ্যে একটা বড় সামিয়ানা টাঙানো হয়ে যায়, এবং তার পেছনদিকে একটা কানাত ও চারটে ছোট চৌকি মত বিছিয়ে সতরঞ্চি দিয়ে ঢেকে একটা স্টেজ তৈরি হয়। সরমার ঘড়িতে ন’টা পঞ্চান্ন ।

    শুভময় ও তার তিন স্যাঙাৎ এবার ওদের কোম্পানির ও মহিলা সমিতির ব্যানারগুলো দ্রুত হাতে টাঙাতে থাকে। পেছনের কানাতের গায়ে সাদার মধ্যে গাঢ় নীল দিয়ে বড় অক্ষরে লেখা ‘চক্ষুচিকিৎসা শিবির’এর নীচে আয়োজক হিসেবে রায়পুর মহিলা সমিতির নাম লেখা । তবে এককোণে ছোট অক্ষরে লেখা-সহযোগিতায় অমুক ওষুধ কোম্পানি। সব তো হল, বিশ্বাসবাবু সোনালীকে সঙ্গে নিয়ে প্রধান অতিথি জনপদ অধ্যক্ষকে আনতে চলে গেছেন। গ্রামবাসীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। মাইকে গান বাজছে - মেরে দেশ কী ধরতী সোনা উগলে, উগলে হীরা মোতি।

    এবার শুভময় এসে দাঁড়ায় সরমার সামনে। নীল টি-শার্ট, সাদা প্যান্ট, নীলচে কামানো গাল। শুভময়কে অন্যরকম লাগছে।

    কী, এবার নিশ্চিন্ত হয়েছেন তো? কোন টেনশন নেবেন না। দশটা বলেছিলেন, সাড়ে দশটা নাগাদ প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাবে। চিফ গেস্ট এলেই।

    সরমার টেনশন যায়নি। ডাক্তার কোথায়? আসল লোক?

    আমার তো তিনজন ডাক্তার আনার কথা ছিল, বাকি একজন তো আপনার।

    সরমা ঘেমে ওঠে। ওর আমন্ত্রিত ডাক্তার আসেওনি, কোন খবরও পাঠায়নি।

    ও গম্ভীর হয়ে বলে – সেই তিনজনই কোথায়?

    কেন, ওই যে আমার সঙ্গে এসেছে।

    ওরা তো আপনার বন্ধু!

    শুভময় মুচকি হাসে। হ্যাঁ, ওরা বন্ধু বটে, কিন্তু ডাক্তার বন্ধু। ওদের ডেকে এনে সরমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

    একজন একটু ফাজিল গোছের। কার্ড দিয়ে বলে আমার চেম্বার সন্ধ্যেবেলা খোলে, কালীবাড়ির উল্টোদিকে। কিন্তু আপনার এমন সুন্দর চোখ, আমি চাইনে আপনি কখনও আমার চেম্বা্রে আসুন।

    এসে গেছেন প্রধান অতিথি। মাইক গম গম করে হিন্দি এবং ছত্তিশগড়ি ভাষায় লোকজনকে জানাচ্ছে যে আজ কা কার্যক্রম বহোত শীঘ্র শুরু হোনেওয়ালে।

    শুভময় একপাশে সরমাকে ডেকে নিয়ে বলে -আপনার ডাক্তার ওনার সময়ে আসুন গে, এঁরা তিনজন ক্যাম্প সামলে দেবেন। এদের ক্যাম্পের এক্সপিরিয়েন্স আছে।

    চক্ষুচিকিৎসা শিবির গ্রেট সাকসেস।

    তিনটে ছোট টেবিলে বসে তিনজন ডাক্তার, তাদের সামনে গাঁয়ের লোক লাইনে দাঁড়িয়ে। চোখ পরীক্ষা করে সবাইকে ওষুধ দেয়া হচ্ছে কাউকে কাউকে চশমা। অনেককে ফলো আপ ট্রিটমেন্টের জন্যে প্রেসক্রিপশন লিখে রায়পুরে চেম্বারে যেতে বলা হয়েছে।

    যাওয়ার আগে সবাই প্লাস্টিকের ডিসপোজেবল কাপে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। বেলা শেষের সময় হঠাৎ বেসুর। স্থানীয় পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সরপঞ্চ, যিনি গত নির্বাচনে হেরে গেছেন, কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে এসে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে । ওকে ঠিকমত খবর দেয়া হয়নি। এখানেও সম্মান করা হচ্ছে না। ‘না কোঈ দুয়া সলাম, না কোঈ রাম রাম’! কোন সম্বর্ধনা কোন আসুন-বসুন নয়? এরা ভেবেছেটা কী?

    কিন্তু জল বেশি গড়ানোর আগে শুভময় এসে মাথা নুইয়ে নমস্কার করে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চায়, এবং ঠোঁট ফোলানো নেতাকে হাত ধরে স্টেজে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হয়।

    তারপর অনায়াসে মাইকটি নিজের দখলে নিয়ে শুভময় উপস্থিত জনতাকে শোনায় শহরের দিদিমণিরা এই চারটে গাঁ ‘গোদ’ (দত্তক) নিয়েছেন। স্বাস্থ্যের ইস্যুতে এঁরা বছরে কয়েকবার এখানে ক্যাম্প করবেন। তাতে বিনে পয়সায় গরীব জনতাকে ওষুধ দেবার দায়িত্ব ওর ওষুধ কোম্পানির। জনতার মধ্যে হ্যান্ডবিল ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে ওষুধ কোম্পানি এবং অভনপুর বাজারের তিনটে ওষুধের দোকানে নাম ঠিকানা দেওয়া।

    মুখ্য অতিথির সমাপ্তি ভাষণের পর সংক্ষিপ্ত ধন্যবাদ দেবার সময় সরমা বিশেষ করে বলে শুভময় ডে নামের এক এরিয়া ম্যানেজারের কথা।

    ফেরার সময় বিশ্বাসবাবু শুভময়কে বলেন - তোমার ভাড়ার গাড়ি ডাক্তারদের জন্যে ছেড়ে দিয়ে আমাদের সঙ্গে চল। আজ আমাদের পার্টির কাজে তোমার ঠিকমত দুপুরের খাওয়া হল না। তাই রাত্তিরে আমাদের বাড়িতে খাবে, এটা আমার দায়িত্ব।

    সন্ধ্যেবেলা চায়ের আড্ডার এবং রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে বিশ্বাস ঠিকেদার জেনে নিলেন ওর চাকরির ভবিষ্যত এবং ঘরে কে কে আছে ইত্যাদি। কিন্তু সরমা বাড়ি এসেই মাথা ধরেছে বলে সেই যে ওপরের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল, নামল সোজা খাওয়ার সময় হলে।

    কেন? সেটা বোধহয় ও নিজেও জানে না।

    রাত্তিরে শোয়ার আগে স্ত্রীর হাত থেকে পানের খিলি নেবার সময় বিশ্বাসবাবু গিন্নিকে বললেন - কেমন দেখলে ছেলেটিকে?

    আমি যা ভাবছি তুমিও কি তাই? খুব ভাল হয় গো। সরু আমাদের একমাত্র মেয়ে। শুভময়কে পেলে আমাদের ছেলের অভাব ঘুচবে। যাই বল, দুটিকে মানিয়েছে ভাল।

    বিশ্বাস মুচকি হাসলেন। বললেন - আমার উপর ভরসা রাখ। কোন তাড়াহুড়োর দরকার নেই।

    মুখে তাড়াহুড়োর দরকার নেই বললেও ঘটনা ঘটল দুনি লয়ে।

    প্রথম একটি মাস শুভময়ের রাতের খাওয়াটা প্রায়ই বিশ্বাস বাড়িতে হতে থাকল, দ্বিতীয় মাসে ওটা রুটিনে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর একদিন বিশ্বাসবাবু কথাটা পাড়লেন।

    শুভময় কি কিছুই বুঝতে পারছিল না? ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট নয়। খানিকটা আন্দাজ ও পাচ্ছিল বটে, কিন্তু ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। একটা বড় কারণ সরমার ব্যবহার।

    সরমা ঠিক প্রগলভ নয়। ওর কথাবার্তা একটু সংযত ও বয়সের তুলনায় ভারিক্কি। মাঝে মধে ওঁরা কত্তাগিন্নি এদের দুজনকে খালি ঘরে বসিয়ে উঠে গেছেন। কোন লাভ হয়নি। খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে সারদা বা অমরদীপ টকিজে নতুন বাঙলা বা হিন্দি দিনেমা আসার খবরেও সরমা কোন আগ্রহ দেখায়নি।

    কিন্তু বাবা-মা যখন আলাদা করে ওর মত জানতে চাইলেন তখন ও বলল-তোমরা যা ভাল বোঝ। কিন্তু আমাকে এমএ’র পরীক্ষা দিতে আটকালে চলবে না।

    এদিকে সোনালীরও এক ব্যবসায়ী পরিবারে বিয়ে হয়ে অন্য শহরে চলে গেছে। সরমা কি একটু একলা হয়ে গেছে?

    বিয়ে হয়ে গেল তৃতীয় মাসে। বিশ্বাসবাবুদের বাইরের ঘরে সরমা ও শুভময়ের জোড়াফ্রেমে বাঁধানো ছবি বিশ্বাসদম্পতির পাশেই জায়গা করে নিল।

    রবীনবাবু শুভময়ের মামাবাড়িতে বিয়ের কার্ড পাঠিয়েছিলেন, সঙ্গে দু’লাইন চিঠি।

    চিঠির জবাব আসেনি। শুধু ছোটমামার কাছ থেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি টেলিগ্রাম এল।

    কিন্তু তৃতীয় দিনে ঘটল ছন্দপতন। দুটো ব্যাপার।

    বিশ্বাসগিন্নিকে শুভময় স্পষ্ট বলে দিল যে ওর শ্বশুর বাড়িতে ঘরজামাই হয়ে থাকার কোন ইচ্ছে নেই। ওর প্রোবেশন শেষ হয়ে গেছে। ওকে এখন কোরবা শহরে কয়লাখনি ও থার্মাল পাওয়ার স্টেশন এলাকায় নতুন এরিয়া অফিসের দায়িত্ব নিতে হবে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই ও চার্জ নিতে যাচ্ছে। ভাল কোয়ার্টার পেয়েছে। সরমা এখানে থেকে এমএ পরীক্ষা ভালভাবে দিক। তারপর শুভময় এসে ওকে নিয়ে যাবে।

    সরমা আজ নয় কাল এ’বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে? বরাবরের মত? তাহলে এমন বিয়ে দিয়ে কী লাভ হল? রবীনবাবু ঈশারায় গিন্নিকে নিরস্ত করে বললেন - তোমার সরমা বড় হয়ে গেছে। এটা মেনে নাও।

    কিন্তু সরমা যখন বলল যে ওদের দুটো পোষা কুকুরের অন্ততঃ একটাকে, ওই সাদা লোমঝোলা লাসা ডগ টংলুকে, সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চায়, তখন সবাইকে অবাক করে শুভময় জানাল যে ওর কুকুরের লোমে অ্যালার্জি আছে, হাঁচি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয় । কাজেই ওসব সম্ভব নয়। খুব মন খারাপ করলে সরমা মাসে একবার করে এসে ক’দিন মাইকা বা পিতৃগৃহে থেকে যেতে পারে। ট্রেনে চারঘন্টার পথ।

    সরমা একদৃষ্টিতে শুভময়ের দিকে তাকিয়ে রইল।



    কোরবা শহরে শুভময়দের দেখতে দেখতে একবছর হয়ে গেছে। আস্ত একটা বছর!কীভাবে যে গড়িয়ে গেল শুভময় টের পেল না। ও ব্যস্ত ছিল সরমাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে।

    এর মধ্যে সরমার সোসিওলজিতে এমএ হয়ে গেছে। কিন্তু আপাততঃ আদিবাসী জীবন নিয়ে রিসার্চ করার কোন চাড় ওর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। ওর সরমা নাম শুভময় বদলে দিয়েছে। না, নামের মধ্যে বিভীষণ বা কুকুরের সঙ্গে কোন সম্পর্ক জোড়ায় ওর প্রবল আপত্তি।

    সরমা এখন হয়েছে নীলিমা - শুধু শুভময়ের জন্যে। এক সন্ধ্যেয় কালবৈশাখির ঝড় থেমে যাওয়ার পর সরমা গা ধুয়ে ভিজে নীল শাড়ি গায়ে লেপটে বাথরুম থেকে ঘরে এল। শুভময়ের গলার মধ্যে কিছু একটা ডেলা পাকিয়ে উঠল। প্রায় এক দশক আগের ভুলে যাওয়া একটি কবিতার লাইন ইথারে ভেসে বেড়াতে থাকল।

    “রাত্তিরে জেগে ওঠে যে সাগর
    অন্ধকারের সাগরস
    তুমি তাতে স্নান করে এসো নীলিমা”

    গত চারটে শুক্রবার শুভময় নীলিমার কাছে বা ওর কোন অতীন্দ্রিয় শ্রবণশক্তির কাছে হেরে গেছে। আজ পাঁচ নম্বর। এবার শুভময় কিছুতেই হারবে না।

    শুভময় তিনটে বাড়ি পিছিয়ে রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর ওটুকু হাঁটতে থাকে। বাড়ি পৌঁছে সন্তর্পণে বাগানের গেট খুলে পা টিপে টিপে ছোট্ট লন পেরিয়ে ঘরের দিকে এগোয়। নাঃ; এবার ও জিতে গেছে। দরজা খুলে চৌকাঠে কেউ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে নেই।তবে তো জিতেই গেছে, কিন্তু তেমন আনন্দ হচ্ছে কই!

    একী! দরজার কড়ায় ঝুলছে একটা গোদরেজ তালা। শুভময় ভুরু কুঁচকে তালাটা নেড়েচেড়ে টান দিয়ে দেখল। কী হতে পারে? সরমার বাবা-মা কারও শরীর খারাপ হয়েছে? তাহলে ও অফিসে ফোন করত নিশ্চয়ই। আর টাকা পয়সা ছাড়া কোন খবর না দিয়ে এভাবে ও যাবে কেন? সরমার মোবাইলে ফোন লাগালে বলছে ‘কভারেজ এরিয়ার বাইরে’, কী জ্বালা!তাহলে কি সরমার কিছু হল? এবার শুভময়ের বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। কোথায় খোঁজ করবে? এই একবছরে অফিসের সার্কেলের বাইরে কোন পরিবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। পাশের বাড়িতে জিজ্ঞেস করবে? ওর মাথা কাজ করছে না।

    কাছেই মার্কেট কমপ্লেক্সে যাওয়া যেতে পারে। ওখানকার মহাবীর জৈন গ্রসারি স্টোর্স থেকে ওদের মাসের বাজার আসে। সরমা হয়ত ওখানে কিছু কিনতে গিয়েছে, মোবাইল হয়ত বাড়িতে ফেলে গেছে। একা না গিয়ে শুভময়ের ফেরা অবধি অপেক্ষা করলে পারত। যাকগে, শুভময় তিনটে বাড়ি এগিয়ে গিয়ে পার্ক করে রাখা গাড়িতে বসে স্টার্ট দেয়। সরমাকে নিয়ে ফিরবে। কিন্তু প্রথম বাঁক পেরোতেই দেখতে পায় সরমাকে, আরেকজন মহিলার সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করতে করতে আসছে। শুভময় ঠিক ওদের গা ঘেঁষে ব্রেক কষে। ওরা চমকে উঠে ড্রাইভারকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শুভময়কে নামতে দেখে চুপ করে যায়।

    --কী ব্যাপার তোমার? কোথায় গেছলে?

    অপ্রস্তুত সরমা সংকোচ কাটিয়ে কিছু বলার আগেই অন্য মহিলাটি এগিয়ে এসে সরমাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। হাতজোড় করে হাসিমুখে বলে—প্লিজ, ওকে কিছু বলবেন না। আসল দোষী তো আমি। যো সাজা দেনা হ্যায় মুঝে দীজিয়ে।

    ও কখন থেকে বাড়ি যাবে বাড়ি যাবে করছিল, আমিই জিদ করে আটকে রেখেছিলাম।

    সরু তো দেখছি হাজব্যান্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ভয় পাচ্ছে। আমি হলাম সোনালি জগত্যানি। আপনার স্ত্রীর কলেজ জীবনের বন্ধু। বিয়ের পরে আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড কেস। আজ হঠাৎ করে দেখা হয়ে গিয়ে এই কান্ড!

    শুভময় এমন করে কাউকে চোখে চোখে হাসতে দেখেনি।

    নিজেকে সামলে নিয়ে শুভময় এবার সোনালিকে বলে- এতদূর যখন এসেছেন, চলুন আমার বাড়িতে। কফি খেতে খেতে ভাল করে আলাপ করে আলাপ পরিচয় হবে’খন। বেশিক্ষণ আটকে রাখব না। গাড়ি চালিয়ে আপনাকে পৌঁছে দেব।

    সব ভাল যার শেষ ভাল। এভাবেই ওদের পরিচয় হল্ সোনালির হাজব্যান্ড রমেশ জগত্যানির সঙ্গে। উনি এশিয়ান পেইন্টের স্টকিস্ট, বাড়িতেই একতলায় অফিস। খুব আমুদে এবং মিশুকে।

    এদের পেয়ে শুভ যেন বর্তে গেল। ওর তো অফিস আছে, বিজনেস বাড়ানোর নেশা আছে, স্টাফ আছে, কিন্তু সরমা যে সারাদিন বাড়িতে একলা থাকে। কুকুর পুষতে চেয়েছিল, অথচ শুভ এককথায় নাকচ করে দিয়েছিল। বলেছিল মাঝে মাঝে রায়পুরে নিজেদের বাড়িতে কুকুরের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসতে, কিন্তু এখানে? নৈব নৈব চ! এখন দুই সখীর নিজেদের মধ্যে আড্ডা জমে, নানান প্ল্যান ঠিক হয়। উইক এন্ডে সুই পরিবার কারও একজনের গাড়িতে বেরিয়ে যায় - রামঝর্ণা, ফুটকা পাহাড় বা অজগরবাহারের জঙ্গলে পিকনিক করতে। ফেরার সময় রাত্তিরের খাওয়াদাওয়া কখনও এবাড়ি কখনও ওবাড়ি।

    এভাবেই বেশ দিন কাটছিল। কিন্তু একদিন একটা ঘটনা ঘটল।

    শুভ তিনদিনের জন্যে হেড অফিস মুম্বাইয়ে গেছল। রায়পুর থেকে একটা গাড়ি বুক করে সোজা কোরবা—পাক্কা ছ’সাত ঘন্টার ধাক্কা। সন্ধ্যের মুখে বাড়ি ঢুকতে গিয়ে অবাক। দরজার মুখে অন্ততঃ দশ-বারো জোড়া চটিজুতো।

    বাইরের ঘর থেকে শোনা যাচ্ছে বেশ ক’টি চড়া গলা - মেয়েদের।

    ও দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সব কথা থেমে গিয়ে একেবারে পিনড্রপ মেজেতে সতরঞ্চি বিছিয়ে বসে আছেন বেশ কিছু মহিলা, জামাকাপড়ে দারিদ্র্য ও মালিন্যের ছাপ। তাদের সরমা কিছু বোঝাচ্ছে।

    --কী ব্যাপার? ইয়ে সব ক্যা হো রহা?

    ওর গলার স্বরে বিরক্তি লুকোনো নেই।

    সরমা শান্ত ভাবে বলে - আপ অন্দর যাইয়ে। ম্যাঁয় আতী হুঁ।

    ও যত না বিরক্ত হয়েছে তার চেয়ে বেশি অবাক। হচ্ছেটা কী? কথা না বাড়িয়ে ও ট্রলিব্যাগ টেনে ভেতরের ঘরে গিয়ে পাখাটা চালিয়ে দিয়ে বিছানায় বসে। এখন এক কাপ চা যে বড্ড দরকার। মাথাটা বড্ড ধরেছে।

    কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে? ও টিভি চালিয়ে আজকের স্থানীয় খবরে মন দেয়ার চেষ্টা করে।

    এমন সময় সোনালি ট্রে’তে দু’কাপ চা এবং ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কিট সাজিয়ে ঘরে ঢোকে। শুভ’র পিত্তি জ্বলে যায়।

    -আপনি কেন এসব করতে গেছেন? সরমা কোথায়?

    --রাগ করবেন না। মহিলা সমিতির মিটিং এই শেষ হল বলে। সরু প্রেসিডেন্ট তো, ও সবাইকে বিদেয় করে আসবে। তাই আমি নিয়ে এলাম। খেয়ে নিন, একটু পরে নাস্তা নিয়ে ও আসবে।

    --আপনাদের এই মহিলা সমিতির ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন?

    -- দেখুন, অনেকদিন ধরেই সরুর বাবা - উনি এখন আমাদের পার্টির রায়পুর জেলার ট্রেজারার - ওকে বলছেন এই শহরে একটা ইউনিট গড়ে তুলতে। আগে যারা ছিলেন তাঁরা কেউ এখন সক্রিয় নন, অনেকে অন্য শহরে চলে গেছেন। নিয়েআমি আর সরু কোমরবেঁধে লেগে পড়েছি, সেই কলেজের দিনে রায়পুরের মত। আমার স্বামী খুশি, কোন আপত্তি করেননি। জানতাম, আপনিও বাধা দেবেন না। আপনি যে তিনদিনের জন্যে মুম্বাই গেলেন, নইলে আগেই জানতে পারতেন। এটা আমাদের সমিতির প্রথম মিটিং, আঙনওয়াড়ি মহিলাদের নিয়ে। এদের আদ্দেক আবার গোঁড় আদিবাসী। জানেনই তো, কলেজ জীবন থেকেই সরু ভাবত - এদের নিয়ে কাজ করবে ও।

    শুভ আপত্তি করতে পারেনি। সোনালির হাসি ও চোখের ভাষায় ভেতরে ভেতরে পাকিয়ে ওঠা রাগ ঠান্ডা হয়ে যায়।

    সরমা যখন মাঝে মাঝে নীলিমা হয়ে ওঠে তখন শুভ ভাবে সত্যিই তো, অমন সপ্রতিভ ব্যক্তিত্বময়ী মেয়ে কি বিয়ের পর ঘরকুনো ‘সুখী গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন’ হয়ে বাকি জীবন কাটাবে? যা হচ্ছে তা ভালই হচ্ছে।

    সুর কাটল ছ’মাস পরের এক শুক্রবারে।

    সেদিন একটু জ্বরমত হওয়ায় ও অফিস যায়নি। সরমা গেছে কেমিস্টের কাছে ওষুধ কিনে আনতে। তেপায়ার উপর টেলিফোন বেজে উঠল। ধরতেই ওপারে শ্বশুরমশায়ের গলা- কংগ্র্যাটস মুন্নি, আজ ফাইনাল লিস্ট বেরিয়ে গেছে। তোর নাম আছে। তুই সীতামড়ি ওয়ার্ড থেকে দাঁড়াচ্ছিস। হ্যালো, খরচাপাতি নিয়ে তোকে ভাবতে হবেনা। বেশির ভাগটা আমি দেব, বাকিটা পার্টিফান্ড থেকে। হ্যালো -

    --বাবা, আমি শুভ বলছি। কী হয়েছে? আপনার মেয়ে দোকানে গেছে, এসে পড়বে।

    -- শুভ? আজ অফিস যাওনি? শোন, ভাল খবর। সরমা এবার সামনের মিউনিসিপ্যালিটির ইলেকশনে আমাদের দলের ক্যান্ডিডেট, কোরবার সীতামড়ি ওয়ার্ড থেকে।

    --কী বলছেন? আমি তো কিছুই জানিনা।

    --আরে জানবে কোত্থেকে? এই একঘন্টা আগে লিস্ট ফাইনাল হয়েছে। আচ্ছা, ও বাড়ি ফিরলে একটা ফোন করতে বোল।

    সরমা ফিরল ঘন্টাখানেক পরে।

    --তুমি নাকি ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছ?

    --হ্যাঁ, একটু আগে আমার মোবাইল নম্বরে বাবা ফোন করেছিলেন। তখন জানলাম।

    -- আমাকে আগে জানালে না?

    -- আগে তো জানতাম না। আমার নাম প্রপোজ হয়েছিল। ফাইনাল হলে তবে তো বলব। এখন তো জেনেই গেছ।

    -- তা বলছি না। তুমি ইলেকশনে দাঁড়াতে চাও একথা আগে বলনি তো? নাকি বলার দরকার নেই মনে কর?

    -- কেন? তোমার পারমিশন নিতে হবে নাকি? তুমি তোমার কোন কাজের ব্যাপারে আমাকে আগে জানাও?

    শুভময় অবাক। এ কোন সরমা? কবে থেকে এমন বদলে গেল? নাকি একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল, শুভময় টের পায়নি?

    ও আর কথা বাড়াল না।

    এরপর দু’মাস সরমার নাওয়া খাওয়ার কোন ঠিকানা রইল না। সারা শহরে সমস্ত প্রার্থীদের নামে পোস্টার। একদিন অফিসে সমস্ত স্টাফ একটা ফুলের বোকে দিয়ে শুভময়কে কনগ্র্যাচুলেট করে বলল—আপনার ও ম্যাডামের জন্যে আমরা গর্বিত। আমাদের বিশ্বাস উনি জিতে সীতামড়ি ওয়ার্ডের অনেক সমস্যা দূর করবেন। আমরা রোজ দু’ঘন্টা ওনার প্রচারে পাড়ায় পাড়ায় যেতে রাজি।

    শুভময়ের মাথা ঘুরছে। ও সামনে রাখা জলের গ্লাস একচুমুকে খালি করে চুপচাপ সবাইকে এক নজর দেখল। তারপর হিমশীতল গলায় বলল যে ম্যাডাম সরমার পলিটিক্যাল কাজ ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ওর অফিসের কেউ যেন সে’ব্যাপারে নাক না গলায়। এটা নন-নিগোশিয়েবল।

    ভোট গোণা শেষ হলে দেখা গেল সরমা হেরে গেছে। ভোটের ব্যবধান মন্দ নয়। আদিবাসী পাড়াতেই ওর বিরোধী প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছে।

    শুভ দোলাচলে ভুগছে। বুঝতে পারল যে ও প্রাণপণে চাইছিল ওর সরমা জিতে যাক। কোরবা শহরে ওর নিজস্ব পরিচয়ে মাথা তুলে দাঁড়াক। কিন্তু ওর অবচেতন মনে আশা অংকুর মেলেছে যে এবার সরমা ভেঙে পড়বে। ও রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে ঘরগেরস্থালিতে থিতু হবে। সরমা থেকে আবার নীলিমা হবে। এবং হয়ত আগের মত বদলে সন্তানের মা হতে চাইবে।

    শুভময় ওর উপর এসব চাপিয়ে দিতে চায় না। ও অপেক্ষা করতে রাজি।



    কিন্তু দু’তিন মাস গড়িয়ে যাওয়ার পর শুভময় বুঝল যে দুটোর কোনটাই হবার নয়। সরমা যেন কিছুই হয়নি ভাব করে নির্বাচনের পরাজয়কে গা’ থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আগের চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে পার্টির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এবার ওর কাজের ক্ষেত্র কোরবার স্কুল-কলেজে ইউনিয়ন গড়া। তবে রায়পুরের দলীয় কার্যালয়ে শান্ডিল্য ম্যাডামেরা চোখ নাচিয়ে হেসে বললেন—রস্‌সি জ্বল গয়ী, পর এঠন না গয়ী। দড়ি গেছে জ্বলে, কিন্তু গিঁট যায় নি খুলে।

    ওর পার্টি থেকে ওকে একটা গাড়ি দিয়েছে, সর্বক্ষণের জন্যে। তাই বাগানে টিনের শেড দিয়ে আর একটা গ্যারাজ মত বানানো হয়েছে।

    কোথাও কি দুজনের সম্পর্কে একটা ক্লান্তি একটা হেমন্তের কুয়াশা ঢুকে পড়েছে? শুভময় বুঝতে চাইছে, কিন্তু কারও সময় নেই এ’নিয়ে কথা বলার।নিজেদের মধ্যে কথাবার্তাও কেমন ফর্মাল হয়ে গেছে। সোনালিও সরমার কর্মযজ্ঞে অংশীদার। শুভ’র সঙ্গে চলতে ফিরতে দেখা হয়, চোখে আগের মতই হাসির ঝিলিক। কিন্তু শুভ’র কোন উৎসাহ নেই। ভেতরের শৈত্য কেমন বাইরেও বেরিয়ে আসছে। মিঃ জগত্যানির থেকে নতুন পিকনিক বা বেড়াতে যাওয়ার প্রসাতাব শুভ কাজের অজুহাতে এড়িয়ে যায়। বোধহয় যা ঘটেছে তার জন্য ও মনে মনে সোনালিকেই দায়ি করে।

    কোরবায় ওরা বাসা বেঁধেছে মাত্র একবছর। ওর বোঝাপড়ায় সরমা কেমন ওর একান্ত আপন নীলিমা হয়ে উঠছিল। আরও একটু সময়ের দরকার ছিল। কিন্তু কোথায় যেন ওঁৎ পেতে ছিল সোনালি, এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে টেনে নিয়ে গেল বাইরের দুনিয়ায়। নীলিমা আবার সরমা হয়ে গেল।

    অনেক কিছুই বদলে গেল। সরমা আজকাল রান্নার সময় পায় না। ঠিকে কাজের মাসির জায়গায় এখন এসেছে মেরী, সর্বক্ষণের জন্যে। রান্না এবং ঘরের সব কাজ, মায় বাগানের দেখাশুনো সবকিছুই এখন ওর দায়িত্ব।

    সেদিন শনিবার। ওরা রাত্তিরের খাবার খেতে বসেছে। মেরী পরিবেশন করছে। এমন সময় দরজায় কলিবেল ডিংডং শব্দে বেজে উঠল। এই অসময়ে আবার কে এল?

    মেরী পোর্টিকোর আলো জ্বালিয়ে দিয়ে দরজা খুলেই পিছিয়ে এল। দরজা জুড়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন দু’জন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক। একজনের খাকি ধরাচূড়া এবং কাঁধের দুটো স্টার থেকে স্পষ্ট যে উনি কোরবা পুলিশের কোন পদস্থ অফিসার। সঙ্গের ছিপছিপে ভদ্রলোকের বুশশার্ট আর ট্রাউজারে পেশার কোন পরিচয় স্পষ্ট নয়।

    উনি একটু চিনির রস মাখা গলায় বললেন—সরি! অসময়ে এসে পড়েছি। আপনারা ডিনার ষেরে নিন, আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি।

    শুভ তাড়াতাড়ি ভাতে জল ঢেলে হাত ধুয়ে উঠে আসে। ওর চোখে রাজ্যের বিস্ময়।

    --বাত ক্যা হ্যায় অফিসার? কিনসে মিলনা হ্যায়? অন্দর আইয়ে।

    -- নহী নহী; ঘাবড়াইয়ে মত। হমলোগ আপকী মিসেস সে এক দো সওয়াল পুছকর চলে জায়েঙ্গে।

    বাঁকের মাথায় অতল খাদ। শুভ মাথা ঘুরে খাদে পড়ে যায়।

    --মেরী মিসেস? ম্যায় কুছ সমঝা নহীঁ।

    এবার সাদা পোষাকের মাঝবয়েসি এগিয়ে আসেন।

    -দেখুন, আমরা জানতে চাই মিসেস সরমা ডে আজ দুপুরে একটা থেকে তিনটের মধ্যে কোরবার গভর্নমেন্ট কলেজে গেছলেন কিনা?

    --কেন?

    -- হয়েছে কি, আজ দুপুরে কলেজ ইউনিয়নের ইলেকশন ছিল। সেখানে দুই ইউনিয়নের ছাত্রদের মধ্যে মারামারি হয়। এক পক্ষের আঘাত খুব বেশি নয়। কিন্তু অন্য দলের তিনজলের মাথা ফেটেছে, বর্তমান ইউনিয়ন সেক্রেটারির সাতটা স্টিচ হয়েছে। হকিস্টিক নিয়ে হামলা হয়েছিল।

    -- এ ধরণের গুন্ডামি বরদাস্ত করা যায় না। কিন্তু এর সঙ্গে সরমার, মানে আমার স্ত্রীর কী সম্পর্ক?

    -- আসলে আহতদের নামজদ রিপোর্টে চারটে ছেলে গ্রেফতার হয়েছে। জেরার সময় ওরা স্বীকার করেছে যে ওদের পেট্রন সরমা ম্যাম নির্দেশ দিয়েছিলেন হকিস্টিক দিয়ে পেটাতে। তাই—

    ককিয়ে ওঠে শুভময়।

    -- অফিসার, এসব কী বলছেন? আমার স্ত্রী এসব করতে পারে না। ওকে এতদিন ধরে দেখছি। ও যে পরিবারের মেয়ে—

    সাদা পোষাক হাত তুলে ওকে থামান। বলেন, আমরা সব জানি। তাই আপনার সামনে ওনাকে দুটো প্রশ্ন করেই চলে যাবো।

    --ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছেন?

    কখন সরমা এসে গেছে আর দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে শুভময়কে আড়াল করে।

    --না, আমরা শুধু জিঞ্জেস করে—

    -ইয়ার্কি পেয়েছেন? কলেজের দুটো ছেলে মারের ভয়ে থানায় কী না কী বলেছে তার ভিত্তিতে রাত্তিরে সোজা আমার ঘর অবধি ধাওয়া করেছেন? ভেবেছেন কী আপনারা? সরকারের নৌকর হলেই শাসক দলেরও নমক খেতে হবে? আমি আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেব না।

    দুই অফিসার মুচকি হেসে দু’দিকে মাথা নাড়েন।

    -- ওকে, আজ চলি। কিন্তু আশা করব তদন্তের স্বার্থে আপনি আমাদের সঙ্গে কো-অপারেট করবেন। ঠিক বলছি, মিসেস ডে?

    শুভময় সম্বিৎ ফিরে পায়।

    - সরি অফিসার। নিশ্চয়ই কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।

    আমরা ল’ অ্যাবাইডিং সিটিজেন। তদন্তের স্বার্থে দরকার পড়লে আমরা নিশ্চয়ই থানায় আসব। আমি নিজে মিসেসকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব।

    ওরা চলে যাবার পর শুভময় সরমাকে জিজ্ঞেস করলঃ তুমি ওদের হ্যাঁ না কিছুই বললে না যে? তার মানে তুমি ওখানে ছিলে?

    --খুব বুঝেছ। আজ সারাদিন আমাদের রোটারি ক্লাবে মিটিং ছিল। আমি ওদের এগজিকিউটিভ মেম্বার। পুলিশ অফিসার সব জানে। এসেছিল তোমার সামনে আমাকে অপদস্থ করতে যাতে তুমি আমাকে এসব ছেড়ে দিতে বল।

    -- তা কেন বলব? কিন্তু মারপিটের ব্যাপারটা? তুমি সত্যি হকিস্টিক দিয়ে ঠ্যাঙাতে বলেছিলে? ভায়োলেন্সের একটা চেন রি-অ্যাকশন আছে, সেটা ভেবে দেখেছ? হেলদি পলিটিক্স এককথা আর রাজনীতির নামে গুন্ডামি –

    - গুন্ডামি কাকে বলছ? বিশুদ্ধ বলে এই দুনিয়ায় কিছু হয় কি? ডিপেন্ড করছে তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে। একই ঘটনা ছাত থেকে দেখলে একরকম, মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখলে আর।

    শুভময় হতবাক। এভাবে কথা বলতে, আর্গুমেন্ট করতে কবে শিখল সরমা?

    সম্পর্কের মধ্যে নেমে এসেছে হেমন্তের শীত।

    শুভ বারান্দায় বসে সিগ্রেট ধরায়। সরমা আজকাল অন্যঘরে শুচ্ছে। ওর ঘরে নীল আলো জ্বলছে। ক্যাসেট প্লেয়ার চালিয়ে ও জগজিতের সিং এর গজল শুনছে, সুরের রেশ এই নিস্তব্ধ রাতে গোটা বাড়িতে ছড়িয়ে যাচ্ছেঃ

    “সরকতী জায়ে হ্যায় রুকসে নকাব,
    আহিস্তা, জনাব আহিস্তা।"

    মুখ থেকে সরে যাচ্ছে মুখোশ,
    ধীরে বন্ধু, একটু ধীরে।

    দু’দিন পরে সকালে চা খাওয়ার সময় সরমা বলল - ও একটা কুকুর আনিয়ে নিচ্ছে, সিকিউরিটি পারপাস। রাজনৈতিক কারণে শত্রু বেড়েছে, তাই।

    শুভময় প্রমাদ গোণে। কুকুর! হাল্কা সুরে বলে - কেন, তোমার বডিগার্ড হিসেবে আমি তো আছিই। আরও একজন চাই।

    সরমা হাসে না।

    -আমি সিরিয়াস। তোমার অপছন্দ জানি। তাই পেছনের পুরনো গ্যারাজে থাকবে। তোমার সামনে আসবে না, বাড়ির ভেতরে ঢুকবে না। ওদের খাবার দেয়া, ঘুরিয়ে আনা সব মেরি করবে। কখনও সখনও আমিও।

    এরপর তোমার আপত্তি হওয়া উচিত নয়।

    শুভময় নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে।

    দু’তিন সপ্তাহের মধ্যেই প্রব্লেম দেখা দিল। ফ্রিজে রাখা দুধ ও মাংস হিসেবে কম পড়ে যাচ্ছে। শুভ বুঝতে পেরে দুটোরই কোটা বাড়িয়ে নিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।

    সেদিনটা ছিল রবিবারের দুপুর।

    শুভ শেভিং করে স্নানটান সেরে পরেছে একটা গতমাসে কেনা পোলকা ডট বুশশার্ট আর জীন্স, ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে যাবে মোটরসাইকেলে চড়ে ফুটকা পাহাড়। শুভ নিয়ে যাবে হটবক্সে কিছু কাবাব ও ফ্লাস্কে কফি।

    কিন্তু ফ্রিজ খুলেই ওর চক্ষু চড়কগাছ, কালকের আনা এক কিলো মাংসের মাত্র কয়েক টুকরো পড়ে আছে। তবে মেটলির ট্রে রয়েছে।

    মেরীকে ডেকে ও ধমকায় - এতটা মাংস কোথায় গেল?

    মেরী ফিসফিস করে - কুকুরকে দিতে হয়েছে।

    --একটা কুকুরের বরাদ্দ এক কিলো?

    নিরুপায় মেরী খবরের কাগজ পড়তে থাকা সরমার দিকে তাকায়।

    সরমা খবরের কাগজ পাশের চেয়ারে ছুঁড়ে ফেলে। শান্ত গলায় বলে- একটা কেন চারটের খাবার।

    --চারটে? চারটে কুকুর কবে এল? আমার সামনে তো খালি একটার কথা হয়েছিল!

    সরমার চোয়ালের ভাঁজ স্পষ্ট হয়।

    --সিকিউরিটির জন্য কুকুর রাখার কথা হয়েছিল। একটা-দুটো এসব কিছু বলা হয়নি। চারটে দরকার, তাই এসেছে।

    শুভময়ের গলা কাঁপে, ঠোঁট ফরফরায়। তারপর ও মেরীর উপস্থিতি ভুলে হাতজোড় করে বলে ওঠে—ম্যাম, আমি আপনার সবচেয়ে ভাল, সবচেয়ে বিশ্বস্ত কুকুর। যে কোন কাজ বলবেন—দৌড়ে গিয়ে বল মুখে করে আনা, আপনাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়া—সব পারি। ওদের বিদেয় করে দিন। আমি আছি, আপনার কোন ভয় নেই। একবার মৌকা দেকর দেখিয়ে তো! একটিবার দেখুন।

    শুভ’র দু’গাল বেয়ে জল গড়ায়।

    সরমার ভুরূ কুঁচকে ওঠে। ও চোখ ছোট করে শুভকে একপলক দেখে, তারপর চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়।

    --বেশ, এস আমার সঙ্গে; পরীক্ষা হয়ে যাক। যদি তুমি জিতে যাও, ওদের সবকটাকে দূর করে দেব। কিন্তু হারলে—চারটে হোক কি দশটা –তুমি মুখ খুলতে পারবে না।

    শুভ একটা ঘোরের মধ্যে সরমার পেছন পেছন গ্যারাজের দিকে যায়। সরমা তালা খোলে। শুভময় বহুদিন পরে এই গ্যারাজে এল।এটা বেশ বড়। চারদিক বন্ধ, একটা টিমটিমে হলদে বাল্ব জ্বলছে। একটা মান্ধাতার আমলের সিলিং ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে।

    মাঝখানে একটা টেবিলে একটা এটোঁ এলুমিনিয়ামের বাটি, তরকারির খোসা, সব্জিকাটার ছুরি। কুকুরগুলো কোথায়? চারটে কুকুর?

    খানিকক্ষণ পরে চোখ সয়ে যাওয়ায় শুভময় ওদের দেখতে পেল। ঘরের এককোণায় গাদাগাদি করে ঘুমুচ্ছে।দরজা খোলার শব্দে দু’জন ঘুম ভেঙে উঠে জিভ বের করে হাই তুলল। তারপর বাকি দুজনকেও জাগিয়ে দিল।

    কিন্তু এরা কারা? চারজন উনিশকুড়ি বছরের ছেলে, খালি গা, হাফপ্যান্ট, গলায় কালো সুতোয় একটা করে চাকতি ঝুলছে। চোখের পাতা ভারি, ঢুলু ঢুলু, মুখ থেকে নাল গড়াচ্ছে. তবে ভাবভঙ্গি কিন্তু ঠিক কুকুরের মতন।

    একজন আর একজনের গায়ের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে, একে অন্যকে থাবা মারছে আর সরমার দিকে তাকিয়ে মুখ উঁচু করছে।

    --এরা তোমার কুকুর? এরা?

    -হ্যাঁ, এরাই। অত্যন্ত বিশ্বস্ত, আমার জন্যে জান দিতে পারে। তুমি পারবে?

    শুভময় কিছু ভাবে, তারপর ধীরে ধীরে ইতিবাচক মাথা হেলায়।

    --তাহলে পরীক্ষা হয়ে যাক। শোন, তুমি উল্টোদিকের দেয়ালে পিছিয়ে যাও। আমি যেই হাতের রুমালটা মাটিতে ফেলব, অমনই খেলা শুরু হবে। ওকে? গুথথম

    সরমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ওর রুমাল তুলে ধরে। শুভময় একদিকের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়, উলটো কোণায় হাডল করা কুকুরগুলোকে দেখে।

    রুমাল মাটিতে পড়তেই চারটে কুকুর জোড় পায়ে লাফিয়ে এসে আক্রমণ করে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুভময়ের জোড়া পায়ের লাথিতে দুটো ওঁক করে ছিটকে পড়ে। এবার ওরা অবাক চোখে ওকে জরিপ করে। শিকার খুব সহজ নয় মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় বার ওরা ডান এবং বাঁ-দিক থেকে দু’জন করে ঝাঁপ দেয় শুভময়ের মাথা টেবিলের পায়ায় ঠুকে যায়। ও মাটিতে পড়ে গেছে। ওরা ওকে প্রায় কবজায় এনে ফেলেছে। নখের আঁচড় আর দাঁতের কামড়ে কাঁধের কাছটায় ছড়ে গেছে।

    শুভময় মরিয়া। জানে ওরা যদি একবার গলার নলিতে দাঁত বসাতে পারে তাহলে--। ও অন্ধের মত হাত-পা চালায়, কিছুটা গুথথম গুথথা ভাবটা আলগা হয়। ওর হাতে ঠেকে টেবিলের উপর থেকে পড়ে যাওয়া তরকারি কাটার ছুরিটা। প্রাণপণে এলোমেলো হাত চালায় ওদের মাঝখানে। জনাদুয়েকের গায়ে লাগে এবং রক্ত ছিটকে পড়ে।

    শুভ উঠে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে থাকে, আবার দেয়ালে পিঠ সামনে বাগিয়ে ধরেছে ছুরি, তাতে রক্ত লেগেছে।

    ওরা ভয় পেয়েছে, পিছিয়ে গিয়েছে উলটো কোণায়। বুঝতে পারছেনা আজব শিকারটিকে।

    সরমা অবাক, সরমা দিশেহারা। হিস্টিরিয়া গ্রস্তের মত চেঁচায়ঃ

    --কাম অন জিমি, কাম অন টম! গো, গো, গেট হিম!

    ওরা মিইয়ে গেছে, গুটিয়ে গেছে। সাড়া দেয় না।

    সরমার মুখের কষে ফেনা জমেছে। হিসহিস করে শুভময়কে বলে ছুরিটা ফেলে দিতে।

    -মানে?

    --মরদ হলে সমানে সমানে লড়। ওদের হাতিয়ার নেই, আর তুমি? কাওয়ার্ড!

    -ওরা যে চারজন?

    --তুমিই তো বলেছ তুমি একাই ওদের থেকে বেশি, এখন?

    শুভময় সরমার চোখে দিকে তাকায়। সাদা চোখ, মণি অদৃশ্য।

    ও একটু ভাবে। তারপর ছুরিটা টেবিলে নামিয়ে ফিরে এসে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়ায়।

    কুকুরগুলো বুঝতে পেরেছে যে খেলা শেষ। বাকিটুকু সময়ের অপেক্ষা। ওরা কোন তাড়াহুড়ো করছে না। ধীর মাপা পায়ে এগিয়ে আসছে, একটা বৃত্ত গড়ে তুলছে।

    শুভময় এখন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সরমা, কুকুর কাউকে না। ও সমস্ত ইন্দ্রিয় এক করে শুনছে একটা গান- “আর কি কখনও কবে, এমন সন্ধ্যা হবে”?

    বৃত্তটি ছোট হয়ে আসছে।
    ======================
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বাতী রায় | 117.194.33.65 | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৮:২৭733693
  • এই গল্পটা কাল রাতেই পড়েছিলাম। শেষটা খুব ভালো লেগেছিল। কিন্তু একটা জায়গা একটু আবছা ছিল, সারমেয় বিশ্বস্ততা দিতে পারে নি বলেই কি  শুভময়ের তীব্র সারমেয় বিতৃষ্ণা? তাই কোন মন্তব্য করি নি। কিন্তু সেই থেকে ওই শেষটা হণ্ট করছে। কিছুতেই ভুলতে পারছি না। বিন্দু বিন্দু করে ক্রাইসিসের পাহাড় গড়া, ... এ গল্প  ভুলব না  সহজে 

  • | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৯:০৭733694
  • এই গল্পটা বহু বছর আগে বাংলালাইভে পড়েছিলাম। সেখান থেকে আবার নতুন করে লিখেছেন। এই ভার্সানটা অসম্ভব তীক্ষ্ণ হয়েছে।  খুবই ভাল লাগল রঞ্জনদা।

  • | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৯:০৯733695
  • ও আর নামটা দুই তিন জায়গায় সরলা হয়ে গেছে। অন্য কোথাও দেবার সময় ঠিক করে দেবেন।

  • Ranjan Roy | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৮:০০733696
  • দুজনকেই অনেক ধন্যবাদ। 


    হ্যাঁ, বারোবছর পরে গল্পটি নতুন করে লিখলাম। দময়ন্তী আগের থেকে শার্প হয়েছে বলায় বুঝলাম পরিশ্রম কাজে এসেছে।


     আজ আবার দেখে বুঝলাম সরলা/সরমা এবং বেশ কিছু টাইপো শোধরাতে হবে।


    ট্রিভিয়া: আমি ঘরের মধ্যে কুকুর , কুকুরের লোম সহ্য করতে পারি না। এলার্জিও আছে। যদিও একসময় বাড়িতে পাঁচটি সাদা লোমঝোলা কুকুর ছিল।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
    • কি, কেন, ইত্যাদি
    • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
    • আমাদের কথা
    • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
    • বুলবুলভাজা
    • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
    • হরিদাস পালেরা
    • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
    • টইপত্তর
    • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
    • ভাটিয়া৯
    • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
    যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন